
রুদ্রশঙ্কর তাণ্ডনৃত্য করছে, নেমে আসছে মহাপ্রলয়। মহাদেবের রুদ্র রূপ দেখে সময়ের আগেই বিদায় নিয়েছে সূর্যদেব। শঙ্করকে শান্ত করার জন্য মহিলারা শঙ্খ বাজাচ্ছে, উলু দিচ্ছে। ভোলানাথ শান্ত না হলে চন্দ্রদেব আসার সাহস করতে পারছে না। বাড়ির চালের টিন, টালি নিয়ে খেলা করছে পবন দেব। গাছ আর ধরে রাখতে পারছে না নিজের ডালগুলোকে, একে একে গাছ ছেড়ে ডাল পবনের ইচ্ছায় এদিক ওদিক ছিটকে পড়ছে। যে সকল গাছ পবন দেবের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে সেই গাছগুলোকে মা বসুন্ধরা উপড়ে ফেলছে। থেকে থেকে দেবরাজ ইন্দ্র অজানা রাগে নিজের অস্ত্র বজ্র বা বিদ্যুতের প্রযোগ করছে জগতের উপর। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নিজের সৃষ্টির এই অবস্থা দেখে মনোব্রত নিয়েছেন। এই দুর্যোগ থেকে রক্ষার জন্য মানুষ বিষ্ণু নাম জব করছে। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে নিজের বাড়ির দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করে প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক অমিত গুহ। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে মায়ের কোলে শুয়ে থাকা দশ বছরের ছেলে মুখ তুলে তাকায় বাবার দিকে। শিক্ষক ঘরে ঢুকে দেখেন তার স্ত্রী ঘরের একটি কোনে আলমারির আড়ালে দশ বছরের ছেলেকে আঁচলে জড়িয়ে বসে রয়েছেন আর তার চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। শিক্ষক ছুটে এসে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন— কী হয়েছে বাবুর? আর তোমারইবা কী হয়েছে! অমন করে তাকিয়ে আছ কেন?
শিক্ষকের স্ত্রী বলেন, বাবুর খুব জ্বর এসেছে, শরীর গরমে পুড়ে যাচ্ছে।
শিক্ষক বললেন, তো তুমি আলমারির আড়ালে এমন করে বসে আছ কেন?
শিক্ষকের স্ত্রী ঘরের চালের দিকে তাকিয়ে বললেন, ঐ দেখো টালি চুইয়ে জল ঝরছে।
শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, কী ওষুধ দিয়েছ বাবুকে?
শিক্ষকের স্ত্রী বলেন, ঘরে ওষুধ নেই। এই পরিস্থিতিতে তোমার আসতে এত দেরি হলো কেন?
শিক্ষক বলেন, ঝড় আসছে দেখে স্কুলের সব দরজা-জানালা ভালো করে বন্ধ করতে করতেই ঝড় নেমে যায়। স্কুল থেকে বেরোতে যাব দেখি বিদ্যাসাগরের মূর্তির উপর নিম গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে, সেই গাছের ডাল সরিয়ে আসতে আসতে দেরি হয়ে গেল। তুমি বাবুকে নিয়ে একটু বসো আমি বাবুর জন্য ওষুধ নিয়ে আসছি।
শিক্ষকের স্ত্রী বলেন, তুমি এই দুর্যোগের মধ্যে আবার বেরোবে?
শিক্ষক বলেন, ঝড় থেমে গেছে, আমি সাইকেল নিয়ে যাব আর আসব।
শিক্ষক হাঁটুমুড়ে বসে ছেলের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলেন, বাবা আমি এক্ষুনি ওষুধ নিয়ে আসছি। শরীর ঠিক হয়ে যাবে।
শিক্ষকের স্ত্রী বলেন, একটু দাঁড়িয়ে যাও। বৃষ্টি থামুক।
শিক্ষক বলেন, আমি তো ভিজেই রয়েছি, বৃষ্টিতে কী হবে?
শিক্ষকের স্ত্রী বলেন, সাবধানে যেও।
ছেলের ইচ্ছা করছিল বাবার হাতটা ধরে আটকে রাখতে। কিন্তু নিজেই জ্বরে কাবু তাই মায়ের কোলে শুয়ে বলল— বাবা, তাড়াতাড়ি আসবে।
শিক্ষক সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যান।
শিক্ষকের স্ত্রী ওইভাবেই ছেলেকে জড়িয়ে বসেছিলেন ঘণ্টাদুয়েক। কিন্তু না থামল বৃষ্টি, না ফিরে এলেন প্রধান শিক্ষক। হঠাৎ ঘরের দরজা খুলেই ঢুকে পড়ে পাড়ার লোকেরা। চমকে ওঠেন শিক্ষকের স্ত্রী। আর তাই দেখে কোল থেকে নেমে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় দশ বছরের ছেলে। সবাই মিলে প্রায় একসাথে বলে, প্রধান শিক্ষকের মৃতদেহ পড়ে আছে কদমতলায় পুকুরপাড়ে।
শিক্ষকের স্ত্রী ছেলেকে রেখেই বেরিয়ে যায় ঐ ভয়ঙ্কর দুর্যোগের রাতে। ছেলেও ছুটে যায় মায়ের পেছনে। বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। ছেলেটির গায়ে বৃষ্টি পড়তেই মনে হচ্ছিলো অ্যাসিড ছুঁয়ে যাচ্ছে, তার শরীর ঝলসে যাচ্ছিল। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই সারা পাড়ার সব লোক গিয়ে উপস্থিত হয় কদমতলার পুকুরপাড়ে। সবাই সেখানে পৌঁছে দেখল সাইকেলের নিচে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে তাদের পাড়ার প্রিয় প্রধান শিক্ষক আর তার পিঠে কেউ কাস্তে দিয়ে কাটাকুটি খেলে এঁকেছেন তারা চিত্র।
পাড়ার সব লোকের চোখেই হয়তো জল ছিল কিন্তু বৃষ্টি সেই জল আড়াল করে দিয়েছিল। দশ বছরের ছেলেটির বুকে জ্বলতে শুরু করল একটি চিতা।
ফোনের রিংটোন বাজতেই ঘুম ভেঙে যায় অঞ্জনের। ফোন রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশ থেকে পুলিশ অফিসার ইন্দ্রজিৎ সরকার বলে— স্যার, তাড়াতাড়ি থানায় আসুন। খুব দরকার।
অঞ্জন বলে, আপনি চলে আসুন আমার বাড়িতে।
ফোনের ওপাশ থেকে বলে— ঠিক আছে স্যার, আমিই আসছি।
অঞ্জন ভাবে এই এক স্বপ্ন ছোটবেলা থেকে তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কোনোভাবেই সে এই স্বপ্ন থেকে মুক্তি পায় না।
ঘড়িতে তখন বাজে ভোর সাড়ে চারটে পুলিশ অফিসার ইন্দ্রজিৎ সরকার অঞ্জনের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। ইন্দ্রজিৎ সরকার এসে বসে বৈঠকখানায় কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের বেডরুম থেকে নেমে আসে অঞ্জন। অঞ্জনকে দেখেই উঠে দাঁড়ায় ইন্দ্রজিৎ। অঞ্জন বলে, আপনাদের এই ধরনের নাটক আমার পছন্দ নয়। আপনি একজন পুলিশ অফিসার, নিজের মর্যাদা ভুলবেন না।
এমন সময় বাড়ির চাকর এসে দু’কাপ কফি দিয়ে যায়। কফিতে চুমুক দিয়ে অঞ্জন জিজ্ঞাসা করে, কী হয়েছে বলুন? এত ভোরে আমার বাড়িতে ছুটে আসার কারণ কী?
ইন্দ্রজিৎ কফিতে চুমুক দিয়ে বলে— দাদা, আপনার দলের ছেলেরা একটি নিরীহ ছেলেকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে খুন করে গঙ্গার পাড়ে লাশ ফেলে দিয়েছে।
কথা শুনে একটু বিরক্ত হয়ে অঞ্জন বলে, কে খুন হয়েছে?
ইন্দ্রজিৎ বলে— সুজয় দাস, বয়স চব্বিশ বছর, বাড়ি ত্রিবেণী নেতাজিনগরে আর লাশটি পাওয়া গেছে ফাঁসিতলা ঘাটে গঙ্গার তীরে।
আমার দলের ছেলেরা খুন করেছে, কেন?
কাল সন্ধ্যাবেলায় সুজয় দাস বিরোধী দলের ছেলেদের সঙ্গে ত্রিবেণী পুরোনো বাজারে সরকারবিরোধী লিফলেট বিলি করতে বেরিয়েছিল, সেই সময় আপনার দলের ছেলেদের সঙ্গে ওর তর্কাতর্কি হয়।
অঞ্জন বলে, ছেলেটি কী কাজ করত?
ইন্দ্রজিৎ বলে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স করেছিল।
অঞ্জন জিজ্ঞাসা করে, ছেলেটির বাবা কী করেন?
ইন্দ্রজিৎ সরকার বলে, ওর বাবার নাম সুশান্ত দাস, বিটিপিএস-এ কাজ করেন।
অঞ্জন জিজ্ঞাসা করে, তারপর কী হয়েছে?
ইন্দ্রজিৎ সরকার বলে, কাল রাত সাড়ে দশটার সময় সুজয় খাওয়াদাওয়া করে ঘুমোচ্ছিল, তখন আপনাদের দলের চারজন ছেলে মদ খেয়ে গিয়ে ওর বাড়িতে ডাকে। ডাক শুনে সুজয়ের মা, বাবা আর ভাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আপনাদের দলের ছেলেরা গালাগালি দিয়ে বলে— সুজয়কে ডেকে দে। নির্মলদা ডাকছে। সুজয়ের বাবা বলেন, কাল সকালে যাবে। এখন অনেক রাত হয়ে গেছে। এই চিৎকার চেঁচামেচি শুনে পাড়ার সব লোক একে একে এসে জমা হয়। আপনার দলের ছেলেরা সবাইকে উপেক্ষা করে ঘরে ঢুকে সুজয়কে টেনে বের করে টাটা সুমোতে করে নিয়ে যায়। সুজয়ের বাড়ির সবাই মিলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়, পাড়ার লোকেরা ভয়ে কেউ বাধা দিতে আসেনি।
কফি শেষ করে একটি সিগারেট ধরিয়ে অঞ্জন বলে, ওটা বাঁশবাড়িয়া পৌরসভায় পড়ে, তাই তো?
ইন্দ্রজিৎ বলে— হ্যাঁ, ওটা বাঁশবাড়িয়া পৌরসভার শেষ ওয়ার্ড। ছেলেটির বাড়ি সপ্তগ্রাম বিধানসভায় আর লাশটি পাওয়া গেছে বলাগড় বিধানসভায়।
অঞ্জন বলে, আপনি তদন্ত করে দেখেছেন সে সত্যিই আমার দলের ছেলেরা এই খুনের সঙ্গে জড়িত কী না?
ইন্দ্রজিৎ সরকার বলে— হ্যাঁ। আমি কাল রাত বারোটার সময় খবর পাই বিরোধী দলের নেতার কাছ থেকে, সুজয়কে আপনার দলের ছেলেদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজেই ছুটে যাই কিন্তু আমি পৌঁছে দেখি মার্ডার হয়ে গেছে।
অঞ্জন জিজ্ঞাসা করে— কে কে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত?
ইন্দ্রজিৎ বলে— সন্টু, কেস্ট, শিবু আর আশীষ সরাসরি জড়িত। আর পেছনে রয়েছে গোপাল চন্দ্র সেন, কার্তিক মজুমদার ও নরেশ সাহা।
অঞ্জন জিজ্ঞাসা করে, আপনি প্রমাণ করতে পারবেন এরা এই খুনের সঙ্গে জড়িত?
ইন্দ্রজিৎ বলল— হ্যাঁ, প্রমাণ করা যাবে।
অঞ্জন বলে, তো আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন?
ইন্দ্রজিৎ সরকার জিজ্ঞাসা করে— আমি কী করব?
অঞ্জন বলে, কী করব মানে?
ইন্দ্রজিৎ সরকার বলল, এই খুনের সঠিক তদন্ত করব? না অন্যভাবে ফাইল বন্ধ করে দেব?
অঞ্জন রাগতস্বরে বলে, আমি আপনাকে আগেই বলেছি আপনি একজন পুলিশ অফিসার। এটা ভুলে যাবেন না। আপনি আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন। আমার দলের নেতারা যদি অপরাধী হন তবে তাদের শাস্তি হবে, আপনি আপনার ডিউটি পালন করুন।
অঞ্জন উঠে দাঁড়ায় আর বলে— আপনি এখন আসতে পারেন।
অঞ্জন তার দলের লোকদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে ইন্দ্রজিতের দেওয়া খবরটা যাচাই শুরু করল। বড় নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রী অঞ্জনকে ফোনকল করে জানতে চাইল পুরো ঘটনা। দেখতে দেখতে বেলা বাড়তে শুরু করল আর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিভির খবর চ্যানেল থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়াতে সুজয়ের খুন নিয়ে নানা রকম আলোচনা সমালোচনা হতে লাগল। ত্রিবেণী রেলস্টেশনে যাত্রীরা সুজয় দাসের খুনের প্রতিবাদে রেল ধর্মঘট শুরু করল। বাঁশবাড়িয়া পৌরসভাজুড়ে চলতে লাগল শোক মিছিল। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে প্রমাণ করতে শুরু করল সুজয় দাস তাদের দলের নেতা। টিভিতে খবরের চ্যানেলগুলোতে দেখানো হচ্ছে সুজয়ের বাড়ির লোকেদের ইন্টারভিউ। ত্রিবেণী বাসস্ট্যান্ডে সুজয়ের খুনিদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে মহিলারা ধর্নায় বসল। খবরের চ্যালেনগুলোয় বারংবার টেলিকাস্ট হতে লাগল রাজ্যের বিরোধী দলনেতা এবং কিছু বড় মাপের বিরোধী নেতা আসছে সুজয়ের বাড়িতে তার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। পুলিশ অফিসার ইন্দ্রজিৎ সরকারের সঙ্গে অঞ্জন একাধিকবার ফোনে কথা বলেছেন, তদন্তের অগ্রগতি জানার জন্য। বেলা সাড়ে এগারোটার সময় মুখ্যমন্ত্রী নিজে ফোন করে অঞ্জনকে বলল, তুমি সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নাও, যাতে দলের বদনাম না হয়।
অঞ্জন সকাল থেকে বুঝে উঠতে পারছিল না কী করে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করবে, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে একটু সাহস পেয়েছেন। দুপুর আড়াইটার সময় অঞ্জনের বাড়ির সামনে জমা হলো প্রায় সকল টিভি চ্যানেল আর খবর কাগজের সাংবাদিক। অঞ্জন কিছুটা বাধ্য হয়েই সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত হন। একে একে অঞ্জনকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন…
আপনার দলের ছেলেরা কেন সুজয় দাসকে খুন করল?
নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরিয়ে কী লাভ?
আপনি কি গিয়েছিলেন সুজয় দাসের বাড়িতে?
এত কম বয়েসে এত বড় পদ পেয়েছেন আপনি, এভাবে খুন করানোর জন্য?
মানুষ আপনাদের বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছেন, নিরীহদের হত্যা করার জন্য?
কতদিন চলবে এভাবে বিরোধী দলের কর্মীদের হত্যা?
ভোটে জেতার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে চলছে হত্যা। এই বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?
আপনি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রয়েছেন কেন?
মুখ্যমন্ত্রী কি আসবেন সুজয় দাসের বাড়িতে?
সুজয় দাসের খুনিদের কী শাস্তি হবে?
একনায়কতন্ত্রের মতো আপনার দল কী রাজ্য থেকে সব বিরোধী কণ্ঠ রোধ করতে চায়?
রক্তমাখা হাতে ভাত খান কী করে?
এত প্রশ্ন হওয়ার পড়েও অঞ্জন চুপ করে কিছু একটা চিন্তা করছিলেন, তার চোখ দুটি অব্যক্ত ব্যথায় ছলছল করছিল। একজন মহিলা সাংবাদিক একটা প্রশ্ন করতেই অঞ্জনের চেতনায় ধাক্কা লাগে। মহিলা সাংবাদিক প্রশ্ন করে কিছুদিন আগে বিরোধী দলের এক বিশেষ নেতা তর্পণ করেন কলকাতা, কাশীপুর সর্বমঙ্গলা ঘাটে। অঞ্জন জিজ্ঞাসা করে কী জন্য অসময়ে তর্পণ করেছেন? মহিলা সাংবাদিক বলেন, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন গণতন্ত্র হত্যার কাজ সরকারের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলের হিংসার আর রক্তলোলুপতার বলি হয়েছেন আমাদের ২০০ অধিক কার্যকর্তারা। তাঁদের সকলের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণ করলাম।
অঞ্জন হেসে বলল, বুঝতে পেরেছি কে এমন পাগলাটে কথা বলতে পারে। আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেব। এর আগে আমার মনে পড়ে যাওয়া একটা গল্প আপনাদের শোনাই। গল্পটা হয়তো কিছুটা সময় নষ্ট করবে কিন্তু এমন সময় গল্পটা শোনানো দরকার। অঞ্জন গল্প বলতে শুরু করে।
আজ থেকে প্রায় বছর কুড়ি আগে সাত বছরের একটি ছেলে মামা বাড়ি থেকে মা ও বাবার সঙ্গে বাসে করে ফিরছিল। বাবা ও মা বাসের সিটে বসে থাকলেও ছেলেটি বাসজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, মা ও বাবা তাদের কাছে বসতে বললেও ছেলেটির তাদের ডাকে সাড়া না দিয়ে নিজের মতোই মজা করছিল। বাসের অনেক প্যাসেঞ্জার বাচ্চাটির এই ধরনের আচরণ দেখে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল কিন্তু কিছুই বলতে পারছিল না। হাজরার মোড়ের কাছে রাস্তায় বিশাল জ্যাম তাই বাস দাঁড়িয়ে পড়ল। প্যাসেঞ্জার কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করে কী জন্য রাস্তায় জ্যাম? বাসের গেট থেকে নেমে খালাসি বলল, সরকারি দলের বিশাল বড় মিছিল যাচ্ছে তাই রাস্তায় জ্যাম বেঁধে গেছে। কখন জ্যাম খালি হবে ঠিক বুঝতে পারছি না।
গরমের মধ্যে বাসের ভেতরে বসে বসে সব প্যাসেঞ্জার বিরক্ত হয়ে নানা রকমের ফালতু কথা বলতে শুরু করে। বাচ্চা ছেলেটি এই পরিস্থিতিতে একইরকমভাবে বাসের ভিতরে ছোটাছুটি করে খেলছিল। একজন প্যাসেঞ্জার উঠে বলল— দাদা, বাচ্চাকে কোলে নিয়ে নিন।
বাচ্চা ছেলেটিকে তার বাবা ডাকে— বাবু বাবু, এখানে আয়।
একজন প্যাসেঞ্জার বলে, সিট ছেড়ে এসে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে যেতে পারছেন না?
লোকটি বাধ্য হয়েই ছেলেকে কোলে নিয়ে বাসের সিটে বসে। ছেলেটি বাবার কোলে বসে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে— আমাকে ছেড়ে দাও। আমি বসব না।
ছেলেটির চিৎকার চেঁচামেচি, দাঁড়িয়ে থাকা, বাসে বসে থাকা প্যাসেঞ্জারদের অতিষ্ঠ করে দিচ্ছিল। ছেলেকে শান্ত করার জন্য বাবা বলেন, এই রাস্তা দিয়ে সোজা গেলে বাম দিকে পড়বে কালীঘাট।
ছেলেটি জিজ্ঞাসা করে, কী আছে কালীঘাটে? বাবা বলতে শুরু করেন— কালীঘাটের মা কালী অত্যন্ত জাগ্রত। এই মন্দিরের দশনার্থীরা কখনোই খালি হাতে ফেরত যায় না। কালীঘাট সতীর একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম হিন্দু তীর্থক্ষেত্র। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর তাঁর ডান পায়ের চারটি আঙুল এই তীর্থে পতিত হয়েছিল। কলকাতা মহানগরীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান এই কালীঘাটের মন্দির।
মন দিয়ে বাবার গল্প শুনছিল ছেলেটা। বাস কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল আর প্যাসেঞ্জাররাও গরমে বাসের ভেতর হাঁসফাঁস করতে শুরু করে। বাবা গল্প এগিয়ে নিয়ে যান। বলেন, কালীঘাট কালী মন্দিরের কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিটি অভিনব রীতিতে নির্মিত। মূর্তিটির জিভ, দাঁত, মুকুট, হাত ও মুণ্ডমালাটি সোনার। মন্দিরের মধ্যে একটি সিন্দুকে সতীর প্রস্তরীভূত অঙ্গটি রক্ষিত আছে; এটি কারওর সম্মুখে বের করা হয় না। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপূজা ও দীপান্বিতা কালীপূজার দিন এই মন্দিরে প্রচুর ভক্তের সমাগম ঘটে। শিবরাত্রি ও নীলষষ্ঠী উপলক্ষেও এই মন্দিরে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। এছাড়াও, বছরের প্রায় সবসময়ই এখানে ভক্তদের ভিড় লক্ষ করা যায়। এতো গল্পের পড়েও বাসের চাকা একটুকু ও গড়ায় না। লোকেরা মিছিল করা রাজনৈতিক দলের প্রতি বিরক্ত হয়ে গালাগালি করতে শুরু করে। বাসের ভেতর থাকা প্রতিটি মানুষের ভিতর সেইদিন পশুত্ব জেগে উঠেছিল। গল্প শেষ হতেই বাচ্চা ছেলেটি আবার বাবার কোল থেকে নেমে যায়।
একজন প্যাসেঞ্জার বলে, বাচ্চা সামলাতে পারেন না তো জন্ম দেন কেন?
ছেলের বাবা আবার ছেলেকে কোলে নিয়ে বলেন— তুই জানিস, কালীঘাট কালী মন্দিরের অপরদিকে কার বাড়ি?
ছেলেটি জিজ্ঞাসা করে— কার বাড়ি?
বাবা বলেন, দিদির বাড়ি।
ছেলেটি বলে, আমি দিদির বাড়িতে যাব।
বাবা বলেন, দিদির বাড়ি যাওয়া যায় না।
ছেলেটি বলে, কেন যাওয়া যায় না?
বাবার মুখে কোনো উত্তর নেই। ছেলেটি বলে, আমি এখন দিদি বাড়িতে যাব।
ছেলেটির মা বলেন, এখন নয়। আমরা অন্য একদিন দিদির বাড়িতে আসব।
ছেলেটি বলে, আমি এখনই দিদির বাড়িতে যাব।
ছেলেটির মা আর সংযত থাকতে না পেরে বসিয়ে দেন ছেলের পিঠে থাপ্পড়। থাপ্পড় খেয়ে ছেলেটি চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। আর সাথে বলে, আমি দিদি বাড়িতে যাব।
ছেলেটির এই আচরণে বাসের সবাই প্রায় একসাথে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে আর বলতে থাকে— দাদা, আপনারা ছেলেকে নিয়ে বাস থেকে নেমে যান।
বাসের কন্ডাক্টর সবাইকে থামানোর চেষ্টা করে কিন্তু মানুষ নিজেদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। ভ্যাপসা গরম, রাস্তার জ্যাম, গন্তব্যে ফেরার চিন্তা, সময় নষ্ট আর রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনা ছাড়া মিছিল সব মিলিয়ে বাসের মধ্যে থাকা মানুষের মধ্যে পশুত্ব জেগে উঠেছিল। ছেলেটি কিন্তু চিৎকার করে বলতে থাকল— আমি দিদি বাড়িতে যাব।
একজন প্যাসেঞ্জার বলে উঠল— দাদা, আপনি ছেলে নিয়ে নেমে যান। নয়তো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে আপনাকে বাস থেকে নামিয়ে দেব।
একজন মহিলা বলল, ছেলেটাকে ঠেলে ফেলে দেব বাস থেকে।
কোনো উপায় না দেখে বাচ্চা ছেলেটিকে জোর করে হাত ধরে টানতে টানতে বাস থেকে নেমে পড়ে তার বাবা আর মা।
ভিড় ঠেলে ছেলেকে নিয়ে এগোতে থাকেন তার বাবা কিন্তু ছেলে বাবার হাত ছাড়াবার চেষ্টা করতে থাকে। ছেলেটা বাবার হাত ছড়িয়ে রাস্তার ফুটপাতের উপর শুয়ে চিৎকার করতে থাকে— আমি যাব না, আমি দিদিবাড়ি যাব।
একদিকে গাড়ির হর্নের আওয়াজ, মানুষের চেঁচামেচি অন্যদিকে গাড়ির জ্যাম। এর মধ্যে ছেলের এমন বেয়াদব আচরণে তার বাবা ও মা কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। ছেলেটির মা ছেলেকে জোর করে কোলে নিলে ছেলেটি মায়ের চুল ধরে টানতে শুরু করে আর বলতে থাকে— আমি দিদিবাড়ি যাব।
এই ঘটনা দেখে রাস্তায় চলতে থাকা কিছু মানুষ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এমন সময় পাশের চায়ের দোকান থেকে একটি স্বাস্থ্যবান, লম্বা, কালো লোক এগিয়ে আসে বাচ্চা ছেলেটির কাছে। গম্ভীর গলায় লোকটি বাচ্চাটির বাবাকে জিজ্ঞাসা করল— কী ব্যাপার বলুন তো মশাই? বাচ্চা ছেলেটি কে?
ছেলেটির বাবা বলেন, আমার ছেলে।
লোকটি বলল, কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে ছেলেটি আপনাদের নয়, কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছেন।
ছেলেটির মা বলে, কী বলছেন আপনি! এটা আমাদের ছেলে।
লোকটির সন্দেহ কিছুই মাত্র কম হয়নি। তাই সে ঝুঁকে রাস্তার মাঝে বসে থাকা বাচ্চা ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে— এরা দুজন কে হয় তোমার?
ছেলেটি একটু ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে বসে রইল। লোকটি ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে জিজ্ঞাসা করে— তোমার মা কোথায়? ছেলেটি ইশারা করে দেখায় নিজের মাকে।
লোকটি জিজ্ঞাসা করে— তোমার বাবা? ছেলেটি হাত দিয়ে ইশারা করে বলে, ঐ যে আমার বাবা।
লোকটি ছেলেটির উত্তর শুনে একটু লজ্জা পেয়ে যায় আর ছেলেটির বাবার কাছে গিয়ে বলেন কিছু মনে করবেন না। আমি ভুল বুঝে ছিলাম।
লোকটি জিজ্ঞাসা করল, কী জন্য আপনার ছেলে এমন বায়না করছে?
বাচ্চা ছেলেটির বাবা বলেন, ও দিদির বাড়ি যাওয়ার জন্য বায়না করছে।
লোকটি বলল, তবে নিয়ে যান ওর দিদির বাড়ি।
ছেলেটির বাবা বলেন, সেটা সম্ভব নয়।
লোকটি বলল, কেন সম্ভব নয়? কোথায় ওর দিদির বাড়ি?
ছেলেটির বাবা বলেন, কালীঘাটে।
লোকটি বলল, তবে তো সামনেই। নিয়ে যান।
ছেলেটির মা বলেন, এই দিদি সেই দিদি নয়।
লোকটি বলল, এই দিদি সেই দিদি নয় মানে?
ছেলেটির বাবা বলেন, আমার ছেলে যেতে চাইছে বিরোধী নেত্রী দিদির বাড়ি।
লোকটা শুনে হো হো করে হেসে উঠল। তারপর বলল— চলুন, আমি আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি দিদির বাড়িতে।
ছেলেটির বাবা বলেন— না না, উনি খুব ব্যস্ত মানুষ। এই সামান্য ব্যাপারে ওনাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না।
লোকটি বলল, আরে দাদা, আপনি অত ভয় পাচ্ছেন কেন?
ছেলেটির বাবা বলেন, উনি ব্যস্ত মানুষ। এই বাচ্চার বায়না মেটাতে ওনার বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া আমাকে উনি চেনেন না। কেন দেখা করবে আমাদের সঙ্গে?
লোকটি বলল, দিদি বাংলার সবাইকে চেনেন আর জানেন, সেই জন্যই উনি আমার আপনার সবার দিদি। আপনি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চলুন আমার সঙ্গে উনি বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে খুবই ভালোবাসেন। লোকটি বাচ্চা ছেলেটিকে বলল, চল তোমার দিদি বাড়ি।
ছেলেটি উঠে লোকটির হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল কালীঘাটের দিকে, ছেলেটির বাবা, মা উপায় না দেখে তারাও পা এগোলো ছেলের পিছু পিছু।
গল্পটি শুনে সাংবাদিকরা এতে কিছুই রস পেলেন না তাই একে একে বলতে শুরু করল এই গল্পের অর্থ কী? এমন সময় সাংবাদিকদের জন্য শরবত নিয়ে এলো অঞ্জনের বাড়ির চাকর, একে একে প্রায় সবাই শরবতের গ্লাস তুলে নিল হাতে। অঞ্জন বলল, শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে কী করে রস পাবেন? আগে গলায় ঢালুন তবেই তো রস পাবেন! আর বুঝতে পারবেন শরবত মিষ্টি, টক নাকি তেতো।
অঞ্জন আবার বলল, তবে গল্প শুরু করি?
অনিচ্ছাসত্ত্বেও সাংবাদিকরা বলল, বলুন।
অঞ্জন বলতে শুরু করে…
লোকটির হাত ধরে ছেলেটি গিয়ে পৌঁছোয় ৩০বি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে। ছেলেটি লোকটির হাত ধরে, টালির ঘরে ঢুকে দেখেন একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা কিছু পড়াশোনা করছেন। শুভ্র পোশাকে মহিলাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন দেবলোক থেকে নেমে এসেছেন স্বয়ং মা সরস্বতী। ছেলেটি লোকটি জিজ্ঞাসা করেন, উনি কে?
লোকটি বলল, উনি আমাদের দিদি।
দিদি গলার আওয়াজ শুনে মুখ তুলে তাকায়। এর মধ্যে ছেলেটির মা ও বাবা প্রবেশ করে ঐ ঘরে। দিদি লোকটিকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, কী রে মানিক কী হয়েছে?
মানিক বলল— দিদি, এই বাচ্চা ছেলেটি আপনার বাড়িতে আসার জন্য হাজরা মোড়ের ফুটপাতে শুয়ে বায়না করছিল।
দিদির মুখে মিষ্টি হাসি খেলে যায়। হাত বাড়িয়ে দিদি নিজের কাছে ডেকে নেন বাচ্চা ছেলেটিকে আর বসিয়ে নেয় নিজের কোলে। মানিক ছেলেটির বাবা ও মাকে বসতে দেয় ঐ ঘরের মধ্যে থাকা চেয়ারে।
দিদি ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কোন ক্লাসে পড়?
ছেলেটি দিদির কোলে বসে উত্তর দেয়, ক্লাস থ্রিতে পড়ি।
দিদি জিজ্ঞাসা করেন, তোমার নাম কী?
ছেলেটি বলে, অঞ্জন গুহ।
নামটি শুনেই সাংবাদিকদের মধ্যে কানাফুশি শুরু হয়ে যায়। অঞ্জন বলে, পাচ্ছেন গল্পের রস?
একজন মহিলা সাংবাদিক বলেন— স্যার, আপনি গল্পটা বলুন। অঞ্জন আবার বলতে শুরু করে…
দিদি অঞ্জনকে জিজ্ঞাসা করেন— তোমার বাবার নাম কী?
অঞ্জন বলে, অমিত গুহ।
কী করেন বাবা? জিজ্ঞাসা করেন দিদি।
অঞ্জন বলে, আমার বাবা আমাদের স্কুলের হেডমস্টার।
দিদি হাত জোড় করে প্রধান শিক্ষক অমিত গুহ ও তার স্ত্রীকে নমস্কার জানান। অমিত গুহ ও তার স্ত্রী নমস্কারের বিনিময়ে নমস্কার জানান।
দিদি বলেন— মানিক, তুই দাঁড়িয়ে কী শুনছিস! যা শিক্ষক মহাশয় ও ওনার স্ত্রীর জন্য চায়ের ব্যবস্থা কর।
মানিক বেরিয়ে যায় চা আনতে।
দিদি বলেন, তা অঞ্জন বাবু, তোমার বাবা ও মা চা খাবেন। তুমি খাবে?
অঞ্জন বলে, আমি কিছুই খাব না।
দিদি বলেন, সেটা কী করে হয়? তুমি এই প্রথম আমার বাড়িতে এসেছ তুমি কিছু খাবে না সেটা তো হবে না। তুমি বসো আমি তোমার জন্য রসগোল্লা নিয়ে আসি।
দিদি অঞ্জনকে নিজের চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেলেন। অমিত গুহ ও তার স্ত্রী শুনেছিলেন দিদির এমন মিশুকে ব্যবহারের গল্প। আজ সামনে থেকে এমন ব্যবহার দেখে নিজেদের ধন্য মনে করলেন।
দিদি নিজেই দুটো প্লেটে দুটো করে রসগোল্লা, দুটো করে সন্দেশ আর একটি বাটিতে একটি রসগোল্লা আর দুটো সন্দেশ নিয়ে ঘরে ঢোকেন। দিদি প্রবেশ করতেই অমিত গুহ ও তার স্ত্রী উঠে দাঁড়ান। দিদি হেসে বলেন, আমি আপনার মতন শিক্ষক নই যে ঘরে ঢুকলেই উঠে দাঁড়াতে হবে! বসুন বসুন। একটু মিষ্টিমুখ করে নিন।
দিদি মিষ্টির প্লেট দুটো অমিত গুহ আর তার স্ত্রীকে দিয়ে, মিষ্টির বাটি নিয়ে এগিয়ে যায় অঞ্জনের দিকে। তারপর পুনরায় অঞ্জনকে কোলে বসিয়ে নিজে হাতে রসগোল্লা খাওয়াতে শুরু করেন। দিদি বলেন, মিষ্টি খাওয়া শেষ করে অঞ্জন তোমাকে কিন্তু একটা কবিতা শোনাতে হবে। অঞ্জন রসগোল্লা মুখে থাকার কারণে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। মিষ্টি খাওয়া শেষ হতেই মানিক চা আর চানাচুর নিয়ে হাজির হয়। দিদি বলে— অঞ্জন, একটা কবিতা শোনাও।
অঞ্জন কবিতা বলতে শুরু করে…
হিন্দু-মুসলমান
কাজী নজরুল ইসলাম
মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।
এক সে আকাশ মায়ের কোলে
যেন রবি শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।
এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল,
এক সে মায়ের বক্ষে ফলে এক ফুল ও ফল।
এক সে দেশের মাটিতে পাই
কেউ গোরে কেউ শ্মশানে ঠাঁই,
মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান।
চিনবে নেরে আঁধার রাতে করি মোরা হানাহানি,
সকাল হলে হবে রে ভাই ভায়ে ভায়ে জানাজানি।
চাইবো ক্ষমা পরস্পরে,
হাসবে সেদিন গরব ভরে এই হিন্দুস্থান।
কবিতা শেষ হতেই দিদি জড়িয়ে ধরেন অঞ্জনকে।
অঞ্জন বলে, তুমি একটি কবিতা শোনাও।
দিদি বলেন, ঠিক আছে। তোমাকে আমার লেখা একটা ছড়া পাঠ করে শোনাচ্ছি।
দিদি পাঠ করতে শুরু করেন…
এপাং ওপাং ঝপাং/ সুর ধরেছে পটাঙ
ব্যাঙ ডাকে গ্যাঙ গ্যাঙ/ হাতির কতো বড় ঠ্যাং
হরে কর কমবা/ গরু ডাকে হাম্বা
গর্জন করে অম্বা/ মা ডাকেন বুম্বা
হরে কর কমবা/ ডব্বা ডব্বা রব্বা
হুড়হুড় করে হুম্বা/ তোবা তোবা আব্বা।
ছড়া শুনে অঞ্জন আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে। অমিত গুহ বলল— দিদি, আমরা তবে আজ আসি?
ঠিক আছে, সাবধানে যাবেন।
দিদি আরও বলেন— মানিক, ওনাদের একটু এগিয়ে দিয়ে আয়।
অঞ্জন জিজ্ঞাসা করে, তোমাকে তো বাবা দিদি ডাকছে। তবে আমি তোমাকে কী বলে ডাকব?
দিদি বলেন, ঠিকই তো, তুমি বলো আমাকে কী বলে ডাকবে?
অঞ্জন বলে, আমি তোমাকে পিসি বলে ডাকব।
দিদি বলেন, ঠিক আছে। তাই ডাকবে।
অঞ্জন বলে— পিসি, আমি তো তোমাদের বাড়িতে এলাম। তুমি একদিন আমাদের বাড়ি যেও।
দিদি বললেন, ঠিক আছে, যাব।
অঞ্জন বলে, কী করে যাবে তুমি?
দিদি বলে, কেন? অঞ্জন বলে তুমি তো আমাদের বাড়ি চেনো না।
দিদি বলে, তবে তুমি তোমার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে যাও।
অঞ্জন ঠিকানা বলে— সংগ্রামপুরগ্রাম, পোলবা, হুগলি।
দিদি বলে মানিক আমার ডাইরির পেছনে ঠিকানাটা লিখে রেখে দে।
সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করে— এরপর কী হলো?
অঞ্জন আবার বলতে শুরু করে…
এই ঘটনার প্রায় তিন বছর পর বিধানসভা ভোটের আগে দিদি পোলবার হাসপাতাল ময়দানে জনসভা করতে আসেন। হাসপাতাল ময়দানে জনসভা শেষ করে সোজা এসে ওঠেন প্রধান শিক্ষক অমিত গুহর বাড়িতে। প্রধান শিক্ষক অমিত গুহর বাড়ি ঘিরে ফেলে দিদির সিকিউরিটি। মিডিয়া ছেয়ে যায় গ্রামজুড়ে। সারা গ্রামের লোক জড়ো হয় দিদিকে দেখার জন্য প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে। সরকারি দলের লোকজন ঘটনাটাকে সহজ করে হজম করতে পারেন না। দিদি বাড়িতে পৌঁছে বলেন, অঞ্জনকে কথা দিয়েছিলাম ওর বাড়িতে আসব। তাই খবর না দিয়েই চলে এলাম।
অঞ্জন মনে করতে পারল না যে এটা তার কোন পিসি। পিসি যেহেতু তার জন্য রসগোল্লা আর সন্দেশ নিয়ে এসেছিলেন তাই সে ছিল খুবই খুশি। দিদি বললেন, যখন শুনলাম পোলবাতে জনসভা আছে তখন মনে পড়ে গেল অঞ্জনকে দেওয়া কথা। তাই ডাইরি খুঁজে ঠিকানা বের করে চলে এলাম। অঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে।
গ্রামের লোকজন দিদির এই আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। গ্রামের অনেক মানুষ প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে এভাবে আসার পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র খুঁজতে শুরু করল। দিদি অঞ্জনের মুখ থেকে আগের দিনের মতন একটি কবিতা শুনতে চাইল। অঞ্জন আনন্দের সঙ্গে কবিতা শুরু করল…
ঝড়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ে,
ঝড় এল রে আজ—
মেঘের ডাকে ডাক মিলিয়ে
বাজ্ রে মৃদঙ বাজ্।
আজকে তোরা কী গাবি গান
কোন্ রাগিণীর সুরে।
কালো আকাশ নীল ছায়াতে
দিল যে বুক পুরে।
বৃষ্টিধারায় ঝাপসা মাঠে
ডাকছে ধেনুদল,
তালের তলে শিউরে উঠে
বাঁধের কালো জল।
পোড়ো বাড়ির ভাঙা ভিতে
ওঠে হাওয়ার হাঁক,
শূন্য খেতের ও পার যেন
এ পারকে দেয় ডাক।
আমাকে আজ কে খুঁজেছে
পথের থেকে চেয়ে।
জলের বিন্দু পড়ছে রে তার
অলক বেয়ে বেয়ে।
মল্লারেতে মীড় মিলায়ে
বাজে আমার প্রাণ,
দুয়ার হতে কে ফিরেছে
না গেয়ে তার গান।
আয় গো তোরা ঘরেতে আয়,
বোস্ গো তোরা কাছে।
আজ যে আমার সমস্ত মন
আসন মেলে আছে।
জলে স্থলে শূন্যে হাওয়ায়
ছুটেছে আজ কী ও।
ঝড়ের ’পরে পরান আমার
উড়ায় উত্তরীয়।
আসবি তোরা কারা কারা
বৃষ্টিধারার স্রোতে
কোন্ সে পাগল পারাবারের
কোন্ পরপার হতে।
আসবি তোরা ভিজে বনের
কান্না নিয়ে সাথে,
আসবি তোরা গন্ধরাজের
গাঁথন নিয়ে হাতে।
ওরে, আজি বহু দূরের
বহু দিনের পানে
পাঁজর টুটে বেদনা মোর
ছুটেছে কোন্খানে—
ফুরিয়ে-যাওয়ার ছায়াবনে,
ভুলে-যাওয়ার দেশে,
সকল-গড়া সকল-ভাঙা
সকল গানের শেষে।
কাজল মেঘে ঘনিয়ে ওঠে
সজল ব্যাকুলতা,
এলোমেলো হাওয়ায় ওড়ে
এলোমেলো কথা।
দুলছে দূরে বনের শাখা,
বৃষ্টি পড়ে বেগে,
মেঘের ডাকে কোন্ অশান্ত
উঠিস জেগে জেগে।
কবিতা শেষ হতেই দিদি হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন, তুমি অনেক বড়ো মানুষ হও।
সন্ধ্যায় চপ, মুড়ি আর চা খেয়ে দিদি প্রধান শিক্ষক অমিত গুহের বাড়ি ছাড়লেন। দিদি বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার লোকেরা একে একে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করল— কীভাবে দিদির সঙ্গে গুহ পরিবারের পরিচয়?
অমিত গুহ ও তার স্ত্রী স্বপ্না গুহ পরিচয়ের গল্প সবাইকে শোনালেও গ্রামের লোক ঠিক মেনে নিতে পারল না। সরকারি দলের এক নেতা প্রধান শিক্ষকের কানে কানে বলল— মাস্টার, কাজটা ঠিক হলো না, আমাদের দৌলতে চাকরি পেয়েছেন, হেডমাস্টার হয়েছেন আর আমাদের সাথে বেইমানি।
অমিত গুহ বললেন, কী বেইমানি?
সরকারি দলের নেতা বলল, ভেতরে ভেতরে দিদির সঙ্গে যোগাযোগ, আমরা সময় মতোন দেখে নেব।
অঞ্জন নিজের চোখের কোনে আসা জল মুছে বলল, সেই বছর রাজ্যজুড়ে বিধানসভা ভোট হয়। বিধান সভার নির্বাচিত ২৯৪টি আসনের মধ্যে দিদির দল পায় মাত্র ৩০টি আসন। দিদির দল অঞ্জনদের বিধানসভার আসনটি হেরে যায়। এর ফলে রাজ্যজুড়ে শুরু হয় হার্মাদ বাহিনীর তাণ্ডব। দিদির দলের লোকজন নানাভাবে খুন হতে শুরু হয়।
একজন সাংবাদিক এই কথায় অঞ্জনের বিরোধিতা করে বলেন, আপনি যা তথ্য দিচ্ছেন তা সঠিক নয়।
অঞ্জন বলে, ঠিক আছে। তথ্য মিথ্যে হতে পারে কিন্তু আমার গল্প মিথ্যে নয়। এই ঘটনার ঠিক মাসখানেক পর একদিন ঝড় বৃষ্টির সন্ধ্যায় প্রধান শিক্ষক অমিত গুহ, অসুস্থ ছেলের জন্য ওষুধ নিতে বের হন কিন্তু আর ফেরেন না। একজন মহিলা সাংবাদিক প্রশ্ন করে— কী হয়েছিল প্রধান শিক্ষকের?
অঞ্জন বলে, প্রধান শিক্ষকের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল ঐ গ্রামের কদমতলায় পুকুরপাড়ে সাইকেলের নিচে। সরকারি দলের লোকজন কাস্তে দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করেছিল। কেননা তাদের মনে হয়েছিল প্রধান শিক্ষক লুকিয়ে লুকিয়ে দিদির দল করছেন। আর সেই জন্যই দিদি তার বাড়িতে এসে চপ আর মুড়ি খেয়ে গেছেন।
একজন মহিলা সাংবাদিক প্রশ্ন করে— স্যার, অমিত গুহ কি আপনার বাবা ছিলেন?
অঞ্জন বলে, আপনি ঠিক বলেছেন। হ্যাঁ প্রধান শিক্ষক অমিত গুহ ছিলেন আমার বাবা।
সকল সাংবাদিক একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এল না আর কোনো প্রশ্ন।
অঞ্জন বলে, সেই খুনের তদন্ত আজ পর্যন্ত হয়নি। আপনারা বললেন না আমাদের রাজত্বে এই ধরনের খুন হচ্ছে তাই গল্পটা শোনালাম। স্বাধীনতার পর থেকে এই রাজ্যে এমন অনেক অনেক খুন হয়েছে, এই ধরনের খুন করার রাজনীতি কোনো রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য নয়। মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত কারনে খুন করে থাকে, যারা এই সব ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদেরকে বলা হয় খুনি বা অপরাধী। গণতন্ত্রকে হত্যার কাজ আমাদের সরকারের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়নি, এটা আমাদের রাজ্যের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলের হিংসার বলি মানুষ হয় না। মানুষ বলি হয় মানুষের হিংসায়। মানুষের পশুত্ব আচরণ-কে রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে নেতারা রাজনীতি করছে। আমার বাবা অমিত গুহ যেদিন হত্যা হয়েছিল আমি নিশ্চিত যে তার নির্দেশ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী দেননি আর কাল যে সুজয় দাস মার্ডার হয়েছে তার নির্দেশ আমি বা আমার মুখ্যমন্ত্রী আমাদের দলের ছেলেদেরকে দেননি। প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই রয়েছে পশুত্ব। আমরা শিক্ষা, সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের মধ্যে থাকা পশুর আচরণগুলো লুকিয়ে ফেলে সভ্য মানুষ সেজে থাকি। রাতের অন্ধকারে কিংবা নেশার ঘোরে আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয় পশুত্ব আর সেই পশুত্ব আচরণকে কাজে লাগিয়ে কিছু মানুষ অন্য মানুষকে হত্যা করায়। এই ধরনের হত্যাকে রাজনৈতিক দলের কাজ বলে ব্যাখ্যা করতে আমি রাজি নই। আগের সরকার এই ধরনের খুনিদের লুকিয়ে রেখেছিল কিন্তু আমাদের সরকার খুনিদের আশকারা দেবে না। সুজয় দাসের পরিবারের পাশে আমাদের দল রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সুজয় দাসের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হবে আর তার ছোট ভাইকে দেওয়া হবে সরকারি চাকরি। আগামীকাল মুখ্যমন্ত্রী আসবেন সুজয় দাসের পরিবারের দুঃখ ভাগ করে নিতে।
এমন সময় অঞ্জনের ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করে খুব ধীরে কথা বলে, অঞ্জন ফোন কেটে দেন। ফোন রেখে অঞ্জন বলে, আমাকে ফোন করেছেন পুলিশ অফিসার ইন্দ্রজিৎ সরকার। তিনি জানালেন সুজয় দাসের খুনে অভিযুক্ত চার জনের মধ্যে তিনজন ধরা পড়েছে আর একজন পালিয়েছে।
একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করলেন,
কে কে ধরা পড়েছে?
অঞ্জন বলল, আপনাদের সামনে ফোনে ইন্দ্রজিৎ সরকারের সঙ্গে কথা বললাম। এত কথা হয়নি তবে শুনলাম সন্টু পালিয়ে গেছে। আপনাদের প্রশ্নের ঝোলা নিয়ে এবার থানায় যান। দু’হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে অঞ্জন ঘরে ঢুকে যায়।
শেখর দাস
বাড়ি হুগলী জেলার ত্রিবেণী শহরে।
বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি ও বিএড করেছেন। বর্তমানে হুগলী জেলার অন্তর্গত হরিপাল ব্লকের একটি সরকারি স্কুলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষকতা করছেন।
কলেজ জীবন থেকেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন।
নানা ম্যাগাজিনে ও স্যোশাল মিডিয়ায় লেখালেখি করেন।
প্রায় সব ধরনের লেখাতেই সমান তাঁর দখল।
এই লেখাটি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর লিখেছেন।
কোনো দলের আলোচনা বা সমালোচনা করা লেখকের উদ্দেশ্য নয়।