অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
এপ্রিল ৫, ২০২৫
২২শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
এপ্রিল ৫, ২০২৫
২২শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

হোজাইফা হোসাইন -
আলোর মিছিল

দৃষ্টি যেন তার দূর সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ছে তার দৃষ্টির শেষ সীমানায়। পাখিদের সাথে তার জীবনের অদ্ভুত একটা মিল রয়েছে। পাখি যেমন আকাশে মুক্ত, স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ায় ঠিক তেমনি রাফির জীবন। সে এই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিচরণ করে দিগবিদিক। সে স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যৌবনের টগবগে রক্ত প্রস্ফুটিত হচ্ছে তার শিরায় শিরায়। এই বয়সে কি কভু শৃঙ্খলা, পরাধীনতা মেনে নেওয়া যায়? কিন্তু তার বাবা রায়হান আহমেদ সেটা বুঝতে চান না। তিনি অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক। নিজের সারাটি জীবন ব্যয় করেছেন একটি আলোকিত জাতি গড়তে। যারা জ্ঞানগরিমায় দেশকে করবে সমুন্নত। এই মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়ে রায়হান সাহেব নিজেকে একজন গর্বিত মানুষ মনে করেন। কিন্তু রাফির কাছে এসব গর্বিত কিংবা লজ্জিত হওয়া কোনো মুখ্য বিষয় নয়। সে তার নিজের মতো জীবনকে উপভোগ করতে চায়। কিন্তু তার সেই চাওয়ার মাঝে একমাত্র বাধা তার বাবা। এটা নিয়ে অবশ্য তার বিরক্তির অন্ত নেই। রাফি কেবলই প্রহর গুনছে কবে তার বাবা মারা যাবেন আর সে শান্তিতে এই পৃথিবীর প্রতিটি পথে বিচরণ করতে পারবে। থাকবে না বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া। যখন খুশি বাড়ি ফিরলেও কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না এমন একটা জীবনের স্বপ্নই তো সে দেখে এসেছে এতদিন। এসব ভাবতে ভাবতেই দ্রুত পায়ে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশে হাঁটছে রাফি। সে আপনমনে বিড়বিড় করে বলছে, কতদিন বলেছি একটা বাইক কিনে দাও। শুনো না। এই যে এখন হেঁটে যেতে হচ্ছে। একটু দেরি হলেই আবার কত কাহিনী করবে। সারাদিনের জন্য পকেট খরচই দাও কত টাকা?

এই টাকা দিয়ে বন্ধুদের সাথে ভালো করে পার্টিই তো করা যায় না। বিরক্তিমাখা মুখে নিজে নিজেই এসব বলে বাড়ি ফিরল রাফি। ঘরের ভেতর প্রবেশ করতেই তার নজরে পড়ল রায়হান সাহেব একটি চেয়ারে হেলান দিয়ে পুরোনো পত্রিকায় মুখ গুঁজে আছেন। রাফি তার সাথে কথা বলবে নাকি বলবে না সেটা মনস্থির করতে পারছে না। এমন সময় রায়হান সাহেব মুখের সামনে থেকে পত্রিকা সরিয়ে কয়েকবার ঝাঁকিয়ে কাশি দিলেন। গলা পরিষ্কার করার পর তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, সারাদিন কোথায় ছিলে, রাফি?

প্রশ্নটি শুনেই রাফির মাথায় যেন বিদ্যুৎ ছুটে গেল। কিন্তু রাফি তার রাগকে দমন করে বলল, দেখ বাবা, আমি প্রাপ্তবয়স্ক একজন ছেলে। তুমি আমার উপর এভাবে সর্বক্ষণ অধিকার ফলাতে পারো না। আমার নিজস্ব একটা জীবন আছে। সেটাকে আমার মতোই চালাতে দাও। তাছাড়াও বাসায় ফেরার সময় তো রাত ৮টা পর্যন্ত। এখন ৮টা ১০ বাজে। এই মাত্র দশ মিনিট দেরি হওয়ার জন্য যদি তুমি আমাকে ফাঁসি দিতে চাও? তবে তাই দাও!

রায়হান সাহেব ছেলের কথায় কষ্ট পেলেন কিনা বোঝা গেল না। কিন্তু তিনি মুখে বিষণ্নতার হাসি এনে বললেন, আমি তো তোমার জীবনে কোনো অধিকার ফলাচ্ছি না। বাবা হিসেবে শুধু আমার দায়িত্ব পালন করছি। তোমার মা মারা যাওয়ার পর আমিই তোমাকে নিজ হাতে বড় করেছি। আমি সবসময় স্বপ্ন দেখতাম আমার ছেলে আমার মুখ উজ্জ্বল করবে।

বাকি কথা বলার আগেই রাফি বিরক্তির কণ্ঠে বলল, তোমার লেকচার শুনতে এখন ভালো লাগছে না, বাবা। আমি ক্লান্ত আমাকে বিশ্রাম নিতে হবে। দয়া করে মাফ কর এখন।

রায়হান সাহেব বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে বাদ দাও। কিন্তু একটা কথা বল তো। তুমি কী এখন মেয়েদেরও বিরক্ত করা শুরু করেছ? পাশের বাসার রহিম সাহেবের মেয়ে কলেজে যাওয়ার সময় নাকি তুমি তাকে আজে-বাজে কথা বলেছ?

রাফি বাবার মুখে এই কথা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে অপ্রস্তুত অবস্থায়ই বলল, আমি কাউকে বিরক্ত করিনি। আমি মারিয়াকে ভালোবাসি বাবা। কলেজে যাওয়ার সময় সেটাই বলেছিলাম। অনেকদিন ধরেই তাকে ভালোবাসি কিন্তু আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না। তাই আজকে যাওয়ার সময় আবারও বলেছি। ভালোবাসার কথা বলা কী অপরাধ, বাবা?

রায়হান সাহেব চোখ থেকে চশমা খুলতে খুলতে বললেন, সত্যি বলতে জানো কী, রাফি? নিজেকে আমার এখন পৃথিবীর সর্ব-নিকৃষ্ট বাবা মনে হয়। তোমাকে ছোটবেলা থেকে যে শিক্ষা দিয়ে বড় করেছি সেটাই যখন ভুলে গিয়েছ এখন আর নতুন করে কোনো শিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছাও নাই। কিন্তু একটা মেয়েকে ভালোবাসার নামে বিরক্ত করা কী মানায়? তুমি কাউকে পছন্দ করতেই পারো। তাকে বিয়ে করার অধিকারও আছে তোমার। কিন্তু মেয়েটা যদি রাজি না হয় তাহলে তোমার কোনো অধিকার নেই। তোমার যদি আজ একটা বোন থাকত, যদি রাস্তাঘাটে বিভিন্ন ছেলেরা তাকেও ভালোবাসার নামে বিরক্ত করত তাহলে তুমি কী করতে?

রাফির যেহেতু বোন নেই তাই সে বোনের কথাও ভাবতে চেষ্টা করছে না। এসব ভাবনা তাকে বিরক্ত করে। রায়হান সাহেবের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে রাফি সোজা উল্টোপথে বাইরের দিকে হাঁটা ধরল। পেছন থেকে রায়হান সাহেব কয়েকবার ছেলেকে বৃথা ডাকার চেষ্টা করলেন। কিন্তু রাফি সেদিকে একবারও ফিরে তাকাল না। রাফি যাচ্ছে তাদের আড্ডা দেওয়ার বিখ্যাত সেই জায়গায়। ঘন ঝোপঝাড়ের ভিতর লম্বা একটি ব্রিজের উপর মধ্যরাত পর্যন্ত চলে তাদের আড্ডা। যদিও রাফি সেই আড্ডাতে একদিনও শামিল হতে পারে না তার বাবার জন্য। তার বাবার কড়া নির্দেশ রাত আটটার মাঝে বাসায় থাকতে হবে। বাবার নির্দেশ মানতে তার ভালো লাগে না। তাই আজ বাবার সাথে তর্কের সুযোগে রাগকে ব্যাবহার করে সে বাইরে চলে এসেছে। মনে মনে বাবার বোকামির জন্য রাফির খুব হাসি পাচ্ছে। সে ভাবছে বাবা যদি তর্ক না করত তাহলে তো আজকে সে বাইরে আসতে পারত না রাগের ভান করে। তর্ক চালিয়ে নেওয়ার জন্য বাবাকে রাফির ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটি সম্ভব নয়। এখন পুনরায় বাসায় বাবাকে ধন্যবাদ দিতে গেলে সে আজকে আর বের হতে পারবে না এটা খুব ভালো করেই অনুধাবন করে রাফি।

রাফিকে আড্ডাখানায় দেখে তার বন্ধুদের রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা হলো। রাফির বন্ধু সিয়াম সিগারেটে টান দিতে দিতে বলল, কী রে দোস্ত। আজকে তুই এখানে? তোর বাবা টপকে গিয়েছে নাকি?

রাফি বলল, না রে দোস্ত। বাবার কিছু হয়নি। আজকে ঝগড়ার সুযোগ নিয়ে চলে এসেছি।

সিয়াম বলল, ভালো করেছিস, দোস্ত। সিগারেট খাবি? নে সিগারেট খা।

রাফি আনন্দ চিত্তে বলল, ভেতরে জিনিসপাতি আছে?

সিয়াম রাফির পিঠ চাপড়ে বলল, হ্যাঁ আছে রে, দোস্ত। এক টানেই পিনিক উঠে যাবে। আমার জীবনে খাওয়া সেরা গাঁজা এটি।

সিয়ামের কথা শুনে রাফি পাগলের মতো সিগারেটে টান দিতে শুরু করল। রাফির কাছে মনে হচ্ছে সিগারেটের ধোঁয়াগুলো যেন তার বাবার উপদেশবাণী। ধোঁয়ার মতো তার বাবার সমস্ত উপদেশবাণীও সে এভাবে ফুঁ দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে ক্রমাগত। এমনি করেই তাদের আড্ডা চলল মধ্যরাত পর্যন্ত। আড্ডা শেষে রাফি বাসায় চলে এল। বাসায় আসতেই তার চোখ রীতিমতো কপালে ওঠার অবস্থা। সে মানসিকভাবে প্রস্তুতই হয়ে এসেছিল আজকে তাকে বারান্দায় রাত কাটাতে হবে। কিন্তু সে স্বপ্নেও ভাবেনি এসে ঘরের দরজা খোলা পাবে। সাধারণত আমাদের মন যেটা কল্পনাও করতে পারে না সেটাই ঘটলে ভালো কিছু হলে আমরা খুশি হই, খারাপ কিছু হলে আতঙ্কিত হই। রাফির ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। তার মনে ভয় কাজ করছে। এরকম অস্বাভাবিক ঘটনার কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। ভয়ে ভয়ে রুমের ভেতরে ঢুকল। রায়হান সাহেবের রুমের দিকে একবার উঁকি দিল সে। দরজা ভেতর থেকে লক করা। রাফি আর কিছু না ভেবে নিজের রুমে চলে গেল। সে এখন মনে মনে বেশ খুশি হচ্ছে এই ভেবে যে, তার বাবা আজ ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাই তাকে আজ আর বকাও দিতে পারবেন না বা নিরর্থক উপদেশবাণীও শোনাতে পারবেন না।

রাফি নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ার সাথে সাথেই চমকে উঠল। হালকা সাউন্ডে রায়হান সাহেবের কণ্ঠ ভেসে আসছে তার কানে। রাফি রুমে লক্ষ করে দেখল সেখানে ছোট একটি সাউন্ড বক্স রাখা। যেটা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তার বাবার রুম থেকে। রায়হান সাহেব বাঘ-হরিণের গল্প বলছে। কিন্তু এসব গল্প শোনার বয়স কি এখন রাফির আছে?

রাফি বিরক্ত হয়ে কয়েকবার রায়হান সাহেবের দরজায় নক করল। কিন্তু রায়হান সাহেব কোনো প্রতি উত্তর করলেন না। রায়হান সাহেব যে পাগল হয়ে গিয়েছেন সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না রাফির। কিছুক্ষণ পরেই রাফির মনযোগ আটকে গেল রায়হান সাহেবের কথায়। তিনি বলছেন, হরিণটি দল বেঁধে থাকতে পছন্দ করল না। সে হরিণের দল থেকে আলাদা হয়ে একা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। এভাবেই দিন যায়। স্বাধীনতাকামী হরিণটি মনের আনন্দে বনে বেড়াতে থাকে একা একা। কিন্তু হঠাৎ একদিন হরিণটি তার সামনে বিশাল আকৃতির একটি বাঘকে আবিষ্কার করে। বাঘকে দেখেই হরিণটি প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল। দৌড়ানোর সময় তার মনে কেবল পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো ক্রমান্বয়ে উঁকি দিচ্ছে। যখন সে দল বেঁধে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত অন্যসব হরিণের সাথে। তখন কোনো শিকারি প্রাণী তাদের আক্রমণ করার চেষ্টা করলে সবাই মিলে বেঁচে থাকার চেষ্টা করত। কিন্তু আজ সে একা। বড় একা। বাঘের হাত থেকে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করার মতো কেউ নেই। হরিণটি তখন আক্ষেপ আর আফসোসের সাথে পৃথিবী থেকে বিদায় নিল বাঘের শিকার হয়ে।

রাফি এবার কথাগুলো পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শুনছে। রায়হান সাহেব বলেই চলেছেন, পৃথিবীতে স্বাধীনতা, মুক্তি আমাদের সবারই কাম্য। কিন্তু এমন স্বাধীনতা কখনোই আমাদের চাওয়া উচিত নয়, যেটা আমাদের একা করে দেয়, নিঃস্ব করে দেয়। পরিবার হলো পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর জিনিস। বিশ্বাস, ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন পরিবার। তাই এমন মুক্তি আমাদের কখনোই চাওয়া উচিত নয় যা আমাদের পরিবার থেকে আলাদা করে দেয়। এটা প্রকৃতির নিয়মবিরোধী। পুরো পৃথিবীটাই একটি নিয়মের অধীন। আমরা যদি সেই নিয়ম ভাঙি তবে হরিণের মতো একা, নিঃস্ব অবস্থায় আমাদের মৃত্যুবরণ করতে হবে।

শেষের দিকে এই কথাগুলো রাফিকে যেন ঘুমের সাথে স্বপ্নের দেশে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাফির স্বপ্নেও তখন বাঘ, হরিণ খেলা করছে। স্বপ্নের ঘোরে চোখের পাতাগুলো মৃদুভাবে নড়ছে অবিরত। ক্রমান্বয়েই তার চোখগুলো ভারী হয়ে আসছে। চোখগুলো স্বপ্নের ঘোরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে রাফিকে।

সকাল বেলা ঘুম ভাঙতেই রাফি চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল। তার কেবলই মনে হচ্ছে সে যেন এক জগৎ থেকে আরেক জগতে প্রবেশ করেছে। সেই জগতে অন্ধকার নামে না। কালো মেঘ কখনো সেই জগতে বাসা বাঁধে না। সেই জগতের আকাশজুড়ে কেবলি চাদের আলো বিরাজমান থাকে অবিরত। ঘুম থেকে উঠেই রাফি তার বাবাকে খুঁজতে শুরু করল। ছোটবেলার পর এই প্রথম সে তার বাবাকে খুঁজছে। কিন্তু পুরো বাড়ির কোথাও তার বাবাকে দেখতে পেল না। রায়হান সাহেব হয়তো সকাল সকাল উঠে একটু বাইরে গিয়েছেন এমনটা ভেবে নিজের রুমে চলে এল রাফি। রুমে আসতেই তার টেবিলের উপর সাদা কাগজে ভাঁজ করা একটি চিরকুট নজরে পড়ল। রাফি চিরকুটটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল—

প্রিয় রাফি,

যেদিন তোমার জন্ম হয়েছিল সেদিন আমি কী পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম তুমি জানো না। বাবা হওয়ার মুহূর্তটা যে কেমন সেটা তুমি নিজে বাবা হওয়ার আগে কখনোই অনুধাবন করতে পারবে না। একজন বাবার সামনে তার ছেলে ধ্বংসের পথে দাঁড়িয়ে থাকলে, বাবাকে প্রতিনিয়ত অপমান করতে থাকলে সেই বিষাদময় অনুভূতিটাও বাবা হওয়ার আগে তুমি কখনোই বুঝতে পারবে না। তোমার মা মারা যাওয়ার পর কত যত্ন করে তোমাকে আমি বড় করেছি। অথচ আজ সেই তুমিই ভুল পথে হাঁটছ অবিরত। একজন বাবা হিসেবে তোমার সেই পথে আমি সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। তোমার থেকে বারবার অপমানিত, অপদস্থ হয়েও আমি সর্বদা তোমার ভালোর জন্যেই কথা বলেছি। কিন্তু আজ থেকে বৃথা সেই চেষ্টা করব না আর। একজন ব্যর্থ বাবা হিসেবে নিজেকে মেনে নিয়েছি আমি। কিন্তু চলে যাওয়ার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও আমি তোমাকে একটি উপদেশ দিয়ে যাই— কখনোই প্রযুক্তির দাস হয়ো না। প্রযুক্তিকে সর্বদা নিজের জন্য কাজে লাগাও। যেমনটা আমি গতকাল রাতে কাজে লাগালাম তোমাকে গল্প শুনিয়ে। তুমি তখনই পৃথিবী জয় করতে পারবে যখন তুমি প্রযুক্তিকে শাসন করতে পারবে। জীবনে চলার পথে বন্ধু গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ। কিন্তু যখন তুমি অনৈতিক বন্ধুদের সাথে চলতে শুরু করবে, তাদের সাথে নেশায় আসক্ত হয়ে যাবে তখন তোমার ধ্বংস অনিবার্য। নেশা-জাতীয় সবকিছুই আমাদের ধর্মেও যেমন হারাম তেমনি তোমার শরীরের জন্যেও ক্ষতিকর। আমার ছেলে একজন নেশাখোর হয়ে বেড়ে উঠবে সেটা বাবা হিসেবে কখনোই আমি মেনে নিতে পারব না। তাই তো আজ বিদায় নিচ্ছি তোমার জীবন থেকে। জানি আমাকে কখনো তোমার মনে পড়বে না। কিন্তু তোমাকে আমার খুব মনে পড়বে। আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন যে তুমি। সেই স্মৃতিচিহ্ন ছেড়ে যেতে আমি বাধ্য। আমার একটাই আফসোস, কত ছেলে-মেয়েকে সুশিক্ষা দিলাম অথচ নিজের সন্তানকেই দিতে পারলাম না। তোমার পতন দেখার চেয়ে দূরে কোথাও তুমি হয়তো ভালো হয়ে গিয়েছ এই আশায় বেঁচে থাকাই আমার জন্য স্বস্তিদায়ক। তাই তো চলে গেলাম। তোমার জীবন নক্ষত্রপূর্ণ পূর্ণিমা রাতের চাঁদের মতোই আলোকিত হোক সেটাই চাই আমি।

ইতি—

তোমার ব্যর্থ বাবা

চিঠিটি পড়তে পড়তেই রাফির চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। চিঠির সাদা কাগজে বৃত্ত তৈরি করছে। এদিকে রাফির বন্ধু সাইফ একটানা ফোন দিয়েই যাচ্ছে। রাফি অস্পষ্ট চোখে একবার সেদিকে তাকাল। বন্ধুর ডাক আজ আর তাকে আকর্ষিত করছে না। তার অশ্রুসিক্ত নয়নে কেবলই বাবার অবাধ্য হওয়ার দিনগুলোর কথা ভেসে উঠছে বারবার। বাবার আকাঙ্ক্ষা এখন যেন খুব করে কাছে টানছে তাকে। চোখের অশ্রুতে তৈরি হওয়া চিঠির বাজের বৃত্তগুলোতে রাফির চোখ ক্রমাগত ঘন হয়ে আসছে। অশ্রুজল দিয়ে তৈরি সেই বৃত্ত যেন তার বাবার প্রতীক্ষিত সেই বৃত্ত। সেই বৃত্তের মাঝে ঘোরের মাথায় রাফি হঠাৎ দেখতে পেল, বৃত্তটা যেন ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে চিঠির খামে। সেই বৃত্ত বড় হতে হতে যেন রাফিকেও শৃঙ্খলতার শিকলে বেঁধে ফেলছে ক্রমাগত। আজ আর রাফির এই শিকলে বাঁধা হতে আপত্তি নেই। এই শিকলে বাঁধা হয়ে মৃত্যুবরণ করাতেও যেন শান্তি। রাফির নজরে পড়ল বৃত্তের মাঝে যেন হাজার হাজার মানুষ মশাল নিয়ে হেঁটে চলছে পথকে আলোকিত করে। রাফি চলমান সেই মিছিলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মিছিলের মাঝখানে হঠাৎ তার নজরে পড়ল তার বাবা রায়হান সাহেবও ছোট একটি মশাল হাতে নিয়ে এগিয়ে চলছেন সামনের সারিতে। রাফির মন চাচ্ছে এখনি ছুটে গিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু কী যেন এক অজানা শক্তি তাকে বাধা দিচ্ছে তুমুল বেগে। রাফি শত চেষ্টা করেও সেই বাধা অতিক্রম করতে পারছে না।

রাফি বলল, এটা কীসের মিছিল, বাবা?

রায়হান সাহেব মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, আলোর মিছিল।

এরপর মিছিল ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চলল। রাফি একদৃষ্টিতে আলোর মিছিলের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি যেন আজ আলোর সেই মিছিলের উপরেই সীমাবদ্ধ।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

সম্পাদকীয়, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল অনুপ্রাণন ৬ষ্ঠ সংখ্যা

Read Next

আবু আফজাল সালেহ – যুগল কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *