
পোয়াতির ভয়
সেদিন কবি সাদেক শামীম বলছিলেন, পাগলের বাণী কিন্তু এখন মহাশ্রমের দেয়ালে লেখা হয়। আমি বরাবরই তাকিয়ে থাকি কবির ঠোঁটে। দেখি জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতোই সত্য উচ্চারণ করছেন কবি। তারপর যখন পকেটের ভেতর স্যামসাং গ্যালাক্সিটা শব্দ করল— ওটার স্ক্রিনে তাকাতেই বউয়ের কথা মনে পড়ল। সে রাতেই বউয়ের মেসেজ, একটা তাবিজ আনিও নূর হুজুর থেকে। বিবস্ত্র হয়ে স্নান করা হয়তো জায়েজ অথবা না। তবু ইদানীং স্নান করার সময় লুঙ্গিটা খুলে রাখি। কারণ বউ পোয়াতি হওয়ার পর থেকে ডাক্তারবাবু কলেমা পড়ার মতোই মুখস্থ করে দিয়েছেন— বউ সামনের ক’মাস কাজ করতে পারবে না। বিষয় বউয়ের গর্ভে আমার পোলা।
কবি সাদেক শামীমের ঠোঁটের কথা আবার মনে পড়ে গেল। তার কবিতা আওড়ানোর ভঙ্গিমা কল্পনা করতে করতে দ্রুত সঞ্জীব ঠাকুরের পায়ের সামনে পড়ি। ঠাকুরকে বললাম, একটা বাণী দিন লিখে আপনার অপ্রকাশিত। ঠাকুর জানতে চাইলেন, অপ্রকাশিত দিয়ে কী করবি?
বললাম, আপনার আগের রচনাসমগ্র তো সবাই গিলে ফেলছে তাই নতুন ছাড়া অসুখ ছাড়ব না বউয়ের।
পেগের গ্লাসটা ধুতির পাশে রেখে ঠাকুর পষ্টস্বরে চেঁচিয়ে শব্দ করলেন, ওই ফাজলামো করিস আমার লগে।
ঠাকুরের খানকায় কত চেহারার নারী পুরুষ। সেদিক না তাকিয়ে দ্রুত কবির পরিচয় দিলে, মুখে এক পেগ দিয়েই জানতে চাইলেন, বল তো তোর মূল কথাটা কী?
খানকায় উপস্থিত নারী পুরুষগুলো মূলত বিভিন্ন জাতের। এক পুরোহিতের দিকে তাকিয়েই বললাম ঠাকুরকে, কবি সাদেক শামীম সেদিন কবরস্থানে দাঁড়িয়ে দোয়া ও সূরাহর জায়গায় জীবনানন্দের একটা কবিতা পড়েছেন। মূলত সে ভরসায় আমার পোয়াতি বউটার ভয় কাটাতে— আপনার একটা বাণী নিতে আসছি ঠাকুর।
নেহারির বিয়ে
দেলু ফকিরের মূল ভরসা নেহারি’র উপর। করিমগঞ্জ এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে দেলু ফকির অন্যতম। ইদানীং ইচ্ছে করেই ভাত কম খায়। ঘর-বসা হওয়ার পর তার মেয়ে নেহারিই রুটি-রুজির একমাত্র ভরসা।
ছোট বয়স থেকে ছাতা, পুরান ডেকচির মেরামতের কাজে বাবাকে সহযোগিতা করলেও— মাঝ বয়সে বাবার শুঁটকির দোকানেও সময় দিয়েছে নেহারি। করিমগঞ্জ এলাকায় দোকান দিয়ে কী ভুলটাই না করল দেলু ফকির। ঋণ করে কী আর বাণিজ্য হয়? এনজিও থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দেলু ফকির শুঁটকির ব্যবসাটা শুরু করেছিল। কিন্তু ভাগ্য তার সহ্য হলো না, গ্রামের মানুষ বাকি নিলে টাকা দিতে পারে না— সরল স্বভাবের মানুষ দেলু ফকির তা বুঝে উঠতে পারেনি। অবশ্য বুঝতে বুঝতে ৭০ হাজার টাকার সুদ বেড়ে লক্ষ টাকায় যখন পৌঁছাল, এরপর লোকসানে দোকান ছেড়ে ঘরবন্দি হয় দেলু ফকির। বয়সের ভারে এখন শরীরটাও প্রায় অর্ধমৃত।
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার যোগীপল গ্রাম থেকে আসা নুরুনের সঙ্গে নেহারি’র বিয়ের আলাপ হয়। করিমগঞ্জ নুরুনের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় থাকার সুবাদে নেহারিকে বিয়ে করতে সহজ হচ্ছে তার। তা না হলে দূর এলাকার অচেনা যুবকের কাছে কার মেয়েকেই বা বিয়ে দিবে। তাছাড়া করিমগঞ্জের কোন মেয়ের যৌতুক ছাড়া বিয়ে হয়েছে এরকম রেকর্ড এর আগে একটিও নেই।
দেলু ফকির বাড়তি ভাবনার দিকে না গিয়ে নুরুনের সঙ্গে অল্প সময়ে মেয়ের বিয়ে চূড়ান্ত করে। এছাড়া কিচ্ছু করারও নেই তার, নেহারির বিয়ের বয়স পার হওয়ার পথে। মেয়েরা এই বয়সে পা রাখলে সব বাবারই কম-বেশি চিন্তা বাড়ে। দেলু ফকিরও আগপিছ না ভেবে যৌতুকহীন নেহারিকে নুরুনের সঙ্গেই বিয়েটা সম্পন্ন করে।
করিমগঞ্জের ছোট ও বড়রা দল বেঁধে আসে নুরুনকে শুভেচ্ছা জানাতে। মহৎ এমন চরিত্রের জন্য নুরুন উপস্থিত সবার ভালোবাসায় উজ্জ্বল হয়। অসুন্দর আর অল্প শিক্ষার একজন নুরুনের কাছে এই প্রথম যৌতুক প্রথার অবসান দেখলো করিমগঞ্জবাসী।