
ফ্রয়েড যিনি পড়েননি তিনিও জানেন, ক্ষমতা ও যৌনতা পারস্পরিকভাবে কীভাবে সম্পৃক্ত।
যে আধপেটা খেয়ে সারাদিন কাজ করে, মালিকের অত্যাচার সহ্য করে, কম মজুরি পায়, রাতে বাড়ি ফিরে তার প্রথম কাজ হর বউকে পেটানো। এতে সে তৃপ্তি বোধ করে। মালিকের প্রতি আক্রোশ, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এভাবে সে মিটিয়ে ফ্যালে। স্বামী-স্ত্রীর এই অস্বাভাবিক সম্পর্কের ভেতরে কোনো রাত কিন্তু সঙ্গমহীন পার হয়ে যায় না। এটা হয় ঐ না-পাওয়া থেকে, ক্ষোভ থেকে, প্রতিহিংসা থেকে, ক্ষুধা থেকে।
সমরেশ মজুমদারের ‘বাঙালির নষ্টামি’ পড়ছি। জার্নাল আর স্মৃতিকথার মিশেল। সমরেশ জনপ্রিয় লেখক। অল্প বয়সেই ‘দৌড়’ প্রকাশিত হলে, তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
সমস্ত বইটা দেখছি এক ধরনের বিষোদ্গার। লেখকদের প্রতি। কেমন লেখক? যারা কম লেখে বা লিখে জনপ্রিয় হয়নি। যাদের লেখা বড় কাগজে ছাপে না। যারা প্রকাশক পায় না। গাঁটের পয়সা খরচ করে যারা বই ছাপতে বাধ্য হন। যাদের জোটে না প্রকাশকের জামাই আদর। এদের প্রতি সমরেশের খুব রাগ। তার কথা যে কত খাঁটি তার প্রমাণ দিতে তিনি হাজির করেছেন রবীন্দ্রনাথকে, শরৎচন্দ্রকে, সমরেশ বসুকে।
কিন্তু আপেক্ষিকতাবাদ না বুঝেও বলা যায়, সত্য অনেক রকম। জীবনানন্দের নাম কি তিনি শুনেছেন? কমলকুমার? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস? হাসান আজিজুল হক? এরা তার মতো জনপ্রিয় কেউ না। প্রকাশক টাকার বান্ডিল নিয়ে এদের দরজায় কখনো ধর্না দেয়নি। তা কী মনে হয়, এরা লেখক না?
পশ্চিমবঙ্গের যে পুরস্কারের কথা সমরেশ উল্লেখ করেছেন, সাহিত্যের ক্ষেত্রে তা পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় আর্থিকমূল্যের পুরস্কার। যা সমরেশ পয়েছেন, ইলিয়াসও পেয়েছেন। সমরেশের মতো আড়াইশ’খানা উপন্যাস না লিখেই পেয়েছেন। অবশ্য কর্তৃপক্ষ ইলিয়াসকে কেন পুরস্কার দিল এ নিয়ে ভিন্ন মত আছে। কেন না ইলিয়াস তো নিজেকে বিক্রি করবেন না। যা সমরেশের পক্ষে সম্ভব।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইলিয়াস দুটো মাত্র উপন্যাস লিখেছেন। এর ভিতরে ‘খোয়াবনামা’কে বলা যায় বাংলা উপন্যাসের উৎকর্ষের চূড়ান্ত রূপ। ইলিয়াসের কথা সমরেশের মনে আসেনি। মৃণাল সেনকে তিনি সহ্য করতে পারেন না। কেন? এরা মধ্যবিত্তের রুচির গালে খাপ্পড় মারেন বলে? যে মধ্যবিত্ত-রুচি সমরেশের-সুনীলের-হুমায়ূনের করে খাওয়ার আদর্শ ক্ষেত্র।
অজনপ্রিয় লেখকদের প্রতি সমরেশের যত রাগ। কেন? এরা তো সমরেশের বাড়া ভাতে ছাই দিতে যাচ্ছেন না। এরা সাতেও না, পাঁচেও না। তাহলে? নাকি এই বিদ্বেষ এই ক্ষোভ নিজেকে আড়াল করার জন্য, সব অপরাধ থেকে, অক্ষমতা থেকে? ইলিয়াস কেন একটা উপন্যাস লিখেই তার মতো একই পুরস্কার পাবেন যা তাকে পেতে দু’শতাধিক লিখতে হয়েছে? এটাও ঐ পুরস্কার কর্তৃপক্ষের কারসাজি। এসব প্রতিষ্ঠান সবই করে ব্যাবসায়ের খাতিরে। আর ইমেজ রক্ষার জন্য, পাপ ঢাকার জন্য কখনো কখনো সত্যকে এরা স্বীকার করে নেয়। ঐ ব্যবসায়িক স্বার্থেই। এখানে সমরেশরাও লাভবান হন। কেন না ইলিয়াসদের সঙ্গে একই মঞ্চে বসার সুযোগ মিলে যায়।
‘বাঙালীর নষ্টামি’ বইতে সমবেশ যে নষ্টামি ক্রমাগত করেছেন, আমার মনে হয়েছে তা অক্ষমতার দহন। কোনো অন্তর্দ্বন্দ্ব কি তার নেই? কখনো কি মনে হয়নি, এত এত উপন্যাস না লিখে যদি একটা, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ বা ‘বন্দী শিবির থেকে’ লিখতে পারতাম!’
১. আত্মজা ও একটি করবী গাছ— গল্পগ্রন্থ— হাসান আজিজুল হক
২. বন্দী শিবির থেকে— কাব্যগ্রন্থ— শামসুর রাহমান