
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন পরিবর্তনশীল শিক্ষক এবং একজন মহান শান্তিবাদী ব্যক্তিত্ব, যিনি চিরকাল মানবজাতিকে আধ্যাত্মিক শক্তি ও কর্মে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন। যদি তার চিন্তাভাবনা এবং কার্যকাণ্ড থেকে শেখার আগ্রহ হয়, তবে তার কাছ থেকে যা আহরণ করা যাবে তার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই।
অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারাজীবন একজন অসুখী মানুষ ছিলেন। সুখ ছাড়া শান্তি নেই। অন্তরে ও সংসারজীবনে সুখ না থাকায় শান্তিতে থাকতে পারেননি। এটা সত্যি যে তিনি একটি সম্ভ্রান্ত, সম্পদশালী, প্রভূত প্রভাবশালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বিশেষ সুযোগ ও সুবিধা পেয়েছিলেন। যদিও তিনি একটি নিরবচ্ছিন্ন এবং নিরাপদ জীবনযাপন করেছেন, কিন্তু তার জীবনে যেমন শান্তি ছিল না, তেমনি তার হৃদয়ে কোনো সুখ বা আনন্দ ছিল না। বলা যায় দুর্ভাগ্যতাড়িত একজন মানুষ ছিলেন। তার আপন জন্মভূমি এবং আপন জাতির লোকেরাই তাকে পদে পদে অপদস্ত করেছে। তার এই দুর্ভাগ্যের তিনটি সম্ভাব্য কারণ বা পটভূমি রয়েছে বলে আমার ধারণা।
প্রথমটি হলো, তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার অকাল মৃত্যুতে সীমাহীন মর্মান্তিক কষ্ট পেয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, রবীন্দ্রনাথ তার পারিবারিক জীবনে যে অপরিমেয় দুঃখ, বেদনা ও হতাশার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তার নজির তৎকালীন খ্যাতিমান বাঙালির মধ্যে দেখা যায়নি।
দ্বিতীয় কারণ হলো, রবীন্দ্রনাথ ভারতের নাগরিক হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলেন। কোনো স্বাধীনতা ছিল না ভারতবাসীর। ছিল না কোনো প্রকার শান্তি ও মুক্তির স্বাদ। ১৮৫৭ সালে ভারতীয়রা তাদের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিল। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও আন্দোলন গড়ে ওঠে, এবং ক্রমশ তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। স্বাধিকারের জন্য এই জাগরণ ও উদ্দামতাকে ‘স্বদেশি আন্দোলন’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আর এই সংগ্রামের বিপ্লবী কর্মী বা দেশপ্রেমিকদের অধিকাংশই ছিল তরুণ-তরুণী। তাদের মধ্যে একজন অত্যন্ত সাহসী ও কর্মঠ বিপ্লবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি একজন ব্যাংকার এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী মানুষ ছিলেন। ১৯০২ সালে যখন প্রভাবশালী জাপানি মনীষী, শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন ভারত ভ্রমণ করেন, তিনি তার বাড়িতে কিছুদিন আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় বাঙালির তরুণসমাজে স্বাধীনতার আগুনকে উসকে দিয়ে প্রজ্জলিত করে সুদূর জাপান পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম জাপানি নাগরিক যিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে অন্তর থেকে সমর্থন করেছিলেন। উজ্জীবিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওকাকুরার উষ্ণ সান্নিধ্য পেয়ে। দুজনের বন্ধুত্ব এতই প্রগাঢ় হয়েছিল যে, ব্রিটিশ সরকার তা সুনজরে দেখেনি। রবীন্দ্রনাথের ওপর ক্রমশ চাপ বৃদ্ধি পেয়েছিল, অশান্ত করেছিল তাকে। বাংলার বিভাজন ঠেকাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্য যে-কারওর চেয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনি বাঙালির ঐক্যবদ্ধতার জন্য, শান্তিময় স্বাধীনতার জন্য অজস্র কবিতা লিখেছেন, প্রবন্ধ রচনা করেছেন, স্বরচিত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন, দিয়েছেন জ্বালাময়ী বক্তৃতা।
বঙ্গভঙ্গরোধ আন্দোলনে তার এই অবদান সুবিশাল। সেই আন্দোলন সাময়িকভাবে বাংলার বিভাজনকে রোধ করলেও রবীন্দ্রনাথের স্বদেশে শান্তি আসেনি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ে। শান্তি দেয়নি তাকে। ১৯১৬ সালে তার বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী ওকাকুরার দেশ জাপানে প্রথম ভ্রমণ এবং প্রায় মাস তিনেক অবস্থান, তার জাপান ভ্রমণের সূত্র ধরে ১৯১৫ সালে দুর্ধর্ষ বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর জাপানে পালিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়গ্রহণ, বিপ্লবী গদর পার্টির সংযোগ এবং জার্মান থেকে ক্রয়কৃত বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ভারতে চালানকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে এক গভীর ষড়যন্ত্রের মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটে আমেরিকায় ১৯১৭ সালে তার পুনরায় আমেরিকা ভ্রমণকালে। যাকে ইতিহাসে হিন্দু-জার্মান কন্সপিরেসি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
তৃতীয় কারণ হলো, রবীন্দ্রনাথ তার সময়ের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা প্রচুর সমালোচিত হয়েছেন, পর্যুদস্ত হয়েছেন। তার ক্ষুরধার বাস্তবধর্মী সাহিত্যরচনা ও বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অহেতুক অভিযোগ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। অবশ্যই, সঠিক মতামতের চেয়ে নেতিবাচক মতামতই বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত দুঃখের বিরুদ্ধে উচ্চাবাক্য করেননি, কারও বিরুদ্ধেই বাদ-বিবাদ-প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ করেননি। যাই ঘটুক না কেন, তিনি তার লক্ষ্যে অটল ছিলেন এবং পরিকল্পনামাফিক কাজ করার জন্য তার কঠোর পরিশ্রম করার ক্ষেত্রে মোটেই অনীহা বা ক্লান্তি ছিল না। রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক ও জীবনীশক্তি ছিল অপরিসীম, আশ্চর্যজনক ও অদম্য। এই শক্তি দিয়েই তিনি আজীবন স্বদেশবাসীর জন্য— বিশ্বমানবের জন্য নিঃশর্ত ও সুদূরপ্রসারী এক আন্তর্জাতিক বা সর্বজনীন শান্তিবাদের প্রবক্তা হয়ে উঠেছিলেন। এই ক্ষেত্রে তিনি কখনোই নমনীয় হননি, গভীর হতাশার মধ্যেও আশাবাদী ছিলেন মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত। তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯১৯ সালে রাজধানী দিল্লিতে ব্রিটিশ পুলিশ কর্তৃক নির্মম জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ঘটালে, এর প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ তার ‘নাইডহুড’ উপাধি ত্যাগ করেন। এই অমানবিক ঘটনায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রতিবাদ করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীকে অনুরোধ করেছিলেন তার অভিমত ব্যক্ত করার জন্য কিন্তু গান্ধী রাজি হননি। সর্বমান্য গান্ধীর এই মনোভাব অত্যন্ত ব্যথিত, অশান্ত ও বিক্ষুব্ধ করেছিল রবীন্দ্রনাথকে।
এহেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপর্যুক্ত শান্তিবাদের পক্ষে যে অসীম প্রাণশক্তির অধিকারী ছিলেন, সেটা কোথা থেকে আহরণ করেছিলেন? বাংলার ষড়ঋতুসমৃদ্ধ প্রকৃতি থেকে, হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ, উপনিষদ, শ্রীমদ্ভগবত গীতা, পুরাণ, মহাভারত, রামায়ণ, প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্য এবং শিশু ও যুবসমাজের কাছ থেকে। এবং তার অপরিসীম প্রাণশক্তির কারণে, তিনি সর্বদা নিজের, অন্যের, সমাজ, জাতি এবং বিশ্বের জন্য শান্তি ও সুখ কামনা করেছিলেন। নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য শান্তি সৃজনে কী করা যায় তার কারণ ও ভিত্তি খুঁজে বের করার জন্য প্রতিনিয়ত অন্বেষণ করেছেন, গবেষণা চালিয়ে গেছেন। দেশে-বিদেশে রবীন্দ্রনাথের অর্জিত অজস্র অভিজ্ঞতা, আবেগ ও পর্যবেক্ষণের পেছনে ছিল শান্তি ও আনন্দের আহ্বান। এককথায় যা মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য। এই অনুভবই তার সমস্ত সাহিত্যচর্চায় সর্বজনীন শান্তির কথা বলতে, মঙ্গলের কথা বলতে, মানুষ, সমাজ ও ভবিষ্যৎ শিশুদের জন্য কল্যাণকর কাজে অবদান রাখতে অশেষ অনুপ্রাণিত করেছিল। কালজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’ তার ব্যক্তিগত জীবন, স্বপ্ন, দর্শন, সর্বজনীন শান্তি এবং আধ্যাত্মিক আনন্দের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে ‘গীতাঞ্জলি’ সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য একটি অমূল্য সম্পদ।
শান্তি-অন্বেষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বদাই আগ্রাসী, অপ্রয়োজনীয় জবরদস্তি, নিপীড়ন, অপশাসন, স্বার্থপরতা, বৈষম্য, যুদ্ধ ও ধ্বংসকে ঘৃণা করতেন। তিনি অস্বীকার করেছেন যে তিনি একা কিছু করতে পারেন না। একাই অনেক অসাধ্য কাজ সম্পাদন করা সম্ভব। মানুষ এমন প্রাণী যারা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এগিয়ে চলে। উজানে রয়েছে অজানা-অচেনা আশা, আকাঙ্ক্ষা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বেঁচে থাকার অপার সম্ভাবনা। পেছনে রয়েছে অতীতের প্রেরণা। অচলতা, অসুস্থতা ও নির্ভরতা আপন শক্তির অপচয় মাত্র। একক শক্তি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নীতি তার ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে/ তবে একলা চলো রে’ গানটিতে সুস্পষ্ট। এর অর্থ এই যে, যদি কেউ তোমার ডাকে, তোমার কাজে সাড়া না দেয় তবে একাই এগিয়ে যাও।
ভবিষ্যৎদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ৮০ বছরের মধ্যে প্রায় ৪০ বছর বিদেশ ভ্রমণে কাটিয়েছেন। চারটি মহাদেশের অনেক দেশ ও সমাজ পর্যবেক্ষণ করে তিনি প্রচুর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মানব সমাজের বৈচিত্র্য ও বহুত্বই শান্তির পথ। বহুত্ববাদ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও মানবিক প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এটা মেনে নিলে জাতি-গোত্রের ভেদাভেদ থাকবে না, ধর্মের নামে কোনো অনৈতিক কাজ কেউ করবে না এবং জাতীয়তাবাদের অতিরিক্ত ঔদ্ধত্য থাকবে না। শান্তি হলো পারস্পরিক মতবিনিময়, পারস্পরিক সহিষ্ণুতা, হার্দিক সহাবস্থান বজায় রাখা এবং বিপদের সময় সহযোগিতা করা। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জাতীয়তাবাদী, ধর্মান্ধ বা অন্যায়ের নীরব পথচারী বলা যায় না। তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ১৬ জুন, ১৮৯৪ তারিখের একটি চিঠিতে, রবীন্দ্রনাথ তার আত্মীয় প্রমথ চৌধুরীকে লিখেছিলেন—
‘ইংরেজগুলো যে রকম অসহ্য অহংকারী এবং উদ্ধত হয়ে উঠছে তাতে একটা কিছু হওয়া নিতান্ত উচিত— চুপ করে পায়ের তলায় পড়ে পড়ে মার খাওয়াটা নিতান্ত অন্যায়।’
শিক্ষাব্রতী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুশিক্ষার প্রতি আজীবন অনুরক্ত ছিলেন। বিশেষ করে, শিশুদের শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। শিশুকে কুসংস্কারবর্জিত জাতিগত ঐতিহ্য ও আধুনিক মানসগঠনকল্পে শিক্ষাদান করাই সুফলদায়ক। সুশিক্ষা অবশ্যই সুফল দিতে বাধ্য, আর সামান্য কুশিক্ষাও বিপথগামী করতে যথেষ্ট। মানুষ তার আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না, যদি না সে ভালো শিক্ষা অর্জন করে, এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সমকক্ষ না হয়। সুশিক্ষার মূল লক্ষ্যই হলো স্বাধীনতা। অবশ্যই, সুন্দর পরিবেশ সুশিক্ষার জননী। পরিবেশ অবশ্যই সীমাবদ্ধ কিন্তু সেখানে থাকতে হবে প্রকৃতির সতেজ আমেজ ও শক্তি। খোলা বাতাস, অবাধ সূর্যালোক, পাতার উপর জলের প্রবাহ, ক্ষুদ্রজীবন এবং প্রাণীদের মিষ্টি কোলাহল, পাখির কূজন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অবিরাম প্রবহমান রশ্মি বা মহাবিশ্বের দীপ্তি। এসব শারীরিক ও মানসিক সত্তা উভয়কেই সুস্থ এবং শক্তিমান রাখে। এককথায় বললে আজকের যুগে যাকে ‘ইকোলজি’ বলা হচ্ছে, তার স্বরূপ রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষপূর্বেই পুনর্সৃজন করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। যা প্রাচীনকালে মুনিঋষিদের যুগে ভারতবর্ষেই ছিল। এই উদ্দেশ্যেই তিনি প্রাচীন ভারতীয় ঋষিশিক্ষাকেন্দ্র তথা তপবনের আদর্শে শান্তিনিকেতনে একটি ব্রহ্মচর্যাশ্রম নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে শিশু ও যুবরা শুধু পড়তে ও লিখতে শিখবে না, দৈহিক, আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানবিজ্ঞান শিখতে পারবে, যা মানবতার উপকারে আসবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ সহবস্থান সুপ্রতিষ্ঠা লাভ করবে। শান্তিনিকেতনকে এমনভাবে গড়তে চেয়েছিলেন যে, শিশু এবং যুবরা শিক্ষাপাঠের মাধ্যমে যেন বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠে। শান্তিনিকেতন তাই সারাবিশ্বের মানুষের জন্য। এটি স্থানীয় ও বিদেশিদের একত্রিত হওয়া এবং যোগাযোগ সংযোগ করার একটি অনুপম মিলন কেন্দ্র। বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব শান্তিনিকেতনের শিক্ষাগত দর্শনের মূলনীতি।
রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এই উচ্চবিদ্যাপীঠ বিগত শত বছরে ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিশ্বব্যাপী খ্যাতিমান অনেক দেশি-বিদেশি বুদ্ধিজীবী এবং পণ্ডিতদের প্রভাবিত করেছে। তার আমন্ত্রণে দেশ-বিদেশের বহু বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কবি, লেখক, শিল্পী ও রাজনীতিবিদ শান্তিনিকেতনে পা রেখেছেন। তাদের মধ্যে জাপানিদের সংখ্যাই বিস্ময়করভাবে অধিকাংশ। শান্তিনিকেতন এবং ঠাকুরবাড়ির ‘বিচিত্রা’ আর্ট স্কুলে জাপানের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট চিত্রশল্পীকে শিক্ষকরূপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই ইতিহাসও অনেক দীর্ঘ। তার পরিশ্রম বৃথা যায়নি ২০২৩ সালে ইউনেসকো বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতিতে ভূষিত করেছে। অর্থাৎ বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সারিতে স্থান করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি যা প্রতিটি বাঙালির জন্য গৌরবের বিষয়। পেছনে ফিরে তাকালে, তার সকল প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারের বক্তৃতায় যা বলেছিলেন তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সন্দেহ নেই । তিনি বলেছিলেন—
‘এক জাতির সঙ্গে অন্য জাতির, এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির সংঘাত হওয়ার মধ্যে নয়, মানুষের কর্তব্য হচ্ছে একের সঙ্গে সৌভ্রত্রার শান্তির সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাওয়া, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন পুনরুদ্ধার করা। আমরা তো হিংস্র পশু নই। এখন আত্মস্বার্থই আমাদের বিচ্ছিন্ন করছে, দুঃখ দিচ্ছে, হিংসা ও ঘৃণাবোধের জন্ম দিচ্ছে, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছে।’
এক শতাব্দী পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর্যবেক্ষণ আজও একই জায়গায় আছে, কিন্তু আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ বন্ধ না করে আমরা শান্তি বিনষ্ট করার জন্য যুদ্ধ শুরু করি— এটা রবীন্দ্রদর্শনের পরিপন্থী। তাই, আমাদের লক্ষ্য ও কর্ম হলো রবীন্দ্রনাথের শান্তি দর্শন ও তার শান্তির দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুধাবন করা। আজকের শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে একটি যুগোপযোগী শিক্ষাগ্রহণে নিযুক্ত করা যাতে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে তারা শৈশব থেকেই। এই প্রাচ্যাঞ্চলে ও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিজেদের উৎসর্গ করার মতো একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা। সমাজের অভিভাবকদেরকে উৎসাহিত করা। শান্তিবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজীবন লালন করেছিলেন এই লক্ষ্য ও আশা।
১৪ এপ্রিল, ১৯৪১ তারিখে মৃত্যুশয্যায় লেখা কবিগুরুর শেষ প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’য়ে তিনি একজন মহান ব্যক্তির আগমনের অপেক্ষাকে কেন্দ্র করে শান্তির জন্য অনির্বাণ এক আশা রেখে গেছেন। প্রবন্ধের শেষদিকে তিনি বলেছেন—
‘আজ আশা করি আছি, পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্রলাঞ্ছিত কুটীরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই। আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি— পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, কী রেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তুপ! কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপমান মনে করি।’
কে জানে সেই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত প্রাচ্যের সূর্যোদয়ের দেশ জাপানেই জন্ম হতে পারে সেই পরিত্রাণকর্তা-মহাত্মার। ইতিহাসের চরম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ধ্বংস আর বিনাশে অপার অভিজ্ঞতালব্ধ এবং বিশ্বশান্তি আন্দোলনে জাপানিদের মধ্যে সেই সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান বলেই বিশ্বাস করি। শান্তিবাদী রবীন্দ্রনাথ যতবারই মনে অস্থিরতা, অশান্তি অনুভব করেছেন জাপানে চলে এসেছিলেন। শান্তিময় জাপান তাকে দৈহিক ও মানসিক শান্তি দিয়েছিল। শান্তিকামী সচেতন জাপানিদের সুশিক্ষা, ঈর্ষণীয় সংস্কৃতি লালন, ক্রমাগত উত্তরণের আত্মপ্রচেষ্টা কবিকে বারংবার আশাবাদী করেছে, শান্তিনিকেতনে শান্তির বাতাবরণ নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছে। সেই স্মৃতি থেকেই হয়ত বা ভবিষ্যতের শান্তির দূতকে কল্পনা করেছেন ‘সভ্যতার সংকট’ নামক শেষ রচনায়।
* ১১.১১.২০২৪ তারিখে য়োকোহামাস্থ রবীন্দ্রস্মৃতিধন্য সানকেইএন বাগানবাড়িতে অনুষ্ঠিত সভায় পঠিত বক্তৃতা
প্রবীর বিকাশ সরকার