
গোলাম মোকছেদ। অঢেল ধনসম্পদের মালিক। সমাজে বেশ নামডাক। তিনি সরাসরি রাজনীতি না করলেও অনেক বড় বড় নেতার সাথে সখ্য আছে। রাজধানীর গুলশানে চোখধাঁধানো বাহারি বাগানবাড়ি। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে রাজকীয় সংসার। না চাইতেই সবকিছু মিলে যায়। তারপরও একটা কষ্টের ঘুণপোকা জীবনকে আস্তে ধীরে গিলে খাচ্ছে। তার এত ধনসম্পদ ধরে রাখার মতো যোগ্য কেউ নেই। ছেলে দু’টো এবনরমাল। গায়ের গঠন নাদুসনুদুস হলেও বোধবুদ্ধিহীন। কখন কাকে কী করে বসে তার কোনো হিসাব নেই। মেয়েটা সবদিক দিয়ে গুণবতী। বোধবুদ্ধি লেখা পড়ায়ও চৌকস।
গোলাম মোকছেদ একজন পুঁজিবাজ। চাল ডাল, তেল নুন, থেকে শুরু করে মদ গাঁজা সব ব্যবসার সাথে জড়িত। বাহারি বাগানবাড়ি অঢেল ধনসম্পদ সবকিছু হয়েছে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন থেকে। বাবা একজন কালোবাজারি তা মেয়েকে খুব ভাবায়। বান্ধবীরা যখন বলে— সুইটি, তোর কীসের চিন্তা। ভাইরাসে আমরা মরলেও তুই ভালা থাকবি। তর বাবা বিমান ভাড়া কইরা বিদেশে চিকিৎসা করাইব। আমরা গরিব মানুষ মইরা ডাস্টবিনে পইরা থাকমু। দাফনকাফন না হইলে হিয়াল কুত্তায় খাইব।
বান্ধবীদের কথায় সুইটি লজ্জা পায়। সুইটির বান্ধবীরাও জানে ওর বাবা একজন অসৎ ব্যবসায়ী। জবাবে কিছুই বলে না। নীরবে একটা কষ্টের নিঃশ্বাস ছাড়ে।
সারা বিশ্বের মানুষ করোনা ভাইরাসের ভয়ে কাঁপছে। নাইটক্লাব মদের বার যথাতথা লোক সমাগম সব বন্ধ। আর সুইটির বাবা গোলাম মোকছেদ সাহেব রাতে ছাদের উপর ড্রিংকস পাটির আয়োজন করে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মজা করে। যা সুইটির মোটেও পছন্দ নয়। কথা প্রসঙ্গে সুইটি বাবাকে বলে— আব্বা, মানুষ মরণঘাতি ভাইরাসের ভয়ে কাঁপতাছে। আর তুমি নেশা কইরা আধমরা হইয়া পইড়া থাক। তোমার মনে কি কোন ডরভয় নাই! মরণরে তুমি কি একটুও ডরাও না?
বাবা একগাল হেসে বলেন— মারে, বড়দের সব কাজে মাতা ঘামানো ঠিক না। যারা শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিসের রোগী তারাই এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হইতাছে। আমার একটু মদের নেশা ছাড়া ওইসব কিছুই নাই। এই ভাইরাস রোগ তোমার মায়ের হলে হতে পারে। সাবধান, তুমি তোমার মায়ের কাছে যাইবা না।
কথা বলতে বলতে তিনি ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কালরাতে নেশাটা ওভার হয়ে গেছে। নেশার ঘোরে মেয়ের সামনে কী বলতে কী বলেছেন তা মগজে কাজ করেনি। সুইটি ছোট হলেও বাবার কথার সারমর্ম ঠিকই বুঝে নিয়েছে। মা প্যারালাইসিস রোগী। তিনি কারও সহযোগিতা ছাড়া প্রাকৃতিক কাজও সারতে পারেন না। তাই সংসারে তিনি ভ্যালুলেস। বাম হাত-পা দু’টোই নিস্ক্রিয়। মুখ খানিকটা বেঁকে গেছে। ডাক্তার বলেছে কিছুদিন থেরাপি নিলে ঠিক হয়ে যাবে। মাস তিনেক হলো চিকিৎসার— তেমন কোনো উন্নত হয়নি। দিনকে দিন স্বাস্থ্যের অবনতিই ঘটছে। বাবা কখনো মায়ের খোঁজখবর নেন না। কাজের বুয়ারা মায়ের দেখভাল করে।
বাবার বেফাঁস কথায় লাজে সুইটি এক দৌড়ে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে নীরবে কাঁদে। মা ডান হাতটা মেয়ের পিঠে রাখেন। তিনি বুঝতে পারেন বাবার সাথে মেয়ের কিছু একটা হয়েছে। সুইটি মায়ের অবশ বাম হাতটা নিজ মাথায় চেপে ধরে আদর নেয়। মাও জানে সারা দেশে করোনার তাণ্ডব চলছে। এটা ছোঁয়াচে রোগ। বিছানায় পিঠ ঘষে মেয়েকে বুক থেকে ছাড়িয়ে বলে— মা, তুই আ-আমার বুকে আ-আর মাথা রা-আ-খ-বি না। আমি শ্বা-শ্বাস কষ্ট কা-কাশির রোগী। তুই আ-আ-মার কাছ থা-থাই-ক্যা দূরে দূ-দূরে থা-থা-কবি।
প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে মা স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না। কথা বলেন থেমে থেমে।
সুইটিও জানে করোনা ভাইরাস ছোঁয়াচে রোগ। পারতপক্ষে অন্য মানুষের সংস্পর্শে না যাওয়াই ভালো।
স্কুল বন্ধ বলে গৃহবন্দি জীবন। স্কুল ছুটির দিন টিচার সাবধান করে বলেছে, দলবেঁধে কেউ কোথাও যাবে না। বাইরের খাবার খাবে না। কারও সাথে হ্যান্ডশেক করবে না। বারবার হাত ধোবে। পানিতে সবসময় গলা ও মুখ ভিজিয়ে রাখবে। মা কি করোনাতে আক্রান্ত হলো। ঘনঘন কাশি তো ভাইরাসে আক্রান্তেরই লক্ষণ। একবার কাশি শুরু করলে আর থামে না। বাবাও বলেছে মায়ের কাছে না যেতে। এক অজানা সংশয়ে মন ভারী হয়। মন খুলে কাউকে কিছু বলবে তাও সম্ভব না। বাড়ি তো নয় যেন একটা পাগলাগারদ। ভাই দু’টো আধপাগল। সারাদিন তাদের নানা রকম যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। দু’জন বুয়া তারা রান্নাবান্না ঘরদোর ঝাড়পোছ এবং মায়ের সেবা দিতে গিয়ে ক্লান্ত। বাড়িভর্তি মানুষ, কোনো কিছুর অভাব নেই। অভাব শুধু মানসিক শান্তির।
মেজ মামা বলেছিল একদিন এসে তাকে নিয়ে যাবে। স্কুল ছুটির দিনগুলো নানার বাড়িতে কাটাবে। তা আর হলো না। ইটালি থেকে সেজ মামা বেড়াতে এসেছে। সবার সন্দেহ তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। লোকলজ্জার ভয়ে তিনি গ্রামছাড়া। মামিটা সর্দি-কাশিতে ভুগছে। সেখানে যাওয়াটাও নিরাপদ নয়। কী যে মরণ ভাইরাস আল্লাহপাক জমিনে দিল, তার ভয়ে সবাই কুপোকাত। মানবের সব শান্তি গ্রাস করেছে এক অদৃশ্য ভাইরাস।
মোবাইল ফোন চ্যাট, টিভি প্রোগ্রাম কোনো কিছুতেই মন বসছে না সুইটির। সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতেই দারোয়ান চাচার সঙ্গে দেখা। দারোয়ান চাচা একাকী কাউকে বকাঝকা করছে। সুইটি জানতে চায়— চাচা, তোমার আবার কী হইল! কারে বকতাছ?
দুখের কতা কারে কমুরে মা। সর্দি কাশির ভাইরাস কারবারি গো ধরে না ক্যান।
কারবারিরা আবার কী করল?
কারবারিরা বড় হারামিরে মা। ভাইরাসের নামে সব জিনিসের দাম বাড়াইয়া দিছে। মনে লয় হেরা জীবনেও মরব না। চল্লিশ ট্যাকার পিঁয়াইজ আশি ট্যাকা দর হইছে। মা তুমি তো শিক্ষিত মানুষ। কও তো, এইডা কি ভালা কাম করছে?
চাচার কথায় সুইটির মনটা আবারও খারাপ হয়ে যায়। ওর বাবা একজন পুঁজিবাজ। জিনিস গুদামজাত করে বেশি মুনাফা করাই তার কাজ। সুইটি একমুহূর্ত দেরী না করে বাবার মুখোমুখি হয়। বাবা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে ব্রাশ করছিলেন। চিরুণিটা ছুড়ে ফেলে পিছু তাকাতেই দেখে সুইটি দাঁড়িয়ে। কপালে ভাঁজ ফেলে সুইটি জানতে চায়— আব্বা, কই যাও?
হারামখোরের বাচ্চারা নাকি আমার গুদামে মোবিল কোট দিছে। ফকিন্নির বাচ্চারা, মাসে মাসে টাকা না নিলে তো তগোর সংসার চলে না। গুদামে তালা ঝুলাইলে তো তগোর বউ পোলারা না খাইয়া মরব।
আব্বা কী হইছে। কারে বকতাছ?
ফকিন্নির বাচ্চাগো বকতাছি। হারামির বচ্চারা, বেঈমান কমিনরা আমার চাইল ডাইল পিঁয়াইজের গুদাম সিলগালা করছে।
করবই তো।
কী কইলা মা?
তুমি নাকি পিঁয়াইজের দাম বাড়াইছ। চল্লিশ টাকার পিঁয়াজ আশি টাকা হইলে গুদাম তো সিলগালা করবই।
মা, তুমি এইসব বুঝবা না। সবাই তো চড়া দামে বেচতাছে। আমি বেচলে দোষ কী? আমি পিঁয়াইজের মৌসুমে কম দামে পিঁয়াইজ কিন্না রাখছি। হেই পিঁয়াইজের দাম কি বাড়াইছি। সারা দেশে বাড়ছে। আমি কম দামে বেচমু ক্যান।
আব্বা, তুমি বড় খারাপ মানুষ।
কী কইলা, আমি খারাপ মানুষ?
কথা বলতে বলতে কষে এক চড় মারে সুইটির গালে।
সুইটি কখনো এমনটি আশা করনি। একহাতে গাল চেপে ধরা গলায় বলে,আব্বা, তুমি খারাপ বইল্লাই আমারে চড় দিতে পারলা। মানুষ ভাইরাসের ডরে আল্লাবিল্লা করতাছে। আর তুমি টাকার চিন্তায় দিনরাইত ঘুমাও না। মরলে এই টাকা তুমি কবরে নিতে পারবা না। এই ভাইরাস তোমাদের পাপের গজব। এহনো সময় আছে, সব ছাইড়া নামাজ পড়, আল্লারে ডকো। ভাইয়ারা তো আধাপাগল হইছে। তুমি এইসব না ছাড়লে আমিও একদিন আধ পাগলা হইয়া যামু।
মোবাইল ফোনের রিংটোন বাজতেই সুইটিকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে দরজা লক করে কথা বলে। মোবাইলের অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হলো, আইসা লাভ হইব না বস। মোবাইল কোট গুদামের পিঁয়াজ, চাল, ডাল সব ক্রোক কইরা নিয়া গেছে। আপনি কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকেন। আপনের নামে কেইছ কইরা দিছে।
কেইছ কইরা দিছে মানি?
গুদামে টিসিবির চাইল, ডাইল, তৈল পাইছে। সরকারি মাল গুদামে আইল কেমনে জানতে চাইছে।
ক্যান। তরে না কইছি বেবাক মাল সরাইয়া রাখতে।
সরামু কেমনে। তার আগেই তো মেজিস্ট্রেড আইয়া হাজির। মনডায় কয়, যার থাইক্যা চোরাই মাল কিনছেন, তাঁরার মইধ্যে কেউ একজন কইয়া দিছে।
চাইলের গুদামে তৈল রাখছি, এইডা জাননের কতা না।
জবাবে কিছু বলার আগেই মাথা ঝিমঝিম শুরু হয়। ধমকা বাতাসে গায়ের লোম কাটা দিয়ে উঠে। সাথে বার কয়েক হাঁচি বের হয়ে আসে। দরজা খুলে দেখেন সুইটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কান্নাভেজা চোখে ঘৃণার আগুন। মেয়েকে হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়ে কয়েকবার ঘনঘন হাঁচিতে কাঁপতে কাঁপতে ফ্লোরে পড়ে যান।
সুইটির চিৎকারে দারোয়ান মোবারক চাচা ছুটে আসে। সাথে আধপাগল দুই ভাইও। দুই বুয়া দূরে দাঁড়িয়ে কী হয়েছে ঠাহর করার চেষ্টা করে। মা বিছানায় শুয়ে চিৎকার হই চইয়ে কিছু একটা হয়েছে আঁচ করতে পারছেন। কিন্তু উঠে গিয়ে দেখার মতো শক্তি নেই।
ঘণ্টা দুই পরে হোম ডাক্তার জানাল, তিনি করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। গায়ের তাপমাত্রা এবং হাঁচিতে তাই প্রমাণ করছে।
ডাক্তারের কথা শুনে চমকে উঠে মোকছেদ সাহেবের মন। মুহূর্তের মধ্যে একটা ভয় বাসা বাঁধে মনের গভীরে। সারাবিশ্বে করোনা আক্রান্তে যে হারে মানুষ মরছে, তাতে বাঁচার আশা খুবই ক্ষীণ। চোখের সামনে হাজারো লাশের ছবি ভাসে। মৃত্যুর চিন্তা মগজে ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরতে থাকে। নির্বোধ শিশুর মত ফ্যালফ্যাল করে একবার সুইটির দিকে তাকায়, আরেকবার ডাক্তারের দিকে।
ডাক্তার সাহেব বলেন, তবে ভয়ের কিছু নাই। কারও সংস্পর্শে যাবেন না। কিছু নিয়মকানুন লিখে দিয়েছি, তা মেনে আলাদা ঘরে থাকবেন। মনে রাখবেন এটা ছোঁয়াচে রোগ। আপনার যদি হয়ে থাকে পরিবারের সবার হতে পারে। তাই একা থাকবেন। কাউকে স্পর্শ করবেন না। নিয়মিত নামাজ পড়ে আল্লাহপাকের করুণা প্রার্থনা কবরেন। এর কোনো প্রতিষেধক নাই। তিনি চাইলে আমাদের সবাইকে মাফ করে দিতে পারেন।
ডাক্তার সাহেবের কথা শুনে মনটা বেশি দুর্বল হয়ে গেল। মানুষ যত জ্ঞানীই হোক না কেন একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে তার জীবন। একটা সময় সব লাফালাফি বন্ধ হয়ে যায়। আর এতে প্রামাণ হয় সৃষ্টির স্রষ্টা বলে একজন আছেন। তার বিপক্ষে গেলেই মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। গোলাম মোকছেদ সাহেবও তা টের পাচ্ছেন।
ডাক্তারসহ সবাই চলে গেলেও সুইটি দাঁড়িয়ে থাকে। বাবার মনে বড় অনুশোচনা জাগে। মেয়েকে আচমকা চড় মারাটা ঠিক হয়নি। তিনি আদরমাখা কণ্ঠে ডাকেন— মারে। সুইটি মা। আয়, কাছে আয়।
সুইটি কোনো কথা বলে না। পলকহীন অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। বাবা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ান এবং হাত বাড়িয়ে ডাকেন, মারে, আয়। আমার কাছে আয়। সত্যিই আমি মানুষটা বড় খারাপ। টাকার ধান্ধায় অমানুষ হইয়া গেছি। তর মা আইজ অনেকদিন ধইরা প্যারালাইসিসে পঙ্গু। এই বাড়িতই থাকে, কিন্তু আমি তার মায়ের খবর লই না। আইজ তোমারে লইয়া তারে দেকতে যামু। তুই আমার পাঞ্জাবিডা আইন্যা দে।
হঠাৎ বাবার মানসিক পরিবর্তনে অবাক হয় সুইটি। মনে মনে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে বলে— আব্বা, একটা কতা কই?
কও মা। তোমার যা খুশি কও।
চিন্তা কইরা দেহ, টাকাকড়ি দিয়া বাড়ি গাড়ি কিনন যায়, কিন্তু সুখ কিনন যায় না।
অনেক দেরিতে হলেও তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছেন। মেয়ের কথা সমর্থন করে বলেন, বড় খাঁটি কতা কইছরে মা। দুনিয়ার এই করোনা ভাইরাস কোনো বৈজ্ঞানিকের জীবাণু বুলেট না। এইটা আল্লাহপাকের প্রতি আমাদের নাফরমানি, আনুগত্য অস্বীকারের গজব। সত্যি আমরা বড় নাফরমান। সুস্থতায় বাইচ্চা আছি অথচ শুকরিয়া আদায় করি না। আল্লার কসম, এই তর মাথা ছুঁইয়া কতা দিলাম, মানুষ কষ্ট পায় এমন কাজ আমি বাঁইচ্চ্যা থাকলে আর করমু না।
বাবার এমন পরিবর্তনে সুইটি বাবার বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। বাবার চোখ থেকেও অনাবিল এক সুখের জল গড়িয়ে পড়ে সুইটির মাথায়।
সুইটি বাবার বুক থেকে মুখ সরিয়ে আলমারি থেকে একটা পাঞ্জাবি এনে বাবার হাতে দেয়। বাবা গোলাম মোকছেদ তা গায়ে জড়িয়ে চুলটা একটু ব্রাশ করে অসুস্থ স্ত্রীর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সাথে সুইটি ও আধপাগলা দুই ছেলে। মোকছেদ সাহেবকে দরজায় দাঁড়াতে দেখে স্ত্রী বিস্মিত হন। বিগত তিন মাসে তিনি মোকছেদ সাহেবকে তাঁর সামনে দেখেননি। স্ট্রোক করার পর থেকে তিনি আলাদা রুমে থাকেন। স্ত্রী রেবেকা বানু বিছানা থেকে উঠার জন্য ছটফট করেন। কিন্তু উঠতে পারেন না। সুইটি আর আধপাগলা দুই ছেলে গিয়ে মাকে বিছানা থেকে তুলে বসানোর চেষ্টা করে। মা রেবেকা অবলা অসহায় শিশুর মতো পলকহীন মোকছেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি দেখলেন গত ঈদে কিনে দেওয়া কচি কলাপাতা রঙের পাঞ্জাবিটা মোকছেদ সাহেবের গায়ে। দেখতে অপূর্ব লাগছে তাকে।
মোকছেদ সাহেব খাটের একপাশে বসে স্ত্রী কপালে হাত রেখে জানতে চান— কেমন আছ, রেবেকা?
রেবেকা বানু জবাবে কিছুই বলেন না। চোখ থেকে কয়েক ফোটা কষ্টের নোনাজল গড়িয়ে পড়ে।
স্ত্রীর অবশ হাতটা দু’হাতের তালুতে বন্দি করে বলেন, আমাকে মাফ কইরা দাও। আমি পাপী। তুমি অসুস্থ আমি স্বামী হইয়া একবারও খোঁজ খবর লই নাই। তুমি মাফ না করলে আল্লাও আমারে মাফ করব না। আমি বড় বিপদে আছি। তোমার দোয়া আমার বড় দরকার। সুইটি মা আমার চোখ খুইল্লা দিছে। আমি আর বেশি লাভের কারবার করমু না। কও মাফ কইরা দিছ। আমি ডাক্তারের পরামর্শ নিয়া তোমার বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করমু। আমার এত টেকাপয়সা কে খাইব। আমি চিন্তা কইরা দেখছি সুস্থ থাকার মতো সুখ আর কিছুতে নাই। যত টেকাই লাগুক তোমারে উন্নত চিকিৎসা দিয়া সুস্থ কইরা তুলমু। কও, তুমি আমারে মাফ কইরা দিছ?
মোকছেদ সাহেবের কথার মাঝে রেবেকা বানুর চোখ থেকে শুধু অশ্রু ঝরে। সুইটি তা ওড়নার আঁচল দিয়ে মুছে দেয়। জবাবে রেবেকা বানু বলেন, আ-আ-মারে আ-আ-পনে মাফ ক-কই-রা দি-দিয়েন। আ-আমি অ-অসু-সুস্থ হইয়া আ-আপ-নার কোনু সেবা-য-যত-নো করতে পারি নাই। আ-আপ-নার প্রতি আ- আমার কোনু অ-অভি-যোগ নাই। আপ-না-নারে পাশে পা-পাইয়া খুব খু-খুশি হইছি।
কথা বলতে বলতে ঠোঁটে একচিলতে মোহন হাসির রেখা ফুটিয়ে মোকছেদ সাহেবের কোলে লুটিয়ে পড়েন। মোকছেদ সাহেব যতই ওঠানোর চেষ্টা করেন রেবেকা বানু ততই ঢলে পড়েন। মুহূর্তে মধ্যে হাত-পা খিঁচুনি দিয়ে রেবেকা বানুর দেহ শক্ত হয়ে যায়। মোকছেদ সাহেব বুঝতে পারেন রেবেকা বানু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি মৃদু কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ইন্না-লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
সুইটি মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মোকছেদ সাহেব শোকে পাথরের মূর্তির মত বসে থাকেন। কান্নার শব্দে কাজের বুয়ারা ছুটে আসে। মোকছেদ সাহেবকে বসা দেখে তাঁরা কেউ ঘরে ঢুকে না। সুইটির আধ-পাগলা দুই ভাই বুঝতেই পারে না ঘটনা কী ঘটেছে।
টঙ্গী কলেজ গেট, গাজীপুর থেকে