
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র : ১৯৭১–২০২৫
ড. আ. ন. ম এহছানুল মালিকী
ভূমিকা
১৯৭১ সালে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন অধ্যায়ের শুরু তখনই। আর সেই থেকেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প, সংস্কৃতি, বিনোদন ও গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে তার বৈশিষ্ট্য ও ভিত্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সকলেরই জানা, চলচ্চিত্র একই সঙ্গে আর্ট এবং ইন্ডাস্ট্রি। একই সঙ্গে মানবিক ও বাণিজ্যিক। তাই সাধারণের পক্ষে অপেক্ষাকৃত জটিল কিন্তু সবচেয়ে প্রভাবসঞ্চারী এই মাধ্যমটির প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল বিরাজমান। তবে এ অধ্যায়ের শুরুতেই ভীষণ আফসোসের একটা ব্যাপার থেকে যায়, আর তা হলো শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে জহির রায়হান নিখোঁজ হন। যুদ্ধ ও স্বাধীনতার বছর ১৯৭১ সালে এদেশে ৮টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের স্বরলিপি, অশোক ঘোষের নাচের পুতুল, খান আতাউর রহমানের সুখ দুঃখ উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পরে আবির্ভূত চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে আলমগীর কবির (১৯৩৮-১৯৮৯) উল্লেখযোগ্য। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র হলো ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), সূর্য কন্যা (১৯৭৬), সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), রূপালী সৈকতে (১৯৭৯), মোহনা (১৯৮২), পরিণীতা (১৯৮৪) ও মহানায়ক (১৯৮৫)।
সত্তরের দশক: জাতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিত্তি
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পরপরই চলচ্চিত্র নির্মাতারা জাতীয় পরিচয় গঠনে সচেষ্ট হন। সত্তরের দশকের শুরুতেই অশোক ঘোষের নাচের পুতুল (১৯৭১), নজরুল ইসলামের স্বরলিপি (১৯৭১), জহিরুল হকের রংবাজ, সুভাষ দত্তের বলাকা মন এবং ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭২) বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশেষ মানে উন্নীত করে। এই চলচ্চিত্রগুলো কেবল বিনোদনই দেয়নি, বরং নতুন জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় আলমগীর কুমকুমের আমার জন্মভূমি (১৯৭৩) দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। রুহুল আমিনের বেইমান (১৯৭৪) সামাজিক অবিচার নিয়ে কঠোর বক্তব্য উপস্থাপন করে। খান আতাউর রহমানের আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৪) মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করে। এছাড়া বেবী ইসলামের চরিত্রহীন (১৯৭৫) নারীর অধিকার ও সামাজিক বৈষম্য তুলে ধরে। নারায়ণ ঘোষ মিতার লাঠিয়াল (১৯৭৫) গ্রামবাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও শ্রেণি সংগ্রামের গল্প বলে। খান আতাউর রহমানের সুজন সখী (১৯৭৫) প্রেম ও সামাজিক বন্ধনের চিরায়ত কাহিনি উপস্থাপন করে। এসব চলচ্চিত্র সত্তরের দশকের মধ্যভাগে বাংলা চলচ্চিত্রের ভিত্তি মজবুত করে (হোসেন, ২০১৯)।
১৯৭৬ সালটি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য মাইলফলক। এই বছর মুক্তি পাওয়া ছয়টি চলচ্চিত্র বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ধারণাকেই পাল্টে দেয়। রাজেন তরফদারের পালঙ্ক মধ্যবিত্ত জীবনের জটিলতা বিশ্লেষণ করে। হারুনর রশীদের মেঘের অনেক রঙ নারী মনস্তত্ত্বের গভীরে ডুব দেয়। আলমগীর কবিরের সূর্য কন্যা নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প বলে। কবীর আনোয়ারের সুপ্রভাত নগরজীবনের একাকিত্ব ফুটিয়ে তোলে। আবদুস সামাদের সূর্যগ্রহণ অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে রচিত। আমজাদ হোসেনের নয়নমনি শিশুদের নির্মল আনন্দ ও সংবেদনশীলতার ছবি আঁকে। আর জহিরুল হকের রংবাজ (১৯৭৬) গ্রামীণ লোকজীবনের রঙিন আয়োজন উপস্থাপন করে (কাদের, ২০২১)।
১৯৭৭ সালে আবদুল রতিফ বাচ্চুর যাদুর বাঁশি শিশুতোষ ও কল্পনাপ্রবণ গল্পের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। ১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেনের গোলাপী এখন ট্রেনে নগরায়নের সাথে তাল মেলাতে না পারা এক নারীর করুণ কাহিনি দর্শকদের নাড়িয়ে দেয়। একই বছর আবদুল্লাহ আল মামুনের সারেং বৌ নিপীড়িত নারীর প্রতিবাদের শিল্পোত্তীর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই দুই চলচ্চিত্র শিল্পগুণ ও দর্শকপ্রিয়তায় সমানভাবে নন্দিত হয় (কাদের, ২০২১)।
স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ও দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম নির্মিত হয় ১৯৭৯ সালে। শেখ নজরুল ইসলামের নদের চাঁদ এক অসহায় নারীর মাতৃত্বের কাহিনি দর্শককে আবেগে ভাসায়। ইবনে মিজানের নাগনাগিনী লোকগাথার সফল রূপায়ণ। আজিজুর রহমানের সম্পাদনায় নির্মিত ওয়ালা পারিবারিক টানাপড়েনের চিত্র এঁকেছে। তবে সবচেয়ে বড় মাইলফলক মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর যৌথ নির্মাণ সূর্য দীঘল বাড়ি। এই চলচ্চিত্রটি কেবল দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে অনন্য উচ্চতায় পরিচয় করিয়ে দেয়। কৃষকের জীবনের করুণ বাস্তবতা এবং ভূমিহীনতার যন্ত্রণা এতে এত শিল্পময় হয়ে উঠেছে যে এটি আজও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পায় (রহমান, ২০১৮)।
১৯৭৯-এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের শুরুতেও বেশ কিছু চলচ্চিত্র দর্শকের মন জয় করে। আবদুল্লাহ আল মামুনের সখি তুমি কার (১৯৮০) ও এখনই সময় (১৯৮০) নারী শিক্ষা ও সময়োপযোগী চেতনা প্রচার করে। সৈয়দ হাসান ইমামের লাল সবুজের পালা (১৯৮০) মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলে। আমজাদ হোসেনের কসাই (১৯৮০) সামাজিক অসঙ্গতি ও শ্রেণিবৈষম্যের প্রখর সমালোচনা করে। দিলীপ সোমের স্মৃতি তুমি বেদনা (১৯৮০) প্রেম-বিচ্ছেদ ও অতীতের স্মৃতির বেদনাকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করে। এই চলচ্চিত্রগুলো দর্শকপ্রিয়তা লাভ করতে সমর্থ হয় এবং দশকের শেষে বাংলা চলচ্চিত্রকে এক শক্ত ভিত উপহার দেয় (রহমান, ২০১৮)।
সত্তরের দশক শেষে আমরা দেখতে পাই, স্বাধীনতার ঘোষণার পর যে শূন্যতা ছিল, তা ক্রমে সার্থক নির্মাণকুশলতা, প্রতিভাবান নির্মাতা ও সচেতন দর্শকের অক্লান্ত পরিশ্রমে পূরণ হয়েছে। এই দশকের চলচ্চিত্রই পরবর্তী সময়ের জন্য বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছে।
আশির দশক: বাণিজ্যসফল ও সামাজিক বাস্তবতার চলচ্চিত্র
আশির দশক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য এক গৌরবময় অধ্যায়। এই দশকেই পরিচালকরা সুস্থ ও সামাজিক সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ব্যাপক ব্যবসাসফলতা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পূর্ববর্তী দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে তারা এখন আরও পরিণত ও দর্শকমুখী গল্প বলতে শুরু করেন।
১৯৮১ সালে আমজাদ হোসেনের জন্ম থেকে জ্বলছি চলচ্চিত্রটি সুস্থ চলচ্চিত্রের মেজাজ বজায় রাখে। এটি একজন নারীর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কাহিনি দিয়ে দর্শকের মন জয় করে। ১৯৮২ সালটি ছিল একাধিক উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের বছর। চাষী নজরুল ইসলামের দেবদাস শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাসের সফল রূপায়ণ। একই বছর মোস্তফা আনোয়ারের কাজল লতা গ্রামীণ প্রেমের মর্মস্পর্শী কাহিনি উপস্থাপন করে। আবদুস সামাদ খোকনের বড় বাড়ির মেয়ে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে রচিত হয়। মতিন রহমানের লাল কাজল নারী-পুরুষের সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরে। আলমগীর কবিরের মোহনা ও জহিরুল হকের প্রাণসজনী সকল অর্থে সুস্থধারার সামাজিক চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এসব চলচ্চিত্র বাণিজ্য ও শিল্প, উভয় ক্ষেত্রেই সমান সাফল্য দেখায় (ইসলাম, ২০২০)।
১৯৮৩ সালে আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র দর্শকের নজর কাড়ে। সিবি জামানের পুরস্কার ও এজে মিন্টুর মান সম্মান পারিবারিক মূল্যবোধের গল্প বলে। সুভাষ দত্তের নাজমা নিপীড়িত নারীর কাহিনি দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৮৪ সালটি ছিল অসাধারণ সৃজনশীলতার বছর। আখতারুজ্জামানের প্রিন্সেস টিনা খান শিশু-কিশোরদের জন্য নির্মিত হয়। কাজী কাজী হায়াতের রাজবাড়ি রহস্য-রোমাঞ্চের গল্পে দর্শক মাতায়। কামাল আহমেদের গৃহলক্ষ্মী সংসারের স্থিতিশীলতার গল্প বলে। সুভাষ দত্তের সকাল সন্ধ্যা মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন চিত্রিত করে। চাষী নজরুল ইসলামের চন্দ্রনাথ লোককথার আঙ্গিকে নির্মিত। আর আমজাদ হোসেনের সখিনার যুদ্ধ ও ভাত দে (১৯৮৪) বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কাহিনি বলে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে (হোসেন, ২০১৯)।
১৯৮৫ সালেও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র দর্শকের গ্রহণযোগ্যতা পায়। সিবি জামানের শুভরাত্রি দাম্পত্য জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প বলে। শক্তি সামন্ত ও সৈয়দ হাসান ইমামের অবিচার সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। শেখ নিয়ামত আলীর দহন এক নারীর করুণ আত্মবলিদানের কাহিনি। রাজ্জাকের সৎভাই পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরে। শহিদুল আমিনের রামের সুমতি ধর্মীয় সহিষ্ণুতার বার্তা দেয় (কাদের, ২০২১)।
আশির দশকের শেষার্ধে আরও বিচিত্র সব চলচ্চিত্র দর্শক পায়। সুভাষ দত্তের ফুলশয্যা (১৯৮৬) দাম্পত্য প্রেমের কোমল ছবি আঁকে। আলমগীর কবিরের পরিণীতা (১৯৮৬) নারীর আত্মসম্মানের গল্প বলে। চাষী নজরুল ইসলামের শুভদা সামাজিক বাধার বিপরীতে প্রেমের জয়গান করে। ১৯৮৭ সালে বুলবুল আহমেদের রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত ও নারায়ণ ঘোষ মিতার হারানো সুর শিক্ষামূলক ও নৈতিকতা বোধ জাগায়। আফতাব খান টুলুর দায়ী কে (১৯৮৭) পিতৃত্বের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
১৯৮৮ সালে কবীর আনোয়ারের তোলপাড় ও মহিউদ্দিন ফারুকের বিরাজ বৌ সামাজিক সমস্যার সাহসী চিত্রায়ণ করে। একই বছর আজিজুর রহমানের কাঞ্চনমালা ও চাষী নজরুল ইসলামের বেহুলা লক্ষীন্দর লোকগাথা থেকে কাহিনি নিয়ে নির্মিত হয়। এতে প্রমাণিত হয়, লোকায়ত সংস্কৃতি ও উপাখ্যানও চলচ্চিত্রের অনন্য উপজীব্য হতে পারে (কাদের, ২০২১)।
১৯৮৯ সালটি জনপ্রিয়তার দিক থেকে রেকর্ড করে। তোজাম্মেল হক বকুলের বেদের মেয়ে জোসনা চলচ্চিত্রটি দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষ স্পর্শ করে। বেদে সম্প্রদায়ের এক মেয়ের সংগ্রাম ও ভালোবাসার গল্প সবার মন জয় করে। একই বছর সাইদুর রহমান সাইদের আলোমতি প্রেমকুমার ও ইবনে মিজানের আপন দুলাল মুক্তি পেয়ে বেশ আলোচিত হয়।
আশির দশক শেষে দেখা যায়, বাংলা চলচ্চিত্র এখন বাণিজ্য ও সামাজিক বাস্তবতাকে একসূত্রে বাঁধতে শিখে গিয়েছে। দর্শক ভালো গল্প ও অভিনয় দেখতে হলে সিনেমা হলে আসে। নির্মাতারাও এখন আত্মবিশ্বাসী যে দেশীয় কাহিনি ও সংস্কৃতি ব্যবহার করলেই আন্তর্জাতিক মান ছোঁয়া যায়। দশকটির শেষে বেদের মেয়ে জোসনা-র মতো ব্যবসাসফল ছবি প্রমাণ করে দিয়েছে, সচেতন দর্শক ও শিল্পসম্মত বাণিজ্যসফলতা পরস্পরবিরোধী নয়।
নব্বইয়ের দশক : হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব ও নতুন গল্প বলা
নব্বইয়ের দশক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই দশকেই বাংলা সাহিত্যের কলম জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ সরাসরি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন এবং গল্প বলার ধরনকে আমূল বদলে দেন। তবে তার আগমনের আগেও প্রথমার্ধে কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র দর্শক নজর কেড়েছিল। সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীর আয়না বিবির পালা লোককথার আধুনিক রূপায়ণ হিসেবে সাড়া ফেলে দেয়। এহতেশামের চাঁদনী (১৯৯১) প্রেম ও আবেগের গল্প দর্শকের মন জয় করে।
এই সময়েই হুমায়ূন আহমেদ ছত্রছায়ায় ঢাকা পড়ে যান কিছু ব্যবসাসফল বাণিজ্যিক ছবিও। কিন্তু মূল ধারার পরিবর্তন শুরু হয় যখন হুমায়ূন আহমেদের কলম ও চলচ্চিত্রের মেলবন্ধন ঘটে। প্রথম ধাপে তার রচিত উপন্যাস অবলম্বনে মুস্তাফিজুর রহমান নির্মাণ করেন শঙ্খনীল কারাগার। এই চলচ্চিত্রের কাহিনি, চরিত্রায়ণ ও সংলাপ দর্শককে নতুন এক অভিজ্ঞতা দেয়। হুমায়ূন আহমেদ সেরা কাহিনিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন (রহমান, ২০১৮)।
উৎসাহ পেয়ে তিনি নিজেই গড়ে তোলেন প্রযোজনা সংস্থা- নুহাশ চলচ্চিত্র। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি। এটি শুধু একটি সিনেমা ছিল না, বরং এক নতুন গল্প বলার সূচনা। প্রেম, পারিবারিক টানাপোড়েন ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে তিনি এত সহজ ও আন্তরিকভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন যে দর্শক অভিভূত হয়ে যায়। এরপর একে একে নির্মাণ করেন শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, শ্যামল ছায়া, নয় নম্বর বিপদ সংকেত ও আমার আছে জল (১৯৯৪)। প্রতিটি ছবিতেই তিনি ভিন্ন স্বাদের গল্প বলেছেন, মাঝে মাঝে হাসির, মাঝে মাঝে কান্নার, মাঝে মাঝে দার্শনিক (ইসলাম, ২০২০)।
হুমায়ূন আহমেদের সাফল্যে অন্য নির্মাতারাও উৎসাহিত হন। তবে নব্বইয়ের দশকে শুধু হুমায়ূন আহমেদের ছবিই নয়, আরও নানান ধারার চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে। ১৯৯৫ সালে বেদকন্যা পক্ষীরানী, গহর বাদশা বানেছা পরী, নাচনাগিনী নাচ, নয়া বাইদানী, নয়া লায়লা নয়া মজনু প্রভৃতি লোকগাথাভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এসব ছবি মূলত গ্রামীণ দর্শকদের জন্য তৈরি হলেও কিছু কিছু শহরেও সাড়া ফেলে।
১৯৯৬ সালে তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রানদীর পাড়ে নির্মিত হয়। এটি নান্দনিক মান ও শিল্পগুণে স্বতন্ত্র স্থান দখল করে নেয় এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়। ১৯৯৭ সালে খান আতাউর রহমানের এখনো অনেক রাত ও চাষী নজরুল ইসলামের হাঙর নদ গ্রেনেড মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দুটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। এগুলোর একটিতে যুদ্ধের মানসিক ক্ষত ও আরেকটিতে বীরত্বগাথা স্থান পায়। এ ছাড়া নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রভৃতি চলচ্চিত্রে দেশের ইতিহাসের গৌরবময় চরিত্রদের পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয় (হোসেন, ২০১৯)।
নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে এসে দেখা যায়, বাংলা চলচ্চিত্র এখন আর একঘেয়ে রোমান্টিক বা মারপিটের গল্পে আটকে নেই। এতে স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, লোকগাথা, পারিবারিক জটিলতা, নারীর অধিকার ও গ্রামীণ জীবন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হুমায়ূন আহমেদের গল্প বলা সহজ, সরল ও প্রাণবন্ত হওয়ার কারণে সাধারণ দর্শকও সিনেমার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত হতে শিখেছে। নব্বইয়ের দশক তাই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘গল্পের বৈচিত্র্যের দশক’ নামে স্মরণীয় হয়ে আছে।
২০০০–২০০৯ : সংকট ও লোকজ পুনর্জাগরণ
২০০০ সালের শুরুর দিক থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সময়টি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘অন্ধকার যুগ’ নামে পরিচিত। কেননা এই সময়ে উল্লেখযোগ্য মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি। যা কিছু নির্মিত হয়েছে, তার গুণগত মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। সিনেমা জগতে এক ধরনের অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল। নির্মাতারা সৃজনশীলতার বদলে সহজ পথ বেছে নেন। আর এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় দর্শকের। সেই সময় অশ্লীলতা ও নিম্নমানের সংলাপ সিনেমা হল জুড়ে ছেয়ে যায়। ফলে দর্শক ধীরে ধীরে সিনেমা হলমুখী হওয়া ছেড়ে দেয়। পরিবারের সঙ্গে গিয়ে সিনেমা দেখার মতো অবস্থা ছিল না বললেই চলে (কাদের, ২০২১)।
তবে এই সংকটের ভেতরেও কিছু ব্যতিক্রমী নির্মাতা মাত্র কয়েকটি চলচ্চিত্র তৈরি করে আশার আলো দেখান। তারা লোকজ সংস্কৃতি, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক মূল্যবোধকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন। মোরশেদুল ইসলামের দুখাই ও লালসালু দুটি অসাধারণ নির্মাণ। লালসালু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বিখ্যাত উপন্যাসের সফল রূপায়ণ, যা ধর্মের নামে কুসংস্কার ও শোষণের চিত্র এঁকেছে। আখতারুজ্জামানের পোকামাকড়ের ঘরবসতি ক্ষুদ্র পোকামাকড়ের রূপকথার মাধ্যমে বৃহৎ সামাজিক বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে।
২০০২ সালে তারেক মাসুদের মাটির ময়না আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এটি কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে পুরস্কার অর্জন করে। উপমহাদেশের ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতের পটভূমিতে এক শিশুর গল্প এখানে বলা হয়েছে। ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবে সমাদৃত এই ছবিটি প্রমাণ করে দেয়, গুণগত মান থাকলে সারা দুনিয়ার দর্শকই ভালো সিনেমা গ্রহণ করে।
২০০৪ সালে তানভীর মোকাম্মেলের লালন ফকির লালন শাহের জীবন ও দর্শনকে অসাধারণ নান্দনিকতায় ফুটিয়ে তোলে। একই বছর নির্মিত হয় খায়রুন সুন্দরী। এছাড়া চাষী নজরুল ইসলামের হাসন রাজা বাউল সম্রাট হাসন রাজার গান ও দর্শনকে গুরুত্ব দিয়ে নির্মিত। ২০০৭ সালে নির্মিত হয় রঙ্গিন রসের বাইদানী, রাঙা বাইদানী, জমেলা সুন্দরী, এসব চলচ্চিত্র লোকগাথা ও আঞ্চলিক কাহিনিকে পুঁজি করে দর্শকের মন জয় করে। এসব ছবিতে গ্রামবাংলার প্রকৃতি, মানুষের সরলতা ও বেদনা ফুটে ওঠে।
২০০৮ সালে কাজী মোরশেদের ঘানি নির্মিত হয়। এটি একটি কৃষক বধূ ও তার পরিবারের গল্প। তেলের ঘানির চাকায় পিষ্ট মানুষের জীবনযন্ত্রণা এখানে শৈল্পিক রূপ পায়। সামাজিক বাস্তবতাকে কখনও কখনও কঠিন, কখনও কোমল হাতে উপস্থাপন করা হয়েছে এই ছবিতে। এসব চলচ্চিত্র নির্মাণ-কুশলতা, ক্যামেরার ব্যবহার, সংলাপ ও অভিনয় সব ক্ষেত্রেই বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।
২০০০-২০০৯ দশকটি যদি সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করা যায়, তবে দেখা যাবে, বেশির ভাগ সময় ছিল নির্মাণহীন। তাই তো দর্শক সিনেমা হলের বদলে টেলিভিশন নাটক বা বিদেশি সিনেমার দিকে ঝুঁকেছিল। তবে আশার কথা, কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রমী নির্মাতা প্রমাণ করেন, কঠিন সময়েও সৃজনশীলতা ও লোকজ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ সম্ভব। মাটির ময়না, লালন, হাসন রাজা, ঘানি প্রভৃতি চলচ্চিত্র প্রমাণ করেছে যে এই অন্ধকার যুগেও ‘শিল্পের দীপক’ নিভিয়ে দেয়নি কেউ। আর এই দশকের শেষেই ধীরে ধীরে ঠাঁই নিতে শুরু করে নতুন এক সম্ভাবনা, যা পরবর্তী দশকে পূর্ণতা পায়।
২০১০–২০২২ : পুনরুত্থান ও আন্তর্জাতিক সাফল্য
২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবারও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে। প্রায় এক দশকের সংকট ও স্থবিরতা কাটিয়ে নির্মাতারা নতুন উদ্যমে ছবি বানাতে থাকেন। দর্শকও ধীরে ধীরে হলমুখী হয়। এই সময়ের শুরুতে মনের মাঝে তুমি ও মনপুরা (২০০৯) সাফল্যের ইঙ্গিত দেয়। তবে পুরো দশক জুড়ে নানা ধারার চলচ্চিত্র দর্শক নজর কাড়ে।
হুমায়ূন আহমেদের ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া সর্বশেষ চলচ্চিত্র ঘেঁটুপুত্র কমলা রূপকথার গল্পের আধুনিক রূপায়ণ হিসেবে প্রশংসিত হয়। এটি হুমায়ূন আহমেদের অনন্য প্রতিভার শেষ নিদর্শন। ২০১৪ সালে অগ্নি, ২০১৬ সালে আয়নাবাজি ও শিকারি ব্যবসাসফল হয়। বিশেষ করে আয়নাবাজি গোয়েন্দা কাহিনি ও প্রযোজনা মূল্যে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ২০১৭ সালে ঢাকা অ্যাটাক ও নবাব অ্যাকশনধর্মী সিনেমা হিসেবে দারুণ সাড়া ফেলে। এই ছবিগুলো প্রমাণ করে যে বাজেট ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে বাংলাদেশের সিনেমাও আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে (রহমান, ২০১৮)।
একই বছর ডুব (২০১৭) নির্মিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক দম্পতির সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে গভীর ও পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। ২০১৮ সালে পোড়ামন-২, দেবী ও স্বপ্নজাল মুক্তি পায়। দেবী হুমায়ূন আহমেদের রচিত থ্রিলার উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ, যা দর্শক ও সমালোচক উভয়ের কাছেই সমাদৃত হয়। স্বপ্নজাল নারী স্বাধীনতা ও ব্যক্তিজীবনের অধিকার নিয়ে সাহসী বক্তব্য দেয়।
২০১৯ সালটি ছিল বৈচিত্র্যের বছর। এ বছর মুক্তি পায় ফাগুন হাওয়ায় (মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে প্রেমের কাহিনি), যদি একদিন (পারিবারিক টানাপোড়া), আবার বসন্ত (উপমহাদেশীয় ক্ল্যাসিক প্রেমের আধুনিক রূপ), পাসওয়ার্ড (টেকনোলজি ও নিরাপত্তা নিয়ে রোমহর্ষক কাহিনি), সাপলুডু (গ্রামীণ কুসংস্কার ও অলৌকিকতার গল্প), ইতি তোমারই ঢাকা (বিভিন্ন নির্মাতার সংক্ষিপ্ত কাহিনির সংকলন), ন ডরাই (মুক্তিযুদ্ধের অদেখা এক অধ্যায়), ইন্দুবালা, গহীনের গান, মায়া- দ্য লস্ট মাদার। এছাড়া নাসিরুদ্দিন ইউসুফের আলফা ও রুবাইয়াত হোসেনের পরিচালিত মেড ইন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রশংসিত হয় (ইসলাম, ২০২০)।
২০২০ ও ২০২১ সাল ছিল করোনা মহামারির কারণে চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য অত্যন্ত কঠিন। সিনেমা হল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ব্যবসা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। কেবল আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের রেহানা মরিয়ম নূর অল্প পরিসরে মুক্তি পেলেও তেমন বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি। তবে নির্মাতারা এই সময়ে নতুন প্রকল্পের প্রস্তুতি নেন এবং অনেকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ছবি মুক্তির পথ খুঁজে বের করেন (কাদের, ২০২১)।
২০২২ সালে বাংলা চলচ্চিত্র ফিরে আসে দারুণ উল্লাস নিয়ে। একের পর এক সিনেমা হলভর্তি দর্শক টানে। বিশেষ করে রায়হান রাফির পরিচালিত পরাণ ও মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত হাওয়া দারুণ দর্শকনন্দিত ও ব্যবসাসফল হয়। পরাণ গ্রামীণ প্রেমের ক্ল্যাসিক কাহিনিকে যুগোপযোগী আঙ্গিকে উপস্থাপন করে। আর হাওয়া (২০২২) একটি নৌকা ও সেখানকার মানুষদের অলৌকিক ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত, যা নান্দনিকতা, কাহিনি ও অভিনয়ে অসাধারণ প্রশংসা কুড়ায়। এই ছবি প্রমাণ করে, গল্প ভালো থাকলে দর্শক সিনেমা হলে ফিরে আসে (কাদের, ২০২১)।
২০১০-২০২২ সময়টি তাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘পুনরুত্থানের যুগ।’ সংকট কাটিয়ে নতুন নির্মাতা, নতুন গল্প, নতুন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক উৎসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই শিল্প আবারও মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান ও তরুণ দর্শকের আগ্রহ বাংলা সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। আর এই পথচলা পরবর্তী বছরগুলোতে আরও সুদৃঢ় হয়।
২০২৩–২০২৫ : নতুন প্রজন্ম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অভূতপূর্ব গতিশীলতা দেখা যায়। এই সময়টিকে বলা যেতে পারে ‘নতুন প্রজন্মের উত্থানের যুগ।‘ পূর্ববর্তী দশকের নির্মাতাদের ধারাবাহিকতায় এখন যোগ দিয়েছেন তরুণ, উদীয়মান ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতারা। তারা স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে সারা বিশ্বে আলোচিত হন।
এই সময়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের উপস্থিতি। মাহাদী হাসানের স্যান্ড সিটি বিশ্বের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘লা ফেব্রিক’ বিভাগে নির্বাচিত হয়। এটি তরুণ একটি মরু শহরে নির্মিত নৈরাশ্য ও স্বপ্নের গল্প। ছবিটি নির্মাণশৈলী, বিষয়বস্তু ও প্রযোজনায় বাংলাদেশের সিনেমাকে বৈশ্বিক মানের আসনে বসিয়ে দেয়। তরুণ নারী নির্মাতাদের মধ্যে তাসমিয়াহ আফরিন ও সেজুতি টুসি একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন। তাদের কাজে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি, কামুকতা, স্বাধীনতা ও সংবেদনশীলতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
এ সময় মুক্তি পাওয়া নির্বাচন, উত্তরণ, শহর থেকে দূরে প্রভৃতি চলচ্চিত্র দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। নির্বাচন বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের গল্প বলে। উত্তরণ একজন নারী ডাক্তারের সংগ্রামের কাহিনি। শহর থেকে দূরে নগরের কৃত্রিমতা ও গ্রামের নির্মলতার পার্থক্য তুলে ধরে। এই ছবিগুলো প্রমাণ করে যে সঠিক চিত্রনাট্য ও নান্দনিকতা থাকলে ছোট বাজেটের সিনেমাও বড় সাফল্য পেতে পারে।
প্রযুক্তির উন্নয়ন এই সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। অডিও-ভিজুয়াল মান বহুগুণ বেড়ে যায়। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার চরম আকার ধারণ করে। ড্রোন শট, ভিএফএক্স, কালার গ্রেডিং, সবকিছুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। প্রেক্ষাগৃহগুলোয় আধুনিক প্রজেক্টর, ডলবি সাউন্ড ও আরামদায়ক আসন বসানো হয়। এসব দর্শক অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
২০২৩-২৫ সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান। চরকি, বিঞ্জ, হইচই প্রভৃতি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। মহামারির সময় হল বন্ধ থাকায় নির্মাতারা ওটিটিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এখন অনেক ছবি সিনেমা হলের পাশাপাশি ওটিটিতে মুক্তি পাচ্ছে। ফলে দর্শক ঘরে বসেই মানসম্পন্ন সিনেমা দেখতে পাচ্ছেন। এতে শিল্পের আর্থিক ভিত্তিও মজবুত হচ্ছে।
গল্প বলার ক্ষেত্রেও এ সময় বৈচিত্র্য এসেছে। চাষী নজরুল ইসলাম, আলমগীর কবির, আমজাদ হোসেন, হুমায়ূন আহমেদের ধারাবাহিকতায় নতুন নির্মাতারা সমাজ, মুক্তিযুদ্ধ, নারী ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ জীবন নিয়ে গভীর অনুভবে ছবি নির্মাণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকে এখন আর কেবল বীরত্বগাথা আকারে না দেখিয়ে যুদ্ধের মানসিক ক্ষত, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও দেশভাগের গল্পও বলা হচ্ছে। নারীরা এখন পর্দায় শক্তিশালী ও স্বাধীন চরিত্রে দেখা দিচ্ছেন, যা আগে ছিল খুবই কম।
এর পেছনে শিক্ষার ভূমিকাও কম নয়। বাংলাদেশের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম বিভাগ থেকে শিক্ষিত তরুণরা পেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাণে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। তারা শুধু দেশেই নয়, বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরছেন। তাদের প্রয়োগিক জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাংলাদেশের সিনেমাকে আরও দূরবর্তী উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবারও একসময়ের মতো স্বর্ণযুগে ফিরে যাওয়ার শক্ত সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এ সম্ভাবনাকে স্থায়ী রূপ দিতে আরও বিনিয়োগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি। তবু আশার কথা, এই তিন বছরের অগ্রগতি প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।
উপসংহার
মূলত বাংলা চলচ্চিত্রের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বাংলা সিনেমা ছিল আন্তর্জাতিক মানের। এরপর অন্ধকার যুগে নব্বই দশক থেকে শুরু করে কয়েক বছর আগ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রে মন্দাভাব গেলেও, সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে এ শিল্প আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নির্মিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা, দেশে বিদেশে পাচ্ছে ব্যাপক প্রশংসা। আমাদের দেশে এখন এমন অনেক উদীয়মান চলচ্চিত্র নির্মাতা আছেন, যারা নিজেদের কাজ দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যাচ্ছেন। মাহাদী হাসানের ছবি স্যান্ড সিটি কানের লা ফেব্রিকে গিয়েছে। তরুণ নারী নির্মাতাদের মধ্যে তাসমিয়াহ আফরিন, সেজুতি টুসিদের কাজে শৈল্পিক রুচির ছাপ দেখা যায়। এই পথচলা অব্যাহত থাকলে আমাদেরও নিয়মিত ভালো ছবি হবে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম স্কুল হচ্ছে, সেখানে ফিল্ম ক্লাব, গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। তারা চলচ্চিত্রের চর্চা করছেন। দল বেঁধে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানাচ্ছে। ক্যামেরা না থাকলে মোবাইলেই বানাচ্ছে। নিয়মিত বিদেশে ছবি যাচ্ছে। পুরস্কারও নিয়ে আসছেন। তবে বর্তমান বাংলা সিনেমাগুলো যেভাবে দর্শক নন্দিত হচ্ছে তাতে বাংলা সিনেমার সুদিন খুব বেশি দূরে নয়। সংকট কেটে যাবে। তা আর বেশি দূরে নয়।
তথ্যসূত্র :
১. হোসেন, এম. (২০১৯)। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস: ১৯৭১-২০১৮ (২য় সংস্করণ)। বাংলা একাডেমি।
২. কাদের, এ. (২০২১)। নব্বই দশক থেকে বর্তমান: বাংলাদেশি সিনেমার রূপান্তর। চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি, ৮(১), ২৩-৪৫।
৩. রহমান, জেড. (২০১৮)। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। জয় প্রকাশনী।
৪. ইসলাম, এস. (২০২০)। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা চলচ্চিত্র: ধারা ও পরিবর্তন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র গবেষণা জার্নাল, ১৫(২), ৪৫-৬৮।
