
শেষবারের মতো প্রাণপণ চেষ্টা করে অমরনাথ একটু উঠে বসতে। কিন্তু নিকষ কালো সর্বগ্রাসী আঁধার এসে তার চোখে ভর করে। ভয়ঙ্কর ভারী সে আঁধার। চোখ বন্ধ করেও দেখতে পায় বিশ্বচরাচর ছেয়ে সুনামির জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রলয়নৃত্য করতে করতে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে অন্ধকারের একটা বিশাল প্রবাহ ধেয়ে আসছে। তারপর সবকিছু সে আঁধারে লুপ্ত হয়ে যায়। অমরনাথ নিথর পড়ে থাকে পাষাণ সড়কে।
চারপাশে তখন উৎসুক জনতার ভিড়— লোকটা মরে যায়নি তো! উত্তপ্ত যুবকেরা হন্যে হয়ে ড্রাইভারকে খুঁজছে— একজন বৃদ্ধ লোকের গায়ের উপর মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে কে? কেউ জল, কেউবা পাখা সংগ্রহে ব্যস্ত। সবাইকে চমকে দিয়ে অমরনাথের সমবয়সী এক বৃদ্ধ কিশোর নাতির হাতটা ধরে হেঁচকা টান মেরে শঙ্কিত গলায় বলে, এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে আয়। পুলিশ এসে গেলে ফ্যাসাদে পড়ে যাব সবাই।
অমরনাথের চোখে লেপ্টে থাকা আঁধার ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে। শরীরটা ঘামের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। তার মধ্যেও বৃদ্ধের কথাটা কানে যায়। সে ভাবতে চেষ্টা করে— কথাটা কি তাকে উদ্দেশ্য করেই বলছে? ধীরে ধীরে আঁধার কেটে গিয়ে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে ওঠে। অমরনাথ একবার উঠে বসার ব্যর্থ চেষ্টা করে। হাত-পা যেন তার ইচ্ছাধীন নয়। সে হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ করে পড়ে থাকে যতক্ষণ না ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষগুলো তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আনে।
কয়েকটা দিন সর্বাঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দেয় অমরনাথ। মাঝে মাঝে সে অ্যাকসিডেন্টের মুহূর্ত, পরিবার-পরিজনের কথা ভাবতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবকিছুতে কেমন যেন একটা ঔদাসীন্য, বীতস্পৃহা। বরং ঘুমিয়ে কাটাতে ভালো লাগে তার। ডাক্তার ও নার্সেরা মাঝে মাঝে পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করেছে, তাদের সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছে। কিন্তু অমরনাথের মনটা রাতারাতি সবকিছু থেকে নির্মোহ লাভ করে বেশ প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছে।
সদ্য ঘুমভাঙা শহরে ক্রমশ কোলাহল জেগে ওঠে। দীর্ঘ দিনের অভ্যাসমতো অমরনাথের মনটা প্রাতঃভ্রমণের জন্য উশখুশ করে। কিন্তু ডাক্তারের নিষেধ অমান্য করার দুঃসাহস হয় না তার। আস্তে আস্তে বিছানায় উঠে বসে। বামপাশে কাত হয়ে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিতেই শরৎ প্রভাতের সোনালি আলোর স্রোত তার ঘরখানা ভরিয়ে তোলে। বাইরে কেমন একটা মায়াবী নির্জনতা। নার্সিংহোমের তিনতলায় বসে চোখে পড়ে পাশাপাশি দু’টো সুপারিগাছে কতগুলো বাবুই পাখির বাসা সকালের মৃদু বাতাসে দুলছে। বাইরে আনমনে চেয়ে থাকতে থাকতে তার কানে আসে— ‘শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয়ে গান’। ভরাট-গম্ভীর গলা। পাশের রুম থেকে ভেসে আসছে বলে মনে হয়। কিন্তু কাল রাতেও তো সে উঁকি দিয়েছিল! সেখানে কেউ ছিল না, শুধু অন্ধকার! নিজের শারীরিক সমস্যার কথা বেমালুম ভুলে কখন যেন বিছানা ছেড়ে সেই রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায় অমরনাথ।
গলা শুনে অনুমান করা কঠিন যে লোকটা এত কৃশকায়। ডান পা-টা হাঁটুর কাছ থেকে কেটে ব্যান্ডেজ করে রাখা। দরজার দিকে পিছন ফিরে বালিশে হেলান দিয়ে বসে তন্ময় হয়ে গাইছে। পাশে এক রমণী তখনও ঘুমিয়ে। ওই লোকটার স্ত্রী হবে হয়তো। অমরনাথের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে, মাথাটা ঝিমঝিম করে। শরীরের একটা অঙ্গ হারিয়ে কেমন করে নির্বিকার চিত্তে গান গাইছে লোকটা! সে নিজের রুমে এসে গভীর ভাবনায় ডুবে যায়—
আজকাল প্রায়ই তার মরে যেতে ইচ্ছে করে। এটা অবশ্য বেশ কিছু দিন ধরে, অবসরে যাওয়ার কিছু দিন পর থেকে। অথচ দুই ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ছোট্ট সংসার। সুখে থাকারই কথা। মেয়ের বিয়ে হয়েছে চাকরি থাকতেই। জামাইকে নিয়ে বিদেশে থাকে। ছেলে মস্ত ইঞ্জিনিয়ার। উচ্চ শিক্ষিত স্ত্রী আর নিজে ছিল পদস্থ অফিসার। কী ছিল না তার! কিন্তু রিটায়ার্ড হতেই সবকিছু রাতারাতি পাল্টে যেতে শুরু করে। ঘরে পুত্র, পুত্রবধূ এমনকি স্ত্রী পর্যন্ত প্রত্যেকটা কাজে খুঁত ধরতে শুরু করে। জীবনটা রাতারাতি এক দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে।
অ্যাকসিডেন্টের দিনও সকালে হাত-মুখ ধুয়ে এসে সবে চা খেতে বসেছিল। এরই মধ্যে ছেলের অসহিষ্ণু গলা শোনা যায়— দেখ, বেসিনটার ট্যাপ ছেড়ে রেখেছে! বুড়ো হয়ে গেল তবু বেসিন ব্যবহার শিখল না। বাইরের কেউ এলে সে কী ভাববে! এর চেয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পুকুরে কাজ করা ভালো।
সম্প্রতি নিজের ভুলগুলো নিয়ে অমরনাথ সব সময়ই বিব্রত থাকে। কেন যে কিছু মনে থাকে না! এত চেষ্টা করে সবকিছু আগের মতো ঠিকঠাক করতে কিন্তু ভুলতার পিছু ছাড়ে না। অথচ কী নিখুঁত ছিল তার কর্মজীবন! বলতে গেলে সারা জীবন প্রশংসার জোয়ারে ভেসেছে। আর আজ সংসারে কেউ তার ভুলগুলো নমনীয়, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে না। সংসারের এই ক্ষমাহীন, নির্মম রূপ দেখে তার সারাজীবনের হিসাবনিকাশ ভুল হতে শুরু করে আর তখন থেকেই মৃত্যু চিন্তাটা স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে বুকের ভেতর।
অমরনাথের সে রাতে এমনিতেই ভালো ঘুম হয়নি। পেসমেকার বসানো হার্টে কিছু সমস্যা সব সময়ই লেগেছিল। তারপরে আছে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস। সকালবেলা বিগড়ানো শরীর-মন নিয়ে নিজেই মনোকষ্টে ছিল। তার উপর নিজের বাড়িতে যদি পদে পদে এত ভুল-ত্রুটি ধরে কারও মেজাজ ঠিক থাকে! চায়ে চুমুক দেওয়ার ইচ্ছেটা উবে যায়। জামাটা গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ে। হাঁটতে হাঁটতে কেবলই সকালের কর্কশ কথাগুলো কানে বাজছিল আর অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল। কখন যেন একটা মোটরসাইকেল এসে গায়ের উপর পড়ে। তারপর আর কিছু মনে করতে পারে না।
নিজের এই অক্ষমতা, পরিবর্তন মনের উপর একটা বিষণ্ন বোঝা হয়ে অমরনাথকে সব সময় মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সময়টুকু প্রকৃতির সহজ অথচ নির্মম নিয়মে ফুরিয়ে আসছে। তাই জীবনকে ঘিরে প্রচণ্ড এক আবেগ ভর করে থাকে মনে। সে জন্যই হয়তো ভুলের পরিমাণ আরও বেশি হয়, আরও বেশি বিস্মৃতি জেগে ওঠে। কী চমৎকার স্মৃতিশক্তি ছিল তার! কোনো কিছু একবার দেখলে, শুনলে বা পড়লে হুবহু তা মনে থাকত। আর আজকাল সকালে একটা কথা ভাবলে বিকেলে তা কিছুতেই মনে করতে পারে না। কখনো একা বসে নিজের সহপাঠী বা সহকর্মীদের কথা মনে করার চেষ্টা করে। হয়তো কারও ছবিটা ভেসে ওঠে কিন্তু সারাবেলা চেষ্টা করেও নাম মনে করতে পারে না। বিরক্তিতে মনটা ভরে ওঠে। প্রয়োজনের সময় সঠিক কথাটাও মুখে জোগায় না প্রায়ই। অথচ কি অনর্গল কথা বলতে পারত সে! শরীরটা দুর্বল হতে হতে এখন হাঁটতে গেলেও ভীষণ ক্লান্তি লাগে। তবু ডায়াবেটিকসের নিষ্ঠুর থাবা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে হেঁটে চলে রোজ। কাজ করতে গেলে নিজের অজান্তেই ভুল করে ফেলে আর তা নিয়ে কেউ সহানুভূতি জানাতে আসা তো দূরের কথা রূঢ় ভাষায় ভুলটাকে তার সামনে তুলে ধরে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে। তখন পরিবারের মানুষগুলোর সামনে মাথা নিচু করে থাকা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এই বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ভুলটাও দিন দিন বেড়ে চলে, বেড়ে চলে স্বজন-পরিজনদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন। আজকাল প্রায়ই সবাইকে ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে অমরনাথের। তিল তিল শ্রমে যাদের বড় করে তুলেছে সেই সন্তান যখন তুচ্ছ কোনো বিষয়ে শ্লেষ করে, কটূক্তি করে তখন ফুসফুস খালি করা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আর তার সাথে আসে মৃত্যু কামনা। কিন্তু একাকী যখন ভালো অথবা মন্দ স্মৃতিগুলোর জাবর কাটে তখন আর মরতে ইচ্ছে হয় না। বরং সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে, নিজের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।
ভাবনার ঘূর্ণি কখন যে তার অজান্তে তাকে পাশের রুমটায় নিয়ে যায় সে টের পায় না। হঠাৎ তার চোখে পড়ে ছোট্ট টেবিলটার উপর ক্রুশবিদ্ধ যীশুর একটা ছবি। সম্বিত ফিরতে সে চমকে ওঠে আর তখনই দৃষ্টি বিনিময় হয় এতক্ষণ ধরে গান গাওয়া লোকটার সাথে। হাত ও মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা বৃদ্ধকে দেখে লোকটা মুহূর্তের জন্য অবাক হয়। পর মুহূর্তেই মৃদু হাসিতে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে তার মুখমণ্ডল। একটা টুল দেখিয়ে বসতে বলে অপরিচিত বৃদ্ধকে। অমরনাথ লোকটার দিকে একবার তাকিয়ে টুলটার উপর দৃষ্টি ফেরায়। না বসে হঠাৎ প্রশ্ন করে, কাল রাতেও তো এদিকটা অন্ধকার ছিল। আপনারা কখন এসেছেন?
—রাত তখন গভীর। আপনাকে আমরা দেখেছি, তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। অন্য একটা নার্সিংহোম থেকে এসেছি তো! সেখানকার কাজ চুকিয়ে আসতে আসতে বেশ দেরি হয়ে গেল। বোঝেনই তো, প্রাইভেট নার্সিংহোম থেকে সহজে কি ছাড়তে চায়! ওদের লোকসান হবে না?
—আপনি এখনও তো সুস্থ নয়!
—তা ঠিক। এখানে থাকাটা খুব একটা ব্যয়বহুল হবে না বলে এসেছি। ওখানকার খরচ মেটাতে পারছিলাম না।
—কী হয়েছিল পায়ে?
—ক্যান্সার।
চমকে ওঠে অমরনাথ। বুকে পেসমেকার বসানো জায়গায় হাতটা নিজের অজান্তেই চলে যায়। বিস্ময়ে তার মুখ থেকে শব্দ বেরোয় না। এমন প্রাণঘাতী রোগে যার একটা পা খেয়ে ফেলেছে সে লোক গান গায় কী করে! সে টুলটার উপর অন্যমনস্কভাবে বসে পড়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে— কী করতেন আপনি?—নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন হবে। কারণ বেঁচে থাকার জন্য কী যে না করেছি তার হিসাব কে রাখে! থাক সে সব। আপনার কথা বলুন।
মুহূর্তেই অমরনাথ তার বর্তমান অবস্থার কথা, পরিবার-পরিজনের অবহেলা বেমালুম ভুলে যায়। একটা গলা খাঁকারি দিয়ে মেরুদণ্ডটা যথাসম্ভব সোজা করে একটা অভিজাত ভঙ্গিতে বসে বলে— একটা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলাম আমি। বছর পাঁচ-ছয় হলো রিটায়ার্ড।
লোকটার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। অমরনাথ বোঝার চেষ্টা করে হাসিটা বিদ্রূপ নাকি আর কিছু। ব্যর্থ হয়ে আগের কথার জের ধরে বলে— রিটায়ার্ডের পর একটা বাড়ি ভাড়া করে একা থাকতে শুরু করি।
—কেন, আপনার পরিবার-পরিজনের কাছে থাকতে মন চাইল না?
—চাকরি জীবনটা তো প্রায় একাই কেটেছে। তাই ভাবলাম একা থাকাই ভালো হবে। প্রথম দিকে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্ত্রীকে সাথে থাকতে বলি। তারপর প্রমোশন হয়ে গেলে রান্নার লোক, বাজার করার লোক সরকারি খরচে পেয়ে যাই। অন্যদিকে মেয়ের বিয়ে হলো। জামাই বিদেশে থাকে। তাই বাধ্য হয়ে মেয়ের কাছে মাকে থাকতে হলো। আমিও মাস হলে প্রয়োজনীয় টাকা পাঠিয়ে দিয়ে নিরিবিলি ছিলাম। অবসরের পর দেখি আমার জন্য ওদের তেমন টান নেই। এতদিনের মতো টাকাটা পেলেই তারা খুশি। তাই খানিকটা অভিমান করে বাড়ি ভাড়া করে থাকতে শুরু করি। তবে এবার আর সরকারিভাবে কাজের লোক নেই। প্রথমটায় নিজেই শুরু করি। কিন্তু অনভ্যস্ত হাতে সব কাজ ভুল হয়ে যায়। অগত্যা কাজের লোক রাখতেই হয়। কিন্তু আগের দিনের মতো সে অনুগত নয়। নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করে, চুরি করে জিনিসপত্র নিয়ে যায়, সম্মান করে না। এমনি করেই চলছিল।
—মান-অভিমান ভুলে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে গেলেন না কেন?
—ফিরে গেছি কিন্তু দায়ে পড়ে। হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে গেলাম। ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী ওরাই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার কোনো সুখের আশ্বাস দিতে পারলেন না। গম্ভীর মুখে জানাল, হার্টের বাল্ব অকেজো হয়ে গেছে। কৃত্রিম বাল্ব বসাতে হবে। মাসখানেক হাসপাতালে থেকে যখন ছাড়া পেলাম ওদের সাথে বাড়িতে গিয়ে উঠি।
—এখন তবে সবার সাথেই থাকছেন?
—সেটাই আমার জন্য সবচেয়ে যন্ত্রণা।
—তা কেন?
—পরিবারে কারও মনে আমার জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। আজকাল যা কিছুই করতে যাই না কেন অপ্রত্যাশিতভাবে ভুল হয়ে যায়। সাবধান থাকার শত চেষ্টা করেও শোধরাতে পারি না। তাই সকলের করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে আছি।
—এই বয়সে ভুল হবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের স্মৃতি ধরে রাখে যে কোষগুলো তা এই বয়সে যেমন দুর্বল হয়ে যায় তেমনি অনেকাংশে যায় মরে। বার্ধক্য, জরা এসব তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই! আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করব?
—নিশ্চয়ই! আপনি যে কোনো প্রশ্ন করতে পারেন।
—আপনার নামটা তো জানা হলো না!
—সবাই আমাকে অধ্যক্ষ অমরনাথ বলে। কিন্তু আমি মনেকরি প্রফেসর অমরনাথ বলা সঙ্গত। কারণ এই পদবিটা আমি অর্জন করেছি।
অমরনাথের গলার স্বরে একটা আভিজাত্য ভর করে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ওঠে। চোখ-মুখে অহংবোধ ঝিলিক দিয়ে ওঠে।
—আপনি অবসর গ্রহণের আগে ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে কোন পরিকল্পনা করেছিলেন?
—নাহ্! এমন অবস্থায় পড়তে হবে তখন তা কে জনত!
—এখন কি করবেন বলে স্থির করেছেন?
—কী আর করব! গতকালই তো সবকিছু শেষ হয়ে যেতে বসেছিল। দৈবাৎ বেঁচে আছি। এখন সেই দিনটার অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই।
—আপনি কোন বিষয়ের অধ্যাপক ছিলেন?
—রসায়নবিদ্যা।
—আচার্য প্রফুল্ল রায়কে তো নিশ্চয়ই চেনেন! জানেন তিনি বলতে গেলে জন্ম থেকেই ক্রনিক ডিসেন্ট্রিতে ভুগেছেন। অথচ সেই হীন স্বাস্থ্য নিয়ে বয়সের হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে টপকে গিয়েছিলেন? আর তাঁর কর্মযজ্ঞও বিশাল। আপনার নাম তো অমরনাথ! এইটুকুতে হাল ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন, এটা কি নামের উপযোগী হলো?
যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম শুনে হয়তো আপনি মর্মাহত হবেন। তবু সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস সবার থাকা উচিত বলেই বলছি— পদস্থ একজন অফিসার হিসেবে আপনি সারাটা জীবন শুধু নিজেকেই দেখেছেন। অথচ পৃথিবীর এত রূপ-রঙ, বিচিত্র মানুষ, এমনকি পরিবার-পরিজনদের উপেক্ষা করে আত্ম-অহমিকার ঘূর্ণিস্রোতে ডুবে ছিলেন। এক সময় চোরাবালিতে এসে ঠেকে গেলেন। এখন অসহায়ভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু কামনা করে দিন কাটাবেন— এটা কী জীবনের আকাঙ্ক্ষা?
এবার অমরনাথের চোখে হতাশা ফুটে ওঠে, গলার স্বরে পরাজয়ের গ্লানি। মাথা নিচু করে বলে— আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি আজকের দিনগুলোর কথা ভাবিনি কখনও। আর অহঙ্কারটা ছিল ঠিকই। এটাকে আমি আভিজাত্যের অলঙ্কার হিসেবে ধারণ করেছিলাম। সেদিন সাধারণের সাথে এক সারিতে বসাটাকে অগৌরবের মনে হতো। তাই হয়তো জীবনটাকে চেনা হলো না। তার আগেই মৃত্যু করাঘাত করে গেল দরজায়।
—মৃত্যু যে কোনো সময়েই হানা দিতে পারে জীবনে। কিন্তু তাই বলে কি হাল ছেড়ে দেব? এই মহান পুরুষকে দেখুন না, মৃত্যুর পরেও মানুষের জন্য এর পুনরুত্থান হয়েছিল— খ্রিস্টের ছবির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে লোকটি।
কবিগুরু বলেছেন না— ‘চিনিলাম আপনারে/ আঘাতে আঘাতে/ বেদনায় বেদনায়—’ এই যে আজ শরীর-মন অবসন্ন, কাছের মানুষগুলো উদাসীনতা দেখাচ্ছে এসব দিয়েই তো জীবনকে চিনতে হয়! রোগ-শোক-জরা-ব্যাধি সবকিছুর সাথে লড়ে তবে জীবনকে চেনা যায়। আর সারা জীবন অহংবোধে নিজেকে যে বড় পদস্থ অফিসার বলে পাপাচরণ করেছেন তারও স্বস্ত্যয়ন করতে হয়। নইলে হৃদয় নির্মল হয় না। নির্মল হৃদয়ের ঐশ্বর্য হচ্ছে প্রেম আর প্রেমের দ্বারাই জগৎ-জীবন এবং ঈশ্বর-দর্শন হতে পারে। আপনি যে আজ পরাজিত হয়ে মৃত্যু কামনা করছেন, এটা আমার দৃষ্টিতে পাপ। জীবন তো পরাজয় বরণ করে চলতে পারে না! মন যদি সদা গ্লানিভারে নত থাকে, প্রতিনিয়ত যদি মৃত্যু কামনা করে ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাতে হয় তাহলে উন্মুক্ত, বিশাল আকাশটার দিকে চেয়ে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবেন কীভাবে!
অমরনাথ গভীর আগ্রহে লোকটার কথা শুনতে থাকে। এমনি করে তাকে কোনোদিন জীবনের কথা শোনায়নি তো কেউ! এ যেন অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শনের মতো। তবু সসঙ্কোচে সে বলে— এই যে অসময়ে একটা প্রাণঘাতী কঠিন রোগ আপনার জীবনে হানা দিয়েছে, আপনাকে পঙ্গু করে দিয়েছে এজন্য কোনো ক্ষোভ নেই আপনার?
—কার প্রতি?
—এই প্রকৃতির প্রতি, বিশ্ববিধাতার প্রতি?
—এক সময় ছিল। সেদিন রোগ মুক্ত, দীর্ঘ জীবনের জন্য গভীর আগ্রহ ছিল। কিন্তু শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ার পর নতুন করে ভাবতে বসি। মানুষ হয়তো নিজের অজান্তেই তার কাজের মধ্য দিয়ে রোগ-ব্যাধিকে ডেকে আনে। তাছাড়া সৃষ্টি এবং ধ্বংস উভয়ই তো যুগপৎ চলে! যে বাতাস ফুল ফোটায়, ফুলের সৌরভ বয়ে নিয়ে আসে, সেই বাতাসই আবার কখনও প্রচণ্ড ঝড় হয়ে বয়ে যায়। দুটোই সত্য। আপনি একটাকে অস্বীকার করলে তো চলবে না! আবার দেখুন, সর্বনাশা একটা ধ্বংসকাণ্ডের পর প্রকৃতিই আবার সে ক্ষত যত্ন করে মুছিয়ে দেয়। সেখানে নতুন জীবনের প্রতিষ্ঠা করে দেয়। এটাই তো প্রকৃতির লীলা আর এটাই সত্য! আপনি কোনটা অস্বীকার করবেন! আমি শুধু বলি, হতাশায় কখনও হাল ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং যে মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা বেঁচে থাকি আনন্দ উপভোগ করে বাঁচি।
—কিন্তু এই যে পরিবার-পরিজনের ঔদাসীন্য, লাঞ্ছনা এসব সহ্য করে কীভাবে ভালো থাকি বলুন?
—আমি তো আপনাকে বলিনি যে ওদের সাথেই থাকতে হবে! যদি অন্য কোথাও গিয়ে ভালো থাকা যায় তবে তাই থাকবেন! পৃথিবীটা তো এত ক্ষুদ্র নয় যে আপনাকে ধারণ করতে পারবে না!
—আমি কখনো জীবনকে এমন বিশাল ব্যাপ্তিতে দেখার দৃষ্টি অর্জন করতে পারিনি। অহংবোধের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকেছি সারা জীবন। আজ কোথায় আর যেতে পারি? আপনিই বরং কোনো কর্তব্য নির্দেশ করে দিন।
—‘পুনরুত্থান’ নামে আমার একটা সেবা সদন আছে। দুস্থ মানুষদের সেবা শুশ্রূষা করার চেষ্টা করি। এখান থেকে যদি সুস্থ হয়ে ফিরতে পারি তবে সেখানেই ফিরে যাব। অবহেলিত, আশাহত, অসহায় মানুষদের নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব।
—এমন অদ্ভুত নামের মানে কী? অসহায় মানুষের কি পুনরুত্থান সম্ভব?
—হ্যাঁ, অধ্যক্ষবাবু! অবশ্যই সম্ভব! যে মানুষ জীবনের সব আশা হারিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণে দিন কাটাচ্ছে তাকে ভরসা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে যদি হতাশা মোচন করা যায় তবে আবার সে বাঁচার স্বপ্ন দেখবে, আনন্দে হাসবে। এটাই তো পুনরুত্থান! যে কোনো কারণেই হোক না কেন পতন মানুষের হতেই পারে। তাকে জীবনের স্বপ্ন দেখানো গেলে সে নিজেই জেগে উঠবে। পুনরুত্থান বলতে আমি এটাই বুঝি। মৃত্যুর পতন থেকে আবার জীবনের দিকে ফিরে আসাটাই পুনরুত্থান। প্রকৃতি আমাদের মৃত্যুর পতন এবং পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে বয়ে নিয়ে চলে। আমি তো অনেক কিছু করতে পারি না! কিন্তু যেটুকু পারি চেষ্টা করছি। মৃত্যুকামী মানুষগুলোর মাঝে জীবনের আশা সঞ্চার করার মধ্য দিয়ে জীবনকে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা করছি। আমার দৃষ্টিতে এটাই জীবনের সার্থকতা।
—তুমি এবার থামো তো জজসাহেব! এতবড় ধাক্কাটা গেল এই বুড়ো শরীরে! তারপরও চুপ করে থাকতে পারো না!
স্ত্রীর মধুর তিরস্কারের বিনিময়ে জজসাহেব শুধু স্নিগ্ধ একটু হাসেন। অমরনাথের দিকে তাকিয়ে জজসাহেবের স্ত্রী বলে— কিছু মনে করবেন না। ওঁকে এত কথা বলতে দেখে আমার কষ্ট হয়। মনে হয় এই বুঝি ক্লান্ত হয়ে পড়বে।
—আমার কিচ্ছু হবে না। তুমি বরং একটু চায়ের ব্যবস্থা কর তো! গলাটা কেমন শুকনো লাগছে।
জজসাহেবের স্ত্রী কাপ হাতে বাইরে গেলে অমরনাথ বিস্ময়ের সাথে বলেন— আপনি তাহলে জজ ছিলেন এর আগে!
—বললাম না, বেঁচে থাকতে কত কী যে করতে হয়েছে তার হিসাব কষে কী হবে বলুন!
—কিন্তু আপনি যে বললেন, অর্থ বাঁচাতে এই নার্সিংহোমে এসেছেন!
—হ্যাঁ বলেছি তো! আমার যা উপার্জন ছিল সবই ব্যয় করেছি ওই অসহায় মানুষগুলোর জন্য। তাই এখন কিছুটা অর্থকষ্টের মধ্যে চলতে হচ্ছে।
অমরনাথের মুখ ফস্কে বেড়িয় যায়— আমার কাছে অর্ধকোটি টাকার বেশি রিজার্ভ মানি আছে। আপনি অনুমতি দিলে টাকাটা আপনার প্রতিষ্ঠানে সেবা কাজে ব্যয় করতে পারি।
—তা হয় না। আমার কাজের জন্য আপনার কাছ থেকে টাকা নিতে পারি না।
—সেবাদান কি শুধু আপনারই কাজ? আমি তো সেই অসহায়, দুঃস্থ মানুষদের জন্য ব্যয় করতে চাই। এই সুযোগটুকু আমাকে দিন। সারাজীবন তো সঞ্চয়ই করেছি! এবার সদ্ব্যবহারটুকু করার শিক্ষা নিই। আপনি আর না করবেন না।
—এই তোমাদের চা। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। তোমরা গল্প করো। তবে—
—কথা কম বলব এই তো?
কথা না বলে জজ গিন্নি মিষ্টি হেসে পাশের রুমে চলে যায়।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে অমরনাথের ভেতর একটা ভাবনা ছলকে ওঠে— অঢেল অর্থ জমিয়ে রেখে এই অর্থহীন, জীবন্মৃত সময় পার করা আর নয়। এবার সবকিছু দিয়ে নির্ভার হয়ে বাকি জীবনটা আনন্দে, সেবাদানে ব্যয় করব। খ্রিস্টের ছবিখানার দিকে তাকিয়ে মনে মনে একবার দৃঢ় উচ্চারণ করে— মানুষের জন্য আমিও একবার বেঁচে উঠব।
শ্রীরামকাঠী, নাজিরপুর, পিরোজপুর থেকে
সন্তোষ কুমার শীল
সন্তোষ কুমার শীল ১৯৭৩ সালের ১৫ অক্টোবর (সার্টিফিকেট অনুসারে) পিরোজপুর জেলার বাটনাতলা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পড়াশুনা শেষে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেন এবং একই পেশায় বর্তমান আছেন। রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ ভক্ত এ নিভৃতচারী ঔপন্যাসিক মূলতঃ একজন সর্বগ্রাসী পাঠক। বই পড়া, গান শোনা এবং সাহিত্য সাধনায় সময় যাপন তাঁর একান্ত প্রিয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি ছোট গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ এবং রম্য রচনার চর্চা করেন। এ পর্যন্ত তাঁর আটটি বই প্রকাশিত হয়েছে। “একাত্তরের কথকতা” তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস।