অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাংলা ভাষান্তর: নাহার তৃণা -
হিরন্ময় ভ্রমণস্মৃতি
কেন্ট নারবার্ন

সেই একটা সময় ছিল আমার জীবনে- বিশ বছর আগে যখন আমি ক্যাব চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম। সেটা ছিল বাঁধনহারা এক রাখালের জীবন, এক জুয়াড়ির জীবন, এমন একটা জীবন যেখানে কেউ মাতব্বরি করার ছিল না। শুধুই এদিক থেকে সেদিকে ছুটে বেড়ানো। প্রতিটি নতুন যাত্রি গাড়িতে ওঠার সময় ছক্কার গুটির মতো নতুন দানের রোমাঞ্চ।

পেশা হিসেবে নেবার আগে এটা ভাবিনি যে এও এক ধরনের পরিসেবামূলক কাজ। যেহেতু আমি রাতে গাড়ি চালাতাম, সে সময়ে আমার গাড়িটি যেনো স্বীকারোক্তির চলন্ত এক চত্বর হয়ে উঠতো। যাত্রিরা গাড়িতে উঠে পেছনের সিটে বসতেন। তারপর সম্পূর্ণ অপরিচিত সেসব মানুষগুলো আমাকে নিজেরদের জীবন কাহিনি শোনাতেন।

গাড়িতে ওঠা মানুষগুলো আর আমি ছিলাম ট্রেন কামরার অপরিচিত যাত্রিদের মতো, রাতটাকে যারা মেরেকেটে কোনোভাবে পার করতে চাইতো, রাতের অন্ধকারে আমরা অকপটে এমন সব অনুভূতি প্রকাশ করতাম দিনের আলোতে যা বয়ানের কথা স্বপ্নও ভাবতে পারতাম না। আমি এমনসব লোকের সান্নিধ্য পেয়েছি যাদের জীবনের গল্প আমাকে বিস্মিত করেছে, অভিভূত করেছে, কখনও আমাকে হাসিয়েছে বা কাঁদিয়েছে। তবে তাদের কারো জীবন কাহিনিই আমাকে অতটা ছুঁতে পারেনি যতটা ছুঁয়েছিল সেই বৃদ্ধার কাহিনি, যাকে আমি আগস্টের এক উষ্ণ মধ্যরাতে আমার ক্যাবে তুলেছিলাম।

শহরের অপেক্ষাকৃত নির্জন কোণের একটি চারতলা ভবন থেকে ফোনটি এসেছিল, আমি সাড়া দিয়েছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম ওখান থেকে হয়তো আড্ডা শেষে ঘরমুখীদের তুলতে হবে, কিংবা এমন কেউ যে তার প্রিয়জনের সাথে মাত্রই ঝগড়া শেষে অভিমানে ঘর ছাড়তে চায়, অথবা শহরের শিল্প এলাকার কোনো কারখানায় কর্মরত কেউ ভোরের শিফটে তাড়াতাড়ি যেতে চাইছে।

ঠিকানা ধরে পৌঁছে দেখলাম শুধু নিচতলার একটা জানালা দিয়ে সামান্য আলোর রেখা ছাড়া পুরো দালানটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। এরকম পরিস্থিতিতে, অন্য চালকেরা হয়ত বার দুয়েক হর্ন বাজাতো, কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে তারপর ফিরে যেতো। কেননা দিবাগত রাত আড়াইটায় অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবন থেকে যাত্রি তোলা একজন ক্যাব চালকের জন্য খুব নিরাপদ নয়; নানারকম বিপদের সম্ভাবনা ওত পেতে থাকতে পারে।

কিন্তু আমি প্রচুর লোককে দারিদ্র্যের জীবনে আটকে থাকতে দেখেছি, যারা তাদের যাতায়াতের একমাত্র বাহন হিসেবে ক্যাবের উপর নির্ভর করে। সেরকম বিপদের ঝুঁকি না দেখলে, আমি সচরাচর নেমে যাত্রির খোঁজে দরজায় গিয়ে টোকা দিতে অভ্যস্ত। নিজেকে প্রবোধ দিতাম, যাত্রিদের কারো হয়তো আমার সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। যদি আমার মা অথবা বাবা কোনো ক্যাব ডাকতেন আমিও কী সেই ক্যাব চালকের কাছ থেকে এমন ব্যবহার আশা করতাম না? কাজেই আমি হেঁটে গিয়ে দরজায় টোকা দিলাম।

-এক মিনিট রোসো, দুর্বল আর বয়স্ক একটি নারী কণ্ঠ উত্তর দিলেন। মেঝের উপর দিয়ে ভারি কোনো কিছু টেনে আনার শব্দ শুনতে পেলাম। বেশ অনেকটা সময় পর, দরজা খুললো। ছোটোখাটো কাঠামোর আশি ঊর্ধ্ব এক বৃদ্ধা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার পরনে ছিল প্রিন্টের জামা আর মাথায় পাতলা আবরণওয়ালা পিলবক্স টুপি, এরকম জিনিস আপনি কোনো পোশাকের দোকানে বা গুডউইল স্টোরে অথবা ৪০ দশকের কোনো চলচ্চিত্রে দেখে থাকতে পারেন। বৃদ্ধার পায়ের কাছে রাখা একটি ছোটো নাইলনের সুটকেস। মেঝের উপর ওটিকেই তিনি টেনে-হিঁচড়ে আনছিলেন যার শব্দ তখন শুনেছিলাম।

অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরটা দেখে মনে হচ্ছিল কয়েক বছরে এখানে কেউ বাস করেনি। ঘরের আসবাবপত্র চাদরে ঢাকা ছিল। দেওয়ালে ঝুলানো কোনো ঘড়ি দেখা গেলো না, কাউন্টারের উপরও কোথাও কোনো ছোটোখাটো জিনিসপত্রের চিহ্নমাত্র ছিল না, বসতবাড়িতে সচরাচর যেমন থাকে। ঘরের এককোণে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স ভর্তি কিছু ছবি আর কাঁচের বাসনকোসন দেখা যাচ্ছিল।
-আমার ব্যাগটি গাড়িতে নিয়ে রাখবে বাবা? তিনি বললেন।

-আমি কিছু সময় একা থাকতে চাই। তারপর ফিরে এসে গাড়ি পর্যন্ত যেতে যদি আমায় একটু সাহায্য করতে? শরীরে খুব একটা জোর নেই আমার।

আমি সুটকেসটি নিয়ে গাড়িতে রেখে তারপর বৃদ্ধাকে সাহায্য করতে ফিরে এলাম। তিনি আমার হাত ধরলেন এবং আমরা ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার সদাশয় আচরণের জন্য তিনি অনবরত আমাকে ধন্যবাদ জানাতে লাগলেন।
-এটা এমন কিছু না। এই বলে তাকে নিরস্ত করতে চাইলাম।
-আমার মা হলে যেমন আচরণ করতাম যাত্রিদের সাথে সেটুকু করতে চেষ্টা করি।
-আহা, তুমি সত্যি একটা সোনার ছেলে, বৃদ্ধা বললেন। তার প্রশংসা স্তুতি বেশ বিব্রত করার মতো।
আমরা গাড়িতে উঠে বসার পর তিনি আমাকে একটি ঠিকানা দিলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন,
-তুমি কি শহরতলির ভেতর দিয়ে যেতে পারবে?
-ওই পথ দিয়ে গেলে কিন্তু দেরি হবে। আমি উত্তর দিলাম।
-ওহ, সমস্যা নেই, তিনি বললেন। আমার কোনো তাড়া নেই। শেষ যাত্রার প্রস্তুতিশালায়(হসপিস) যাচ্ছি আমি বাছা।
আমি রিয়ারভিউ আয়নার দিকে তাকালাম। তার চোখজোড়া ঝকঝক করছিল।
-আমার নিজের বলতে কেউ বেঁচে নেই। তিনি বলে চললেন,
-ডাক্তার বলেছেন সেখানে(হসপিসে) গিয়েই আমার থাকা উচিত। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন আমার হাতে আর খুব বেশি সময় নেই।
সন্তর্পণে হাত বাড়িয়ে আমি মিটারটা বন্ধ করে দিলাম।
-কোন পথ দিয়ে আপনি যেতে চান বলুন? বৃদ্ধার কাছে জানতে চাইলাম।

পরবর্তী দুঘন্টা আমরা শহরময় চক্কর দিয়ে বেড়ালাম। তিনি আমাকে সেই ভবনটি দেখালেন যেখানে একসময় তিনি এলিভেটর অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। আমরা সেই এলাকার আশপাশেও ঘুরলাম, বিয়ের পরপর যে এলাকায় তিনি এবং তার স্বামী থাকতেন। আমাকে তিনি একটি আসবাবপত্রের দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করাতে বলেন, একসময় যেটি বলরুম ছিল, কিশোরী বেলায় তিনি সেখানে নাচতে যেতেন। মাঝে মাঝেই বৃদ্ধা আমাকে বিশেষ কোনো ভবন বা জায়গার সামনে গাড়ির গতি কমাতে বলছিলেন, এবং অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে ছিলেন চুপচাপ।

সূর্যের প্রথম রশ্মি যখন দিগন্তরেখায় ফুটে উঠতে শুরু করেছে, তখন তিনি হঠাৎ বলে ওঠেন,
-অনেক হয়েছে! আমার ক্লান্ত লাগছে। এবার চলো।

বাকি পথটুকু একদম নীরবে কাটলো, তিনি আমাকে যে ঠিকানা দিয়েছিলেন আমরা সেই গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছালাম। আড়ম্বরহীন একতলা একটি ভবন, ছোটোখাটো আরোগ্য নিকেতন যেমন হয়, গাড়ির রাস্তাটি বারান্দার নিচ দিকে চলে গেছে। গাড়ি থামতেই দুজন সাহায্যকারী এগিয়ে এলেন। আমার অপেক্ষা না করেই তারা দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে বৃদ্ধার দেখভাল শুরু করে দিলেন। তারা অত্যন্ত আন্তরিক এবং একাগ্রভাবে তার প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এতক্ষণ নিশ্চয়ই তারা বৃদ্ধার অপেক্ষাতেই ছিলেন; সম্ভবত আমার পৌঁছানোর আগে তিনি তাদের ফোন করে জানিয়ে রেখেছিলেন।

আমি গাড়ির ট্রাঙ্ক খুলে ছোট্ট সুটকেসটা নিয়ে দরজার সামনে পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এলাম। ইতোমধ্যে তার জন্য আনা হুইলচেয়ারে তিনি বসে পড়েছেন।

-গাড়ি ভাড়া কত হয়েছে? বৃদ্ধা তার পার্সের ভেতর হাত ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম,
-দিতে হবে না।
-তোমার রুটিরুজি চলে এ দিয়ে। মায়াভরে তিনি বললেন।
-অন্য যাত্রিরা আছেন, আমি উত্তর দিলাম।
প্রায় কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই নিচু হয়ে আমি বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরলাম। তিনিও আমায় শক্ত করে ধরে রাখলেন।
-তুমি এই বুড়িকে আনন্দের এক মুহূর্ত উপহার দিলে বাবা। আবেগকম্পিত গলায় বললেন,
-ধন্যবাদ।

এরকম মুহূর্তে বলার কিছু থাকে না। আমি তার হাতে আলতোভাবে চাপ দিলাম, তারপর ভোরের মৃদু আলো মাড়িয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। পেছনে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম। হয়তো ওটা ছিল চিরদিনের জন্য একটা জীবনের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

রাতের সেই পালায় আমি আর কোনো যাত্রি গাড়িতে তুলিনি। উদ্দেশ্যহীনভাবে গাড়ি নিয়ে এলোমেলো ঘুরলাম, কী এক ভাবনায় হারিয়ে গেলাম। সেদিনের বাকি সময়, কারো সাথে তেমন কথা বলতেও ইচ্ছে করেনি। শুধু মনে হয়েছে যদি ওই বৃদ্ধা মহিলার ভাগ্যে একজন রগচটা চালক জুটত, অথবা এমন ধৈর্যহীন কেউ যে রাতের শিফট শেষ করার জন্য অস্থির থাকতো কী হতো তাহলে? কী হতো যদি আমি অত ঝক্কি পোহাতে অসম্মত হতাম কিংবা একবার হর্ন দিয়েই চলে আসতাম? কী হতো যদি আমার মেজাজ বিগড়ে থাকতো অথবা মহিলার কাহিনি শোনার ব্যাপারে একদমই আগ্রহ না দেখাতাম? না জানি এরকম আরও কতো মুহূর্ত আমি হেলায় হারিয়েছি বা নিঃসঙ্গ মানুষের অনুভূতি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি?

আমরা শতসিদ্ধভাবে ভাবতে ভালোবাসি যে, আমাদের জীবন নিরন্তর দারুণসব মুহূর্ত ঘিরে আবর্তিত হবে। কিন্তু হিরন্ময় মুহূর্ত অকস্মাৎ-ই আমাদের সামনে ধরা দেয়। যখন ওই বৃদ্ধা মহিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন আমি তাকে আনন্দময় কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছি, তখন মনে

এই বিশ্বাস জন্মায় যে তাঁকে শেষবারের মতো গাড়ির সাওয়ারি করার জন্যই হয়তো এই পৃথিবীতে আমার জন্ম হয়েছে।
আমার মনে হয় না এর চেয়ে মূল্যবান কাজ আমি জীবনে খুব একটা করেছি।
————————-
লেখক পরিচিতি:
পুরো নাম কেন্ট মাইকেল নারবার্ন(Kent Michael Nerburn)। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা স্টেটের মিনিয়াপোলিসে ১৯৪৬ সালের ৩ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। কেন্ট নারবার্ন একজন আমেরিকার লেখক, ভাস্কর এবং শিক্ষক। কেন্ট নারবার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮০ সালে রিলিজন এন্ড আর্টে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ মিলিয়ে এ পর্যন্ত তাঁর ১৬টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখালিখির মূল বিষয় নেটিভ আমেরিকানদের ঐতিহ্য ইতিহাস এবং জীবন, এছাড়া আমেরিকান সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি। তিনি তাঁর ট্রিওলজি “নেদার উলফ নর ডগ(Neither Wolf Nor Dog)”, “দ্য উলফ অ্যাট টোয়ালাইট(The Wolf At Twilight)”, এবং “দ্য গার্ল হু সাং টু দ্য বাফেলো(The Girl who Sang to the Buffalo)” এর জন্য ১৯৯৫, ২০১০-এ মিনেসোটা বুক অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। সুর এবং ছবি, এই দুটি অনুষঙ্গকে সাহিত্য জন্য জরুরি মনে করেন কেন্ট। একজন লেখক যখন তার গল্পটি লিখবেন তখন যেন তিনি তার সৃষ্টির নিজস্ব সুরটি শুনতে পান। স্পষ্ট একটি ছবি যেন বয়ানের শৈলি পেরিয়ে ফুটে ওঠে- লেখালিখি সম্পর্কে এটি হচ্ছে কেন্ট নারবার্নের বক্তব্য। যা তিনি তাঁর লেখালিখি এবং ভাস্কর্যের মধ্যে সযত্নে গুঁজে দেন। তিনি মনে করেন, বিশ্বাস হচ্ছে যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের মূল চালিকাশক্তি। সে বিশ্বাস সৃষ্টিকর্তার প্রতি হতে পারে, প্রকৃতির প্রতি হতে পারে।

‘দ্য ক্যাব রাইড আই উইল নেভার ফরগেট’ গল্পটি কেন্ট নারবার্নের “মেক মি অ্যান ইনস্ট্রুমেন্ট অফ ইওর পিস: লিভিং ইন দ্য স্পিরিট অফ দ্য প্রেয়ার অফ সেন্ট ফ্রান্সিস” থেকে নেওয়া হয়েছে।

Read Previous

বরষা-স্মৃতি : কৈশোরবাস, কদমে প্রেমের সুবাস

Read Next

লাতিন আমেরিকার কবি রোকে ডালটন’র দুটি কবিতা

One Comment

  • খুব ভালো লাগলো। চমৎকার অনুবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *