অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
এপ্রিল ৩, ২০২৫
২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
এপ্রিল ৩, ২০২৫
২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শারদুল সজল – গুচ্ছকবিতা

যুবক

সম্পূর্ণ অন্ধকার গিলে খেয়ে
যে আমি দাঁড়িয়ে আছি
যে আমি ভেঙেছি⸺দোজখের দুর্যোগ আগুন
মুগ্ধতার তুমুল সৌরভে…
মৃতময় মুখগুলোকে জড়ো করে
যিশুর মুজেজায় আদেশ করেছি
জেগে ওঠো
মৃত্যুকে অনুবাদ করে ফিরে আসা হে যুবক

বলো আমি⸺

একমাত্র আমিই⸺

যে মৃত্যুর কাছে কখনো কৃপণভাবে দাঁড়াইনি!

 
তৃতীয় বিশ্ব

শরীর মাংসের যন্ত্রণা
অসংখ্য আত্মহত্যা, শঙ্কা, ঘৃণা, ক্ষোভ⸺
মুখের ভেতর ঝুলে আছে

গতকাল যে যুবকটি ভূমিকম্পের গতিতে
হাড়ের ভেতর নক্ষত্র জড়ো করে বলেছিল
নরকের মধ্যে এইমাত্র ২১টি গোলাপ আর ২১টি
রজনীগন্ধার আত্মা বুনে এলাম

সে, মিনিট পাঁচেক আগে আত্মহত্যা করেছে

মীমাংসাহীন এই মৃত্যু। শস্য-কোমল নিঃসঙ্গতা
নাকি তৃতীয় বিশ্বের নষ্ট সহবাস? জানি না

আমাদের চোখভর্তি জিজ্ঞাসা, ব্যর্থতার বারুদ⸺
চূর্ণবিচূর্ণ সূর্যাস্তের ফেনা
তৃষ্ণার জলের মতো ঢকঢক করে গিলে খেয়ে
হেঁটে চলছি⸺
অসংখ্য আত্মহত্যাকে খুন করে, রক্তাক্ত করে…

 
আত্মীয়

সবাই সংসার গোছায় আর আমি ধ্বংস গুছাই।
রাত্রি গভীর হলে⸺
টিভির অফস্ক্রিনের কালো কাচে
হাজার মুখের তর্ক ছাড়ি
দেখি, প্রাণের আত্মীয়রা আমাকে
খণ্ড খণ্ড করে আনন্দ বৃদ্ধি করছে
কেউবা গোপন কৌশলে হাসছে
এমন হাসিমাখা মুখ আমাকে নেশার মতো টানে
তাই নিয়ম করে ছোট হই

আমি ছোট না হলে মানুষের হাসিমুখ দেখবো কী করে!

 
জাদুকর

গতজন্মের আগেই আমার ভবিষ্যৎ হারিয়ে আসছি ঈশ্বর
এই কংকালসমেত হাড়গোড়ের ভেতর যাকে দেখতে পাচ্ছেন⸺
সে এক দার্শনিক

গতজন্মে যার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল
আপনার সার্কাসবিষয়ক গবেষণায়

এই জন্মে তাই একজন জাদুকর হয়ে এসেছি
মিথ্যে আর লোভ দেখিয়ে মানুষকে অন্ধ করে দেব বলে

পাপ নেবেন না ঈশ্বর
এবার আপনার মতো ভেলকি ছড়াব!

 
ভুলের সৌন্দর্য

এলোমেলো অজস্র গাছ থেকে
জন্ম হয়েছে বনের
বন⸺পশুপাখিদের অভয় অরণ্য

এখন কে ভুল? পশুপাখি
নাকি এলোমেলো অজস্র গাছ!

এলোমেলো তাই কিছু থাকুক

নয়তো পৃথিবী সাজানো বাগান হয়ে যাবে
মানুষের বানানো বাগানে
পাখিরা কি গলা ছেড়ে গান করে? ভালো থাকে?

তাহলে কিছু ভুল জন্মাক
কিছু ভুল হোক সত্যের মতো সুন্দর

কেননা ভুল করে গন্ধম না খেলে
মানুষের জন্মই হতো না!

 
ভেঙে গেলেই শেষ হয়ে যায় না সবকিছু

মানুষ ভুলে যায়
ভুলে গিয়ে খুববেশি সতেজ হয়ে উঠে আজকাল

তুমিও ভুলে গেছ, সতেজ হচ্ছো

তবুও… কোথাও যেন
কী একটা রয়ে গেছে
নড়ছে…

দূরে গিয়েও সরে যেতে পারছি না
হাওয়ার গোপনে

পৃথিবীর বুক খনন করে
জোছনা উড়ছে
কথা ভাঙছে মেঘ ছুটছে
আর বলছে⸺

ভেঙে গেলেই শেষ হয়ে যায় না সবকিছু

 
ইবাদতনামা

এই আদুরে শীতে
আপেল ওমে জেগে উঠে আদম শরীর
কেঁপে কেঁপে ঠোঁটের দ্রবণে
ভিজে যায় পৃথিবী
দাউ দাউ জ্বলে দশটি আঙুল⸺দশ দিগন্তে
লাফায় চুমুর জাহাজ

ভাসে সমুদ্র
ভাসে তৃতীয় থিউরির হংসিনীস্নান

বুকের লাবণ্যে ভিড়ছে⸺
টোটেম নগরীর রাত, ওম
ফিসফিস স্পর্শমুখর মাধবী ছায়া
সন্ধ্যাতারার শরীরে শরীরে নামছে মায়া
শর্ষেখেত, কুয়াশা রোদে রটে গেছে সেই কথা
মাংসল ত্বকজুড়ে ঘুমিয়ে আছে
ভূগোল বিদ্যার ইবাদতনামা

 
সাঁতার

মধ্যরাতে নারীরা খুব সুখী হয়
আগুনগলা নদীর জলে জলে
শরীরের শহরজুড়ে তৃষ্ণার প্লাবন পৃথিবী আকাশ
ওম-সুখে খুঁজে পায় গোলাপীয় নদী

যেখানে সাঁতার, ইচ্ছে ইচ্ছে দারুণ সাঁতার

তখন পৃথিবী ও সে, সে আর সে এক আদিম উৎসব

আদিকাল থেকে এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
খেলোয়াড়
আমি
আপনি
আমরা
এবং
আসতেছে যারা
তারা

যুদ্ধ-মিত্র আদিকাল⸺গুরু আদম হাওয়া

 
সাইরেন

জীবন সুন্দর।
এখানে শিখেছি প্রেম, প্রার্থনা
গোপনে
আমার প্রেমিকার লাজুক ঠোঁটে, চুম্বনে
ঊরুসন্ধি জাদুঘরে
অমাবশ্যা রাত ও গোধূলি পেরিয়ে
তার সুডৌল স্তনের ভাঁজে ভাঁজে…

­­যখন⸺
পৃথিবীর সমস্ত জোছনা ছড়িয়ে পড়ছিল
তার ঠোঁট থেকে
ম্যাপল পাতার শরীরে
চিরবসন্ত নিয়ে

তখন থেকেই ফায়ার সার্ভিসের মতো বেজে চলছি
আমি জরুরি সাইরেন!

 
চুমুর কংকাল

আমার সমস্ত জীবন চুরি হয়ে গেল
একটি হৃদয়ের দাবি নিয়ে
আর তুমি শিখাতে চাইলে আকাশের মাপজোক
মায়া-মৌমাছির যোগ বিয়োগ
প্রমাণসাইজ ট্রেনের চাকায় যত ঘর্ষণ
যতদূর নক্ষত্রের নীলমেঘ
⸺তার সবটুকু!

অথচ ধূলি-ধূসরিত হাজার সেন্টিগ্রেড তাপ ঠোঁটের ডগায় নিয়ে
বুকের ভূমিকম্পে কত আলোকবর্ষ দূরত্বকে টেনে এনেছি
তার হিসেব করলে না

শুধু ছুটে চললে সূর্য ও সময়ের আগে
পৃথিবীর শেষ অবধি⸺
পড়ে রইল আমার চুমুর কংকাল

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

অনুপ্রাণন অন্তর্জাল- সম্পাদকীয় (৭ম সংখ্যা)

Read Next

শর্মী দে – যুগল কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *