
এমরান কবির-এর গুচ্ছ কবিতা
বাহাত্তর-এক
কী-বা রয়েছে এমন এই কাগজবদ্ধ সোপানে? কালো ফ্রেমের মলাটে স্তরে স্তরে সাজানো অক্ষরে? খুব সাধারণ, সমান্তরাল অঙ্কিত দাগে কী রয়েছে এমন? সুদীর্ঘ যাত্রার আসল ঠিকানা? রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পুড়তে পুড়তে মরতে মরতে সুদীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের পর পেয়ে যাওয়া দীর্ঘ বৃক্ষের নিবিড় ছায়া? না-কি চোখ? না-কি সরল আঁধার? বিষাদ বসুধা ঘেঁটে তুলে আনা দীর্ঘশ্বাস? হেমলক হাতে সক্রেটিস—পেয়ালায় দেখছেন মুক্তির আপেল হাতে এমন বদ্বীপ?
ঝাঁঝালো দুপুরে দীর্ঘতর পথ, হেঁটে হেঁটে সেঁটে দেয়া সাদা কালো পোস্টার? ঘাম-রক্ত দিয়ে শোধ করা জীবনের কাছে দূরগামী চোখের গোপন ইশারা? আরো দিন আগে ভাসতে থাকা লাল নীল ভেসে ওঠা রঙিন অঙ্গীকার? ছয় বোতামের অস্ফূট গোপন সন্ধি? হাজার বছরে মিশে মিশে যাওয়া ঢেউটির শেষতক তীরে পৌঁছানোর আনন্দ-বিহ্বল কান্না? ধূলিকণায় ধূলিকণায় মিশে যাওয়া আমাদের বাবা নামের বটবৃক্ষের চিরমুক্তির তর্জনী-দীপ্ত ইশারা? টেকনাফ থেকে বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়া সদ্য ঋতুমতী তরুণীর প্রবল রক্তস্রোতের চাপা কান্না?
প্রান্তরে বৃক্ষের বাতাস আছে? খিলখিল হাসির রিনিঝিনি ভাঙচুর? চিঠির মতো সরল সুন্দর চোখ? না-কি নদীর জলে ধোয়া শস্যক্ষেত? দীপ্ত রোদে ঝুঁকে ঝুঁকে নুয়ে পড়া মাটিবর্তী কৃষকের কাস্তে উঁচু করে ধরা বেহেশতি হাসি? রোদে রোদে ঝিলিক দেয়া মুক্তি বাসনার দীর্ঘ বাঁক?
কী আছে সেখানে? করতোয়া নদীর গল্প?
উড়ে যাওয়া পাখির বিপ্রতীপ কান্না?
দাগগুলো মুছে যাচ্ছে, সমানে সমান্তরালে সবকিছু; বিভক্ত দাগের মধ্যে মিশে যাচ্ছে মার্চ মাসের সপ্তমী কিংবা ষোলো তারিখের বিজয়বরণ
কিন্ত জেনে রেখো, সাদা কিন্তু সাদা নয়। তাই কাগজবদ্ধ সোপানে কী আছে তা জানবার আগে বুঝে নেয়া যাক বুকে হাত দিয়ে, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটিবার
কী নেই এখানে?
বাহাত্তর- দুই
সাদা বইটার কালো অক্ষরগুলো রেখে এলাম রাস্তার পাশে
ধুলিকণা পড়বে, পথের পাশে বামনবৃক্ষ পড়বে, বাতাস পড়বে—এমন ভাবি না। কেন তবে এই কাজ! এজন্য যে কাছে থাকলে গুরুত্ব বোঝা যায় না।
অনেক পৃষ্টা সেখানে, পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে দেখা যাবে শেষই হচ্ছে না। যত পাতা ওল্টানো হচ্ছে ততই বেড়ে যাচ্ছে এর সংখ্যা আর টুকটুক লেখা হয়ে যাচ্ছে
বর্ণমালা, তারা শব্দ হচ্ছে, বাক্য হচ্ছে, বাক্যমালা হচ্ছে। এভাবে ভরে উঠছে পৃষ্ঠাগুলো
নতুন পৃষ্ঠার অবয়ব বৃদ্ধি তবুও থামছে না। না থামুক বাড়তে থাকুক এইসব।
শুধু সাদা বইটা কালো হয়ে না যাক
বাহাত্তর-তিন
হঠাৎ
নিজেকে দেখার পর বিমুগ্ধ বিষাদে কেঁপে কেঁপে ওঠে তার সুঢৌল বসুধা
স্তন নিয়ে কবিতার জন্য পুড়িয়ে ফেলল প্রথম প্রেমের দেয়া কবিতার বই
এখন অসংখ্য প্রেমিককে স্তন দেখিয়েও
ফিরে পাচ্ছে না সে
কবিতায় ফুটে থাকা সেই অলীকযুগল
বই থাকলেও পৃষ্ঠাগুলো নেই
হারিয়ে গেছে
যেমন করে হারিয়ে যায়
তরুণীর স্তন
সুঢৌল বক্ষবন্ধনীর পিছে
বাহাত্তর-চার
সাদা প্রজাপতি উড়ে এলো
নলখাগড়ার ঝাড়ে, রাতের বেলা
তুষার পাতের মতো ঠিকঠিক
পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়
মনে হলো, এখানে
অশরীরী কেউ আছে কি?
স্বেচ্ছা শকুনের পালক দেখে
মনে হলো, তখন
কুয়াশা ঝরেছিল
মুছে গিয়েছিল
সবগুলো গতকাল
এখন কাঁপছে খালি সাদা সাদা অন্ধকার

One Comment
সুন্দর লিখেছেন। ভালোলাগলো কবি।