অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
এপ্রিল ৩, ২০২৫
২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
এপ্রিল ৩, ২০২৫
২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যাহিদ সুবহান -
সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস : একাত্তরের বর্ণিল আলোকছটা

unnamed

একটি জাতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে তার ইতিহাস-ঐতিহ্য পাঠ করার কোনো বিকল্প নেই। যদি জাতিকে কোনো মূল্যবান বস্তুর সঙ্গে তুলনা করা যায়, তবে ইতিহাসকে সে বস্তুর মোড়ক হিসেবে তুলনা করা যেতে পারে। মোড়ক দেখে অনুমান করা যায় এর অভ্যন্তরে কেমন দামি বস্তু আছে। (সব ক্ষেত্রে এমন ধারণা না করাই উত্তম)। ইতিহাস জাতির উৎস সন্ধান করে। একটি জাতির সমৃদ্ধি-বীরত্ব-সভ্যতা সবই নির্ণয় করে সে দেশের ইতিহাস। একটি দেশের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিরূপণ করতে হলেও সে দেশের ইতিহাস গবেষণা জরুরি। তাই ইতিহাস একটি সভ্য জাতির অমূল্য সম্পদ। বিদগ্ধজন বারবার নিজেদের ইতিহাস পাঠ ও উন্মোচনে গুরুত্ব দিয়েছেন। পৃথিবীর সকল জাতি-রাষ্ট্রেরই রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস। নিজেদের ইতিহাস চর্চা করে অনেক জাতি সমৃদ্ধির উচ্চশিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ইতিহাসের আকাল রয়েছে। এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই ইতিহাস চর্চায় বিশেষ উদাসীনতা লক্ষণীয়। আর এই হতাশা থেকেই সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘সাহেবেরা যদি পাখি মারিতে যায়, তাহারও ইতিহাস লিখিত হয়, কিন্তু বাঙ্গালার ইতিহাস নাই। বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী তাহাকেই লিখিতে হইবে। আইস আমরা সকলে মিলিয়া বাঙ্গালার ইতিহাসের অনুসন্ধান করি। যাহার যতদূর সাধ্য, সে ততদূর করুক; ক্ষুদ্র কীট যোজনব্যাপী দ্বীপ নির্মাণ করে। একের কাজ নহে সকলে মিলিয়া করিতে হইবে।’

বাংলা ও বাঙালির রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য। বুনো হাতিকে পোষ মানানোর মতো গৌরব একমাত্র এই ভেতো বাঙালির ঝুলিতেই আছে। এ অঞ্চলের গত দু’শো বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বিচিত্র সব ঘটনা ঘটে গেছে এ ভূখণ্ডে। ভাঙা-গড়ার এইসব ঘটনার অন্যতম সাক্ষী বাংলাদেশ। পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের পর দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসন, নীল বিদ্রোহ, কৈবর্ত বিদ্রোহ, প্রজা বিদ্রোহ, ফরায়েজী আন্দোলন আর নানা সংগ্রাম শেষে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে সৃষ্টি হয় পাকিস্তান নামক নতুন জাতিরাষ্ট্রের। বাংলাদেশের মানুষ আশায় বুক বাঁধতে থাকে। ভেবে নেয় এই তো তাদের সুদিন ফিরে এল। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি! মাত্র কয়েকদিন পরই তারা বুঝতে পারে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছে। তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুকম্পার জনপদে পরিণত হয়। মাত্র এক বছরের মাথায় আঘাত আসে তাদের ভাষার উপর। রাজপথে ঝরতে থাকে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের মতো তাজা প্রাণ। এ যেন উত্তপ্ত কড়াই থেকে জলন্ত উনুনে পড়ার মতো অবস্থা! শুরু হয় তেইশ বছরের যন্ত্রণার নাগরিক জীবনযাত্রা। তবে এত কিছুর পরেও বাঙালি হাল ছাড়েনি স্বপ্ন দেখেতে। দীর্ঘ তেইশ বছরের পাকিস্তানি জীবনে বাঙালি নিজেদের বলে কিছু দাবি করতে পারেনি ঠিকই তবে ঘুরে দাঁড়াতে শিখেছে এই জনপদেরই কয়েকজন সূর্যসন্তানের দেওয়া মুক্তির বার্তায়। এই সূর্যসন্তানেরা বাঙালির সুপ্ত জাতীয়তাবাদের চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। বারবার বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে এদেশের মানুষ একাট্টা হয়েছে এবং ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেশমাতৃকার অধিকারের প্রশ্নে।

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামের বিরল দৃষ্টান্ত। আমাদের এই গৌরবময় অর্জনের কারিগর বাংলা মায়ের সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর মোহন বাঁশির সুরে মোহিত হয়ে বাংলার এই দামাল ছেলেরাই সেদিন ছিনিয়ে এনেছিল আমাদের স্বাধীনতা। তারা চূড়ান্ত জনযুদ্ধে উপনীত হয় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে, ১৬ ডিসেম্বর সম্মিলিত চেষ্টায় ছোট্ট এই ভূখণ্ডটি পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়; পায় একটি পতাকা ও মানচিত্র। এত ঘটনার ডামাডোলের পরেও এই ভূখণ্ডের ইতিহাস শক্তিশালী কাঠামোতে দাঁড়াতে পারেনি। এই সময়ের ইতিহাস রচিত হয়েছে বিক্ষিপ্ত ও মনগড়া। যে শ্রেণি যখন ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করেছে তারাই তাদের মতো করে ইতিহাস রচনা করেছে। ইতিহাসে কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন ইতিহাস রচনা করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সততা। তবে এই চেষ্টা থেমে নেই। ড. আশরাফ পিন্টু সম্পাদিত সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তারই অনবদ্য প্রমাণ।

ভৌগোলিক কারণে সিরাজগঞ্জ উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। যমুনা বিধৌত সিরাজগঞ্জ ময়মনসিংহ অঞ্চলের অধিভুক্ত ছিল। ১৮২৮ সালে জেলা পদ্ধতির উদ্ভব হলে ঐ সালের ১৬ অক্টোবর পাবনা স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে গঠিত হলে সিরাজগঞ্জ পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয় এবং মহকুমার স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৮৪ সালে সিরাজগঞ্জ মহকুমা পৃথক জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৯টি উপজেলা, ১১টি থানা ও ৮৩টি ইউনিয়ন নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা গঠিত হয়। যমুনা, আত্রাই, ফুলজোঁড়, হুরাসাগরসহ শত শত নদী জালের মতো জড়িয়ে আছে জেলাটিকে। দেশের বৃহৎ বিল চলনবিলের অবস্থান এই অঞ্চলেই। অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষের জন্ম হয়েছে এই সিরাজগঞ্জে। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ইসমাঈল হোসেন শিরাজী, মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন, কামাল লোহানী, ফতেহ লোহানী, গণিতবিদ যাদব চক্রবর্তী, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, কবি রজনীকান্ত সেন, কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির, কবি সমুদ্র গুপ্ত, সৈয়দা ইসাবেলা, এইচ টি ইমাম, জাহিদ হাসানসহ অনেকের জন্ম এই অঞ্চলকে প্রসিদ্ধ করে তুলেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কাছারিবাড়ি এই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। ১৮৯০-১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথঠাকুর সিরাজগঞ্জের শাহজাপুর যাতায়াত করেন এবং অবস্থান করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীন, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মতিলাল নেহেরু, জওহরলাল নেহেরু, লিয়াকত আলী খান, খাজা নাজিমুদ্দিন, আবুল হাশিম, মাওলানা আকরাম খাঁ, আব্দুল গাফফার খান, আব্দুল কাইয়ূম খান, হোসেন শহীদ সোওরাওয়ার্দী এবং কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর বোন ফাতিমা জিন্নাহ প্রমুখ ব্যক্তি বেশ কয়েকবার সিরাজগঞ্জে এসেছেন। পুণ্ড্রবর্ধনের অংশ হওয়ায় এবং আবহাওয়া কৃষিবান্ধব হওয়ায় এখানকার মানুষেরা আদিকাল থেকেই কৃষিনির্ভর।

সিরাজগঞ্জের মানুষ চিরকালই সংগ্রামী। জুলুম-অত্যাচার অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এখানকার মানুষের একটি চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। ফকির বিদ্রোহ, তিতুমীরের বারসত বিদ্রোহ, ফরায়েজী আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহসহ পাবনা প্রজাবিদ্রোহ, সিরাজগঞ্জের কৃষকবিদ্রোহ, ভারতীয় উপমহাদেশের কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে এ অঞ্চলের রয়েছে গৌরবের ইতিহাস। ১৮৭৩ সালে সিরাজগঞ্জে কৃষক বিদ্রোহের সূচনা হয়। যা ছিল অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সফল কৃষক বা প্রজা বিদ্রোহ। এই আন্দোলনের মাধ্যমে উপমহাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। ভূমি অধিকার নিয়ে এটাই ছিল সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক আন্দোলন। এছাড়া উপমহাদেশে এটাই ছিল প্রথম আন্দোলন যে আন্দোলনে গ্রামাঞ্চলে হরতাল ও ধর্মঘট পালন হয়। আন্দোলনকারী কৃষকগণ জমিদারের খাজনা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং তা তিন বছর পর্যন্ত তা বলবৎ ছিল। ১৯২২ সালে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় ব্রিটিশবিরোধী এক আন্দোলন সংঘটিত হয়। এ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ। সলঙ্গা বিদ্রোহ ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীকার আন্দোলন তথা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক গুরত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে সিরাজগঞ্জের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে সিরাজগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক শহিদ এ কে শামসুদ্দীন। তাঁর নেতৃত্বে বাঘাবাড়িতে সিরাজগঞ্জের প্রথম প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালিত হয়। ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, মোতাহার হোসেন তালুকদার, সৈয়দ হায়দার আলী এমপিএ, আব্দুল লতিফ মির্জা, আনোয়ার হোসেন রতু, আমির হোসেন ভুলুসহ কয়েকজন সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধকে সংঘটিত করে এবং নেতৃত্বে দেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ৩ মার্চ, ১৯৭১ জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তৎকালীন ছাত্র নেতা জনাব এম এ রউফ পাতা প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ৮ মার্চ ১৯৭১ থেকেই সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এরপর সংগ্রাম পরিষদ এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে আলাদাভাবে বিএ কলেজ (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ) মাঠ ও স্টেডিয়াম (বর্তমানে শহীদ শামসুদ্দিন স্টেডিয়াম) মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তি এবং প্রাথমিক অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আনসার কমান্ডার আব্দুর রহমান, ল্যান্সনায়েক লুৎফর রহমান অরুণ ও রবিউল ইসলাম (গেরিলা)। স্টেডিয়াম মাঠে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সহকারী আনসার কমান্ডার বাহাজ আলী, সেনাসদস্য আমজাদ হোসেন ও রাইফেল ক্লাবের সদস্য জহুরুল ইসলাম মিন্টু।

একাত্তরে সিরাজগঞ্জের সংঘটিত বাঘাবাড়ি ও ঘাটিনা ব্রিজের প্রতিরোধযুদ্ধ, ভদ্রঘাট যুদ্ধ, ভাটপিয়ারী যুদ্ধ শৈলাবাড়ি যুদ্ধ, নওগাঁ যুদ্ধ, বিভিন্ন গণহত্যা এবং যুদ্ধ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। এছাড়া অমিতবিক্রমী মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে পরিচালিত বিশেষ গেরিলা বাহিনী পলাশডাঙ্গা যুব শিবির মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় চলনবিল ও আশপাশের প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার এলাকায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে, যা সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

গ্রন্থের লেখক ড. আশরাফ পিন্টু বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের লেখক, পেশায় একজন শিক্ষক। ফোকলোরাবিদ-গবেষক-আঞ্চলিক ইতিহাস সংকলক হিসেবে তিনি বেশি পরিচিত। বাংলাদেশে সায়েন্স ফিকশন লেখক ও অণুগল্পকার হিসেবেও তিনি বেশ সমাদৃত। মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় তার তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। এর আগে তিনি পাবনা জেলার জেলার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষকদের বিভিন্ন লেখা একত্রিত করে সম্পাদনা করেছেন পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থ, যা পাবনা জেলার সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রথম সম্পাদিত গ্রন্থ। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশ-এর অধিক।

সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থটি সমগ্র সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম সম্পাদিত গ্রন্থ। পূর্বে জেলার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কয়েকজন লেখকের গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ইমতিয়ার শামীমের রক্তে জেগে ওঠে, ইতিপূর্বে প্রকাশিত এ জেলার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত বহুল সমাদৃত গ্রন্থ। এছাড়া বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক খান, লেখক-গবেষক, সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহবায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকতিয়ার চৌধুরীসহ অনেকেই এ জেলার মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অংশ নিয়ে গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। তবে ড. আশরাফ পিন্টুর ‘সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থটি সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলার পৃথক পৃথক ইতিহাস রয়েছে; যা অন্য কোনো বইতে নেই। গ্রন্থটির প্রকাশনা সংস্থা গতিধারা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য-মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করা গতিধারার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থটি সুচিন্তিতভাবে কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। ৪৬৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে বেশ কয়েকজন লেখকের লেখা ইতিহাস-গবেষণা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকর্ম স্থান পেয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ইতিহাস ধারাবাহিক উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বইটিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছে। বইটির আরও ভালোলাগার বিষয় হলো এই গ্রন্থে যাদের লেখা-স্মৃতিচারণা-সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে তাদের মধ্যে বেশির ভাগই মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। কয়েকজন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র।

সিরাজগঞ্জ জেলার সাধারণ বিবরণ, আন্দোলন সংগ্রামে সিরাজগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধ (উপজেলাভিত্তিক), সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধ (সার্বিক), মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা, মুক্তিযোদ্ধাগণের সাক্ষাৎকার, বরেণ্য মুক্তিযোদ্ধা এবং সংগঠকগণের জীবনী, সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য ও বিবিধ শিরোনামসহ মোট ১৪টি অধ্যায়ে গ্রন্থটিকে সাজানো হয়েছে। ১৫ থেকে ৪৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত সূচিপত্রের সাথে সিরাজগঞ্জ জেলার একটি ভৌগোলিক মানচিত্র, সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থান, বিভিন্ন এলাকার বধ্যভূমি ও গণকবরের ছবি, বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধের ছবি এবং সিরাজগঞ্জ থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন পত্রিকা-গ্রন্থ ও সেগুলোর ছবি, মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন চিঠি, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাগণের পরিবারে পাঠানো রাষ্ট্রীয় চিঠি, গ্রন্থের সম্পাদক-লেখকসহ সর্বমোট ৬৯টি ছবি সন্নিবেশ করা হয়েছে।

২১৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত গ্রন্থের সম্পাদক নিজেই লেখকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন তথ্যের আলোকে তিনি ‘সিরাজগঞ্জ জেলার পরিচিতি’ শিরোনোমে সিরাজগঞ্জ জেলার প্রাচীন ইতিহাস থেকে শুরু করে ১১টি অধ্যায়ে সিরাজগঞ্জের ভূ-প্রকৃতি, পুরাকৃতি, আবহাওয়া-জলবায়ু, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-যোগাযোগ, শিল্প-সংস্কৃতি, নদ-নদী, জনজীবন, রাজনৈতিক ইতিহাস, জনপ্রতিনিধি, গ্রাম-মহল্লা, জনসংখ্যা, বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সিরাজগঞ্জ জেলা ও উপজেলাভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা এবং যুদ্ধের বর্ণনার অবতারণা করেছেন। এই শিরোনাম পাঠ করলে সিরাজগঞ্জ জেলার আদিকাল থেকে এ পর্যন্ত ইতিহাসের একটি সারসংক্ষেপ পাঠক খুব সহজে অবগত হতে পারবেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিরাজগঞ্জের মানুষের অবদান সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। ৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর সিরাজগঞ্জে আগমনের বিষয়টি উল্লেখ করার মতো। সত্তরের নির্বাচনে আরিচা হয়ে উত্তরবঙ্গে সফরের সময় বঙ্গবন্ধু সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার দিলরুবা সিনেমা হলে এক পথসভা করেন। দিলরুবা পথসভা শেষে উত্তরবঙ্গে যাত্রার পথে তালগাছি সংলগ্ন গাড়াদহ খেয়াঘাটে জনসংযোগ করেন। গাড়াদহ খেয়াঘাটের ওপারেই ড. মাযহারুল ইসলামের পৈতৃক নিবাস। যিনি বঙ্গবন্ধুর একজন কাছের মানুষ ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে শাহজাদপুর আসন হতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ড. মাযহারুল ইসলাম। ধারণা করা হয় ড. মাযহারুল ইসলামের অনুরোধে বঙ্গবন্ধু সেদিন গাড়াদহ খেয়াঘাটে গণসংযোগ করার জন্য কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি করেন। সিরাজগঞ্জ জেলার সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা, প্রতিরোধ কমিটি গঠন, পলাশডাঙ্গা গেরিলা বাহিনী গঠন, বিভিন্ন এলাকায় স্বাধীনতা বিরোধীদের শান্তি কমিটি গঠন, মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তি, প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে মুক্তিযোদ্ধাগণের ভারত গমন, বিভিন্ন যুদ্ধ এবং পাকিস্তানি বাহিনী এবং এদেশীয় স্বাধীনতা বিরোধীদের বিভিন্ন অত্যাচার নির্যাতনের ঘটনা ইত্যাদি সবই এই অধ্যায়গুলোতে সন্নিবেশ করা হয়েছে।

দ্বাদশ অধ্যায়ে সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক ইতিহাস সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষকারী, গবেষক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচরগণ। বিভিন্ন সময়ে তাদের স্বহস্তে লেখা স্মৃতিচারণামূলক লেখাগুলো হুবহু প্রকাশিত হয়েছে এ অধ্যায়ে। এই তালিকার কয়েকজন ব্যক্তির নাম সারাদেশে অধিক উচ্চারিত। দ্বাদশ অধ্যায়েরই আরেক অংশে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার রয়েছে। এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন সিরাজগঞ্জের প্রথিতযশা কবি-কথা সাহিত্যিক এস. এম. এ হাফিজ, মো. মাছুদুর রহমান এবং আলি আদনান। সিরাজগঞ্জের কৃতিসন্তান, বাংলাদেশের বহুল পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর সাক্ষাৎকারও রয়েছে এ অংশে।

ত্রয়োদশ অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বরেণ্য মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী উল্লেখ করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মোতাহার হোসেন তালুকদার, এম. মনসুর আলী, আব্দুল মতিন (ভাষা মতিন), অমূল্য নাথ লাহিড়ী, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, আবদুল লতিফ মির্জা, কামাল লোহানী, গোলাম হেলাল মোর্শেদসহ বাঘা বাঘা নেতৃবৃন্দের নাম।

চতুর্দশ অধ্যায়ে বিবিধ অংশে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের অবদান, ৭১’-এর মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববরেণ্য শিল্পী সমাজ, ভারতের পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর, মুক্তিযুদ্ধে সিরাজগঞ্জের জয় বাংলা বেতার কেন্দ্র, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাস্তা-ঘাট ও স্থাপনার নামকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে কয়েকজন লেখকের লেখা। এই অধ্যায়ে সংযুক্ত করা হয়েছে সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবি-সাহিত্যিকদের রচিত সাহিত্য। জুলফিকার মতিন, সমুদ্র গুপ্ত, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, এম এ রউফ পাতা, মোহন রায়হানসহ বেশ কয়েকজন সাহিত্যিকের লেখা আছে এ অংশে। সবশেষ ৪৬১-৪৬৪ পৃষ্ঠায় তথ্য প্রাপ্তির বিাভন্ন উৎস বা তথ্যপঞ্জি উল্লেখ করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের এক অনবদ্য দলিল। এই অঞ্চলের গোটা মুক্তিযুদ্ধকে জানতে চাইলে গ্রন্থটি পাঠক-গবেষকগণের বিশেষ সহায়ক হতে পারে। সম্পাদকের পরিকল্পনা ও পরিশ্রম প্রশংসার দাবি রাখে। গ্রন্থটির চাররঙা দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছে সিরাজগঞ্জ বাজার স্টেশনস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধের নান্দনিক স্তম্ভ বিজয়সৌধ। প্রচ্ছদ অলংকরণ করেছেন দেওয়ান সাকিব। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে লেখকের দাদা আলহাজ মোহাম্মদ আলি সরকার ও দাদি গোলচাহারা বেগমকে। উৎসর্গকৃত দুজন মহৎ মানুষই ছিলেন সিরাজগঞ্জের মানুষ। কিছু তথ্য বিচ্যুতির কথা শোনা যায়, যদিও লেখক এ বিষয়ে ভূমিকাতেই দায় স্বীকার করেছেন। পরবর্তী সংস্করণে সেসব ত্রুটিমুক্ত করার সুযোগ আছে। কিছু বানান চোখ এড়িয়ে গেছে। বইটির শুভেচ্ছা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০০ টাকা। নিশ্চিত করে বলা যায়, গ্রন্থটি ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় প্রতিনিধিত্ব করবে। সকল দুর্বলতাকে পাশ কাটিয়ে গবেষক-পাঠক মহলে সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থটি ব্যাপক সমাদৃত হবে আশা রাখি।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন : ৭ম সংখ্যা (মার্চ-২০২৫ : বিশেষ ঈদ সংখ্যা)

Read Next

রোকে ডালটন-এর দুটি কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *