
একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করে নওরিন। অনেকদিন ধরে শুনে আসছিল তার পাশের সিটে বসা কলিগ আরমানের জন্য পাত্রী দেখা হচ্ছে। কিন্তু টিফিন আওয়ারে যখন এই নিয়ে ক’জনের ভেতর তামাশাপূর্ণ তুমুল আলোচনা হচ্ছিল, আর আলোচনার বিষয়টা ছিল পাত্রী দেখতে গিয়ে আরমানের পছন্দ হয়নি। নওরিন তখনি সবার ভেতর বলে ফেলল— আরমান, আমি আপনাকে একটা পাত্রীর সন্ধান দিতে পারি। আমার মনে হয় আপনার পছন্দ হবে!
আরমান বেশ হুল্লুড়ে টাইপের ছেলে। মজা করার ঢংয়ে অনেক বেফাঁস কথাও সে বলে ফেলে। কিন্তু বলার ধরনে তা কারও খারাপ লাগে না। আরমান তার স্বভাবসুলভভাবেই বলে ফেলল, আরে নওরিন, আপনি পাত্রীর সন্ধান না দিয়ে নিজের জন্য প্রস্তাব করে ফেলুন, আমি এককথায় রাজি!
নওরিন কম কথার মানুষ। যেন বেশি কথা তার জানা নেই, সেভাবেই সে মুদু হাসল। আর এতে আরমান একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
যেখানে বসে কথা হচ্ছিল, ততক্ষণে যে যার মতো সেখান থেকে চলে গেছে। কিন্তু আরমান তখনো সেখানে ছিল। নওরিনের চা খাওয়া শেষ হলে সে তার ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটা খাম বের করে আরমানের সামনে রেখে বলল, একখানা ফুল ছবিসহ পাত্রীর বায়োডাটা আছে। এখনি খোলার দরকার নেই। বাসায় নিয়ে গিয়ে দেখবেন। পছন্দ না হলে আগামীকাল এটা আমাকে ফেরত দেবেন। এর ভেতর লাঞ্চ আওয়ার শেষ হলে তারা দুজন যে যার মতো সিটে গিয়ে বসল। তবে অফিস ছুটির পর ফেরার প্রস্তুতি নিতে নিতে আরমান নওরিনকে নিচু ও ভারাক্রান্ত গলায় বলল, আমি বায়োডাটা দেখেছি। কথা আগাতে পারে। আর স্যরি, আমি আপনার সাথে ফান করে যা বলেছি, তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আসলে জানতাম না তো…।
নওরিন বলল, ঠিক আছে। আমি কিছু মনে করিনি। সবার সব কথায় রাগ করতে শিখিনি আমি। কে কোন কথা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বলছে, তা বোঝার ক্ষমতা যার আছে, সে চট করে রাগে না! প্রায় বছর হয়ে এল আমরা পাশাপাশি বসে কাজ করছি। আপনাকে না বুঝলে আমি এই বায়োডাটা আপনাকে দিতাম না!
আরমান বলল, ‘যাক বাঁচালেন আমাকে! কিন্তু এই এক বছরে ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলাম না, আপনি…।’
আরমানকে থামিয়ে দিয়ে নওরিন বলল, এটা তো অফিস। আবার প্রাইভেট ব্যাংক। আমাদের ব্যক্তিগত কথা তুলে গল্প করব সে সময় কই?
পরদিন একটু আগেভাগেই অফিসে চলে এল আরমান। তারপর নওরিন আসা মাত্রই সে ব্যস্ত হয়ে ওঠার আগেই আরমান বলল, আপনার পাত্রী বাসার সবাই পছন্দ করেছে। আমার আব্বা-আম্মা আপনাকে বলতে বলেছেন, যদি আপনারা রাজি থাকেন, লোপাকে অফিসে আসতে বলতে পারেন। আমাদের দুজনেরই যদি একজন আরেকজনকে প্রাথমিক দেখায় পছন্দ হয়, তারপর আমরা আপনাদের বাসায় যাব।
নওরিন বলল, খুব ভালো প্রস্তাব! আমি বাসায় গিয়ে আলাপ করে আপনাকে রাতেই ফোনে জানাব। নম্বরটি দিয়ে রাখুন আমাকে।
সপ্তাহের যেদিন ব্যাংকে ভিড় কম থাকে, তেমন একটা দিনে নওরিন তার ননদ লোপাকে সাথে করে ঘণ্টাখানেক আগে অফিসে এল। আরমানকেও সেভাবে আসতে বলে রেখেছিল। তারপর আরমানও লোপাকে নিয়ে নওরিন কমনরুমে কিছুক্ষণ কথা বলে, ও উঠে চলে এসে ওদের সুযোগ করে দিল তাদের নিজেদের মধ্যে কথা বলার। তারপর অফিস শুরু হলে লোপাকে নওরিন বাসায় চলে যেতে বলল। লোপা একাই গেল। কিন্তু নওরিন তাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে বুঝল আরমানকে লোপার পছন্দ হয়েছে এবং ফিরে এসে আরমানের মুখেও দেখল উজ্জ্বলাভা।
পরের সপ্তাহেই ছুটির দিনে আরমান তার মা-বাবা বড় ভাই-ভাবিকে নিয়ে এল নওরিনদের বাসায়। লোপাকে দেখে ওদের সবারই পছন্দ হলো। সবাই নওরিনকে ধন্যবাদ দিল সে নিজের থেকে এ প্রস্তাব আরমানকে দেওয়ার জন্য। লোপা সোশ্যিওলজিতে মাস্টার্স করেছে। আপাতত একটা কলেজে লেকচারার হিসেবে ঢুকেছে। দুটিই মাত্র ভাইবোন ছিল তারা। ভাইটি রোড এক্সিডেন্টে বছর দুই হলো মারা গেছে। নওরিন লোপার মৃত ভাই জোবায়েরের স্ত্রী। বছর তিনেকের একটি ছেলে আছে নওরিন ও জোবায়েরের। নওরিনের শ্বশুর সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। ঢাকাতে তাদের বাড়ি না থাকলেও বনেদি এলাকায় ভালো মানের ফ্ল্যাট আছে। সব মিলিয়ে আরমানদের পছন্দ হয়েছে লোপাকে। লোপার মা-বাবারও পছন্দ হয়ে যায় পাত্রসহ তার ফ্যামিলিকে। দুইপক্ষই বারবার নওরিনকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন এবং লোপা ও আরমানকে তারা সেই সেদিনই আলাদা করে দিলেন তাদের মতো করে গল্প করতে। নওরিন দেখল, সবাই গল্পে এত মশগুল হয়ে পড়েছে, সন্ধ্যার আগেই যে পাত্রপক্ষের চলে যাওয়ার কথা ছিল, সন্ধ্যা পার হয়েও তারা যাচ্ছে না।
হঠাৎ নওরিনের মাথায় একটা নতুন ফন্দি এল। সে সবার হাতে হাতে আরেক দফা গরম চা ধরিয়ে দিয়ে একাই দ্রুত হাতে সবার জন্য রাতের খাবার রেডি করে ফেলল। আর খাবারের সুবাস যখন সারাবাড়ি ছড়িয়ে পড়ল, তখন পাত্রপক্ষের মনে পড়ল, অনেক দেরি হয়ে গেছে তাদের উঠতে। হঠাৎ তারা গড়িমসি করে যখন উঠতে যাচ্ছিল, নওরিন সবাইকে থামিয়ে দিল। বলল, আমি সালাদটুকু রেডি না করা পর্যন্ত যে যেভাবে বসে আছেন, সেভাবেই থাকেন। আপনারা এভাবে গল্প করছেন, আমার এত ভালো লাগছে দেখে! আমার শ্বশুর অনেকদিন এভাবে কারও সাথে মন খুলে কথা বলেনি!
আরমানের বাবা বললেন, ‘উনি তোমার শ্বশুর কি, আমার তো মনে হচ্ছে তুমি ওনার আরেকটি মেয়ে।’ নওরিনের শ্বশুর বললেন, ঠিক বলেছেন ভাই সাহেব!
অনেকদিন পর নওরিনের খুব ভালো লাগছিল, তার শ্বশুর ছেলের মৃত্যুর পর কারও সাথে মন খুলে আড্ডা দিচ্ছেন। শাশুড়ি মজেছিলেন আরমানের মায়ের সাথে। আর নওরিন আরমানের ভাই-ভাবির সাথে ছুটে এসে একথা-সেকথা বলে গল্পের তাল রেখে গেছে আর রান্নাঘরে কাজ করছে। নতুন করে রান্না চাপানোর আগে আরও দুকাপ চা কোনার বারান্দাতে লোপা ও আরমানের জন্যও দিয়ে এসেছিল সে। আরেক দৌড়ে দিয়ে এসেছিল লবণ-মরিচের গুড়োয় কটা বাদাম ভাজাও।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে সবাই স্থির করল, সপ্তাহখানেকের ভেতরই পাকা কথার জন্য বসা হবে দুই পক্ষের দু’চারজন করে আত্মীয় নিয়ে। এর ভেতর লোপা ও আরমান ফোনে কথা যেমন বলছে, তেমনি নিজেদের মতো করে তারা দেখাও করছে। আর প্রতিদিন আরমানের সাথে নওরিনের কথা তো হচ্ছেই। নওরিনের সাথে লোপার কথা ছাড়াও নওরিনের নিজের কথাও হয়।
ক’দিন পর একদিন হঠাৎ করে আরমান জানতে চায়, নওরিন, আপনি বিধবা হয়ে পুরোনো শ্বশুরবাড়িতে কেন পড়ে থাকবেন? কেন আবার বিয়ে করবেন না?
নওরিন বলে, আমার স্বামী জোবায়ের ওর মা-বাবার একটিই ছেলে ছিল। এখন সে নেই, আমি যদি তার সন্তানকে নিয়ে চলে আসি, তার মা-বাবার জন্য বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনিতেই তারা প্রায়ই কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখন তারা আমার ছেলে রাহুলের ভেতই নিজের ছেলের ছবি দেখেন। এর থেকে আমি তাদের বঞ্চিত করলে, আমি কি আলাদা থেকে সুখ পাব? অন্যদের অসুখী রেখে নিজে সুখী হওয়া যায় না! তাই বলতে পারেন এটাই আমার সুখ।
আরমান বলে, আপনার মা-বাবা কী বলেন?
: মা-বাবা কী বলবেন, এখানে আমার কথাই শেষ কথা। আমি তো আমার আরেক মা-বাবার কাছেই আছি। আমার স্বামীর মা-বাবা মানে তো আমারও মা-বাবা। জোবায়ের নেই। তাই এখন তাদের ভালো রাখার দায়িত্ব তো আমার ওপরই বর্তায়!
: এই ধরেন, লোপা যদি তার স্বামীকে নিয়ে থাকে তার মা-বাবার কাছে?
: ঘরজামাই হওয়ার ইচ্ছে আছে নাকি? মৃদু হেসে কথাটি বলল নওরিন আরমানকে।
: না, আমার কথা আসছে কেন? যদি অন্য কাউকে লোপা বিয়ে করে তার মা-বাবার সাথে থেকে যেতে চায়!
নওরিনের একটু খটকা লাগে। যেখানে সবাই নিশ্চিত হয়ে আছে লোপার সাথে আরমানের বিয়ে নিয়ে, সেখানে মাত্র কয়েকটি দিন পার না হতেই লোপা বিষয়ে আরমানের কণ্ঠ বেসুরো ঠেকছে তার কাছে। কিন্তু এ বিষয়ে জোর দিয়ে কিছু জানতে চায় তেমন স্বভাব নওরিনের নয়।
নওরিনকে গম্ভীর হয়ে থাকতে দেখে আরমান বলল, লোপা তো তাই বলল। সে বিয়ের পর তার মা-বাবার কাছে থাকতে চায়। কিন্তু আমার মা-বাবা জীবিত। আমাদের দু’ভাইয়ের একটিই ফ্ল্যাট। কিন্তু যতদিন আমার মা-বাবা জীবিত থাকবেন, আমি অন্য কোথাও থাকতে পারব না। তাছাড়া এসব বিষয়ে লোপা আমার সাথে আলোচনা করেনি, মনে হল সে থাকবেই। তাই আমাকেও থাকতে হবে। ওর ভেতর প্রবলভাবে ডমিনেট করার স্বভাব আছে…।
আরমানের এবারের কথায় সতর্ক হলো নওরিন। সে বলল, আরে না। আপনি যা ভাবছেন, তেমনটি নয়। ও না বুঝে বলে ফেলেছে। ঠিক আছে, ওকে আমি বুঝিয়ে বলব।
: ওকে বোঝাবেন আপনি? তাহলেই হয়েছে!
: কেন বলেন তো? ও কি আমার কথা শুনবে না? মানুষ ঠিক ধারণা নিয়ে জন্মায় না। সে তো প্রয়োজনে শেখেও। মানে শিখতে হয় তাকে।
: দেখেন নওরিন, আমরা শুধু ঘরের ভেতর থেকেই শিখি না। চারপাশও আমাদের শিক্ষা দেয়। সেই শিক্ষা থেকে বলছি, অনেককে অনেক সহজ বিষয়ও কিন্তু শেখানো যায় না! আর শোনেন, একবার যদি কারও সামনে কারও আব্রু খসে যায়, তারপর বহু পরত আবরণে আর ঢেকে থাকলেও কী! ঠিক স্বভাবের নগ্নতাও তো তেমনি!
: তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু ও এমন কী বলল, যে আপনি ভাবছেন ওকে ওর ধারণা থেকে সরানো যাবে না!
: সরানো হয়তো যাবে। কিন্তু মানুষ যখন মানুষের আসল রূপটি চিনে ফেলে, তখন তাকে নিজের ধারণার মতো গড়বে, সেটা সন্তান বা ভাইবোনের ক্ষেত্রে হয়। কিন্তু গড়েপিটে একটা মাস্টার্স করা মেয়েকে আমার মতো সাদামাটা মানুষ স্ত্রী হিসেবে বাগে আনতে পারব, অতটা বিশ্বাস আমার নিজের ওপর নেই।
আরমানের এমন কথার পরে নওরিন দমে যায়। শত হলেও মেয়ে পক্ষ সে। মনে মনে ভাবে, তোমার সাথে আমার ননদের বিয়ে হলে হোক, না হলে না হোক। লোপা সুন্দরী। শিক্ষিতা। মা-বাবার এখন সে একটাই সন্তান। নিশ্চয় আরেকটা পাত্র জুটে যাবে। নেহায়েত আগে থেকে পাত্র খোঁজা হয়নি তাই। মাত্র তো সে নিজে চেষ্টায় নেমেছে।
সেদিন আর আরমানের সাথে নওরিনের কথাবার্তা মীমাংসায় না পৌঁছালেও বাসায় পৌঁছানোর পর নওরিনের শ্বশুর-শাশুড়ি আরমানের কথা জানতে চাইলেন। ইদানীং প্রতিদিনই তেমনটি হচ্ছে। নওরিন দুএকদিন বলেছে, কেন, লোপার সাথে তো ওর কথা হয় ফোনে। দেখাও হয়, ও কী বলে?
নওরিনের শাশুড়ি তখন বলেন, ওর কথা শুনে তো বুঝব না, তুমি যেটা বলবে সেটাই আসল। সেদিনও শ্বশুর-শাশুড়ি একসাথে জানতে চাইলে নওরিন বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না। এখানে না হলে অন্যখানে দেখব। আমাদের লোপা সব দিক দিয়ে উপযুক্ত। তারপর বিসিএসে টিকে গেলে তো কথাই নেই। এত চিন্তা করবেন না তো!
নওরিনের শাশুড়ি বললেন, চিন্তা করব না? জোবায়েরের শোকে আমরা ঝাঁঝরা হয়ে গেছি। সে থাকলে তো আমাদের কোনো চিন্তা ছিল না। বাবার দায়িত্ব ভাই-ই পালন করত। এখন আমরা দুজন চোখ বুজলে কে এই মেয়েকে বিয়ে দেবে?
শাশুড়ির এই কথার পরে নওরিন কথা খুঁজে পায় না। ওদিকে ওদের কথোপকথন লোপার কানে গেলে সে বিচলিত হয়। মনে মনে ভাবে আরমান তাকে দু’দিন ফোন করে না। আরমান বাড়ি ফিরেছে, তেমন সময় হিসেব করে আজ সে একটু আগে কল দিলে কেমন নিরস কণ্ঠে ওর কথার উত্তর দিচ্ছিল। তারপর অল্পক্ষণের ভেতরেই লোপাকে বলতে হল ‘ঠিক আছে, রাখি।’ ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর লোপা মনে করল, এরা আসলে ঘুরে ঘুরে সুন্দরী মেয়ে নির্বাচন করে আর একটাকে দেখা শেষ হলে আরও একটাকে যাচাইয়ে নামে। ভাবি ঠিক তেমনি এক মক্কেল আমার জন্য ধরেছিল।
এরপর পুরো সপ্তাহ গড়িয়ে গেল আরমান আর কোনো কথাই বলল না লোপার বিষয়ে। এই বিয়ের প্রস্তাবটা আনার পর শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে নওরিনের গুরুত্বটা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিয়েটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিষয়টা এমন হল, যেন নওরিনের দোষ। অযথাই লোপাকে আরমানের সাথে নিরিবিলি কথা বলতে দেওয়া হয়েছে, ঘুরতে দেওয়া হয়েছে, এই সবকিছুর জন্য যেন নওরিন দায়ী।
এতদিনে নওরিন খেয়াল করে দেখেছে, জোবায়ের মারা যাওয়ার দুই বছর পরও সে যে একটানা সেই মৃত স্বামীর মা-বাবার কাছে রয়ে গেছে, এর জন্য তারা কখনো তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা দূরে থাকুক, একটা ধন্যবাদও দেয়নি। তার ওপর লোপার বিয়ে ভাঙার জন্য তার ওপর সবাই নাখোশ হয়ে আছে। এমনকি লোপাও। একেকটা বিয়ে হতে হতেও বেশির ভাগ সময়ে ভেঙে যায়। সেখানে এত কেন’র উত্তর অন্তত পাত্রীপক্ষ খুঁজতে যায় না। সেটা তো সে তার নিজেকে দিয়েই জানে। তাই সে আশ্চর্য হচ্ছে, তার শ্বশুর-শাশুড়ি কেন তাকে তুচ্ছ কারণে শাঁখের করাত বানাচ্ছেন!
নওরিনরা থাকে ইস্কাটনে। কিন্তু তার মা-বাবার বাসা ধানমন্ডিতে। জোবায়ের মারা যাওয়ার পর নওরিনের মা-বাবা বারবার বলেও নওরিনকে এ যাবত দুদিন একসাথে কাছে রাখতে পারেননি। নিজের ছেলেকে দিয়ে যতটা সম্ভব সে শ্বশুর-শাশুড়িকে পুত্রশোক ভুলিয়ে রাখতে চেয়েছে! কিন্তু এই ক’দিনের মনোভাবে বোঝা যাচ্ছে তাদের কাছে থাকাটা তারা ওভাবে নেননি। তারা মনে করেছেন দামি ফ্ল্যাটটি শ্বশুরের নামে। জোবায়ের তো কিছু নগদ অর্থ ছাড়া কিছু রেখে যেতে পারেনি, তাই নওরিন তার ছেলেকে ভায়া বানিয়ে ওটারই মালিক হতে চায়। অথচ ওরকম বুদ্ধি কখনো আসেনি তার মাথায়। আর সেরকম শিক্ষাও সে পায়নি। সে বরং মৃত স্বামীর দায়টাই নিজের দায় মনে করে বয়ে চলছিল। তার নিজের বেতনের টাকা সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংসারে খরচ করে ফেলত। কিন্তু ক’দিনে ওদের সবার মনোভাব বোঝার পর সে খুব জেদি হয়ে ওঠে। সে অল্প সময়ের ভেতর বনানীতে তার অফিসের ধারে-কাছে ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে দিনে দিনে তার জরুরি কিছু জিনিস ও ছেলেকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে আসার একেবারে শেষ সময়ে শাশুড়ি বললেন, তুমি যাবে যাও, কিন্তু আমার বংশধরকে নিয়ে যাচ্ছ কেন?
শাশুড়ির এই কথায় রাগে থরথর কাঁপুনি উঠে গেল নওরিনের গা। নওরিন বলল, আপনাদের কাছে আপনাদের বংশধরকে রাখতেই তো আমি এতদিন থেকে গিয়েছিলাম। কাছাকাছি আমার মা-বাবার নিজেদের বাড়ি। তাদের অনুরোধেও আমি দুটি দিন কখনো একসাথে থাকিনি আপনাদের কথা ভেবে। আর সেই আপনারা দুদিন ধরে আমার সাথে কী ব্যবহার করছেন, তা ভেবে দেখেছেন?
শাশুড়ি অবোধের মতো তবু বললেন, তুমি যাবে যাও, আমাদের নাতিকে রেখে যাও!
নওরিন জানে অবোধকে সচেতন উত্তরই দিতে হয়। তাই সে বলল, আমি আপনাদের নাতিকে নিয়ে যাচ্ছি, ঠিক আছে। আইন করে আপনারা ফিরিয়ে আনবেন!
এর ভেতর লোপা বলল, তুমি আমাদের আইন দেখাচ্ছ?
নওরিন তীর্যক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নয় কেন? আইনের জন্মই তো হয়েছে, যে যা না বোঝে তাকে তা বোঝাতে!’ বলে সে ছেলেকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
কদিনের ভেতর নওরিন আগের অফিসের অন্য আরেকটি শাখায় বদলি হয়ে এল। এতে নওরিনের সিটে নতুন আরেকজনকে দেখে আরমানের মন চঞ্চল হয়ে উঠল। সে খোঁজ নিয়ে জানল নওরিন কোথায় গেছে। তারপর তাকে সুযোগমতো ফোন করে অনেক অনুনয় করে তার সাথে দেখা করতে চাইল। নওরিনের নতুন বাসায় তার ছেলেকে দেখার জন্য আপাতত তার মা-বাবাকে নিয়ে আসছে। নওরিন ভেবেছিল, সে তার মা-বাবার কাছে ধানমন্ডিতে উঠবে। কিন্তু ওখানে গেলে অবকাশ ছিল তাকে তার শ্বশুর-শাশুড়ির ফিরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু সে সুযোগ সে তাদের আর দিতে চায় না। কারণ নওরিন নিজের ব্যক্তিত্ব রক্ষায় বড় একরোখা। এ জন্য সে সহজে কোনো কিছুতে ভেঙে পড়ে না!
নওরিন সন্ধ্যার পর আরমানকে তার বাসায় আসতে বলেছিল। সেই অনুপাতে দেখা গেল দুজনে প্রায় কাছাকাছি সময়ে বাসায় ঢুকল। অবশ্য নওরিন অফিসের পোশাক পাল্টে হাত-মুখ ধোয়াসহ আগন্তুকের জন্য কিছু নাস্তা রেডি করার সময় পেয়েছিল। এরপর আরমান এলে নিজেই দরজা খুলে দিল।
আরমান ঘরে ঢুকেই কোনো ভূমিকা না করে বলল, নওরিন, আমি আপনার ধোঁয়াওঠা চাসহ নাস্তা খাব পরে। আগে আমি আমার কথাগুলো বলে নিই। তারপর যদি খেতে দেন, দেবেন!
নওরিন বেশ আশ্চর্য হয় আরমানের এমন কথায়। সামান্য একটা ঘটনা কেন্দ্র করে কী এমন হতে পারে, যে এমন নাটকীয় মোড় নেবে! সে বলল, ঠিক আছে। তাই হোক!
: দেখেন, লোপাকে আমার কতটা পছন্দ তা আমি জানি না। তবে আপনাকে আমি এত পছন্দ করতাম, নিজের চেয়ে আমি আপনাকে ব্যাংকিংয়ে দক্ষ মনে করে এবং আপনার নিখুঁত চলন বলন সবকিছু আমাকে আপনার সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা দিয়ে আসছে। সেই ক্ষেত্রে আপনি আপনার ননদ কেন, যদি অন্য কারও জন্যও ঘটকালি করেন, আমি নিশ্চিন্তে আপনার পেছনে হাঁটতে পারি!
: তাই যদি হয়, তাহলে সপ্তাহখানেক না যেতেই এমন শীতল মনোভাবের হয়ে গেলেন কেন, বলেন তো? অবশ্য আপনি বাসা পর্যন্ত আসছেন বলেই আমি জানতে চাইছি। নাহলে কোনোদিনই জানতে চাওয়া হতো না!
: সে আমি জানি! সেজন্যই আমার এই ছুটে আসা!
: হ্যাঁ, বলেন!
: আপনি আপনার শ্বশুরবাড়ির জন্য, লোপার জন্য, এত করছেন, আর লোপা বলছে, ওই ফ্ল্যাট তো তার বাবার নামে। তার ভাই যখন নেই, এখন সে একাই ওটা পেতে চায়। তাই বিয়ের পর সে ওটা দখলে রাখার জন্য ওখানেই থাকতে চায় এবং সে বিয়ের পর আপনাকে বলে দেবে, আপনাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে, আর আপনার ছেলেকে তার মা-বাবা মিলে সে পালন করবে! এবার আপনি বলেন, বিয়ের আগেই যে এরকম রূপ প্রকাশ করে ফেলে হবু স্বামীর কাছে, তাকে বিয়ে করার রুচি আর যারই হোক, আমার হবে না।
নওরিন, যেন কথা খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কতক্ষণ আর নীরব থাকা যায়! সে তাই বলল, এবার খাবারটুকু তো মুখে তোলেন! আর শোনেন, মানুষেরও দায় আছে তার আশপাশের মানুষকে ভালো করার। যদিও আমি এইসব বিষয় নিয়েই রাগ করে চলে এসেছি। কিন্তু আমি তো আর জানতাম না অবস্থা এই…।
: সে আমি জানি। আমার তাই মনে হচ্ছিল। শেষে বিবেকের দহনে নেমে পড়লাম আপনাকে কৈফিয়ত দেওয়ার জন্য খুঁজতে।
: যা বলছিলাম, আমি তাদের থেকে দূরে চলে আসছি তাদের সাথে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই বলে। কিন্তু আমার স্বামীর তো ছিল। আমার সন্তানের আছে। তাই আমি ভালো কিছু যদি করতে পারি, তা থেকে বিরত থাকাটা আমার পাপ হবে! দেখেন, আয়নায় যখন পারদ থাকে, তখন শুধু নিজেকে দেখা যায়, সে পারদ ঘষে তুলে দিলে তখন নিজের পরিবর্তে সেই আয়নায় পুরো দিগন্ত দেখা যায়। তাই লোপাকে এসব বুঝিয়ে বললে, সে বুঝবে। আপনি আমাকে একটা চান্স দেন। আমরা একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি, সে দিক দিয়েও কিন্তু আমরা একই পরিবারের সদস্য! আপনি লোপাকে বিয়ে করতে রাজি। বলেন?
আরমানের কী হয়, সে নওরিনের হাত দুটি ধরে ফেলে। বলতে থাকে, নওরিন, কেবলই আপনি আপনার নিজের প্রতি আমার মুগ্ধতা বাড়িয়ে নিচ্ছেন। আপনার এই পরোপকারী রূপ আমাকে পৃথিবীর আর সবার থেকে অন্ধ করে তুলছে। আমার চোখের সামনে আমি শুধু আপনাকেই দেখতে পাচ্ছি। আমার এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে এমনটি কখনো কারও বেলায় হয়নি!
নওরিন আরমানের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলল, পৃথিবীতে ঝড়-বৃষ্টি এসে বৃক্ষরাজিকে ধুয়ে নতুন করে দিয়ে যায়। পুরোনো-জীর্ণ ডালপালা ভেঙে পড়লেও আবার নতুন শাখার উন্মেষ ঘটে সেখান থেকেই। রাত বেশি হয়নি। যদি আপনার আপত্তি না থাকে চলেন, আমার মা-বাবাও আছেন আমার বাসাতে। আমরা একসাথে লোপাদের বাসায় যাই…।
: ক’দিন আগেও যেটা আপনারও বাসা ছিল আজ তা শুধু লোপাদের বাসা হয়ে গেল!
: আমারও তো একটা বাসা হলো! ওটা না ছেড়ে এলে জীবন আসলে নতুন বাঁক পেত না। আর আমি যে আপনাকে যাওয়ার কথা বলছি, যদি আপনার মতোই এ ক্ষেত্রে সবটুকু হয়। যদি মনে করেন বাসা থেকে নতুন করে মত নিতে হবে, তাহলে আজ থাক!
: শেষের যা হয়েছে এটা আমি বাসায় কারও কাছে বলিনি!
: তাহলে চলেন, আমি বলছি!
: আপনি বলছেন, তাহলে আমার কোনো কথা নেই!
ওরা ইস্কাটনে লোপাদের বাসায় যাচ্ছে নওরিনের মা-বাবার গাড়িতে। সাথে তারা দুজনও যাচ্ছেন। লোপার বিয়েকে কেন্দ্র করে নওরিনের জীবনের টানাপড়েন, এবং সেই কারণে শ্বশুরের বাসা থেকে বেরিয়ে আসা, এসবের কিছুই তারা জানেন না। তাই নওরিনের মা-বাবা দুজনেই খুশি বহুদিন পর তাদের ছোট মেয়ের শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে তাদের দেখা হবে বলে। পথে গাড়ি থামিয়ে নওরিন মিষ্টির দোকানে ঢুকল, তার পেছন পেছন গাড়ির সামনের সিট থেকে নেমে আরমানও দোকানে ঢুকল এবং জোর করে মিষ্টির দামটি সে-ই দিল।
গাড়িতে ওঠার পর কিছুক্ষণের ভেতর আরমান বলল— নওরিন, আমার বড় ভাই কিন্তু আমার আপন ভাই নয়। এ যাবত এটা নিয়ে কোনো কথা ওঠেনি। কিন্তু আমার মা-র খুব ভয়, তার দুই বউয়ের ভেতর এই নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি হয়!
: আরমান, এখন আমরা কেউ কিন্তু কারও মুখাপেক্ষী নই। তবু আমরা যে যাকে আপন মনে করে আঁকড়ে থাকতে চাইব, আমাদের ওই চাওয়াটাই লাভ। মানে ওই চাইতে পারাটাই। আর যে তা পারবে না, তো মনের দিক থেকে দেউলিয়া। তা আদনান আপনার সৎভাই?
: আমার মায়ের সন্তান হচ্ছিল না বলে ওনাকে দূরের কোনো লোক মারফত কোনখান থেকে এনেছিলেন। এটা আমাদের আত্মীয়-স্বজনরাও জানে না। আমি জানলাম কিছুদিন আগে। এটা কিন্তু ভাইয়াও জানে না!
: জোবায়ের থাকতে আমিও জানতাম না, জোবায়েরের মা মারা গেলে আমার এই শ্বাশুড়িকে বিয়ে করেন আমার শ্বশুর। জোবায়ের কখনো বলেনি আমাকে।
নওরিনের এই কথার পরে তার মা-বাবা একসাথে বললেন, তাই নাকি?
কিন্তু নওরিন তাদের কথার কোনো উত্তর দেয় না! নীরবতা খুব ঘন হয়ে ওঠাতেই বুঝি আরমান বলে উঠল, রাত বেড়ে যাচ্ছে সে জন্য নয়, নওরিন, যেহেতু এখন গন্তব্য স্থির করে ফেলেছেন, নাহলে বলতাম, চলেন, অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য আমরা সবাই লংড্রাইভে কোনো ফাঁকা রাস্তায় চলে যাই!
নওরিন মনে মনে কল্পনা করতে থাকে, আবিররাঙা আকাশ সামনে রেখে ফাঁকা রাস্তায় লাল ধুলো উড়িয়ে গাড়ি ছুটছে আর তার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে আরমান। যে তাকে ভালোবেসে জেনেশেুনে বিষও পান করতে রাজি আছে।
একসময় গাড়ি ঢুকে পড়ে ইস্কাটন নওরিনের শ্বশুরের ফ্ল্যাটের গ্যারেজে। তারপর নওরিন তাদের দরজার কলিংবেলে চাপ দিতে টুংটাং করে ভেতরে বাজা মৃদু শব্দ, আরও মৃদুভাষে বাইরে এসে নওরিন ও আরমানের কল্পনার সব পথ ফুরিয়ে নিঃশেষ করে দিল। বাইরে দাঁড়ানো তাদের তীব্র অপেক্ষা ভীষণ দোদুল্যমান করে রাখল, ভেতর থেকে কে এসে দরজা খোলে!