অমৃতলো্কে পরম শান্তিতে থাকুন আপনি রিটন সাহেব……
লুৎফর রহমান রিটন
সুকুমার বড়ুয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অপূর্ব। আমরা পরস্পর পরস্পরকে সম্বোধন করি রিভার্স পদ্ধতিতে। দেখা হলে তিনি আমাকে বলেন, কী খবর সুকুমার বড়ুয়া সাহেব? আমিও জিজ্ঞেস করি, রিটন সাহেব ভালো আছেন তো? আমাদের দুজনের এরকম সম্বোধনের ব্যাপারটি যখন জনসমক্ষে ঘটে তখন অন্যরা প্রথমে ভড়কে যায়। পরে মজা পায়।
ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়াকে আমার পছন্দ নানা কারণে। শুধু অসাধারণ ছড়া লেখার কারণেই নয়, ব্যক্তির সুকুমার বড়ুয়াকে আমার পছন্দ তাঁর সারল্যের জন্য। বর্তমান যুগে এরকম একজন সরল মানুষ পাওয়া দুষ্কর। আমার দৃষ্টিতে সুকুমার বড়ুয়া হচ্ছেন হাঁটন্ত ছড়াকার। হাঁটতে হাঁটতে ছড়ার পঙতি ভাজেন। খানিকটা ঝুঁকে অবিরাম হাঁটতে পারেন তিনি। হাঁটতে নাকি তাঁর ভালো লাগে। তাঁর সঙ্গে হেঁটেছি আমি বহুদিন। হাঁটতে হাঁটতে সদ্য লেখা ছড়াটা তিনি আমাকে শোনাতেন। শুনে যতোটা মুগ্ধ হবার কথা তারচে বেশি খুশি হয়ে উঠতাম আমি। আমাকে খুশি হতে দেখে সুকুমার বড়ুয়াও খুশি হতেন বিস্তর। তাঁকে খুশি করতে আমার ভালো লাগতো।
দুই।।
খুব রাত করে ঘুমাই বলে সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গে দেরিতে। সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন ঠিক তার উল্টো। খুব ভোরে এসে প্রায়ই তিনি আমাকে ঘুম থেকে জাগান। আমি ঘুম ঘুম চোখে তাঁর সামনে গেলেই অসাধারণ সারল্য ভরা হাসিতে আমাকে স্বাগত জানান তিনি, হাঁটতে হাঁটতে আইসা পড়লাম বড়ুয়া সাহেব! কেমন আছেন?
আমিও হাই তুলতে তুলতে বলি, ভালো আছি রিটন সাহেব!
আমার ছোটদের কাগজে মাঝেমধ্যে লেখেন তিনি। আমি তাঁর ছড়ার একজন মহা অনুরাগী পাঠক। তাঁর স্বকণ্ঠে ছড়া শোনার একটা আলাদা মজা আছে। অদ্ভুত চাঁটগাইয়া এক্সেন্টে ছড়া পড়েন তিনি। ব্যাপারটা আমি খুব উপভোগ করি। উপভোগ করি তাঁর সারল্য।
সময়কাল ১৯৯৪। একবার, টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে আমরা দুজনই অংশ নিলাম। রেকর্ডিং শেষ হতে হতে রাত নটা সাড়ে নটা বেজে গেল। আমি তখন আজিমপুরে ভাড়া বাড়িতে থাকি আর সুকুমার বড়ুয়া থাকেন পলাশী। রেকর্ডিং শেষ করে টিভি ভবনের মূল ফটকের কাছে আসতেই হঠাৎ ঝুপ করে বৃষ্টি নামল। মহাবৃষ্টি। মুষলধারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, রিটন ভাই, বাড়ি ফিরি ক্যামনে?
সুকুমার বড়ুয়া বললেন, চলেন বড়ুয়া সাহেব, শেয়ারে একটা রিকশা নেই।
আমি বললাম, শেয়ারে কেন?
তিনি বললেন, শেয়ারে গেলে ভাড়া কম লাগবে।
এরকম অবাক করা সারল্যে মুগ্ধ এবং বিস্মিত আমি। মানুষটা এমনই সহজ সরল যে ভাবতেও পারছে না প্রিয় ছড়াকারের সঙ্গে ভাড়া শেয়ার করা যায় না। মজা করার জন্য তাঁর সঙ্গে শেয়ারে রিকশা নিলাম। প্রথমে পলাশীতে রিকশা তাঁকে নামিয়ে দেবে। তারপর সেই রিকশায় আমি আজিমপুর শেখ সাহেব বাজার যাব। সেইমতো রিকশা ভাড়া ঠিক করা হয়েছে। ভাড়া কুড়ি টাকা। সুকুমার বড়ুয়া দেবেন দশ আমি দেবো দশ।
রিকশায় দুজন ঠাঁসাঠাঁসি হয়ে বসলাম। বৃষ্টির তোড়ে আমরা দুজনেই আধভেজা। আমার ডিরেকশনে রিকসাচালক যে পথে চালিত হল, তাতে দেখা গেল রিকশা প্রথম পলাশী না গিয়ে আজিমপুরের শেখ সাহেব বাজারের দিকে যাচ্ছে। এতোক্ষণ কথায় ব্যস্ত ছিলেন তাই ব্যাপারটা টের পান নি তিনি। শেখ সাহেব বাজারে ঢুকতেই চেঁচিয়ে উঠলেন, আরে আরে আগে তো আমার নামনের কথা! আমারে পলাশী না নামাইয়া রিকশা এইখানে কেনো?
আমি বললাম, আগে আমি নামবো। পরে আপনি নামবেন।
পলাশীতে উল্টা হইয়া গেল না? ভাড়া আবার বেশি চাইব না তো? সুকুমার চিন্তিত!
আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম, ভাড়া বেশি চাইলে সেইটা আমি দেবো।
আমার বাড়ির ফটকের সামনে রিকশা এসে দাঁড়ালো। আমি নামলাম। সুকুমার বড়ুয়া তখনও সিটে বসা। রিকশার ছেঁড়া পর্দায় নিজেকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাবার ব্যর্থ চেষ্টায় রত। রিকশাচালককে কুড়ি টাকা ধরিয়ে দিতেই চিৎকার করে উঠলেন তিনি, আরে করেন কি! দশ টাকা তো আমি দিমু!
সরল মানুষটাকে কষে একটা ধমক লাগালাম, কথা না বাড়িয়ে নামেন তো মিয়া! বাসাটা দেইখ্যা যান।
দোতলায় উঠতে উঠতে ভেজা পাঞ্জাবি ঝাড়তে ঝাড়তে সুকুমার বড়ুয়া বললেন, তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরন দরকার। ভাত খাইতে হইব না!
সে রাতে আমরা একসঙ্গে রাতের খাবার খেলাম। আমার স্ত্রী শার্লি ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়াকে আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়নের চেষ্টা করল। অঘোষিত অতিথি আগমনে আমার স্ত্রী মোটেও বিরক্ত হয় নি আমার ওপর। বুঝলাম, শার্লিও সুকুমার বড়ুয়ার অনুরাগী পাঠক।
খাবার টেবিলে খুব মজা হলো। প্রতিটি আইটেমের খাদ্যগুণ ক্যালোরি হিশেব করছিলেন তিনি। বলছিলেন, এতো প্রোটিন খাওয়া ঠিক না। আমি আর আমার গাপ্পুগুপ্পু মেয়ে নদী খাচ্ছিলাম আর হাসছিলাম। পুষ্টি ভবনে চাকরি করেন। মুর্গি, গরুর মাংস, রুই মাছ আর ডালের পুষ্টিগুণ ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি একেকটা আইটেম পাতে তুলে দিলে। নদী আর আমার সঙ্গে শার্লিও হাসছিলো মিটিমিটি–একদিন প্রোটিন বেশি খেলে কিচ্ছু হবে না। খান তো দাদা।
খাওয়ার পর শার্লিকে বললাম, এতো বড় একজন ছড়াকার এসেছেন আমাদের বাড়িতে, একটা ছবি তুলে দে। শার্লি আমাদের দুজনার ছবি তুলে দিল। ছবিটা আমাদের পারিবারিক অ্যালবামে রাখা আছে।
আগেই বলেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুষ্টিভবনে সুকুমার বড়ুয়া চাকরি করেন। বাংলা একাডেমির পেছনে বস্তির মতো ঘিঞ্জি একটা কলোনিতে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে তাঁকে। ফুটো চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি ঝরতো। তাঁর সেই বাড়িতে আমি বহুদিন গিয়েছি।
সে সময়ে একবার উদ্বিগ্ন সুকুমার বড়ুয়ার সঙ্গে দেখা। খুবই বেদনার সঙ্গে জানালেন তিনি, কর্তৃপক্ষ বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। কলোনি মেরামত হবে। কোথায় উঠবে পরিবার পরিজন আর মালামাল নিয়ে সেই বিবেচনা না করে পুরো পরিবারটিকে রাস্তায় ফেলার উপক্রম। হাতে তাঁর ফাইল ছিল এ বিষয়ে কাগজপত্রের। জানলাম, নানাজনের কাছে ছোটাছুটি করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু লেখক প্রফেসর তাঁর সমস্যাটি জানলেও কেউই এগিয়ে আসছেন না সহযোগিতা নিয়ে।
সুকুমার বড়ুয়ার ফাইল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফটোকপি করে নিয়ে তাঁর একটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি চেয়ে আমি ছুটে গেলাম দৈনিক আজকের কাগজ অফিসে। ওখানে নিউজ এডিটরের সামনের চেয়ারে বসেই চা খেতে খেতে একটা প্রতিবেদন লিখলাম, শিরোনাম ‘ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার আশা, এতটুকু বাসা।’ আমার বন্ধু আহমেদ ফারুক হাসান তখন আজকের কাগজের নিউজ এডিটর। তাঁকে ধরলাম। বললাম, প্রতিবেদনটা সুকুমারদার ছবিসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ছাপিয়ে দে ভাই।
ফারুক কথা দিলো ছাপবে। পরদিন আজকের কাগজের শেষের পাতায় ডাবল কলামে বক্স করে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হল প্রতিবেদনটি। আমার লেখা একটি শব্দও বাদ দেয় নি বন্ধু ফারুক। অবশ্য রিপোর্টটি আমার নামে ছাপা হয় নি। ছাপা হয়েছে ‘কাগজ রিপোর্ট’ হিশেবে। আহমেদ ফারুক হাসানকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ফোন করলাম। ফারুক বলল, রিপোর্টটা তোর নামে না ছেপে কাগজ রিপোর্ট হিসেবে ছেপেছি, কারণ তাতে রিপোর্টটির গুরুত্ব বাড়বে। কিন্তু আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি কারণটা ভিন্ন। তাছাড়া আমার নামে রিপোর্ট ছাপা হওয়াটা বড় কথা নয়। রিপোর্টটি ছাপা হওয়াটাই বড় কথা। আমার দরকার পত্রিকার একটা রিপোর্ট। সুকুমারদার সমস্যার একটা সমাধান যদি হয়।
পরদিন এককপি আজকের কাগজ, আমার প্রতিবেদনের পেপারকাটিং, বাড়ির জন্যে আবেদন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজের ফটোকপি সমেত আমি হাজির হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে। ইতোমধ্যে আমি বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জেনেছি সুকুমার বড়ুয়াকে বাড়ি বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন। এই সংক্রান্ত কমিটির তিনিই প্রধান ব্যক্তি। যাবার আগে টেলিফোনে যথারীতি এপয়েনমেন্ট নিয়েছি–স্যার আপনার কাছে খুব জরুরি একটা কাজে আসতে চাই।
তিনি চট জলদি বলেছিলেন–চলে আসো।
আমি তাঁর কাছে যাবার পর তিনি জানতে চাইলেন–বলো তোমার জরুরি কাজটা কি।
আই বললাম, আমার একটা বাসা লাগবে স্যার।
স্যার অবাক হলেন–বাসা লাগবে? তোমার?
বললাম–হ্যাঁ।
স্যার খুব মজা পেলেন–ঠিক করে বলো।
আমি ব্যাখ্যা করলাম। সুকুমার বড়ুয়ার বর্তমান করুণ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বললাম, তাঁর মতো মেধাবী একজন ছড়াকার আপনার সহযোগিতা ছাড়া বাসাটা পাবে না আমি সেটা জেনেই আপনার কাছে এসেছি স্যার। প্লিজ স্যার।
খুব খুশি হলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার। বললেন, সুকুমারের বাড়িকে তুমি নিজের বাড়ি বিবেচনা করছো দেখে ভালো লাগলো। যাও তুমি। চিন্তা করো না। বাড়ি তুমি পাবে।
শক্তিশালী একটা সালাম ঠুকে হাসিমুখে মহানন্দে আমি বেড়িয়ে এসেছিলাম সেদিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কক্ষ থেকে।
৩।।
তারপর অনেকদিন সুকুমারদার সঙ্গে দেখা নেই।
এক সকালে, সকাল না বলে বলা উচিৎ খুব ভোরে মর্নিং ওয়াক করতে করতে সুকুমার বড়ুয়া এসে হাজির আমার বাড়িতে।
ঘুম ঘুম চোখে আমি ড্রইংরুমে এসে দাঁড়ালাম। তিনি খুব আনন্দের সঙ্গে জানালেন প্রার্থিত সেই সুসংবাদটি। খুব সুন্দর একটি বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছেন তিনি। আমাকে খুব করে বললেন, একবার যেন দেখে আসি। বললেন, বুঝলেন বড়ুয়া সাহেব, খুব সুন্দর। বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট বাগানও করেছি।
আমি তাঁকে দেখি আর ব্যথিত হই। খুব ছোট্ট, দু’তিন কক্ষের একটি বাড়িতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েই কী যে খুশি সুকুমার বড়ুয়ার মতো বিশাল ছড়াকার! অথচ আমাদের দেশে টাউট বাটপাররা থাকে প্রাসাদের মতো বাড়িতে।
৪।।
শেষ করি সুকুমার বড়ুয়ার একটা সারল্যের গল্প বলে।
সময়কাল নব্বুইয়ের দশক।
১৯৯৬-৯৭ সালের কথা।
বাজারে লাল মরটিন কয়েল নামবে। লাল মরটিন কয়েলকে জনপ্রিয় করতে ইউনিট্রেন্ড দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশবাসীর কাছে দুই লাইনের একটি শিরোনাম বা শ্লোগান আহবান করলো। গদ্যে বা পদ্যে। যার বাণী সিলেক্টেড হবে তিনি পাবেন এক লক্ষ টাকা। ব্যাপক সাড়া পড়ে গেলো। চিঠির স্তুপ জমে গেলো ইউনিট্রেন্ডে।
ইউনিট্রেন্ডের কর্মকর্তা তুষার দাশ আমাকে ডেকে বললেন, তোমার নেতৃত্বে তিনজন ছড়াকারের একটা বিচারক প্যানেল বানাও। প্রত্যেক বিচারককে আমরা দশ হাজার টাকা সম্মানী দেবো।
আমি যে দু’জন ছড়াকারকে নির্বাচন করলাম তার একজন সুকুমার বড়ুয়া। বললাম, দাদাকে নিই। দশ হাজার টাকা পেলে দাদার বড় উপকার হবে। তুষার দাশ খুশি হলেন।
নির্ধারিত দিনে ইউনিট্রেন্ডের একটি বন্ধ কক্ষে আমরা তিনজন বসলাম। আমাদের জন্যে পর্যাপ্ত চা-বিস্কুটের সরবরাহ রাখা হলো। তুষার দা আমাদের সামনে হাজির করলেন দুই বস্তা চিঠি। সত্যি সত্যি আক্ষরিক অর্থেই দুই বস্তা।
আমরা দুইজন অতি দ্রুততায় অতি ক্ষিপ্রতায় খাম ছেঁড়া এবং বাণী পড়ার পর অধিকাংশই গার্বেজ বিনে ফেলে দিচ্ছি। কিন্তু সুকুমার বড়ুয়া খুবই মন্থর। খুবই ধিরে সুস্থে তিনি খাম খোলা এবং বিমুগ্ধ নয়নে পাঠকদের পাঠানো বাণী কিংবা দুই লাইনের ছড়াটি পাঠ করে স্লো মোশনে সেগুলো সাজিয়ে রাখছেন টেবিলে। দাদার গতিতে কাজ করলে এতো চিঠি খুলতে পড়তে আমাদের দুই সপ্তাহ লেগে যাবে। কিন্তু দাদা বলে কথা। তাঁকে তাড়া দিলাম না। আমি শুধু চাইছি সম্মানীর টাকাটা দাদার হাতে তুলে দিতে।
তুষার দাশ এসে ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সঙ্গ দিয়ে যান। আমি ইশারা করি–যান মিয়া। শেষ করতে হইবো। তুষার দাশ বুঝলেন দাদার পারফরম্যান্স ভয়াবহ রকমের স্লো। তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমি উঠে তুষার দাশকে পাশের কামরায় নিয়ে গিয়ে আশ্বস্ত করলাম–নো চিন্তা। কাজ আমরা করে দিচ্ছি। দাদাকে শুধু খামটা দিয়ে দেবেন। তাঁকে আমি জেনে বুঝেই এনেছি। টাকাটা পেলে দাদার খুব উপকার হবে। খুশি হয়ে তুষার দাশ আমার কাঁধ চাপড়ে দিলেন।
রেস্টুরেন্ট থেকে আমাদের জন্যে বিশেষ লাঞ্চ প্যাকেট আনিয়েছে ইউনিট্রেন্ড কর্তৃপক্ষ। সুস্বাদু চায়নিজ। ফ্রায়েড রাইস-ভেজিটেবল গ্রেভি-ফ্রায়েড চিকেন এন্ড শ্রিম্প। আমার ফেভারিট।
মন ভরে গেলাম। খেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। এর মধ্যে এক ফাঁকে তুষার দাশ সুকুমার বড়ুয়াকে খানিক বিরতি দিতে আমাদের কক্ষ থেকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর দাদা ফিরে এসে যোগ দিলেন চিঠি ছেঁড়া প্রকল্পে।
আমাদের সম্মিলিত ছেঁড়াছেঁড়ির কাজটা শেষ হলে আমরা তিনজন তিনটি খাম হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলাম ইউনিট্রেন্ড অফিস থেকে। দাদা খুব খুশি।
তুষার দাশ আমাকে বললেন–তুমি কাল সকালে একবার এসো। অবশ্যই এসো। জরুরি কাজ আছে। শার্প এগারোটা। এগারোটা মানে এগারোটা।
তুষার দাশ তখন থেকেই কর্পোরেট জগতের অধিবাসী। একিউরেট টাইম-এলিগেন্ট পোশাক আর টাই। এই তিনের সমন্বয়ে গড়া মানুষ। ঢাকায় আমার দেখা প্রথম এবং শেষ–টাই পরা কবি!
পরদিন সকাল এগারোটায় তুষার দাশের দফতরে গিয়ে এক অভাবনীয় ঘটনার মুখোমুখি হলাম। তুষার দাশ আমাকে গোপন একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে অতি অনুচ্চ কণ্ঠে যা বললেন তাতে আমি মহা বিস্মিত। বললেন–তোমার হেল্প ছাড়া এটা সম্ভব না। আমি চাই তুমি আমাকে সহযোগিতা করো।
ঘটনাটা এমন–গতকাল তিনি আমাদের কাছ থেকে সুকুমার বড়ুয়াকে আলাদা করে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে দু’টো দুই লাইনের ছড়া লিখিয়েছেন মরটিন বিষয়ে। তারপর সেটা তাঁর কন্যার নামে (চন্দনা বা রঞ্জনা) দুইটা কাগজে সুকুমার দা-র হাতে কপি করিয়ে রেখে দিয়েছেন নিজের কাছে। তুষার দাশ চান কন্যার নামে সুকুমার দা-র হাতে এক লক্ষ টাকা তুলে দিতে।
আমি বললাম–আমার বিচারক জীবনে এইরকম বেআইনি কাজ আমি করি নি।
তুষার দাশ বললেন–মিয়া তুমিই তো চেয়েছিলে দাদাকে দশ হাজার টাকার খামটা পাইয়ে দিতে। কাজ তো দাদা কিছুই করে নাই বলতে গেলে। দাদার প্রতি তোমার ভালোবাসাটা দেখেই তো আইডিয়াটা এলো। তুমিই প্রধান বিচারক। তুমি ছাড়া এই কাজটা হবে না। সম্মতি দাও।
তুষার দাশ খুবই উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আমার দিকে।
আমি গম্ভীর।
আমি স্বভাববিরুদ্ধ নিরব।
টেনশনে আরেকটা সিগারেট ধরালেন তুষার দাশ।
বর্তমান এবং নিকট ভবিষ্যতের কম্বাইন্ড সিকোয়েন্সটা ভেবে সহসা আমার মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। এক পশলা বৃষ্টির পর সেই বৃষ্টির রেণুমাখা দখিনা বাতাসে হৃদয় আমার প্লাবিত হয়ে গেলো যেনো বা।
টাই পরা কবি তুষার দাশের মানবিকতা, গ্রেটনেস আমাকে মুগ্ধ করলো। একটা আলিঙ্গনে বেঁধে ফেললাম তুষার দাশকে। তুষার দা আমার পিঠে হালকা চাপড় দিতে দিতে বললেন–আমি জানতাম তুমি আমাকে অসম্মান করবে না। আমি জানতাম সুকুমার বড়ুয়াকে তুমি অনেক ভালোবাসো।
কিছুক্ষণ পর তুষার দা বললেন, আরেকটা দায়িত্ব তোমাকে পালন করতে হবে। এটা একমাত্র তুমিই পারবে।
আমি বললাম কি সেটা?
–এই প্রতিযোগিতার রেজাল্ট পত্রিকায় জানিয়ে দেয়া হবে। বিজয়ীর অর্থ বা সম্মানির টাকাটা তুলে দিতে শেরাটন বা সোনারগাঁ-য় একটা অনুষ্ঠান করবো আমরা। ফলোওড বাই ডিনার। আমাদের সেই অনুষ্ঠানটা খুব ঝাঁকজমকের সঙ্গে হবে। সুকুমার বড়ুয়াকে বলতে হবে তিনি যেনো কিছুতেই কন্যার সঙ্গে অনুষ্ঠানে হাজির না হন। তাহলে সবাই বুঝে যাবে নেপথ্য কাহিনি।
আমি বললাম, ঠিক আছে। দাদাকে আমি বুঝিয়ে বলবো।
সুকুদাকে পাকড়াও করে বিস্তারির বুঝিয়ে বললাম তাঁকে। বললাম–রিটন সাহেব, (তিনি আমাকে সুকুমার বাবু আর আমি তাঁকে রিটন সাহেব সম্বোধন করি, আজও!) সেদিন সেখানে আপনার কিছুতেই হাজির হওয়া চলবে না। তাহলে আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাবো। তুষার দা তাঁর কলিগদের কাছে ছোট হবেন। আর ইউনিট্রেন্ডের কাছে ছোট হয়ে যাবো আমিও।
সুকুমার বড়ুয়া সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন, ঠিক আছে। ঠিক আছে! আমি যাবো না রঞ্জনার সঙ্গে। আপনি কোনো টেনশন করবেন না বড়ুয়া সাহেব।
তুষার দাকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম বিস্তারিত। আমার কথায় আশ্বস্ত হলেন তিনি।
৫।।
নির্ধারিত দিনে বিকেলেই আমি সেই পাঁচতারকা হোটেলের হলরুমে হাজির হলাম। পুরো অনুষ্ঠানটা উপস্থাপনা করবো আমি। লাল মরটিন নিয়ে একটা ছোট্ট নাটিকাও লিখে দিয়েছি ছন্দে ছন্দে। বিখ্যাত অভিনেতা আবদুল আজিজসহ একদল অভিনয়শিল্পী তাতে পারফর্ম করবেন। অনুষ্ঠান শুরু হলো। নানান আনুষ্ঠানিকতা চলছে। এরইমধ্যে দেখা গেলো হলরুমে ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া তাঁর কন্যাটিকে নিয়ে প্রবেশ করলেন বিপুল উদ্যমে! এবং একটি টেবিলে আসনও গ্রহণ করলেন সহাস্যে!
ছুটে এসে তুষার দা আমাকে ফিঁসফিসিয়ে বললেন, তুমি সুকুমার বড়ুয়াকে নিষেধ করোনি রিটন!
আমি কটমট করে বললাম–শালারে পিটামু আমি তুষার দা…
হেসে ফেললেন তুষার দা–আরে নাহ্ রাগ করো না। চেপে যাও।
৬।।
সপ্তাহ খানেক পর এক সকালে, সকালে মানে খুব সকালে, সাতটা সাড়ে সাতটায়, শার্লি আমাকে ডেকে তুললো–তাড়াতাড়ি ওঠ। দাদা এসেছেন তোর কাছে।
কোন দাদা? কে দাদা? কেনো দাদা? (মহা বিরক্ত আমি। কারণ, নয়টা দশটার আগে আমি উঠতে পারি না ঘুম থেকে।)
আমাদের এলিফ্যান্ড রোডের বাড়িতে এরকম মাঝে মধ্যেই সহসা হাজির হতেন সুকুদা। তিনি মর্নিং ওয়াক করতে করতে চলে আসতেন আমার বাসায়। তাঁকে পেলে খুব খুশি হতো শার্লি। আমাদের দু’জনকে ডায়নিং টেবিলে বসিয়ে সকালের ব্রেকফাস্ট সার্ভ করতো শার্লি মহা আনন্দে। প্রিয় ছড়াকার বলে কথা!
ঘুম ঘুম চোখ কচলাতে কচলাতে ড্রয়িং রুমে এসে দেখি একটা কলাপাতা রঙ পাঞ্জাবি পরে সুকুদা বসে আছেন হাসি হাসি মুখে। আমাকে দেখেই উল্লসিত হয়ে উঠলেন তিনি–সুকুমার বাবু এই যে দেখেন আমার মেয়ের কান্ড। জানেন তো মরটিন কয়েলের ছড়া লিখে এক লাখ টাকা পেয়েছে রঞ্জনা। সেই টাকায় এই পাঞ্জাবিটা সে আমাকে কিনে দিলো। তাই ভাবলাম পাঞ্জাবিটা আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে যাই…।
আমি বললাম, বাহ্ কী সুন্দর পাঞ্জাবিটা! আপনি বসেন রিটন সাহেব। আমি একটু ফ্রেস হয়ে আসি। নাস্তা করবো একসঙ্গে।
তারপর এক দৌড়ে আমি বেডরুমে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ি বিছানায়। হাসতে থাকি হেচকি তুলে। কিচেন থেকে ছুটে আসে শার্লি–কি হলো তোর? হাসতে হাসতে তো মারা পড়বি দেখছি!
অনেক কষ্টে হাসি চেপে শার্লিকে বললাম ঘটনাটা–‘……জানেন তো মরটিন কয়েলের ছড়া লিখে এক লাখ টাকা পেয়েছে রঞ্জনা’……হাহ হাহ হাহ সুকুদা মানুষটা এতো সরল কেনো……
প্রিয় ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া, পৃথিবীর যে কোনো সভ্য দেশে জন্মালে আপনার মর্যাদা এবং প্রাপ্তি হত অন্যরকম। বিত্তের প্রাচু্র্য ছিলো না আপনার। কিন্তু চিত্তের প্রাচুর্যের ক্ষেত্রে এদেশের সেরা ধনাঢ্য ব্যাক্তিটিও পরাজিত ছিলো আপনার কাছে।
সুকুমার বড়ুয়ার নামটি আমাদের গৌরব। আমাদের অহংকার।
০২ জানুয়ারি অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন আমার প্রিয় ছড়াকার কিংবদন্তি সুকুমার বড়ুয়া। তাঁর বিদায় সম্ভাষণটা জানাতে চাই আমাদের পারস্পরিক সম্বোধনের চিরকালিন সেই স্টাইলেই–গুডবাই রিটন সাহেব। আপনার অনন্তযাত্রা শান্তিময় হোক। অমৃতলোকে পরম শান্তিতে থাকুন আপনি রিটন সাহেব……
অটোয়া ০৩ জানুয়ারি ২০২৫।