অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জানুয়ারি ২৯, ২০২৬
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
জানুয়ারি ২৯, ২০২৬
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্বকৃত নোমান -
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের প্রয়াণ দিবসে গুরুর প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।

সেলিম আল দীনের মধ্যে এই প্রবণতা ছিল যে, কোনো আখ্যান রচনার আগেই তিনি একটা তত্ত্ব দাঁড় করাতেন, একটা দর্শন দাঁড় করাতেন। তারপর আখ্যানটিকে সেই তত্ত্ব ও দর্শনের মধ্যে ফেলে লিখতেন। এই প্রবণতা সব লেখকের নেই, সেলিম আল দীনের ছিল। সম্ভবত তিনি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন বলে এই তত্ত্বপ্রবণতা তার ওপর ভর করেছিল। এই প্রবণতা ভালো না মন্দ দিক, তা অন্য আলোচনা।
‘স্বর্ণবোয়ালে’র দর্শন কী? কোন তত্ত্বে ফেলে ‘স্বর্ণবোয়াল’ রচনা করেছেন সেলিম আল দীন? এই আখ্যানে তিনি পাশ্চাত্য দর্শনের বিপরীতে প্রাচ্য দর্শনকে দাঁড় করিয়েছেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’তে শিকার ধরা আর শিকার হারানোর চাইতেও প্রধান হয়ে ওঠে শিকারী সান্তিয়াগোর হার না মানা, পরাজয় স্বীকার না করার লড়াকু মনোভাব। হেমিংওয়ে মানুষের হার না মানার দর্শনকে বড় করে দেখিয়েছেন। ‘স্বর্ণবোয়াল’র অবস্থান সেই দর্শনের বিপরীতে। সান্তিয়াগের সেই বিশাল মাছটির মতো তিরমনের স্বর্ণবোয়াল হারেনি, সে ধরা দিয়ে ফের পালিয়েছে। অপরপক্ষে তিরমনও হারেনি। কারণ সেও বোয়ালটিকে শিকার করেছে।
কিংবা বলা যায় দুজনের কেউই জেতেনি। এই হার-জিতহীনতার দার্শনেরই আখ্যান ‘স্বর্ণবোয়াল’। এই আখ্যানের মধ্য দিয়ে সেলিম আল দীন তুলে ধরেছেন ভারতীয় দর্শন। ভারতীয় দর্শনে হার-জিত বলে কিছু নেই। ভারতীয় দর্শন হার-জিতকে স্বীকার করে না। বলে, এই বিশ্ব প্রকৃতিতে হার-জিত বলে কিছু নেই। শুধু লড়াই চলে নিরন্তর একের সঙ্গে অন্যের। তিরমন যেমন বলে, ‘জগত সিরজন থিকা মাছ আর মানুষের এই খেলা। খেলা খেলা। এই খেলা চলবে।’
অর্থাৎ, বোঝা গেল, সেলিম আল দীন এই রচনায় জীবন-বাস্তবতার বাইরে এক সাহিত্য-বাস্তবতা নির্মাণ করেছেন। বাস্তবে স্বর্ণবোয়াল বলে কোনো মাছ নেই। বোয়ালের রঙ কখনো স্বর্ণের মতো হয় না। বোয়ালের শরীরের রঙ ফ্যাকাশে সাদা হয়। কোনো শিকারী কোন মাছকে নিয়ে টানা একদিন দুই রাত তীব্র লড়াই করে না। কোনো শিকারী কখনো রাতবিরাতে শিকার করতে গিয়ে তার পূর্বপুরুষদের দেখতে পায় না। দেখাটা অসম্ভব। কিন্তু তিরমন দেখতে পায়, তাদের সঙ্গে কথোপকথন করে। ডাঙায় তোলা কোনো মাছের খলবলানি আর আলোর ঝলকানিতে বিশ্বচরাচর মুগ্ধ হয় না। কিন্তু স্বর্ণবোয়ালের খলবলানি আর ঝলকানিতে হয়েছে।
এটাই হচ্ছে সাহিত্যের বাস্তবতা। বাস্তবের ঘোড়া কখনো আকাশে উড়তে পারে না, সাহিত্যের ঘোড়া পারে। বাস্তবের মানুষ কখনো মৃত মানুষদের দেখা পায় না, তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। সাহিত্যের মানুষেরা দেখা পায়, কথাও বলতে পারে, যেমন পেয়েছে তিরমন। জীবনের বাস্তবতার বাইরে এই সাহিত্য-বাস্তবতা নির্মাণের কারণেই ‘স্বর্ণবোয়াল’ হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রম, দৃষ্টান্তহীন। জীবনের বাস্তবতা এখানেও আছে, কিন্তু সরাসরি নয়, তেরচাভাবে। মার্কেস যে ধাঁধার কথা বলেছেন, সেলিম আল দীন সফলভাবে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন সেই ধাঁধা।
কিংবা ধরা যাক তাঁর ‘প্রাচ্য’ নাটকটির কথা। ‘স্বর্ণবোয়াল’ ও ‘প্রাচ্যে’র মূল সুর প্রায় একই। এখানেও কেউ হারে না, কেউ জেতে না। ‘স্বর্ণবোয়ালে’ যেমন সর্বপ্রাণবাদের জয় ঘোষিত হয়েছে, ‘প্রাচ্যে’ও তাই। ‘প্রাচ্যে’র দর্শন কী? তত্ত্ব কী? তা এই যে, ‘পদ্মপুরাণ’ বা ‘মনসামঙ্গলে’ লখিন্দরকে দংশন করে সাপ, আর ‘প্রাচ্যে’ করে নোলককে। অর্থাৎ ‘প্রাচ্য’ হলো ‘মনসামঙ্গলে’র বিপরীত আখ্যান। কিন্তু সাপকে কেন্দ্র করে রচিত এই আখ্যানের নাম ‘প্রাচ্য’ হলো কেন? এর পেছনে তত্ত্ব কী?
তা এই যে, প্রাচ্যের দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে এই আখ্যানে, তাই এর নাম ‘প্রাচ্য’। প্রাচ্যের দর্শন হচ্ছে, ক্ষমা, জীবপ্রেম, অদৃষ্টবাদ কিংবা অলঙ্ঘনীয় জাগতিক নিয়মকে শান্তচিত্তে মেনে নেওয়া হয়। ক্ষমা প্রাচ্যের মহত্তম শিক্ষা। প্রাচ্যদর্শন ক্ষমাকে উচ্চে তুলে ধরেছে। প্রাচ্য সব সময় ক্ষমার কথা বলে। সয়ফর সাপটিকে যে ক্ষমা করে দিল―এ প্রাচ্যেরই দর্শন। রূপক আখ্যানের ছলে সেলিম আল দীন প্রাচ্যের গলায় পরিয়ে দিয়েছেন ক্ষমার মালা। তাই আখ্যানের নাম দিয়েছেন ‘প্রাচ্য’।
প্রাচ্যের আরেকটি দর্শন হচ্ছে সর্বপ্রাণবাদ। অর্ধাৎ এই পৃথিবী কেবল মানুষের একার নয়, পশুপাখি আর কীটপতঙ্গেরও। এই পৃথিবীতে প্রত্যেক প্রাণীরই সমান অধিকার। একটা ব্যাঙেরও বাঁচার অধিকার আছে। কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষে দেখতে পাই সর্বপ্রাণের জয়জয়কার। ভারতীয় পুরাণে কোনো প্রাণকেই গৌণ করে দেখা হয়নি, প্রত্যেক প্রাণকে ভাবা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ, দেখা হয়েছে মানুষের পরিপূরক হিসেবে। সেলিম আল দীনের ‘প্রাচ্যে’ ঘোষিত হয়েছে এই সর্বপ্রাণবাদের গুরুত্ব।
‘প্রাচ্য’ মূলত একটি প্রাচ্যদেশীয় লৌকিক গল্প। লৌকিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয়গুলোই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। নাট্যকারও ‘প্রাচ্যে’র কথাপুচ্ছে বলেছেন যে, প্রাচ্য মূলত মনসাপূরাণের উল্টা দিকটা কী রকম―এমন ভাবনা থেকেই লিখিত। বাংলা-ভারতের লোকপুরাণ অনুযায়ী, প্রতি বাড়িতেই একটি করে সাপ থাকে। সেটা বাস্তুসাপ। তার ভয়ে বাড়িতে অন্য কোনো সাপ ঢুকতে পারে না। তাই ওটাকে মারতে নেই। মারলে অমঙ্গল হয়, নানা বিষাক্ত সাপ বাড়িতে ঢোকে, অধিবাসীদের অনিষ্ট করে। কিন্তু বাস্তুসাপ কারো ক্ষতি করে না। তাই সয়ফরচান যখন সাপটিকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছেনি ঘোরায়, এমন সময় তার দাদির হাত এসে খপ করে তার ছেনি বাগানো হাত ধরে ফেলে। বলে, ‘না, এইটা বাস্তুসাপ। খবদ্দার।’
‘প্রাচ্যে’ মূলত মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের কথাই ব্যক্ত হয়েছে। ‘কোনটা তবে কী থেকে পৃথক হবে’―এটি প্রাচ্যের একটি সংলাপ। সংলাপটি সয়ফরচানের। মানুষ ও প্রকৃতি এক ঐক্যে এসে মিলিত হয় এখানে যে, মানুষ থেকে অন্য প্রাণীদের পৃথক করা যাবে না। প্রকৃতিকে ধ্বংস করা মানে মানুষের জয় নয়। অন্য প্রাণীদের বিনাশ করে মানুষ নিজেরই বিনাশ ডেকে আনছে। মানুষ কোনো একক প্রাণী নয়, এককভাবে বাঁচতে পারে না মানুষ। তার জন্য অনেক কিছুর দরকার হয়। সাগর, নদী, পাহাড়, বৃক্ষ, প্রাণী, চন্দ্র, সূর্য―সবই মানুষের সহায়ক শক্তি, বা পড়শি। মানুষ যদি এসবকে বাদ দিয়ে একা বাঁচতে চায়, তবে বিপন্ন হবে তাদের অস্তিত্ব।
কিন্তু এ সত্য মানুষ উপলব্ধি করতে পারে না সহজে। সয়ফরচান পেরেছিল। ‘প্রাচ্যে’র অন্তপর্বে লেখা, ‘সয়ফর ছেনি হাতড়ে নেয়। সাপটি তার দিকে তাকিয়ে সতর্ক হয়। ফণা নামাতে গিয়ে আবার সাঁই করে লকলকে জিভে বুকে ভর দেয়। সেই ভর দেড় হাত উঁচুর কম নয়। একবার ডানে একবার বামে নড়ে নড়ে ফণার প্রতাপ দেখায়। প্রতাপ না সৌন্দর্যরাঙা বাহার। ফাল্গুনের ভোরের রাঙা মেঘাবলী বিচিত্রিত কমলাবর্ণের ফণা। সে উদ্ভিদ। মাটি ভেদ করে উঠেছে। বৃক্ষরাও ভূমিভেদী বিচিত্র ফণা। সে ফণা দোলে চিকন বাতাসে। কোনটা তবে কি থেকে পৃথক হবে। হায় সয়ফর দ্বিখণ্ডিত হয়। তবে কে কার মতো।’
‘হায় সয়ফর দ্বিখণ্ডিত হয়।’ সাপ নয়, দ্বিখণ্ডিত হয় সয়ফর নিজেই। বাহ্যিক অনৈক্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান পেয়ে সে নিজের কাছে পরাজিত হয়। এই যে ঐক্য―বৃক্ষ ও সাপে ভেদ নেই―মূলত এ ঐক্যই প্রাচ্যের মূল সুর। মানুষের জন্য বৃক্ষ প্রয়োজন। প্রয়োজন সাপেরও। কারণ সাপও বৃক্ষের মতোই ভূমিভেদী, সেও প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতিকে বিচ্ছিন্ন করে মানব-অস্তিত্ব অসম্ভব। মানুষ ও প্রকৃতি কোনোটাই কোনোটা থেকে পৃথক নয়, একে অন্যের পরিপূরক। সাপটি প্রকৃতির সৌন্দর্য। তারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে ঠিক মানুষের মতো করেই। সাপ থাকবে তার আবাসে, মানুষ থাকবে মানুষের আবাসে। পরস্পরের সীমানা লঙ্ঘন করলেই প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দপতন ঘটে। নোলকের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। তার পা সীমানা ডিঙিয়ে সাপের সীমানায় পড়েছিল বলে সাপ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে দংশন করতে বাধ্য হয়েছিল। এটাই হচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। সয়ফর এ নিয়মকেই শান্তচিত্তে মেনে নেয়। এই হচ্ছে ‘প্রাচ্যে’র মূল সুর, মূল দর্শন।
এই আখ্যানেও জীবনের বাস্তবতার হুবহু প্রতিফলন ঘটেনি। বাস্তবে কেউ একটি সাপকে হত্যা করার জন্য রাতভর ইঁদুরের গর্ত খোঁড়ে না। বাস্তবে কেউ হন্তারক সাপকে হাতের কাছে পেয়েও ছেড়ে দেয় না, তার ফণার সৌন্দর্যে অভিভূত হয় না। সেলিম আল দীন এই আখ্যানে সৃষ্টি করেছেন সাহিত্যের বাস্তবতা। এই বাস্তবতা জীবনসম্ভূত হলেও বাস্তব নয়। সে-কারণে আখ্যানটি পড়তে পড়তে আমাদের মধ্যে বিরক্তি আসে না, একঘেঁয়ে লাগে না।
‘ধাবমান’ উপাখ্যানেও সেলিম আল দীন জীবন-বাস্তবতার বাইরে এক সাহিত্য-বাস্তবতা নির্মাণ করেছেন। এই আখ্যানেও আমরা দেখতে পাই সর্বপ্রাণবাদের গুরুত্ব। ‘স্বর্ণবোয়ালে’র প্রধান চরিত্র মাছ, ‘প্রাচ্যে’র সাপ এবং ‘ধাবমানে’র মোষ। ‘ধাবমানে’র কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি মোষ, যার নাম সোহরাব। তার রাগ আছে, দুঃখ আছে, শোক আছে, বেদনাও আছে। সেও মানুষের মতো ভাবতে পারে। তার ও মানুষের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তার যে কেবল বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তা নয়, সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারও আছে। এমনকি মৃত্যুর পর স্বর্গ বা নরকেও তার স্থান হওয়া উচিত।
‘ধাবমান’ পড়ে আমার মনে হয়েছিল, আচ্ছা, এ কি সম্ভব? একটি মোষ কি কথা বলতে পারে? একটি মোষ কি মানুষের মতো আচরণ করতে পারে? সর্বোপরি একটি মোষ নিয়ে কি একটা আখ্যান রচনা হতে পারে? এ কি বিশ্বাসযোগ্য? পরবর্তীকালে জর্জ অরওয়েলের এনিমেল ফার্ম পড়ে আমার সেই সংশয় দূর হয়। এনিমেল ফার্মে যদি পশুরা চরিত্র হতে পারে, তবে ‘ধাবমানে’ কেন নয়? শরৎচন্দ্র যদি মহেশকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করতে পারেন, সেলিম আল দীন কেন মোষ সোহরাবকে করতে পারবেন না?
আজ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের প্রয়াণ দিবস। গুরুর প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।
.
শত জ্যোৎস্নার মাধুরী
স্বকৃত নোমান
১৪ জানুয়ারি, ২০২৬

Read Previous

অমৃতলোকে পরম শান্তিতে থাকুন আপনি রিটন সাহেব……

Read Next

সম্মাননা পেলেন কবি ও লেখক তানভীর আহমেদ হৃদয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *