অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
এপ্রিল ৫, ২০২৫
২২শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
এপ্রিল ৫, ২০২৫
২২শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

তাহমিনা কোরাইশী -
ঝরাপাতায় দিন

প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছে এবারের শীতে। হিম শীতলতায় জমে আছে চারপাশ। আজ আর চিন্তা করছে না মহিবুল। ঘরেই আগুনের চুল্লি বসিয়েছে। নিজ হাতে বানানো ইট আর কিছু মাটি দিয়ে। বেশ আয়েশে আরামে তাপ পোহাবে। ইচ্ছে হলে কিছু ছোটখাটো রান্নাও চলতে পারে। আরাম কাকে বলে! আগুন হাতের মুঠোয়, সাশ্রয়ী হতে হবে না। সরকারের দেওয়া গ্যাসের সিলিন্ডারে বা গ্যাস লাইনের বিল ভরতে হবে না। নিজের রাজত্বে নিজেই রাজা। সারাটা গ্রীষ্মে তো বন-বাদাড়ে কাঠ কেটেছে। কাঠ বাজারে বিক্রি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে সংসারের আগুন নিভিয়েছে। মনে কেবল একটাই জ্বালা বিবেকের দংশন। কী আর করা পেটের আগুনের কাছে আর কোনো আগুন তো আগুন নয়। কত কত দেশে দেখা যায়  বনে এমনি এমনি আগুন লেগে যায়। লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ পুড়ে বিরান ভূমিতে পরিণত হয়ে যায়। দোষ কার? প্রকৃতি নিজেই নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে। বাধা দেওয়ার কে আছে! তবু নিজের মনকে বুঝ দিতে মহিবুলকে কতই না ছলনার আশ্রয় নিতে হয়! বনের দিকে তাকালে তার মনটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। এমন খাঁখাঁ করছে বনটা। একেবার দেউলিয়া হয়ে গেছে সে। এই দুটো বছর নিজে যেমন বনদস্যুর কাজ করেছে আরও দশজনকে এ কাজে সম্পৃক্ত করেছে। কী করবে?  করার কী ছিল! চাকরি নেই আয় রোজগারের পথ নেই। যাও চাকরি করত মহিবুলের ছেলে-মেয়ে দুটো। ছাটাই করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অবশেষে গার্মেন্টস বন্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। তারা দুটিতে যখন চাকরি করত তখন উপছে পড়া না হলেও টানটান আনন্দ ছিল সংসারে। মা উমানি, ছেলে মতিন, মেয়ে নাজমা আর বর্গাচাষি মহিবুল নিশ্চিন্তে দিনযাপন করেছে। ভিটেমাটিটুকু কিনেছে। সময়টা ভালোই চলছিল। মহিবুল যদিও এইট পাস করা একজন কিন্তু তাকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। প্রচুর জ্ঞান বুদ্ধিতে মাথাভরা। প্রকৃতি সমাজ সংসার জীবন থেকে হাতেখড়ি তার বিদ্যাপাঠের। অন্যের জমিতে বর্গাচাষ করেই ভালো দিন গুজরান হতো। জমির পেছনে যে খরচা হতো তা পুষিয়ে সংসার চালাত। আর জমির মালিকের পাওনা বুঝিয়ে দিতে কষ্ট হতো না। গত দুই তিন বছর  কি যে আকাল এল কোনোভাবেই সুবিধা করতে পারছে না। চাষাবাদ তো নেই তার ওপর ছেলে মেয়ে দুটোকে চাকরিতে ঢুকিয়েও শান্তি নেই। অভাবি সংসারের ছেলে-মেয়ে দুটোকে পড়াতে পারল না বেশি দূর সবে ইন্টার পাস করে গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছে আর মেয়েটি এসএসসি পাস করে ভাইয়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছে। সেই সুবাদে মহিবুলের ঘর আলো ঝলমল হয়ে উঠেছিল। ঘরে এল একে একে রঙিন টিভি, সেকেন্ডহ্যান্ড ফ্রিজ, ইলেকট্রিসিটি।  দিনগুলো ওদের উতরে যাচ্ছিল টায় টায় ভালোবাসায়। গ্যাসের লাইন পাওয়াটা যেন সোনার হরিণ পাওয়ার মতো দামি। বৃথা ওর পেছনে সময় নষ্ট করা যায় না। অন্য ব্যবস্থায় অভ্যস্ত ওদের নিত্যদিনের ধারাপাত। ছকবাঁধা জীবনে ছন্দপতন শুরু হলো তখন সারাবিশ্বে যখন দাপিয়ে বেড়াল করোনা নামের এক আজদাহা। গ্রাস করে চলেছে দেশ মহাদেশের মানুষগুলোকে। মানুষের দুর্গতির সীমা নেই। জীবনের চাকা চলা একেবারেই দুস্কর। কেবল চলছে সাশ্রয়ের উলুধ্বনি। আরে আছেটা কী যে সাশ্রয়ী হবে? চারদিকে যখন নেই শব্দের সমাহার তখন থেকেই মহিবুলের এই কাজ শুরু। দিনে দিনে মানুষ যখন হাফ ছেড়ে বাঁচবার চেষ্টায় তখন এসে হজির হলো ইউক্রেন আর রাশিয়ার যুদ্ধ। এই এক যুদ্ধে তেলে মাথায় তেল দেওয়া বন্ধ হলো। তেল নিয়ে কত কেলেংকারি। তার সাথে যোগ হলো প্রতিটি জিনিসের মূল্য বৃদ্ধির মহাউৎসব। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। মহিবুলরা সবই বোঝে কোথায় কে কলকাঠি নাড়াচ্ছে। কী চায় বিশ্বের মোড়োলরা! চোখের সামনে খোলা বিশ্ব। বিশ-ত্রিশ ইঞ্চি পর্দায় সবই তো হাতের মুঠোয়। একটু চোখ কান খোলা রাখলেই চলে। প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর অভিশাপের কথা কি বিস্মৃত এ যুগের মানুষ? হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের সেই পরমাণু বোমার বিভীষিকার কথা!  কেন তবে আবার ফিরতে চায় সেই অভিশপ্ত জীবনে। যেখানে সভ্যতার বিপর্যয়ে মানুষ হয়ে ওঠে ইবলিশ শয়তানের চেয়েও বেশি বিপথগামী।

মহিবুল মাঝে মধ্যে তার দলের সদস্য নিয়ে বসে আলাপচারিতায়। সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগিতে  নাকি তার আঁচ কমে যায়। মহিবুল ভাবে সমাজের কথা দশ ও দেশের কথা। মহিবুল  বলে— কী ভাইজানরা এত মুষড়ে পড়লে চলব?  কথা বলতে তো টেক্স নেই। মনটা খুইল্যা কথা কও, হাসো তাইলে দুঃখ-ভয় পালাইয়া যাইব।

জমিরউদ্দীন বলে— মিয়া ভাই,  দিন দিন তো হাসি ভুইল্যা যাইতাছি মনে আনন্দ নাই। সামনের দিনগুলো পার করব কেমনে সেই চিন্তায় পাগল হইয়্যা যাই।

—পাগল হবা কেন? যাত দিন আশা আছে ততদিন বাঁচা আছে। দিন কি এমনই থাকব? দিন কি পাল্টাইব না?

—আশা করি সুদিন আইব।

মিজান বলে— আমরা এই যে এতগুলা পরিবার আছি তারা তো এক পরিবারের মতই আছি। কারও বিপদে অন্যরা নিজের গাঁইটের পয়সা খরচ করি। তার উপকার করার চেষ্টা করি। এইটা কম কীসে!

—ঠিক কথাই কইছ মিজান।

সবার অভিভাবক যেন এখন থেকে মহিবুল।

—জিনিসপত্রের যে দাম মানুষ তো না খাইয়্যা মরব ভাইজান।

তারা মিয়ার কথার উত্তরে মহিবুল বলে— সবুর কর, উপায় একটা বাইর হইব। দুই বছর করোনার লগে যুদ্ধ করলাম না? এখনও করমু। সাধে কি কাঠ কাটার কাজে আইছি? অভাবি বাতাসের স্রোতে ভাইস্যা উজানে যাওয়ার রাস্তা খুঁজি। আমার হইলাম সূর্যের তাপ লাগা পোড়া মানুষ। করোনাও ছুঁইতে পারে নাই আমাগো।

তাই তো গ্রামের মানুষদের করোনা কাবু করতে পার নাই। শহরে যে ভাবে তারা রাজত্ব কইরা গেছে।

—করোনার থাবায় একেবারে শুকনা চেলা কাঠে পরিণত হইছিলাম। দোষ কারে দিবা, মানুষ নাকি প্রকৃতি না কি খোদাতায়ালারে?

মহিবুলের জিজ্ঞাসু মনের তাগিদে সে অনেক জানে বোঝে। প্রকৃতির ওপর মানুষের যে জুলুম বাইড়া গেলে সেও তার হিসাব বুইঝা লয়। ইচ্ছামতো নদী শাসন, গাছপলা কাটা, পাহাড় কাটা, দূষিত আবর্জনা ফালাইয়া মিঠা পানির  নদীগুলা নষ্ট করা, যানবাহনের কালো ধোয়া। এভাবেই আমরা প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট করছি। ভাগারে পরিণত করেছি। দোষী কে মানুষ! বায়ু দূষণ কইরা চলছি। এর বোঝা তো মানুষই বইব।

মানুষকে গৃহবন্দি করেছে করোনা সাজিয়েছে প্রকৃতিকে। বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তরে স্বচ্ছতা, সমুদ্রসৈকতে ডলফিনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, সৈকতের বালিয়াড়িতে সাগরলতা ফুলের সমাহার, সবুজ অরণ্যের হাতছানি, অতিথি পাখিদের কলতান, হরিণ সাবকেরা রাজপথে নির্ভয়ে। খোঁয়াড়ে বন্দি মানুষ, নেই কলকারখানার আওয়াজ, কালো ধোঁয়া, নেই যানবহনের কার্বন, নেই আকাশে যুদ্ধজাহাজ বা মানুষ পরিবহন। বায়ুতে নেই কার্বন। বিষবাষ্পহীন প্রকৃতি মেতেছে আনন্দ উৎসবে।

কেবল মানুষের হাহাকার স্বজন প্রিয়জন হারানোর বেদনা। নিজেদের ওপর আস্থাহীন  হওয়ার  সময়। মেধা মননে সৃজনে ঋদ্ধ যারা তারা আজ করোনার কাছে হার মেনেছে। ভুলে গেছে চলার গতি। শত বছর পর পর প্রকৃতির  অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে কি মানুষ! প্রকৃতিতে জমা হয় ক্লেদ আবর্জনা বিষবাষ্প প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। ফুঁসে ওঠা প্রকৃতি ছড়িয়ে দেয় বিষাক্ত বাতাস। প্লেগ, ইবোলা ভাইরাস, কলেরা, স্প্যানিস ফ্লু, অবশেষে করোনার মতো ভাইরাস। আসে সুনামি, খরা, জলোচ্ছ্বাস। প্রকৃতির বৈরীভাবে মানুষের ওপর বিপর্যয় নেমে আসে।

দিনগুলো ভালোর পিঠে মন্দতে চলমান।

মহিবুলের কথায় বড় ছেলে মতিন বাপের কাজেই সম্পৃক্ত হয়েছে ইচ্ছের বিরুদ্ধে তো বটেই। চাকরিহারা মতিন একেবার বিবাগী উদাসী বাউল। ঘর নেই দোর নেই চাল নেই চুলো নেই তার স্বপ্নকে রাখবে কোথায়! এটা একটা বড় জিজ্ঞাসাবোধক চিহ্ন হয়ে আছে। কুলসুমের সাথে মতিনের ঘর বাঁধবার স্বপ্ন কি স্বপ্নই রয়ে যাবে!

নদীর পাড়ে ঘাসের আঁচলে বসে কিছুক্ষণ কুলসুম— মতিন। মতিনের মনে জমে থাকা ভয় কিছুটা হলেও বয়ান করে বলে— তয় কি এই নব্য কাঠুরিয়াকে আগের মতন ভালেবাসো? নাকি সুযোগ পাইলেই বাপের পছন্দ করা পাত্রের গলায় মালা দিতে রাজি হইয়্যা যাইবা?

কুলসুমের হাসি হাসি লাজুক মুখে অভিমানী বর্ণচ্ছটা। যদিও গ্রাম্যবালা বুদ্ধিতে অধিকার আদায়ে কিছুটা দুর্বল। তবুও ভালোবাসায় সাহসী প্রাণ। জীবন দিয়ে ভালোবাসার মান রাখতে জানে। আত্মঅহংকারে পরিপূর্ণ হৃদয়। বলে, এই একটা মন ভাগ করব কেমনে! চাল নাই চুলা নাই তাতে কি ভালোবাসার বাতাসে বন-বাদাড়ে পাতাদের সংসারে ঘর বাঁধব।

—বাহ্ ভালো বলেছো। যদিও ঘষাপেটা ডায়লগ তবুও শুনে মনটা ভরে গেল। স্বপ্নের ঘোরে ওড়ো বাস্তব বোঝার দরকার নেই। মতিন একটু চাঙ্গা চাঙ্গা ভাব অনুভব করে। কুলসুমকে জড়িয়ে ধরে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টায়। পুলকিত উচ্ছ্বসিত আনন্দিত ভাবটা বজায়ে রাখার চেষ্টা করে। মনের ভেতরে ঝড় কমানো দায়। এতটাই আকালে দিশেহারা জগৎ সংসার, অন্নদেবী সুপ্রসন্ন নয়। নেই শব্দেরা পুলকিত উচ্চস্বরে যথা নাকি অযথা করে হৈ চৈ। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তদের নাভিশ্বাস। ধনীদের অভাবি মনটার ঘুম ভাঙলে কিছুটা দানখয়রাত করে সমাজের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে।

মেয়ে নাজমা মায়ের সাথে ঘরকন্নার কাজ করে বটে তবুও চৈতন্যহীন চাহনি খোঁজে সেই বাঁশিওয়ালাকে। শখ আর সাধ্যের পায়ে বেড়ি বাঁধা। এ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা কি তার আছে? যদি চাকরিটা থাকত তবে দিতে পারত মনের ক্ষুধার দাম। পেটের ক্ষুধাকেই প্রধান্য দিয়ে বাঁশিওয়াকে বলবে— ঐ পোড়া বাঁশি আর বাজাইও না। দুচোখে জল নিয়ে মনকে বোঝায় আর জনমে যখন এই আকালি দিন থাকবে না তখনের অপেক্ষায় থকো আমার বাঁশিওয়ালা।

করোনার বিপর্যয় শেষ হতে না হতেই আরম্ভ হয়ে গেলো রাশিয়া আর ইউক্রেন যুদ্ধ। মন্দার ওপর মন্দা লেগেই আছে। যুদ্ধের বর্তায় বিশ্ববাসী নড়েচড়ে বসেছে। কী আর করা সুন্দর আয়েশি সকালের গল্পগুলো অভাবি তাপে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তথৈব, এই কয়টা বছর বনের গাছ কাটতে কাটতে বেশ অনেক দূর বিরান ভূমিতে পরিণত হয়ে গেছে। তবুও প্রশাসনের টনক নড়েনি। ব্যপারটা নিয়ে ভেবেছে মহিবুল আর তার সঙ্গীরা। নব্য কাঠুরের দল বনে আজ। জোরেশোরে কাঠ কাটার ধুম পড়েছে। হেইয়্যা মারো হেইয়্যা শব্দে গাছে বাঁধা রশি ধরে টানছে আর একদল গাছের গোড়ায় কুঠার দিয়ে সর্বশক্তিতে আঘাত বসিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ শুনতে পায় পুলিশের বাঁশির হুইশেল জিপের আওয়াজ। আজ মরণ নিশ্চিত বলেই মহিবুল সবাইকে শব্দ না করতে বলে। সতর্ক অবস্থানে নিঃশব্দের মাঝে শব্দহীন হয়ে নিশ্চল বসে থাকা। তবুও কি রক্ষা আছে? আজ আর রেহাই পাওয়ার আশা নেই। আতিপাতি করে খুঁজতে খুঁজতে একদল পুলিশ বনের মাঝে। সাথে এসেছেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব সয়ং। দলনেতা মহিবুল আর কি চুপ করে বসে থাকতে পারে? স্যারের সামনে হাজির একদল নব্যকাঠুরে। তাদের অপরাধ তারা জানে বলেই ক্ষমা চাওয়াটা জরুরি। মহিবুল আগ বাড়িয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব কাছে হাত জোড় করে বলে— দোষটা আমার স্যার।  আমারে হাতকড়া পরাইয়া দেন, স্যার। ওগরে ছাইড়া দেন স্যার। আমার বুদ্ধিতে ওরা এই কাজে আইছিল।
স্যার হুঙ্কার দিয়ে বলেন— কার দোষ, কে দোষী না, সব পরে দেখা যাবে। সবাইরে হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলো। কতদিন যাবৎ এই অন্যায় কাজ চলছে?  বনবাদাড় তো সমূলে শেষ করে ফেলেছে বনদস্যুরা! কীরে, তোদের কি শাস্তি হওয়া উচিৎ?

আবার মহিবুলের কাকুতি মিনতি— কী করতাম স্যার এই আকালের দিনে! ব্যবসাপাতি নেই চাকরিবাকরি নাই। পোলা মাইয়্যা বউ বাচ্চা লইয়া কেমনে বাঁচতাম? দেয়ালে পিঠ ঠেইক্যা গেছে। আমরা তো স্যার কোনো অন্যায় কাজ করি নাই। কারও বাসায়  চুরি ডাকাতি করি নাই। সরকারের ওপর ভরসা কইরা তার জিনিসই খাইছি। সরকারে ওপর আমাগো অধিকার আছে না!

মহিবুলের কথায় পুলিশ অফিসারের ভাবান্তর হলো। মনটাও খারাপ হয়ে গেল তবুও কিছুক্ষণ কী যেন চিন্তা করলেন। পরে বললেন— চল তোরা সবাই মিলে থানায় চল। দেখি কী করা যায়। থানার ভাত  নাকি জেলের ভাত খাওয়ানো যায়।

এ কথা শুনে মহিবুলে চোখ দুটো চকচক করে ওঠে বলে— স্যার, একটা কথা জেলেই পাঠাইয়া দেন। নিশ্চিন্তে একমুঠ ভাত তো খাইতে পারমু। আরও একটা কথা স্যার আমাগো পরিবারের সবাইরে আমাগো সঙ্গে লইয়্যা লই। তারাও আমার কাজে এই সাথে দোষী। জেলের ভাত তারাও খাইব।

পুলিশ অফিসার চিন্তায় পড়ে যান। যারা চাষি কৃষিকাজ তাদের পেশা তারা তো বনদস্যু নয়।

অভাবের তাড়না এই কাজ বেছে নিয়েছে।

স্যারের নীরবতার সুযোগ নিয়ে মহিবুল বলে— স্যার, আমরা গাছ জন্মাই আমরা তো গাছের শত্রু না। আমরা ডাকাতিই করতে পারতাম না। আমরা গাছ ভালোবাসি, মানুষরে ভালোবাসি আর নিজের পরিবারে ভালোবাসি। নিজের পরিবারে না খাওয়্যা মরতে দিতে পারি?

স্যার প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব তিনি আইনের লোক। তাঁর কর্তব্য অবহেলা তিনি কীভাবে করবেন? বলেন— এবার চলো তোমরা থানায়। দেখি কোথায় রাখা যায়? জেলের ভাত তো খেতেই হবে।

মহিবুল বলিষ্ঠ কণ্ঠেই উত্তর করল— চলেন স্যার, আমাগো সবাইরে লইয়্যা চলেন। একটা কথা স্যার লগে কইলাম আমাগো পরিবারও যাইব। যেই দোষে আমরা দোষী তারাও তো সেই দোষে দোষী। এই কাঠ বেচা টাকায় খাওন জুটছে। তারও সবাই সেই খাওন খাইছে।

স্যারের মুখে ভাবান্তর কিন্তু করণীয় কী! কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বলে— আগে বাড়ির কর্তাকেই জবাবদিহি করতে হবে তারপর পরিবার। এবার চলো তো তোমরা।

অগত্যা আশা নিরাশা দোলাচলে একদল নব্যকাঠুরে দুটো পুলিশ জিপে উঠে পড়ে। জানা নাই কপালে কী আছে?

থানায় নিয়ে তাদের জেরা করা হলো যদি কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে এই আশায়! হলোও তাই। নব্যকাঠুরের দল বাজারে গাছ বিক্রি করেছে কিন্তু কাঠ কেটে সে কাঠ তারা চিরে বিক্রি করেনি। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে মধ্যস্বত্বভোগী কালাচাঁদ মিয়া। ধরি মাছ না ছুঁই পানি এমনিভাবে মহিবুলদের দিয়ে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করেছে। মহিবুলরাও শকুন দৃষ্টিতে ব্যাপারগুলো দেখেনি বলেই কালাচাঁদের কপাল খুলেছে। বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতায় পুলিশ কর্মকর্তা গোমর ফাঁস করতে সক্ষম হয়েছে। কালাচাঁদকে থানায় এনে জেরা করেই বেরিয়ে এলো প্রকৃত বনদস্যু বদিউল। প্রশাসনের ভয়ে নিভৃতে তার কাজকর্ম সমাধা করার চেষ্টা করে। অল্প খরচে বেশি মুনাফা পাওয়ার আশায় এমনই  ছোট ছোট হাজারো অবৈধ কাঠুরিয়া তার সাপ্লাইয়ার। তারাই থাকে মধ্যস্বত্বভোগী কালাচাঁন গোত্রের লোক।কালাচাঁদের দুরভিসন্ধি নিরীহ মহিবুলদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে। তারা দশ জন নব্যকাঠুরে  বনের যত কাঠ পানির দরে বিক্রি করে চলেছে এই কালচাঁদ নামের মানুষটির কাছে। মহিবুলদের বদৌলতে ধরা পড়ে কালাচাঁদ আর কালাচাঁদের মাধ্যমে ধরা পড়ে বদিউল।

মনে-প্রাণে বেশ ভালো সন্তুষ্টি নিয়ে থানা থেকে ছাড়া পায় ওরা দশজন। কিন্তু তাদের অপরাধও কম নয় তবু হতদরিদ্র বলে কথা। মানবিকতার কথা বিবেচনায় এনে পুলিশ কর্মকর্তা কেবল মুচলেকা নিয়ে তাদের ছাড়পত্র দেন। জীবনেও আর ঐ মুখো হবে না ওরা। গাছপ্রেমী ওরা। মাটির ঘ্রাণে মাটির ভালোবাসায় ঋদ্ধ স্বত্তায় আজীবন খেতে-খামারে কাজ করা মানুষ ওরা। তাদের অঙ্গীকার কেবল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছেই নয় নিজেদের অস্থি-মজ্জা নিজের বিবেক বুদ্ধির কাছেও। আপন জাতি মাটি দেশ ও দশের কাছেও।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

অনুপ্রাণন অন্তর্জাল- সম্পাদকীয় (৭ম সংখ্যা)

Read Next

শর্মী দে – যুগল কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *