
আমাদের ছড়াসাহিত্য বিশ্বের প্রধানতম সাহিত্যের সাথে অপরিচিত। এ-অবস্থা চলতে পারে না। কারণ রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকুমার আমাদের পূর্বসূরি। তাঁদের ঝাপসা হয়ে যাওয়া পথটা নতুন আলোয় ভরিয়ে তুলতে হবে। এমন উপলব্ধি থেকে গত শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের প্রথম সারির বেশ কজন কবি এগিয়ে এসে কলম ধরেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ-র নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তিনিই এখানকার প্রথম সিদ্ধ ছড়াকার। উনিশশো পঞ্চান্ন অব্দে তাঁর ‘সাতনরীর হার’ বইটির প্রকাশ তখনকার সামাজিক-রাজনীতিক তুঙ্গ অবস্থার ভেতরেও বিদ্বজ্জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য বইটিতে গুটিকয়েক ছড়া ও কবিতা ছিল। ছড়াগুলোর উদ্দিষ্ট ছোটরা ছিল না, এবং সেগুলোর মধ্যে ব্যঙ্গ ছিল। ঐতিহাসিক কারণেই বইটি এবং এর রচয়িতা হিসেবে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর নাম স্মরণীয়। এরপরই যিনি বিশেষ ভূমিকায় নাম লিখিয়েছেন— তিনি বরেণ্য কবি শামসুর রাহমান। সমাজ-সভ্যতার প্রতি দায়বদ্ধ এই কবি তাঁর সাহিত্যচর্চায় ব্যক্তিগত জীবন থেকে একটা বৃহৎ ভূখণ্ডের দিকে, মানববিশ্বের দিকে এগিয়ে গেছেন।
সাহিত্যের যত শাখা, তার মধ্যে ছড়ার সাথেই মানুষের প্রথম পরিচয় ঘটে। শৈশবকে রাঙিয়ে তুলতে প্রথমেই ছড়ার দ্বারস্থ হতে হয় আমাদের। কেননা ছড়া মনে অসংখ্য রঙ ছড়ায়, সুর ঝরায়। শুধু কি তাই, ছড়া খুব সহজেই মজা দিতে পারে। শৈশবকে আনন্দময় করে তুলতে ছড়ার জুড়ি নেই। সে এক মায়াবী যাদুকর। আমরা যখন খুব ছোট, কথা বলতে পারি না, তখন থেকেই সে তার যাদুকরী ভূমিকা রাখতে শুরু করে। তখন মা, বাবা, বড় ভাই-বোনেরা আমাদের ছড়া কেটে শোনান। তারপর একটু বড় হয়ে নিজেরাই ছড়া কাটতে শিখি। সেরকম বালক বয়সে মাথা দুলিয়ে সুর করে ছড়া কাটেনি— এমন কেউ আছে কি?
শামসুর রাহমানের ছড়ায় শিশু-কিশোরদের নির্মল আনন্দের পাশাপাশি যে-জায়গাটি প্রধান হয়ে ওঠে তা আমাদের বাহ্যজীবন। বাংলার সমাজ, রাজনীতি, তার দুর্দশা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ তাঁর কবিতার মতো ছড়ায়ও ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। যদিও মূলত তিনি বাহ্যজীবনের প্রতি তেমন আকৃষ্ট নন, তবু এমন হওয়ার কারণ— তাঁর মতে— প্রত্যেক ক্রিয়ার একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। উল্লিখিত বিষয়গুলো তাঁকে আন্দোলিত করেছে। তাছাড়া তৃতীয় বিশ্বে বসবাসের একটা যন্ত্রণা আছে, বিশেষ করে শিল্পী-কবিসাহিত্যিকরা এ-যন্ত্রণা বেশি ভোগ করেন। তৃতীয় বিশ্বে বাস করতে হয় সামাজিক, রাজনীতিক, সামরিক ইত্যাদি পীড়নের মধ্যে। তাই তৃতীয় বিশ্বের কবিদের অনেক জ্বালা, অনেক বেদনাবোধ ও দায়িত্ববোধ আছে। আর সেজন্যেই তাঁর কবিতার মতো ছড়াও ক্রমশ সেই ভেতরের পৃথিবী থেকে বাইরের পৃথিবীর দিকে গেছে। সামাজিক অনাচার, অবিচার, স্বৈরশাসন ও নানা ধরনের উৎপীড়ন, শৃঙ্খলাবদ্ধতার বিরুদ্ধে তাঁর মন রিঅ্যাক্ট করেছে, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, যা তাঁর সামাজিক ভূমিকায়ও দেখা গেছে, এবং এর প্রকাশ ঘটেছে তাঁর অধিকাংশ ছড়ায়। বিক্ষোভকে তিনি ছড়ায় পরিণত করেছেন, কীভাবে, তা দেখার আগে ছড়া সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক আরও কিছু কথা।
অনেক ছড়া আছে, যার এক পঙক্তির অর্থ বোঝা যায় তো আরেক পঙক্তির অর্থ বোধগম্য হয় না, তবুও ভালো লাগে— কারণ ছড়ায় যাদু থাকে। বিশেষ ছন্দ ও সুরের জন্যেই তার মধ্যে থাকা আবোল-তাবোল কথাও মিষ্টি ও মধুর হয়ে ওঠে। সাধারণত ছড়ায় যে-ছন্দ থাকে তার নাম স্বরবৃত্ত; যার আরেক নাম দলবৃত্ত। নামটি যেমন সুন্দর, তেমন এর নাচ বা চলনও। চপলা মেয়ের মতো সে নাচতে নাচতে চলে, আর ঝলমল করে বাজতে থাকে তার নূপুর। কোনও ছড়া নাচে দেখিয়ে দেখিয়ে, আর কোনওটি বা মনে মনে— যেমন নিচের লোকছড়াটি—
ওপেনটি বায়স্কোপ
নাইন-টেন টাইস্কোপ।
চুলটানা বিবিয়ানা
সাহেব-বিবির বৈঠকখানা।
সাহেব বলেছে যেতে
পান-সুপারি খেতে।
পানের আগায় মরিচ-বাটা
স্প্রিঙের চাবি আঁটা।
যার নাম রেনুবালা
তারে দিলাম মুক্তার মালা।
প্রচলিত এমন আরও অনেক লোকছড়া আছে, যা ভেঙে ভেঙে শামসুর রাহমান লিখেছেন নতুন ছড়া। নমুনা—
আঁটুল বাঁটুল শামলা সাঁটুল, শামলা গেছে হাটে
কুচকরণ কন্যা যিনি, তিনি ঘুমান খাটে।
খাট নিয়েছে বোয়াল মাছে, কন্যে বসে কাঁদে,
ঘটি বাটি সব নিয়েছে, কিসে তবে রাঁধে?
আর কেঁদো না, আর কেঁদো না, ছোলা ভাজা খেয়ো,
মাটির ওপর মাদুর পেতে ঘুমের বাড়ি যেয়ো।
[আঁটুল বাঁটুল ছড়া/এলাটিং বেলাটিং]
আপাতত এর অর্থ বোঝার দরকার নেই। তার চেয়ে এর মিষ্টি নাচে মত্ত হয়ে, এর ভেতরে যে কোনও অর্থ থাকতে পারে সে-কথা ভুলে গিয়ে, কেবল এর ছন্দ ও সুরের যাদুতে নাচি আর নাচি। তবে ছড়ায় কোনও অর্থ থাকে না, এ-কথা পুরোপুরি ঠিক নয়। ছড়ায় অর্থ থাকে গোপনে, গভীর জলের মাছের মতো লুকিয়ে, সহজে ধরা দিতে চায় না। এমন একটি ছড়া আমরা সবাই জানি, যার ভেতরে অনেক অশ্রু লুকিয়ে আছে—
ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?
ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কী?
আর ক’টা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।
ছড়াটি আবৃত্তি করলেই দু-চোখে ঘুম নেমে আসে। কারণ, এর ছন্দ নাচের চঞ্চল ছন্দ নয়, এর চরণে চরণে রয়েছে স্বপ্নভরা ঘুমের আবেগ। অথচ ছড়াটি ধরে আছে অজস্ত্র কান্না। এর ভেতরে ছিন্নসূত্রের মতো বয়ে গেছে বর্গিদের অত্যাচারের স্রোত। একদা বাংলার উপকূল অঞ্চলে বর্গিরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ছড়াটির মধ্যে আছে সেই দুঃসহ অত্যাচারের কথা।
প্রত্যেক কবিরই থাকে আপন এলাকা— সাম্রাজ্য—; শামসুর রাহমানের কবিতা-সাম্রাজ্যের নাম ‘একান্ত ব্যক্তিতাজড়িত অব্যবহিত প্রতিবেশ-পৃথিবী-জীবনপূর্ণ সমকাল’। তাঁর ছড়া সম্পর্কেও এ-কথা প্রযোজ্য। তাঁর ছড়ার এক অংশ উড্ডীন পাখির মতো অমল; আরেক অংশ সমকালের বিশ্বস্ত দলিল। গতশতকের কয়েক দশকের বাংলাদেশ, তার বাহ্যজীবন ও আন্তর আলোড়নকে তাঁর ছড়ায় ভালোভাবে পাওয়া যায়।
[ক]
আতা গাছে চারটি পাখি, ডালিম গাছে তিন—
সাতটি পাখি মনের সুখে নাচে তা ধিন ধিন।
সাতটি পাখি সাতটি সুরে গান গেয়ে যায় রোজ,
আতা গাছে, ডালিম গাছে সুরের সে কি ভোজ।
হুকুম এলো একই সুরে গাইতে হবে গান,
নইলে জেনো সাতটি পাখির যাবে যে গর্দান।
শুনলো সবাই গাছতলাতে ব্যাপার সে কী হাঁক,
পড়ল ঢাকা সাতটি পাখির মিষ্টি সুরের ডাক।
কৈ পালালো গানের পাখি শূন্য করে শাখ?
আতা গাছে, ডালিম গাছে বসছে শুধু কাক!
[আতাগাছে, ডালিম গাছে/ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো]
[খ]
একালের এক রাজ্যে আছেন
রূপসী এক রানি।
তাঁর বিষয়ে আমরা সবাই
অনেক কিছুই জানি।
ঘোড়াশালে ঘোড়া আছে,
হাতিশালে হাতি।
রানির সকল দরদালানে
জ্বলে ঘিয়ের বাতি।
রানির রূপের কদর আছে
হাটে ঘাটে মাঠে।
অথচ তার কুশাসনে
দেশ উঠেছে লাটে।…
[একালের এক রাজ্যে/ নয়নার জন্য]
আপাত সরল এসব ছড়ার মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে আছে আমাদের জাতীয় জীবনের রক্তাক্ত ও বেদনাময় ইতিহাস। প্রথমটিতে [ক] স্বৈরাচারী শাসকের অন্যায় হুকুম-জারির মাধ্যমে ভাষার ওপর আগ্রাসন, আর তার প্রতিবাদে গর্জে-ওঠা পাখির প্রতীকে মুক্ত ও সংস্কৃতিমনাদের মর্মান্তিক পরিণতি; দ্বিতীয়টিতে [খ] একালের এক রানির কথা, যার রূপের কদর থাকলেও কুশাসনে দেশ লাটে উঠেছে। কিন্তু রূপের ছটা দেখে তো আর গরিব প্রজার পেট ভরে না। তারা ভাত খেতে চায়। ভাতের অভাবে তারা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না, বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। দেশে খুনের নদী বয়ে যায়, তবু রানি তার সাধের সোনার গদি আঁকড়ে থাকেন। ছড়াটি এক বিশেষ সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও হয়ে উঠেছে সর্বকালের। সীমিত পরিসরেও রানির সম্পর্কে অনেক কথা বলা হয়েছে। কোথাও তার নাম বলা হয়নি। তবে শুরুতে ব্যবহৃত ‘একালের’ শব্দটি চাবির মতো কাজ করেছে। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না— সেই রূপসী রানি কে? এভাবে ছড়ার মধ্যে অর্থ গোপনে ঘুমিয়ে থাকে, অনেক আদর করে তাকে জাগাতে হয়। শিশুদের মতো ছড়ার অর্থও ছড়ার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকতে ভালোবাসে।
শামসুর রাহমানের প্রথম ছড়াবই এলাটিং বেলাটিং-এর প্রথম ছড়া ‘ছড়ার এ-বই’ পড়ে জানা যায়— যারা বয়সে নবীন, দুষ্টুমিতে ভরা চোখ, কিন্তু কল্পনায় নির্দোষ, সুন্দরকে দেখে দেখে আরও সুন্দর হয়ে উঠবে; যারা পক্ষীরাজের পিঠে উড়ে বেড়ায়, স্বপ্নবাড়ির ভিটেয় বসে জিরিয়ে নেয়, এবং হঠাৎ মিলের ফাঁদে পড়ে ভেল্কি বোঝে, তাদেরই ছন্দের দোলনায় চড়িয়ে দিতে চেয়েছেন কবি।
এই তো দ্যাখো ফুলবাগানে গোলাপ ফোটে,
ফুটতে দাও।
রঙিন কাটা ঘুড়ির পিছে বালক ছোটে,
ছুটতে দাও।
… … … …
মধ্যদিনের নরম ছায়ায় ডাকছে ঘুঘু,
ডাকতে দাও।
বালির ওপর কত্ত কিছু আঁকছে শিশু,
আঁকতে দাও।
… … … … …
নরম রোদে শ্যামাপাখি নাচ জুড়েছে,
নাচতে দাও।
শিশু, পাখি, ফুলের কুঁড়ি— সবাইকে আজ
বাঁচতে দাও।
[বাঁচতে দাও/রংধনুর সাঁকো]
শিশু, পাখি, ফুলের কুঁড়িসহ সবাই যেন জীবনের সবকিছু নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচার আনন্দে বাঁচতে পারে, এবং সেই স্বাধীনতায় কেউ যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়— এমন আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে উদ্ধৃত ছড়ায়। এর প্রতিটি পঙক্তির মধ্যেই রয়েছে মোহনীয় আবেদন। একেকটি মনোরম চিত্রকল্পের মাধ্যমে তা শিল্পরূপ পেয়েছে!
এক-সময় ছড়া ছিল মূলত নন-সেন্স রাইম। যত উদ্ভট বিষয় আর রসের মিশেলে রচিত সেসব ছড়া। পাঠককে আনন্দদানই সেসবের প্রধান উদ্দেশ্য। এ-পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সুকুমার রায়—
হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল ‘‘হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে— ‘‘বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”
টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা—
পোকা ছেড়ে শেষে কিগো খাবে কাঁচা লঙ্কা?
ছাগলের পেটে ছিল না কি ফন্দি,
চাপিল বিছার ঘাড়ে, ধরে মুড়ো সন্ধি!
জিরাফের সাধ নাই মাঠে ঘাটে ঘুরিতে,
ফড়িঙের ঢং ধরি’ সেও চায় উড়িতে।
গরু বলে, ‘‘আমারেও ধরিল কি ও রোগে?
মোর পিছে লাগে কেন হতভাগা মোরগে?”
হাতিমির দশা দেখ,— তিমি ভাবে জলে যাই,
হাতি বলে, ‘‘এই বেলা জঙ্গলে চল ভাই।”
সিংহের শিং নেই, এই তার কষ্ট—
হরিণের সাথে মিলে শিং হলো পষ্ট।
[খিচুড়ি/আবোল তাবোল]
তারপর সেখান থেকে যুগপরিক্রমায় পুরোপুরি সেন্সে চলে এসেছে ছড়া। এ-পর্যায়ের বড় উদাহরণ অন্নদাশঙ্কর রায়—
তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো!
তার বেলা?
[খুকু ও খোকা/ শ্রেষ্ঠ ছড়া]
ননসেন্স থেকে এরকম সেন্সে চলে আসার বড় কারণ, আধুনিক ছড়া-রচয়িতারা তাদের ছড়ায় আর অর্থহীন কথার সুর ছড়াতে চান না। তারা স্বপ্নের ফুল ফোটানোর পাশাপাশি জ্বালাতে চান বাস্তবের আগুনও। তাই ছড়া আজ বিচিত্র; যেমন অর্থহীন, তেমন স্বপ্নময়, জ্বালাময়, আরও অনেক রকম। শামসুর রাহমানের ছড়া-পাঠে আমরা এই বৈচিত্র্যের স্বাদ পাই।
[ক]
হঠাৎ সেদিন পাঁচ বছরের কন্যা
দোরের গোড়ায় দেখতে পেল বন্যা।
শুকনো মাটি কোথাও খুঁজে পায় না—
এক নিমেষে দেশটা হলো আয়না।
[আয়না/ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো]
[খ]
ভায়ে ভায়ে হবে না আর
লড়াই কোনোখানে
দিগ্বিদিক উঠবে ভ’রে
বুক মেলানো গানে।
খরায় পোড়া বিরান মাঠে
ফলবে ফসল কত,
নতুন শতক জ্বালবে পিদিম
লক্ষ তারার মতো।
[নতুন শতক/নয়নার জন্য]
[গ]
রাত দুপুরে মচমচিয়ে
ওঠে হাজার বুট
সত্য গেছে বনবাসে
রাজ্যি চালায় ঝুট!
[ইঁদুর কাটে/ আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি]
[ঘ]
পাখা নেড়ে নেড়ে প্রজাপতি বলে—
মেরো না আমাকে, মেরো না।
আমাকে তোমরা বাঁচতে দাও।
গাছের পাতার রাঙাপোকা বলে—
মেরো না আমাকে, মেরো না।
আমাকে তোমরা বাঁচতে দাও।
… … … …
ক্ষুধায় কাতর মানুষটা বলে—
মেরো না আমাকে, মেরো না।
আমাকে তোমরা বাঁচতে দাও।
খুনীকে লোকটা ভয় পেয়ে বলে—
মেরো না আমাকে, মেরো না।
আমাকে তোমরা বাঁচতে দাও।
[বাঁচতে দাও/আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি]
এ-দেশের শিশুতোষ ছড়া নির্মাণের দ্বিতীয় পর্বে একটি বিশেষ সামাজিক কারণ উপস্থিত ছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিস্মৃত হলে চলবে না। কেননা, ওই কার্যকারণের ফলেই তৎকালীন বহু রসোত্তীর্ণ রচনা আকৃতিতে ছড়া হলেও প্রকৃতিতে স্যাটায়ার হয়েছে, এবং তা শিশুর প্রয়োজনে নিবেদিত হলেও প্রকৃত লক্ষ্য ছিল পিতৃ-পিতৃব্যের দল। সেখানে প্রশাসনের বিরুদ্ধে কটাক্ষ ছিল, প্রচলিত রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল, সামাজিক জীবনের ছায়া প্রতীকে এসে ধরা পড়েছিল। সেই সমকালে শামসুর রাহমান লিখেছেন—
ঘরে এলে তোমায় আমি
খেতে দেব কী?
খেতে দেব চালের কাঁকর
দেব ভেজাল ঘি।
[ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ]
সুদূর পঁয়ষট্টিতে রচিত এই ছড়ার ধারাবাহিতায়, পরবর্তী সময়ে, তাঁর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি এমন আরও ছড়া—
[ক]
ফাও পেতে চাও? ফাও?
ওয়াসার কাছে চাও।
পানির সঙ্গে পাবে
গুবরে পোকার ছা-ও।
[ফাও/রংধনুর সাঁকো]
[খ]
কাফন ছাড়াই লাশগুলো সব
করছ দাফন কি?
ছেঁড়া কাঁথা, কলার পাতা
মন্দ কাফন কী?
[বিকল্প/রংধনুর সাঁকো]
[গ]
একজন আছে লোক
চৌকস বলিয়ে।
তিলকে সে করে তাল
বিদ্যেটা ফলিয়ে।
কী যে বলে রাত দিন
দেখেনাকো তলিয়ে।
[বক্তা/ধান ভানলে কুঁড়ো দেব]
এসব ছড়া একাধারে রাজনীতি ও প্রতিবাদী লক্ষণাক্রান্ত এবং যে-সব সামাজিক-রাজনীতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে রচিত তা আজও প্রাসঙ্গিক। এভাবে সমকালীন রাজনীতি ও সামাজিক মাৎস্যন্যায় তাঁর ছড়ার শরীর কম-বেশি ভরে রেখেছে। চারিত্রিক ধর্মের দিক থেকে এরা অন্নদাশঙ্করী ছড়ার সগোত্র। এর বহমান ধারা বহুদূর সচল। স্বাধীনতার পরে শ্লেষ মেশানো এমন ব্যঙ্গ জড়িত ছড়ার প্রসার বেড়েছে।
ছড়ার সুর যেখানে সচেতনভাবে প্রতিবাদী সেখানে সে বয়স্ক মননের তীব্র মনোযোগ দাবি করে। শিশু বা কিশোর ছন্দের দোলা বা ধ্বনিমাধুর্যে আপ্লুত হলেও এ-জাতীয় ছড়ার শেষ বিচারক তারা নয়, বরং বিচারক হলো সাবালক পাঠক। শামসুর রাহমানের ছড়া-পাঠকালে এ-কথাটি আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। প্রবাদ প্রবচন ও রূপকথার ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে, প্রচলিত লোকছড়ার ঢঙে লেখা তাঁর এমন দুটি ছড়া থেকে উদ্ধৃতি—
[ক]
ঠগ বেছো না, ঠগ বেছো না,
এ-গাঁয়ে ভাই ঠগ বাছাটা বারণ।
এক নিমেষে উজাড় হওয়ার
ভয়টা হ’ল ঠগ না বাছার কারণ।
[বিবেচনা/লাল ফুলকির ছড়া]
[খ]
আজব দেশের ধন্য রাজা
দেশজোড়া তাঁর নাম
বসলে বলেন ‘হাঁট রে তোরা’,
চললে বলেন, ‘থাম’।…
[রূপকথা/লাল ফুলকির ছড়া]
আরেক জাতের ছড়া আছে, যা আদি ও অকৃত্রিমভাবে খেয়াল-খুশির রাজ্যে টেনে নিয়ে যায়। সে-জগৎ উদ্ভট খামখেয়ালির, বিশুদ্ধ ননসেন্সের। শ্লেষ নয়, কৌতুক ও রঙ্গ তার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। প্রাকৃতিক খেয়ালখুশির ন্যায় তা অযৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু অসত্য নয়; আর সে-কারণেই সচেতন চেষ্টায় তার নির্মাণ অতিশয় দুরূহ; আরও কঠিন, রসোত্তীর্ণতায় তাকে উতরে দেওয়া। কৌতুকমাত্রার পরিমিতিবোধ মনুষ্যসমাজে সুলভ নয়। ফলে প্রায়শই কষ্টকল্পিত ভাঁড়ামিতে পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমাদের দেশের ছড়ায় কৌতুকরসের মাত্রা প্রায়শ সীমালঙ্ঘনের দায়ভাগী হয়, রসাভাস ঘটায়। বিখ্যাত, স্বল্পখ্যাত বা অখ্যাত— সব ধরনের কবিপ্রতিভা সেক্ষেত্রে একই পঙক্তিভোজ্য হয়ে পড়েন। এ-ব্যাপারে শামসুর রাহমাকে প্রথম থেকেই সচেতন মনে হয়—
ও-পাড়ার ঐ লতু বেজায় চতুর
হাজার কয়েক কড়ি ছিল লতুর।
অষ্টপ্রহর লেগেই আছে ভোজ যে,
গপ্ গপ্ গপ্ গিলতো গজা রোজ সে,
গজা খেয়ে লতু হলো ফতুর।
[ফতুর/এলাটিং বেলাটিং]
এটি কবির প্রথম-ছড়াগ্রন্থের একটি লিমেরিক। বাংলাদেশি ছড়ার উপরোল্লিখিত স্বাভাবিক প্রবণতার মধ্যেই এটি রচিত। আপাত সরল ছোট্ট ছড়াটির ভেতরেও লুকিয়ে আছে জীবনের গভীর আর্থনীতি ও অঙ্কের জটিল হিসাব।
প্রথম-দিকে শামসুর রাহমান ছিলেন কিছুটা লৌকিক ধারার প্রতিবাদী; অচিরেই হয়ে ওঠেন পুরোপুরি আধুনিক ধারার, তবে বরাবরের মতো মৃদুভাষী— যেমন এই প্রতীকাশ্রয়ী ছড়ায়—
ভাঙা একটা দেয়ালে
কী জানি কী খেয়ালে বসলো এক কাক।
ক্ষুধায় কাতর ছিলো সে
হঠাৎ তাড়া দিলো কে? মৌমাছিরই ঝাঁক।
মৌমাছি তুই উড়ে যা,
ভাঙা দেয়াল ঘুরে যা, কাকটা বসে থাক।
সারা দুপুর কাঁপিয়ে
শহরটাকে ছাপিয়ে উঠছে কাকের ডাক।
[কাক ডাকে/ গোলাপ ফোটে খুকির হাতে]
অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে— ‘ছড়া যদি কৃত্রিম হয় তবে তা ছড়া-ই নয়, তা হাল্কাচালের পদ্য। গল্প-উপন্যাস বানিয়ে বানিয়ে লেখা যায়, ছড়া বানাতে গেলে তা ছড়ার মতো শোনায় না, পদ্যের মতো শোনায়। তাতে বাহাদুরি থাকতে পারে, কিন্তু তা আবহমানকাল প্রচলিত খাঁটি দেশজ ছড়ার সঙ্গে মিশ খায় না।’ শামসুর রাহমান এ-ব্যাপারেও সতর্ক থেকে লিখেছেন তাঁর সময়ের নতুন ছড়া। বিভিন্ন লোকজ ছড়া ভেঙে নিজের মতো করে পাকিস্তানি আমলের হালহকিকতসহ বিভিন্ন সময়ের রাজনীতিক-সামাজিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন—
[ক]
সবাই করে আহা উহু,
কার কাহিনী কে শোনে?
চায়ের চিনি উধাও হ’ল;
চাল মেলে না রেশনে।
সর্ষে তেলের ঘ্রাণ পাওয়া ভার,
নেইকো ঘরে জ্বালানি।
পণ্যগুলো হচ্ছে লোপাট
ধন্য চোরাচালানি।
[ছড়া/লাল ফুলকির ছড়া]
[খ]
রাতারাতি লাল হয়ে যায়
কালোবাজারি
গুনলে পরে হবে ওরা
কয়েক হাজারই।
আইনে বলে, হ্যাঁ গো, কাজটা
ওদের সাজারই।
কিন্তু ওদের সাজা দিলে
রুই-কাতলা সবাই মিলে
রেগে মেগে করবে মিটিং
করবে মুখ ব্যাজার-ই।
[সম্পর্ক/ লাল ফুলকির ছড়]
[গ]
কালো টাকার পাহাড় গড়া
মহাপ্রভুর ধামা-ধরা
টাকার জোরে ভোট বাগানো
মিথ্যে কথায় লোক খ্যাপানো
মঞ্চে উঠে বকবকানো
যখন-তখন লোক ঠকানো
এই তো আমার কেতা,
মস্ত আমি নেতা।
… … …
আমার পুকুর আমার খামার
ঘাতক-দালাল মিতা আমার
ধর্ম আমার বিরাট পুঁজি
আলো ছেড়ে আঁধার খুঁজি
আগামী এই নতুন সনে
যে-করেই হোক ইলেকশনে
চাই যে আমার জেতা
মস্ত আমি নেতা।
[নেতা/ গোছানো বাগান]
সাম্প্রতিক ও বাস্তব ঘটনা-ই তাঁর ছড়ার বিষয় হয়নি, জীবন ও প্রকৃতির মিশেলে তা হয়ে উঠেছে সৌন্দর্য ও আনন্দময় কল্পনার রাজ্য—
[ক]
শোন দীপিতা আমরা দুজন
উড়ে উড়ে চাঁদের দেশে যাবো।
রাতের বেলা সেই মুলুকে
পৌঁছে গেলে তারার মালা পাবো।
… … …
শোন দীপিতা, তোর সে হারের
দোলায় ফুলে উঠবে নদী-নালা।
চোখের পাতা কেঁপে ওঠার
সাথেই শুরু বাড়ির ফেরার পালা।
[চাঁদের দেশে কিছুক্ষণ/ইচ্ছে হলো যাই ছুটে যাই]
[খ]
বহুদূরের পথ পেরিয়ে, বন পেরিয়ে
এই শহরে আসবে উড়ে
একটা পাখি ভালো।
তার দু-চোখে মায়াপুরীর ছায়া আছে
দূর পাতালের স্বপ্ন আছে
আছে তারার আলো।
সেই পাখিটা এই শহরে আসবে ব’লে
পথের ধারে ভিড় জমেছে
সবাই তাকায় দূরে।
চোখগুলো সব আকাশপারে বেড়ায় ছুটে—
মস্ত রঙিন পাখা নেড়ে
আসবে পাখি উড়ে।…
[একটা পাখি/গোছানো বাগান]
গতশতাব্দীর আশির দশকে বাংলাদেশের সাহিত্য এক নতুন মোড় নেয়— যেমন মননে, তেমন চর্চার ব্যাপকতায়, যার আভাস দেখা যাচ্ছিল সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। নতুন পথের প্রায় সর্বাঙ্গে সমাজ সচেতনতা, যার ঝলমলে বিভা ফোটে ছড়ার গায়ে। ছড়া তখন সাহিত্যের এক প্রধান শাখা। এর চর্চায় এগিয়ে এসেছিলেন অনেকেই। তখন সামনের কাতারে ছিলেন শামসুর রাহমান—
[ক]
মোল্লাগুলো যখন-তখন
ফতোয়া জারি করে
পাড়াগাঁয়ের দুলালিরা
দোররা খেয়ে মরে।
… … … …
মোল্লাগুলোর জুলুমবাজি
খতম করার তরে
দেশের মানুষ সবাই মিলে
যেতে হবে ল’ড়ে।
[মোল্লাগুলো/লাল ফুলকির ছড়া]
[খ]
শহরটাকে ধরল ঘিরে
মিশমিশে এক আঁধার,
খোলা ছাদের, হাটের মাঠের
সময় হলো কাঁদার।
…. … … …
সবাই মিলে করি যদি
‘আঁধার খেদা’ও লড়াই,
লেজটি তুলে পালাবে সে
করবে না আর বড়াই।
[আঁধার তাড়ানো ছড়া/তারার দোলনায় দীপিতা]
শামসুর রাহমানের ছড়া খনার বচন, ডাকের বচন বা নিছক ছেলে-ভোলানো নয়, কিংবা লোকসাহিত্যের ভাঙাচোরা ছন্দের রচনাও নয়; এগুলোর ভাবে, ভাষায়, ছন্দে সর্বত্র রয়েছে শিল্পীর হাতের ছাপ। কোথাও কোথাও ছন্দে ও বলার ভঙ্গিতে হালকা হলেও ভাবে ভারি। শিল্পগুণ বজায় রেখেও কবি তাঁর ছন্দ ও বলার ভঙ্গিকে যথাসম্ভব মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। কান ও মন খোলা রাখলে দেখা যাবে— ছড়াগুলো তাঁর স্বকীয়তায় জ্বলজ্বল করছে—
[ক]
আমার দোয়াত সাঁতার কাটে
নিঝুম সরোবরে;
আমার কলম অস্ত্র হয়ে
দুষ্ট দমন করে।
[আমার কলম/আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি]
[খ]
আমার খাতা রবি ঠাকুর
হাসেন রবির মতো,
কাজী কবি ঝড় হয়ে যান
দোলেন অবিরত।
আমার খাতায় ডুকরে ওঠে
লক্ষ ভুখা লোক
তাকিয়ে থাকে হিরোশিমার
গলে যাওয়া চোখ।…
[আমার খাতা/ আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি]
[গ]
রোদ হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে
খেঁকশেয়ালের বে’।
সর্বনাশা ঝড়ের পরে
কোমর বাঁধে কে?
[সাইক্লোন/ ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো]
দাদা-দাদি, মা-খালাদের বা চাষাভুষার অশিক্ষিত মুখের ছড়া এক জিনিস, আর চালাক-চতুর সেয়ানা লেখকের পাকাহাতের ছড়া আরেক জিনিস। এক্ষেত্রে তিনি মৌখিক ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করতে চেয়েছেন—
[ক]
শোনরে বৃষ্টি শোন
কান্না তোদের বোন।
ঘর ভাসালি, দোর ভাসালি
আনলি দেশে বান,
চাষির চোখে জল নামালি,
নিলি সোনার ধান।
শোনরে বৃষ্টি শোন
কান্না তোদের বোন।
[থামরে বৃষ্টি/গোলাপ ফোটে খুকির হাতে]
[খ]
ইল্লি ইল্লি ইল্লি
কেমন তুমি বিল্লি?
অষ্টপ্রহর করছ কেন
এমন চেল্লাচিল্লি?
চুনসুপারি দিয়ে তুমি
পান খাবে তিন খিল্লি?
চুনসুপারি মেলে নাকো,
ইল্লি ইল্লি ইল্লি।
আর কটা দিন সবুর করো
হয়ে যাবে হিল্লি।
[ইল্লি ইল্লি ইল্লি/গোলাপ ফোটে খুকির হাতে]
রবীন্দ্রনাথের মতো সত্য ও সুন্দর তাঁর অন্বিষ্ট। তাই বারবার তাঁর লেখায় এসেছে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর প্রসঙ্গ। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তাঁকে নিয়ে তিনি বলেছেন অনেক, এবং গদ্য, কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন ‘সেই যে তিনি’; ‘কবি’; ‘অন্যরকম ছেলে’; ‘ঠাকুর বাড়ির সেই ছেলেটি’; ‘সেই ছেলেটা’র মতো বেশ কয়েকটি যাদুকরী ও সুখপাঠ্য ছড়া; যার একটি এখানে তুলে ধরা হলো—
সেই যে যিনি বাংলাদেশে পদ্য লিখে
এনেছিলেন বান,
বলতে পার কাদের জন্যে তাঁর সে-লেখা
প্রাণ জুড়োনো গান?
বলতে পার, কাদের তিনি? বিশেষ করে
কাদের তিনি আজ?
সত্যি বলি, এই কথাটা বলতে পারা
নয়কো সহজ কাজ।
ওই যে দ্যাখো আকাশ জুড়ে সূর্য থাকেন
আদ্যিকালের বুড়ো—
বিশেষ করে কাদের জন্যে দিন-দুপুরে
ছড়ান আলোর গুঁড়ো?
লাটের বাড়ি, চাষির কুটির— যেখানে যাও,
সূর্য ওঠে হেসে।
তখন জানি শুধায় না কেউ, তার ঠিকানা
কোন সে অচিন দেশে?
এপার-ওপার সবখানেতে একই রূপে
সূর্য বিলোন আলো।
তার সে-আলোর রং ওপারে হলদে হলে
এপারে নয় কালো।
সেই যে যিনি ছিলেন কবি, তাঁর কবিতার
পাই যে আজো রেশ।
সেই কবিকে ভূগোল দিয়ে যা না বাঁধা
সবখানে তাঁর দেশ॥
[সেই যে তিনি/লাল ফুলকির ছড়া]
জ্যোতির্বিজ্ঞানীর ন্যায় মহাকাশে নক্ষত্র আবিষ্কারের মতো রবীন্দ্রনাথকে সূর্যের উপমায় প্রকাশ করেছেন শামসুর রাহমান। তাঁকেও আমরা, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা না করে, এভাবে দেখতে পারি। আমাদের বর্তমান জীবনযাপনের সাথে, রাজপথে-গলিতে, মিছিলে-প্রতিবাদে, কাছে-দূরে— কোথায় নেই তিনি? কোনও রাজনীতিক দলের সাথে যুক্ত না হয়েও একটি শোষণহীন ন্যায়ভিত্তিক সমাজের প্রত্যাশায় তিনি বরাবর মানুষের পাশে থেকেছেন, যে-কোনও সংকটে-সংগ্রামে মানুষের কাঁধেই হাত রেখেছেন। তাই তাঁর ছড়ায় রয়েছে আমাদের সবার সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশা-গ্লানি, ঘৃণা-ভালোবাসার কথা—
[ক]
বর্গি এল খাজনা নিতে
মারল মানুষ কত।
পুড়ল শহর, পুড়ল শ্যামল
গ্রাম যে শতশত।
হানাদারের সঙ্গে জোরে
লড়ে মুক্তিসেনা
তাদের কথা দেশের মানুষ
কখনো ভুলবে না।
[রৌদ্র লেখে জয়/রংধনুর সাঁকো]
[খ]
শতযুগের ঘন আঁধার
গাঁয়ে আজো আছে
সেই আঁধারে মানুষগুলো
লড়াই করে বাঁচে।
মনে আমার ঝলসে ওঠে
একাত্তরের কথা
পাখির ভাষায় লিখেছিলাম
‘প্রিয় স্বাধীনতা’।
[প্রিয় স্বাধীনতা/রংধনুর সাঁকো]
সামাজিক-রাজনীতিক সংকটের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে-দুর্বিপাকেও তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়েছেন এই কবি, আপন বিবেক ও দায়বোধ থেকে নিজের সবটুকু সহানুভূতি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন আর্তমানুষের পাশে—
[ক]
চাল নিলো, চুলো নিলো
ঘটি, বাটি সবই নিলো
নিলো কাঠের গড়
ঝড়, ঝড়, ঝড়,
সর্বনাশা ঝড়!
ধান নিয়েছে, জান নিয়েছে,
চাষীভায়ের হাল নিয়েছে,
রইলো পড়ে চর।
ঝড়, ঝড়, ঝড়,
সর্বনাশা ঝড়!
[ঝড়ের মুখে/ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো]
[খ]
উড়িরচরে আছড়ে পড়ে
অজগরের মতোই হাজার ঢেউ।
ঘর উড়ে যায়, দোর উড়ে যায়
পানির তলায় ডোবে দূরের দ্বীপ।
কেয়ামতের আঁধার যেন
নামল এসে, কেউ জ্বালে না দীপ।
… … … … …
আকাশ কাঁদে, পাতাল কাঁদে
বাতাস কাঁদে, কাঁদে মাঠের ঘাস।
কোথাও কারো নেই যে সাড়া—
এখন শুধু লাশের পরে লাশ।
[উড়িরচর/রংধনুর সাঁকো]
[গ]
বানের পানি চতুর্দিকে
ক্ষুধায় কাঁপে যুবা, বুড়ো
কাঁদছে শিশু ভাতের জন্যে
ডুবছে জলে ঘরের চূড়ো।
এসো আজকে আমরা সবাই
দাঁড়াই দুখী, সবার পাশে
কোথাও যেন কাউকে বদলে
যেতে না হয় শীর্ণ লাশে।
[বানের পানি চতুর্দিকে/ইচ্ছে হলো যাই ছুটে যাই]
মানুষের মঙ্গলের কথা ভেবে ভেবে অনেক কষ্ট পেয়েছেন এই কবি। তবু পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তে মানবতা বিপন্ন হলেই তিনি এগিয়ে এসেছেন—
ইরাক ইরাক ইরাক
গোলাপ ছাওয়া
সেখান থেকে গায়ে-পড়া শত্রুরা সব যাক
ইরাক ইরাক ইরাক
সবার চাওয়া—
সেখানে সব শান্তিপ্রিয় মানুষেরা থাক।
[ইরাকের গান/হীরার পাখির গান]
আধুনিক কাল বিভিন্ন দেশ ও জাতির পারস্পরিক নির্ভরতার কাল— একের অগ্রগতি অপরের হাত ধরে চলে— এই বোধের যুগ। গত শতকের ষাটের দশকের শেষদিকে যারা উক্ত বোধ নিয়ে ছড়াসাহিত্য রচনায় অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন দেশে— বিশেষত ভিয়েতনাম আর আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবাদী হামলার প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদে শামিল হয়ে স্বাভাবিকভাবেই হাত তুলেছেন শামসুর রাহমান—
দিন-দুপুরে ওমা!
ফেললে কারা বোমা?
মেকং নদীর দেশে
হুট করে ভাই এসে
গোল বাধাল কারা?
বর্গি নাকি তারা?…
[ভিয়েতনাম/লাল ফুলকির ছড়া]
ছড়া অনেক রকম হয়। ইংরেজি বা ফরাসি ভাষায় তার বহুবৈচিত্র্য। বাঙলায় এত বৈচিত্র্য নেই, যা আছে তার প্রায় সবই কম-বেশি প্রয়োগ করেছেন শামসুর রাহমান, চেষ্টা করেছেন কিছু বৈচিত্র্য যোগ করতেও। কিন্তু জোর করে নয়, কেননা ছড়া লেখা কোনও ইন্ডাস্ট্রি নয়, ছড়া লেখা একটি আর্ট। অন্নদাশঙ্করের মতো তাঁর হাতেও ছড়া তার শিশুসাহিত্যের সীমায়িত ক্ষেত্র থেকে উঠে এসে নিজস্ব আঙ্গিকে ও বৈশিষ্ট্যে প্রকাশ মাধ্যমের অন্যতম হাতিয়ার বা অস্ত্র হয়ে উঠেছে এবং বৈচিত্র্যে, ব্যাপ্তিতে, বিষয়ে, মননে সগৌরবে শিল্পসাহিত্যের বিকশিত জমিতে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু তাঁর হিমালয় সদৃশ কবিখ্যাতি সেই অনন্য মাত্রাকে আড়াল করে রেখেছে।
তাঁর কিছু ছড়া ছোটদের, কিছু ছড়া বড়দের, আর কিছু ছড়া ছোট-বড় নির্বিশেষ সবার। তবে ছোটদের জন্যেই হোক, আর বড়দের জন্যেই হোক, সত্যাশ্রয়ী প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার এই কবির সব ছড়া-ই শেষপর্যন্ত ন্যায়, সত্য ও সুন্দরকে ছুঁয়ে থাকে।
শিশুদের জন্যে রচিত অধিকাংশ বই কবি উৎসর্গ করেছেন শিশুদেরই। তাদের প্রতি ভালোবাসাই কি তার একমাত্র কারণ? না-কি প্রত্যেক ছড়ার প্রত্যেক কথায় বাঙলাদেশের একটি মূর্তি, একটি আবহসঙ্গীত, গৃহের একটি আস্বাদ রোপন করে দিতে চেয়েছেন শিশুদের মনে, ভালোবাসাতে চেয়েছেন স্বদেশকে, চেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে উঠুক নতুন প্রজন্ম? আর তাই বুঝি লিখেছেন এরকম ছড়া—
[ক]
আবার দেখি নীল আকাশে
পায়রা মেলে পাখা
মা হয়ে যায় দেশের মাটি
তার বুকেতে থাকা।
কাল যেখানে আঁধার ছিল
আজ সেখানে আলো
কাল যেখানে মন্দ ছিল,
আজ সেখানে ভালো।
কাল যেখানে পরাজয়ের
কালো সন্ধ্যা হয়
আজ সেখানে নতুন করে
রৌদ্র লেখে জয়।
[রৌদ্র লেখে জয়/রংধনুর সাঁকো]
[খ]
পাঞ্জাবিরা চেয়েছিল
বাংলাভাষা মুছে দিতে
বাংলাদেশের সকল কিছু
গায়ের জোরে লুটে নিতে।
… … … …
আঁধার ছিল ন’মাস জুড়ে
নাচল শেষে অনেক লতা
রক্তসাগর সেচে পেলাম
সূর্যোদয়ে স্বাধীনতা।
[সূর্যোদয়ে স্বাধীনতা/সবার চোখে স্বপ্ন]
[গ]
কবি জানে স্বাধীনতা
প্রাণের চেয়ে প্রিয়,
দুই নয়নে, বুকের ভেতর
একেই ঠাঁই দিও।
[কবি লেখে/ সবার চোখে স্বপ্ন]
[ঘ]
শেষে হারমাদ পশ্চিমা সব
শত্রুরা সব হার মানলো, বিজয়ী
মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের কাছে
কিন্তু এখনো স্বাধীনতাময়— জ্বলজ্বল পথে
সবকিছু ঠিক নয় মসৃণ
আজো পথে কিছু কালো কাঁটা আছে।
[বাংলাদেশের স্বাধীনতা/হীরার পাখির গান]
‘আজো পথে কিছু কালো কাঁটা আছে’— এই সতর্কবাণীর মাধ্যমে কবি সেই স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক-দালালদের ব্যাপারে আমাদের সাবধান করেছেন, যারা লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না, এবং তাদের সম্পর্কে তাঁর ছড়ায় বলেছেন এভাবে—
[ক]
আলবদরের ঝাড় বেড়েছে
ওদের বড় বাড় বেড়েছে।
… … … …
ওরা যদি শানায় ছুরি
পায়রার প্রাণ হবে চুরি।
হাতের পায়ের শিরা কেটে
রক্ত ওরা নেবে চেটে।
ওরা যদি হল্লা করে,
শান্তি যাবে দেশান্তরে।
[যদি/রংধনুর সাঁকো]
[খ]
যা রাজাকার ভেগে যা,
এদেশ ছেড়ে ভেগে যা,
খোকার সাহস দেখে যা,
মারের মজা চেখে যা।
তোদের হাতে খুনের দাগ,
ভাগরে তোরা জোরসে ভাগ।
নোসরে তোরা ভালো মানুষ,
ওড়াস শুধু ঝুটের ফানুস।
শয়তানিটা নেশা তোদের,
মানুষ মারা পেশা তোদের,
এদেশেতে নেই কো ঠাঁই,
তোদের সবার বিচার চাই।
যা রাজাকার ভেগে যা
এদেশ ছেড়ে ভেগে যা।
[যা রাজাকার/রংধনুর সাঁকো]
[গ]
স্বাধীনতার শত্রু যারা
তাদের পায়া ভারি
এসো, সবাই মিলে ওদের
তাড়াই তাড়াতাড়ি।
[যুদ্ধজয়ের কথা/রংধনুর সাঁকো]
এর পাশাপাশি বলেছেন এ-কথাও—
সোনার জাদুর হাতে আছে
লাঠির মতো লাঠি,
সেই লাঠিটা অনেক বছর
তেল খেয়েছে খাঁটি
তার ঘুমানোর জন্য লাগে
মস্ত শীতল পাটি।
সেই লাঠিটা কখনো হয়
সোনা-রূপার কাঠি।
সোনার জাদুর লাঠির বলে
বুক ফুলিয়ে হাঁটি।
ঘুরলে লাঠি যায় গুঁড়িয়ে
দৈত্যগুলোর ঘাঁটি;
লাঠি খসায় বারো ভূতের
পুতের দাঁতের পাটি!
সেই লাঠিটা ফসল বাঁচায়
বাঁচায় দেশের মাটি।
[লাঠি/নবারুণ]
লক্ষণীয়, ‘লাঠি’ এখানে আমাদের ভরসা নতুন প্রজন্মের নতুন চেতনার প্রতীক। এসব ছড়ার মাধ্যমে কবি ভবিষ্যতের শিশুকে লগ্ন করে দিয়ে চেয়েছেন ইতিহাস সমৃদ্ধ স্বদেশ চেতনায়; চেয়েছেন তারা সুস্থ ও সুন্দরভাবে, দেশের ইতিহাসকে সাথে নিয়ে, বেড়ে উঠুক মানবিক মানুষ হয়ে।
আমাদের দেশের শিশু সবাই দলে দলে
কখনও যায় মুক্ত মাঠে; নদীর কিনারে—
কখনও যায় প্রতিবাদী নিশান হাতে
বুক ফুলিয়ে রক্তে-গড়া শহীদ মিনারে,
নানা রঙের শত্রু যখন ঘটায় ভাষার ক্ষতি
এবং দেশের হৃদয় নিয়ে করে তামাশা
নতুন যুগের শিশুরা সব দেবে মুছে
হাটের, মাঠের, শহর-গাঁয়ের কালো হতাশা।
[আমাদের দেশের শিশু/ তারার দোলনায় দীপিতা]
নতুন যুগের শিশুদের কাছে শামসুর রাহমানের প্রত্যাশার স্মারক ছড়াটি যেন কবিতা হয়ে উঠতে চাইছে। তাঁর বেশকিছু ছড়ায় এমন লক্ষণ দেখা যায়। আকৃতি ও আয়তনে ছড়া হলেও প্রকৃতি ও ভাবগুণে এরা কবিতা-ই। অর্থাৎ এগুলো কবির হাতের কাজ। আসল কবিতার প্রধান লক্ষণ দুটি— অল্পকথার ব্যঞ্জনায় বৃহৎভাবকে প্রতিফলিত করা, আর স্বকালের সীমানা পেরিয়ে ভাবীকালে উত্তরণের ক্ষমতা। শামসুর রাহমানের এসব ছড়া এই দুই গুণের আভায় ঝকঝক করে—
[ক]
শব্দ সে তো জোছনা-নাওয়া নদীর তীর
শব্দ সে তো সন্ধ্যাবেলার মেঘের ভিড়।
শব্দ সে তো ভরদুপুরে শঙ্খচিল,
শব্দ সে তো টলটলে ওই পদ্মবিল।
শব্দ সে তো রাখাল ছেলের ডাগর চোখ,
শব্দ সে তো চলতিপথে হাটের লোক।
শব্দ সে তো খোকনসোনার চিকন ছিপ,
শব্দ সে তো লক্ষ্মীমেয়ের লালচে টিপ।
শব্দ সে তো আয়নাজোড়া নানির মুখ,
শব্দ সে তো নকশিপিঠে খাওয়ার সুখ।
শব্দ সে তো ভরাগাঙের মাঝির হাঁক,
শব্দ সে তো ধর্মঘটের ব্যক্ত ডাক।
শব্দ সে তো পিঠে বাঁধা নতুন তূণ,
শব্দ সে তো বীর শহীদের তাজা খুন।
শব্দ সে তো দুঃখভরা পথের শেষ
শব্দ সে তো রৌদ্রমাখা বাংলাদেশ।
[শব্দ/ লাল ফুলকির ছড়া]
[খ]
বৃষ্টি পড়ে এই শহরে গলির মোড়ে
বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে।
বৃষ্টি পড়ে আজিমপুরের নতুন গোরে
বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে।
বৃষ্টি পড়ে ঝমঝমিয়ে আকাশ ফেটে
বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে
শুকনো জমি ফোঁটাগুলো খাচ্ছে চেটে;
বৃষ্টি পড়ে পাড়াতলীর ধুধু চরে
বৃষ্টি পড়ে গরিব চাষির কুঁড়ে ঘরে
বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে…
[বৃষ্টি পড়ে/নয়নার জন্য গোলাপ]
[গ]
কবিতার নয়া গুলবাগে ব’সে
গেয়েছিল গান কোন সেই বুলবুল?
নজরুল, নজরুল।
… … … …
হাতে ছিল কার আগুন-ঝরানো
সুরময় বীণা, হৃদয়ে ফুটত ফুল?
নজরুল, নজরুল।
কার কবিতার ঝংকারে বলো
গোঁড়ামির কালো দুর্গ হয়েছে ধুল?
নজরুল, নজরুল।
কার গানে গানে ছিঁড়ত শেকল,
উপড়ে পড়ত সাম্প্রদায়িক মূল?
নজরুল, নজরুল।
[নজরুল/ রংধনুর সাঁকো]
উল্লিখিত ছড়াগুলোর চরণবিন্যাস যেমন দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় তেমন বিষয় ও বক্তব্য অনুযায়ী ভাষা ও ছন্দ প্রয়োগে, শব্দের প্রতীকী ব্যবহারে, পঙক্তির পর্ব ও মাত্রাবিন্যাসে কারুকার্যখচিত অবয়ব পেয়েছে। চিত্রকল্প. উপমা ও প্রতীকের মতো কবিতার বিভিন্ন প্রকরণে সমৃদ্ধ হয়ে ছড়াগুলো নান্দনিক সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে! কবির বেশ কিছু শ্রেষ্ঠ কবিতায় আমরা এমন প্রকরণ লক্ষ করেছি। আসলে প্রাসঙ্গিক কোনও একটি বিষয় যা কবিতার উপযোগী নয়, তাকে আঙ্গিকগত গতিময়তার সাহায্যে ছড়ার কাঠামোর মধ্যে ছড়িয়ে চারিয়ে দেওয়ার কাজে কবি সিদ্ধহস্ত। এছাড়া কবিতায় পুনরাবৃত্ত শব্দের প্রয়োগ এর নির্মাণকলার একটি বিশেষ অনুষঙ্গ। পুনরুক্তি কবিতাশরীরে ধ্বনির মায়া বিভ্রম জ্বেলে দেয়; কবিতায় সৃষ্টি করে ধ্বনিসাম্য। ধ্বনিসাম্যের প্রয়োজনেই মূলত কোনও কোনও ছড়ায় পুনরুক্তি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিসমূহে দেখা যাচ্ছে শব্দের ধ্বনি-সিম্ফনি বাজানোই কবির উদ্দেশ্য নয়। মহৎ কবিতায় পুনরুক্তি পাঠক-চেতনায় প্রবল অভিঘাত সৃষ্টি করে। এখানেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
কবি যে ভেতরে ভেতরে একটি শিশু সে-কথা যখন তিনি ভুলে যান তখনই তার ছড়া কৃত্রিম হয়ে পড়ে, পদ্যের মতো শোনায়। শামসুর রাহমানের ছড়ায় তেমন যে নেই তা নয়, তবে তা অতিশয় নিকটজন ও স্নেহাস্পদদের প্রতি গভীর স্নেহ ও ভালোবাসা থেকে উৎসারিত বলেই। যেখানে প্রগাঢ় আবেগ ও উচ্ছ্বাস কবিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সেখানে এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্র-নজরুল-মুজিবের মতো অসাধারণদের পাশাপাশি সাধারণ প্রিয়জনদের নিয়েও তিনি যথেষ্ট লিখেছেন। তবে কবির প্রিয় দুই নাতনি— নয়না ও দীপিতাকে ঘিরেই রচিত হয়েছে সর্বাধিক ছড়া। তার মধ্যে কয়েকটি এমন—
[ক]
নয়না সে ছোট্ট মেয়ে দাদুভাইয়ের সাথি,
যখন তখন জ্বালে ঠোঁটে হাসির হাজার বাতি।
দিনদুপুরে পক্ষীরাজের ডানায় হাওয়া খায়,
রাতদুপুরে ভেসে বেড়ায় রাঙা চাঁদের নায়।
পেট মোটা সব বইয়ের ইটে বানায় খেলাঘর,
এক পলকে বিছানা হয় মেঘনা নদীর চর।
বিকেল বেলা ড্রইং রুমে হরিণ ডেকে আনে,
নয়না তো পশুপাখির মজার ভাষা জানে।
[টইটম্বুর/রংধনুর সাঁকো]
[খ]
নয়না চায় এই গলিতে
যাক বয়ে যাক একটি নদী,
এক পলকে বইছে নদী
নয়নাদের ঘর অবধি।…
… … … … …
নয়নার এই চাওয়াগুলো
ফলছে কেমন করে জানো?
কিছু তুলি, রঙের বাক্সো
দোকান থেকে কিনে আনো।
এনে সেসব ইচ্ছে মতো
কাগজ জুড়ে আঁকো ছবি,
দেখবে তুমি চাইছ যা যা
একে একে হচ্ছে সবই।
[নয়না চাওয়াগুলো/নয়নার জন্য]
[গ]
দীপু তারার মালা থেকে ফুল খুলে আজ
সব শিশুকে হাসিমুখে দিচ্ছে,
ছোট্ট মিষ্টি শিশুরা সব তারার ফুলের
মন-মাতানো অচেনা ঘ্রাণ নিচ্ছে।
[তারার মেলা/তারার দোলনায় দীপিতা]
[ঘ]
নয়না ওর মিষ্টি আপু,
প্রথম শ্রেণীর শান্ত ভালো ছাত্রী,
বইয়ের বোঝা টেনে টেনে
লেখাপড়ায় দিন হয়ে যায় রাত্রি।
দীপিতা রোজ থাকে মজায়,
হয় না ওকে নিত্য অঙ্ক কষতে।
হাত-পা নাচায়, হাসে কাঁদে,
টিভি ছেড়ে হয় না পড়তে বসতে।
[ছোট্ট মেয়ে দীপিতা/গোছানো বাগান]
শামসুর রাহমানের ছড়াসংখ্যা তিনশো প্রায় (দুশো বিরানব্বইটি)। এর মধ্যে বত্রিশটিই নয়না ও দীপিতাকে ঘিরে। এই দুটি নাম, দুটি চরিত্র, কবির ছড়া লেখায় এত প্রভাবসঞ্চারী যে তাদের জন্মের পর প্রকাশিত কবির দশটি ছড়াবইয়ের তিনটিরই নামকরণ হয়েছে তাদের নামে। এছাড়া কবির ছড়াসমগ্রসহ বেশকিছু বইয়ের উৎসর্গপাতায় শোভা পাচ্ছে তাদের নাম। সব মিলিয়ে কবির জীবনযাপন ও লেখালেখির একটা বড় জায়গা জুড়ে তাদের অবস্থান; যা নিয়ে আলাদা একটি বই হতে পারে।
সচেতন কবি-লেখকেরা যে-কথা অন্যভাবে বলছেন না, বা বলতে পারছেন না, ছড়া তাঁদের দিয়ে তা বলিয়ে নেয়। অত্যন্ত রাশভারি মানুষটিও যেমন পিকনিক, পার্টি বা অন্য কোনও প্রমোদ অনুষ্ঠানে আচার-আচরণে ও হাবভাবে স্বভাব বিরুদ্ধ এমন অনেক কাজ করে থাকেন যা অন্যসময় করলে ভীষণ খেলো ও ছেলেমানুষি মনে হতো। খুব গুরুগম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিও যেমন ঘরে ফিরে এসে মনের মানুষের কাছে কত খোলামেলা আর অন্তরঙ্গ হয়ে যান, ছুটির দিনে দৈনিক রুটিনে যেমন স্বেচ্ছায় এমন অনেক পরিবর্তন ঘটে যায় যা অন্যদিন ঘটলে হয়ে উঠত স্বেচ্ছাচার বা বিশৃঙ্খলা, ছড়া-ও তেমন ওই ছুটির দিনের জিনিস— ভেতর ঘরের জিনিস। শামসুর রাহমানের ছড়াপাঠে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনও কোনও ব্যক্তি যেমন তা-ই ও তাতেই তার শৈলী, শামসুর রাহমানের ছড়ায় তাঁর ব্যক্তিত্ব বা চারিত্র্যও তেমন তাঁর রুচি আদর্শ ও আঙ্গিকের মাধ্যমে অর্জিত, এবং সে-কারণে প্রতিষ্ঠিত।
আড়াইশো বছর আগেও সচেতন কবি-লেখকেরা ছড়া লিখতেন না। তখন ছড়া বলত মেয়েরা, চাষিরা, শিশুরা। তাদের নাম কেউ জানে না। আজ সিরিয়াস লোকেরাও ছড়া লিখছেন। ছড়ার মধ্যে সত্যি কিছু না থাকলে এটা হতো না। ছড়ার ঐতিহ্য যেমন বহুদিনের, ছড়ার ভবিষ্যৎও নিরবধি। প্রবহমান এই কালস্রোতে নিরন্তর বহমান থাকবে শামসুর রাহমানের ছড়া। বাংলার চিরায়ত লোকছড়া ভেঙে সমকালীন জীবনকে তার সবকিছু নিয়ে যাপন করেই আধুনিক জীবনধারার সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন তিনি। তাঁর চিহ্নিত ‘কালো কাঁটা’গুলো পথ থেকে সরিয়ে বর্তমানকে সঙ্গে নিয়ে আমরাও এগিয়ে যেতে পারি নতুন পথের বাঁকে, যেখানে হাতছানি দিচ্ছে সুন্দর আগামী।