
তোমাদের উদ্ভিদ নীল। আর আমাদের বৃক্ষ সবুজ।
আমাদের উদ্বাস্তু পিঠে জেগে ওঠে মহাকাল।
আমরা কৃষক। বালু দিয়ে বানাই নদীর মানচিত্র।
নারকেল পাতার চশমায় আকাশের মনমেজাজ বুঝি।
কলাপাতার বাঁশিতে ফুঁ দিয়েই বেজে উঠি। বেজে উঠি।
আমরা কৃষক। আল বেঁধে ধরে রাখি বৃষ্টির পানি।
বর্ষা, শীত, শরৎ ও হেমন্ত বিদ্যায় বীজের বিস্তার।
লাঙ্গলের ফলা মাটির ভাষা বোঝে। ভবিষ্যৎ খোঁজে।
আর আমরা বাপের ভিটায় বৃষ্টির ধারাপাত পড়ি।
ফলবতী মেঘ। আহা! বাজনা বাজে দেহকলে।
বাজারে কোম্পানির অধিক লাভের বীজ,
সার ও কীটনাশকে মাঝে মাঝে আমাদের হেমন্ত বিবর্ণ।
ঘরে ঘরে আবার অভাব।
আমাদের দুঃখ বোঝে না ফড়িয়া মহাজন।
আর প্রথা মেনে অগ্রিম ধান নিয়ে যায় রাজবাড়ির শালিকেরা।
আমরা টাকা দিয়ে কিছুটা চিটা কিনি। নৌকার পালে অপেক্ষা।
আমরা ভাসতে ভাসতে ফের মেতে উঠি উত্তরাধিকার গানে।
আমরা কৃষক। আমাদের রক্তে লেখা হয় মৌনতা।
কপালের ভাঁজে ভাঁজে জলকণায় জন্মে সোনালি আঁশ। সর্বনাশ!
তার কিছুটা দুঃখ এঁকেছি চোখে মুখে গালে।
এবারও ঈদে স্ত্রীকে দিতে পারিনি নতুন শাড়ি। ব্লাউজ।
ছেলেটার প্রাইভেটের খাতায় ছয় মাস বকেয়া।
মেয়েটা তবু কিছু দুঃখ বোঝে।
আমরা কৃষক। বাপ-দাদার ভাষা বুঝি। মাটির গন্ধে মাতি।
আমরা ধুলোঝড়ে উড়ে যাই। শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়াই।
আর ভারি ভারি কথার সৌরভে আমাদের পালা দীর্ঘ হয়।
আমরা মহাজনী ভাষা বুঝি না।
আমরা কোম্পানির সংকেত বুঝি না।
তাই আমাদের ঘামে মাঠ ভিজে যায়। বীজ থেকে চারা।
আর ফসলের বাক্যে আমরা ভাগ্যের বিভীষিকা ভুলে যাই।
আর মাটির সুবাসে আমরা ক্রোধ ও বঞ্চনার গল্প ভুলে যাই।
আমরা কৃষক। তেনাচিড়া বিলে এখন ইরি ফলাই।
অথচ আমাদের বিলবস্তায় ডাকাত নামে! ডাকাত!
জলের ভাষা কেড়ে নেয় কাগজের মানুষ!
আর কাগজের ভাষায় আমরা ক্রমাগত শব্দহীন হই।
আমরা কৃষক। গণিতে অজ্ঞ। জ্যামিতি বুঝি না।
মানচিত্রের মহানায়ক নেমে আসে ভূমিতে।
শাপলা-শালুকের দিন শেষ। সব শেষ, সব শেষ!
আমাদের মৃত্যুর রং বদলায় বীজ ও বাদলায়। মড়ক ও খরায়।
আর আমরা ইতিহাসের দিকে মুখ করে উত্তরাধিকারের কাহিনী হই।