
হালিমা বজল মাস্টারের বাসার সামনে এসে দরজায় নক করল। খরখর শব্দ শুনে এগিয়ে এল বজল মাস্টারের স্ত্রী ফারহানা। দরজা খুলতেই দেখতে পেল তেরো-চৌদ্দ বছরের কিশোরী মেয়ে, হাতে একটা কাপড়ের পোটলা নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফারহানা প্রথমে মেয়েটির আপাদমস্তক দেখে নিল। কিন্তু তাকে চিনতে পারল না। তবে মেয়েটি কে? প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়েটিও হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে চেয়েও পারছে না। ভয়ে বুক ধুকপুক করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ফারহানা জিজ্ঞেস করল, তুমি কে?
আমি হালিমা।
কোত্থেকে এসেছ?
গ্রাম থেকে।
কাকেও চাও?
বজল মাস্টার সাহেবকে।
উনি তোমার কী হন?
আমার বাবা। আমি উনার ছোট মেয়ে।
কথাটা শোনামাত্র ফারহানার চোখ উপরে উঠে গেল। চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল সে। ততক্ষণে বাসার সব লোক জড়ো হলো। বজল মাস্টারের প্রথম পক্ষের তিন ছেলে এক মেয়ে। ছোট ছেলে আয়ান ছাড়া সবার বিয়ে-শাদি শেষ। ফারহানা সবাইকে বিষয়টা খুলে বলল। কিন্তু কথাটা কেউ বিশ্বাস করতে পারল না। আর বিশ্বাস করবেইবা কেন? উনি জীবিত থাকা অবস্থায় প্রথম স্ত্রীকে দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে কিছুই বলে যাননি। তাই সবার ধারণা, মেয়েটি মিথ্যে বলছে। মাস্টার কখনো এমন কাজ করতে পারেন না। তিনি খুব ভালো স্বভাবের মানুষ ছিলেন। নিজের স্ত্রী ছাড়া পর নারীর দিকে ভুলেও তাকাতেন না। কিন্তু আজ এই মেয়েটি কী বলছে। সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তাদের ধারণা মেয়েটি তাদেরকে ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছে। তাই এমন একটা উদ্ভট কথা বলেছে। মাস্টারের বড় ছেলে সেলিম কড়া ধমক দিয়ে বলল, এই মেয়ে তুমি মিথ্যে বলছ। বাবা আমার মাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করেননি।
ভাইয়া সত্যি বলছি। মাস্টার সাহেব আমার মাকেও বিয়ে করেছেন।
মিথ্যে কথা, সত্যি কর বল, তোমাকে এখানে কে পাঠিয়েছে?
আমার মা পাঠিয়েছে।
তোমার মা এখন কোথায়?
সাতদিন আগে আমার মা মারা গেছে। মারা যাবার সময় এই ঠিকানা দিয়ে বলেছেন, আমি মারা যাওয়ার পর উনার কাছে চলে যাবি। বলবি তুই উনার ছোট মেয়ে। আমার এই জনমে কেউ নেই। আমাকে একটু আশ্রয় দিন।
না, দেব না। কারণ মুখের কথায় কেউ কারও মেয়ে হতে পারে না। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে, বানোয়াট। আজকাল এমন ঘটনা অহরহ ঘটে। ভালোই ভালোই চলে যাও। তা না হলে পুলিশে দেব।
হালিমা হাতজোড় করে কেঁদে কেঁদে বারবার বিশ্বাস করাতে চাইছে। সে ওদের মতো এই পরিবারের সদস্য। কিন্তু তার কথা কেউ বিশ্বাস করছে না। সবাই মিলে তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। এমন সময় মাস্টারে ছোট ছেলে আয়ান উপস্থিত হলো। সে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে। চাকরি এখনো পায়নি। তবে বিভিন্ন পদে ইন্টারভিউ দিচ্ছে। সে এসে দেখে হালিমা কাঁদছে আর সবাই মিলে তাকে কড়াভাবে ধমকাচ্ছে। হালিমাকে কেন জানি তার পরিচিত মনে হলো। সে তাকে ভালোভাবে দেখে নিল। তারপর পরিচয় জানতে চাইলে ফারহানা মেয়েটির দেওয়া জবানবন্দি প্রকাশ করল। সব কথা শোনার পর আয়ান বলল, মা, হালিমা ঠিক বলেছে। সে এই পরিবারের ছোট মেয়ে।
কে বলেছে?
বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে সবকথা বলেছে।
আমি বিশ্বাস করি না।
মা, বিশ্বাস না করলেও হালিমা এই পরিবারের মেয়ে।
আমি মানি না।
মা মানতে তোমাকে হবে। এই পরিবারে আমাদের যেমন অধিকার আছে। হালিমারও আছে।
কোথাকার কে একটা কথা বলল,আর অমনি তুই বিশ্বাস করলি?
হুম করলাম। তেরো চৌদ্দ বছর আগের কথা, বাবা গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে। গিয়ে দেখলেন উনার দুঃসম্পর্কে চাচা কবির মিয়া খুব অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী। একমাত্র মেয়ে হাজেরা বাবার পাশে বসে বসে কাঁদছে। বাবাকে দেখামাত্রই উনার চাচা বলল, বজল, তুই এসেছিস?
জ্বি চাচা। কিছু বলবে?
হ্যাঁ বলব।
জ্বি চাচা বলুন।
আমি আর বাঁচব না। আমার মেয়েটার এই দুনিয়ায় কেউ নেই। তুই আমার মেয়েটার দায়িত্ব নিবি?
চাচা ইয়ে মানে…।
মানে মানে করিস না। বল আমার মেয়েটার দায়িত্ব নিবি?
তিনি বারবার কয়েকবার অনুরোধ করলেন। একটা লোক মৃত্যুপথযাত্রী এই অবস্থায় না করাটা কী ঠিক হবে? মাস্টার পড়লেন মহাবিপদে। হ্যাঁ-ও করতে পারছেন না, না-ও করতে পারছেন না। চাচার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ঠিক সেই মূহূর্তে তিনি সত্যি তার মেয়েকে বজল মাস্টারের হাতে তুলে দিলেন। মাস্টারও ওয়াদা করলেন তার মেয়েকে সুখে রাখার। তিনি মারা গেলেন। মাস্টার তার কাফন দাফনের কাজ শেষ করলেন। তারপর চাচার ওয়াদা পূরণ করতে হাজেরাকে বিয়ে করলেন। খোরপোষ দিয়ে শহরে চলে এলেন। এরপর তিনি আর কখনো গ্রামে যাননি। তবে খোরপোষ ঠিকমতো দিয়েছেন। জীবিত অবস্থায় এই সত্য প্রকাশ হলে পরিবারে একটা কেলেঙ্কারির সৃষ্টি হবে। তাই তিনি সত্যটা বলে যেতে চাননি। তবে মারা যাওয়ার আগে ছোট ছেলে আয়ানকে সব সত্য বলে গেছেন। এবং ছোট বোন হালিমার দায়িত্ব পালন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করে গেছেন। আজ আয়ান বাবার সব সত্য সবার কাছে প্রকাশ করল এবং হালিমাকে ছোট বোন হিসাবে মেনে নেওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ করল। কিন্তু কেউ মানতে পারল না। সবাই তাকে দূর দূর করে…।
একমাত্র আয়ান ছাড়া সবাই তার বিপক্ষে। বিশেষ করে ফারহানা মানতে পারল না, হালিমা বজল মাস্টারের মেয়ে। নারীরা কখনো স্বামীর ভাগ কাউকে দিতে পারে না। হালিমাকে মেয়ে হিসেবে মানা, মানে বজল মাস্টারের ভাগ কাউকে দেওয়া। তার উপরে হালিমা ওয়ারিশ হিসেবে সম্পত্তি পাবে, এটা কী করে হয়। তাই ফারহানা কিছুতেই হালিমাকে মেয়ে হিসেবে মানতে রাজি না। তার এক কথা, এসব উটকো ঝামেলা রাস্তার মেয়েকে কখনো মেয়ে হিসাবে মানবে না। পরিবারসুদ্ধ সবার এক কথা। তবে মাস্টারের ছোট ছেলে আয়ান সম্পূর্ণ আলাদা। সে বাবার দেওয়া অনুরোধ রাখতে প্রস্তুত। হালিমাকে ছোট বোন হিসেবে মেনে নিয়েছে।
মাকে অনেক বুঝিয়েছে এই নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে। হালিমাকে এ বাড়িতে থাকতে দিতে। কিন্তু না, ফারহানা রাজি না। তাকে এ বাড়ি ছাড়তে হবে। শুধু তাই নয় ভবিষ্যতে যাতে এই অধিকার নিয়ে এ বাড়িতে না আসে তার জন্য হুঁশিয়ারি সংকেতও দিল।
হালিমা কেঁদে কেঁদে বলে, মা, আমায় তাড়িয়ে দিবেন না। আমার এই জনমে কেউ নেই। আমাকে একটু আশ্রয় দিন। বিনিময়ে সব কাজ করে দেব।
না না, তা কখনো হবে না। এই বাড়িতে শুধু আমার ছেলে-মেয়ে থাকবে, আর কেউ না।
হালিমা মায়ের পা চেপে ধরে কেঁদে কেঁদে আবারও অনুরোধ করল। এভাবে সে কয়েকবার অনুরোধ করল। কিন্তু ফারহানা নাছোড়বান্দা, কিছুতেই হালিমাকে এ বাড়িতে থাকতে দেবে না। তাই কড়া ধমক দিয়ে লাথি মেরে ফেলে দিল। চোখের জল মুছতে মুছতে হালিমা উঠে দাঁড়াল। চলে যেতে প্রস্তুত হলো। তখনি আয়ান বলল, হালিমা, তুমি এই বাড়িতে থাকবে। চল, ভেতরে চল।
এবার আয়ান মাকে বলল, মা, তোমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। ওকে তাড়িয়ে দিও না। তাহলে বাবার আত্মা কষ্ট পাবে। তুমি কি চাও বাবা পরকালে জাহান্নামে যাক। ওকে যদি অধিকার থেকে বঞ্চিত করি বাবা জাহান্নামি হবে। মা, প্লিজ এটা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি কোরো না।
ফারহানা আপাতত থামল। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা থেমে থাকল না। বড় দুবউ মুখ ভ্যাংচিয়ে বলল, নিজে খাও অন্যের ঘাড়ে বসে। এর উপরে আর একজনকে কে খাওয়াবে!
ভাবি তোমরা আমাদের পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে কথা বোলো না। রিজিকের মালিক আল্লাহ। আমার চাকরিটা হয়ে যাক। ওর সব দায়িত্ব আমি পালন করব।
হালিমাকে বলল, বোন, মন খারাপ কোরো না। আমি আছি তোমার পাশে।
হালিমার চোখের পানি মুছে দিয়ে আয়ান তাকে ভেতরে নিয়ে বসতে দিল। তারপর নিজের হাতে ভাত বেড়ে খেতে দিল।
এসব দেখে দুই বউয়ের গা জ্বলে উঠল। মনে মনে বলে, তোকে ফ্রিতে খেতে দিলে তো। সংসারের সব কাজ তোকে দিয়ে করাব।
পরদিন থেকেই একটার পর একটা কাজের ফরমায়েশ দিয়ে চলেছে হালিমাকে। কাপড় কাচা, থালা-বাসন ধোয়া, ঘর মোছা, টয়লেট পরিষ্কার ইত্যাদি। হালিমা কোনো প্রতিবাদ করছে না। সব কাজ করে দিচ্ছে। তবুও কারও মন পাচ্ছে না। কথায় কথায় ভাতের খোঁটা দিচ্ছে। কাজের মেয়ের মতো ব্যবহার করছে। ভালো কিছু খেতে দিচ্ছে না। বাসি ও পচা খাবার খেতে দিচ্ছে।
একদিন আয়ান দেখল রান্নাঘরের মেঝেতে বসে হালিমা ভাত খাচ্ছে, আর চোখের জল ফেলছে। প্লেটে কিছু ভাত আর বাসি তরকারি। অথচ সেদিন গোস্ত বিরানি রান্না করা হয়েছিল। আয়ান এগিয়ে এসে বলল, বোন, এসব কী খাচ্ছ?
ভাত খাচ্ছি।
তা বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে কী রোজ ওরা এসব খাবার খেতে দেয়?
জ্বি না মানে…।
আয়ান বুঝতে পেরেছে হালিমার দুঃখের কারণ। কিন্তু তার কিছুই করার নেই। হালিমার পক্ষ হয়ে কিছু বলতে গেলে হয়তো তাকে তাড়িয়ে দেবে। তাই কাউকে কোনকিছু না বলে বোনকে সান্ত্বনা দিল।
বোন, বুঝতে পেরেছি ওরা তোমাকে ভালো খেতে দিচ্ছে না। চিন্তা কোরো না। আমার চাকরিটা হয়ে যাক। তোমাকে আলাদা বাসায় রাখব। তখন খাওয়া-পরার কোনো অসুবিধা হবে না। এই সময় পর্যন্ত একটু কষ্ট কর।
ভাইয়া, আপনার মতো একজন ভাই পেয়েছি। এটাই অনেক। আমার কোনো কষ্ট নেই। এই বাড়িতে ছোট মেয়ে হয়ে থাকতে পেরেছি, এটাই যথেষ্ট। আর বেশি কিছু চাই না। আপনি আমাকে নিয়ে কোনো টেনশন করবেন না।
ঠিক আছে, বোন। আর কেঁদো না।
বোনের চোখের পানি মুছে দিল ভাই। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করল। মুহূর্তের মধ্যে হালিমা সকল দুঃখ ভুলে গেল। তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল খুশির রেখা।
যাক, অন্তত একজন মানুষ তাকে এই পরিবারের ছোট মেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েছে।