অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভাষান্তর : শামীম আহমেদ -
লর্ড ডানসানি’র সাতটি উপকথা

(এডওয়ার্ড জন মোরটন ড্রাক্স প্লাঙ্কেট, ডানসানির ১৮তম ব্যারন (১৮৭৮-১৯৫৭), ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সক্রিয় একজন অ্যাংলো-আইরিশ লেখক ও নাট্যকার। তার কাজ বেশির ভাগ ফ্যান্টাসি ধারার, লর্ড ডানসানি নামে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি প্রথম বিখ্যাত হয়েছিলেন ‘দ্য গডস অফ পেগানা’র জন্য, যা বিশ্ব সৃষ্টিকারী কাল্পনিক দেবতাদের নিয়ে একটি অতিশয় গল্পের সংকলন। তিনি পরবর্তীকালে ‘দ্য কিং অফ এলফল্যান্ডস ডটার’সহ অনেক ছোটগল্পসহ প্রচুর ফ্যান্টাসি লিখেছেন। পরবর্তী জীবনে, তিনি বিভিন্ন ধরনের নন-ফ্যান্টাস্টিক কল্পকাহিনী লিখেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ‘টেলস অব জরকেন্স’। ডব্লিউ বি ইয়েটস এবং লেডি গ্রেগরির সাথে তিনি কাজ করেছেন।

জীবদ্দশায় তার কাজের নব্বইটিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছিল এবং মূল কাজ এবং সংকলন উভয়ই প্রকাশিত হয়েছে। ডানসানি’র রচনায় অনেকগুলো প্রকাশিত ছোটগল্পের পাশাপাশি নাটক, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রয়েছে। তিনি তার প্রথম দিকের ছোটগল্প ও নাটকের মাধ্যমে দারুণ খ্যাতি ও সাফল্য অর্জন করেন এবং ১৯১০-এর দশকে ইংরেজিভাষী বিশ্বের অন্যতম সেরা জীবন্ত লেখক হিসেবে বিবেচিত হন। পরবর্তী ফ্যান্টাসিতে ডানসানির প্রভাব সাধারণত জে. আর. আর. টোলকিয়েন (যিনি নিজেই ডানসানিকে তার অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন) দ্বারা ছাপিয়ে যায়। তার প্রথম দিকের কাজের স্বপ্নের মতো গদ্যভাষ্য বিশেষভাবে আসক্তিযুক্ত, তার গদ্যভাষ্য প্রায়শই অনুকরণ করা হয়। সেই কারণে, উরসুলা কে. লে গুইন তাকে ‘দ্য ফার্স্ট টেরিবল ফেট দ্যাট বেফালেথ আনোয়ারি বিগিনার্স ইন ফ্যান্টাসি’ বলে অভিহিত করেছেন। এইচ. পি. লাভক্রাফ্ট, রবার্ট ই. হাওয়ার্ড, চলচ্চিত্র নির্মাতা গুইলারমো দেল তোরো, নীল গাইমান ডানসানি দ্বারা অনুপ্রাণিত। লাভক্রাফ্টের ‘ড্রিম সাইকেল’ গল্পগুলো, কীভাবে মহাবিশ্বের উদ্ভব হয়েছিল তার অন্ধকার ছদ্ম-ইতিহাস এবং তার দেবতা আজাথথ সবই ডানসানির প্রভাবকে স্পষ্টভাবে দেখায়। বোর্হেস, তার প্রবন্ধ ‘কাফকা অ্যান্ড হিজ প্রিকার্সরস’-এও ডানসানির গল্প ‘কারকাসোন’কে কাফকার বিষয়বস্তুকে প্রাসঙ্গিক বা সমান্তরাল পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো ‘দ্য চ্যারোমানস শ্যাডো’, ‘দ্য গডস অব পেগানা’, ‘দ্য কিং অফ এলফল্যান্ডস ডটার’, ‘টাইম এন্ড দ্য গড’, ‘দ্য সোর্ড অব ওয়েলারান এন্ড আদার স্টোরিস’, ‘এ ড্রিমারস টেলস’, ‘ফিফটি ওয়ান টেলস’, ‘দ্য বুক অব ওয়ান্ডার’ উল্লেখযোগ্য। অনূদিত নিম্নোক্ত গল্পগুলো ‘ফিফটি ওয়ান টেলস’ থেকে নেওয়া হয়েছে।)

অগ্নিযজ্ঞের পর

পৃথিবীকে যখন একটি কালো-অজ্ঞাত নক্ষত্র আঘাত করার ঘটনাটি ঘটে গেল, অন্য কোনো জগতের কিছু বিদঘুটে প্রাণী এসে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল যে সেখানে স্মরণীয় কিছু আছে কিনা! তারা সেইসব মহান জিনিগুলোর কথা বলছিল, যেগুলো পৃথিবীতে ছিল বলে তাদের মনে হয়; উদাহরণ স্বরূপ তারা ‘ম্যামথে’র নাম উল্লেখ করে।

বর্তমানে তারা দেখল মনুষ্য মন্দির, নীরব এবং গরাদবিহীন, ভয়াল খুলির মতো তাকিয়ে আছে।

‘কিছু দুর্দান্ত জিনিস এখানে রয়েছে, এই বিশাল জায়গায়’ একজন বলল। ‘এটি ম্যামথ ছিল,’ অন্যজন বলল। ‘তার চেয়ে বড় কিছু,’ আরেকজন বলল।

এবং তারপর তারা দেখতে পেল যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জিনিস ছিল মানুষের স্বপ্ন।

খরগোশ-কচ্ছপের আদি ও প্রকৃত ইতিহাস

খরগোশ বা কচ্ছপের মধ্যে কে দ্রুত ছুটতে পারে তা নিয়ে পশুকুলের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে অমীমাংসিত তীব্র সংশয় ছিল। কেউ কেউ বলেছিল, খরগোশ দ্রুততর কারণ তার বেশ লম্বা কান ছিল। অন্যদলের মতামত, কচ্ছপটি দ্রুততর, কারণ যার খোলস এত শক্ত সে দ্রুত দৌড়াতে সক্ষম হবে। এই বাদানুবাদ ও বিশৃঙ্খল দলাদলি চিরকাল একটি সিদ্ধান্তমূলক প্রতিযোগিতা মুলতবি করেছে। কিন্তু যখন পশুকুলের মধ্যে যুদ্ধংদেহী অবস্থা, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, খরগোশ ও কচ্ছপ পাঁচশো গজের দৌড়ে পরস্পর প্রতিযোগী হবে, যাতে সবাই দেখতে পারে কে সঠিক।

‘কী অদ্ভুত কথারে, বাবা!’ খরগোশ বলল, এবং তাকে দৌড়াতে রাজি করানোর জন্য তার সমর্থকরা যথা সর্বস্ব করল।

‘প্রতিযোগিতাটি আমি স্বাগত জানাই,’ কচ্ছপ বলল, ‘আমি এটাকে এড়িয়ে যাব না।’

‘সাবাস!’, তার সমর্থকরা উল্লাসধ্বনি করে। প্রতিযোগিতা দিন উত্তেজিত হয়ে, রাজহাঁস শিয়ালের দিকে তেড়ে এসে তাকে প্রায় ঠুকরে দিল। উভয়ের সমর্থক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের ব্যাপারে উচ্চস্বরে আশাবাদ ব্যক্ত করে।

‘আমি সফলতার ব্যাপারে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী,’ কচ্ছপটি বলল। কিন্তু খরগোশ কিছুই বলল না, সে বিরক্তি নিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে রইল। তখন তার কিছু সমর্থক তাকে পরিত্যাগ করে অন্যদিকে চলে যায়, যেখানে সমর্থকেরা কচ্ছপের অনুপ্রেরণামূলক কথাগুলো নিয়ে উচ্চস্বরে উল্লাস করছিল। কিন্তু অনেকেই খরগোশের সাথে রয়ে গেল। ‘আমরা তাকে হতাশ করব না, এত লম্বা কান বিশিষ্ট একটি জানোয়ার জয়ী হতে বাধ্য।’ কচ্ছপের সমর্থকরা বলল, ‘দ্রুত দৌড়াও।’ ফলে ‘দ্রুত দৌড়াও’ বাক্যাংশটি জিকির হয়ে ওঠে, যা প্রত্যেকে একে অপরের কাছে পুনরাবৃত্তি করে। ‘কঠিন খোলস এবং কঠিন পরিশ্রম। দেশ এটাই চায়। দ্রুত দৌড়াও।’ এই শব্দগুলো কখনই উচ্চারিত হয়নি, বরং পশুকুলের হৃদয় থেকে হর্ষধ্বনি আকারে আন্দোলিত হয়েছিল। তারপর তারা চুপ হয়ে গেল, এবং হঠাৎ সেখানে নিস্তব্ধতা নেমে এল। খরগোশ প্রায় একশ গজ দূরে চলে গেল, তারপর সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী কোথায় তা দেখার জন্য চারদিকে তাকাল। খরগোশ বলল, ‘কচ্ছপের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করা অযৌক্তিক।’ বসে বসে সে গা আঁচড়াতে লাগল। ‘দ্রুত দৌড়াও! দ্রুত দৌড়াও।’ সমর্থকেরা চিৎকার করছে।

‘ওকে বিশ্রাম নিতে দাও,’ অন্যরা চিৎকার করে বলল। ‘তাকে বিশ্রাম দাও’ বাক্যটিও জিকির হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পর তার প্রতিদ্বন্দ্বী কচ্ছপকে তার কাছাকাছি উপস্থিত হতে দেখা যায়।

‘ফালতু কচ্ছপটি চলে এসেছে,’ তারপর সে উঠে যথাসম্ভব দৌড়ে গেল যাতে কচ্ছপ তাকে হারাতে না পারে।

‘ওই কানগুলো জিতবে, ওই কানগুলো জয়ী হবে; আমাদের সত্য অনুমানকে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে।’

তাদের মধ্যে কেউ কেউ কচ্ছপের বন্ধু সমর্থকদের দিকে ফিরে বলল, ‘এখন তোমাদের প্রতিযোগীর কী হবে?’

‘দ্রুত দৌড়াও,’ তারা উত্তরে আওয়াজ দিল। ‘জোরে দৌড়াও।’ খরগোশটি প্রায় তিনশ গজ পর্যন্ত দৌড়ে গেল, সমাপ্তিরেখার খুব কাছাকাছি গিয়ে আচমকা তাকে এই ভাবনা পেয়ে বসল যে, সে বোকার হদ্দ। একটা কচ্ছপের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে, যাকে দৃষ্টিসীমায় দেখা যাচ্ছে না। তাই, সে আবার বসে পড়ল এবং শরীর চুলকাতে লাগল।

‘দ্রুত দৌড়াও, জোরে দৌড়াও’ এবং ‘ওকে বিশ্রাম নিতে দাও’, বাক্যদ্বয় উভয় সমর্থকেরা চেঁচিয়ে বলতে লাগল।

‘এসবের দরকার কী?’ খরগোশের বিরক্তি প্রকাশ পায়, এবার সে আয়েশ করে বিশ্রাম নেয়। কেউ কেউ বলে সে ঘুমিয়ে যায়। এক বা দুই ঘণ্টার জন্য প্রচণ্ড উত্তেজনা ছিল, এবং তারপর কচ্ছপ জয়ী হয়।

‘দ্রুত দৌড়াও, জোরে দৌড়াও,’ চিৎকার করে তার সমর্থকরা। ‘কঠিন খোলস এবং কঠোর পরিশ্রম : এটিই জয়ী করেছে।’ তারপরে তারা কচ্ছপকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তার কৃতিত্বের মর্মার্থ কী? কচ্ছপ বলে, ‘এটি দ্রুততার শক্তির জন্য একটি গৌরবময় বিজয়।’ তারপরে কচ্ছপটি তার বন্ধুদের কাছে এটি পুনরাবৃত্তি করে।

সমস্ত পশু বছরের পর বছর আর কিছুই বলেনি। এমনকি আজ পর্যন্ত ‘দ্রুততার শক্তির জন্য একটি গৌরবময় বিজয়’ শামুকের বাড়িতে একটি প্রবাদ-বাক্য।

প্রতিযোগিতার এই সংস্করণ ব্যাপকভাবে পরিচিত না হওয়ার কারণ হলো, এটির প্রত্যক্ষদর্শী পশুকুলের মধ্যে খুব কম সংখ্যক খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটে যাওয়া একটি বড় দাবানল থেকে বাঁচতে পেরেছিল। রাতে প্রচণ্ড বাতাসের সাথে তা বন-প্রান্তরের উপর উঠে এল। খরগোশ, কচ্ছপ এবং কিছু প্রাণী দূরের দাবানলটিকে অরণ্যপ্রান্তের একটি উঁচু খালি পাহাড় থেকে দেখেছিল। জঙ্গলে অন্য জন্তুদের সতর্ক করার জন্য কোন বার্তাবাহক তারা পাঠাবে তা ঠিক করার জন্য তারা তাড়াতাড়ি একটি সভা ডাকে।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক তারা কচ্ছপকে পাঠিয়েছিল।

ভুল পরিচয়

‘খ্যাতি’ একদা শহুরে সন্ধ্যায় হাঁটার সময় একটি গ্যাস-বাতির নিচে ‘কুখ্যাতি’র জাঁকালভাবে অঙ্কিত মুখটি প্রদর্শন করা দেখে। অনেকে রাস্তার নোংরায় তার কাছে হাঁটু গেড়ে বসেছিল।

‘তুমি কে?’ খ্যাতি তাকে বলে।

‘আমি খ্যাতি,’ কুখ্যাতি উত্তর দেয়।

তারপরে ‘খ্যাতি’ চুপিসারে চলে গেল যাতে কেউ জানতে না পারে যে সে চলে গেছে। ‘কুখ্যাতি’ অনতিবিলম্বে সম্মুখে এগিয়ে যায়। তার সমস্ত উপাসক তাকে অনুসরণ করে বেশির ভাগই তার কবরের অতলে মিলিত হয়।

কীট ও দেবদূত

পতিত সমাধি থেকে হামাগুড়ি দিয়ে একটি কীট একজন দেবদূতের সাক্ষাৎ পায়। তারা একসাথে রাজা ও রাজ্য, যুবক, কুমারী এবং মানুষের শহরগুলোর দিকে তাকায়। তারা অথর্ব বৃদ্ধদের চেয়ারে গুরুভার নেতানো অবস্থায় দেখে, মাঠের মধ্যে বাচ্চাদের গান গাইতে শোনে। তারা আরও দেখে দূরবর্তী যুদ্ধ, যোদ্ধা ও প্রাচীর ঘেরা শহর, প্রজ্ঞা ও কপটতা, রজন্যবর্গের জাঁকজমক ও সূর্যালোকের নিকট যে সমস্ত দেশের মানুষ পরিচিত ছিল তাদের।

কীট দেবদূতকে বলে, ‘আমার খাবার দেখে রাখুন।’

‘ভি দেকন পারা থিনা পলুফ্লইসবইও থ্যালাসেস’, (‘তিনি নিঃশব্দে এগিয়ে গেলেন উচ্চনাদি সাগরের তীরে’।) দেবদূত বিড়বিড় করলেন, কারণ তারা সমুদ্রের পাশ দিয়ে হাঁটছিল, ‘তুমি কি এটিও ধ্বংস করতে পারো?’

কীট ক্রোধে ফ্যাকাশে হয়ে বিষণ্নতায় পীড়িত হলো, তিন হাজার বছর ধরে সে এই জলজ সীমানাটি ধ্বংস করার চেষ্টা করছিল এবং এখনও তার মাথায় তার সুর বেজে চলেছে।

সময় ও কারিগর

‘সময়’ দুনিয়া চষে বেড়ানোর সময় তার চুলে ধূসরতা আসে,-বয়সের ভারে নয়,-শহরগুলোর ধ্বংসের ধুলোয়। সে একটি আসবাবের দোকানের অ্যান্টিক বিভাগে প্রবেশ করে। সেখানে সে একজন লোককে একটি চেয়ারের কাঠকে পলিশ দিয়ে কালো করতে ও শিকল দিয়ে পিটিয়ে তাতে গর্ত তৈরি করতে দেখে। যখন ‘সময়’ তাকে কাজ করতে দেখছিল, তখন সে তার পাশে দাঁড়িয়ে সমালোচনার দৃষ্টিতে তাকায়।

অবশেষে সে বলে, ‘আমি এভাবে কাজ করি না,’ সে লোকটির চুল সাদায় রূপান্তরিত করে তার পিঠ বাঁকিয়ে তার ছোট্ট ধূর্ত মুখে কিছু বলিরেখা ফুটিয়ে তোলে।

অতঃপর মুখ ফিরিয়ে দ্রুতলয়ে চলে যায়। একটি শক্তিশালী শহর, যে ক্লান্ত আর অসুস্থ ছিল এবং দীর্ঘকাল ধরে ক্ষেতগুলোকে কষ্ট দিয়েছে, তার ‘সময়’কে প্রয়োজন ছিল।

মুরগি

খামারের বাগানের তিনকোনা ধারে সোয়ালো পাখি সারি সারি বসে একে অপরকে কিচিরমিচির করে বিরক্ত করছে। অনেক কিছু বললেও তারা কেবল গ্রীষ্ম আর দক্ষিণের কথাই ভাবছে। এখন শরৎকাল আর উত্তরের বাতাস তাদের অপেক্ষা করছে। হঠাৎ একদিন তারা সবাই একেবারে চলে গেলে খামারের সবাই সোয়ালো এবং দক্ষিণের কথা আলোচনা করে।

‘আমি মনে করি পরের বছর আমি নিজেই দক্ষিণে যাব,’ একটি মুরগি বলে। বছর অতিবাহিত করে সোয়ালোরা আবার এল। তারপরের বছরটিও অতিবাহিত হলো এবং তারা আবার বাগানের তিনকোনা ধারের উপর এসে বসল। এবারে খামারের পক্ষীসমূহ মুরগির প্রস্থান নিয়ে আলোচনা করছিল।

একদা খুব ভোরে, উত্তর দিক থেকে আসা বাতাস সোয়ালোরা তাদের ডানায় অনুভব করে উড়ে গেল। তাদের উপর একটি অপার্থিব অদ্ভুত পুরোনো জ্ঞানের শক্তি এসেছিল, যা মানুষের বিশ্বাসের চেয়েও বেশি। শহরের ধোঁয়া ও ছোট ছোট মনে রাখা ঘরের ছাঁইচগুলো ছেড়ে তারা উঁচুতে উড়াল দিল। অবশেষে বিশাল এবং সীমাহীন সমুদ্র দেখল। ধূসর সমুদ্র, বাতাসে দ্বারা নিয়ন্ত্রিত স্রোতে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। দক্ষিণে কুয়াশার তীরভূমি ধরে গিয়ে তারা তাদের মাথার উপরে ঝলমলে পুরোনো দ্বীপগুলো দেখতে পেল।

তারা দেখে বিচরণকারী জাহাজের ধীরগতির চলন, ডুবুরিরা মুক্তো খুঁজছে, যুদ্ধলিপ্ত ভূখণ্ড, যতক্ষণ না তারা যে পাহাড়গুলো খুঁজছিল তাদের চেনা চূড়াগুলোর দৃশ্য দেখতে পেল। তারা একটি দখিনা উপত্যকায় নামে, গ্রীষ্মকে সেখানে কখনো থির অথবা কখনও গান গাইতে দেখেছিল।

‘আমার মনে হয় বাতাস ঠিকই আছে,’ মুরগি বলল; সে তার ডানা মেলে হাঁস-মুরগির খামার থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। দৌড়ে রাস্তার দিকে ছুটে কিছু পথ নেমে গেল যতক্ষণ না সে একটি বাগানে আসে।

সন্ধ্যায় সে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল।

খামারে সে অন্য হাঁস-মুরগিকে বলল, যে সে কীভাবে দক্ষিণে উঁচু রাস্তা পর্যন্ত চলে গিয়ে দেখেছিল যেখানে বিশাল যানবাহনের সারি, জমিতে আলু জন্মেছে, খড়ের গাদা দেখতে পেয়েছে মানুষের বাসস্থানে, রাস্তার শেষ প্রান্তে সে একটি বাগান খুঁজে পেয়েছিল, সেখানে গোলাপ ছিল সুন্দর গোলাপ! মালিও ছিল সেখানে।

‘অত্যন্ত আকর্ষণীয়,’ হাঁস বলল, ‘সত্যিই সুন্দর বর্ণনা!’

শীতকাল চলে যায়, তিক্ত মাসগুলো মিলিয়ে যায়, বছরের বসন্ত আবির্ভূত হয়। সোয়ালোরা আবার ফিরে আসে।

‘আমরা দক্ষিণে গিয়েছিলাম সমুদ্রের ওপারে উপত্যকায়’, তারা বলে।

কিন্তু হাঁস-মুরগি রাজি হলো না, দক্ষিণে একটি সমুদ্র আছে। তারা বলল, ‘তোমদের মুরগির কথা শোনা উচিত।’

সাক্ষাৎ

‘খ্যাতি’ তুচ্ছভাবে গান গেয়ে রাজপথ দিয়ে যাচ্ছিল। তার এই নগণ্য ভ্রমণক্ষণে সে কবিকে পাশ কাটিয়ে গেল। কবি ‘খ্যাতি’র জন্য ছোট ছোট গানের কলি তৈরি করছিল, প্রণয় নিবেদনের ক্ষণে তাকে অর্ঘ্য দিতে। ‘খ্যাতি’ তার পরিবর্তে মূল্যহীন মালা পরত। উদ্ধত পুরবাসী ‘খ্যাতি’র পথে ছুটে আসে পচনশীল উপকরণ দিয়ে তৈরি মালা নিয়ে। কিছুক্ষণ পরে যখনই এই মালাগুলো মারা যায় কবি তার গানের স্তবক মালা নিয়ে তার কাছে আসে; তবুও সে কবিকে নিয়ে হাসে এবং মূল্যহীন পুষ্পস্তবক পরিধান করে, যদিও তারা সবসময় সন্ধ্যায় ইন্তেকাল করে।

একদিন তিক্ততায় কবি তাকে তিরস্কার করে বলে, ‘সুন্দরী খ্যাতি, মহাসড়ক এমনকি পথের মধ্যেও তুমি মূল্যহীন লোকদের সাথে হাসতে, চিৎকার করতে এবং ঠাট্টা করা থেকে নিজেকে সামলাতে পারো না। আর আমি তোমার জন্য মেহনত করেছি এবং তোমার স্বপ্ন দেখেছি, তথাপি তুমি আমাকে উপহাস করে আমাকে বরাবরই পাশ কাটিয়েছ।’

‘খ্যাতি’ তাকে তার পশ্চাৎ দেখিয়ে চলে যায়। বিদায় নেওয়ার সময় সে তার মাথা ঘুরিয়ে কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে মৃদু হেসে যেমন সে আগে হাসেনি, প্রায় ফিসফিস করে বলে, ‘আমি কারখানার পেছনের কবরস্থানে একশ বছরে মধ্যে তোমার সাথে দেখা করব।’

 

Read Previous

মুদ্রিত দুঃখের ধারাপাতে

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৫ম সংখ্যা (অক্টোবর-২০২৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *