অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জুন ২০, ২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রওশন রুবী -
‘নাটক আত্মপরিচয় ও সমাজচেতনার ভাষা’

‘নাটক আত্মপরিচয় ও সমাজচেতনার ভাষা’

রওশন রুবী

 

নাটক কোন দৃষ্টি নকল করে না, সে নিজেই চোখ খুলে দেয়। তার প্রতিটি দৃশ্য, যেমন সমাজের আত্মার এক টুকরো প্রতিবিম্ব, তেমনি নাটক এক আলোর সংলাপ। যা নেমে যায় শব্দহীন, যেখানে দীর্ঘদিন সূর্য পড়েনি। সে খনন করে অতীতের হাড়গোড়। সে শুধু দেখায় না, শোনায়— কে কবে চিৎকার করেছে নীরবে। নাটক ইতিহাসকে রক্ত-মাংসের মানুষে রূপ দেয়, চাপা পড়া যন্ত্রণাকে উন্মোচন করে। নাটক যখন মঞ্চে ওঠে, তখন কেবল চরিত্রে  সীমাবদ্ধ থাকে না, জাতির চেতনা হেঁটে চলে আলো—আঁধারীর ভিতর দিয়ে। যেখানে সময় থেমে থাকে, চরিত্ররা হয়ে ওঠে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একটি সমাজ তার দুঃখ, প্রেম, সংগ্রাম—সবকিছুই নাটকে লিখে রাখে নীরব ভাষায়। জার্মান নাট্যকার, কবি ও নির্দেশক বার্টোল্ট ব্রেখ্‌ত মনে করতেন, ‘নাটক কেবল বিনোদন নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।’ নাটক নিয়ে তাঁর আরও একটি উল্লেখযোগ্য দর্শন হলো, ‘নাটক হলো একটি সমাজ ও মতাদর্শেগত মাধ্যম, যা সমাজকে আয়নার মতো দেখাবে।’ আর এই প্রেক্ষিতে বলা যায়— নাটক সমাজের আয়না, আর আয়নাই সত্যের ভেতরে আলোর রেখা দেখায়। তাই তো নাটকের মঞ্চ মানে কেবল সংলাপের ক্ষেত্র না— চোখ, মুখ, দেহও সেখানে কথা বলে। একটি স্পর্শ, একটুখানি বিরতি, কিংবা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকাও হয়ে ওঠে অর্থের প্রতীক। নাটক শেখায়—মানুষ না, মানবতাও একটি নাট্য—অভিজ্ঞতা। রাজার পতন, কৃষকের কান্না, বিপ্লবীর ভাষণ—সব একাকার হয়ে যায় এই শিল্পমাধ্যমে। বাস্তবতার চেয়েও বেশি সত্য, খোঁজা হয় কল্পনার গভীরে গিয়ে। সংলাপ ও অভিনয়ের মাধ্যমে মঞ্চে বাস্তব জীবনের প্রতিফলন ঘটে, যা দর্শকদের সরাসরি প্রভাবিত করে।
নাট্যচার্য সেলিম আল দীন বাংলা নাটককে ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে নিজস্ব সংস্কৃতি ও দেশজ ধারায় প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ। তিনি নাটককে ‘বর্ণনাত্মক রীতি’ বা ‘কথানাট্য’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে বলেন, ‘আমার সংলাপরীতিকে আমি চরিত্রের উল্লাস ও বেদনাপ্রবাহের সঙ্গে একীভূত করতে চাই।’ তাঁর মতে, ‘নাটক গীতলতা নয়, বরং জীবনের নিগূঢ় প্রবাহ।’ তিনি আরও বলেন, ‘জীবনের প্রান্তিক মানুষ ও তাদের বেদনা তাঁর নাটকের মূল উপজীব্য, যা বাংলা নাটকের নিজস্ব নান্দনিকতা তৈরি করেছে।’ সত্যিকার অর্থে নাটক হলো চিন্তার আন্দোলিত রূপ। যা দর্শকের হৃদয়ে কাঁপন তোলে। নাট্যকলা বাংলায় শুধু বিনোদন এমন নয়, বরং সংঘাত ও সহমর্মিতার চর্চাও। নাটক দেখিয়ে দেয়—ভাষা ছাড়াও মানুষ কাঁদতে পারে, ভালোবাসতেও শেখে। একজন অভিনেতার শরীরের মধ্য দিয়ে একটি জাতির ইতিহাস বয়ে চলে, অকুতভয়ে। নাটকই পারে—রাজনীতি, প্রেম, দুঃখ, বিদ্রোহকে একই পর্দায় আনতে। স্মৃতিহীন সমাজের জন্য নাটক— এক অন্তরাল প্রবেশ, এক আত্মজিজ্ঞাসার দরজা। আমাদের ভাষা, পোশাক, কান্না—সবকিছু নাটকে হয়ে ওঠে নথিভুক্ত চিহ্ন। তাই নাটক শুধু মঞ্চে নয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির গভীরেও বাস করে। উইলিয়াম শেকসপিয়র তাঁর ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ নাটকে—পৃথিবীকে একটি রঙ্গমঞ্চ এবং মানুষকে অভিনেতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছে নাটক ছিল মানুষের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে হাসিকান্না এবং ট্র্যাজেডির মাধ্যমে জীবনের গভীর সত্যগুলো ফুটে ওঠে।
নাটক যখন শুধুই বিনোদন নয়, তখন সে হয়ে ওঠে সময়ের ভাষ্যকার। বাংলার মঞ্চনাটক তেমনি এক শিল্পমাধ্যম, যার মাধ্যমে সমাজ নিজেকে বুঝতে, প্রশ্ন করতে এবং রূপান্তরিত হতে শিখেছে। ব্যক্তির যন্ত্রণাও যেমন নাটকে উঠে এসেছে, তেমনি রাষ্ট্রের নিষ্পেষণও পেয়েছে কণ্ঠস্বর। ভাষা, আন্দোলন, দুঃখ, প্রেম ও প্রতিবাদ—সবকিছুর সীমানা ছুঁয়ে বাংলা নাট্যচর্চার ভিত্তি রচিত হয়েছে এক বিশাল ইতিহাসের মাটিতে। আর সেই ইতিহাসের পাতা খুললেই আমরা ফিরে যাই—নীলকরদের বিরুদ্ধে কলম ধরা দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলর্পণ’ কিংবা বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানে নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের প্রেরণাময় মঞ্চে। যখন নাটক হয়ে ওঠে ইতিহাসের ভাষ্যকার, সমাজচেনার শব্দহীন প্রতিধ্বনি। মূলত নাটক কথায় গড়ে তোলে ইতেহাস, আর অনুবাদ করে নীরবে সমাজের আত্মপ্রকাশ।
এই সূত্র ধরে বাংলা নাটকের ইতিহাসে যাত্রা শুরু করা যায়। যেখানে শব্দের চেয়ে বেশি কথা বলে নীরবতা, আর অন্ধকারেই জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের আলো। এই নাট্যচেতনার বীজ কোথা থেকে অঙ্কুরিত, তা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে বাংলা নাটকের ইতিহাসে। ইতিহাসের মঞ্চে চেতনার উন্মেষ বাংলা মঞ্চনাটকের ইতিহাস—শিল্পচর্চার ইতিহাস পাশাপাশি এক জাতির আত্মবিকাশ ও সাংস্কৃতিক জাগরণের দীর্ঘ, দৃপ্ত পদচিহ্ন। এই ইতিহাসে যেমন আছে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষা, তেমনি আছে আত্মপরিচয়ের সন্ধান, সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং মুক্তির গোপন স্বপ্ন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি বাংলা ভাষায় মঞ্চনাটকের যে সূচনা, তার বীজ রোপিত হয়েছিল গভীর সামাজিক-রাজনৈতিক আলোড়নের মধ্যে। দীনবন্ধু মিত্র রচিত ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) ছিল সেই বীজের প্রথম অঙ্কুর। এটি ছিল এক কৃষকসমাজের নীলকররে শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া প্রতিবাদী ভাষা। এই নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যা নাট্যচেতনার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। আর নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করার কারণে রেভারেন্ড জেমস লং কারাবরণ করেন। আধুনিক বাংলা নাটকের প্রকৃত বিপ্লব শুরু হয়েছিল ‘নীলদর্পণ’ থেকেই।
হিরণ্ময় বন্দোপাধ্যায়, বাংলা নাট্যচেতনার ইতিবৃত্ত এই বিপ্লবের পথ ধরে বাংলা নাট্যচর্চায় সবচেয়ে দীপ্তিমান যে নামটি উঠে আসে, তিনি গিরিশচন্দ্র ঘোষ। যিনি ছিলেন—নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা। তাঁর হাত ধরে বাংলা মঞ্চনাটক পায় গঠন, ভাষা এবং দর্শন। তিনি কেবল মঞ্চে দৃশ্যপট নির্মাণ করেননি, গড়ে তুলেছেন একটি বাঙালি চেতনার নাট্যমঞ্চ। তাঁর লেখা— প্রফুল্ল, বলিদান, বিল্বমঙ্গল, রাবণবদ, পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস, হারানিধি, সীতারবনবাস প্রভৃতি নাটক—পৌরাণিক কিংবা ঐতিহাসিক হলেও তাতে ছিল জীবনের, সমাজের, বিশ্বাস ও আত্মানুশীলনের গভীর প্রতিচ্ছবি। বলা আছে—‘গিরিশ মানেই নাটক, নাটক মানেই গিরিশ।’ গিরিশচন্দ্র ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, যিনি মঞ্চকে কেবল বিনোদনের জায়গা ভাবেননি, তাকেই করেছেন সমাজের আয়না, সময়ের বিবেক। তাঁর দেহভাষা, সংলাপপ্রক্ষেপণ, চরিত্র নির্মাণ—সব মিলিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এমন এক নাট্যভাষা, যা কালকে স্পর্শ করেও চিরকালীন। গিরিশচন্দ্র ঘোষ বাংলা থিয়েটারের প্রাণ; তাঁর নাট্যকর্ম রসায়ন ছাড়িয়ে অন্তর্দীক্ষা ও সাধনার। এরপর মঞ্চনাটক ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে নাগরিক সমাজের আত্মপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। সমাজসংস্কার, নারীশিক্ষা, ব্রাহ্ম আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের প্রভাব নাটকের বিষয়বস্তুতে গভীর ছাপ ফেলে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা নাটসাহিত্যে একটি বিপ্লব এনেছিলেন, বিশেষ করে ছন্দ ও রূপকের বিপ্লব, যার প্রমাণ ‘শর্মিষ্ঠা’—বাংলার প্রথম ট্র‍্যাজেডি, যা গ্রিক নাট্যরীতির অনুরণনে নির্মিত। এরই মধ্যে বাংলা নাট্যে উদিত হয়েছিল এক মহীরুহ নাট্যপ্রতিভার। যার ছায়া ছুঁয়ে যায় যুগের হৃদয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাট্যজগৎ ছিল সরল কাহিনি, স্বপ্ন, দর্শন ও প্রতিরোধের কাব্যিক রূপান্তর। ‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’, ‘অচলায়তন’—প্রতিটি নাটকে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন সমাজ, ঈশ্বর এবং মানবিক মুক্তি নিয়ে। সভ্যতার সংকট ‘রক্তকরবী’-তে নন্দিনী কেবল এক প্রেমিকা নন, তিনি হচ্ছেন প্রতিরোধ ও সম্ভাবনার প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটকে প্রতীকবাদের এক ব্যতিক্রমী ভাষা নির্মাণ করেন, যা আত্মবিশ্বাস, মুক্তি ও শিল্পবোধের সমবায়ে সমৃদ্ধ।
এই ধারায় নাট্যজগৎকে আলোকিত করেন আরও অনেকে—মন্ময় রায়, অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, অমৃতলাল বসু প্রমুখ, যাঁরা নাটকে এনেছেন নাগরিক টানাপোড়েন, শ্রেণিবৈষম্য, ও উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের শুরু পর্যন্ত বাংলা মঞ্চনাটক হয়ে ওঠে সমাজের অন্তর আয়না, জাতীয় চেতনার বাহক এবং শিল্প ও চিন্তার এক সমান্তরাল নদী। বাংলা মঞ্চনাটক জন্ম নেয় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আর বড় হয় আত্মসন্ধান ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে। তবে নাটক এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সময়ের সাথে সাথে তার ভাষা, রূপ, দায়বদ্ধতা ও দর্শক পাল্টে যায়। আর এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলা নাটকে নিয়ে আসে এক ঐতিহাসিক মোড়।
মঞ্চ তখন আর চরিত্র উপস্থাপনের জায়গাই থাকে না হয়ে ওঠে একটি জাতির রক্তাক্ত স্মৃতি, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও নৈতিক দায়বদ্ধতার মঞ্চ। নাটকে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, বুদ্ধিজীবী নিধন, শরণার্থী যন্ত্রণা এবং স্বাধীনতার আদর্শ। নাটক সময়কে এবং সময়ের ভিতরে অন্তর্জাগতিক মেটাফোর। যা প্রশ্ন তোলে, উত্তর ভাবায়, উত্তর দেয়, আলো আনে, মানুষ জাগায়। এ সময়ে জন্ম নেয় নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, বহুবচন, আরণ্যক—যারা নাটককে গণজাগরণের মাধ্যম হিসেবে রূপায়ণ করে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে নাটক হয়ে ওঠে শিল্পচর্চারও বাইরে একজন মুক্ত মানুষের কণ্ঠস্বর, বিপন্ন আত্মার চিৎকার।
১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের জাগরণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি, জাগিয়ে তোলে নতুন সাংস্কৃতিক ও আত্মিক চেতনা। যার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে ছিল নাট্যশিল্প। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নাট্যচর্চা হয়ে ওঠে বিনোনের মাধ্যম ছাড়াও সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের গভীর সংকটচেতনার এক প্রতিরোধী ভাষা। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং রাষ্ট্র নির্মাণ—পরবর্তী অনিশ্চয়তা নাট্যকর্মীদের ভাবনায় প্রবলভাবে প্রভাব ফেলে। তাঁদের কাছে নাটক হয়ে ওঠে গণবলার একটি শক্তিশালী উপায়। যেখানে ব্যক্তি আর সমাজ একে অপরের প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে। এই পর্বে গড়ে ওঠে এমন কিছু নাট্যসংগঠন, যাদের হাত ধরে মঞ্চে আসে নতুন ভাষা, রূপক, আঙ্গিক এবং মননের আন্দোলন। নাগরিক নাট্যসম্প্রায় ১৯৭২ সালে আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত নাগরিক নাট্য সম্প্রাদায় প্রেম, পারিবারিক জটিলতা, একাকিত্ব এবং আধুনিক শহুরে মানসিকতার বিবর্তন, নাগরিক জীবনের টানাপোড়েন, মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্ব এবং আত্মপরিচয়ের অন্বেষাকে নাটকের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। গদ্যের স্পষ্টতা, সংলাপের গভীরতা এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নাট্যরূপে উপস্থাপন করে তারা নতুন ধারা নির্মাণ করে।
সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাটক ‘বহুবচন’, যারা নাটকে ভাষার অন্তর্জাগতিক শক্তিকে ধারণ করে। তারা নাট্যকে চিন্তার ক্ষেত্র এবং ভাষার দর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে। বহুবচনের নাটকগুলোতে থাকে গদ্যনাট্যের বহুরৈখিকতা, কথনভঙ্গির বুনন, কবিতার ছোঁয়া, এবং অলৌকিকতার সঙ্গে বাস্তবতার মিশ্রণ। বহুবচন নাট্যদল সেলিম আল দীনের ‘সর্পবিষয়ক গল্প’সহ ‘প্রজাপতির লীলাস্য’, ‘সভাপতি বললেন’ ও ‘আমি রাজা হব না’ নাটকগুলো মঞ্চস্থ করে। এই দলের মাধ্যমে নাটক হয়ে ওঠে দর্শকের চেতনাজগতে আলোড়ন তোলার অভিনব উপায়। ১৯৭২ সালে শেষের দিকে বা ১৯৭৩ সালের শুরুতে  মামুনুর রশীদ ‘আরণ্যক নাট্যদল’ প্রতিষ্ঠা করেন। অরণ্যক নাট্যদল মুনির চৌধুরী রচিত ‘কবর’ নাটক মঞ্চায়ন করে। তাদের নাটক ‘রাঢ়াঙ’- এ
গরিব-গ্রামীণ মানুষের যাপন, ভূমি ও শ্রমের অধিকার, জাতিসত্তার সংগ্রাম ও শ্রেণিসচেতনতাকে শিল্পভাষায় রূপ দেওয়া হয়। আরণ্যকের বিশেষত্ব ছিল পথনাট্যধর্মী, জনসংলগ্নতা, লোকরীতিনির্ভর ভাষা এবং সরল অথচ ব্যঞ্জনাময় নির্মাণশৈলী।
নাট্যশৈলীর বিবর্তন ও মঞ্চভাষার রূপান্তরে ৭০’র দশকের পরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সাক্ষর দেখা যায়। এ সময় বাংলা নাটকে লক্ষ করা যায় ব্রেখ্তির ‘দূরত্ব রচনা’ কৌশল, কোরাস ও সংগীতের নাট্য—আঙ্গিক, ভিজ্যুয়াল চমক, এবং ট্যাবলোভিত্তিক উপস্থাপন। যা দর্শকের মধ্যে ভাবানুভূতির পরিবর্তে বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। নাটক গল্প ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে একটি মঞ্চ অভিজ্ঞতা। নাট্যকার এবং নির্দেশকরা চেয়েছেন দর্শককে শুধু কাঁদাবেন না, ভাবিয়ে তুলবেন, এবং তাকে নিজেকে কেন্দ্র করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার জায়গায় দাঁড় করাবেন। সেলিম আল দীন এই ধারা আরও স্পষ্ট করে বলেন— ‘নাটক কেন কবিতার গভীরতা অর্জন করতে পারে না? তাঁর ‘হাত হাই’, ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ নাটকগুলোতে ভাষা, স্থানে স্থানে লোকরীতির ব্যবহার এবং ইতিহাসকে মঞ্চে নান্দনিকভাবে মেলানো হয়। তাঁর নাটক একটি লোকজদর্শন, একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। বিখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা উৎপল দত্ত তাঁর নাট্যচিন্তা ও দর্শনের মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্ব এবং নাটক সম্পর্কেও গভীর ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করতেন, ‘নাট্যকলার অস্তিত্ব মানুষের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি জরুরি, কারণ তা মানুষকে তার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়।’
১৯৭৩ সালে ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর পর থেকেই তাদের কার্যক্রম ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে। ২০০২ সাল থেকে বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ নিয়মিত জাতীয় পর্যায়ে পথনাটক উৎসব আয়োজন করে আসছে। তবে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে খণ্ডকালীন বা বিশেষ উপলক্ষে পথনাটকের উল্লেখযোগ্য আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই সংগঠন পথনাটক আন্দোলনকে বেগবান করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিয়মিত নাট্যোৎসব আয়োজনের মাধ্যমে নাট্যচর্চাকে এগিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নাট্যচর্চা ও নাট্যমঞ্চায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় কেন্দ্র থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে নতুন নতুন নাট্যদল, এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক থিয়েটার আন্দোলনও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে ১৯৭১-পরবর্তী নাট্যচর্চা ছিল আত্মসন্ধান, প্রতিবাদ, ভাষার বিস্তার এবং মানবিকতার আরেক রূপ। এখানে নাটক একটি চরিত্র ছাড়িয়ে একটি অবস্থান, একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অভিমুখ হয়ে ওঠে। নাট্যজনেরা শুধু দৃশ্য রচনা করেননি, গড়েছেন দর্শকের হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা প্রশ্ন—ভাষা। এ ভাষা কখনও সংলাপে, কখনও নীরবতায়, কখনও দেহভঙ্গিমায় আমাদের সমাজ, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ভবিষ্যৎকে পুনরায় নির্মাণ করে। মঞ্চের আলো যখন শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামান্তরে পৌঁছাতে পারছিল না, তখন সেই আলোই র্পদা হয়ে প্রবেশ করল ঘরের ভেতরে। যুদ্ধোত্তর চেতনার স্পর্শে বাংলা নাটক একদিকে হলো মঞ্চে প্রতিরোধের গান, অন্যদিকে টেলিভিশনের র্পদায় হয়ে উঠল মধ্যবিত্ত জীবনের আয়না। দুই ধারায়ই ভাষা বদলাল, দৃশ্য বদলাল, কিন্তু নাটক থেকে গেল হৃয়ের দৃশ্যপট। তখন থেকে বাংলাদেশের নাট্যচর্চা শুধু মঞ্চকেন্দ্রিক ছিল না। সমান্তরালে গড়ে ওঠে নতুন মাধ্যম, যা নাটকের আলোকছায়া পৌঁছে দেয় ঘরের প্রতিটি কোণে। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) হয়ে ওঠে নতুন যুগের ‘আলো ও শব্দের নাট্যশালা।’ যেখানে বাস্তবতা, প্রেম, প্রতিবাদ ও বিরহ ফুটে ওঠে ছোট পর্দায়। টেলিভিশন নাটক বিনোদনের একটি রূপ থেকে তা হয়ে ওঠে মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন ও দ্বন্দ্বের আয়না। স্টুডিওভিত্তিক উপস্থাপন, সংলাপনির্ভর অভিনয়, সীমিত সেট। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নাট্যকারেরা নির্মাণ করেন সমাজের সূক্ষ্ম সত্যগুলো। বাংলাদেশে নাটকের প্রাণ কখনও বইয়ে লেখা হয়নি, তার জীবন্ত চিত্র পর্দা বা মঞ্চনাট্যে ফুটে উঠেছে অনুভবেবর বর্ণনায়। আর তা ফুটিয়ে তুলেছে নিরলস পরিশ্রমে আব্দুল্লাহ আল মামুন, আলী যাকের, আতাউর রহমান, ফেরদৌসী মজুমদার, আনোয়ার হোসেনসহ প্রমুখ গুণী নাট্যব্যক্তিত্বগণ। তাঁরাই ছিলেন এই সময়ের প্রাণসঞ্চারক। তাঁরা মঞ্চ থেকে ক্যামেরার সামনে এসে নাটকের নতুন ভাষা নির্মাণ করেন।
এই যুগে বিটিভিতে প্রচারিত নাটকগুলো হয়ে ওঠে জাতীয় স্মৃতির অংশ। ‘কোথাও কেউ নেই’ (হুমায়ুন আহমেদ)। চরিত্র ‘বাকের ভাই’ হয়ে ওঠেন সামাজিক প্রতিরোধের এক প্রতীক। ‘আজ রবিবার’—নগরজীবনের মধ্যবিত্তের হাসি, কান্না, রাগ ও প্রেম একসঙ্গে বয়ে আনে। ‘বহুব্রীহি’— রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, জীবনের জটিলতা ও হাস্যরসের চমৎকার সংমিশ্রণ। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘তবুও’, ‘সংশপ্তক’, ‘শুকনো পাতা’—প্রতিটি নাটকই সমাজ, পরিবার, ব্যক্তিমানসের প্রতিচ্ছবি হয়ে আজও স্মরণীয়। টেলিভিশন নাটক নির্মাণ করে এক নতুন বাস্তবতা। দর্শক মঞ্চে না গিয়েও নাটকের ভেতর ঢুকে পড়েন, কাঁদেন, হাসেন এবং সেই গল্প নিজের জীবনের অংশ মনে করেন। ভাষা ও শৈলীর বিবর্তনেও টেলিভিশন নাটকগুলো অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখে। নাটকগুলোর ভাষা ও শৈলী ছিল বাস্তবধর্মী, সংলাপপ্রধান ও দৈনন্দিনতাভিত্তিক। এখানে নাট্যকাররা তুলে এনেছেন—নাগরিক ক্লান্তি, পারিবারিক সম্পর্ক, নারী স্বাধীনতা, প্রেম ও পরিচয়ের জটিলতা। এই নাটকগুলো শুধুই গল্প ছিল না, এগুলো হয়ে উঠেছে আত্মানুসন্ধানের দলিল। সেলিম আল দীন মনে করতেন—‘টিভিতে অহেতুক সরকারি নিয়ন্ত্রণ লেখকদের সত্য প্রকাশে বাধা দেয়। সত্য প্রকাশের সুযোগ থাকলে তা সরকারের প্রতি জনগণের বিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।’
মূলত টেলিভিশন নাটক আমাদের সত্তার নীরব ডায়েরি—যা আমরা নিজেরাও পড়তে ভয় পাই। নারীর আত্মপ্রকাশ ও কাহিনির গভীরতায় টেলিভিশন নাটক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নারী চরিত্রগুলো এখানে পেয়েছে শক্তিশালী ও স্পষ্ট অবস্থান।  দিলারা জামান, শর্মিলী আহমেদ, মঞ্জু, নিনা, রুমানা, শবনম, সুবর্ণা মোস্তফা প্রমুখের অভিনীত চরিত্রগুলোতে দেখা যায়—নারীরা কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নন, তারা আত্মনির্ভর, প্রেমিক, প্রতিবাদী এবং সর্বোপরি মানবিক শক্তির প্রতিরূপ।
১৯৯০-এর দশকে, টেলিভিশন নাটক জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বাস, বাজার, অফিস বা চায়ের দোকানে নাটকের গল্প হয়ে ওঠে আলোচনার অন্যতম বিষয়। একটি সংলাপ বা চরিত্র জনমানসের এমনভাবে প্রবেশ করত, যা অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়েও গভীরভাবে প্রভাব ফেলত। এই আলোকে বলা যায়—টেলিভিশন নাটক আমাদের নিজস্ব পরিচয়ের এক গোপন দরজা খুলে দিয়েছে। যেখানে গল্প ও চরিত্র আমাদের জীবনের ভেতরকার অংশ হয়ে ওঠে।
বাংলার নাট্যচেতনায় মঞ্চনাটক ও টেলিভিশন নাটক পরস্পরকে পুষ্ট করেছে।  মঞ্চের দার্শনিকতা গভীরতা, টেলিভিশনের নাগরিক অভিব্যক্তি—এই দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ নাট্যভুবন। মঞ্চের অভিনেতারা টিভিতে, টিভির অভিনেতারা মঞ্চে—এই পারস্পরিক বিনিময় নাট্যভাষায় সৃষ্টি করেছে নতুন মাত্রা। নাটক তাই একটি মাধ্যম নয়, এটি হয়ে উঠেছে জীবন, প্রতিবাদ ও পরিপ্রেক্ষিতের ভাষা। যেখানে মুখাবয়ব, সংলাপ, দৃশ্য, নীরবতা—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে বাংলাদেশের আত্মার নাট্যমঞ্চ। নাটকই এমন এক আয়না, যেখানে জাতি তার আত্মপরিচয়ের মুখমুখি হয়। নাটক যেমন সামাজিক পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে, তেমনি সমাজকে নতুন করে গড়ারও শক্তিশালী মাধ্যম। বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেকসপিয়র তাঁর হ্যামলেট নাটকে বলেন, থিয়েটারের উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতির কাছে আয়না ধরা; যাতে সততা কাছে তার নিজস্ব রূপ, অপকর্মেও কাছে তার নিজস্ব অবয়ব ও প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা।’
টেলিভিশন নাটকের বিকাশ নাট্যচর্চাকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। একদিকে যেখানে মঞ্চনাটক ছিল জনতার কণ্ঠস্বর, টেলিভিশন নাটক হয়ে ওঠে জনমানসের স্মৃতি, সময়ের নান্দনিক দলিল। এই দুই ধারা মিলেই তৈরি করেছে বাংলাদেশের নাট্য-ইতিহাসের প্রাণস্পন্দন। মঞ্চ থেকে পর্দা—নাটকের পরিসরের প্রসার। ১৯৭১-পরবর্তী বাংলা নাট্যচর্চা যখন সমাজের গভীরে ঢুকে প্রতিবাদ ও আত্মসচেতনতার ভাষা হয়ে উঠছিল, তখনই নাটকের আরেক রূপ প্রবেশ করে মানুষের ঘরে ঘরে—টেলিভিশনের পর্দায়। মঞ্চ নাটক যেখানে চিন্তার আন্দোলন, চেতনার চর্চা ও রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক ছিল; টেলিভিশন নাটক হয়ে উঠল মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন, অসন্তোষ ও সম্পর্কের অন্তর্দ্বন্দ্বের কণ্ঠস্বর। দুই ধারার অভিন্ন সুর—মানুষ, সমাজ ও সময়ের সত্যকে দৃশ্যমান করে। একদিকে পথঘাটের মাটি, অন্যদিকে ঘরের চৌকাঠ—বাংলা নাটক এই দুই পরিসরেই খুঁজে নিল নিজের দর্শক, নিজের প্রতিবিম্ব। বাংলাদেশে রেডিও নাটক থেকে ভিজ্যুয়াল নাটকের দিকে এই যাত্রা ছিল ঐতিহাসিক। বিটিভি-র ‘স্বর্ণযুগে’ প্রচারিত নাটকগুলো যেমন ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘সংশপ্তক’—এগুলি হয়ে ওঠে মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিচ্ছবি এবং জাতির আবেগের ঐক্যবিন্দু। এই সময়কার টেলিভিশন নাটক হয়ে ওঠে ঘরের ভেতর ‘মঞ্চ’, যেখানে দর্শক নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। স্টুডিও-ভিত্তিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, নাটকের ভাষা, সংলাপ, অভিনয় এবং নির্মাণশৈলী ভিন্ন বাস্তবতা নির্মাণ করে। আব্দুল্লাহ আল মামুন, হুমায়ুন আহমে, আতাউর রহমান, আলী যাকের, ফেরদৌসী মজুমার প্রমুখ নাট্যস্রষ্টা ও শিল্পী এই ধারার নেতৃত্ব দেন।
বর্তমান ধারায় বিশ্বায়নের ও ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে নাটক প্রবেশ করেছে নতুন পরিসরে—ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং ওয়েব সিরিজের ভুবনে। এ মাধ্যম তরুণদের কাছে দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়েছে। স্বল্পদৈর্ঘ্যে নির্মিত এই নাটকগুলো প্রেম, মানসিক স্বাস্থ্য, নারী স্বাধীনতা, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়কে আধুনিক আঙ্গিকে তুলে ধরে। তবে এই রূপান্তরের ভেতরেই নাট্যগোষ্ঠীগুলোর সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দর্শকের অবসান, পেশাদারিত্বের অভাব। চটুলতা ও বাণিজ্যিক চাহিদার চাপে নাট্যমান হ্রাস পাচ্ছে। নাটকের প্রাণ রক্ষার জন্য দরকার একসাথে সামাজিক দায়বোধের গভীরতা ও চিন্তার উদ্ভাবনী মিশ্রণ। মঞ্চের ভাষা আর হৃদয় যেন কিছুটা হারিয়ে ফেলছে স্পষ্ট নীতিগত ও দর্শনচিন্তায়। অথচ নাটক হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম, যা শুধুই চিত্তবিনোদনই না সে মূল্যবোধ জাগানোর ‘মনস্তাত্ত্বিক থিয়েটার’।
ইতিহাস থেকে ডিজিটাল নাট্যসংস্কৃতির সংহতি বাংলা নাটকের যাত্রাপথ কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় না, এ  এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। আমরা দেখি দীনবন্ধু মিত্রর ‘নীলর্পণ’ শোষণের বিরুদ্ধে কণ্ঠ। গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাট্যসাধনা সমাজের আয়না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক আত্মর্শনের প্রতীক। সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনা জনগণের ভাষা। নাটক সময়ের প্রতিবিম্বের সাথে সাথে সময়ের গভীরে জন্ম নেওয়া আন্তর্জাগতিক প্রতীক। যা প্রশ্ন তোলে, আলোকিত করে এবং মাটির গভীর স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। আজ যখন ইউটিউব বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নাটকের নতুন ভাষা জন্ম নিচ্ছে, তখন তা গিরিশচন্দ্র, সেলিম আল দীন বা হুমায়ুন আহমেদের চিন্তারই ডিজিটাল প্রতিফলন। মূলসুর একটিই—নাটক মানুষকে চিনতে শেখায়, প্রতিবাদ করতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়। তাই আজকের নাট্যচর্চা যদি সত্যিকারের সৃজনশীলতা অর্জন করতে চায়, তবে তাকে প্রযুক্তিগত, নৈতিক, দার্শনিক এবং সামাজিক গভীরতার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
এ পর্যায়ে বলাই যায়—নাটক বিনোনের মাধ্যম ছাড়াও সময়ের ভাষ্য, সমাজের বিবেক, আর আত্মার আয়না। সেই আয়নায় জাতি যেমন তার ইতিহাস দেখে, তেমনি দেখে ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবিও। যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায়, যেখানে ছিল বধ্যভূমির স্তব্ধতা, শহীদের আত্মত্যাগ, নারীর আর্তনাদ, এবং জাতির পুনর্গঠনের আকুলতা। সেই প্রেক্ষাপটে নাটক হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা, প্রতিবাদের আঙিনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নপট। ১৯৭০-এর দশকে নাটক আর নিছক বিনোদন ছিলনা—এটি হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্র ও সমাজচেতনার প্রতিফলন। নাট্যকারেরা মানুষ ও সময়ের ভেতরকার দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেন সাহসী সংলাপে, প্রতীকী চিত্রে, কিংবা মৌন প্রতিবাদ। নাট্যকলা মঞ্চ বা ক্যামেরা, সংলাপে এটি জাতির আত্মজিজ্ঞাসা ও ভবিষ্যতের মানচিত্র হয়ে ওঠে। বাণিজ্যিকতা ও শিল্পের সমন্বয় যদি সৎভাবে কিছু করা যায়, তবে বাংলাদেশি নাটক নতুন আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে আগামী প্রজন্মের জন্য। নাটক মানুষের অন্তর্লোকের এক জাগ্রত ভাষা, চিন্তার বুনন, চেতনার আয়না, এবং সমাজের মৌন উচ্চারণ। বাংলার নাট্যচর্চা ১৯৭১-এর উত্থান থেকে আজকের ইউটিউব নাটক পর্যন্ত রূপান্তরের বহু বাঁকে হেঁটে এসেছে, কিন্তু পরিবর্তনের ভেতরেও যে বস্তুর ক্ষয় হয়নি, তা হলো মানবিকতা, শিল্পের প্রতি দায়, এবং সত্যের অনুসন্ধান। নাটক আমাদের শেখায় কীভাবে হাসতে হয়, কীভাবে জিজ্ঞাসা করতে হয়, সমাজকে দেখতে হয়, এবং একটি ভালোতর ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে হয়। নাটক আমাদের চিনিয়ে দেয় নিজেদের, দেখায় সমাজের ফাটল ও সম্ভাবনার রেখা। নাটক যখন জীবনের প্রতিচ্ছবিতে আলো ফেলে, তখন জাতি তার মুখাবয়ব স্পষ্ট করে দেখতে পায়। শিক্ষক, শিল্পী ও দর্শক—এই ত্রিমুখী প্রাণশক্তিই নাটকের মূলভিত্তি। তাঁদের দায়বদ্ধতা, সাহস ও বোধ নাট্যভুবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাই, নাটক যেন কখনও বিনোদনের খেলায় রূপ না নেয়। তাকে হতে হবে জীবনের প্রগাঢ় ভূবন, স্বপ্নের ব্যাকরণ এবং মানুষের মৌলিক সত্যের অন্বেষণ। নাটক যখন নিছক বিনোদনের বাইরে যায়, তখনই তা হয়ে ওঠে জাতির আত্মার ভাষা।

তথ্যসূত্র :

  • বার্টোল্ট ব্রেখ্‌ত, নাটকে বিদেশীকরণ ও সমাজ—সচেতনতা।
  • সেলিম আল দীন, নাট্যচিন্তা, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, ২০০২।
  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রক্তকরবী, বিশ্বভারতী প্রকাশন।
  • উইলিয়াম শেকসপিয়র, অ্যাজ ইউ লাইকে ইট (অনুবাদ/রূপান্তর)।
  • উইলিয়াম শেকসপিয়র, হ্যামলেট অঙ্ক ৩, দৃশ্য ২।
  • আউগুস্তো বোয়াল, অভিনয়ের নিপীড়িত তত্ত্ব (মূল: ঞযবধঃৎব ড়ভ ঃযব ঙঢ়ঢ়ৎবংংবফ, ১৯৭৯; বাংলা অনুবাদ: সাঈদুল হক, মুক্তাঙ্গন প্রকাশনী)।

লেখক পরিচিতি :
রওশন রুবী
কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষক।

Read Previous

ফেরা

Read Next

বাংলাদেশের শিল্পসাহিত্য ও চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থান ও মূল্যায়নের দ্বান্দ্বিকতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *