অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
আগস্ট ২৯, ২০২৫
১৪ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আগস্ট ২৯, ২০২৫
১৪ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিলেকাসা -
অতল অন্ধকূপে

পূর্ণিমার স্বপ্ন তার ছিল না। তার আগেই থেকে থেকে রাহুর থাবা মেনে নিয়েছিল। আরবি দেশের কথায় হঠাৎ তার মনে পূর্ণিমার সাধ জাগে। ভেসে উঠে পাঞ্জাবি পরা সফেদ চেহারার মানুষ। যারা নারীদের দেখে মা আর মেয়ে হিসেবে। চোখে মুখে ভাসে জীবন, যেন এবার কিছু হবে। রাহুর থাবাটিকে ঘৃণাভরে দূরে ঠেলে দিতে চায়। নিজের ভূমিকাটুকু মুছে ফেলতে চায়, দোষ ধরে সমাজের। অসুস্থ পুরুষের কুৎসিত দৃষ্টিতেই যেন সব পাপ। এবার তার মুক্তি; আর তাকে জড়াতে হবে না নোংরা কিছুতে। পাপ এখনি হয়ে যায় তার অতীত, সে সব ফেলে চলে যাবে কলুষমুক্ত জীবনে। শেষরাতের মুয়াজ্জিনের গভীর গলার স্বরটিই যেন আরবি। ফজরের সময়ের মতোই সবকিছু নির্মল আর পবিত্র।

দুপাশের কুৎসিত আধমরা চাহনিকে ঠেলে ঠেলে চলে রাবেয়া। তার জন্য অপেক্ষা করছে জীবন, সফেদ আরবি জীবন। মনে হিসেব করে ফেলে পাঁচ বছর পর ফিরে আসবে। পাঁচ বছরে গড়ে তুলবে এক সফেদ জীবনে; ফিরে এলেও ধরে রাখবে সে জীবন, সফেদ জীবন। আসার পথে পারলে হজ করে দেশে ফিরবে। যা টাকা জমাতে পারবে তাতে তার বাকি জীবন চলে যাবে। বাইরের কোনো কাজে সে আর যাবে না, কাউকে দেবে না কোনো বিকার প্রকাশের। প্রতিহিংসাও জেগে উঠে, দেখে নিতে ইচ্ছে করে, ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে অন্ধকারে জেগে উঠা মানুষের পিশাচ মন। নিজেকে থামিয়ে রাখে। সুবেহ সাদিকের শান্তির হালকা বাতাস ধীরে ধীরে বয়ে চলে জীবনে। রাবেয়া টের পায় সমস্ত দেহ মন দিয়ে। কল্পনায় দেখে আরবি দেশ, সফেদ মানুষ, আর কানে বাজে ভোর রাতের মুয়াজ্জিনের গভীর গলার স্বর।

মা-বাবা আর ভাইকে রেখে একদিন উঠে পড়ে প্লেনে। আরবি দেশের উদ্দেশে। তার ভাই-ই সব জোগাড় করে দিয়েছে। ভাইটির প্রতি মন আনন্দে আর কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠে; জীবন মুক্তির একমাত্র প্রবাদপুরুষ যেন তার ভাইটি। প্লেনটি দিয়েই সে পুলসিরাত পাড়ি দিতে চায়। ওপারে অপেক্ষা করছে আরবি দেশ আর সফেদ জীবন। প্লেনের আঁটসাঁট কাপড় পরা মেয়েগুলোকে দেখে কষ্ট হয়। নিজের জীবনের রাহুর থাবা ভেসে উঠে চোখে; মেয়েগুলোকে মনে হয় কর্দমাক্ত আর নোংরা। ওরাই যেন নিজেকে তুলে দিয়েছে অন্ধকারে জেগে উঠা মানুষের পিশাচ মনের কাছে। ঘৃণাভরে তাকায় আর মনে গালি দেয়, কুৎসিত যত গালি। চোখের সামনে দেখতে পায় দোজখের লেলিহান শিখা এদের সাদা চর্বিতে গনগন করে জ্বলে ওঠে। আবার করুণাও টের পায় মনে, এরা কেন আরবি দেশে থাকে না!

আরবি দেশে নেমে ভালো লাগে। চারিদিকে সাদা ধবধবে পা সমান লম্বা পাঞ্জাবি পরা আরবি লোক। কালো বোরকাতে ঢাকা আরবি মহিলা। কারও কারও আবার মুখ পর্যন্ত ঢাকা। সফেদ জীবন যেন শুরু হয়ে গেল! এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসার পর একটি লোকের পেছনে হাঁটতে থাকে। আরবি লোকটির মুখে দাড়ি নেই, কিন্তু খুবই সফেদ চেহারা। মাথা পাগড়ি দিয়ে ঢাকা। বাইরে এসে দেখে বড় একটি গাড়ি। এত বড় গাড়ি করে তাকে নিতে আসছে দেখে লোকটির দয়ার প্রতি রাবেয়ার মন শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে যার। ওর গার্মেন্টসের বড় সাহেবদেরও এত বড় গাড়ি নেই। ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে ধরে। রাবেয়া উঠে বোঁচকাটি কোলে নিয়ে রাখে। দুপাশের রাস্তাগুলোও যেন ধবধবে পাঞ্জাবি পরা। কোথাও কোনো ময়লা নেই, সবকিছুই সফেদ। রাবেয়ার মনে পুলক জাগে, সফেদ জীবনের পুলক।

গাড়িটি একটি বিশাল গেটের কাছে থামে। ড্রাইভার সুইচ টিপে গেট খুলে; রাবেয়ার তাজ্জব লাগে। ভেতরে অনেক বড় একটি একতলা বাড়ি। চারিদিকে ফুল গাছ আর কিছু খেজুর গাছ। বড় পানির ফোয়ারা। বাইরে চেয়ার টেবিল সাজানো। রাবেয়ায় স্বপ্নের জীবন এবার বাস্তবে দেখতে পায়। রাজবাড়ির মতো বিশাল বাড়ি। ড্রাইভার দরজা খুলে ধরে। আরবি লোকটা কিছু না বলে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। ড্রাইভার ওকে বাড়ির পেছনের দিকে রাস্তা দেখিয়ে দেয়। রাবেয়া ওর বোঁচকাটি নিয়ে আস্তে আস্তে যেতে থাকে। পেছনে গিয়ে দেখে একটি বড় ঘর। কী করবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশ দেখতে থাকে বিস্ময়ে, এত সুন্দর; এটা কি বেহেশত! চোখে ধাঁধাঁ লেগে যায়।

ঘরের দরজাটি খুলে একটি মাঝবয়সী মেয়ে বেরিয়ে আসে। মাথায় স্কার্ফ আর ম্যাক্সি পরা। রাবেয়াকে হাতের ইশারায় ঘরে ঢুকতে বলে। রাবেয়া বোঁচকাটি নিয়ে ঘরে ঢুকে। বেশি বড় ঘর না। কয়েকটা লোহার খাট ফেলানো পাশাপাশি। একদিকে ছোট একটি টিভি। পাশে একটি ফ্রিজ আর মাঝারি একটি শেলফ। ঘরঘর শব্দে এসি চলছে। একটি খাট দেখিয়ে দেয় মেয়েটি। রাবেয়া বোঁচকাটি খাটের নিচে ঢুকিয়ে দিয়ে বসে পড়ে খাটে। রাবেয়াকে মেয়েটি হিন্দিতে বলে, এটিই ওর ঘর। এখানেও ওর মতো আরও তিনজন আছে। ওর নাম রমা, ইন্ডিয়ার কেরালা থেকে এসেছে। রাবেরা হিন্দি সিনেমা দেখার সুবাদে ওর কথা বেশ বুঝতে পারে, কিন্তু হিন্দি বলতে পারে না। রুটি আর জুস দেয় ওকে খাবার জন্য।

কিছুক্ষণ পরে বাকি দু’জনও ঘরে আসে। ওরাও কেরালা থেকে এসেছে। সোমা আর মিথি ওদের নাম। ওরাও ম্যাক্সি আর স্কার্ফ পরা। ওরা এসে রাবেয়াকে বাড়িটি সম্পর্কে বলতে থাকে। বাড়িতে দুইজন ছেলে কাজ করে; একজন পাকিস্তানি ড্রাইভার আরেকজন সিরিয়ার মালি। ওদের ঘর গেটের কাছেই। ওরা বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারে না। খাবারের সময় ওদের কেউ একজন বাইরের ঘরে খাবার দিয়ে আসে। অন্য সময় যেন রাবেয়া ওদিকে না যায়। রাবেয়ার অবাক লাগে যখন জানতে পারে এত বড় বাড়িতে মাত্র চারজন মানুষ থাকে! সাহেব, বিবি, আর দুই ছেলে। ছেলে দুটো ছোট, স্কুলে পড়ে। বড়টার বয়স দশের নিচেই হবে আর ছোটটা পাঁচের মতো।

রাবেয়াকে ম্যাক্সির মতো দুটো ড্রেস দেওয়া হয়। রঙিন পলেস্টার কাপড়ের। একটি স্কার্ফ দেয়, চুল বাঁধার জন্য। স্কার্ফ ছাড়া যেন সাহেবদের ঘরে না যায়। এই ঘরের বাইরে গেলেই যেন মাথায় স্কার্ফ থাকে। রাবেয়ার কাজ ঘর পরিষ্কার করা। রমা দেখিয়ে দিয়েছে কী করে ঘর পরিষ্কার করতে হয়। বারবার সাবধান করে দিয়েছে ঘরের অন্য কিছুতে যেন হাত না দেয়। ঘর পরিষ্কার হলেই যেন ওদের ঘরে ফিরে আসে। বাচ্চারা যাই করুক না কেন কখনো যেন কিছু না বলে। আরেকটা জিনিস, সাহেব আর বিবির কথায় কখনোই যেন না করে। সাহেবদের ঘরগুলো অনেক বড় বড়। অনেক মোটা কার্পেট, দেয়ালজুড়ে লম্বা পর্দা। সবকিছুর জন্যই আলাদা আলাদা ঘর। টিভি দেখার জন্য অনেক বড় একটি ঘর, টিভিটিও অনেক বড়। এত বড় টিভি থাকতে পারে রাবেয়ার ধারণা ছিল। এতগুলো ঘরে ওরা কি করে রাবেয়া চিন্তা করে কিনারা করতে পারে না। বড় ঘরের সঙ্গেই আছে বিশাল এক তাঁবু দিয়ে ঘর।

পরের কয়েকদিন কাটে কাজ আর ভাষা শিখতে। ভাঙা কিছু হিন্দি বলতে পারে। কয়েকটা আরবি শব্দও শিখে নিয়েছে। বেশ কাজ চলে যায়। কাজ শেষ হলে ঘরে এসে ছোট টিভি খুলে বসে। আরবি আর হিন্দি চ্যানেল আছে। রান্না ঘরে ঢুকে রান্না দেখে। রান্নার দায়িত্ব মিথি আর রমার। অন্যরা রান্নার কিছু ধরতে পারে না। চারজন মানুষের জন্য অনেক রান্না করতে হয়। বেশির ভাগ খাবারই ফেলে দিতে হয়, রাবেয়াদের সে খাবার নিয়ম নেই। কম কেন রান্না করে না? রাবেয়ার প্রশ্নটি আসে। ইসলামে যে খাবার নষ্ট করা হারাম! কাকে জিজ্ঞেস করবে, এরাই যে ধর্মের খুব কাছে-আরবি আর ইসলাম রাবেয়ার কাছে এক। কাজের লোকের জন্য আলাদা রান্না। যত পারো খাও, কিন্তু রান্না ভালো লাগে না। ওরা কেরালার ধাঁচে রান্না করে, রাবেয়ার স্বাদের সঙ্গে মেলে না বলে খুব কম খেয়েই দিন কাটিয়ে দেয়। রান্নার কথা বলতে চেয়েও এখনো কিছু বলা হয়নি রাবেয়ার। আরও কিছুদিন যাক। ওর লক্ষ্য সফেদ জীবন।

রাবেয়া সফেদ জীবনের আশায় মনোযোগ দিয়ে কাজ করে। কোন কিছুতে হাত দেয় না। এত দামি জিনিস দেখতেও ভয় করে, যদি কিছু ভেঙ্গে যায়। সাহেব সকালে বেরিয়ে যায়। বাচ্চাদের ড্রাইভার স্কুলে দিয়ে আসে। বিবিও চলে যায় তারপর। রমাকে জিজ্ঞেস করে বিবি কী করে, বাইরে কোথায় যায়। বিবি কেন এত সাজে। রমা উত্তর দেয় না, এটা জানা তার দরকার নেই।

দুপুরে খাবার দিতে মিথি যায় ড্রাইভার আর মালির ঘরে। যেদিন বিবি থাকে না, মিথির আসতে অনেক দেরি হয়। রাবেয়া মিথির মুখে দেখে ক্লান্তি আর প্রশান্তির ছাপ। রাবেয়ার মনে পরে গার্মেন্টস জীবনের কথা। মন থেকে যত তাড়িয়ে দিতে চায় তত চিন্তাটি জেঁকে বসে। ভাবতে চায় ওর কোথাও ভুল হচ্ছে, কিন্তু ভুলটি খুঁজে পায় না। সফেদ জীবন মরীচিকার মতো মায়া মনে হয়। আরবি দেশ কেন যেন পাঁকের ঘোরে তলিয়ে যেতে থাকে। মনের অজান্তেই মিথিকে ইন্ডিয়ার বলে গালি দেয়। ও সে পথে আর যাবে না। রাবেয়া এসেছে সফেদ জীবনের খোঁজে। মিথিকে ঘৃণা করতে থাকে, অভিশাপ দেয় জাহান্নামের।

রাবেয়ার রাতটি কাটে নানান চিন্তায়। বিবির এত সেজে বাইরে যাওয়া, খাবার দিতে গিয়ে মিথির দেরি করা। সবকিছুই তালগোল পাকিয়ে শুধু গার্মেন্টসের জীবনের দিকে চোখ চলে যায়। ভোরের দিকে ঘুম থেকে উঠে কাজে লেগে যায়। তবু চিন্তা মাথা থেকে তাড়াতে পারে না। বাচ্চারা স্কুলে চলে গেলে বিবি রমা আর মিথিকে নিয়ে বাজারে যায়। সঙ্গে পাকিস্তানি ড্রাইভার। দুপুরে সোমা রাবেয়াকে বলে মালিকে ভাত দিয়ে আসতে। রাবেয়া যেতে চায় না। ভাত দিতে গিয়ে ওরও যেন দেরি হবে। ও মিথির মতো হতে চায় না। মিথিকে পেছনে ফেলে এসেছে। আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। শেষপর্যন্ত রাবেয়া যায়, দরজার কাছে ভাত রেখেই চলে আসে। ঘরের ভেতরে তাকায় না পর্যন্ত।

রাবেয়া ঘরের বাইরে পানির ফোয়ারা পরিষ্কার করছে। আজ কেউ বাইরে যায়নি। স্কুল নেই বলে বাচ্চা দুটো খেলছে বল নিয়ে। হঠাৎ বলটি এসে পানিতে পরে। রাবেয়া উঠিয়ে দেয়। বলটি নিয়ে বড় ছেলেটি জোরে রাবেয়ার গালে চড় মারে। চড় খেয়ে রাবেয়া হতভম্ব, কেন মারল! এতটুকু ছেলের হাতে এত শক্তি! আবার চড় মারতে যায়, রাবেয়া এবার হাত ধরে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি কাঁদতে শুরু করে। ছোটটাও যোগ দেয়, কাঁদতে থাকে। কী করবে রাবেয়া বুঝতে পারে না। রমা কান্না শুনে বেড়িয়ে এসেছে। রমা বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে। ওরা বলে রাবেয়া ওদেরকে মেরেছে। বিবি আর সাহেবও চলে এসেছে। রাবেয়া যত বলার চেষ্টা করে ও মারেনি, তত সাহেবের গালি বেড়ে যায়। গালির মাঝে শুধু হারামি আর বাঙালি শব্দ দুটোই বুঝতে পারে। রাবেয়া অসহায়ের মতো কাঁদতে শুরু করে।

রাবেয়ার কান্নায় বিবির রাগ উঠে যায়। রাবেয়াকে ঘরে নিয়ে যায়। নিজেদের বাথরুমে রেখে একটি চামড়ার বেত আনে। তারপর মারতে থাকে। নারীর অস্তিত্বের যেখানে প্রকাশ সেখানেই শুধু মারে। মার খেয়ে রাবেয়া চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকে। একজন নারীর কাছে আরেকটি নারীর সমস্ত অহংকার মাথা ঠুকে আছড়ে পরে। চিৎকার শুনে চলে আসে সাহেব। চিৎকার থামাতে বলে, রাবেয়া মার খেয়ে কিছু আর বুঝতে পারে না। কাঁদতে থাকে। এবার সাহেব শুরু করে মার। বিবির চেয়ে তিনগুণ জোরে জোরে। রাবেয়া সহ্য করতে পারে না। লুটিয়ে পড়ে।

রাবেয়ার জ্ঞান ফিরে পরদিন সকালে। চোখ খুলে চারদিক দেখে, কিছু চিনতে পারে না। কী হয়েছিল মনে আসে না। টের পায় গাঁয়ের কিছু জায়গায় ব্যথা। বুকে আর দুপায়ের মাঝে বিষের ব্যথা টনটন করছে। মনে আসতে থাকে ঘটনা; কী হয়েছিল ওর জীবনে। হাত দিয়ে ছুঁতে যায় বুকের কাছটা, ফুলে গেছে। জামা তুলে দেখে পুরো জায়গাটা কালো। কেন ওকে মারল? কারণটি খুঁজে পায় না। অভিমান চলে আসে, দুচোখ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে চলে অঝোরধারা। সাহেব আর বিবিকে গালি দেয় না। অভিশাপ দেয় নিজের জীবনকে।

রমা ওষুধ মালিশ করে দেয়। খাবার এনে মুখে তুলে দেয়। আস্তে-ধীরে রাবেয়া বেঁচে উঠে। রমাকে ধরে একদিন রাবেয়া কাঁদতে থাকে। রমাও কি মিথির মতো! খাবার দিতে গিয়ে দেরি করে! দেরি করলেও রমার প্রতি কোনো ঘৃণা আসে না, জাহান্নামের অভিশাপ দেয় না। রমা যেন এক ফেরেশতা। রমা বলে ও যেন আর কখনো বাচ্চাদের না ধরে। ওরা মারলেও কিছু বলতে পারবে না রাবেয়া। এখানে ওরা বন্দির মতো আছে। আরবিরা ওদের মানুষ মনে করে না। রাবেয়ার কান্না থামাতে পারে না। সফেদ জীবনের হাতছানি নিমেষেই মিলিয়ে যেতে থাকে।

রাবেয়া ভালো হয়ে ওঠে। মাথা নিচু করে কাজ করে যায়। একদিন আরবি লোকটা দুপুরে বাসায় চলে আসে। রাবেয়াকে ঘরে ডাকে। আরবি লোকটার ভাবটির সঙ্গে রাবেয়া পরিচিত। তাই একটা কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে। বারবার না না বলে কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু আরবি লোকটার কোনো ধৈর্য নেই বোঝার, বরং রেগে যায়। রাবেয়া বোঝাতে পারে না। কিন্তু পরে লোকটা নিজেই বোঝে; গায়ে তার ময়লা লাগে। আগুনের মতো রেগে গিয়ে রাবেয়ার পেটে লাথি মারে, সঙ্গে চলে আরবিতে গালি। রাবেয়ার পেটের ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে, কোনোভাবে উঠে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। লোকটার গালি কোনোমতেই থামছে না; রাবেয়া হারামি ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারছে না। নিজের কোনো দোষ রাবেয়া দেখছে না; বাইরে এসে কাঁদতে থাকে। ব্যথায় দুঃখে কষ্টে সবকিছুতেই কান্না আসে। সফেদ জীবনের আর কোনো আশাই রইল না। রাবেয়া ভেঙে পড়ে। জীবন চলে যায় গহিন অতলে।

বিকালের দিকে বাচ্চাদের নিয়ে আরবি মা ফিরে আসে। বাচ্চারা দরজার কাছেই বাইরের জামা খুলে রাখে। দৌড়ে চলে যায় ভেতরে। একটু পরেই রাবেয়ার ডাক পড়ে ঘরে। ওর সামনেই বিবি কাপড় খুলতে থাকে। রাবেয়ার পেটের ব্যথা এখনো যায়নি। রাবেয়া মাথা নিচু করে রাখে। রমাকে ডেকে আনে, হিন্দিতে জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে। রমা বলতে পারে না, ও দুপুরে রান্নাঘরে ছিল। রাবেয়া বলতে যায়, শেষ করতে দেয় না কথা। তার আগেই বিবি রেগে আগুন। ছোট দুটো কাপড় শুধু পরা ছিল, বাকি কিছু না পরেই জোরে জোরে চড় মারতে থাকে রাবেয়াকে। রাবেয়া দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে বসে পড়ে। তখন চলে লাথি, অনবরত লাথি মারতে থাকে রাবেয়াকে। তাঁর দু-একটা লাগে মুখে, রক্ত বেরিয়ে আসে। রমা ওকে টেনে নিয়ে ওদের ঘরে বসায়। রাবেয়া কিছুই বুঝতে পারছে না কেন এমন হচ্ছে। ওর দোষ কোথায়? কী পাপ করেছে জীবনে!

পাপপুণ্যের হিসাব যে রাখে, তাঁর বিচার রাবেয়া জানে না। মাথা গুঁজে কাজ করে যায়, কোনোদিকে তাকায় না। দেশে ফিরে যাবে ও। রাহুর থাবায় ঘৃণা এলেও মার খেয়ে শরীর পচাতে ইচ্ছে করে না। বিশেষ করে যেখানে ওর কারণটি জানা নেই। কেন ওরা মারছে? আরবিদের প্রতি চলে আসে ক্ষোভ আর ঘৃণা। ছোট বাচ্চা দুটোকে মনে হয় ইবলিশের বাচ্চা। সবাই এখানে হারামির বাচ্চা। প্রতিক্ষণেই রাবেয়া গালি দেয় আর মনে মনে থুতু ছিটায় ওদের গায়ে। রমাকেই শুধু মনে হয় মানুষ। খাবার দিতে গিয়ে দেরি করে ফিরলেও আর কিছু মনে হয় না। রমার ঘাম আর ক্লান্তির মুখ দেখেও রাবেয়ার আর কোনো প্রশ্ন আসে না।

দেশ থেকে আসার তিন মাস পরে রাবেয়া বিবির সঙ্গে মলে যায় বাজার করতে। সঙ্গে রমাও যায়। এই প্রথম বাইরে বেরিয়ে ওর ভালো লাগে। আগের মতো আর সাদা পাঞ্জাবি আর কালো বোরকা দেখে ওর বিশেষ কিছু মনে হয় না। বিশাল বিল্ডিংয়ে সবকিছু। একটি দোকানেই রাজ্যের জিনিস। বিবি দেখিয়ে দেয় আর রমা উঠাতে থাকে ট্রলিতে। যা সামনে পায় কিনতে থাকে। এত জিনিস দিয়ে কী করবে, রাবেয়া ভাবতে পারে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভরে ফেলে ট্রলি। তারপরেও বিবি এদিক সেদিক ঘুরতে থাকে। একসময় রাবেয়ার বাথরুমে যেতে ইচ্ছে করে। রমা দেখিয়ে দেয়।

বাথরুমে ঢুকে দেখে একজন মহিলা পরিষ্কার করছে। চারদিকে ঝকঝকে হলেও আবার পরিষ্কার করছে। চেহারাটা বাঙালি বাঙালি, জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশি কিনা। মহিলা জবাব দেয় সে বাংলাদেশ থেকে এসেছে। রাবেয়া আর কোনো কথা বলে না। হাউমাউ করে কেঁদে মহিলাকে জড়িয়ে ধরে বলে— আমাকে বাঁচান। আমি দেশে চলে যাব। এখানে থাকলে আমি মরে যাব। মহিলা ওকে সান্ত্বনা দেয়। তারপর আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে বাড়ি কোথায়, কবে এসেছে। রাবেয়ার কাছে সব শুনে মহিলা ওকে বোঝায়, এখানে প্রায় সবাই এরকম। ও কোথাও যেতে পারবে না। পাসপোর্ট যেহেতু ওর কাছে নেই। তবে খুব বেশি সমস্যা হলে ও পালিয়ে যেতে পারে। সে তাকে উপায় বলে দিতে পারে। ওর জানাশোনা কিছু মানুষ আছে। নিজের ফোন নম্বরটি রাবেয়াকে দিয়ে দেয়। যোগাযোগ করতে বলে।

বাড়ি ফিরে এসে রমাকে বলে ও পালিয়ে যাবে। রমা বলে পালিয়ে গিয়ে কোনো লাভ নেই। এ দেশের পুলিশ খুব কড়া। কেউ পালাতে পারে না। ধরতে পারলে জেল খাটতে হবে তারপর দেশে ফেরত পাঠাবে। রাবেয়া কিছু শুনতে চায় না। এই নরকে সে আর থাকবে না। উপায় খুঁজতে থাকে। পরের সপ্তাহে আবার বিবির সঙ্গে মলে যেতে পারে। সে মহিলার সঙ্গে কথা বলে, ও পালিয়ে যাবে। মহিলা এবার একটি ছেলের ফোন নম্বর দেয়। ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। রাবেয়া বাড়ি ফিরে এসে রমার ফোন থেকে ফোন করে। ওপাশে একটি ছেলের গলা শুনতে পায়। ছেলেটিকে ধর্মের ভাই বানিয়ে ফেলে। তার কাছ থেকে আশ্বাস পায়, রাবেয়ার কোনো অসুবিধা হবে না। এখানেই অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। পাসপোর্ট না থাকলেও চলবে। রাবেয়া ভরসা পায়। ও পাসপোর্টের হিসাব বুঝে উঠতে পারেনি। অনেকেই পারে না, যখন বুঝতে হয় তখন জীবন দিয়েই বোঝে।

রমা তারপরেও রাবেয়াকে বলে ধৈর্য ধরে থেকে যেতে। রাবেয়া পরে যায় দোটানায়। একদিকের টান একদিন ছিঁড়ে যায়। যেদিন দুপুরে সাহেব তার সমস্ত রাগ মিটায় রাবেয়ার উপর। সেদিন আর ওকে মারে না। কিন্তু রাহুর থাবায় আর কামড়ে ধপধপ করে জলে উঠে রাবেয়া। কিছু করতে পারে না-সিদ্ধান্ত নেয় যে করেই হোক ও পালাবে। ঘরে এসেই রমার ফোনটি চেয়ে নেয়। ছেলেটিকে ফোন করে। আর থাকতে পারবে না। সব খুলে বলে। ওপাশে ছেলেটির সহানুভূতিতেও সান্ত্বনা পায় না। ওকে পালাতেই হবে। ঠিক করে পরের বার মলে গেলেই ও পালিয়ে যাবে। ছেলেটিই সব ব্যবস্থা করে রাখবে। শুধু মলে যাওয়ার আগে রাবেয়া যেন ওকে ফোন করে আর বাড়ি থেকে টাকার বাইরে যেন আর কিছু না আনে। তাহলে ধরা পরে যাবে।

সুযোগের অপেক্ষায় দিন কাটতে থাকে। মুক্তির প্রহর গুনতে থাকে। পালিয়ে কোথায় যাবে রাবেয়া জানে না; এ নিয়ে কিছু ভাবতে পারে না। এখান থেকে চলে যেতে পারলেই যেন মুক্তি। দুসপ্তাহ পর আবার মলে যায়। সঙ্গে করে নিয়ে যায় যেটুকু টাকা জমেছিল। বিবিকে বলে বাথরুমে যায়। সেখানে আগেই একটি কালো বোরকা রেডি করা ছিল। রাবেয়া বোরকাটি পরে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বাথরুমের বাইরেই একটি ছেলে ওর পেছনে পেছনে হাঁটতে বলে। দ্রুত পা ফেলতে থাকে, সবাই যেন বুঝে গেছে ও পালিয়ে যাচ্ছে। পা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে; ঠিক ভাবে পা ফেলতে পারছে না। মলের বাইরে একটি পুরোনো গাড়ি। ওতে উঠে পরে দুজনেই। ছেলেটি নিজের পরিচয় দেয় এবার। ওর নাম আফজল। বাড়ি চিটাগাং। রাবেয়াকে বলে আর ভয় নেই। গাড়িটি বাজারের কাছে আসে। রাস্তার দুধারে মানুষ আর মানুষ। আফজল বলে এরা সবাই বাঙালি। বাংলাদেশের এত মানুষ এখানে, রাবেয়ার ভয় কমে যায়।

একটি ছোট ঘরে এসে উঠে আফজল আর রাবেয়া। একটি বড় বিল্ডিংয়ে ঘিঞ্জি-মতো অনেকগুলো ঘর। ঘরটিতে দুটো লোহার খাট। রাবেয়াকে বলে বাইরে যেন না বেরোয়। পুলিশে ধরতে পারলে জেলে নিয়ে দেশে ফেরত পাঠাবে। এবার রাবেয়ার ভয় লাগে। ও বাড়ি থেকে বের হলেই মুক্তির যে ভাবনাটা ছিল তা এক দণ্ডেই পানসে হয়ে যায়। আফজল ওকে রেখে বাইরে গিয়ে রুটি আর ডাল কিনে আনে। ফিরে এসে দেখে রাবেয়া কাঁদছে। আফজলকে দেখা মাত্র রাবেয়া পা জড়িয়ে ধরে— ভাই, আমাকে দেশে ফেরত পাঠাও। তুমি আমার ধর্মের ভাই। আমার সব টাকা তোমাকে দিয়ে দিলাম।

বলেই টাকাগুলো আফজলকে বের করে দেয়। আফজল বিচলিত হয় না। এ পেশায় অনেকদিন ধরে আছে। অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে পাসপোর্ট ছাড়া কিছু হবে না। আর বাইরে বেরোলেই পুলিশে ধরবে। রুটি আর ডাল খেতে বলে আফজল আবার বেরিয়ে যায়।

রাবেয়া কান্না থামাতে পারে না। ওর জীবনে আর কিছু নেই এই সত্যটি কেন যেন মনের কোণে পৌঁছে গেছে। কেঁদে কেঁদে মেঝেতেই শুয়ে পড়ে ঘুমিয়ে যায়। দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। প্রথমে বুঝতে পারে না কোথায় আছে। টের পেয়ে কাপড় ঠিক করে নেয়। দেখে আফজল না, আরেকজন এসেছে। রাবেয়া তার পরিচয় জিজ্ঞেস করে। লোকটা বলে সে এ ঘরেই থাকে। আফজলের বন্ধু মানুষ। লোকটা আর কিছু না বলে কাপড় খুলে লুঙ্গি পরে। বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আসে। রাবেয়া জিজ্ঞেস করে আফজল কখন আসবে। লোকটা উত্তর দেয় না। অনেক দিনের বুভুক্ষু মন আর অতৃপ্ত আত্মা উপরি উপরি শুষে নেয় আরেকটি মানুষের প্রাণের শেষ বিন্দুটুকু। রাবেয়া অচেতনের মতো পড়ে থাকে মেঝের উপর। ওর কোনো অনুভূতি নেই, জীবন নেই। সবকিছু হারিয়ে গেছে; নিজে শুধু পরে আছে ভাগাড়ে। মায়ের কথা মনে পরে সঙ্গে দুচোখ বেয়ে চলে অশ্রুধারা, বিরামহীন অশ্রুধারা।

এ ঘরে রাবেয়া আরও তিনদিন আটকা পরে ছিল। তিনদিনের থাকা আর খাবারের জন্য কোনো টাকা দিতে হয়নি। উপরন্তু তিনশ দিরহাম পেয়েছে। ও দিরহাম চায় না। যেই এসেছে তারই পা ধরে কেঁদেছে, তাকেই সব দিরহাম দিয়ে দিতে চেয়েছে, যত রকম খুশি করে দিতে চেয়েছে— শুধু একবার যেন ওকে দেশে ফেরত পাঠায়। তাতে কোনো কাজ হয়নি। কেউ জানে না পাসপোর্ট ছাড়া কীভাবে দেশে পাঠাতে হয়। তিনদিন পরে রাবেয়ার অজান্তে দশ হাজার দিরহামের একটি বিকিকিনি হয়। আদিম প্রয়োজনে মানুষের কেনাবেচার বাজার এখনো আগের মতোই আছে— দাম হয়তো আগের তুলনায় বেড়েছে।

আফজল রাবেয়াকে বোঝায় কিছু টাকা নিয়ে দেশে ফিরে যেতে। এক বছরেই অনেক টাকা হবে। টাকা হলেই ও চলে যাবে। রাবেয়ার মতো আরও মেয়ে আছে। ওদের ভিসা নেই, সঙ্গে পাসপোর্ট নেই। তাতে কিছুই যায় আসে না। আফজল সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। টাকা বেশি বলে ওরা বাড়িতে কাজ করার চেয়ে এ কাজেই ভালো আছে। কোনো ঝামেলা নেই। প্রতিদিন টাকা আসবে, কোনো খরচ নেই, খাবারও এমনিই চলে আসবে। রাবেয়া বুঝতে পারে না, ও দেখে গার্মেন্টসের অন্ধকার ঘর, মিথির খাবার দিতে গিয়ে দেরি করা, বিবির সেজে বাইরে যাওয়া…। ও দেশে ফিরে যেতে চায়। এই প্রথম মরুর বালু রুক্ষ মনে হয়। মরুতাপ রাবেয়াকে স্পর্শ করে। মরু বালু গরম বাতাসে উড়তে উড়তে ধুলাঝড় হয়ে রাবেয়াকে ঘিরে রাখে। রাবেয়া নিঃশ্বাস নিতে পারে না, চোখে দেখতে পারে না। গরম বালু এসে চামড়া ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। শেষবারের মতো আফজলের পা জড়িয়ে ধরে। ধর্মের ভাই বলে কাঁদতে থাকে, ওর পা ছাড়ে না।

আফজল রাবেয়াকে পুলিশের নানা কথা বলে আরেকটি গাড়িতে তুলে দেয়। বলে দেয় সেখানে ও ভালো থাকবে। ওর কথায় রাবেয়া আর ভরসা পায় না। নিরুপায় জেনে গাড়িতে উঠে বসে। অনেক ঘুরে ঘুরে আরেকটি বাড়ির সামনে আসে। এ বাড়ির চারদিকে বালু, কোনো গাছ দেখা যায় না। অনেক দূরে দূরে লাইট। রাবেয়ার গা ছমছম করে উঠে। কিছু ভৌতিক ওর জন্য যেন অপেক্ষা করছে। দোতলায় উঠে একটি ঘরে নিয়ে যায় রাবেয়াকে। ঘরটির মাঝে ছোটছোট পর্দা দিয়ে ভাগ করা। ঘরে ঢোকা মাত্র নানা শব্দ আসতে থাকে, এ শব্দ রাবেয়ার পরিচিত। রাহুর হাড় জিরজিরে থাবা যেন নিমেষে নিমেষে বুক চিরে রক্ত মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। পর্দা ঘেরা একটি আধা অন্ধকার ভাগে রাবেয়াকে রাখে। ঢোকা মাত্র রাবেয়া বমি করে ফেলে। সমস্ত জীবনের গ্লানি আর নোংরা সবকিছু যেন বেরিয়ে আসতে চায়। রাবেয়া সবকিছু বের করে দিতে চায়। পারলে জীবনটাও বের করে দিত। পারে না, চিৎকার দিয়ে গালি দিয়ে উঠে সঙ্গের মানুষটি।

রাবেয়ারা চারজন এ ঘরে থাকে। কেউই বেরোতে পারে না। পুলিশে ধরে নেবে। কিন্তু কতদিন এখানে থাকবে, পুলিশে ধরলেই যে ভালো তা কেউই ভাবতে পারে না। ঘরের ভেতরে ছোট একটি বাথরুম। ঘরের বাইরে ওরা বেরোতে পারে না। ভোর রাতের দিকে রাবেয়ারা ছাড়া আর কেউ থাকে না। পরদিন বিকাল পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা খুব কম। এসময়ে ঘরের মালিক ওদের জন্য খাবার নিয়ে আসে। অবসরে সেও মিটিয়ে নেয় তার প্রয়োজনটি। রাবেয়ারা লোকটির সঙ্গে কথা বলে না। ওদের চোখে সে একটি মূর্তিমান শয়তান। টাকার বাইরে সে কিছুই বোঝে না— সে ঠিকই পারবে তার মা আর মেয়েকে একইভাবে আটকে রাখতে। লোকটি চলে গেলে নিজেরা বসে কাঁদে, উপায় খুঁজে দেশে ফেরার। এ দুর্বিষহ জীবন আর বয়ে বেড়াতে পারে না।

ওদের রক্ত-মাংস শেষ হয়ে গেছে কবে তা নিজেরাও বলতে পারে না। হায়েনারা আসে শুকনা পাঁজরের হাড়গুলো নিজের লালায় ভিজিয়ে চেখে নিতে। একটি দুটি হায়েনা না, অজস্র। বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, নেপাল… কত দেশ, কত জাত, কত ধর্ম; কিন্তু এ ঘরে এসে সবাই হয়ে যায় হায়েনা। খাদ্যহীন শুকনো মরুর ভুবুক্ষু হায়েনা। বহুদিনের অপ্রাপ্তির পুরোটা একেবারে পুষিয়ে নিতে চায় বিশ দিরহামে। পাছে কিছু বাকি থাকে তাই উলটেপালটে টেনে-হিঁচড়ে দেখে কোথাও একবিন্দু রস আছে কিনা। ওদের কাতর গোঙ্গানিতে এদের পুলক জাগে, প্রাণ যেন খুঁজে পেল। হামলে পরে খুবলে আনতে চায় সে প্রাণ। প্রাণ পায় না, খুঁজে পায় মরুর রসহীন শুকনা বালু।

রাবেয়ারা হয়ে গেছে ছিঁড়ে ফাড়া পুরোনো চটের বস্তার মতো। ওদের কোনো অনুভূতি নেই; আছে শুধু জ্বলুনি। কিছু লাগলেই মরিচের মতো জ্বলতে থাকে। একটু খাবার আর অন্ধকার জীবনের ভ্যাপসা ক্লান্তিতে প্রাণটুকু ধুঁকে ধুঁকে মরে। ঘরের মালিক দিন শেষে পঞ্চাশ দিরহাম দিত প্রথম দিকে। এখন সেটা ঠেকেছে বিশ দিরহামে। এ নিয়ে কথা হলে লোকটি পাগলা কুকুরের মতো ঘেউঘেউ করে ওঠে। খিস্তির পর খিস্তি দিয়ে বলতে থাকে ঘর ভাড়া, খাবার খরচের কথা।

রাবেয়ার ইচ্ছে করে লোকটিকে একদিন মেরে ফেলবে। হাতের কাছে কিছু পায় না। মারতে না পারলেও একবার কামড় দিয়ে এক খাবলা মাংস তুলে ফেলতে ইচ্ছে করে। লোকটা হয়তো এটা টের পেয়ে গেছে। প্রয়োজন মেটাতে সে রাবেয়ার কাছে আসে না। শুক্রবারে জুমার পরে লোকটি সবার জন্য বিরিয়ানি আর বড় এক বোতল কোক দিয়ে যায়। রাবেয়া শুধু সেদিনের খাবার খায় না। লোকটির প্রতি ঘৃণার প্রকাশ ঘটায় নিজের উপবাসে। একটি বেলার জন্য হলেও রাবেয়ার নিজেকে মানুষ মনে হয়। ঘরের বাকিরাও তখন রাবেয়াকে ভয় পায়। নারীর প্রতিহিংসার রূপটি সর্বজনীন আর স্পষ্ট।

ভোরে গোসল করে এসির ঠাণ্ডায় রাবেয়ার জ্বর আসে। কাউকে ওর ভাগে ভিড়তে দেয় না। ঘরের মালিক যায় জ্বর দেখতে। ওর ধারণা ছিল রাবেয়া ফাঁকি দেওয়ার জন্য জ্বরের কথা বলছে। লাল টকটকে চোখে রাবেয়া অনবরত গালি আর অভিশাপ দেয়। লোকটি অভিশাপে ভয় পায় না, ভয় পায় রাবেয়ার জ্বলন্ত মূর্তিটিকে। দ্রুত নেমে যায়। জ্বরের জন্য এক পাতা প্যানাডল অন্য একজনের কাছে দিয়ে যায়। রাবেয়ার জ্বর কমে না। ওষুধে কাজ হয়নি। ঘরের মালিক নিজেই একটি এন্টিবায়োটিক কোর্স দিয়েছে তাতেও জ্বর কমছে না। মরে গেলে ঝামেলা বাঁধবে। তাই একদিন ওকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। নামিয়ে দেয় গেটে, বলে গাড়ি পার্ক করে আসছে। ভেতরে ঢুকে অপেক্ষা করতে থাকে। কেউ আসে না। জ্বরে গা পুড়ে যায়, বসে থাকতে পারে না। শুয়ে পড়ে চেয়ারে। প্রলাপ শুনে একজন এগিয়ে আসে, রিসেপশনে খবর দেয়। ওরা এসে জিজ্ঞেস করতে থাকে পরিচয়, কী হয়েছে। রাবেয়া কিছু বলতে পারে না। কার্ড চায় তাও দেখাতে পারে না। কোমরে গোঁজা কিছু টাকা ছাড়া ওর কাছে কিছুই নেই। নিয়মের বশে হাসপাতাল পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ দেখে রাবেয়ার কোনো ভয় হয় না। ওর কিছু ভয়ের নেই, ভাবনার নেই। পড়ে আছে একটি দেহ। এত জ্বরের মাঝেও জানে এ জগতে দেহটির খুব প্রয়োজন। দেহটি যেন একটি নদীর মতো, গড়ে উঠতে সময় বহু নেয়। শুরু হয় প্রাণের সঞ্চার। দুপাশে জেগে উঠে নানা বৃক্ষলতা। প্রাণে ছেয়ে যায় চারধার। তারপর যেন একটি হঠাতের ভূমিকম্পে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। জহ্নু মুনির মতো শুষে নেয় সব জল। চারিদিকে জেগে উঠে থকথকে কাদা। যেটুকু বা প্রাণ ছিল, পানি নেই বলে পচে উঠে গলে যায়। পুতিগন্ধে ভরে উঠে বাতাস।

বারো দিন হাসপাতালে ছিল। এখন একটু উঠে বসতে পারে। সকালে পুলিশ এখানে এনে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে দিয়ে গেছে। রাবেয়ার শীত লাগছে। দুটো চাদর গায়ে জড়ানোর পরেও ঠাণ্ডা লাগা কমছে না। পাসপোর্ট ওর হাতে নেই। প্লেনে উঠলে তারপর পাসপোর্ট হাতে পাবে। আজ ঢাকায় চলে যেতে হবে। গত দেড় বছরে কত কেঁদেছে কতজনের পা ধরেছে ওকে দেশে পাঠানোর জন্য। দেশে গেলেই যেন ও মুক্ত হয়ে যেত। আজ ও দেশে যাচ্ছে, মুক্তির জন্য নয়। দেড় বছরে তিলে তিলে পেয়ে গেছে মুক্তি। কোথাও যে আর বন্ধন নেই! আরবি দেশে ওর কাজটি শেষ হয়ে গেছে। কোথাও ওর আর কোনো প্রয়োজন হবে না। এত বড় পৃথিবীর সবটুকুই প্রয়োজনের মাপে, অপ্রয়োজনের দাবি করার যে কিছুই নেই!

রাবেয়াদের জীবনে আর কোনো মায়া নেই, কোনো চাওয়া নেই। মানুষের সবকিছু ওরা দেখেছে নিরাভরণ। ওদের কাছে আর কেউ কিছুই লুকাতে পারবে না। সবকিছুর অতলে নেমে দেখেছে মানুষের রূপ আর জীবনের চাহিদা। কলুষ আর পঙ্কিলতায় থেকেই জেনেছে পরম সত্য। মানুষের অতৃপ্ত আত্মা জগতের অন্য বুভুক্ষু প্রাণীর মতোই হামলে পড়ে খুবলে আনে যা প্রয়োজন। ধর্ম, সমাজ, ভদ্রতাবোধ… সবই যেন নীরব দর্শক হয়ে যায়; হার মেনে যায় জীবনের অন্ধকারে বড় হওয়া পিশাচ রূপটির কাছে। কারওই যেন কিছু করার নেই।

অতল অন্ধকূপে জীবনটি কাটিয়ে;

আলো কী? প্রশ্নটি তার জাগে একবার!

সবকিছু দেখে বুকফাটা আর্তনাদে;

কেন? খুব জানতে ইচ্ছে করে আমার!!

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

নূতন প্রেমে ভোর

Read Next

জেগে থাকো পূর্ণিমা : সমাজ বাস্তবতার আখ্যান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *