
‘চিহ্নমেলা মুক্তবাঙলা’ স্লোগান ধারণ করে বসেছে এবারকার চিহ্নমেলা আসর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শহীদুল্লাহ কলাভবন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত লেখক-সম্পাদক-সুধিজনের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বরে। দুই বাংলার লেখক, পাঠক ও সম্পাদকের বৈশ্বিক সম্মিলন ‘চিহ্নমেলা’র এবারকার আয়োজনও ছিল যথারীতি মনোমুগ্ধকর।
দুইদিন ব্যাপী মেলার প্রথম দিন সোমবারে ‘প্রয়াত-প্রিয়জন’ অনুষ্ঠানে প্রয়াত প্রতিথযশা লেখকদের স্মরণ করা হয়। পরে ‘সৃষ্টিশীলতার সমাজতত্ত্ব ও লিটলম্যাগ’ নিয়ে একক বক্তৃতা দেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। অনুবাদ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন আলম খোরশেদ, শরীফ আতিক-উজ-জামান, সফিকুল ইসলাম, প্রত্যয় হামিদ ও মুহম্মদ মুহসীন।
দুই বাংলার এ প্রাণের মেলায় বাংলাদেশের ১০৫টি এবং ভারতের ৬৫টি পত্রিকা অংশগ্রহণ করছে। এবার লিটলম্যাগ সম্মাননা পেয়েছে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত আলী প্রয়াস সম্পাদিত ‘তৃতীয় চোখ’ ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত অমলেন্দু বিশ্বাস সম্পাদিত ‘নৌকো’। এবারে চিহ্ন সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কথাসাহিত্যিক হামিদ কায়সার। চিহ্ন সারস্বত-সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে প্রবীণ সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ জুলফিকার মতিনকে। তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক, সনদ ও নগদ অর্থ তুলে দেন অতিথিবৃন্দ। এসময় পুরস্কার গ্রহণের অনুভূতি ব্যক্ত করেন তাঁরা।
মেলার সমাপনী দিন মঙ্গলবার বেলা ১১টায় মামুন মুস্তাফার সঞ্চালনায় ‘লিটলম্যাগে লেখালেখি : দ্বৈরথ ও দ্বন্দ্ব’ শীর্ষক আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মেলা উপলক্ষে দুই বাংলা থেকে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি বই ও লিটল ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচন করেন সন্দীপ দত্ত ও অধ্যাপক শহীদ ইকবাল। বিকেল ৩টায় ‘গদ্য আখ্যান ও বাংলার গ্রামীণ জীবন’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন মোস্তাক আহমেদ। পরে মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি পত্রিকার সম্পাদকের হাতে ‘চিহ্নস্মারক’ তুলে দেন মেলা উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক শহীদ ইকবাল।
সমাপনী অনুষ্ঠানে ভারতের বিশিষ্ট লিটলম্যাগ ব্যক্তিত্ব সন্দ্বীপ দত্ত বলেন, ‘চিহ্ন একটি পত্রিকা ছিল। পত্রিকা থেকে সেটি আরও বিস্তারিত হলো এবং দুই বাংলাকে একত্রিত করল। রাষ্ট্রীয় কোনো সাহায্যে নয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ও ব্যক্তিগত পুঁজির বিতরণে। আমার মনে হয় দুদিনের এই অনুষ্ঠানটি পাঁচদিন হতেও পারত। দেখলাম চিহ্ন স্টলে বহু লিটল ম্যাগাজিন ছড়ানো ছিটানো রয়েছে। তা দেখে মনে হলো এখানে একটা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র তো হতেই পারে।’

‘চিহ্ন’ সম্পাদক অধ্যাপক শহীদ ইকবাল বলেন, ‘আমরা এই অঙ্গনে শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা-সংস্কৃতি চর্চার একটি ধারা আপনাদের মধ্য দিয়ে তুলে ধরতে চাই। নানা অঞ্চল থেকে আসা লোকদের মধ্যে যে সম্মিলন তার মধ্যেও একটা চেতনা আমি লক্ষ করি। সেটি হচ্ছে বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। ইংরেজি ভাষা আমাদের অনেকভাবে প্রভাবিত করছে। এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে সমস্ত বঙ্গের মানুষদের সাথে যে ভাষা ভিত্তিক চেতনার যুদ্ধ সে যুদ্ধ আসলে এই ‘চিহ্নমেলা’। ভাষার সাথে আমাদের যে সংস্কৃতি, মেধা, মনন, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা, প্রগতিশীলতা ও কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে যে অস্ত্র সেটিই হচ্ছে আমাদের এই বাংলা ভাষা এবং ভাষার ভেতর দিয়েই যে শিল্পের চর্চা সেটা।’
রাবি উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, ‘এই মেলা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা বাংলা ভাষাকে পেয়েছি। এই বাংলা ভাষা আর কোনোদিন হারিয়ে যাবে না। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন বাংলা ভাষা থাকবে। এরকম মেলা আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করে। আজকের আয়োজনে আমরা দুই বাংলার মানুষ একত্রিত হয়েছি। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।’
প্রসঙ্গত, অধ্যাপক ড. শহীদ ইকবাল সম্পাদিত চিহ্ন পত্রিকাটি ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও বুদ্ধিবৃত্তির মানুষদের নিয়ে মেলার আয়োজন করে। এরপর ২০১৩, ২০১৬, ২০১৯ সালে তিন বছর বিরতি দিয়ে তারা মেলাটি উদযাপন করা হয়। পঞ্চম আসর বসল এবার। আয়োজকদের একজন চিহ্নকর্মী শামীম সাঈদ বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে পরবর্তী চিহ্নমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২০২৫ সালে।