
শকুন
তিপ্পান্ন বছর আগের—
কোনো এক কালরাত্রির খোঁজ করি,
এ রাত কোনো সাধারণ রাত ছিল না;
অন্য রাতের মতো নিকষ কালো হলেও
এ রাতেই পনেরশ মাইল পশ্চিম থেকে
উড়ে এসেছিল মাংসখেকো হিংস্র শকুন।
পিলখানা, রাজারবাগ, রথখোলা, লালবাগ—
রাতের আঁধারে শকুনেরা ঢুকে ছিল মানুষের ডেরায়
এ শকুনের বিষদাঁত, নখের হিংস্র থাবায় ক্ষত-বিক্ষত
বাংলা মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন, মানিক-রতন;
নয় মাস শকুনের রাজ্যে চললো মানুষের জীবনপণ
বাঁচার লড়াই। শকুনগুলো তাড়াতে হবে বলে—
শপথ নিলেন আমাদের পূর্বপুরুষ ।
তিপ্পান্ন বছর ধরে অতৃপ্ত আত্মার আহাজারি—
বাংলাদেশ শকুন মুক্ত কর, দেশ শকুন মুক্ত হোক।
নদীও মরে যায়
বাংলাদেশে নদীগুলোকে
আর এখন ঠিক নদী বলা যায় না
ষোড়শীর নাভির মতো বড্ড সরু!
সেখানে জোনাকির আলো পড়ে
ছোট মাছ করে না কিল-বিল।
আসলে নদীও মরে যায়—
মরা গাঙ, মুমূর্ষু মানুষের মতো
গ্রীষ্মে পড়ে থাকে হাড্ডিসার;
চতুর্দিক জলহীন, স্রোতহীন, ধুধু বালুচর
যেন কূলভাঙা হাহাকার জনহীন প্রান্তরে।
ডিপারচার
নষ্ট সময়ের কাছে নতজানু মানুষের বিবেক; বরং
পশুপাখি সব ভালো আছে মানুষের চেয়ে। তাদের
বিবেকের কাঠগড়ায় নেই জবাবদিহি, অশুভ হুংকার।
যে ডাক্তার আয়তালকুরশি পড়ে ফু দিয়ে—
সারাতে চায় মনের ক্ষত; কতদিন তার কাছে গিয়েছি
অবেলায় নিরাশার গল্পগুলো ফেলে দিয়ে— সে
শুনিয়েছে প্রভাতপাখির গান; শুকনো ঝরা পাতায়
নতুনের বার্তা!
মমি
কতিপয় স্নেহকাতর চোখের আবছায়া;
ঠাণ্ডার জড়তায় জবুথবু শীতের পাখি—
তুমি কথা কও সোনা! কিন্তু সে কথা কয় না।
কাচের জানালা মাড়িয়ে হিমহিম সুড়সুড়ি আসে।
শৈত্য প্রবাহের মতো কেবলি বয়ে যায় তোমার প্রপঞ্চ
কুয়াশাধূসর মৃত মুখগুলো জেগে উঠলে মমির পারদে—
গলে যাবে কি তোমার সব অভিমান!
চব্বিশের বীর সন্তানেরা
বর্ষার রৌদ্রকরোজ্জ্বল মধ্যদুপুরে
আগুনঝরা তপ্ত আকাশ থেকে
মিছিলের ওপর অতর্কিত গুলি ছুড়ে
ওরা যাদেরকে খুন করে দিল—
তারা ছিল আমাদের সন্তান।
জলজ্যান্ত ছেলেগুলো—
কী সুন্দর নাম এক, একটি
আবু সাঈদ, মুগ্ধ, আর কত…
মিছিলে উদ্যত তর্জনী তুলে ওরা
স্বৈরাচারমুক্ত, স্বাধীন দেশ চেয়েছিল।
বেপরোয়া বেড়িয়ে গিয়েছিল উল্লাসে
মুক্তির মিছিলে; নাম তার বাংলা ব্লকেট
আর একবার মুক্তির স্বাদ এনে দিতে
বেরিয়ে এসেছিল পিচঢালা পথে; অতঃপর
রক্তপিছল ফেলে নিথর দেহ রিকশায়।
মিছিলের ওপর অতর্কিত গুলি ছুড়ে
ওরা যাদেরকে খুন করে দিল—
তারা ছিল আমাদের সন্তান।