
এলিজা বিনতে এলাহীর পায়ের নিচে সর্ষে, হাতের তালুতে পাসপোর্ট-ভিসা আর মাথায় থাকে নতুন কোনো ‘বিউটি স্পট’! পথকে সঙ্গী করেই দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত চষে বেড়ান। ‘ঐতিহ্য পর্যটক’ হিসেবেই নিজের পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ঘুরে দেখেন। সংগ্রহ করেন সেখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ইতিহাস, ঐতিহ্য অনুষঙ্গ ও তথ্য–উপাত্ত। ‘কোয়েস্ট… এ হেরিটেজ জার্নি অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের ৬৪ জেলা। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচেই তিনি জেলায়-উপজেলায় ঘুরে বেড়ান।
বাংলাদেশের মাটিতে পদচ্ছাপ ফেলেই ক্ষান্ত হননি তিনি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রাখছেন পদচিহ্ন, বহন করে চলেছেন বাংলাদেশের পতাকা তথা পাসপোর্ট। এলিজা বিনতে এলাহী ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ এশিয়ায় ইংরেজি সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিভাগে এবং স্কুল অফ বিজনেস-এ শিক্ষকতা করতেন। বর্তমানে ফুলটাইম ভ্রামণিক ও ভ্রমণলেখক। তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন; আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি) থেকে এইচআরএম-এ মেজর এমবিএ। ভ্রমণ তার পছন্দের শীর্ষে।
ভ্রমণকন্যা এলিজা বিনতে এলাহীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিক হাসান
আপনি ভ্রমণ করেছেন বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা। নিজের দেশকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পারার আনন্দটা কেমন অনুভব করেছেন?
একজন ভ্রমণকারী হিসেবে আমার মূল কাজই দেশের ঐতিহ্য পর্যটন ও হেরিটেজকে ঘিরে। নিজের দেশকে জানার মাঝে যে আনন্দ ও গর্ব রয়েছে সেটি পুরো বিশ্ব দেখে ফেললেও পাওয়া যাবে না বলে আমি মনে করি। ভ্রমণে যা কিছু দেখি ও জানি, সমস্ত কিছুই সুন্দর ও অনন্য কিন্তু সেগুলোকে নিজের মনে করতে পারি না। আমার দেশের সমৃদ্ধি ও সীমাবদ্ধতা পুরোটাই আমার এবং আমাদের। পুরো দেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার অনুভূতি নিশ্চয়ই আমি বোঝাতে পেরেছি।
নিজের দেশ দেখার পাশাপাশি ভ্রমণ করেছেন আরও ৬০টি দেশ। জীবনানন্দ দাশ বাংলার রূপ দেখেছেন তাই পথিবীর অন্য কোথাও যেতে চাননি। নিজের দেশ ও বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে তুলনামূলকভাবে কীভাবে দেখছেন?
প্রাচীন ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির কথা বলতে গেলে বাংলাদেশ অনেক সম্পদশালী কিন্তু সেই সমৃদ্ধ অতীতকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি, সংরক্ষণ করতে পারিনি। তাই পর্যটন শিল্প সেভাবে গড়ে ওঠেনি আমাদের দেশে। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য দেশ পর্যটন শিল্পকে দারুণভাবে ব্যবহার করছে। আর্থিক সঙ্গতি থাকলে বিশ্ব ভ্রমণ আমার কাছে খুব কষ্টসাধ্য বিষয় মনে হয় না। কারণ সেসব দেশের পর্যটন বেশ গোছানো। সঠিক দিকনির্দেশনা আছে, তথ্য আছে, গাইড রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। মোট কথা বেশির ভাগ দেশের পরিবেশ বেশ পর্যটনবান্ধব। আমাদের দেশে এসবের অপ্রতুলতা রয়েছে। তাই নিজের দেশ জানতে হলে, দেখতে হলে ধৈর্য, দেশপ্রেম, ভ্রমণ ও ইতিহাসের প্রতি ভীষণ অনুরাগ প্রয়োজন নয়তো দীর্ঘদিন গবেষণার প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশে নিজ উদ্যোগে অনুসন্ধান করে ভ্রমণ করতে হয়। এশিয়া, ইউরোপ ও পশ্চিমের অন্য দেশগুলোতে পর্যটনকেন্দ্রিক অসুবিধাগুলো কম অনুভূত হয়।
ভ্রমণের নেশা কখন থেকে, কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার জন্য কিছুটা মুশকিল ও বরাবরই খুব শক্ত। আমি নিজেকে ঘুরে বেড়াতে দেখছি সেই যখন আমার বয়স ৩ বছর। কীভাবে এরকম হলপ করে বলতে পারছি! পারিবারিক অ্যালবামে সংগ্রহ করা ছবিগুলো থেকে।
আদতে ঘুরে বেড়াবার অভ্যাসটা গড়ে উঠেছে পরিবার থেকে। বাংলাদেশে প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছি সেই ছোটবেলা থেকে। এমন নয় বাংলাদেশের আনাচেকানাচে আমি ঘুরে বেড়াইনি আগে। প্রচুর ঘুরেছি। কিন্তু সেটি কেবল ঘুরে বেড়ানো, ছুটি কাটানো ছিল। একটি উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রমণ শুরু করেছি অনেক পরে। মুলত বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাকে নিজ দেশ ভ্রমণের জন্য অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আমি কখনোই জীবন, যাপন করতে চাইনি, জীবনকে সব সময় উপভোগ করতে চেয়েছি। জীবনকে আমি প্রকৃতির একটি মূল্যবান উপহার মনে করি। সেখান থেকেই উপভোগ করার চিন্তা মাথায় এসেছে। আর উপভোগ করবার মাধ্যম আমার কাছে ভ্রমণ। এক জীবনে পৃথিবীতে যা কিছু আছে যতটুকু সম্ভব দেখে যেতে চাই।
পাঁড় পর্যটকরা বলে থাকেন— ‘ভ্রমণের টাকা জোগায় ভূতে’! আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?
হা হা হা! এই প্রবাদ হয়তো কারও কারও জন্য কাজ করে কিংবা সঠিক। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে যেটা হয় তা হলো– ভ্রমণের আগে আমি বিস্তর গবেষণা করি সেই স্থান সম্পর্কে। সেখানকার আবাসন, যাতায়াত, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বাহন। ভ্রমণে আমি বেছে নেই থাকার জন্য হোস্টেল, ডর্ম বা ন্যূনতম সুবিধাসহ হোটেল। আদতে খরচ কমিয়ে কীভাবে ভ্রমণ করা যায় এইসব গবেষণার উদ্দেশ্যটাই থাকে সেরকম। ভ্রমণে গিয়ে অকারনে শপিং করা আমি একদমই পছন্দ করি না।
আর একটি বিষয় হলো ভ্রমণের স্থান নির্বাচন করে ভিসা হওয়ার পর পরই বিমানের টিকেট সংগ্রহ করা। প্রতিদিন চলার পথে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়েই আমি ভ্রমণের খরচ জোগাড় করি। এই সকল পদ্ধতি ভূতে জোগায় বলে কিনা আমি জানি না।
ভ্রমণকাহিনী লিখতে গিয়ে কেউ কেউ কল্প-গল্পও ফেঁদে বসেন বলেও শোনা যায়। এমন প্রবণতাকে কীভাবে দেখেন?
ভ্রমণকাহিনী কিংবা ভ্রমণ রচনা লিখতে গিয়ে কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করাকে আমি সঠিক মনে করি না। কারণ আজকের ভ্রমণ গল্প কালকের জন্য ইতিহাস ও গবেষণার তথ্য। প্রাচীন সব ভ্রমণ লেখক ও পরিব্রাজকদের লিখিত তথ্য আজ পৃথিবীর জন্য ইতিহাস ও গবেষণার উপাত্ত।
ভ্রমণকাহিনী ও ভ্রমণগদ্য— দুয়ের মধ্যে মৌলিক কোনো ফারাক আছে কি? থাকলে সেটা কী?
ভ্রমণকাহিনী কিংবা ভ্রমণগদ্য ভ্রমণগল্প নামের ফারাক ছাড়া আর কিছুই নয় আমার মতে। দুটোই গদ্য। এত শত আমি বুঝি না। আমি ভ্রমণ করি। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করতে পছন্দ করি। ভ্রমণের যাপিত জীবনের বর্ণনা আমি লিখি। সেখানে ইতিহাস আছে, ভ্রমণ আছে, তথ্য থাকে। অবশ্যই কোনো কাল্পনিক চরিত্র দাঁড় করিয়ে ভ্রমণগল্প বর্ণনা আমি করি না। যদি কল্পনার আশ্রয় নিয়ে ভ্রমণকাহিনী লেখা হয় সেটি উপন্যাস হবে। ভ্রমণগদ্য নয়।
‘ভ্রমণগল্প’ বলে নতুন একটি সাহিত্যধারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আপনি এধরনের লেখা পড়েছেন কি? পড়ে থাকলে ‘আরোপিত’ এই ভ্রমণ কেমন লাগে?
আমি আগেই বলেছি যে কোন ভ্রমণগল্প/ ভ্রমণগদ্য আমার কাছে ইতিহাসের অংশ মনে হয়। সেখানে আরোপিত গল্প আমার ভালো লাগে না। একজন ভ্রমণকারী যখন ভ্রমণগদ্য বা ভ্রমণগল্প লেখেন তখন আরোপিত কিছু লিখবেন না বলেই ধরে নিচ্ছি।
বারবার যেতে চান কোন জায়গায়, কেন?
আবারও কঠিন প্রশ্ন। নিজ দেশের প্রতিটি কোনায় আমি বারবার গেছি। কাজের প্রয়োজন ও ভালোলাগা থেকেই যাওয়া হয়েছে বারবার। বিদেশে একই স্থানে বারবার যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয় না। একজীবনে পুরো পৃথিবীর সব দেশে পা রাখতে পারব কিনা জানি না। তবে প্রত্যাশা করি এরকমটাই। তাই ইচ্ছে থাকলেও সময় ও অর্থের সংকুলান হয়নি বারবার যাওয়ার মতো।
আপনার প্রিয় ভ্রমণলেখক কারা? তাদের লেখার কোন দিকটা আকর্ষণ করে?
বর্তমান সময় থেকেই বলছি, ভ্রমণ ও ইতিহাসভিত্তিক লেখা সম্পর্কে— বিদেশি লেখকদের মধ্যে ভালো লেগেছে নরওয়ের লেখক এরিকা ফাটল্যান্ডের বই, পাকিস্তানের লেখক আনাম জাকারিয়ার বই। দুজনেই তরুণ লেখক— দুজনের লেখাতেই ভ্রমণ, ইতিহাস ও গভীর গবেষণার ছোঁয়া রয়েছে।
ছেলেবেলায় বাংলাদেশে ভ্রমণ লেখক বলতে হাসনাত আবদুল হাইয়ের কথাই জেনেছি ও পড়েছি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন-এর লেখা, ফারুক মঈনউদ্দীন— ভ্রমণ ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে দারুণ লেখেন তারা। মীনা আজিজের ভ্রমণগ্রন্থ ভালো লাগে।
ইতিহাস গ্রন্থে আমার প্রথম পছন্দ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, মুনতাসীর মামুন, সাইফুল আহসান বুলবুল, শামীম আমিনুর রহমান। মূলত তাদের বই আমাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের পথে চলতে ও হেরিটেজ ট্যুরিজম বিকাশের কাজ করতে ভীষণ সহায়তা করেছে। অঞ্চলভেদে, জেলাভিত্তিক অনেক লেখক রয়েছেন যারা নিজ অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন নিয়মিত।
আদতে এরকম নাম ধরে বললে সঠিক বলা হয় না। হয়তো দেখা গেছে, একজন লেখকের অনেক বইয়ের মাঝে একটি বই পড়েছি সেটি ভালো লেগেছে। এরকম বহু লেখক আছেন, বহু বই রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের ৩৩ দেশের ভ্রমণবই ও শরৎচন্দ্রের বার্মা ভ্রমণ বইয়ের কথা বলাই বাহুল্য। রামনাথ বিশ্বাসের ভ্রমণ বই, হরিপ্রভা তাকেদার একটি মাত্র বই, বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ভ্রমণ বইও সুখপাঠ্য।
টেলিভিশনে, ইউটিউব চ্যানেলে ভ্রমণবিষয়ক অনুষ্ঠানগুলো পর্যটনের বিকাশে কতটা সহায়ক?
ভীষণভাবে সহায়ক। কিন্তু আমাদের কোনো টেলিভিশন চ্যানেলেই ভ্রমণ প্রোগ্রাম গুরুত্ব পায় না। উল্লেখ করার মতো ভ্রমণবিষয়ক অনুষ্ঠান নেই। বড় বড় জেলা শহরে মোবাইলের প্রচলন রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের অনেক স্থান এখনও টেলিভিশননির্ভর। তাই ইউটিউব চ্যানেল পর্যটন বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবার জন্য টেলিভিশনে ভ্রমণবিষয়ক অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াতে না পারার নেপথ্যে কী রয়েছে বলে মনে করেন?
দেশীয় পর্যটক যদিও আকর্ষিত হচ্ছে দর্শনীয় স্থানগুলোতে কিন্তু বিশ্ব পর্যটকদের আমার এখনও পুরোপুরি আকর্ষণ করতে পারিনি। প্রথমে গবেষণা প্রয়োজন— আমরা বাংলাদেশের কোন কোন দিকটা তুলে ধরতে চাই, আমাদের টার্গেট মার্কেট ঠিক করতে হবে তারপর টার্গেট মার্কেটের সাথে যথাযথ কমিউনিকেশন করতে হবে। দেশের আভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নতি করতে হবে। হোটেল, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল দরকার, ট্যুরিস্ট গাইড পেশাটি আমাদের দেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। রেল পথ, নদী পথ ও সড়ক পথকে পর্যটনের আওতায় নিয়ে একটি সামগ্রিক পরিবর্তন দরকার। সব থেকে বড় কথা পর্যটনবান্ধব পরিবহন, পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
আমাদের দেশে এখনও ‘হেরিটেজ ট্যুরিজম’, ‘রিভার ট্যুরিজম’, ‘ইকো ট্যুরিজম’ নতুন বিষয়। এগুলোর জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। যদিও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কিছু কাজ হচ্ছে কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।
কোন কোন পন্থা অবলম্বন করলে বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে আকৃষ্ট করা যাবে?
বাংলাদেশ ট্যুরিজম নিয়ে আমি গবেষণা করছি ২০০৮ সাল থেকে। প্রথম একটি গবেষণাপত্র তৈরি করি Publicizing Tourism : opportunity and challenges in the context of Bangladesh. আর দ্বিতীয়টি ২০১৮ সালে নেদারল্যান্ডে A communication plan for Bangladesh Govt. to promote Bangladesh as a Global Tourist Destination. দুটি গবেষণাপত্রেই আমি উল্লেখ করেছি কী কী পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে বাংলাদেশকে একটি বিশ্ব পর্যটনের দেশ বানানোর জন্য। সল্প পরিসরে পুরো গবেষণা তুলে ধরা সম্ভব নয়। শুধু মূল বিষয়গুলো তুলে ধরছি।
- বর্তমান সময়ে বিশ্ব পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য ডিজিটালাইজেশনের সর্বোচ্চ ব্যবহার প্রয়োজন, তার মধ্যে পড়ছে কার্যকরী ওয়েবসাইট তৈরি (যেখানে পজিটিভ কন্টেন্ট থাকবে, ভিডিও, ছবির মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে, সঠিক তথ্য থাকবে, দ্রুত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য লোক নিয়োগ করতে হবে)।
- সোশ্যাল মিডিয়া যেমন— ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্টারনেট টিভির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থাপনাগুলোর ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। সেখানে কীভাবে যাওয়া যায়, থাকার ব্যবস্থা, গাইডের তথ্য থাকতে হবে।
- বিভিন্ন ধরনের প্রমোশনাল অফার দিতে হবে এয়ারলাইন কোম্পানিগুলোর সাথে যোগাযোগ করে।
- বাংলাদেশে বিভিন্ন দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও নিয়মিত তথ্য প্রদান করা।
- এয়ারপোর্ট, বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশনে ট্যুরিজম সম্পর্কিত তথ্য ও বিলবোর্ড স্থাপন।
- সরকারিভাবে বিভিন্ন ট্যুরিজম ইভেন্টের আয়োজন করা এবং অন্য দেশের ট্যুরিজম কোম্পানিগুলোকে ইভেন্টে অংশগ্রহণের জন্য দাওয়াত দেওয়া।
- বিদেশে ট্যুরিজম ইভেন্টে অংশগ্রহণ।
- সমস্ত দেশের এয়ারলাইনে বাংলাদেশের ট্যুরিজম সম্পর্কিত বই প্রদানের ব্যবস্থা করা।
দেশের অনেকেই সুযোগ পেলেই বিদেশে ভ্রমণ করতে ছোটেন। অথচ নিজের দেশটা ভালোভাবে দেখার গরজ বোধ করেন না। এটা কি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা! নাকি অন্য কোনো বিষয় জড়িত?
বিষয়টি দুঃখজনক। আমাদের দেশে অনেকে ভ্রমণ বলতে বিদেশ ভ্রমণকেই বোঝেন। অনেকে বাংলাদেশ ভ্রমণকে কম গুরুত্ব দেন। সাধারণের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে। কিন্তু আমি অবাক হয়েছি বিভিন্ন সাহিত্য ফোরামের আমন্ত্রণে উপস্থিত হওয়ার পর। বাংলাদেশ ভ্রমণকে অনেকে ভ্রমণ হিসেবেই গণ্য করেন না। এমনকি নিজের দেশ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই। এ-কথা সত্যি যে আমাদের দেশে পর্যটন শিল্প সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু তাই বলে নিজ দেশ সম্পর্কে আমি জানব না, দেখব না! নিজ দেশ ভ্রমণ নিয়ে লিখব না! এটি সমর্থনযোগ্য নয়। কোনো কোনো পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ভ্রমণ লেখা বলতেই বিদেশ ভ্রমণ লেখাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
এই মানসিকতার কারণ জানা নেই।
আপনি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেন। নির্মাণের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেন?
তথ্যচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আমি গুরুত্ব দিই সঠিক গবেষণা ও স্ক্রিপ্টকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী, বিপ্লবী লীলা নাগকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণে প্রয়াসী হয়েছেন কোন তাড়না থেকে?
আমার সবগুলো তথ্যচিত্রের বিষয় খুঁজে পেয়েছি বাংলাদেশ ভ্রমণ করতে গিয়ে। ইতিহাসের যে কোনো ব্যক্তিত্ব কিংবা ঘটনা যা আমাদের সমাজে সমাদৃত নয় কিন্তু জাতীয় জীবনে গুরুত্ব বহন করে সে সব বিষয়ই আমি নির্বাচন করি তথ্যচিত্রের জন্য। লীলাবতী নাগকেও ভ্রমণ করতে গিয়েই জানা।
অবাক লেগেছে শিক্ষিত সমাজে লীলা নাগের কর্ম ও জীবন সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। তরুণ প্রজন্মেরও একই অবস্থা। লীলা নাগের পরিচয় কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী নয়। তাঁর রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকাণ্ড। শিক্ষা ক্ষেত্রেও লীলা নাগ অবদান রেখেছেন। ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন ১২টি অধিক স্কুল। সবকিছু জানার পর আমার মনে হয়েছে তাঁর সমস্ত কর্মকাণ্ডের একটি আর্কাইভ করা দরকার। বাংলাদেশে লীলাবতী নাগকে নিয়ে প্রথম তথ্যচিত্র নির্মাণ করি।
সমসাময়িক কোন ভ্রমণ-লেখকের লেখা আপনাকে টানে?
উপরের একটি প্রশ্নে ভ্রমণ লেখকদের নাম উল্লেখ করেছি। অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণে ভালো লাগে ইফতেখারুল ইসলামের লেখা। তাঁর বই ‘যেখানে এভারেস্ট’ পড়ে আমি একজন নন-ট্রেকার হওয়ার পরও এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প ট্রেক করার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। মুনিম সিদ্দিকীর ‘মরক্কোর রোজনামচা’ আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। লেখকের এটিই একমাত্র বই। জাপান প্রবাসী মনজুরুল হকের গবেষণা, বিভিন্ন দেশের স্মৃতিচারণমূলক বইগুলো। এগুলো একাধারে আত্মজীবনীমূলক ও ভ্রমণগল্প।
ভ্রমণসাহিত্যিক হিসেবে সৈয়দ মুজতবা আলী থেকে মঈনুস সুলতান— এদের লেখাজোকা নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা আলোচনা করার মতো যোগ্যতম আমি নিজেকে মনে করি না। তাঁর লেখার মাধুর্য, শব্দের প্রয়োগ, দুই বাক্যের মাঝে অন্তর্নিহিত অর্থ, সহজ কিন্তু রসময় উপস্থাপন, গল্পে চরিত্র ফুটিয়ে তোলার ধরন, এগুলো সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় খুবই সহজ আমিও লিখতে পারব। কিন্তু আদতে বিষয়টি ভীষণ কষ্টসাধ্য। তবে আমার স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকে মনে করি তাকে ঠিক পুরোপুরি ভ্রমণ লেখক বলব না আমি। যে কোনো ভূখণ্ডের জীবন, মানুষ তাকে বেশি আকর্ষণ করত।
ছেলেবেলা থেকে বাংলাদেশের ভ্রমণ লেখক হিসেবে জেনেছি হাসনাত আবদুল হাইয়ের নাম। তাই তাঁর ভ্রমণবইগুলো পড়া হয়েছে ছাত্র বয়স থেকেই। ৮৯ বছর বয়সে তিনি লিখেছেন রাশিয়া, চায়না ও জাপান ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। এটি বিস্ময়কর!
মইনুস সুলতানের ভ্রমণগল্প আমি পড়িনি।
দেশে কিংবা বিদেশের পর্যটন হিসেবে এগিয়ে রাখবেন কাকে বা কাদের? তাদের কোন দিকটি আপনাকে আকৃষ্ট করে?
সমৃদ্ধির বিচারে ঐতিহ্যগত দিক থেকে চিন্তা করতে গেলে আমাদের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে অন্যান্য দেশের মতোই। কিন্তু সেই প্রাচীন ইতিহাস সংরক্ষণে, পর্যটন বিকাশে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি এখনও। পর্যটনে এগিয়ে রয়েছে প্রথম বিশ্বের দেশগুলো। এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকার কিছু কিছু দেশ পর্যটন সম্পর্কে মনোযোগী হয়েছে।
সমগোত্রীয়রা মিলে প্রতিষ্ঠা করেছেন ভ্রমণ সংগঠন। এটা আপনাদের লেখালেখি বা ভ্রমণে কতটা সহায়ক হচ্ছে?
আমি কোনো ভ্রমণ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করিনি। হেরিটেজ ট্যুরিজমের কাজ, আমার নিজস্ব প্রজেক্ট আমি একাই পরিচালনা করি। অন্য ভ্রমণ সংগঠনগুলোতে অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণে যোগ দিই। মাঝে মাঝে সমমনারা বসে ভ্রমণ বিষয়ে আলাপ করি।
ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন আলোচনা, সংগঠন যে কাউকেই উৎসাহিত করতে পারে। আমরা যারা ভ্রমণ নিয়ে কাজ করছি, দেশীয় পর্যটনকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি, বিকাশে কাজ করছি তাদের উদ্দেশ্যই দেশের আপামর জনসাধারনকে ভ্রমণে অনুপ্রাণিত করা। বিশেষ করে তরুণরা যাতে পর্যটন ব্যবসার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে উৎসাহিত হয়। ভ্রমণকারীদের নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করতেও উৎসাহিত হয়।
দেশের ও দেশের বাইরের ভ্রমণবিষয়ক ম্যাগাজিনগুলো সম্বন্ধে আপনার মূল্যায়ন কী?
আমাদের দেশে উল্লেখ করবার মতো নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে, এরকম ভ্রমণ ম্যাগাজিন কম। আদতে নেই বললেই চলে। তবে এসবের মাঝে কেউ কেউ নিজেদের মতো চেষ্টা করছেন সেটিও দারুণ উৎসাহব্যাঞ্জক। প্রথম আলো বর্ণিল ভ্রমণ নামে দুটো সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশ হয় জিওগ্রাফিকা, পর্যটনবিচিত্রা নামক একটি ভ্রমণ ম্যাগাজিন রয়েছে, ট্রাভেল টক, ছোটকাগজ ভ্রমণগদ্য— এই ম্যাগাজিনগুলোর বয়স বেশি নয়, তবে তারা নিয়মিত চেষ্টা করছেন। আরও কিছু অনিয়মিত ম্যাগাজিন রয়েছে যাদের একটি সংখ্যাই প্রকাশ হয়েছে— ট্রাভেলার, ভ্রামণিক ইত্যাদি। মাসিক লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ক্যানভাস প্রতি সংখ্যায় একটি ভ্রমণগল্প প্রকাশ করে। যে কয়টি নাম উল্লেখ করলাম প্রতিটি ম্যাগাজিনে আমি লিখেছি, কোনো কোনো ম্যাগাজিনের প্রতি সংখ্যাতেই আমার ভ্রমণগল্প ছাপা হয়। যেগুলোর একটি সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে তাদের প্রথম সংখ্যাতেও আমি লিখেছি।
জাতীয় দৈনিকগুলোর ভ্রমণ পাতা ভ্রমণবিষয়ক ফিচার আয়োজনকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
নিঃসন্দেহে ইতিবাচক একটি বিষয়। ভ্রমণগদ্য লেখার স্থানই অল্প। সব দৈনিকে ভ্রমণ পাতা নেই। যত লেখার সুযোগ সৃষ্টি হয় ততই ভালো। তরুন ভ্রমণ লেখকরা উৎসাহ পাবেন। নতুন লেখক সৃষ্টি হবে। যারা ভ্রমণগল্প লিখতে চান তারা বলেন লেখার সুযোগ কম। আবার পত্রিকার সম্পাদকরা বলেন ভালো লেখা পাওয়া যায় না। ভ্রমণ লেখক ও লেখার স্থানের সমতা আনা প্রয়োজন। লেখার সুযোগ সৃষ্টি হলে লেখার মানও নিশ্চিত হবে বলে আমি মনে করি।
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের বিপজ্জনক সময়ে ফেসবুক লাইভ আড্ডা অনুষ্ঠানে সরব ছিলেন। ভ্রমণ ছিল একেবারেই বন্ধু। ‘নিষিদ্ধ’ তো বটেই। কেমন কেটেছিল তখনকার বন্দি দিনগুলো?
তখন ঘরে বসে ভ্রমণগল্প লিখেছি। তৈরি করেছি ভ্রমণ তথ্যচিত্র। আগে ভিডিও ধারণ করে রেখেছিলাম। বন্দি জীবন না পেলে হয়তো সেগুলো আলোর মুখ দেখত না। ২০২০ সালে ইদের বিশেষ প্রোগ্রাম দীপ্ত টিভিতে ৭টি ভ্রমণ তথ্যচিত্র দেখানো হয়েছে ‘এলিজাস ট্রাভেল ডায়েরি’ নামকরণে। ব্যস্ততা ছিল ফেসবুক লাইভ নিয়ে। এরকম সময় গেছে প্রতিদিন গড়ে ৩টি লাইভ প্রোগ্রাম করেছি নানা প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে। তবে আমি খুব বেশি বন্দি সময় কাটাইনি। যখন বাসে এক সিটে একজন বসার নিয়ম ছিল, আমি সেসময়েও দেশে ভ্রমণ করেছি। বিদেশ ভ্রমণ বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। ২০২০ সালের জানুয়ারী মাসের পর ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে ২০২২ সালের মার্চ মাসে।
নারী ভ্রামণিকের দল ট্রাভেলেট অব ভ্রমণকন্যা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
নারী ভ্রমণ গ্রুপ বাংলাদেশে খুবই কম। নারীদের ভ্রমণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে আরও অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা মেয়েদের ভ্রমণ নিয়ে কাজ করছে।
একটা সময়ে নারীরা গৃহকোণে বন্দি থাকতেন। আর এখন আগল ভেঙে তারা নিজেদের বিস্তৃতি ঘটাচ্ছেন দিকে দিকে। এমনকি অ্যাডভেঞ্চারেও পিছিয়ে নেই। এটাকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
খুবই ইতিবাচক। বহমান এই ধারা অব্যাহত থাকুক। বিস্তৃতি লাভ করুক।
‘বাঙালি ঘরকুনো’ এই প্রবাদ কতটুকু সত্য বা মিথ্যা?
বাঙালী ঘরকুনো— আদতে কি তাই? আমি তা মনে করি না। আদতে আমাদের জীবিকা কিংবা ভাগ্য বদলের জন্য দেশ পাড়ি দিতে হয়নি। বাঙালি সেরকম উচ্চাভিলাষীও ছিল না। প্রথম ভ্রমণগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে ১৮৪০ সালে। ইংল্যান্ডে বঙ্গমহিলা কৃষ্ণভাবীনী দাস লিখেছেন ১৮৯১ সালে। বিশ শতকে নারীরাও ভ্রমণ করেছেন। লিপিবদ্ধ করেছেন অভিজ্ঞতা।
ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে আপনার এমন নিবিড় প্রেম জাগ্রত হওয়ার নেপথ্য প্রভাবক কী?
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো তৈরির পেছনের মানুষগুলোর ভাবনা ও কারিগররা আমাকে শুধু মানুষের সীমাহীন ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এক ধরনের শক্তি অনুভব করি আমি। আমার মনে হয় মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই, শুধু স্বপ্ন দেখতে হবে।
আমার পড়াশোনার বিষয় কখনো ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্ব ছিল না। নিজের ইচ্ছার তাগিদে আমি আমার প্রফেসরদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আমার শখের বিষয়কে পড়াশোনার সাথে সম্পৃক্ত করেছি।
আমি আমার কাজের সাথে সবসময় বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছি। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে আমি এযাবৎ ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ভিয়েতনাম ও জাপানে ৮টি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে যোগ দিয়েছি। সেখানে বক্তা হিসেবে আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছি যেমন— বাংলাদেশের ট্যুরিজম এবং বেগম রোকেয়ার অবদান।
বাংলাদেশের খুব কম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা আছে যেগুলো সাধারণের কাছে পরিচিত। দেখার উপযোগী বিভিন্ন জেলায় অল্প কিছু সংখ্যক স্থাপনা আছে যা বহুল পরিচিত। আমি মূলত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্ততরের প্রকাশিত বই, বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ারের বই এবং আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার (যিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ নিয়ে গবেষণা করেছেন) বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জেলাগুলো ঘুরছি। এমন কিছু স্থাপনার তথ্য আমি পেয়েছি যা লোকচক্ষুর অন্তরালে আছে। এমনকি সেই জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেই স্থাপনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায়ে তুলে ধরার পরও একই ধরনের ফিডব্যাক পেয়েছি ‘আল্লাহ, আপু এটা আমার জেলায় আমি জানি না’। উদাহরণস্বরূপ ঠাকুরগাঁও জেলার গোরকুই কূপ (যা বাংলাদেশের একমাত্র বেলে পাথরের কূপ), নওগাঁ জেলায় জগদ্দল বিহার, দিনাজপুরের সীতাকোট বিহার (সেটি খনন করেছেন আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া), পঞ্চগড়ের ভিতর গড় (বাংলাদেশের একমাত্র দুর্গ নগরী), গাইবান্ধা জেলার প্রাচীন বোগদহ বিহার, জয়পুরহাট পাথরঘাটা প্রাচীন নগরী, নওগাঁ জেলার দিবর দিঘি স্তম্ভ, ভীমের পান্টি, নীলফামারী জেলার ধর্ম পালের গড়, পটুয়াখালীর মসজিদবাড়ি, সৈয়দপুরের ফিদা আলি ইনস্টিটিউট, সিলেটের মেগালিথ স্তম্ভ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নওদা বুরুজ প্রভৃতি।
বিভিন্ন জেলার প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। জেলার প্রাচীন ইতিহাস অনেকেই জানতেন না। ৫ হাজার বছরের পুরোনো গাইবান্ধার রাজা বিরাটনগর, বরিশাল অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠ গঠিত হয়েছিল ৫০,০০০ হাজার বছর আগে আর মানুষ বসতি স্থাপন করে ৩,০০০ হাজার বছর আগে, বিক্রমপুর জেলার নগর কসবা, ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা ৩,০০০ বছর আগের প্রাচীন শহর, হবিগঞ্জের বানিয়াচং গ্রাম এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ গ্রাম। এই তথ্যগুলো অনেকে জানেন না আবার কেউ কেউ আবার ভুল তথ্য জানেন। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোও আমাদের হেরিটেজের অংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোল সম্প্রদায় সবচেয়ে ছোট সম্প্রদায় বাংলাদেশে এখন। তাছাড়া ঈশ্বরদী রয়েছে গুড়িয়া সম্প্রদায় যারা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
বেশির ভাগ স্থাপনার অবস্থা খুবই শোচনীয়। তথ্য নেই, সংরক্ষণের অভাব রয়েছে। যাতায়াতব্যবস্থা ভালো না। কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে নেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। সংরক্ষণের জন্য নিম্নের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি—
- যেগুলো বেদখলে আছে সেগুলো দখল মুক্ত করা দরকার।
- প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঠিক গবেষণার মাধ্যমে সংস্কার করা প্রয়োজন।
- পর্যটন কর্পোরেশন সেগুলোকে দেখার উপযোগী করবে।
- দক্ষ লোকবলের মাধ্যমে নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন
- স্থাপনা সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন (অনলাইন ও অফলাইন দুই পদ্ধতিতে)।
ভ্রমণে ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত কোনো বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন কি?
ভ্রমণের সবকিছুই নতুন অভিজ্ঞতা। কোনো কিছুই বিড়ম্বনা নয়। আপাতদৃষ্টিতে বিড়ম্বনা মনে হলেও আদতে পরে সবই মধুর স্মৃতির অংশ। ভাষার সমস্যা হয়েছিল জাপান ও চীন ভ্রমণে, ২০১৪ সালে। ইউরোপে বসবাস করার সময় কিছু অভ্যাস ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার মুখোমুখি হয়েছি।
নিজ দেশে বা অন্য দেশগুলোতে ভ্রমণের সময় খাদ্য সংকট কিংবা খাদ্য বিভ্রাটে পড়েছেন কখনো?
চীন ভ্রমণে প্রায় দেড় দিন খাবার নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলাম। জাপানে সুসি ও কাঁচা মাছ খেতে প্রথম বেশ কষ্ট হয়েছে। আমি যে কোনো দেশের খাবার গ্রহণ করি অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য। কিন্তু পৃথিবীর কোনো খাবার আমাকে মুগ্ধ করেনি এখন অব্ধি। নিজ দেশের খাবারই আমার প্রিয়।
ভ্রমণের প্রতিবন্ধকতাসমূহ কী?
আমাদের দেশের ভিত্তিতে যদি বলতে হয় তাহলে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এছাড়া পেশাগত পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠেনি এখনও। তাই অনেকে নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন। পরিবহনের অপ্রতুলতা, আবাসনের অপ্রতুলতা রয়েছে, তথ্যের অপ্রতুলতা।
ভ্রমণ ও ইতিহাস-ঐতিহ্য পরিচর্যায় আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
প্রথমত বাংলাদেশের হেরিটেজ ট্যুরিজম বিকাশে আমৃত্যু কাজ করে যাওয়া। আমি মনে করি হেরিটেজ ট্যুরিজম বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের দেশে।
সেই ক্ষেত্রে আমি সব সময়ই চাই একটি দিবস নির্ধারণ করা হোক ‘হেরিটেজ ট্যুরিজম ডে’ প্রতিবছর প্রতিটি জেলায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হবে। প্রতিবছর ১টি স্থাপনা, প্রতি জেলায় সংরক্ষণ ও প্রচার প্রচারণার কাজ করতে হবে। তাহলে অল্প সময়েই স্থাপনাগুলো দেখার উপযোগী হবে ও পর্যটকরা আকর্ষিত হবে।
আমার ৬৪ জেলা মিশনের সময় আমি প্রতিটি জেলায় তরুন সংগঠনগুলোর সাথে মতবিনিময় করেছি। তাদের উৎসাহিত করেছি পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত হতে। পড়াশোনার পাশাপাশি গাইড পেশায় তারা নিযুক্ত হতে পারে। বিশ্বব্যাপী এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে।
যেহেতু আমি ভ্রমণের পাশাপাশি লেখালেখিও করি নিয়মিত। সেহেতু বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করার বাসনা রয়েছে। সেটি জেলাভিত্তিক, বিভাগভিত্তিক ও বিভিন্ন বিষয় নির্বাচন করে।
বিশ্বভ্রমণও লিপিবদ্ধ করতে চাই ৬৪ জেলার সাধারণ মানুষের জন্য, নারীদের জন্য।
ভ্রমণ সবার জন্যই কঠিন— লিঙ্গ বিবেচনার বাইরে এসেও। নারী ভ্রামণিক হিসেবে কখনো ‘বাড়তি’ কোনো ঝক্কি-ঝামেলায় পড়েছিলেন?
সত্যি কথা বলতে উল্লেখ করার মতো সেরকম কোনো ঝামেলায় আমি পড়িনি। এটির বড় কারণ ভ্রমণের পূর্বে গবেষণা। ভ্রমণে অযথা ঝুঁকি না নেওয়া। সতর্ক থাকা। আর আমি একটি কথা মেনে চলি Eat Local, Be local, stay Local. যেখানেই আপনি ভ্রমণ করুন সেখানকার পরিবেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই করা উচিত।
আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বলে পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ সদালাপী, সাহায্যকারী। ঝক্কি ঝামেলার কথা ছড়িয়ে পড়ে বেশি বেশি। কখনও কখনও ইতিবাচক কথাগুলো আমরা নিজের মাঝেই রাখি।
বাংলাদেশের হেরিটেজ নিয়ে বিশদ কাজ করছেন আপনি। পেয়েছেন হেরিটেজ ট্রাভেলার ও ঐতিহ্য পর্যটক উপাধি। ‘কোয়েস্ট… এ হেরিটেজ জার্নি অব বাংলাদেশ’কে নিয়ে পরিকল্পনা কী?
আগের একটি প্রশ্নে আমি উত্তর দিয়েছি। আদতে ভ্রমণ নিয়ে আমার পরিকল্পনা চতুর্মুখী— পত্র-পত্রিকায় লেখা, মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও প্রচার। সবকিছুর উদ্দেশ্য একটিই— বাংলাদেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে দেশের মানুষকে অবহিত করা। বিশ্বের মানুষকে বাংলাদেশ ভ্রমণে উৎসাহিত করা।
জানি কষ্টকর বিষয়টি। আমার জীবদ্দশায় হয়তো এই সফলতা আসবে না। আমার পরে অন্য কেউ নিশ্চয়ই হেরিটেজ ট্যুরিজমের এই মিশন এগিয়ে নিয়ে যাবে।
পর্যটকদের একাংশ ‘প্রত্নতাত্ত্বিক ট্যুরিজম’ গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলেই ধারণা করা যায়। এটাকে জনপ্রিয় করা যাবে কোন পন্থায়?
রাষ্ট্রীয়ভাবে ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রচার প্রচারণা করা, আইন প্রয়োগ করে নাগরিকদের সচেতন করে তোলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ঐতিহ্য সংরক্ষণে পাঠদান। শিক্ষাসফরে ঐতিহাসিক শহর ও জাদুঘরগুলোতে ভ্রমণ উৎসাহিত করা।
ভ্রমণ লাইব্রেরি করছেন ২০২৩ সালে। এই পাঠাগারের কার্যক্রম কী হবে?
ভ্রমণ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করি ২০২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি। এটি শুধু ভ্রমণ বইয়ের পাঠাগার। চেষ্টা করছি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই প্রকাশিত ভ্রমণ বইয়ের একটি আর্কাইভ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার।
এ যাবত আপনার প্রকাশিত বইগুলোর বৈশিষ্ট্য কী? পাঠক-সাড়া কেমন পেয়েছেন? মানুষ কি আদৌ বই ‘কিনে’ পড়তে চান? পাঠ-সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে না তো!
আমি ভ্রমণগল্প লিখি। ভ্রমণকে ঘিরেই আমার লেখালেখি। সেটি দেশ কিংবা বিদেশ যেখানেই ভ্রমণ করি। ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করি। ভ্রমণগদ্য ছাড়া কখনও কিছুই লিখিনি। মাঝে মাঝে বুক রিভিঊ লিখি।
আমার প্রথম দুটি বই ইংরেজিতে লেখা। আমাদের দেশে ইংরেজি ভাষার পাঠকপ্রিয়তা কম। কিন্তু জাতীয় দৈনিক, ম্যাগাজিন, ইদ সংখ্যাগুলোতে বাংলায় লিখি। ভ্রমণ লেখা কোনো কোনো পাঠক বেশ পছন্দ করেন। এবার প্রথম বাংলা বই প্রকাশিত হলো। (পূর্ব আফ্রিকার তিনকাহন। প্রকাশন : অনুপ্রাণন প্রকাশন)।
দেখা যাক কী হয়।
আপনার প্রথম দুটি বই ইংরেজিতে লেখা। ‘এলিজা’স ট্রাভেল ডাইরি’ ও এলিজা’স ট্রাভেল ডাইরি ২’। দ্বিতীয় বইয়ে লিখেছেন ফিলিপিন্স ও সিঙ্গাপুরে ভ্রমণ-আখ্যান। আপনার ‘পূর্ব আফ্রিকার তিনকাহন’ বইয়ে বড় আকারে দুটি পরিবর্তন দেখা গেল। প্রথমত, আপনি নিজের নামে বইয়ের নামকরণ থেকে বেরিয়ে এলেন। দ্বিতীয়ত, এটার ভাষা বাংলা। এমন আমূল পরিবর্তনের পেছনে কি কোনো কারণ রয়েছে?
সেসসময় পূর্ণকালীন শিক্ষক ছিলাম। ইংরেজি সাহিত্য পড়িয়েছি। দীর্ঘসময় পড়াশোনা আর পেশাগত কারণে সমস্ত লিখিত বিষয়ই প্র্যাকটিস করেছি ইংরেজি ভাষায়। ভাষায় আরও বেশি দক্ষতা অর্জনের জন্যই প্রকাশনাগুলোও ইংরেজি ভাষায় লেখা।
এলিজাস ট্রাভেল ডায়েরি নামকরণটি আদতে খুব বেশি চিন্তার ফসল নয়। আমি লেখালেখি শুরু করেছি এমন নামকরণের মাধ্যমে। প্রথম তো ইংরেজি পত্রিকায় লিখেছি। তারপর বই প্রকাশ করেছি।
সরে আসার বিষয় নয়। পরিপ্রেক্ষিত ও প্রাসঙ্গিকতা। সেসময় এলিজাস ট্রাভেল ডায়েরি নামকরণ প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। আফ্রিকা লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে পূর্ব আফ্রিকার তিনকাহন প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। আদতে বর্তমানটাই সত্যি। এটির ব্যাখ্যা দেওয়া মুশকিল।
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রভৃতি জাতি-গোষ্ঠীর ধর্মীয় স্থাপত্যকলাগুলোকে পর্যটনের অনুষঙ্গ বানানো গেলে পর্যটকরা কতটুকু আকৃষ্ট হবেন বলে মনে করেন?
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় পর্যটন নিয়ে আলাদাভাবে কাজ হচ্ছে। চীন, জাপান, ভারত, কম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশে রিলিজিয়াস ট্যুরিজম ভীষণ জনপ্রিয়। হেরিটেজ বলতে আদতে শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাই বোঝায় না। সে কোনো অঞ্চলের খাবার, পোশাক, গান, নৃগোষ্ঠীদের সংস্কৃতি সবই হেরিটেজের অন্তর্গত।
পর্যটনের প্রচার ও বিকাশের ক্ষেত্রে ‘জেলা ব্র্যান্ডিং’ ধারণার বাস্তবায়ন কীভাবে ফলপ্রসূ হতে পারে?
ভীষণভাবে ফলপ্রসূ হতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে জেলা ব্র্যান্ডিং স্লোগান ভীষণ কার্যকরী। তবে প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে সেগুলো জনপ্রিয় করতে হবে।
নাটোরের জেলা ব্র্যান্ডিং খুব পছন্দ আমার— ‘দ্য ল্যান্ড অব কুইন’ বাংলাটিও দারুণ ‘রাজসিক নাটোর’।
সংসারবন্ধু ফাইয়াজ আলম খান আপনার ভ্রমণকে কীভাবে দেখেন?
তিনি দারুণ উৎসাহ দেন। তাঁর উৎসাহ ও সহযোগিতা ছাড়া এত বড় কাজ এগিয়ে নেওয়া আমার জন্য সম্ভবপর ছিল না। বাংলাদেশ হেরিটেজ ট্যুরিজমের বিকাশ এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁরও অবদান রয়েছে।
একজন পর্যটক হিসেবে কোন প্রশ্নে বিরক্ত বোধ করেন?
ভ্রমণ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন, কোনো আগ্রহী ব্যক্তি কখনোই আমার বিরক্তির কারণ নয়। আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসার নাম ভ্রমণ।