
দৃষ্টির ওপাড়ে সম্পদ
ক্ষুদীরাম দাস
শহরের ব্যস্ততম মোড়টি পার হয়ে একটু ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে গগনচুম্বী এক অট্টালিকা—নাম তার ‘স্বর্ণশিখর’। নামটির সার্থকতা বজায় রাখতেই যেন ভবনটি গোধূলির শেষ আলোয় সোনালি আভার বিচ্ছুরণ ঘটায়। এ প্রাসাদের অধিপতি জনাব আসাদ সাহেব। তার জীবনটা যেন কোনো দামি রেশমি সুতোয় বোনা এক নিপুণ কারুকাজ। আভিজাত্য তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে; সকালে ঘুম থেকে উঠে দামি পারফিউমের সুগন্ধিমাখা থেকে শুরু করে রাতের ডিনার টেবিলের রুপোর চামচ পর্যন্ত—সবখানেই বিলাসিতার একচ্ছত্র আধিপত্য। তার গ্যারেজে সাজানো থাকে বিশ্বের নামি সব ব্রান্ডের চকচকে গাড়ি, যেগুলো রাস্তার ধুলোবালি স্পর্শ করার আগেই যেন আভিজাত্যের ভারে নুয়ে পড়ে। আসাদ সাহেবের পোশাকের ভাঁজে কোনোদিন একটি রেখাও পড়ে না, ঠিক যেমন তার পরিপাটি সাজানো জীবনে কোনো অভাবের কালো ছায়া কখনো প্রবেশ করতে পারেনি। আভিজাত্যের এ দুর্ভেদ্য মোড়কে বন্দি হয়েই তার দিনগুলো কেটে যায় যান্ত্রিক এক আবর্তে। অথচ এ আকাশছোঁয়া আভিজাত্যের ঠিক বিপরীতেই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি এঁকে রেখেছে প্রকৃতি। ‘স্বর্ণশিখর’-এর বিশাল লোহার গেটটির ঠিক উল্টো পাশেই একফালি খাস জমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি জীর্ণ কুটির। ভাঙা বাঁশ আর তালি মারা চটের বস্তা দিয়ে তৈরি সেই ঘরটি যেন কোনোমতে ঝড়ের ঝাপটা থেকে নিজেকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সেখানে বাস করে বৃদ্ধ রহমত আলী আর তার নয়নমণি, ছোট্ট নাতি পুতুল। রহমত আলীর শরীরে বয়সের ভাঁজ আর দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট হলেও তার দুটি চোখে এখনো এক অদ্ভুত মায়া লেগে আছে।
রহমত আলীর পেশা হলো ভাঙারি কুড়ানো। যখন শহরের অভিজাত মানুষগুলো নরম বিছানায় শেষ রাতের ঘুম দেয়, তখন হাতে একটি চটের বস্তা নিয়ে রহমত আলী বেরিয়ে পড়ে রাজপথের সন্ধানে। রাস্তার ধারের ডাস্টবিন কিংবা পরিত্যক্ত ড্রেনের পাশে পড়ে থাকা মরচে ধরা লোহার টুকরো, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল কিংবা বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া পুরানো খবরের কাগজই তার বেঁচে থাকার রসদ। জগতের কাছে যা আবর্জনা, রহমত আলীর কাছে তা পরম যত্নে কুড়িয়ে নেয়া মণি-মুক্তো। প্রতিটি লোহার টুকরো কুড়ানোর সময় বৃদ্ধ মনে মনে হিসাব করে, আজ পুতুলের জন্য একমুঠো চাল আর সামান্য সবজি কেনা যাবে কি না।
শহরের ধুলোবালি মেখে সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখন সে এক বস্তা ‘ময়লা’ নিয়ে কুটিরে ফিরে আসে, তখন ছোট্ট পুতুল আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে। রহমত আলী পরম মমতায় সেই পরিত্যক্ত জিনিসগুলো আলাদা করে সাজিয়ে রাখে। তার কাছে এই ভাঙারিগুলো শুধু সম্পদ নয়, বরং তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র মাধ্যম। একদিকে স্বর্ণশিখরের ওপর তলায় এসির ঠাণ্ডা বাতাসে আসাদ সাহেবের বিলাসিতা চলে, আর অন্যদিকে পিচঢালা রাস্তার উত্তাপ গায়ে মেখে রহমত আলী তার সামান্য সম্বলটুকু আগলে রাখে। এই দুই অসম জগতের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা জীবনগুলো একই শহরের বাসিন্দা হলেও তাদের ভাবনার আকাশ যেন যোজন যোজন দূরে অবস্থিত।
সেদিন সকালের আকাশটা ছিল অদ্ভুত রকমের পরিষ্কার। স্নিগ্ধ রোদের ছটা এসে পড়েছিল ‘স্বর্ণশিখর’ অট্টালিকার কাচের জানলায়। জনাব আসাদ সাহেব আজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। তার গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে এলো কুচকুচে কালো রঙের দামি গাড়িটি, যার পালিশ করা বডিতে সকালের রোদ ঠিকরে পড়ছিল। আসাদ সাহেব অত্যন্ত পরিপাটি হয়ে গাড়ির পেছনের সিটে হেলান দিয়ে বসলেন। তার পরনে ইস্ত্রি করা দামি শার্ট আর চোখে দামি সানগ্লাস। আজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মিটিং আছে, তাই সময়ের গুরুত্ব তার কাছে অনেক বেশি। তিনি যখন চালককে ইশারা করলেন গাড়িটি বাইরে বের করার জন্য, অমনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গেল বাড়ির সেই বিশাল ও ভারী লোহার গেটটি। গেটটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হতেই আসাদ সাহেবের নজরে পড়ল ঠিক সামনের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটি। রাস্তার ওপাড়ে রহমত আলীর কুটিরের সামনের একফালি জায়গা জুড়ে এক অদ্ভুত জঞ্জালের হাট বসেছে। আগের দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শহর ঘুরে যা-কিছু সংগ্রহ করতে পেরেছিল রহমত আলী, সেগুলোকে পরম মমতায় রোদে শুকানোর জন্য ছড়িয়ে রেখেছে সে। রাতের শিশিরে ভেজা কাগজ আর লোহালক্কড়গুলো রোদে না শুকালে মহাজনের কাছে ওজন পাওয়া যাবে না, এই চিন্তায় বৃদ্ধটি ব্যস্ত হয়ে কাজ করছিল।
আসাদ সাহেবের চোখের সামনে ভেসে উঠল স্তূপাকার হয়ে থাকা মরচে ধরা লোহার শিক, রংচটা আর ফাটা কিছু পুরানো প্লাস্টিকের বালতি, যা রোদের তাপে এক ধরনের কটু গন্ধ ছড়াচ্ছিল বলে তার মনে হলো। তার পাশেই অযত্নে রাখা ছিল স্তূপ করা একগাদা পুরানো খবরের কাগজ, যেগুলোর পাতা বাতাসের ঝাপটায় এলোমেলোভাবে উড়ছিল। রোদের আলো যখন সেই জংধরা লোহার ওপর পড়ছিল, তখন আসাদ সাহেবের মনে হলো এ দৃশ্যটি তার আভিজাত্যের গায়ে এক বড়ো ধরনের কলঙ্ক। তিনি গাড়ির এসির ভেতরে বসেও যেন নাকে এক ধরনের দুর্গন্ধ অনুভব করতে লাগলেন। আভিজাত্যের শিখরে বসে থাকা এ মানুষটির কাছে ওই জীর্ণ জিনিসগুলো কোনো প্রয়োজনীয় বস্তু নয়, বরং রাস্তার ধুলোবালি আর নোংরামির এক একটি প্রতীক। তিনি জানালার কাচটি নামিয়ে বিরক্তিভরা চোখে সেই স্তূপের দিকে তাকাতে লাগলেন। রহমত আলী তখনো একমনে একটি ভাঙা টিনের কৌটো সোজা করার চেষ্টা করছিল, সে খেয়ালই করেনি যে তার এ সামান্য অন্নসংস্থানের আয়োজনটি পাশের অট্টালিকার মালিকের চোখে কতটা কদর্য আর বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। আসাদ সাহেবের কপালে ফুটে উঠল ভাঁজ, তার কাছে মনে হলো এই ‘ময়লা’র ভাগাড়টি তার আভিজাত্যের পথে এক মস্ত বাধা।
গাড়ির কাচ নামাতেই বাইরের ভ্যাপসা গরম আর রাস্তার ধুলোবালির সাথে এক অদ্ভুত গন্ধ আসাদ সাহেবের নাকে এসে ধাক্কা দিলো। তিনি তৎক্ষণাৎ বিরক্তিতে নাক কুঁচকালেন এবং তার কপালে বিরক্তির গভীর ভাঁজ ফুটে উঠল। তার গায়ে মাখা ইউরোপীয় দামি পারফিউমের যে আভিজাত্যময় সুগন্ধ গাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে ছিল, তা যেন বাইরের ওই জংধরা লোহা আর ভেজা কাগজের গন্ধে মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। আসাদ সাহেবের মনে হলো, এই কটু গন্ধ তার রুচিতে আঘাত করছে, তার আভিজাত্যকে অপমান করছে। তিনি স্থির থাকতে পারলেন না; চালককে গাড়ি থামাতে বলে সজোরে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। তিনি অত্যন্ত দ্রুতপায়ে বা বলা যায় রাগে হনহনিয়ে রাস্তা পার হয়ে রহমত আলীর কুটিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার চকচকে দামি জুতো জোড়া রাস্তার ধুলোয় পড়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল, যা তার বিরক্তিকে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিলো। রহমত আলী তখন নিবিষ্ট মনে একগাদা ময়লার ভেতর থেকে একটি প্লাস্টিকের টুকরো সরাচ্ছিল। আসাদ সাহেবের ছায়া তার ওপর পড়তেই সে মাথা তুলে তাকাল, কিন্তু কিছু বলার আগেই আসাদ সাহেবের রাগত কণ্ঠস্বর বাজের মতো আছড়ে পড়ল।
আসাদ সাহেব তর্জনী উঁচিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও রাগত স্বরে বললেন, ‘এ যে বুড়ো, আপনার কি’ কাণ্ডজ্ঞান বলতে কিছু নেই? ঘরের ঠিক সামনে রাস্তার ওপরে এসব কুৎসিত আর নোংরা ময়লা জিনিসপত্র এভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছেন কেন? এসব এখুনি এখান থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে রাখুন।’ আসাদ সাহেবের কণ্ঠস্বরে আভিজাত্যের দম্ভ আর অবজ্ঞা মিশে ছিল। তিনি এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর আবার ঘৃণাভরে বললেন, ‘প্রতিদিন সকালে যখন আমি আমার দামি গাড়ি নিয়ে জরুরি কাজে বের হই, তখন গেট খুললেই এসব বিশ্রী দৃশ্য আর জঞ্জাল আমার নজরে পড়ে। সারাদিনের মেজাজটাই এতে বিগড়ে যায়। এ এলাকাটি নোংরা করবেন না, রাস্তাটা সব সময় পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করুন। নিজের দারিদ্র্যকে এভাবে সবার সামনে প্রদর্শনী করার কোনো মানে হয় না।’
আসাদ সাহেবের প্রতিটি শব্দ যেন তীরের মতো বৃদ্ধ রহমত আলীর বুকে বিঁধছিল। আসাদ সাহেব এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন যেন রহমত আলী কোনো মানুষ নয়, বরং ওই জঞ্জালেরই একটি অংশ। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে আসাদ সাহেবের সেই কর্কশ শাসন যেন আকাশের স্নিগ্ধতাকে বিষিয়ে তুলল। তিনি তার হাতের দামি ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে আবার বিরক্ত হলেন এবং চূড়ান্ত অবজ্ঞার সাথে রহমত আলীর সামনে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
আসাদ সাহেবের কঠোর তিরস্কার যখন তীরের মতো ধেয়ে আসছিল, তখন রহমত আলী অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে একটি ধুলোবালি-মাখা, চাকা ভাঙা লাল রঙের প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ি পরিষ্কার করছিল। খেলনাটি হয়তো কোনো বড়ো ঘরের শিশু অবহেলায় ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল, যা রহমত আলী কুড়িয়ে এনেছে তার অনাথ নাতি পুতুলের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোর আশায়। বৃদ্ধের কাঁপা কাঁপা হাত দুটি পরম মমতায় খেলনাটির গায়ের ময়লা মুছছিল, যেন এটি কোনো খেলনা নয়, বরং এক টুকরো অমূল্য স্বপ্ন। আসাদ সাহেবের কর্কশ কণ্ঠস্বর কানে যেতেই তার হাতের গতি থমকে গেল; যেন এক মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীটাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে আসাদ সাহেবের দিকে তাকাল। তার রোদে পোড়া, বলিরেখা পড়া মলিন মুখে এক নিমেষেই গাঢ় বিষণ্নতার ছায়া খেলে গেল। সেই বিষণ্নতা অপমানের চেয়েও বেশি ছিল আত্মসম্মানের চোট পাওয়ার হাহাকার। বৃদ্ধ এক দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল, যা তার বুকের গভীরে জমে থাকা বহু বছরের বঞ্চনার কথা জানান দিচ্ছিল। সে তার শীর্ণ হাত দিয়ে মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা মরচে ধরা লোহা আর ফাটা প্লাস্টিকের স্তূপটির দিকে ইঙ্গিত করল। আসাদ সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ ও কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে সে বলল, ‘‘দাদা, আপনার অনেক দয়া যে আপনি আমাকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু আপনি আমাদের এই অতি সামান্য জিনিসগুলোকে স্রেফ ‘ময়লা’ বলে তুচ্ছ করলেন?’’
রহমত আলীর কণ্ঠস্বর আবেগে বুজে আসছিল। সে আবার বলতে শুরু করল, ‘হয়তো আপনার দামি কাচের অট্টালিকা থেকে দেখলে এসব জঞ্জাল মনে হয়, আপনার ঝকঝকে গাড়ির চাকায় এসব ধুলোবালি লাগলে আপনার রুচিতে বাধে—তাই আপনার দৃষ্টিতে এগুলো কেবলই ময়লা। কিন্তু দাদা, একবার এই অভাগার চোখ দিয়ে তাকিয়ে দেখুন, এগুলোই আমাদের জন্যে পরম সম্পদ। এই মরচে ধরা লোহাগুলো যখন মহাজনের দোকানে ওজন দেয়া হবে, তখন যে কয়েকটা টাকা পাব, তা দিয়ে আজ রাতে আমার নাতির মুখে দুমুঠো অন্ন উঠবে। এই ছেঁড়া কাগজ আর ভাঙা প্লাস্টিকই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র আশা।’ বৃদ্ধের চোখ দুটি কানায় কানায় জলে ভরে উঠল। সে জানত, তার এই ‘সম্পদ’ আসাদ সাহেবের দামি পারফিউমের এক ফোঁটার সমানও নয়, তবুও এই অভাবী মানুষের কাছে এর চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই। রহমত আলী ধরা গলায় শেষ কথাটি বলল, ‘যে ময়লা দেখে আপনার মেজাজ খারাপ হয় দাদা, সেই ময়লাই আমাদের পেট চালায়। আমাদের মতো গরিবের সম্পদ তো আর সোনাদানা হয় না, আমাদের সম্পদ হলো জগতের ফেলে দেয়া এই উচ্ছিষ্টগুলোই।’ তার গলার স্বর কান্নায় ভেঙে পড়ল, আর রোদে পোড়া গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা নোনা জল।
কথাগুলো বলতে বলতে রহমত আলীর কণ্ঠস্বর ক্রমশ ভারী হয়ে এলো, যেন বুক ঠেলে আসা এক দলা কান্না তার গলার কাছে এসে আটকে গেছে। শেষ শব্দটি উচ্চারণ করার শক্তিটুকুও সে হারিয়ে ফেলল। সমাজের চোখে যা মূল্যহীন আবর্জনা, তা যে কারোর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হতে পারে—এই সত্যটুকু বোঝানোর ক্ষমতা তার এই জীর্ণ শরীরে ছিল না। বৃদ্ধের ঘোলাটে চোখ দুটি কানায় কানায় জলে ভরে উঠল এবং পরক্ষণেই সেই তপ্ত অশ্রু তার গালের গভীর ভাঁজ বেয়ে গড়িয়ে ধুলোয় মিশে গেল। গভীর এক অভিমানে আর অন্তহীন দুঃখে লোকটি ডুকরে কেঁদে উঠল না ঠিকই, কিন্তু তার দুচোখের সেই জল আসাদ সাহেবের আভিজাত্যের দেয়ালে এক অদৃশ্য করাঘাত করল। আসাদ সাহেব এ আবেগের কোনো মূল্যই বুঝলেন না। তিনি কোনো সান্ত্বনা তো দূরের কথা, একটি উত্তর দেয়ার প্রয়োজনও বোধ করলেন না। বরং বৃদ্ধের কান্নাকে এক ধরনের আদিখ্যেতা মনে করে বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বড়ো বড়ো পা ফেলে তিনি নিজের রাজকীয় গাড়িতে গিয়ে বসলেন এবং সজোরে দরজাটি বন্ধ করলেন। তার কাছে দারিদ্র্য কোনো দুর্ভাগ্য নয়, বরং এক প্রকার অমার্জনীয় অপরাধ। তিনি বিশ্বাস করতেন, যারা নোংরা পরিবেশে থাকে তারা মন থেকেও নোংরা; আর দরিদ্রদের ব্যবহৃত বা কুড়িয়ে আনা প্রতিটি জিনিসই হলো সমাজের জঞ্জাল বা স্রেফ আবর্জনা, যা দেখার অধিকারও তার মতো মানুষের নেই। গাড়িটি যখন স্টার্ট নিলো, তখন তার টায়ারের ধুলো রহমত আলীর সেই ‘সম্পদ’গুলোর ওপর আছড়ে পড়ল। কিন্তু প্রকৃতির হিসাব বড়োই অদ্ভুত। সেদিন রাতে শহরের বুকে নেমে এলো এক প্রলয়ঙ্করী ও ভয়ংকর দুর্যোগ। গত কয়েক দশকের স্মৃতি হাতড়েও হয়তো এমন প্রমত্ত বৃষ্টি আর পাগলাটে ঝড়ো হাওয়ার উদাহরণ কেউ খুঁজে পাবে না। বিকেলের শেষ থেকেই আকাশের মুখ ভার হয়েছিল, আর রাত বাড়ার সাথে সাথে তা এক দানবীয় রূপ ধারণ করল। মেঘের বুক চিরে ক্ষণে ক্ষণে যখন নীলচে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল আকাশটা যেন দ্বিখণ্ডিত হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়বে। বজ্রপাতের সেই বিকট শব্দে মানুষের বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, যেন কোনো অশুভ শক্তি পুরো শহরটাকে গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে।
আসাদ সাহেবের গর্বের ‘স্বর্ণশিখর’ অট্টালিকাটি আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে তা যেন তাসের ঘরের মতো অসহায় ও তুচ্ছ হয়ে পড়ল। জানালার কাচগুলো ঝড়ের ঝাপটায় আর্তনাদ করছিল। হঠাৎ এক গভীর অন্ধকার রাতে এক বিকট মড়মড় শব্দে চারপাশ প্রকম্পিত হলো। অট্টালিকার পেছনের বিশাল পুরানো রেইনট্রি গাছটি ঝড়ের তীব্রতা সইতে না পেরে সমূলে উপড়ে পড়লো প্রধান বিদ্যুতের খুঁটির ওপর। সাথে সাথে এক বিশাল স্ফুলিঙ্গ আর প্রচণ্ড আওয়াজ! মুহূর্তের মধ্যে সারা এলাকা অন্ধকারে ডুবে গেল। ‘স্বর্ণশিখর’-এর ঝাড়বাতি আর নিয়ন আলো নিমেষেই নিভে গেল, আর সেই বিলাসবহুল প্রাসাদটি অন্ধকারের এক বিশাল কালকূটে পরিণত হলো। আসাদ সাহেব তার দামি ড্রয়িংরুমে বসে অনুভব করলেন, প্রকৃতির কাছে ধনী আর গরিব—সবার অন্ধকারই আসলে এক রঙের।
অন্ধকার নামার সাথে সাথেই আসাদ সাহেব ভেবেছিলেন তার শক্তিশালী জেনারেটরটি মুহূর্তেই প্রাসাদে আলো ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু বিধি বাম! যান্ত্রিক কোনো এক রহস্যময় গোলযোগে সেই দামি যন্ত্রটিও অচল হয়ে পড়ে রইল, যেন প্রকৃতির এই তাণ্ডবের সামনে সে-ও আত্মসমর্পণ করেছে। বিশাল সেই অন্ধকার ঘরে একা আসাদ সাহেব এক ভয়ংকর ও শ্বাসরুদ্ধকর অস্বস্তি বোধ করছিলেন। এত বড়ো অট্টালিকা, অথচ এখন তা এক নিস্তব্ধ কবরস্থানের মতো মনে হচ্ছিল। ঘরের কোণে সাজানো দামি মেহগনি কাঠের আলমারি, শৌখিন মূর্তিসমূহ আর বিশাল সব আসবাবপত্র অন্ধকারের আবছায়ায় যেন একেকটি দানবীয় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আসাদ সাহেব নিজের ঘরেই নিজেকে আজ আগন্তুক বলে মনে করছিলেন; প্রতিটি ছায়া যেন তাকে বিদ্রুপ করছিল। হঠাৎ তিনি এক অদ্ভুত শব্দ পেলেন। টর্চের ক্ষীণ আলোয় লক্ষ্য করলেন, তার বিলাসবহুল ড্রয়িংরুমের বিদেশি জানালার কাচ চুইয়ে বৃষ্টির নোনা পানি অঝোরে ভেতরে ঢুকছে। ঝড়ের তীব্র ঝাপটায় পানির তোড় এতটাই বেশি ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে তার দামি পার্সিয়ান কার্পেট আর মখমলের সোফাসেট ভিজে সাকার হয়ে যেতে শুরু করল। আভিজাত্যের সেই চাকচিক্যময় ঘরটির অনেকাংশই বৃষ্টির লোনা জলে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আসাদ সাহেব দিশেহারা হয়ে আর্তনাদ করে চাকরদের ডাকলেন, বারবার তাদের নাম ধরে চিৎকার করলেন; কিন্তু বাইরের সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের গর্জনে তার কণ্ঠস্বর যেন মিলিয়ে যাচ্ছিল। অট্টালিকার নিচতলার পানির শব্দ আর বাতাসের শাঁ শাঁ আওয়াজ ছাড়া কারো কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। সেই মুহূর্তে তিনি উপলব্ধি করলেন, বিপদ যখন আসে, তখন দামি দেওয়ালও মানুষকে আড়াল করতে পারে না।
পরদিন সকালে যখন ভোরের আলো ফুটল, তখন আকাশ ছিল ধোয়া মোছা সাফ আর এক অদ্ভুত রকমের শান্ত। কিন্তু রাতের সেই তাণ্ডবের ক্ষতচিহ্ন সারা শহরের চেহারা বদলে দিয়েছিল। আসাদ সাহেব ক্লান্ত শরীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বাইরের দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তার সাজানো-গোছানো বাগানবাড়িটি আজ লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে; দামি-বিদেশি ফুলের গাছগুলো শিকড়সহ উপড়ে মাটির সাথে মিশে গেছে। ড্রেন উপচে আসা নোংরা আর দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানি তার সাজানো আঙিনা আর রাস্তার চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। যে আভিজাত্যের দম্ভ তিনি করতেন, সেই আঙিনা আজ কাদাজলে একাকার।
সবচেয়ে বিড়ম্বনার বিষয় হলো, আসাদ সাহেবের বাড়ির সামনে রাখা সেই আভিজাত্যের প্রতীক—তার প্রিয় চকচকে কালো গাড়িটি। রাতের জলমগ্নতায় ইঞ্জিনের গভীরে নোংরা পানি ঢুকে তা একাকার হয়ে গিয়েছিল। আসাদ সাহেব বারবার চেষ্টা করেও সেটি স্টার্ট দিতে পারলেন না। যে গাড়িটি তাকে আভিজাত্যের শিখরে পৌঁছে দিত, আজ তা স্রেফ লোহার এক জীর্ণ স্তূপের মতো অচল হয়ে পড়ে রইল। চারদিকের কাদা আর নোংরা পানির মধ্য দিয়ে তার সেই দামি জুতো জোড়া পরে বের হওয়ার কোনো উপায় রইল না। প্রকৃতির এক রাতের আঘাতে তার সাজানো জগৎটি যেন এক নিমিষেই শ্রীহীন ও অচল হয়ে গেল।
আসাদ সাহেব যখন তার বিধ্বস্ত অট্টালিকার সামনে একরাশ হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তার দুটি চোখ আটকে গেল রাস্তার ওপারে। তিনি দেখলেন, রাতের সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে যেখানে বড়ো বড়ো অট্টালিকা আর দামি যান্ত্রিক শহর থমকে গেছে, সেখানে রহমত আলী আর তার ছোট্ট নাতি পুতুল পরম নিশ্চিন্তে কাজে লেগে পড়েছে। তাদের সেই জীর্ণ কুটিরের সামনে কালকের ঝাপটায় ধুয়ে যাওয়া সেই ‘ময়লা’ জিনিসগুলো—অর্থাৎ সেই লোহালক্কড়, প্লাস্টিকের বোতল আর ভেজা কাগজগুলো—তারা আবারও যত্ন করে রোদে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাদের কারো মুখে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই, নেই কোনো বিরক্তির ছাপ। যেন এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই তারা নতুন করে বেঁচে থাকার ছন্দ খুঁজে পেয়েছে।
রহমত আলী দূর থেকে আসাদ সাহেবকে বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাতের কাজ ফেলে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। বৃদ্ধের মলিন মুখে গত দিনের চরম অপমান কিংবা আসাদ সাহেবের রূঢ় আচরণের কোনো চিহ্ন বা প্রতিশোধের সুপ্ত বাসনা ছিল না। তার শান্ত দুটি চোখে ছিল কেবল অকৃত্রিম মায়া আর সহানুভূতি। আসাদ সাহেবের দামি গাড়ির অচল দশা আর বিধ্বস্ত বাগানটির দিকে তাকিয়ে রহমত আলী অত্যন্ত বিনীত ও কোমল স্বরে বলল, ‘দাদা, কালকের ভয়ংকর ঝড়ে আপনার অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ে গেছে মনে হয়। আপনার এত দামি জিনিসপত্র সব নষ্ট হয়ে গেল, এটা দেখে বড়ো কষ্ট হচ্ছে।’ বৃদ্ধ একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল, ‘আমাদের এ অভাগার কুটিরেও কাল রাতে কোমর সমান পানি ঢুকেছিল দাদা। আমরা রাতভর জেগে সেই পানি সেচেছি। কিন্তু দেখেন, আমাদের এ ‘ময়লা’ সম্পদের কোনো ক্ষতি হয়নি। পানি লাগলে লোহা তো আর পচে যায় না, আর প্লাস্টিকও তো নষ্ট হয় না। এগুলো শুধু একটু কাদা লেগে নোংরা হয়েছিল, এখন এ রোদে ধুয়ে দিলেই আবার আগের মতো ঝকঝকে হয়ে যাবে। আমাদের সম্পদ কোনোদিন অচল হয় না দাদা।’ রহমত আলীর এ সহজ সরল কথাগুলো আসাদ সাহেবের কানে কোনো এক মহান দর্শনের মতো বাজতে লাগল।
রহমত আলী আকাশের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসল, তারপর গম্ভীর স্বরে বলল, ‘আসলে কী জানেন দাদা, লোহার সংকটে বা প্লাস্টিকের অভাবে জগৎ কোনোদিন থেমে থাকে না। আপনার কাছে যা স্রেফ আবর্জনা, তা-ই আবার কোনো কারখানায় গিয়ে গলানো হবে এবং নতুন কোনো রূপ নিয়ে মানুষের কাছে ফিরে যাবে। এ ময়লাই আবার নতুন কিছুর জন্ম দেয়। জগৎটা তো ত্যাগের আর পুনর্জন্মের মধ্য দিয়েই চলে। আমাদের এই অতি তুচ্ছ জিনিসগুলোই হয়তো কাল আপনার অট্টালিকার কোনো নতুন কারুকাজ হয়ে ফিরে আসবে। তাই এগুলোকে ময়লা ভাবলেও, আসলে এগুলোই হলো জগতের টিকে থাকার মূল শক্তি।’ রহমত আলীর এই গভীর কথাগুলো আসাদ সাহেবের ভেতরের অহংকারের পাহাড়টাকে যেন এক নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিলো।
আসাদ সাহেব বিমূঢ় হয়ে রহমত আলীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখের পলক পড়ছিল না। কাল ঠিক এ সময়টিতেই তিনি এই মানুষটিকে অতি তুচ্ছ জ্ঞান করে ঘৃণাভরে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন, বাতাসের গন্ধেও যার অস্পৃশ্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন। অথচ আজ সেই মানুষটিই কোনো অভিযোগ ছাড়াই পরম আত্মীয়ের মতো তার বিপদে খোঁজ নিতে এগিয়ে এসেছে। আসাদ সাহেবের মনে হলো, তার পায়ের তলার মাটি যেন ক্রমশ সরে যাচ্ছে। তিনি এতদিন যে সম্পদের বড়াই করতেন, আজ তা প্রকৃতির এক রাতের ঝাপটায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, সম্পদের প্রকৃত সংজ্ঞা কোনো জড় বস্তুর চাকচিক্য বা অর্থমূল্যে নির্ধারিত হয় না; বরং তার প্রকৃত মাহাত্ম্য লুকিয়ে থাকে ব্যবহারের উপযোগিতা আর মানুষের গভীর আবেগের মাঝে। তার চোখের সামনে পড়ে থাকা কোটি টাকার দামি গাড়িটি এখন স্রেফ এক যান্ত্রিক বোঝা, যা তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে অক্ষম। অথচ রহমত আলীর সেই কুড়িয়ে পাওয়া ‘ময়লা’ ভাঙারিগুলোই আজ বৃদ্ধের চোখেমুখে বেঁচে থাকার এক অদম্য প্রেরণা আর অফুরন্ত সাহস জোগাচ্ছে। আসাদ সাহেবের প্রাসাদোপম অট্টালিকা যেখানে স্তব্ধ হয়ে গেছে, রহমত আলীর জীর্ণ কুটির সেখানে নতুন উদ্যমে জেগে উঠেছে। সম্পদের এই বৈপরীত্য আসাদ সাহেবকে জীবনের এক কঠিন পাঠ শেখাল—যা অচল তা সম্পদ নয়, যা প্রতিকূলতায় টিকে থাকে তা-ই প্রকৃত সম্বল।
আসাদ সাহেবের বুকের ভেতরটা অনুশোচনার এক তীব্র দহনে জ্বলতে লাগল। রহমত আলীর সেই জলভরা দুটি চোখ, যা গতকাল অপমানের ভারে ঝরে পড়েছিল, আজ যেন সেই পবিত্র অশ্রুগুল দিয়েই আসাদ সাহেবের মনের ভেতরকার স্তূপীকৃত সব অহংকার, আভিজাত্যের দম্ভ আর ক্ষুদ্রতা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। তিনি নিজের অজান্তেই অনুভব করলেন, তার ভেতরের সেই দামি পারফিউমের কৃত্রিম সুগন্ধ আজ এ মাটির মানুষের সরলতার কাছে বড্ড ম্লান হয়ে গেছে। মানুষের ভেতরের মনুষ্যত্বই যে সবচেয়ে দামি অলংকার, সেই সত্যটি আজ তার সামনে সূর্যের মতো উদিত হলো। তিনি কোনো দ্বিধা না রেখে অত্যন্ত ধীর ও সংকুচিত পায়ে রাস্তা পার হয়ে রহমত আলীর সেই জীর্ণ কুটিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার পরনের দামি পোশাক কিংবা রাস্তার জমা পানি—কোনো কিছুই আজ তাকে বাধা দিতে পারল না। তিনি রহমত আলীর চোখে চোখ রেখে এক অদ্ভুত আর্দ্রতা অনুভব করলেন। আসাদ সাহেব অত্যন্ত মৃদু ও বিনীত স্বরে, যা তার নিজের কানেই অপরিচিত মনে হচ্ছিল, বললেন, ‘রহমত ভাই, আমি কি তোমার এই মাটির আঙিনায়, তোমার সাথে একটু বসতে পারব?’ এই প্রথমবার তার কণ্ঠে ‘বুড়ো’র বদলে ‘ভাই’ শব্দটি ধ্বনিত হলো, যা ছিল এক নতুন সম্পর্কের সূচনালগ্ন।
রহমত আলী ক্ষণিকের জন্য বিমূঢ় হয়ে গেল। শহরের এত বড়ো অট্টালিকার মালিক, যার পায়ের ধুলো কোনোদিন এই কাদার আঙিনায় পড়েনি, তিনি আজ কি না এই জীর্ণ স্থানে বসার অনুমতি চাইছেন! বৃদ্ধের ঠোঁটের কোণে এক নির্মল ও প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে তার কাঁধের পুরানো কিন্তু পরিচ্ছন্ন গামছাটি দিয়ে একটি কাঠের জীর্ণ পিঁড়ি মুছে দিলো। পিঁড়িটির কাষ্ঠল শরীরের এখানে-সেখানে চটা উঠলেও রহমত আলীর যত্নে তা হয়ে উঠেছিল আতিথেয়তার এক পরম আসন। আসাদ সাহেব যখন তার দামি ব্রান্ডের প্যান্টের ভাঁজ উপেক্ষা করে সেই সাধারণ পিঁড়িতে গিয়ে বসলেন, তখন তার মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সোফাতেও বোধহয় এতটা শীতলতা আর শান্তি নেই। তিনি আজ প্রথমবার খুব কাছ থেকে অনুভব করলেন, মাটির সুবাস মেখে থাকা এই অবহেলিত মানুষগুলোর হৃদয়ের পরিসর কতটা বিশাল হতে পারে। কোনো প্রকার কৃত্রিমতা বা অহঙ্কারের দেয়াল ছাড়াই তারা যে কতটা আপন করে নিতে পারে, তা আসাদ সাহেবের আভিজাত্যের চশমায় এতদিন ধরা পড়েনি। তিনি মর্মে মর্মে বুঝতে পারলেন, দামি পোশাক আর পাথরের অট্টালিকার মোড়কে তিনি এতটা দিন আসলে এক অন্ধকার ও রুদ্ধ জগতের মধ্য দিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে পথ চলছিলেন, যেখানে মানুষের হাহাকার পৌঁছালেও মানুষের আত্মার আলো প্রবেশ করতে পারত না।
বসতে বসতে আসাদ সাহেবের নজরে পড়ল পাশে পড়ে থাকা একটি পুরানো, জীর্ণ ডায়েরি। ডায়েরিটির মলাট অনেক আগেই ছিঁড়ে গেছে, পাতাগুলো হলদেটে হয়ে সময়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে। তিনি পরম মমতায় এবং এক অদ্ভুত সম্মানবোধ নিয়ে সেই ডায়েরিটি হাতে তুলে নিলেন। এটিও হয়তো রহমত আলী কোনো এক ডাস্টবিন কিংবা পরিত্যক্ত বাড়ির কোণ থেকে কুড়িয়ে এনেছে। তিনি ডায়েরির পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখলেন, সেখানে কাঁচা হাতে পেন্সিল দিয়ে কিছু অগোছালো অঙ্ক কষার চেষ্টা করা হয়েছে। রহমত আলীর নাতি পুতুল হয়তো তার দাদুর কুড়িয়ে আনা এ ‘ময়লা’ খাতাটিকেই তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো পাঠ্যবই বানিয়ে নিয়েছে। সেখানে যোগ-বিয়োগের ভুল অঙ্কগুলোর মাঝে আসাদ সাহেব জীবনের এক অমোঘ ধ্রুব সত্য খুঁজে পেলেন। পুতুলের সেই ভাঙা ভাঙা হাতের লেখা আর অঙ্ক কষার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আসাদ সাহেবের চোখে এক নতুন জগতের দ্বার খুলে দিলো।
আসাদ সাহেবের ঠোঁটের কোণে এক স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। তিনি ডায়েরিটির পাতায় হাত বোলাতে বোলাতে মনে মনে ভাবলেন, জীবনের প্রকৃত পাঠশালা তো বড়ো বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নয়, বরং জীবনের এই চরম বাস্তবতার মাঝেই লুকিয়ে আছে। যেখানে অভাব আছে কিন্তু অভিযোগ নেই, যেখানে জঞ্জালের স্তূপেও স্বপ্নের বীজ বোনা হয়—সেখানেই তো আসল শিক্ষা। তিনি এতদিন মনে করতেন অর্থই মানুষকে জ্ঞান ও মর্যাদা দেয়, কিন্তু আজ এই ভাঙারি কুড়ানো বৃদ্ধের আঙিনায় বসে তার উপলব্ধি হলো, মানুষের মর্যাদা তার ত্যাগে আর সহনশীলতায়। রহমত আলীর এই জীর্ণ কুটির আর সেই আধপোড়া ডায়েরির পাতাগুলোই যেন আজ তার কাছে শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয় হয়ে দাঁড়াল। জীবনের অলিগলি আর ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই যে মানুষ পূর্ণতা পায়, সেই সত্যটি তিনি আজ অন্তরে গেঁথে নিলেন।
আসাদ সাহেব আকাশের দিকে তাকালেন। মেঘমুক্ত নীল আকাশে সূর্যটা এখন প্রখর হয়ে উঠেছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই সূর্যের আলো যেমন ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ করে না, তেমনি মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধও কোনো বৈষয়িক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি মনে মনে এক নতুন প্রতিজ্ঞা করলেন—‘স্বর্ণশিখর’ অট্টালিকাটি হয়তো আগের মতোই উঁচুতে থাকবে, কিন্তু তার মনের জানালাগুলো আজ থেকে খোলা থাকবে এ সাধারণ মানুষের জন্য, যাদের ‘ময়লা’ জিনিসগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর অমূল্য মানবিক সম্পদ।
