অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
আগস্ট ২৯, ২০২৫
১৪ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আগস্ট ২৯, ২০২৫
১৪ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আশরাফ খান -
নিশুতি রাতে মৃতদের মিছিল

দূর্গাগাতী কবরস্থানে মধ্যরাতে বৃত্তের মতো গোল হয়ে তুষারের মতো সাদা কাফনে মোড়ানো মৃত ব্যক্তিদের জরুরি সভা বসেছে। কবরস্থান সংলগ্ন মহাসড়কের সংস্কারের কাজ চলছে। দুই লেনের রাস্তা ভেঙে চার লেনের রাস্তা তৈরি হবে। রাস্তা সংলগ্ন বহুতল ভবনগুলো ইতোমধ্যে বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। উত্তর-দক্ষিণ বরাবর অবস্থিত চাঁদের মতো বাঁকা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে দূর্গাগাঁতি কবরস্থান ও পূর্বপাশে শ্মশান। যে কোন মুহূর্তে কবরস্থানের কিছু অংশ ও শ্মশানের কিছু অংশ ভেঙ্গে রাস্তা বর্ধিত করা হবে। কবরস্থানের যে অংশে রাস্তা হবে সেখান থেকে বেকু গাড়ি দিয়ে লাশ এবং হাড়গোড় তুলে কবরস্থানের অপর পাশে ফাঁকা জায়গার পুনরায় কবরস্থ করা হবে, লোকমুখে এরকম গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এ নিয়ে গ্রামবাসী তো বটেই কবরবাসীদের মধ্যেও একটা চঞ্চল্যকর অবস্থা বিরাজ করছে। এক পাশে কবরস্থান আরেক পাশে শ্মশান মাঝখানে মহাসড়কের এই অংশটুকু দুর্ঘটনাপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে বিশেষভাবে চিহ্নিত। এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। দূর্গাগাঁতীর লোকেরা বলে যে— ‘অমাবস্যা অথবা পূর্ণিমা রাতে এই একটি রাস্তা তিনটি রাস্তায় পরিণত হয়। চালকের চোখে ধোঁয়াশার মতো দৃশ্যমান তিনটি রাস্তার মধ্যে সঠিক রাস্তা নির্ণয় করতে না পারায় দূর্ঘটনা ঘটে থাকে’। বিশেষ করে কুয়াশার চাদরে মোড়ানো শীত এবং অতি ব্যস্ত ঈদের মৌসুমে প্রায় রাতেই এখানে দুর্ঘটনার খবর শোনা যায়।

দূর্গাগাঁতী বাজারের চায়ের দোকানদার জুলমত আলী শ্মশানের পাশেই বাড়ি করেছে বছর দুই হলো। ‘এত জায়গা থাকতে তুই শ্মশানের পাশে বাড়ি করলি ক্যা’? গ্রামবাসীর এমন প্রশ্নের উত্তরে জুলমত আলী বলে— ‘ভালো জায়গার দাম ম্যালা, এতো ট্যাহা পামুনি কোয়ানে। শ্মশানের কাছে জায়গার দাম কম। কেউ নেয় না। হস্তা পাইলাম। তাই কিনলাম’।

দূর্গাগাঁতীর লোকেরা বলে— ‘জুলমত আলী বিশ্বরোডের সাথে বাড়ি করার পর থেইক্যা ধনী অয়ত্যাছে। টিন ঘর থেইক্যা দালান করছে, কিছু জমিও কিনছে’।

‘কেইবা কইরা জুলমত আলী ধনী হইলো’?

এমন প্রশ্নের উত্তরে কেউ কেউ বলে, ‘বিশ্বরোডে প্রায়ই এক্সিডেন্ট অয়। মধ্যরাতে যহন গাড়ি এক্সিডেন্ট অয় তহন জুলমত আলী আর তার স্ত্রী দৌড়ে এসে বাসের কনট্রাক্টর ও যাত্রীদের নগদ টাকা, মহিলা যাত্রীদের পরিহিত সোনার গয়না নিয়া যায়’।

তারা আরও বলে— ‘একবার মধ্যরাতে একটা বিয়ার মাইক্রোবাস এক্সিডেন্ট অয়ছিল, বর কনেসহ সাতজন লোক ঘটনাস্থলেই মারা গেছিল, কনের গায়ে সাত ভরি সোনার গয়না আছিল। কনের লাশ পাওয়া গেলেও একটি গয়নাও পাওয়া যায় নাই’।

মূর্দাদের সভায় কবরস্থানের অপরপ্রান্তের শ্মশান থেকেই অনেকে এসেছে। তাদের মধ্যে স্বর্গীয় ভুবনচরণ ও স্বর্গীয় সত্যনারায়ণ ঠাকুর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সত্যনারায়ণ ঠাকুর জীবদ্দশায় অনেক আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। সনাতন ধর্মের অনেক রীতিনীতি তার ঠোঁটস্থ ছিল। ঠাকুরমশাই এসেই মশকারা করে বললেন— ‘দ্যাখো, আমরাই কিন্তু কমে যায় না। আমাদের দেবী মা দূর্গা নামেই এ গ্রামের নামকরণ হয়ছে। গ্রামের কবরস্থান ও মসজিদে আমাদের দেবীর নাম লেখা আছে।’

২.

দূর্গাগাঁতী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আব্দুল খালেক মাস্টার সদ্য মৃত্যুবরণ করেছে। আশি বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও মুর্দাদের মধ্যে সেই সর্বকনিষ্ঠ। তারপর দূর্গাগাঁতী কবরস্থানে মৃতদের জগতে নতুন করে কারও প্রত্যাবর্তন হয়নি। জীবদ্দশায় দূর্গাগাঁতি মসজিদ ও ঈদগাহ কমিটির সভাপতি ছিলেন তিনি। মুর্দাদের সভা চলমান থাকাবস্থায় আব্দুল খালেক মাস্টার হঠাৎ বলে উঠল— ‘আমি একটু ছুটি চাই। আমি একটু বাড়িতে যাব। গত তিনদিন হলো আমি মুর্দাদের জগতে পদার্পণ করেছি। এখনো সংসারের মায়া ছাড়তে পারি নাই। স্ত্রী তো এই গোরস্থানেই শুয়ে আছে। দেখি আসি ছেলেমেয়েরা কেমন আছে। আমার জন্য হয়তো কান্নাকাটি করছে’।

মরহুম আব্দুল খালেক মাস্টার ধীরে ধীরে বাড়ি দিকে রওনা হয়। কালীপাড়া পার হতেই মসজিদের পাশের বাড়ি থেকে রেহানা বেওয়ার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। কিছুদিন আগে তার একমাত্র তরতাজা জোয়ান পোলা কাওছার মারা গেছে। ভিনগাঁয়ের এক হোটেলে বাবুর্চির কাজ করত কাওছার। অতি অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিল রেহেনা। দাদি-নানিরা বলত— ‘কাঁচা চুলে বিধবা অয়লি এ শোক তুই সইবি কেমনে’। এবাড়ি ওবাড়ি ঝিয়ের কাজ করে অনাহারে অর্ধহারে কাটত রেহানা বেওয়ার জীবন। কাওছার ছোটবেলা থেকে এর ওর ফাইফরমাশের কাজ করত। একটু বড় হয়ে ইটভাটায় কাজ ধরে। কিন্তু ইট ভাটায় ছয়মাস কাজ থাকে বাকি ছয়মাস বেকার থাকতে হয়। দূর্গাগাঁতী বাজারে আবু শামার হোটেল থেকে কাওছার মাঝে মধ্যে পুরি-শিঙ্গাড়া কিনত। একদিন হোটেল মালিক আবু শামা কাওসারকে বলে— ‘আমার ইহিনে একজন লোক দরকার। তুই আমার ইহিনে কাম করবি। তিন ওয়াক্ত খাওয়া দিমু। আর দিন একশ ট্যাহা দিমু। কাম শিখলি ধীরে ধীরে বেতন বাড়ামু’।

আবু শামার কথায় কাওছার বলে, ‘তাইলি মায়ের কাছ থেকে শুনি’।

পরের দিন মায়ের সম্মতি নিয়ে কাওছার আবু শামার হোটেলে কাজে যোগ দেয়। তারপর সেখানে প্রায় পাঁচ বছর কাজ করে কাওছার একজন দক্ষ বাবুর্চি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শিঙ্গাড়া, পুরি, সমুচা, মোগলাই, পরোটা, বিরানি রান্নায় তার চেয়ে সিদ্ধহস্ত দূর্গাগাঁতী বাজারে আর নেই বললেই চলে। হঠাৎ ভিনগাঁয়ের একটা হোটেলে কাজ পায় কাওছার। তিনবেলা খাওয়া মাসে পনেরো হাজার টাকা বেতন। মন্দ না। রেহেনা বেওয়ার সংসার ভালোই চলতে থাকে। ছোট ছনের ঘর ভেঙ্গে বড় টিনের ঘর দেয়। আব্দুল খালেক মাস্টার জীবদ্দশায় একদিন রেহানা বেওয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলেন— এই ঘর কি তোমরা দিলা? কাওছারের মা হাসি মুখে উত্তর দেয়— ‘হ ভাই, আমরাই দিলাম’।

—কাওছারের কী খবর?

—ভাই দোয়া কইরেন। কাওছার বেশ ভালো আছে। কামাই কাজিও ভালোই করে।

—তো ঘর দিলা ছওয়ালকে বিয়া করাইবা নাহি?

—হ, বিয়া করামি। পাত্রী দেহেন।

বেশ ভালোই কাটছিল কাওছারদের সংসার। হঠাৎ একদিন খবর এল কাওছার যে হোটেলে কাজ করতে সেখানেই মারা গেছে। কেউ বলে কাওছার আত্মহত্যা করেছে আবার কেউ বলে দুষ্কৃতকারীরা তাকে হত্যা করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রেখেছিল। সেই থেকে পুণরায় শুরু হয় কাওছারের মায়ের কান্দন।

৩.

কাওছারের মায়ের ঘর পার হয়ে পশ্চিম দিকে আরও একটু আগাতেই মরহুম আব্দুল খালেক মাস্টার দেখতে পায় কানা মবজেল পাগলের মতো বিলাপ করতে করতে খালি গাঁয়ে হাটছে। লোকমুখে কানা মবজেল নামে পরিচিত হলেও সে আসলে পুরোপুরি অন্ধ নয়। জন্ম থেকে মবজেলের বাম চোখটি নষ্ট হলেও ডান চোখ দিয়ে সে সবই দেখতে পায়। এক চোখ আলো না থাকায় লোকমুখে সে কানা মবজেল নামে পরিচিত। কানা মবজেলের দুই ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে। দূর্গাগাঁতীর লোকেরা বলে— ছেলের আশায় আশায় মবজেলের পাঁচটি মেয়েসন্তানের জন্ম হয়। পাঁচটি কন্যা সন্তান জন্মের পর মবজেল প্রথম পুত্রসন্তানের পিতা হয়। কিন্তু মবজেল বলে একটি ছওয়ালের কোনো ভরসা নাই, আমার আরও একটি পুত্র সন্তান চাই। পরের বছর মবজেলের ঘরে আরও একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়।

মবজেলের বড় সন্তান তুখোড় মেধাবী ছাত্র আতিক হাসান একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মাকে বলে— ‘আমার পায়ে কুত্তা খামচা দিছে। এই দ্যাহো রক্ত বের হইছে’।

আতিক হাসান তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা এবং বৃত্তি পরীক্ষা শেষ হয়েছে কিন্তু ফলাফল প্রকাশ হয়নি। আতিকের মুখে কুত্তা খামচা দেওয়ার কথা শুনে তার মা বলে— ‘দেহি দেহি কোয়ানে কুত্তা খামছা দিছে’।

সে সত্যি সত্যি আতিকের পায়ে কুত্তা খামচা দেওয়ার দাগ দেখতে পায় এবং ক্ষত স্থানে রক্তও দেখতে পায়। আতিকের মা মনে মনে ভাবে— ‘রক্ত বের হইছে, তাইলি বিপদ অয়তে পারে’। লোকমুখে শোনা যায়, পাশের গ্রামের শুক্কুর আলী গুড় পড়া দেয়। গুড় পড়া খাইলে জলাতঙ্ক হয় না। গুড় পড়া দেওয়ার আগে শুক্কুর আলী প্রথমে আক্রান্ত ব্যক্তির পিঠে থালি ধরে। বিষ থাকলে পিঠে থালা আটকে যাবে আর বিষ না থাকলে থালা আটকিবে না। পরের দিন ভোরে মবজেল আলীর স্ত্রী জয়নব বেগম সামন্য গুড় ও একটি কাসার থালাসহ আতিককে নিয়ে দুই মাইল দূরে শুক্কুর আলীর বাড়িতে হাজির হয়। জয়নব বেগমের মুখে সব কথা শুনে শুক্কুর আলী আতিকের পিঠে কাসার থালা ধরে মন্ত্র পড়ে ফু দিলে আতিকের পিঠে থালা আটকে যায়। শুক্কুর আলী জয়নবকে বলে— ‘আপনার ছওয়ালের শইলে বিষ আছে, চিন্তা কইরেন না, গুড় পইড়া দিত্যাছি। ঠিক অইয়া যাইবোনি’।

তারপর অনুমান পঁচিশ দিন পর একদিন ভোরে আতিকের পেটে ব্যথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়তে থাকে। ডাক্তারের কাছে নেওয়া হলে ডাক্তার জানায় আতিক হাসান জলতাঙ্কে আক্রান্ত হয়েছে। পনেরো তিন অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে কানা মবজেলের বড় সন্তান আতিক হাসান। সেদিন বিকালে খবর আসে আতিক হাসান ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে।

দিনমজুর মবজেলের সংসারে কোনদিন স্বচ্ছলতা ছিল না। অভাব তার নিত্যদিনের সঙ্গী। একদিন দুপুরে মবজেল কানার দ্বিতীয় পুত্র আশিক হাসান স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মাকে বলে— ‘মা , খুব খিদা লাগছে, চারডো ভাত দে’।

এই কথা শুনে জয়নব বেগম বলে— ‘ভাত পামু কোয়ানে, ভাত তো নাই। যা তুই গরুর জন্য ঘাস নিইয়া আয়’।

আশিক বলে— ‘আচ্ছা। এই যে আমি ঘাসের লাইগা গেলাম। আইসা জানি ভাত পাই’।

কিছুক্ষণ পর আশিক টুকরিভর্তি করে তরতাজা সবুজ ঘাস কেটে নিয়ে আসে। খিদার যন্ত্রণায় আশিকের ঘাসগুলো খেতে ইচ্ছে করে এবং মনে মনে ভাবে— ‘মানুষ না অ’য়া গরু অ’লে মন্দ অতো না। খাবারের এত চিন্তা থাকতো না’। হঠাৎ সরকার বাড়ির নাদুসনুদুস কুত্তার কথা মনে পড়ে তার— ‘শরীর দেইহাই মনে হয় ওই কুত্তার খাওয়ার কোনো অযত্ন নাই’। সে মনে মনে ভাবে— ‘গরিব ঘরের মানুষ অ’য়ার চেয়ে ধনীর ঘরে কুত্তা অ’য়া অনেক লাভ’। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেটে নিয়ে আশিক মাকে বলে— ‘গরুর লাইগা ঘাস আনলাম, আহুন আমাক ভাত দে’।

আশিকের মা আঁচলে মুখ আড়াল করে কাঁদে আর বলে- ‘বাবা, ভাত পামু কোয়ানে। ভাত তো নাই’।

রাগে অভিমানে আশিক বলে— ‘তাইলি এক বোতল বিষ দে, খাইয়া দাইয়া একবারে ঘুমাই’। জয়নব বেগম শুধু মুখ আড়াল করে নীরবে কাঁদে। আশিক রাগে অভিমানে কোথাই যেন চলে যায়। কিছুক্ষণ পর অস্থির হয়ে ফিরে এসে মাকে বলে— ‘আমার বুকের মদ্দে খুব জ্বালা পোড়া করত্যাছে। আমি বিষ খাইছি। আমাক হাসপাতালে নিয়া যা’। কানা মবজেল তখন বাড়িতে নাই। কামলার কাজ করতে গেছে। জয়নব বেগম হাউমাউ করে কান্নাকাটি করে লোকজন ডাকতে থাকে। গ্রামের লোকজন ধরাধারি করে আশিককে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রওনা হয়। কিন্তু পথের মধ্যেই আশিক মারা যায়।

কাঙ্ক্ষিত দুই পুত্রের অকাল মৃত্যুর পর মবজেল ওরফে কানা মবজেল রাতবিরাতে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে আর একা একা আবোলতাবোল কথা বলে। এমন দৃশ্য দেখে লোকে বলে— ‘দুই ছওয়ালের মৃত্যুর পর মবজেল পাগল অইয়া গ্যাছে’।

৪.

মরহুম আব্দুল খালেক মাস্টার ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে তার বাড়ির দিকে। মসজিদের পর ছোট সরু ব্রিজ পার হলেই মাস্টার বাড়ি। খালেক মাস্টারের বাবা এবং বাবার বাবা শিক্ষক ছিলেন। খালেক মাস্টারের চারপুত্র ও দুই কন্যার মধ্যে দুইপুত্র এবং দুই কন্যা শিক্ষক হওয়ায় তার বাড়ি মাস্টার বাড়ি নামে পরিচিত।

মৃত আব্দুল খালেক মাস্টার ব্রিজ পার হয়ে বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে গলির মুখে দেখতে পায় এক টুকরো মাংসের হাড় নিয়ে দুটি নেড়ি কুত্তা কাড়াকাড়ি করছে। বাড়িতে প্রবেশ করে সে দেখতে পায়, সামিয়ানা টানানো উঠোনে কিছু টেবিল চেয়ার অগোছালো পড়ে আছে তাতে গরুর গোস্তের গন্ধ লেগে আছে। মৃত আব্দুল খালেক মাস্টার একবার পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখে। পেছন বাড়িতে গরুর ভুড়ি পরিষ্কার করা গোবর এবং ছোট একটা গর্তে জমাট বাধা রক্ত পড়ে আছে। মৃত আব্দুল খালেক মাস্টার খুব সহজে অনুমান করতে পারে যে, তার মৃত্যু উপলক্ষে গরু জবাই করে বাড়িতে উৎসব হয়েছে। সে মনে মনে ভাবে এ এক অদ্ভুত নিয়ম, এখানে মৃত্যুতে শোকের পরিবর্তে উৎসব হয়।

মৃত আব্দুল খালেক মাস্টার ধীরে ধীরে তার সদ্য ত্যাগকৃত ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে এবং দেখতে পায় সেখানে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি এবং নগদ অর্থ ভাগবাটোয়ারার জন্য পারিবারিক বৈঠক বসেছে। গেল বছর তার স্ত্রী বিয়োগ হওয়ায় ওয়ারিশ বলতে রয়েছে তার চারপুত্র এবং দুই কন্যা। ভাগবাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে রীতিমতো দর কষাকষি হচ্ছে। কে কোন জমি নেবে? নগদ টাকা কীভাবে ভাগ হবে? ঘরের আসবাবপত্র, তৈজসপত্র ও কাঁথা বালিশ কে কোনটা দেবে? ঘরগুলো কে কোনটা দখল করবে? এই নিয়ে তার ওয়ারিশগণের মধ্যে ভীষণ দেনদরবার চলছে। কন্যাদ্বয় কিছুটা ছাড় দিতে রাজি থাকলেও পুত্রবধূগণ বিন্দুমাত্র ছাড়তে নারাজ। নিজেদের মধ্যে তারা কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব মেলাচ্ছে। একেকজন একেক রকম মতামত ব্যক্ত করছে। কিন্তু কোনো মতামতেই তার চার পুত্রবধূ একমত পোষণ করতে না পারায় একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। মৃত আব্দুল খালেক মাস্টার লক্ষ করে, তার পরিবারের লোকজন তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি ভাগবণ্টন নিয়ে ব্যস্ত। তাকে স্মরণ করার মতো সময় তাদের নেই। বরং মনে হয় এই দিনের জন্যই হয়তো তারা প্রতীক্ষায় ছিল।

৫.

মৃত আব্দুল খালেক মাস্টার ধীরে ধীরে কবরস্থানে ফিরে যায়। তখন মুর্দাদের সভা মাত্র শেষ হয়েছে। অন্য মুর্দাদের কাছে সে জানতে চায়— ‘সভায় কী সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো’?

একজন মুর্দা বলে উঠল— ‘সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, কবরস্থান ভাঙ্গা হলে মুর্দারা মহাসড়কে কাফন মিছিল করবে’।

নানা জটিলতা ও প্রতিকূলতা শেষে কবরস্থানের কিছু অংশ এবং শ্মশানের কিছু অংশ নিয়ে দুই লেনের রাস্তাটি দৃষ্টিনন্দন চার লেনের মহাসড়কে পরিণত হয়। দূর্গাগাঁতী গ্রামের লোকেরা বলে যে— ‘নতুন রাস্তা হওয়ার পর মাঝে মধ্যে গভীর রাতে কবরস্থানের সামনে সড়কের উপর সারি সারি সাদা কাফনে জড়ানো লাশ শুয়ে থাকতে দেখা যায়’।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন : ৭ম সংখ্যা (মার্চ-২০২৫ : বিশেষ ঈদ সংখ্যা)

Read Next

রোকে ডালটন-এর দুটি কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *