অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
আগস্ট ২৯, ২০২৫
১৪ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আগস্ট ২৯, ২০২৫
১৪ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিশির মল্লিক – গুচ্ছ কবিতা

চুম্বনের শ্বাশত দাগ

আমার শুয়ে থাকা শরীরে অরণ্য শোভিত নির্জনতা
মুখরিত শ্যামল অনুরাগ চিকচিকে রোদ্রকরোজ্জ্বল
সুবাসিত ফুলের মায়ায় ফলের জন্ম দেবে বলে
ভ্রমরের ফুর্তিবাজ গুঞ্জরণ
বহু শতাব্দী ধরে অশ্বের হ্রেষাধ্বনি
নিদ্রাহীন শিয়রে পেতেছে সিংহাসন
বাঘেরা অরণ্য ছেড়ে কোথায় পালাল?
ফুল পাখি তৃণের অবিশ্বাস আমাকে তৃপ্তি দেয়
তোমরা যা কিছু বিশ্বাস করো
তাতে আমার কি যায় আসে
অরণ্যহীন এই ধুসর সজ্জায় আমি ঘুমাব এখন
রক্তিম পরিচ্ছদে নিজেকে রাঙাব
যে কোনো নক্ষত্রের আলোয় প্রাণহীন এ দেহে
পাবে না খুঁজে তুমি চুম্বনের শ্বাশত কোন দাগ।

 

ভাবনার ঘনত্ব

সম্পূর্ণ ভুলে থাকি আপন ক্ষুধায়
ক্ষুধার বিবিধ প্রয়াস ঘন হয় সরের মতো
কোলেস্টেরল ভয় আছে তাতে
তবু্ও জীবন উজ্জীবক ভুলে থাকা স্বভাবে
নদীর কুলু কুলু স্রোতে ফুঁ দিই
প্রবাহ উপেক্ষা করে পিছু টান
মরার মতো নিষ্পন্দ তুমি, অনাবিল স্বপ্ন, সুখ প্রসারিণী
শ্যামলী চুম্বনে উত্তেজক অনুরাগী
ফেলে দিই যাকিছু প্রতিবন্ধক সতেজ প্রাণের
ঘাসের মতো আঁকড়ে থাকি তোমার শরীর
সব দহন আমাতে জ্বলুক
নগর পুড়ে যায় লালসার জিঘাংসে, যাক
তোমার শরীরের রস-খনিজ
অমৃতের পুত্রেরা চেটে নিচ্ছে
তাদের সাম্রাজ্যে সুবাসিত গণতন্ত্র
আমি খুলে ফেলছি আমার পায়ের জুতো
পারমাণবিক মারণাস্ত্রের অহমিরা
গিরগিটির মতো রং বদলায়
তবু এসব সম্পূর্ণত ভুলে থাকার চেষ্টা করি
ফলবতী শষ্যবতী তোমার মায়ায় দেখি
জড়াজড়ি করে বাঁচার কথা⸺
ক্রমশ ঘন হয় মানুষের আঙিনায়।

 

আগামী

রাতটা কেটে গেলে
দিনটাকে কুটিকুটি করে কেটে নেব⸺
খাবার টেবিলে
শিকারে
ফসলের মাঠে
কারখানায়
রাজপথে কিংবা
আমাদের শয্যায়
সমবণ্টন সমানাধিকারের দাবিতে সোচ্চার হব
পরিবারের জন্য রেখে দেব সুখের বাটিটি
ব্যক্তির জন্য থাকবে স্বাধীনতা
সমাজের জন্য শান্তি ও শৃংখলা
রাষ্ট্রের জন্য রেখে দেব সেবা ও নিরাপত্তা
রাজনীতি বিক্রেতাদের দোকানে গণতন্ত্র নামক জাঙ্কফুড
নিষিদ্ধ হবে আমাদের খাবার টেবিলে
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এমন বিধি-নিষেধ
দিন ও রাত্রির স্বভাবকে মেনে নিতে
উদ্বুদ্ধ করবে আমাদের
প্রাকৃত জীবন হবে⸺
সাম্য ও সমৃদ্ধির আগামী।

 

জলের আয়না

জলের আয়নায় তোমার প্রতিরূপ যতই ম্লান হোক
তার মাঝে থাকে আলাদা সুষ্মিতি
পাশে বসে যারা যতই নিজের কথা বলুক
নির্বাক তোমার দ্যুতি প্রলুব্ধ করে মন
দিনের আলোয় হারানো তারারা যতই উঁকি দিক
আমার চোখ জুড়ে নেচে যায় তোমার পায়ের ঘুঙুর
তোমার আঙিক বাঁকে কেঁপে ওঠা ঢেউ
কামুক প্রাণে তোলে সম্ভোগ আকুতি
শালিক খুঁজছে কীট, চড়ুই নেচে নেচে কিচকিচ ডাকে
টুনটুনিরা করে খুনসুটি, কাক বসে আছে চুপ
কোকিল কেন জানি করে কুহু কুহু
আমি কি বুঝি এসবের মানে?
নিস্তরঙ্গ জল বাতাসের পরশে কাঁপে দুরুদুরু
বিম্বিত প্রতিরূপের অনুজ্জ্বল আকৃতি
কী অপরূপ লাগে!
খেলা করে মস্তিষ্কের উঠোনে আমোদিত সুন্দর শিশুরা
জন্ম না নেওয়া শব্দগুলো ভাবের বাগানে মাথা নাড়ে
আভিধানিক শব্দের মাঝে যথার্থ অর্থপূর্ণ শব্দের সংকট⸺
চিত্রকল্প নির্মাণে যতই ক্লেশ ছড়াক
কালো অক্ষরগুলো প্রতীক্ষা করে নতুন প্রজন্মের
গাছগুলো যেভাবে দাঁড়ায়⸺ দৃঢ়তা নিয়ে
পাহাড় যেমন দাঁড়িয়ে অবিচল
অচঞ্চল জলের রূপ যেমন বিম্বিত করছে আকাশ
আমিও তেমনি চঞ্চলতার মাঝে অকৃত্রিম⸺ খুঁজি যেন কার মুখ।

 

পাতা বৃত্তান্ত

পাতারা বাঁচে বৃক্ষ সংলগ্নতায়
আমি বাঁচি তোমাকে জড়িয়ে
বায়ু স্রোত যতই দোলক পাতাদের মন
হাসুক না যতই রোদের সোহাগে
বৃক্ষচ্যুত দিনে থাকে কি এসবের মানে!
কান্নার সশব্দ চিৎকার শুনি না
দেখি না শোকের মাতম
অনাদরে পড়ে থাকে পাতাদের শব
কুড়ানিরা লুটে নেয় এসে।
লকলকে উষ্ণতায় ছাই হয় দেখি পাতার শরীর
পড়ে থাকে ধূসর শুভ্রতা।
ছাই জেনে করো না হেলা
আমি এখন ছায়া শরীর
আমাকে পোড়াবে কে?

 

Print Friendly, PDF & Email
শিশির মল্লিক

Read Previous

অনুপ্রাণন অন্তর্জাল- সম্পাদকীয় (৭ম সংখ্যা)

Read Next

শর্মী দে – যুগল কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *