
ফেরা
আবুল হাসান তুহিন
কাহিনি সংক্ষেপ :
নাটকটি গড়ে উঠেছে উচ্চবিত্ত এবং আধুনিক মনস্ক দম্পতি দিপু ও হেনাকে কেন্দ্র করে। দিপু শহরের সফল মানুষ হলেও তার মন পড়ে থাকে গ্রামে, অন্যদিকে হেনা আধুনিকতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা আর যান্ত্রিক জীবনের আবহে বড় হওয়া এক নারী। দীর্ঘ বিরতির পর দিপুর জেদে তারা কোরবানির ঈদ করতে গ্রামে যায়। গ্রামে গিয়ে হেনা মুখোমুখি হয় এক চরম অস্বস্তিকর পরিবেশের। কাদা-মাটি, মশা, কুয়োর পানি আর অস্বাস্থ্যকর (তার দৃষ্টিতে) জীবনযাপনের সাথে তার প্রবল সংঘাত শুরু হয়। সে বারবার ঢাকা ফিরে যাওয়ার জেদ ধরে। কিন্তু দিপুর মা এবং বাবার অসীম মমতা, গ্রামের শিশুদের সারল্য এবং দিপুর শেকড়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ধীরে ধীরে হেনার ভেতরের শহুরে আভিজাত্যের দেয়ালগুলো ভেঙে দিতে থাকে। কোরবানির ত্যাগের মধ্য দিয়ে হেনা উপলব্ধি করে যে, প্রকৃত কোরবানি কেবল পশু জবাই নয়, বরং নিজের ভেতরকার অহংকার আর জেদকে ত্যাগ করা। মেহদি পাতা বাটা থেকে শুরু করে বিলের টাটকা মাছের ঝোল—সবকিছুর মাঝে সে খুঁজে পায় জীবনের এক নতুন স্বাদ। নাটকটি শেষ হয় হেনার পূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, যেখানে সে তার পরবর্তী প্রজন্মকেও এই মাটির গন্ধে বড় করার স্বপ্ন দেখে।
চরিত্র লিপি :
১. দিপু (নায়ক) : বয়স ৩৫-৩৮। শহরের কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব কিন্তু অন্তরে আপাদমস্তক গ্রাম্য সহজ-সরল মানুষ।
২. হেনা (নায়িকা) : বয়স ২৭-৩০। আধুনিক, কিছুটা খুঁতখুঁতে স্বভাবের এবং স্বাস্থ্য সচেতন।
৩. মা (দিপুর মা) : গ্রামের চিরাচরিত মমতাময়ী মা। ধৈর্যশীল ও বুদ্ধিমতী।
৪. বাবা (দিপুরের বাবা) : শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতির।
৫. পল্টু (দিপুর বন্ধু) : নাটকের অন্যতম মজার চরিত্র। দিপুর ছোটবেলার বন্ধু, সবসময় সাথে থাকে।
৬. বক্কর (বাড়ির কাজের ছেলে/সহকারী) : প্রাণবন্ত ও বিশ্বস্ত।
৭. আরজা (দিপু-হেনার মেয়ে): শিশুর সারল্যে ভরা চরিত্র।
৮. পুটু ও নিধি (গ্রামের দুরন্ত শিশু): যারা হেনাকে প্রথম মাটির কাছাকাছি আসার অনুপ্রেরণা দেয়।
দৃশ্য ০১।। দিপুর আধুনিক ড্রয়িং রুম।। সকাল
চরিত্র : দিপু, হেনা, পল্টু।
[ফ্রেমে দেখা যায় চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে জামাকাপড় ও সুটকেস। দিপু খুব উৎসাহ নিয়ে একটি সুটকেস গোছাচ্ছে। পাশেই সোফায় বসে হেনা বিরক্ত মুখে একটি আইপ্যাড স্ক্রল করছে। দিপুর বন্ধু পল্টু এক কোনায় বসে একটা আপেল খাচ্ছে আর তাদের কাণ্ড দেখছে।]
দিপু : (সুতি পায়জামা পাঞ্জাবি ভাঁজ করতে করতে) হেনা, তোমার সিল্কের শাড়িটা কি এই ব্যাগে রাখব? গ্রামে কিন্তু এবার বেশ জাঁকজমক হবে। বাবা তো গরু কেনার জন্য অলরেডি হাটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে!
হেনা : (আইপ্যাড থেকে চোখ না তুলেই) আমি তো এখনো বলিনি যে আমি যাচ্ছি। আর ওই শাড়িটা কাদা-গোবরের গ্রামে পরে নষ্ট করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।
পল্টু : (আপেলে কামড় দিয়ে) আরে ভাবি, কাদা-গোবরই তো গ্রামের আসল পারফিউম! শহরে কি আর ওই ঘ্রাণ পাবেন? আর গরুর ডাক? সে তো পুরো রক কনসার্ট!
হেনা : (পল্টুর দিকে তাকিয়ে) পল্টু ভাই, আপনার রসিকতা নিজের কাছে রাখুন। দিপু, আমি সিরিয়াসলি বলছি —আমাদের বাচ্চার অ্যাডমিশন সামনে, ফিউচারের জন্য সেভিংস দরকার। আর তুমি কিনা প্রতিবার ঈদের আগে গ্রামে টাকা ওড়াও! তোমার মা-বাবা তো গ্রামেই ভালো আছেন, ওখানের মানুষের এত বিলাসিতার কী দরকার?
দিপু : (স্তব্ধ হয়ে হেনার দিকে তাকায়) বিলাসিতা? হেনা, মা-বাবার জন্য কেনাকাটা করা কি বিলাসিতা? যে মা নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে আমার স্কুলের খাতা বেঁধে দিত, সেই মায়ের জন্য একটা শাড়ি কেনা কি অপচয়?
হেনা : (উঠে দাঁড়িয়ে) ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করো না। আমরা প্র্যাকটিক্যাল দুনিয়ায় বাস করি। ওই গ্রামে গেলে আমার স্কিন নষ্ট হয়, মেয়েটা গরমে অসুস্থ হয়। তার চেয়ে চলো এবার আমরা সিঙ্গাপুর যাই, ঈদটাও লাক্সারিয়াস হবে।
পল্টু : (ফিসফিস করে) সিঙ্গাপুরে তো আর কোরবানি দিয়ে নিজের হাতে মাংস বিলানোর আনন্দ নেই ভাবি। ওখানে বড়জোর প্লাস্টিকের প্যাকেটে হিমায়িত মাংস পাবেন।
হেনা : (রাগে চিৎকার করে) আপনি থামবেন পল্টু ভাই?
দিপু : (শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে) হেনা, অনেক বছর তোমার কথা শুনেছি। কিন্তু এবার আমি আমার শিকড় ভুলে যেতে পারব না। আমি অলরেডি বাবাকে বড় গরু কেনার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি। আর তুমি সিঙ্গাপুর যেতে চাইলে যেতে পারো, কিন্তু আমি আর আমার মেয়ে এবার গ্রামেই ঈদ করব।
(হেনা অবাক হয়ে দিপুর দিকে তাকিয়ে থাকে। দিপুকে আগে কখনো এত কঠোর হতে দেখেনি সে। পল্টু আড়ালে গিয়ে দিপুকে থাম্বস-আপ দেখায়।)
হেনা : (গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়) দেখে নেব আমি! টাকাগুলো তো জলেই গেল!
পল্টু : (দিপুর কাঁধে হাত দিয়ে) দোস্ত, বাঘিনী তো খেপেছে! তবে চিন্তা করিস না, গ্রামের খাঁটি ঘি আর সরু চালের ভাত খেলে এই রাগ আইসক্রিমের মতো গলে যাবে। প্যাকিং চালিয়ে যা!
(দিপু হাসে, কিন্তু তার চোখে ফেলে আসা দিনের স্মৃতি আর মা-বাবার প্রতি ভালোবাসার এক গভীর আভা ফুটে ওঠে।)
দৃশ্য ০২।। গ্রামের বাড়ির উঠোন।। দিন
চরিত্র : মা, বাবা।
[ফ্রেমে দেখা যায় উঠোনের একপাশে একটি পুরোনো আমগাছ। তার নিচে একটি বাঁশের মাচায় বসে আছেন দিপুর বাবা। তিনি চশমা মুছে বারবার খবরের কাগজ পড়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু মন বসছে না। দিপুর মা একটি কুলায় চাল ঝাড়ছেন। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত প্রতীক্ষা।]
মা : ওগো, শুনছো? ছেলেটা যে ফোন করে বলেছিল আজ রওনা দেবে, এখনো তো কোনো খবর পেলাম না। ঢাকা থেকে আসতে কি খুব বেশি দেরি হয়?
বাবা : (চশমা চোখে দিয়ে হাত ঘড়ি দেখে) এই তো মোটে বেলা ১১টা বাজে। ঢাকা থেকে বেরোনোটাই হচ্ছে বড় সমস্যা। যানজট লেগেই থাকে ঈদের সময় আরও বেশি। বড় রাস্তা থেকে গ্রামে ঢোকার পথটা তো এখন আগের চেয়ে ভালো। গাড়ি নিয়ে আসতে সময় লাগবে না। তুই বরং দেখ, বউমার জন্য সেই যে বিলের শোল মাছটা আনিয়ে রাখলাম, ওটা ঠিক আছে কি না।
মা : (হাসিমুখে) সব ঠিক আছে। বউমা তো আবার শহরের মানুষ, বেশি ঝাল খেতে পারে না। আমি আলাদা করে ঝাল ছাড়া তরকারি রাঁধব। আর পুতনির জন্য তো মাটির সরা ভরে নাড়ু বানিয়ে রেখেছি। কিন্তু শোনো… হেনা কি এবারও আমাদের সাথে থাকতে চাইবে? গতবার তো দুদিন না যেতেই গরমে হাঁসফাঁস করে চলে গেল।
বাবা : (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) দিপু এবার কথা দিয়েছে। আর ও এবার কুরবানির জন্য বেশ বড় অঙ্কের টাকা পাঠিয়েছে। এবার বড় একটা গরু আনব। দেখো, পুরো গ্রাম ভেঙে পড়বে আমাদের উঠোনে।
দৃশ্য ০৩।। ড্রয়িংরুম।। সকাল
চরিত্র : দিপু, হেনা, পল্টু।
[দিপু তড়িঘড়ি করে ট্রলি ব্যাগে কাপড় ভরছে। হেনা একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর মাস্কের প্যাকেট নিয়ে সোফায় বসে আছে। তার মুখভঙ্গি বিরক্তিপূর্ণ। পল্টু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বড় একটা ট্রাভেল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হাসছে।]
দিপু :(ঘড়ি দেখে) হেনা, জলদি করো! জ্যামের পড়লে আর দেরি করলে কিন্তু আজ পৌঁছাতে পারবো না।
হেনা : (বিরক্তির সাথে) আমি এখনো বুঝতে পারছি না দিপু, এই প্যান্ডেমিক আর ধুলোবালির মধ্যে গ্রামে যাওয়ার কী দরকার? ঈদের ছুটিটা আমরা তো আরামসে এখানে কাটাতে পারতাম। অথবা কোনো ভালো রিসোর্টে যেতে পারতাম।
পল্টু : (ফোড়ন কেটে) আরে ভাবি, রিসোর্টে তো কৃত্রিম অক্সিজেন পাবেন। গ্রামে চলেন, এক্কেবারে ন্যাচারাল হাওয়া! আর চাচির হাতের সেই দেশি মুরগির ঝোল, উফ, ভাবলেই আমার পেটের ভেতর ড্রাম বাজছে!
হেনা : (পল্টুর দিকে তাকিয়ে) আপনার ওই মুরগির ঝোলের জন্য আমার স্কিন আর হাইজিনের বারোটা বাজাতে পারবো না। দিপু, আমি কিন্তু বলে দিয়েছি, আমি আমার স্পেশাল বেডশিট, পানির ফিল্টার আর আলাদা সাবান-শ্যাম্পু সব সাথে নিয়েছি। ওখানকার টিউবওয়েলের পানিতে আমি মুখ ধুতে পারবো না।
দিপু : (হেনার কাছে এসে শান্ত গলায়) হেনা, মা-বাবা সারাটা বছর আমাদের পথ চেয়ে বসে থাকেন। কোরবানিটা তো শুধু একটা নিয়ম না, এটা একটা ত্যাগ। মা-বাবার জন্য এইটুকু কষ্ট কি আমরা করতে পারি না?
হেনা : ত্যাগের কথা বলো না তো দিপু! আমি তো যাচ্ছিই। কিন্তু শোনো, কুরবানির ওই কাদা আর পশুর গন্ধের মধ্যে আমি কিন্তু ঘর থেকে বের হবো না। তিন দিন পর কিন্তু আমরা ব্যাক করছি, রাইট?
পল্টু : (হাসতে হাসতে) ভাবি, একবার গ্রামের মাটিতে পা দেন, দেখবেন ঢাকার এসি রুমের কথা ভুলে গেছেন। দিপু দোস্ত, গাড়ি নিচে ওয়েট করছে। চল!
দিপু : (হেনার ব্যাগটা হাতে নিয়ে) চলো হেনা। অন্তত এবার মা-বাবার হাসিটা দেখতে চলো। বাকিটা পরে দেখা যাবে।
(হেনা অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ায়। সে বড় একটা সানগ্লাস পরে নেয়, যেন গ্রামের রোদ আর ধুলোবালি তাকে এখনই আক্রমণ করবে। তারা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।)
দৃশ্য ০৪।। গ্রামের বাড়ির উঠোন।। দিন
চরিত্র : মা, বাবা, বক্কর।
[ফ্রেমে দেখা যায় গ্রামের চঞ্চল এক যুবক বক্কর’ হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে। বক্কর এই গ্রামের খবর আদান-প্রদানকারী চরিত্র।]
বক্কর : ও চাচা! ও চাচি! খুশির খবর! দিপু ভাই তো বাজারের মোড়ে চলে এসেছে, আমি দেখে আসলাম মস্ত বড় একখান গাড়ি নিয়ে আসতিছে! আর গাড়ির পেছনে মনে হয় আস্ত একটা দোকান নিয়ে আসছে, কত যে কার্টুন!
মা : ( আশ্চর্য হয়ে) সত্যি বলছিস বক্কর? দিপুর আব্বা, শুনেছো? ছেলে বাউমা চলে এসেছে!
বাবা : (উত্তেজিত হয়ে) শুনেছি। বক্কর, তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, দিপুর ঘরটা আর একবার ঝেড়ে দিয়ে আয়। আর শোন, বাজারে গিয়ে বলিস আজ যেন গরুটা আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
বক্কর : (হাসতে হাসতে) চাচা, গরু তো অলরেডি রওনা দিছে। বড় এক কালা পাহাড়! দিপু ভাই আসার পর গরু নিয়ে হাজির হবে। তবে চাচা, শহরের বউমা তো আসছে, একটু সাবধানে থাকবেন গতবার আমারে দেইখে তো জংলি’ কইছিলো!
মা : (আঁচলে চোখ মুছে) ও কিছু না রে পাগলা, ওটা তো শহরের ভাষা। তুই তাড়াতাড়ি যা।
(বাবা আর মা উঠোনের গেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাদের চোখে জল আর মুখে হাসির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। দূরে একটি গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যায়।)
মা : ওই তো! মনে হয় আমার দিপু এসে গেছে!
(মা দ্রুত কুলাটা একপাশে রেখে শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যান। বাবার মুখটা গর্বে ভরে ওঠে।)
দৃশ্য ০৫।। গ্রামের ভাঙাচোর রাস্তা।। বিকেল
চরিত্র : দিপু, হেনা, পল্টু।
[ফ্রেমে দেখা যায় দিপুর গাড়ি ঝাকুনি খেতে খেতে এসে বাড়ির সামনে থামে। ধুলোবালিতে গাড়িটা ধূসর হয়ে গেছে। দিপু ও পল্টু বেশ হাসিখুশি মনে গাড়ি থেকে নামে। হেনা নাক-মুখ রুমাল দিয়ে চেপে ধরে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলে গাড়ি থেকে নামে, যেন মাটিতে পা দিলেই তার দামি জুতো নষ্ট হয়ে যাবে।]
হেনা : (বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায়) ওহ গড! দিপু, এই রাস্তা দিয়ে মানুষ চলে? আমার তো মনে হচ্ছে মেরুদণ্ড আর জায়গায় নেই। আর এই গন্ধটা কীসের? শ্যাওলা না গোবরের?
পল্টু : (গভীর শ্বাস নিয়ে) আহ! ভাবি, এইটা হইলো মাটির সোঁদা গন্ধ। শহরে তো শুধু পোড়া মবিল আর ধোঁয়ার গন্ধ পান।
(গাড়ি রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসে।)
দৃশ্য ০৬।। রাস্তা।। বিকেল
[ফ্রেমে দেখা যায় একটি নসিমনে একটি বিশাল কালো গরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে।]
দৃশ্য ০৬।। সদর দরজা।। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা
চরিত্র : পল্টু, মা , হেনা, বক্কর, দিপু, বাবা।
[ফ্রেমে দেখা যায় গাড়ির হর্ন বাজতে বাজতে বাড়ির গেটের সামনে এসে থামে। দিপুর বাবা গেট খুলে দেন। দিপু গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত গিয়ে বাবাকে কদমবুসি করে এবং মাকে জড়িয়ে ধরে। হেনা বিরস মুখে গাড়ি থেকে নামে, তার হাতে বড় একটা সানগ্লাস। বাচ্চারা লাফিয়ে নামে। পল্টু পেছনের সিট থেকে নামতে গিয়ে পা আটকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।]
মা : (আবেগে আপ্লুত হয়ে) আয় বাপ, আয়! কতদিন পর তোদের দেখলাম। বউমা, আসো মা ভেতরে আসো। রাস্তায় খুব কষ্ট হইছে না?
(মা হেনার হাত ধরতে গেলে হেনা হাতটা সরিয়ে নিয়ে নিজের স্যানিটাইজার বের করে মাখে। মায়ের হাসিমাখা মুখটা এক মুহূর্তের জন্য একটু ম্লান হয়, কিন্তু তিনি পরক্ষণেই আবার হাসেন। তারা সবাই মিলে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।)
বাবা : (দিপুর মাথায় হাত রেখে) বড় ভালো করলি বাপ। আমাদের ঈদের খুশি তো তোরাই। বক্কর! ওরে বক্কর! ব্যাগগুলা ভেতরে নে।
বক্কর : (লুঙ্গি মালকোঁচা মেরে দৌড়ে এসে) আইছি চাচা! ও দিপু ভাই, ও পল্টু ভাই! আপনেরা তো দেহি একদম সাহেব হয়ে গেছেন! আর ভাবি তো এক্কেবারে পরির মতো চকমক করতিছে!
হেনা : (বক্করের গায়ের ঘাম আর ময়লা দেখে একটু দূরে সরে গিয়ে) দিপু, আমার সুটকেসগুলো যেন বক্কর সাবধানে ধরে। ওতে দামি কসমেটিকস আছে। আর মা, আমার জন্য যে ঘরটা রেডি করেছেন ওখানে মশা নেই তো? আমি ওডোমস আনতে ভুলে গেছি।
মা : (মৃদু হেসে) না রে মা, নতুন মশারি টাঙাইয়া রাখছি। ঘরদোর লেপে-পুছে একদম তকতকা করছি। তুই ভেতরে আয় মা, একটু শরবত খা।
হেনা : (দিপুর কানে কানে) মা কি মাটির কথা বললেন? লেপে-পুছে মানে কী? দিপু, আমি কিন্তু ফ্লোরে পা দিতে পারবো না!
দিপু : (হেনার হাত ধরে) হেনা, প্লিজ! মা কত খুশি হয়েছেন দেখো। একটু মানিয়ে নাও। এসো ভেতরে এসো।
(সবাই মিলে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।)
পল্টু : (নিজেকে সামলে নিয়ে) ওফ! এই তো খাঁটি মাটি! দোস্ত দিপু, তোর উঠোনের মাটিতেও দেখি চুম্বকের মতো টান, পা ছাড়তেই চাইছে না!
(বক্কর বেশ উৎসাহ নিয়ে গাড়ির ডিকি খোলে। একগাদা প্যাকেট দেখে তার চোখ কপালে ওঠে)
বক্কর : ওরে বাপরে! দিপু ভাই, এ তো দেখি কোরবানির আগেই ঈদের বাজার শেষ কইরা দিছেন! এই প্যাকেটে কী? এ কি শহরের জিলাপি?
পল্টু : (বক্করের পিঠ চাপড়ে) আরে না মিঞা, ওগুলো জিলাপি না, ওগুলো হলো শহরের স্টাইলিশ প্যান্ট। ওসব পরলে তোমারে একদম হলিউড লাগবে!
হেনা : (বিরক্তি নিয়ে) দিপু, সাবধানে! ওগুলোতে আমার ইমপোর্টেড কসমেটিকস আছে। বক্কর ভাই, প্লিজ একটু জেন্টলি হ্যান্ডেল করুন।
দিপু : (শান্ত গলায়) হেনা, ব্যস্ত হয়ো না। বক্কর আমাদেরই ছোট ভাইয়ের মতো। ও সব ঠিকঠাক ঘরে নিয়ে যাবে। বাবা, আপনি গরুটা কি আনালেন? আমি তো বাজারের মোড়ে একটা মস্ত কালো গরু দেখলাম।
বাবা :(গর্বের হাসি হেসে) হ্যাঁ রে দিপু, ওইটাই তোর পাঠানো টাকার গরু। পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছিল হাটে। লোকে বলছে, এমন তাগড়া গরু এই তল্লাটে আর একটাও নেই।
বক্কর : (মাথা চুলকাতে চুলকাতে) চাচা, গরু তো কেবল ট্রেলার! আসল সিনেমা তো দিপু ভাইয়ের কেনাকাটায়। ও ভাবি, আপনে রাগ কইরেন না, আমি আপনার লাগেজ এক্কেবারে পালকের মতো কইরে ঘরে পৌঁছে দেবো!
হেনা : (বিরক্তি চেপে) আচ্ছা ঠিক আছে সাবধানে নিয়ে আসো! ওফ দিপু, চলো ভেতরে যাই। এখানে মশার যা সাইজ, মনে হচ্ছে এক একটা ড্রোনের সমান!
পল্টু : (হেসে কুটিপাটি) হা হা! ঠিক বলেছেন ভাবি, গ্রামের মশা একটু পেটুক হয়। কিন্তু ভয় পাবেন না, আপনার জন্য ওডোমস আর কয়েল সবই দিপু দোস্ত লোড করে এনেছে!
(সবাই হাসাহাসি করে ভেতরে ঢুকতে থাকে। দিপু একবার তার পুরনো শোবার ঘরের দিকে তাকায়, যেখানে তার ছোটবেলার অনেক স্মৃতি। তার মুখে এক প্রশান্তির হাসি। হেনা গজগজ করতে করতে ভেতরে ঢোকে।)
দৃশ্য ০৭।। শোবার ঘর ও বারান্দা।। রাত
চরিত্র : হেনা, দিপু, পল্টু, মা।
[ফ্রেমে দেখা যায় হালকা ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে হেনা কয়েল জ্বালাচ্ছে আর নিজের হাত-পায়ে মশা তাড়ানোর ক্রিম মাখছে। দিপু খাটের ওপর বসে পুরনো একটি ডায়েরি উল্টে দেখছে। ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে চাঁদের আলো এসে পড়ছে।]
হেনা : (বিরক্তি নিয়ে) দেখলে তো? রাতে এখানে থাকা জাস্ট অসম্ভব! ফ্যানটা যেভাবে ঘুরছে এতে মশা তাড়ানো যাবে না। আর তোমার মা-ও না, কেন যে ওই পুরনো কাঁথাগুলো বিছানায় দিলেন! স্মেল আসছিল।
দিপু : (মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই) ওগুলো পুরনো কাঁথা না হেনা, ওগুলো মায়ের হাতের নকশিকাঁথা। মা অনেক যত্ন করে ওগুলো সেলাই করেছেন। বড় বড় শোরুম থেকে যখন ওগুলো বেশি দাম দিয়ে কেন তখন কোনো দোষ নেই! ওতে কোনো স্মেল নেই, ওটা হলো মায়ের মমতার ঘ্রাণ।
হেনা : (তাচ্ছিল্য করে) মমতার ঘ্রাণ দিয়ে তো আর হাইজিন বজায় থাকে না। আর শোনো, কাল সকালে কিন্তু ওই বক্করকে বলবে আমার জন্য পানি গরম করে দিতে। আমি পুকুরে নামতে পারব না, ওখানে নাকি জোঁক আছে!
(এমন সময় দরজায় টোকা পড়ে। পল্টু ভেতরে মাথা গলায়। তার গলায় একটা গামছা ঝোলানো।)
পল্টু : কিরে দোস্ত? ভাবি কি এখনো ‘মিশন মাস্কুইটো’ চালাচ্ছে?
হেনা : পল্টু ভাই, আপনিও কি এখানে ঘুমাননি? আপনার তো মশা ধরছে না দেখছি!
পল্টু : (হেসে) আরে ভাবি, গ্রামের মশারা হলো আমাদের আত্মীয়। আমাকে দেখে ভাবছে, এই তো শহরের পনিরের মতো নরম গালওয়ালা লোক আসছে, একটু আদর করি! তবে সিরিয়াসলি দিপু, বাইরে গিয়ে দেখ, চাচা-চাচি তোর জন্য কী সব নাশতা বানাচ্ছে। এই মাঝরাতেও পিঠা ভাজার ধুম পড়েছে!
দিপু : (উঠে দাঁড়িয়ে) মা সারা বছর এই দিনটার জন্যই তো অপেক্ষা করে রে পল্টু। হেনা, চলো না একটু বাইরে? মা নিজের হাতে গরম পিঠা বানাচ্ছে।
হেনা : (চোখ কপালে তুলে) এই মাঝরাতে কার্বোহাইড্রেট? অসম্ভব! আমার ডায়েট চার্ট দেখলে ডক্টর হার্ট অ্যাটাক করবে। তোমরা যাও, আমি বরং আমার ল্যাপটপে মুভি দেখি। এখানে তো আবার নেটওয়ার্কও কচ্ছপের গতিতে চলে!
পল্টু : (মজা করে) ভাবি, নেটওয়ার্কের দরকার কী? বাইরে গিয়ে আকাশের দিকে তাকান, একদম ফোর-কে কোয়ালিটির চাঁদ দেখা যাচ্ছে। কোনো বাফারিং নাই!
হেনা : (বালিশে মুখ গুঁজে) আপনারা যান তো! আমাকে একটু একা থাকতে দিন।
(দিপু আর পল্টু বারান্দায় বেরিয়ে আসে। বারান্দার এক কোণে মা মাটির উনুনে পিঠা ভাজছেন, বাবা পাশে আগুনের আভা মায়ের মুখে এক অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি করেছে।)
দৃশ্য ০৮।। কলপাড়।। সকাল
চরিত্র : হেনা, বক্কর, মা, পল্টু।
[ফ্রেমে দেখা যায় হেনা চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে, হাতে একটা দামি ফেসওয়াশ আর মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিয়ে কলপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। চাপকলের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন ওটা একটা বিষধর সাপ। বক্কর এক হাত দিয়ে দাঁতন করছে আর অন্য হাতে কল চেপে বালতিতে পানি ভরছে।]
বক্কর : (হাসিমুখে) ও ছোট ভাবি! উইঠা গেছেন? গ্রামের সকাল দেহেন কত সুন্দর! এই চাপকলের পানি এক্কেবারে বরফের মতো ঠাণ্ডা। একবার মুখে দিলে মনে হইবো শরীরের সব জ্বালাপোড়া মিট্যা গেছে।
হেনা : (বিরক্তি চেপে) বক্কর ভাই, আপনি কি এই বালতিতে পানি ভরেন? এটা কি স্টেরিলাইজ করা? আর এই পানিতে কত আয়রন থাকতে পারে আপনি জানেন? আমার স্কিন তো সেনসিটিভ।
বক্কর : (মাথা চুলকে) আয়রন না কি যেন কইলেন অসব বুঝি না ভাবি। তবে এই পানি খেয়ে আমরা বড় হয়ছি! আপনি চিন্তা কইরেন না, আমি আপনার জন্নি কল ভালোভাবে চাইপে বালতি ভইরে দিচ্ছি।
(এমন সময় দিপুর মা এক বাটি মুড়ি আর নারিকেল নিয়ে আসেন। তার চোখেমুখে তৃপ্তি।)
মা : বউমা জলদি, মুখ ধুয়ে আসো। এই যে কুড়কুড়ে মুড়ি আর নারিকেল কোরা নিয়ে আসলাম। খেয়ে নাও। সকালে খালি পেটে থেকো না মা!
হেনা : (অবাক হয়ে) মা! সকালে আমি ওটস বা কর্নফ্লেক্স খাই। মুড়ি তো একটা স্ন্যাকস, এটা ব্রেকফাস্ট হয় কী করে? আর এই নারিকেল… এতে তো প্রচুর ফ্যাট!
মা : (একটু অপ্রস্তুত হয়ে) শহরে কী খাও তা তো জানি না মা। তবে গ্রামের মুড়ির স্বাদই আলাদা। দিপু তো সেই ভোরবেলা উইঠা পল্টুরে নিয়া বিলের ধারে গেছে শাপলা দেখতে। ও তো গামছা পইরা এক্কেরে বাড়ির ছেলে হইয়া গেছে।
হেনা : (নিজের মনে) গামছা পরে বিলের ধারে! লোকটা কি পাগল হয়ে গেল নাকি? দিপুকে আমি চিনিই না মনে হচ্ছে।
পল্টু : (কাদামাখা পা নিয়ে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে প্রবেশ) ওরে বাবারে! ভাবি, আপনি তো মিস করলেন! বিলের ধারে যে টাটকা বাতাস আর ওই যে বড় বড় শাপলা! দিপু তো একটা বড় শাপলা তুলতে গিয়া প্রায় হড়কায়া পইড়া গেছিল।
হেনা : (বিরক্তি প্রকাশ করে) পল্টু ভাই, আপনার পায়ের কাদাগুলো কি একটু দূরে রাখবেন? আমার স্যান্ডেলে লাগছে। আর আপনার বন্ধু কোথায়? ওকে এখনই ডেকে আনুন। আমাদের তো কালই ফিরতে হবে, ওর কোনো সেন্স নেই?
মা : (স্নেহের স্বরে) তাড়াহুড়ো করো না মা। গ্রামে আসছো, একটু শান্তিতে থাকো। আজ দুপুরের রান্নায় আমি নিজের হাতের বানানো পিঠা আর দেশি কই মাছের ঝোল রাখছি। তোমার ভালো লাগবে।
হেনা : (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) দেখা যাক। বক্কর ভাই, প্লিজ আমাকে এক মগ পানি দিন, আমি জাস্ট আমার এই বোতলের পানি দিয়ে কোনোমতে মুখটা ধুয়ে নেই।
(বক্কর পানি ঢালে, আর হেনা অত্যন্ত সাবধানে তর্জনী দিয়ে মুখ স্পর্শ করে। তার চোখেমুখে বিরক্তি আর মা-বাবার চোখেমুখে সস্নেহ মমতা এই বৈপরীত্যেই দৃশ্যটি শেষ হয়।)
দৃশ্য ০৯।। উঠোন ও গোয়ালঘর।। সকাল
চরিত্র : পল্টু, দিপু, হেনা, বক্কর, বাবা।
[ফ্রেমে দেখা যায় উঠোনের মাঝখানে সেই বিশাল কালো গরুটা বাঁধা। গ্রামের উৎসুক কয়েকটা বাচ্চা আর মুরুব্বি গরুটা দেখছে। দিপু লুঙ্গি আর টি-শার্ট পরে একদম গ্রাম্য ঢঙে গরুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পল্টু হাতে একটা লাঠি নিয়ে গরুর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে।]
পল্টু : (গরুর চোখের সামনে আঙুল নাড়িয়ে) কিরে ব্যাটা? তুই তো দেখি একদম ডন! ঢাকা শহরের জ্যাম দেখলে তো তুই হার্ট অ্যাটাক করতি। এখানে তো রাজার হালে আছিস।
দিপু : (হেসে) ও তো রাজার হালে থাকবেই রে পল্টু। মা ওকে সকাল থেকে কাঁচা ঘাস আর ভাতের মাড় খাইয়ে একাকার করে ফেলেছে। বাবা তো খুশিতে বাকবাকুম, সারা গ্রামকে বলে বেড়াচ্ছে, আমার ছেলে এবার মস্ত গরু এনেছে।
(এমন সময় হেনা বারান্দায় আসে। পরনে দামি সালোয়ার কামিজ, চোখে রোদচশমা। হাতে একটা জীবাণুনাশক স্প্রে। সে গরুর থেকে অন্তত দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকায়।)
হেনা : (স্প্রে করতে করতে) দিপু! তুমি কি পাগল হলে? ওই জানোয়ারটার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছো! ওর গায়ে কত ব্যাকটেরিয়া আছে আইডিয়া আছে তোমার? আর সারা বাড়ি তো গোবরের গন্ধে নরক হয়ে গেল!
পল্টু : (ফড়ন কেটে) ভাবি, এই গন্ধটা হলো ‘অরগানিক ফ্লেভার’। শহরের পারফিউম তো কেমিক্যাল, এটা হলো একদম ন্যাচারাল! আর দেখুন, গরুর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন কেমন মায়াবী!
হেনা : (বিরক্তি নিয়ে) মায়াবী না ছাই! ও যেভাবে লেজ নাড়ছে, মনে হচ্ছে এক্ষুনি আমার ওপর অ্যাটাক করবে। দিপু, আমি কালই ফিরে যেতে চাই। এখানে থাকা আমার পক্ষে পসিবল না।
বক্কর : (হঠাৎ কোত্থেকে এক বালতি দুধ নিয়ে উদয় হয়) ও ভাবি! ভয়ের কিছু নেই? এই গরু হইলো শরিফ গরু। কামড়ায় না, কেবল মাঝে মাঝে একটু ফোঁসফোঁস করে। আর এই দেহেন, একদম টাটকা দুধ! দিপু ভাইয়ের জন্নি মা পাঠাইছে।
হেনা : (আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে) ওহ গড! ওটা খোলা বালতি কেন? মাছি পড়ছে তো! দিপু, আমি এই দুধ খাব না, আমার মেয়েও খাবে না। আমাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে।
দিপু : (শান্তভাবে হেনার কাছে গিয়ে) হেনা, ওর মা অনেক আশা নিয়ে এগুলো করছে। এই দুধ খেয়েই আমি বড় হয়েছি, আমার তো কোনো ইনটলারেন্স হয়নি। একটু মানিয়ে নাও না। চারিদিকে সবাই কত খুশি দেখছো না?
হেনা : (জেদ ধরে) খুশি মানে কি আমাকে অসুস্থ করা? তোমার বাবা-মা তো দেখি গ্রামের অর্ধেক মানুষকে দাওয়াত দিয়ে ফেলেছে। এত মানুষের ভিড়ে আমি তো সাফোকেটেড হয়ে যাব!
পল্টু : (টিপ্পনী কেটে) ভাবি, সাফোকেশন কমানোর জন্য বক্কররে বলেন হাতপাখা দিয়া বাতাস করতে। বক্কর, তুই ভাবির চারপাশে একটা ‘বর্ডার লাইন’ টাইনা দে তো, যেন মশা-মাছি বা কোনো ব্যাকটেরিয়া ওনার পারমিশন ছাড়া ঢুকতে না পারে!
বক্কর : (মাথা চুলকে) সেই লাইন কি চুন দিয়ে টানবো পল্টু ভাই? নাকি গোবর দিয়ে?
হেনা : (রাগে পা দাপিয়ে ভেতরে চলে যেতে যেতে) জঘন্য! জাস্ট জঘন্য!
(দিপু আর পল্টু একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসে। দিপুর বাবা দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে একটু ম্লান হাসেন। তার মনে এক চাপা কষ্ট, ছেলেটা এত ভালো হলো, কিন্তু বউমাটা কেন এখনো পর রয়ে গেল! তবে দিপু আবার গরুর পিঠে হাত বুলিয়ে নিজের শেকড়ের স্পর্শ খোঁজে।)
দৃশ্য ১০।। উঠোন ও সদর রাস্তা।। দুপুরবেলা।।
চরিত্র : দিপু, বৃদ্ধা, পল্টু, বক্কর, হেনা, বাবা, গ্রামের বেশ কিছু মানুষ।
[ফ্রেমে দেখা যায় উঠোনে দিপু বড় বড় কয়েকটা ব্যাগ নিয়ে বসেছে। গ্রামের কিছু অভাবী মানুষ, প্রতিবেশী মুরুব্বি এবং ছোট বাচ্চারা ভিড় করে আছে। দিপু ব্যাগ থেকে নতুন শাড়ি, লুঙ্গি আর গেঞ্জি বের করে একে একে সবাইকে দিচ্ছে। পল্টু পাশে দাঁড়িয়ে লিস্ট মেলাচ্ছে আর রসিকতা করে ভিড় সামলাচ্ছে।]
দিপু : (এক বৃদ্ধার হাতে একটি শাড়ি দিয়ে) এই নিন খালা, এটা মায়ের পছন্দের রঙের শাড়ি। এবারের ঈদে এটা পরে আমাদের বাড়িতে দাওয়াত খেতে আসবেন কিন্তু।
বৃদ্ধা : (চোখ মুছে) বেঁচে থাক বাবা। তোর বাপ-মা কত কষ্ট করে তোরে মানুষ করছে, আজ তুই তাদের মুখ উজ্জ্বল করলি। আমাগো মতো গরিবের কথা মনে রাখলি, আল্লা তোর ভালো করবে।
পল্টু : (বক্করকে উদ্দেশ্য করে) এই বক্কর! লাইন ঠিক কর। তুই তো দেখি শাড়ি দেখে নিজের বিয়ের কথা ভাবা শুরু করছিস! ওটা তোর জন্য না, তোর দাদির জন্য।
বক্কর : (হেসে) পল্টু ভাই, আমি তো ভেবেছিলাম দিপু ভাই আমারে একটা ‘শহুরে কোট’ দেবো। বিয়ের সময়, ঐ কোট পরে জামাই সাজবো!
হেনা : (বারান্দা থেকে বিরক্তি মুখে এই দৃশ্য দেখছে। সে দিপুর কাছে এগিয়ে আসে।) দিপু! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? এই রোদের মধ্যে বসে এইসব কী করছো? আর এতগুলো দামি জিনিস এভাবে বিলিয়ে দেওয়ার কী মানে? আমাদের ভবিষ্যতের কথা একবারও ভেবেছো? এই টাকাগুলো সেভ করলে আমরা অন্তত একটা নতুন গাড়ি কিনতে পারতাম!
দিপু : (হেনার দিকে না তাকিয়েই কাজ চালিয়ে যায়) হেনা, গাড়ি হয়তো আমরা পরের বছরও কিনতে পারব। কিন্তু এই মানুষগুলোর মুখে এক চিলতে হাসি দেখার সুযোগ সবসময় আসে না। এই যে বৃদ্ধা দেখছো, ওনার দোয়াই হয়তো আমার আজকের এই সাফল্যের আসল কারণ।
হেনা : (গলা চড়িয়ে) দোয়া দিয়ে তো আর সংসার চলে না দিপু! তুমি জাস্ট ইমোশনাল হয়ে টাকা নষ্ট করছো। আর এই নোংরা মানুষগুলোর ভিড়ে তুমি কীভাবে বসে আছো? আমার তো ঘেন্নায় গা রি রি করছে।
পল্টু : (টিপ্পনী কেটে) ভাবি, ঘেন্না পাবেন না। এই মানুষগুলো হয়তো নোংরা জামা পরে আছে, কিন্তু এদের মনটা একদম ব্র্যান্ড নিউ। আপনার শহরের দামি পারফিউমের চেয়ে এদের মাটির টান অনেক বেশি পাওয়ারফুল!
হেনা : (পল্টুর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে) আপনি সবসময় মাঝখানে কথা বলবেন না তো! দিপু, আমি ভেতরে যাচ্ছি। আর শোনো, এই সব কেনাকাটার হিসাব কিন্তু আমি ঢাকা গিয়ে নেব।
(হেনা গটগট করে ভেতরে চলে যায়। দিপু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার কাজে মন দেয়। এমন সময় দিপুর বাবা পাশ থেকে এসে দিপুর কাঁধে হাত রাখেন।)
বাবা : (নিচু স্বরে) বাবা দিপু, বউমার ওপর রাগ করিস না। ও তো শহরের বড়লোকদের পরিবেশে বড় হয়েছে, ত্যাগের মাহাত্ম্য হয়তো ও এখনো বুঝতে পারেনি। কিন্তু তুই যা করছিস, তাতে আমার বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছে রে।
দিপু : (বাবার হাত চেপে ধরে) বাবা, হেনার দোষ নেই। আমিই ওকে ঠিকমতো বোঝাতে পারিনি। তবে আজ আমি যা করছি, তা তো আপনার আর মায়ের থেকেই শেখা। মনে আছে বাবা, আমার পড়াশোনার টাকার জন্য আপনি একবার ঈদে নিজের পাঞ্জাবি কেনেননি?
(বাবার চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। তিনি কিছু না বলে শুধু ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বক্কর পেছনের দিক থেকে একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে নাচা শুরু করে, যাতে পরিবেশটা আবার হালকা হয়ে যায়।)
দৃশ্য।। ১১।। শোয়ার ঘর।। রাত
চরিত্র : হেনা, মা।
[ফ্রেমে দেখা যায় হেনা বিছানায় কাঁদো কাঁদো অবস্থায় বসে আছে। তার পাশেই খোলা সুটকেস, অর্ধেক কাপড় গোছানো, বোঝাই যাচ্ছে সে এখনই চলে যাওয়ার জেদ ধরেছে। দিপু ঘরে নেই। এমন সময় হাতে এক গ্লাস দুধ আর কিছু ঘরে বানানো পিঠা নিয়ে মা ঘরে ঢোকেন।]
মা : (খুব মমতায় হেনার মাথায় হাত রেখে) মা… ও বউমা! রাগ করে কি না খেয়ে থাকতে হয়? এই নাও, একটু দুধ খেয়ে নাও। তোমার শরীরটা তো সহ্য করতে পারছে না।
হেনা : (মুখ তুলে চোখ মুছতে মুছতে) মা, আমি আর পারছি না। আমি এখানে থাকলে পাগল হয়ে যাব। আপনার ছেলে আমাকে অপমান করেছে। সে এই কাদা-মাটিকে আমার চেয়ে বেশি ইম্পর্টেন্স দিচ্ছে!
মা : (হেনার পাশে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে) ওরে মা, দিপু তোমারে অপমান করেনি। ও আসলে তোমারে এই মাটির ভাগ দিতে চাইছে।
হেনা : (অবাক হয়ে তাকিয়ে) কেন?
মা : যে মাটি থেকে আমাদের জন্ম সেই মাটিতে সোনার ফসল ফলে সেই মাটিকে সন্মান করতে হয়। ও তোমাকে ঘৃণা করে না মা, ও চায় তুমিও এই মাটির মায়াটা বোঝো।
হেনা : (একটু নরম হয়ে) কিন্তু মা, এ তো নোংরামি… ওইভাবে মাছ ধরা… মাটিতে খালি পায়ে হাঁটা আমি তো কখনো এসব দেখিনি।
মা : (হেসে) শহর তো তোমাদের সব শিখাইছে মা, শুধু ধৈর্যটা শিখাইতে পারেনি। মেহদি পাতা দেখো এটা যখন বাটা হয় তখন হাত সবুজ থাকে, কিন্তু শুকিয়ে গেলে রঙ হয় লাল। ভালোবাসাটাও তেমন, প্রথমে একটু তেতো লাগে, কিন্তু সয়ে নিলে এক সময় রঙ ছড়ায়।
হেনা : (নিচু স্বরে) মা, আমি কি সত্যিই খুব খারাপ? দিপু আজ আমাকে বলল আমার মানসিকতা অসুস্থ।
মা : না মা, তুমি খারাপ হবে কেন? তুমি তো আমার ঘরের লক্ষ্মী। দিপু তোমাকে অনেক ভালোবাসে, তাই তোমারে নিজের গ্রামের সাথে পরিচয় করাতে এনেছে। তুমি একটু শান্ত হও মা। দিপু বারান্দায় মন খারাপ করে বসে আছে। যাও ওর কাছে?
(হেনা চুপ করে থাকে। তার চোখের পানি শুকিয়ে এসেছে। মা’র কথাগুলো তার মনের ভেতরের জেদটা একটু আলগা করে দিয়েছে। সে গ্লাসের দুধটা হাতে নেয়।)
মা : তুমি খাও মা। আমি যাই। দিপুরে পাঠিয়ে দিচ্ছি। রাত অনেক হইছে।
(মা ঘর থেকে বেরিয়ে যান। হেনা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। চাঁদের আলো গাছের পাতার ওপর ঝিকমিক করছে। সে প্রথমবারের মতো অনুধাবন করার চেষ্টা করে, মাটি কি সত্যিই মা হতে পারে?)
দৃশ্য ১২।। বারান্দা।। রাত
চরিত্র : হেনা, দিপু।
[ফ্রেমে দেখা যায় দিপু অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে মেঘ এবং চাঁদের লুকোচুরি। তার মনে একটা বিষণ্ণতা। এমন সময় হেনা খুব ধীর পায়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। হেনার হাতে একটা ওড়না জড়ানো, সে একটু ইতস্তত করছে।]
হেনা : (খুব নিচু স্বরে) এখনো রাগ করে আছো?
দিপু : (তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার শিকড়টাকে সম্মান করবে। কিন্তু তুমি যা করলে… আমার বাবা-মা ভেতরে ভেতরে খুব ছোট হয়ে গেছেন।
হেনা : (দিপুর হাতটা আলতো করে ধরে) আই এম সরি দিপু। আমি আসলে অভ্যস্ত নই তো, তাই রিয়্যাক্ট করে ফেলেছি। মা কিছুক্ষণ আগে আমার ঘরে এসেছিলেন। উনার কথাগুলো শুনে আমার মনে হলো, আমি আসলে নিজের আভিজাত্যের খাঁচায় বন্দি হয়ে আছি।
দিপু : (একটু নরম হয়ে) হেনা, আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু এই যে ঘর, এই যে কাঁদা, এগুলো আমার অস্তিত্ব। তুমি আমার অস্তিত্বকে ঘৃণা করলে আমি নিজেকে অপরাধী মনে করি।
হেনা : (মাথা নিচু করে) আমি মাটির ওপর পা রাখতে ভয় পেতাম দিপু। বিশ্বাস করো, আমি আর জেদ করব না। অন্তত চেষ্টা করব মানিয়ে নিতে।
দিপু : (হেনার দিকে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসে) সত্যি বলছো? কালকে তো ঈদের আগের দিন। গ্রামে ঈদের আগের রাতের আনন্দ শহরের চেয়েও বেশি। সারা রাত কেউ ঘুমাবে না। মা রুটি বানাবেন, বক্কর আর পল্টু মিলে উঠোনে চুলা খুঁড়বে। তুমি কি আমাদের সাথে থাকবে?
হেনা : (একটু হেসে) থাকবো। তবে একটা শর্ত আছে। আমাকে কোনো মরা বা জ্যান্ত মাছ ধরতে বলতে পারবে না!
দিপু : (হেসে ফেলে) ডিল! তোমাকে মাছ ধরতে হবে না। তুমি শুধু আমাদের পাশে বসে এই জোছনা আর মাটির গন্ধটা নিও। ওই দেখো হেনা, আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদটা দেখা যাচ্ছে।
হেনা : (আকাশের দিকে তাকিয়ে) অদ্ভুত তো! এখানে চাঁদটা কত বড় আর স্পষ্ট দেখা যায়। ঢাকায় তো বিল্ডিংয়ের ফাঁকে আকাশই খুঁজে পাওয়া যায় না।
(এমন সময় পেছন থেকে পল্টু আর বক্করের হাসাহাসি শোনা যায়। তারা উঠোনের এক কোণে চুলা বানানোর তোড়জোড় করছে। হেনা আজ আর বিরক্ত হয় না, বরং কৌতূহল নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।)
দিপু : চলো, ওরা মনে হয় চুলা বানানো শুরু করেছে। আমরাও যাই।
(হেনা আর দিপু একসাথে সিঁড়ি দিয়ে উঠোনের দিকে নামে। হেনার পায়ে এখন আর সেই দামি জুতো নেই, সে সাধারণ চটি পরে মাটির ওপর পা রেখেছে। এই প্রথম সে মাটির স্পর্শে শিউরে ওঠে না।)
দৃশ্য ১৩।। রান্নাঘর ও সংলগ্ন বারান্দা।। সকাল
চরিত্র : হেনা, মা, দিপু, পল্টু, বক্কর।
[ফ্রেমে দেখা যায় মা মাটির উনুনে বড় ডেকচিতে করে গরুর মাংস রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রান্নার ধোঁয়ায় চারপাশটা একটু ঝাপসা। হেনা রুমাল দিয়ে মুখ চেপে বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। সে রান্নাঘরের ধোঁয়া আর কালির মাখামাখি দেখে শিউরে উঠছে। পল্টু একটা মোড়ায় বসে শসা ছিলছে আর মায়ের সাথে গল্প করছে।]
হেনা : (বিরক্তি মাখা স্বরে) মা, আপনি এই ধোঁয়ার মধ্যে কীভাবে বসে আছেন? আপনার তো লাংসে প্রবলেম হতে পারে! আর এই কালিমাখা হাঁড়ি-পাতিলগুলো দেখলে তো আমার বমি পাচ্ছে। দিপুকে বললাম একটা ইলেকট্রিক ওভেন বা অন্তত একটা গ্যাস সিলিন্ডার পাঠাতে, তা না, সে তার বাপের আমলের কায়দাই বজায় রেখেছে।
মা : (হাসিমুখে উনুনে ফুঁ দিতে দিতে) বউমা, মাটির চুলার রান্নার যে সোয়াদ, তা কি আর ওই মেশিনের রান্নায় পাওয়া যায়? আর কালি তো হাতে লাগে মা, মনে লাগে না। তুমি একটু দূরে গিয়ে বসো, চোখে ধোঁয়া লাগবে।
পল্টু : (শসায় কামড় দিয়ে) ঠিক বলেছেন চাচি! ভাবি, এই ধোঁয়ার ভেতরেই তো আসল ‘স্মোকি ফ্লেভার’ লুকিয়ে আছে। শহরের রেস্টুরেন্টে এই ফ্লেভারের জন্য মানুষ হাজার হাজার টাকা খরচ করে। আর আপনি এখানে ফ্রিতে পাচ্ছেন!
হেনা : (পল্টুর দিকে তাকিয়ে) আপনার সব কিছুতেই ইয়ার্কি! এই যে মা সারাদিন খেটে রান্না করছেন, এরপর দিপু কি করবে জানেন? সব মাংস গ্রামের মানুষদের বিলিয়ে দেবে। আমরা কি শুধু হাড় চিবোতে আসছি এখানে?
পল্টু : (হেসে) ভাবি, ত্যাগের নামই তো কোরবানি। আর চাচি যে রান্নার জাদু জানেন, ওনার হাতের হাড় চিবোলেও মনে হবে অমৃত খাচ্ছি!
(এমন সময় দিপু ভেতরে ঢোকে। তার হাতে এক বালতি জল আর গায়ে কাদা লেগে আছে। সে সম্ভবত গরুর পরিচর্যা করে আসছে।)
হেনা : (চিৎকার দিয়ে) ওহ মাই গড! দিপু, তোমার ড্রেসের কী অবস্থা? ছি ছি, ওই কাদা নিয়ে তুমি রান্নাঘরের কাছে আসছ কেন? জাস্ট ইমাজিন, কত জার্মস তুমি বয়ে আনছ!
দিপু : (শান্তভাবে) হেনা, এটা কাদা না, এটা আমার মাটির সোঁদা গন্ধ। মা, খুদা লেগেছে খুব। রান্নার কত দেরি?
মা : (মমতায়) এই তো বাবা, আর একটুখানি। তুই হাত-মুখ ধুয়ে আয়। বউমা, দেখো তো ছেলেটার চেহারাটা রোদে পুড়ে কেমন তামাটে হয়ে গেছে। একটু সরবত করে দাও না মা।
হেনা : (মুখ ঘুরিয়ে) আমি এই গরমে রান্নাঘরে ঢুকতে পারব না। আর সরবত করার মতো হাইজেনিক ওয়াটার এখানে কোথায়? আমি তো আমার সাথে মিনারেল ওয়াটার নিয়ে আসছি, ওটা শেষ হয়ে গেলে কী হবে কে জানে!
পল্টু : (বক্করকে ডাক দেয়) ওই বক্কর! ভাবির লাইগা ডাব পেড়ে আন তো। একদম সিলড প্যাকেট, প্রকৃতির তৈরি ‘মিনারেল ওয়াটার’! মাছি ঢোকারও পারমিশন নাই!
বক্কর : (গাছে ওঠার প্রস্তুতি নিয়ে) এখনই আনতিছি পল্টু ভাই! ভাবি, আপনি ঘাবড়াইয়েন না, আপনার ডাব আমি ধুয়ে-মুছে তার পর দেবো!
হেনা : (গজগজ করতে করতে চলে যায়) ডাব না ছাই! আমি জাস্ট পাগল হয়ে যাব এই গ্রামে থাকলে। দিপু, কাল যদি আমরা না ফিরি, আমি একা বাসে করে চলে যাব!
(দিপু মায়ের দিকে তাকায়। মা একটু ম্লান হাসেন। দিপু মায়ের পাশে এসে উনুনের আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে পড়ে ছোটবেলার সেই দিনগুলো যখন মা ঠিক এভাবেই আগুনের তাপে ঘামতেন শুধু তার মুখে এক লোকমা খাবার তুলে দেওয়ার জন্য।)
দৃশ্য ১৪।। বারান্দা।। দুপুর
চরিত্র : হেনা, দিপু, মা, বক্কর।
[পাটির ওপর দিপু আর পল্টু বাবু হয়ে বসেছে। দিপুর পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি। সামনে মাটির থালায় ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল আর মাছের ঝোল। হেনা এক কোণে খুব জড়সড় হয়ে বসে আছে। সে তার প্লেটটা টিস্যু দিয়ে বারবার মুছছে।]
হেনা : (প্লেটের দিকে তাকিয়ে) দিপু, তুমি কি সিরিয়াসলি এই মাটির থালায় খাচ্ছ? এই থালার পোরসে (ছিদ্র) কত ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে তোমার কোনো আইডিয়া আছে? আর এই মাছটা কি নদী থেকে ধরা? এটা প্রপারলি ক্লিন করা হয়েছে তো?
দিপু্ : (তৃপ্তি নিয়ে এক লোকমা মুখে দিয়ে) হেনা, মা নিজের হাতে এই মাছ কুটেছেন। আর মাটির থালায় খাওয়ার যে আলাদা একটা সোঁদা গন্ধ আছে, সেটা তুমি কোনো দামি সিরামিকের প্লেটে পাবে না। জাস্ট ট্রাই ইট!
পল্টু : (বিশাল এক মাছের কাঁটা চিবোতে চিবোতে) ওহ হো! দিপু দোস্ত, এই কই মাছের যা স্বাদ! ভাবি, আপনি শুধু শুধু চিন্তা করছেন। গ্রামে কোনো জ্যান্ত মাছের পেটে ব্যাকটেরিয়া থাকে না, সব থাকে শহরের প্যাকেটজাত খাবারে।
মা : (রান্নাঘর থেকে বড় একটা বাটি নিয়ে প্রবেশ) এই যে মা, গরম গরম বেগুন ভর্তা আর খাঁটি সরিষার তেল। একটু খেয়ে দেখো মা, তোমার তো শরীরটা এক্কেবারে শুকিয়ে গেছে। শহরে কি কিছু খাও না তোমরা?
হেনা : (একটু দূরে সরে গিয়ে) না মা, থ্যাঙ্কস। আমি একচুয়ালি কার্বস (শর্করা) অ্যাভয়েড করি। আর এই তেলটা… অনেক বেশি রিচ মনে হচ্ছে। দিপু, তুমি কি আমাকে এক গ্লাস গরম পানি দিতে বলবে? আমি এই পানিটা ডিরেক্টলি খেতে পারছি না।
দিপু : (একটু বিরক্ত হয়ে) হেনা, মা কত কষ্ট করে রান্না করেছেন দেখছো না? অন্তত এক লোকমা খেয়ে তো দেখো। এখানে কেউ তোমাকে জোর করছে না, কিন্তু রিজেক্ট করাটা তো অভদ্রতা।
হেনা : (গলা উঁচিয়ে) অভদ্রতা! আমি আমার স্বাস্থ্যের কথা ভাবছি সেটা অভদ্রতা? তুমি তো গ্রামে এসে এক দিনেই বদলে গেছো দিপু। কাল যখন তোমার পেটে সমস্যা হবে, তখন কিন্তু আমার ওই শহরের ওষুধের বক্সটাই খুঁজতে হবে।
বাবা : (পাশ থেকে শান্ত গলায়) থাক দিপু, মা’রে জোর করো না। ও শহরে মানুষ হয়েছে, ওর অভ্যাস আলাদা। বক্কর! ওরে বক্কর! মা’র জন্য দোকান থেকে একটা বড় সিল করা পানির বোতল নিয়ে আয় তো জলদি।
বক্কর : (বাইরে থেকে) আইছি চাচা! আমি এখনই দৌড়ে বাজারে যাচ্ছি। ভাবির জন্নি কোল্ড ড্রিঙ্কসও নিয়ে আসপো নাকি?
হেনা : (হতাশ হয়ে) না, লাগবে না। দিপু, আমি রুমে যাচ্ছি। আমার মাথা ধরছে।
(হেনা না খেয়েই উঠে চলে যায়। মা বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাতের বাটিটা নামিয়ে রাখেন। দিপুর মুখটা কালো হয়ে যায়। পল্টু খাওয়ার গতি কমিয়ে দেয়। একটা আনন্দঘন মুহূর্ত মুহূর্তেই থমথমে হয়ে যায়।)
দৃশ্য ১৫।। খোলা উঠোন।। বিকাল
চরিত্র : দিপু, হেনা, পল্টু।
[ফ্রেমে দেখা যায় উঠোনের একপাশে দিপু আর পল্টু বসে আছে। দিপু একটা ছোট কাঠের পিঁড়িতে বসে পুরনো দিনের মতো করে মুড়ি আর চানাচুর মাখা খাচ্ছে। পল্টু একটা লঙ্কা কামড় দিয়ে ঝালে উঁহু-আঁহু করছে। হেনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে মোবাইল উঁচিয়ে নেটওয়ার্ক খোঁজার চেষ্টা করছে।]
হেনা : (বিরক্ত হয়ে) ধুর! এই গ্রামে কি সিগন্যালও কোরবানি হয়ে গেল নাকি? একটা মেইল চেক করতে পারছি না। দিপু, তোমার ফোনের কী অবস্থা?
দিপু : (তৃপ্তি করে মুড়ি খেতে খেতে) হেনা, এখানে সিগন্যাল থাকে না, এখানে থাকে মানুষের ডাক। মোবাইলটা রাখো তো, দেখো আকাশটা কত সুন্দর! ঠিক যেন কারো আঁকা ছবি।
হেনা : (নিচে নেমে এসে) আকাশ দিয়ে কি আমার কাজ হবে? আর তুমি এই খোলা জায়গায় বসে কী সব খাচ্ছ? ধুলোবালি পড়ছে তো! পল্টু ভাই, আপনিও কি দিপুর মতো আদিম হয়ে গেলেন?
পল্টু : (চোখ টিপে) ভাবি, এই মুড়ি হলো ‘ভিলেজ পপকর্ন’। মুভি থিয়েটারের পপকর্ন তো এয়ার টাইট প্যাকেটে থাকে, আর এটা একদম খোলা আকাশের নিচে মুক্ত হাওয়ায় ভাজা। খেয়ে দেখেন, ভেতরে একটা ‘অরগানিক ক্রাঞ্চ’ আছে!
হেনা : (ঘেন্নায় মুখ কুঁচকে) আপনাদের রুচি দেখে আমি অবাক হই।
(এমন সময় বক্কর দৌড়ে আসে। তার পেছনে গ্রামের ৩-৪ জন ছোট বাচ্চা। সবার গায়ে আধো-পুরনো জামা, কিন্তু চোখেমুখে প্রচণ্ড আনন্দ।)
বক্কর : দিপু ভাই! ও দিপু ভাই! পাড়ার ছেলেপেলে সব জড়ো হইছে। ওরা শুনিছে আপনি নাকি ঢাকা থেইকে ওদের জন্য ‘লাটিম’ আর ‘চকলেট’ আনিছেন?
দিপু : (হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়ে) হ্যাঁ রে বক্কর। হেনা, আমার ওই বড় নীল ব্যাগটা নিয়ে এসো তো।
হেনা : (অবাক হয়ে) ওটা তো একটা দামি ব্র্যান্ডের ব্যাগ! ওটার ভেতর ওই সব সস্তা খেলনা ভরেছ? আর এখন কেন? ওদের কাল দিলেই হতো।
দিপু : (দৃঢ় স্বরে) আনন্দ কালকের জন্য জমিয়ে রাখতে নেই হেনা। ওটা নিয়ে এসো।
(হেনা অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্যাগটা আনে। দিপু ব্যাগ খুলে রঙ-বেরঙের লাটিম, ফিতে আর চকোলেটের প্যাকেট বের করে বাচ্চাদের দিকে বাড়িয়ে দেয়। বাচ্চারা ‘দিপু কাকা’ ‘দিপু কাকা’ বলে হইচই করে ওঠে। তাদের এই সরল আনন্দ দেখে হেনা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।)
বাচ্চা : (হেনার দিকে তাকিয়ে) ও দিপু কাকা, এই সুন্দর মেয়েটা কে? উনি কি পরির দেশ থেইকে আইছে? ওনার হাতে ওটা কী? (হেনার দামি স্মার্ট ওয়াচ।)
পল্টু : (হেসে) না রে পাগলা, উনি পরির দেশের না, উনি হলেন ‘শহরের রানি’। ওনার হাতে ওটা হলো ‘জাদুর আয়না’, ওটা দিয়ে উনি সারা দুনিয়া দেখে ফেলে!
বাচ্চা : (সরলভাবে হেনার কাছে গিয়ে) রানি মা, আপনি কি একটা চকলেট খাবেন? আমার কাছে দুইটা আছে, একটা আপনারে দেই?
(বাচ্চাটি তার নোংরা কিন্তু নিষ্পাপ হাত দিয়ে একটা ছোট চকলেট হেনার দিকে বাড়িয়ে দেয়। হেনা প্রথমে পিছিয়ে যেতে চায়, কিন্তু বাচ্চার চোখের দিকে তাকিয়ে সে আর না করতে পারে না। সে হাত বাড়িয়ে চকলেটটা নেয়। দিপু আড়চোখে এই পরিবর্তনটা দেখে মনে মনে হাসে।)
হেনা : (নিচু স্বরে) থ্যাংক ইউ…
বক্কর : দেখছেন দিপু ভাই! ছোট ভাবি তো হাসছে! আইজ মনে হয় গ্রামে পূর্ণিমা নামব!
(সবাই হেসে ওঠে। বাচ্চারা চকোলেট আর লাটিম নিয়ে দৌড়ে পালায়। হেনা চকোলেটটা হাতে নিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। তার শহরের কাঠিন্য যেন একটু একটু করে গলে যাচ্ছে।)
দৃশ্য ১৬।। উঠোন।। রাত
চরিত্র : বাবা, দিপু, হেনা, পল্টু।
[ফ্রেমে দেখা যায় নিস্তব্ধ চারপাশ, শুধু বাঁশঝাড়ের দিক থেকে হুতুম প্যাঁচার ডাক শোনা যাচ্ছে। উঠোনের মৃদু আলোয় দিপু আর তার বাবা বসে আছে। হেনা বারান্দার অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে তাদের কথা আড়ি পেতে শুনছে।]
বাবা : (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) দিপু, এবারের ঈদটা যেন আমার কাছে হারানো দিন ফিরে পাওয়ার মতো মনে হচ্ছে রে। তুই আসবি কি আসবি না—এই চিন্তায় তোর মা তো গত সাতদিন ধরে ঠিকমতো চোখ বুজতে পারেনি।
দিপু : (বাবার পায়ে হাত রেখে) আমারও খুব আসতে ইচ্ছে করত বাবা, কিন্তু সংসারের চাপে আর হেনার আপত্তির মুখে সবসময় পেরে উঠতাম না। তবে এবার যখন গরুর টাকাটা পাঠালাম, তখন মনে হলো—এই আনন্দটা তো শুধু আমার না, এটা আমার শেকড়ের পাওনা।
বাবা : (একটু ম্লান হেসে) জানিস বাবা, লোকে বলে শহরে গেলে মানুষ নাকি বদলে যায়। হেনা মা-কে দোষ দেই না, ও তো এই ধুলোবালির মায়া বুঝবে না। কিন্তু তোর কথা মনে পড়লে আমার বুকটা ভরে ওঠে। ওই যে বিএসএ পড়ার সময় তুই যখন বাড়ি আসতিস, আমার ছেঁড়া গেঞ্জিটা দেখে তুই কেঁদে ফেলেছিলি—সেই মায়াটা তুই এখনো হারাসনি।
দিপু : (গলার স্বর ধরে আসে) বাবা, আপনি আর মা যদি না খেয়ে আমার পড়াশোনার খরচ না চালাতেন, আজ আমি এই এসি রুমে বসে বড় বড় কথা বলতে পারতাম না। ভবিষ্যৎ ভবিষ্যৎ করে মাকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না।
হেনা : (বারান্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে মনে মনে) এরা কি সারারাত এসব আদিখ্যেতাই করবে? নাকি ঘুমানোর চিন্তা আছে? কিন্তু… দিপু কি সত্যিই আমার অগোচরে এত কষ্ট সয়ে বড় হয়েছে?
(এমন সময় পল্টু লুঙ্গি মালকোঁচা মেরে একটা বড় টর্চলাইট নিয়ে প্রবেশ করে। তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ।)
পল্টু : (ফিসফিস করে) ও দোস্ত দিপু! সর্বনাশ হয়েছে! তোর শশুরের দেওয়া ওই দামি পারফিউমের বোতল মনে হয় কোনো তেনারা নিয়ে গেছে!
দিপু : (অবাক হয়ে) তেনারা মানে?
পল্টু : (আশেপাশে তাকিয়ে) আরে ওঝা-বৈদ্য ডাকতে হবে মনে হয়! আমি দেখলাম গোয়ালঘরের পেছনে একটা ছায়া ওটা শুঁকছে। গ্রামের ভূতগুলো কি এখন ফরাসি পারফিউম মেখে ঈদের নামাজে যাবে নাকি?
বক্কর : (পেছন থেকে হাসতে হাসতে আসে) ও পল্টু ভাই! ওটা ভূত না, ওটা হইলো কালু মিয়ার ছাগল! আপনার সেন্টের শিশি কামড়িয়ে নিয়া গেছে। এখন ছাগল ব্যাঁ ব্যাঁ কইরে ডাকতিছে!
হেনা : (বারান্দা থেকে বের হয়ে আসে) ওহ মাই গড! আমার দামি পারফিউম ছাগলে খাচ্ছে? দিপু! তুমি কি এখনো বসে বসে গল্প করবে? যাও ওটা উদ্ধার করো!
পল্টু : (হাসতে হাসতে) ভাবি, ছাগলকে কি এখন আমরা ইন্টারোগেশন করব? ওটা তো অলরেডি সাবাড় করে ফেলেছে! এখন ছাগলটা কোরবানি দিলে ভেতর থেকে সেন্টের ফোয়ারা বের হবে!
(হেনা রাগে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে, কিন্তু দিপু আর তার বাবা হাসিতে ভেঙে পড়েন। গ্রামের এই সহজ-সরল হাস্যরস যেন রাতের গাম্ভীর্যকে মুহূর্তেই ম্লান করে দেয়। হেনা বিরক্ত হলেও তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।)
দৃশ্য ১৭।। উঠোন।। দিন
চরিত্র : দিপু, হেনা, মা।
[ফ্রেমে দেখা যায় হেনা একটা চেয়ারে বসে আছে। এমন সময় গেট দিয়ে দিপু ও পল্টু প্রবেশ করে। তাদের অবস্থা শোচনীয়—পা থেকে কোমর পর্যন্ত কাদা, হাতের গামছায় কয়েকটা লাফানো জ্যান্ত মাছ। দিপুর কপালে কাদার একটা টিপ, কিন্তু চোখেমুখে জয়ের আনন্দ।]
দিপু : (উৎসাহের সাথে) হেনা! দেখো কী এনেছি! একেবারে বিলের টাটকা শোল আর টাকি মাছ। বক্কর আর আমি মিলে কাদার ভেতর থেকে হাত দিয়ে ধরেছি। উফ, কী যে আনন্দ!
হেনা : (চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে) ওহ মাই গড! দিপু! এটা কী অবস্থা তোমার? তুমি কি ডাস্টবিনে পড়ে গিয়েছিলে? তোমার এই জামা, তোমার গায়ের এই কাদা… ছি ছি! ডোন্ট টাচ মি! একদম কাছে আসবে না!
পল্টু : (হাসতে হাসতে কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে) ভাবি, দিপু তো আজ এক্কেবারে ‘টারজান’ হয়ে গিয়েছিল। কাদার ভেতর ডুব দিয়ে মাছ ধরা যে কত বড় আর্ট, সেটা ও আজ প্রমাণ করেছে।
হেনা : (চিৎকার করে) শাট আপ পল্টু ভাই! এটা আর্ট নয়, এটা নোংরামি। দিপু, তুমি একজন শিক্ষিত মানুষ, শহরে বড় পজিশনে জব করো—তোমার কি ন্যূনতম রুচিবোধ নেই? এই মাছগুলো কি এখনই রান্না হবে? এগুলোর গায়ে তো নর্দমার গন্ধ!
দিপু : (একটু থমকে গিয়ে) হেনা, এটা নর্দমা না, এটা বিলের পরিষ্কার কাদা। আর এই মাছের স্বাদের কাছে শহরের ফরমালিন দেওয়া মাছ নস্যি। তুমি কেন সবকিছু এতো নেতিবাচকভাবে নিচ্ছ?
হেনা : (রাগে কাঁপতে কাঁপতে) নেতিবাচক! তুমি কাদার মধ্যে গড়াগড়ি খাবে আর আমি তালি দেবো? আমি এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যেতে চাই। বক্কর ভাই কোথায়? ওকে বলো গাড়ি ডাকতে। আমি আর এক মিনিটও এই আনহাইজেনিক জায়গায় থাকব না।
মা : (ঘর থেকে বেরিয়ে এসে) কী হইছে রে? ওরে দিপু, এ কী হাল করছিস নিজের? যা যা, কুয়োর পাড়ে গিয়ে আগে ভালো করে সাবান দিয়ে গোসল কর। বউমা, তুমি রাগ করো না মা। ও তো ছোটবেলা থেকেই এমন ডানপিটে।
হেনা : (মায়ের দিকে তাকিয়ে) মা, আপনি ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? ও তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। ওর এই অবস্থা দেখে আমার বমি আসছে।
দিপু : (শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায়) হেনা, অসুস্থ আমি হবো না, অসুস্থ তোমার মানসিকতা। তুমি মাটির গন্ধ সইতে পারো না, অথচ এই মাটির অন্ন খেয়েই তুমি বড় হয়েছো। বক্কর! পানি তোল, আজ কুয়োর ঠাণ্ডা পানিতেই গোসল সারবো।
(দিপু হনহন করে চাপকল পাড়ে চলে যায়। হেনা রাগে গজগজ করতে করতে ঘরের দিকে যায়। পল্টু আর মা একে অপরের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকেন। দূরে বক্কর কল চেপে বালতি ভরে পানি দিচ্ছে দিপু মনের আনন্দে গোছল করছে।)
দৃশ্য ১৮।। উঠোন।। রাত
চরিত্র : পল্টু, মা, দিপু, হেনা, বক্কর।
[ফ্রেমে দেখা যায় রাতের আমেজ চারদিকে। উঠোনে বড় একটা পাটি বিছিয়ে মা, দিপু এবং পল্টু বসে আছেন। মা একটা বড় গামলায় চালের গুঁড়ো নিয়ে রুটি বানাচ্ছেন। দিপু আর পল্টু তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে, যদিও তারা কাজের চেয়ে অকাজই বেশি করছে। হেনা বারান্দায় মোড়ায় বসে দেখছে।]
পল্টু : (রুটি বেলতে গিয়ে রুটির মানচিত্র বানিয়ে ফেলে) দোস্ত দিপু, দেখ! আমি রুটি দিয়ে একদম অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ বানিয়ে ফেলেছি। চাচি, এই রুটি খেলে কি সিডনি যাওয়ার ভিসা পাওয়া যাবে?
মা : (হেসে কুটিপাটি) ওরে পাগলা ছেলে! রুটি কি আর অত ত্যাড়া-ব্যাঁকা হয়? তুই বরং বসে বসে আগুনের তাপ দে। আর দিপু, তুই একটু লবণটা দেখে দে তো বাবা।
দিপু : (রুটি সেঁকতে সেঁকতে) মা, হেনার জন্য কি আলাদা কিছু করছ? ও তো আবার বেশি তেলের খাবার সহ্য করতে পারে না।
মা : (মমতায়) বউমার জন্য আমি আলাদা করে আতপ চালের গুঁড়ো দিয়ে সেদ্ধ পিঠা করছি বাবা। ওতে তেল নেই, ধোঁয়া নেই—একদম সাদা ধবধবে।
হেনা : (বারান্দা থেকে নেমে আসতে আসতে) আচ্ছা মা, আপনারা এই রাত জেগে এত খাটেন কেন? সকালে তো ঘুম থেকে উঠতে পারবেন না। আর দিপু, তোমার ড্রেসে আবার আটা লেগেছে! ছি, তুমি দিন দিন একদম গ্রামের চাষাভুষো হয়ে যাচ্ছ।
পল্টু : (টিপ্পনী কেটে) ভাবি, চাষা হওয়া তো গর্বের বিষয়! আর এই আটা হলো ‘ন্যাচারাল ট্যালকম পাউডার’। দেখুন, দিপুকে কেমন ফর্সা লাগছে! আপনিও একটু মেখে দেখবেন নাকি? সানস্ক্রিনের চেয়ে ভালো কাজ করবে।
হেনা : (বিরক্তি চেপে) আপনার রসিকতা থামান তো। দিপু, শুনলাম কাল সকালে নাকি খুব ভোরে উঠতে হবে? কেন? কুরবানি তো দুপুরেও দেওয়া যায়।
দিপু : (দৃঢ় গলায়) না হেনা, বাবার ইচ্ছে সকাল সকাল কুরবানি দিয়ে মাংস বিলিয়ে দেওয়া। ঈদের আনন্দ তো ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে। আর শোনো, মা তোমার জন্য যে পিঠা বানাচ্ছে, ওটা খেয়ে দেখো—শহরের কেকের চেয়েও নরম।
বক্কর : (হঠাৎ পাড়ায় হইচই করতে করতে ঢোকে) দিপু ভাই! ও দিপু ভাই! পাড়ায় মেহদি লাগানোর ধুম পড়ছে। আপনার মেয়েরে পাঠালাম, ওরা তো মেহদি দিয়ে একদম হাত রাঙিয়ে ফেলছে! ভাবি, আপনিও দেবেন নাকি? আমাদের বাড়ির গাছ থেইকে টাটকা মেহদি পাতা বাটিছি।
হেনা : (নাক সিঁটকে) মেহদি পাতা? ওতে ইনফেকশন হতে পারে। আমার কাছে টিউব মেহদি আছে।
মা : (শান্তভাবে) টিউব মেহদিতে রঙ হয় ঠিকই মা, কিন্তু পাতার মেহদিতে মায়া থাকে। একটু লাগিয়ে দেখো না, সারা বছর হাতে এই স্মৃতি লেগে থাকবে।
(হেনা মায়ের কথার কোনো উত্তর দেয় না, কিন্তু সে চুপচাপ মাটির চুলার আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। আগুনের নাচন আর দিপুর হাসি তাকে কোথাও যেন একটা শিকড়ের টানে বেঁধে ফেলছে। সে ধীরে ধীরে দিপুর পাশে গিয়ে বসে।)
পল্টু : (চুপিচুপি দিপুকে) দেখছিস দোস্ত? আইসক্রিম গলতে শুরু করেছে! কাল সকালে দেখবি ভাবি নিজেই গরুর দড়ি ধরে টানছে!
দিপু : (হেসে) অতটা আশা করিস না রে পল্টু। আমার পুরো পরিবারটা একসাথে আছে—এটাই আমার বড় পাওয়া।
দৃশ্য ১৯।। উঠোন।। ঈদের দিন সকাল
চরিত্র : দিপু, বাবা, পল্টু, বক্কর, মা।
[ফ্রেমে দেখা যায় চারপাশে খুশির আমেজ। দিপু ও তার বাবা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরে জায়নামাজ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। বক্কর নতুন একটা লাল রঙের লুঙ্গি পরে উঠোনে লাফালাফি করছে। পল্টু পাঞ্জাবির সাথে দামী সানগ্লাস পরে পোজ দিচ্ছে। হেনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে, তার চোখে এখনো ঘুমের রেশ।]
দিপু : (বাবার পাঞ্জাবির কলার ঠিক করে দিয়ে) বাবা, আপনাকে একদম আগের মতো জোয়ান লাগছে। ঠিক যেন সেই ছোটবেলায় যখন আমার হাত ধরে ঈদগাহে নিয়ে যেতেন।
বাবা : (হেসে) আর তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই সেই ছোট্ট দিপুটিই আছিস। শুধু বড় হয়েছিস শরীরের মাপে, মনটা তোর এখনো সেই সরলই রয়ে গেছে।
পল্টু : (সানগ্লাস মুছে) চাচা, আমার পাঞ্জাবিটা কেমন হয়েছে? বক্কর বলছে আমাকে নাকি একদম ‘শহুরে দুলাভাই’ লাগছে!
বক্কর : (হেসে) শুধু দুলাভাই না পল্টু ভাই, আপনেরে তো এক্কেবারে সিনেমার নায়ক লাগতেছে! এখন একটা নায়িকা পাইলে গান শুরু কইরা দিতাম।
হেনা : (বারান্দা থেকে) দিপু, সাবধানে যেও। ঈদগাহে অনেক ভিড় হবে, ধুলোবালি নাকে গেলে তোমার আবার অ্যালার্জি শুরু হবে। আর শোনো, ফেরার সময় ওই বক্করকে বলো যেন ভালো পানি দিয়ে হাত-পা ধোয়ার ব্যবস্থা রাখে।
দিপু : (মৃদু হেসে) হেনা, আজ অ্যালার্জিকে ছুটি দিয়েছি। আজ শুধু কোলাকুলির দিন। তুমি রেডি হয়ে থেকো, নামাজ শেষে কিন্তু কোরবানি শুরু হবে।
মা : (রান্নাঘর থেকে মিষ্টির বাটি নিয়ে বের হন) ওরে দিপু, নামাজে যাওয়ার আগে এক চামচ সেমাই মুখে দিয়ে যা বাবা। খালি পেটে যেতে নেই। বউমা, তুমিও একটু খেয়ে দেখো, নিজের হাতে নারকেল কোরা দিয়ে বানিয়েছি।
হেনা : (একটু ইতস্তত করে) মা, আমি তো সকালে হেভি কিছু খাই না… তবে আপনার হাতেরটা একটু ট্রাই করা যায়।
(হেনা এক চামচ সেমাই মুখে দেয়। তার চেহারায় এক তৃপ্তির আভাস ফুটে ওঠে।)
হেনা : (আস্তে করে) এটা… এটা তো সত্যিই অনেক ইয়ামি! ঢাকার কোনো শপে এমন টেস্ট পাইনি।
পল্টু : (চোখ টিপে) ভাবি, এটার নাম হলো ‘মমতা স্পেশাল সেমাই’। এটার রেসিপি গুগল ম্যাপেও পাবেন না!
বাবা : (দিপুর হাত ধরে) চল বাবা, জামাতের সময় হয়ে গেল।
(বাবা ও দিপু গেটের দিকে এগিয়ে যান। বক্কর আর পল্টু তাদের পেছনে হাসাহাসি করতে করতে যায়। হেনা তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।)
মা : (হেনার পাশে এসে) মা, মন খারাপ করো না। তোমার শ্বশুরবাড়ি মানেই তো তোমার নিজের বাড়ি। একটু মানিয়ে নাও, দেখবে এই মাটিই তোমাকে আপন করে নেবে।
(হেনা মায়ের দিকে তাকায়)
দৃশ্য ২০।। উঠোন।। দুপুরবেলা
চরিত্র : হেনা, দিপু, পল্টু, বক্কর, বৃদ্ধ।
[ফ্রেমে দেখা যায় উঠোন জুড়ে মাংসের স্তূপ। দিপু, পল্টু এবং বক্কর মিলে মাংস ভাগ করছে। হেনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল, কিন্তু এখন সে নেমে এসেছে। তার হাতে আর জীবাণুনাশক স্প্রে নেই, বরং সে কৌতূহল নিয়ে বক্করের হাতে থাকা বড় পাল্লাটার দিকে তাকাচ্ছে। গ্রামের একদল মানুষ শাড়ি বা গামছা পেতে মাংস নেওয়ার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে।]
হেনা : (একটু ইতস্তত করে দিপুর কাছে গিয়ে) দিপু, এত মাংস তো তুমি ওদের দিয়ে দিচ্ছ। গ্রামের লোক তো দেখছি আসতেই থাকছে। শেষ হয়ে যাবে না?
দিপু : (হাসিমুখে মাংসের একটা বড় টুকরো ব্যাগে ভরতে ভরতে) হেনা, বাবার একটা কথা আছে—কোরবানির মাংসে বরকত থাকে। এটা যত বিলানো যায়, তত বাড়ে। দেখো, এই লোকগুলো হয়তো সারা বছর চাতক পাখির মতো এই দিনটার অপেক্ষায় থাকে।
পল্টু : (ঘাম মুছতে মুছতে) ভাবি, শহরের সুপার শপ থেকে মাংস কেনা আর এই মাটির ওপর বসে মাংস ভাগ করার মধ্যে তফাৎটা হলো—ওখানে শুধু পেট ভরে, আর এখানে প্রাণ ভরে। এই যে বক্কর দেখছেন, ও তো খুশিতে নিজেই একটা ‘গরু’র মতো লাফাচ্ছে!
বক্কর : (হেসে) পল্টু ভাই, আমি তো খুশিতে লাফাচ্ছি কারণ দিপু ভাই মাংসের সাথে সাথে আমারে একটা মস্ত বড় ‘হাড়’ গিফট দিছে! আজ তো ডাল-ভাত হবে না, আজ হবে শুধু মাংসের উৎসব!
বৃদ্ধপ্রতিবেশী : (মাংস নিতে নিতে হেনার দিকে তাকিয়ে) মা জননী, আল্লা তোমার সোয়ামিরে ভালো রাখুক। এমন বড় গরু এই গাঁয়ে আর কেউ দেয় নাই। আমরা দোয়া করি, তোমাগো ঘর যেন হুক-শান্তিতে ভইরা থাকে।
হেনা : (বৃদ্ধের দোয়ায় কিছুটা অভিভূত হয়ে) ঠিক আছে চাচা… আপনি একটু বেশি করে মাংস নিন। (বক্করকে ইশারা করে) বক্কর ভাই, ওনার ব্যাগে আরও দুই টুকরো সলিড মাংস দিন তো।
পল্টু : (চোখ ছানাবড়া করে) ওরে বাবা! দিপু দোস্ত, দেখ! ভাবি তো এখন ‘অ্যাডিশনাল মাংস’ বিতরণ শুরু করেছে। বক্কর, তুই পাল্লাটা ভাবির হাতে দে, উনিই আজ ডিস্ট্রিবিউশন ম্যানেজার!
হেনা : (লজ্জা পেয়ে) ধুর! আমি শুধু বলছিলাম ওনারা বয়স্ক মানুষ…।
দিপু : (হেনার কাঁধে হাত রেখে) এটাই তো চেয়েছিলাম হেনা। দেখছো তো, ত্যাগের আনন্দটা কেমন? এই যে মানুষগুলো দোয়া করছে, এটাই তো আমাদের আসল সেভিংস।
(এমন সময় দিপুর মা বড় এক গামলা কাঁচা আম দিয়ে রান্না করা টক-মিষ্টি শরবত নিয়ে আসেন।)
মা : ওরে দিপু, বউমা—তোমরা অনেক খাটছ। এই নাও, একটু শরবত খেয়ে নাও। বউমা, তোমার যদি আবার রোদে মাথা ধরে, তুমি ঘরের ভেতরে যাও।
হেনা : (শরবতের গ্লাসটা নিয়ে) না মা, আমি ঠিক আছি। বরং আপনি ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম নিন, আমি আর দিপু মিলে বাকিটা শেষ করছি।
(মা অবাক চোখে হেনার দিকে তাকান। তাঁর চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। হেনা এখন আর শহরের ‘পর’ নয়, সে যেন এই বাড়ির বড় বউ হয়ে মাংসের রক্ত আর ঘামের সাথে মিশে গেছে।)
পল্টু : (সরবতে চুমুক দিয়ে) বাহ! ভাবি তো দেখি একদম ‘ভিলেজ লেডি’র মতো কমান্ড দিচ্ছে। বক্কর, তুই তাড়াতাড়ি কর, ভাবির অর্ডারে গাফিলতি করলে কিন্তু চাকরি থাকবে না!
(সবাই হেসে ওঠে। রোদের তেজ যেন এই হাসির কাছে হার মেনে যায়।)
দৃশ্য ২১।। বারান্দা।। বিকেল
চরিত্র : মা, পল্টু, হেনা, দিপু।
[ফ্রেমে দেখা যায় বারান্দায় লম্বা পাটি বিছানো হয়েছে। মাটির থালা-বাসনে খাওয়ার আয়োজন চলছে। দিপু, পল্টু এবং বাড়ির বাচ্চারা গোল হয়ে বসেছে। দিপুর বাবা তদারকি করছেন। হেনা বারান্দার এক কোণে একটা ছোট পিঁড়িতে বসে আছে। তার সামনে মাটির সরায় ধোঁয়া ওঠা বাসমতী চালের ভাত আর হাড়সহ মাংসের ঝোল।]
মা : (পরম মমতায়) বউমা, আমি তোমার জন্য একদম কম ঝাল দিয়ে আলাদা করে রেঁধেছি। এই যে শসা আর লেবু, একটু খেয়ে দেখো তো মা।
হেনা : (মাংসের ঝোলটা আঙুল দিয়ে একটু মুখে দিয়ে) মা, ঝাল তো একদম পারফেক্ট! কিন্তু এই মাংসটা এত সফট কীভাবে হলো? ওভেনে তো এত সুন্দর হয় না!
পল্টু : (বিশাল এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে) ভাবি, এটার সিক্রেট হলো—মাটির চুলার আঁচ আর চাচির হাতের ‘ম্যাজিক মসলা’। এই মাংস খাওয়ার পর শহরের ফাইভ স্টার হোটেলের স্টেক আপনার কাছে রাবার মনে হবে!
দিপু : (তৃপ্তি করে খেতে খেতে) হেনা, তোমার মনে আছে? বিয়ের পর প্রথমবার যখন তোমাকে বাড়িতে আনলাম, তুমি ভাতের মাড়ের গন্ধ পাচ্ছ বলে খেতে চাওনি। আজ তো দেখি তুমি নিজেই কাঁচা লঙ্কা চটকে খাচ্ছ!
হেনা : (লজ্জা পেয়ে) তখন আমি ছোট ছিলাম দিপু, বুঝতাম না। এখন মনে হচ্ছে, এই ফ্রেশ খাবারের স্বাদই আলাদা। আর মা, আপনি ওই যে টক দইটা বানিয়েছেন, ওটা কি নিজের গরুর দুধের?
মা : হ্যাঁ মা। নিজের হাতে পাতা দই। দিপু খুব পছন্দ করে।
বক্কর : (এক পাশে বসে খেতে খেতে) ছোট ভাবি! আপনি যদি এই দই দিয়া চিনি মিশাইয়া খান, তবে তো আপনের গায়ের রঙ দুধে-আলতায় মিশা এক্কেরে চকমকা হইয়া যাইব!
পল্টু : (হাসতে হাসতে) বক্কর, তুই তো দেখছি ভাবিকে ‘বিউটি টিপস’ দেওয়া শুরু করলি! তুই বরং তোর পাতে নজর দে, না হলে দিপু তোর হাড়টা নিয়ে নেবে।
বাবা : (হাসিমুখে) খাও বাবা, প্রাণভরে খাও। কতদিন পর এই বাড়িটা মানুষের হাসাহাসিতে মুখর হলো। মা আমার (হেনার দিকে তাকিয়ে), তুমি এসেছ বলে বাড়িটা যেন লক্ষ্মীশ্রী ফিরে পেয়েছে।
(বাবার এই সহজ কথাটি হেনার মনে গিয়ে বিঁধে। সে বুঝতে পারে, এতদিন সে শুধু আর্থিক ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে, হেনা ধীরে ধীরে মায়ের পাতে নিজের থেকে এক টুকরো ভালো মাংস তুলে দেয়।)
হেনা : মা, আপনিও খান। সারাদিন তো আপনি শুধু আমাদেরই খাওয়ালেন।
(মা অবাক হয়ে হেনার দিকে তাকান। তাঁর চোখে আনন্দাশ্রু। দিপু হেনার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি দেয়। পল্টু আড়ালে দিপুর পিঠ চাপড়ে দেয়, যেন বলতে চাইছে—‘মিশন সাকসেসফুল’!)
পল্টু : দোস্ত, এই আনন্দের ট্যাক্স যদি সিঙ্গাপুরে দিতে হতো, তবে তো আমরা দেউলিয়া হয়ে যেতাম! গ্রামের এই ‘ফ্রি’ আনন্দই সেরা।
দৃশ্য ২২।। পুকুরঘাট।। বিকেল বেলা
চরিত্র : হেনা, পল্টু, দিপু, বক্কর।
[পুকুরঘাটের সিঁড়িতে দিপু আর পল্টু বসে পা দোলাচ্ছে। পাশে এক গাদা জামাকাপড় ও সাবান। দিপু একটা লুঙ্গি ধোয়ার চেষ্টা করছে। হেনা পুকুরপাড়ের একটি আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে এই ‘আদিম’ ধোয়ামোছা দেখছে।]
হেনা : (দূর থেকে) দিপু! তুমি কি সিরিয়াসলি এই পুকুরের পানিতে ড্রেস ক্লিন করছ? এই পানিতে তো হাঁস সাঁতার কাটছে! জাস্ট ইমাজিন, ওখানে কত রকমের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে!
পল্টু : (পানিতে সাবান দিয়ে ফেনা তুলতে তুলতে) ভাবি, এই হাঁসগুলো হলো আমাদের ‘ন্যাচারাল ক্লিনার’। আর এই পানি হলো আয়ুর্বেদিক! এই পানিতে ধোয়া জামা পরলে গায়ে কোনো র্যাশ হবে না। আর দেখুন, দিপু তো রীতিমতো লন্ড্রি বয় হয়ে গেছে!
দিপু : (হেসে) হেনা, ওয়াশিং মেশিনের যান্ত্রিক ঘড়ঘড়ানির চেয়ে এই পুকুরের পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ অনেক বেশি আরামদায়ক। ছোটবেলায় মা এখানে বসে আমার হাফপ্যান্ট ধুয়ে দিতেন, আজ আমি নিজের পাঞ্জাবি ধুয়ে সেই দিনগুলো ফিল করছি।
হেনা : (এগিয়ে এসে) ফিল করা তো ঠিক আছে, কিন্তু তোমার স্কিনের বারোটা বাজবে। পল্টু ভাই, আপনিও কি তাকে থামাচ্ছেন না?
পল্টু : (গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে) আমি তো থামানোর জন্য নামিনি ভাবি, আমি নেমেছি দেখার জন্য যে মাছগুলো আমার পায়ের তলায় সুরসুরি দিচ্ছে কি না! ওরে দিপু, দেখ! একটা পুঁটি মাছ তো আমার আঙুলে কামড় দিতে চাইছে। ও মনে হয় ভাবছে আমি শহরের কোনো বড় সাইজের টোপ!
বক্কর : (হঠাৎ একটা লুঙ্গি মালকোঁচা মেরে দৌড়ে এসে পুকুরে এক বিশাল ঝাঁপ দেয়) ও দিপু ভাই! ও পল্টু ভাই! সরে দাঁড়ান, আমি আসলাম ‘টাইটানিক’ স্টাইলে!
(বক্করের লাফে পানির ঝাপটা এসে হেনার দামি সালোয়ার কামিজে লাগে। হেনা প্রথমে বিরক্ত হয়ে চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে যায়। সে দেখে বক্কর, দিপু আর পল্টু হো হো করে হাসছে। হেনা নিজের অজান্তেই মুচকি হাসে।)
হেনা : (রুমাল দিয়ে পানি মুছতে মুছতে) তোমরা সবাই জাস্ট বাচ্চা হয়ে গেছো। দিপু, তোমার মুখটা রোদে পুড়ে লাল হয়ে গেছে। ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন?
দিপু : (মুগ্ধ হয়ে হেনার দিকে তাকিয়ে) তাকিয়ে আছি কারণ—শহরের ওই দামী মেকআপের চেয়ে এই পুকুরের পানির ছিটে লাগা মুখটা তোমাকে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে হেনা। তুমি আজ আমাদের গ্রামের সাথে মিশে গেছো।
হেনা : (লজ্জা পেয়ে আকাশ দেখতে দেখতে) ধুর! যা-তা বলো না তো। বক্কর ভাই, আমাকে একটা কলস এনে দিন তো। আমি পুকুর থেকে পানি নিতে চাই না, কিন্তু চাপকলের ঠাণ্ডা পানি দিয়ে একটু মুখ ধুতে চাই।
পল্টু : (মজা করে) বক্কর, যা! ভাবির জন্য ‘ন্যাচারাল ফেসওয়াশ’ নিয়ে আয়। আর শোন, বালতি দেখে নিয়ে আসিস যেন আবার ব্যাঙ না থাকে, তাহলে ভাবি আবার হাইজাম্প দিয়ে ঢাকা চলে যাবে!
(সবাই হাসাহাসিতে মেতে ওঠে। হেনা এখন আর বিরক্তি দেখাচ্ছে না, বরং সে এই গ্রামীণ কোলাহলের অংশ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। পুকুরপাড়ের শীতল বাতাস যেন তাদের শহরের সব ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছে।)
দৃশ্য ২৩।। বাগান।। বিকেল
চরিত্র : পুটু, নিধি, হেনা।
[ফ্রেমে দেখা যায় হেনা বেঞ্চের ওপর খুব সাবধানে তার ওড়না বিছিয়ে বসে আছে। হাতে স্মার্টফোন, কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় সে বারবার ফোনটা উপরে তুলে সিগন্যাল খোঁজার চেষ্টা করছে। এমন সময় গ্রামের তিন-চারটি ছোট বাচ্চা (যাদের পরনে আধো-ময়লা জামা, কারও হাত ভাঙা গোল্লাছুট খেলার উত্তেজনায় ধুলোমাখা) উঁকি দিয়ে তাকে দেখছে।]
পুটু : (ফিসফিস করে) ওই দেখ, দিপু ভাইয়ের শহরের বউ। কেমন আয়নার মতো চশমা পরছে দেখ!
নিধি : (সাহস করে সামনে এসে) ও ছোট ভাবি! আপনার হাতে ওটা কী? ওইটা দিয়ে কি ছবি দেখা যায়?
হেনা : (একটু চমকে গিয়ে দূরত্ব বজায় রেখে) এটা স্মার্টফোন। তোমরা এখানে কী করছো? আর এতো ধুলোবালি কেন তোমাদের গায়ে? সাবান দিয়ে হাত ধোওনি?
পুটু : (হেসে) ধুলোবালি না থাকলে কি খেলা জমে ভাবি? আমরা তো এইমাত্র গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়েছি। খাবেন একটা? এই দেখেন—লবণ আর মরিচ দিয়ে মাখিয়েছি।
(পুটু তার ছোট্ট হাতের তালুতে মরিচ মাখানো এক টুকরো আম হেনার দিকে এগিয়ে দেয়। হেনা আঁতকে উঠে পিছিয়ে যায়।)
হেনা : ওহ মাই গড! নো, নো! ওই হাতে কত জার্মস আছে তোমরা জানো? আর এই আম… এটা না ধুয়েই মরিচ মেখেছো? তোমাদের পেটে তো ইনফেকশন হয়ে যাবে!
নিধি : (অবাক হয়ে) ইনফেকশন কী ভাবি? আমাগো তো কিছু হয় না। আমরা তো প্রতিদিন পুকুরে ঝাপ দেই, আর গাছের ফল পেড়ে খাই। আমাগো পেট তো লোহার মতো শক্ত!
হেনা : (বিরক্তির সাথে) লোহা নয়, ওটা তোমাদের ধারণা। তোমরা জানো না মাইক্রোবস কী জিনিস। দিপু কোথায়? ওকে তো কোথাও দেখছি না।
পুটু : দিপু ভাই তো বক্কর ভাইয়ের সাথে ওই বড় বিলে গেছে মাছ ধরতে। দিপু ভাই তো লুঙ্গি পরে কাদার মধ্যে নেমেছে। আমাদের খুব মজা লাগছে!
হেনা : (নিজের মনে) কাদার মধ্যে নেমেছে! ছি! লোকটার রুচি বলতে আর কিছু থাকল না। (বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে) তোমরা এখান থেকে যাও তো। আমার কাজ আছে।
নিধি : (যাওয়ার সময় মুচকি হেসে) ভাবি, আপনি খুব সুন্দর। কিন্তু আপনি কেন এত ভয় পান? মাটি তো আমাগো মা, মা কি কখনো সন্তানের ক্ষতি করে?
(বাচ্চারা হাসতে হাসতে দৌড়ে চলে যায়। হেনা স্থির হয়ে বসে থাকে। নিধির শেষ কথাটি—‘মাটি তো আমাগো মা’—হেনার কানে বারবার বাজতে থাকে। সে নিজের দামি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়, যেখানে কোনো সিগন্যাল নেই, কিন্তু প্রকৃতির এই বিশাল লাইভ সিগন্যাল সে অস্বীকার করতে পারছে না।)
দৃশ্য ২৪।। বারান্দা।। সন্ধ্যাবেলা
চরিত্র : পল্টু, হেনা, দিপু, বাবা, মা, বক্কর।
[ফ্রেমে দেখা যায় বারান্দায় দিপু ও পল্টু পাটি পেতে বসে আছে। দিপুর হাতে একটা বাঁশের বাঁশি, যেটা সে মেলা থেকে কিনেছে। মা ও বাবা বারান্দার এক কোণে বসে দিপুর ছোটবেলার গল্প করছেন। হেনা দাওয়ার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে রাতের গ্রাম দেখছে।]
পল্টু : (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) দোস্ত দিপু, শহরের আকাশে তো শুধু ধোঁয়া আর লাইট দেখি। এখানে তাকালে মনে হয় কে যেন এক গাদা হীরা আকাশে ছড়িয়ে দিয়েছে। ভাবি, আপনার আইপ্যাডের চেয়ে এই আকাশটা কি বেশি ‘হাই-ডেফিনিশন’ না?
হেনা : (একটু নিচু স্বরে) সত্যিই সুন্দর। শহরে আমরা দেয়ালের ভেতর থাকতে থাকতে ভুলেই যাই যে মাথার ওপরে এত বড় একটা আকাশ আছে। দিপু, তুমি বাঁশি বাজাতে পারো?
দিপু : (হেসে) খুব একটা ভালো না, তবে সুর তোলার চেষ্টা করি। ছোটবেলায় বাবা আমাকে বাঁশি কিনে দিতেন যখন আমি পরীক্ষায় ভালো করতাম।
বাবা : (হেসে) হ্যাঁ রে দিপু। তোকে বাঁশি কিনে দিতাম যাতে তুই সুরে সুরে আনন্দ প্রকাশ করিস। আর আজ তোর মা তোকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। মা আমার (হেনার দিকে তাকিয়ে), তুমি কি জানো দিপু ছোটবেলায় কেমন ডানপিটে ছিল?
মা : ও তো একদিন গাছের আম পাড়তে গিয়ে প্যান্ট ছিঁড়ে এসে গোয়ালঘরে লুকিয়ে ছিল! ভয়ে বাড়িতে ঢুকছিল না।
হেনা : (মুচকি হেসে) দিপু, তুমিও এমন ছিলে? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি সবসময়ই এই গম্ভীর আর কাজের মানুষ।
দিপু : (বাঁশিতে হালকা ফুঁ দিয়ে) গ্রামের এই ধুলোবালিই আমাকে মানুষ বানিয়েছে হেনা। এই যে দেখছো বাবা-মা হাসছে, এই হাসির আড়ালে কত চোখের জল আছে তা আমি জানি। এই বাড়িটার প্রতিটি কোণ আমার ত্যাগের সাক্ষী।
পল্টু : (মজা করে) আর এখন ভাবি এই ত্যাগের সাক্ষী হয়ে গিয়েছেন! বক্কর কোত্থেকে এক গাদা ‘মুড়ি আর আখের গুড়’ নিয়ে এসছে। আজ রাতে নাকি ‘চাঁদনী রাতের মহফিল’ হবে!
বক্কর : (মুড়ির গামলা হাতে নিয়ে প্রবেশ) ও দিপু ভাই! আপনি সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারেন। আমরা আপনার বাঁশি বাজানো শুনতে চাই। আর ভাবির জন্নি আমি স্পেশাল ‘শিমুল তুলা’র বালিশ নিয়ে আইছি, যাতে রাতে শক্ত বালিশে ঘুমাতে কষ্ট না হয়।
হেনা : (বক্করের আন্তরিকতা দেখে অভিভূত হয়ে) ধন্যবাদ বক্কর ভাই। শোনো, কাল সকালে আমাকে একবার তোমার ওই ‘মেহদি গাছ’টা দেখিয়ে দিও তো। আমি নিজের হাতে একটু মেহদি ছিঁড়তে চাই।
পল্টু : (চোখ কপালে তুলে) মিরাকল! দিপু, তুই কি শুনলি? ভাবি এখন অর্গানিক মেহদি খুঁজছে! দোস্ত, তোর গ্রামের টানে তো দেখি হেনা ভাবিও ‘পল্লিবালা’ হয়ে যাচ্ছে!
(দিপু বাঁশিতে একটা মেঠো সুর তোলে। সেই সুরে রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। হেনা মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে। মা ও বাবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসেন।)
দৃশ্য।। ২৫।। বট তলা।। বিকেল
চরিত্র : আরজা, হেনা, বাবা, মা, পল্টু, বক্কর, দিপু।
[ফ্রেমে দেখা যায় বটগাছের নিচে বসে আছেন দিপু, হেনা এবং তাদের ছোট্ট মেয়ে ‘আরজা’। আরজার পরনে ছোট্ট একটা লাল শাড়ি, হাতে মেহদির আল্পনা। বক্কর ও পল্টু একটু দূরে দাঁড়িয়ে গ্রামের অন্য বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলছে।]
আরজা : (হেনার শাড়ির আঁচল ধরে) মা! দেখো, আমার হাতে মেহদিটা একদম তোমার হাতের মতো লাল হয়েছে। বক্কর চাচ্চু বললেন, এখানে নাকি জাদুর মেহদি পাওয়া যায়?
হেনা : (মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে) হ্যাঁ মা। এটা ভালোবাসার জাদু। তুমি যখন বড় হবে, তখন বুঝবে এই মাটির গন্ধের চেয়ে দামি কোনো পারফিউম পৃথিবীতে নেই।
দিপু : (বেদীতে হেলান দিয়ে) দেখেছো হেনা? সময় কত দ্রুত চলে যায়। একদিন তুমি এই বটগাছের তলায় বসে ভাবছিলে কীভাবে এখান থেকে পালাবে। আর আজ দেখো, আরজা এখানে আসার জন্য বায়না ধরে।
হেনা : (মৃদু হেসে) জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা আমি এই গ্রামেই পেয়েছি দিপু। শহর আমাদের ক্যারিয়ার দিয়েছে, কিন্তু গ্রাম আমাদের দিয়েছে ‘পরিচয়’। দেখো, এই বটগাছের তলায় আজ কত মানুষ বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। আমরা যে বেদীটা করে দিলাম, এটাই তো আসল সার্থকতা।
বাবা ও মা : (ধীরে ধীরে লাঠি ভর দিয়ে বটতলায় এগিয়ে আসেন) ওরে দিপু, বউমা—সূর্য তো ডুবে গেল। এবার ঘরে চল। আরজার তো আবার ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
আরজা : (দৌড়ে গিয়ে দাদুকে জড়িয়ে ধরে) না দাদু! আমি আজ দাদুর কোলে বসে গল্প শুনব। ওই যে দিপু বাবা কীভাবে মেলায় গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই গল্প!
(সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। পল্টু আর বক্কর ফুটবল খেলা শেষ করে হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে আসে।)
পল্টু : (ঘাম মুছতে মুছতে) উফ! এই বয়সেও বক্করের সাথে দৌড়ে পারলাম না। দোস্ত দিপু, আমি ঠিক করেছি রিটায়ারমেন্টের পর এই বটগাছের পাশেই একটা কুঁড়েঘর বানাব। শহরটা বড্ড কোলাহলের রে!
বক্কর : (হেসে) পল্টু ভাই, কুঁড়েঘর কেন? আপনের জন্য আমি রাজপ্রাসাদ বানায়ে দেবো! আপনি শুধু আমাদের সাথে থাকবেন।
দিপু : (সবাইকে আগলে ধরে) আমরা সবাই সবার সাথে থাকব। কোরবানি মানে তো শুধু পশু জবাই নয়, কোরবানি মানে হলো একে অপরের জন্য ত্যাগ করা। আর সেই ত্যাগের ফসলই হলো আমাদের এই হাসিভরা পরিবার।
(সূর্যটা দিগন্তে মিলিয়ে যায়। দিপু, হেনা, আরজা, বাবা-মা, পল্টু ও বক্কর—সবাই মিলে ধীর পায়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়। মেঠো পথে তাদের দীর্ঘ ছায়াগুলো একসাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। ত্যাগের মহিমা আর শেকড়ের টান যেন এক সুতোয় গেঁথে দেয় শহর আর গ্রামকে।)
দৃশ্য।। ২৬।। উঠোন।। সকাল
চরিত্র : হেনা, বক্কর, দিপু, পল্টু।
[হেনা আজ আর বারান্দায় নেই, সে রান্নাঘরের দরজার কাছে পিঁড়িতে বসে আছে। তার কপালে একটু ছাইয়ের টিপ লেগে আছে। সে মেহদি পাতা বাটছে।]
হেনা : (মেহদি বাটতে বাটতে) উফ বক্কর ভাই! এই শিলে বাটা তো অনেক কষ্টের। হাত তো ব্যথা হয়ে গেল। আপনাদের গ্রামের মেয়েরা কি প্রতিদিন এমন কষ্ট করে?
বক্কর : (গাছ থেকে আরও কিছু মেহদি ডাল পেড়ে আনতে আনতে) ও ছোট ভাবি, কষ্ট কীসের? এইটা তো আনন্দের কষ্ট। হাতে যখন লাল রঙ হইবো, তখন তো আয়নার সামনে থেইকা আপনে সরবেন না! ওই দেহেন, দিপু ভাই আপনেরে দেইখা হাসতেছে।
দিপু : (লুঙ্গি পরে গামছা কাঁধে নিয়ে প্রবেশ) হেনা, তোমাকে তো একদম গ্রামের গৃহবধূ লাগছে! বিশ্বাস করো, মেকআপের চেয়ে এই বাটা মেহদির গন্ধে তোমাকে অনেক বেশি রিয়েল লাগছে।
হেনা : (মুচকি হেসে) মেকআপের চেয়ে এর গন্ধটা সত্যিই অনেক স্ট্রং। আচ্ছা মা, এই মাংসটা যখন রান্না হবে, তখন কি এর ওপর আবার ওই ভাজা জিরার গুঁড়ো দেবেন? ওটার স্মেলটা দারুণ!
মা : (অবাক এবং খুশি হয়ে) হ্যাঁ রে মা। তুই তো দেখছি সব শিখে ফেললি। ওরে দিপু, তুই কি করছিস? বউমাকে কি আর ঢাকা নিবি না নাকি? ও তো মনে হচ্ছে আমার হাতের খুন্তিই কেড়ে নেবে!
পল্টু : (বিশাল এক গ্লাস মাঠা হাতে নিয়ে প্রবেশ) দোস্ত দিপু, সাবধান! ভাবি যদি এখানে সেটেল হয়ে যায়, তবে তোকে কিন্তু অফিস ফেলে এখানে এসে হাল চাষ করতে হবে। আমি তো অলরেডি মাঠা খেয়ে অর্ধেক মাতাল হয়ে গেছি!
হেনা : (পল্টুর দিকে তাকিয়ে) পল্টু ভাই, আপনার জন্য একটা নিউজ আছে। আমি দিপুকে বলেছি, কাল ফেরার সময় আপনার জন্য এক বস্তা মেহদি পাতা আর এক হাঁড়ি টক দই প্যাকিং করে দিতে। আপনি তো সারাজীবন একাই খেলেন, এবার একটু শহরে গিয়ে সবাইকে বিলিয়ে দেবেন।
পল্টু : (হাসতে হাসতে) ওরে বাবারে! ভাবি তো এখন সমাজসেবিকা হয়ে গিয়েছেন। বক্কর, তুই তাড়াতাড়ি প্যাকিং শুরু কর, না হলে ভাবি আবার আমার পকেটেও মেহদি ভরে দেবে!
বক্কর : (হেসে) পল্টু ভাই, মেহদি পকেটে না, মাথায় দেন—মাথা ঠাণ্ডা থাকবো!
(দিপু হেনার পাশে বসে তার বাটা মেহদি দেখে। হেনা একটু লাজুক হাসে।)
মা : বউমা, বাটা মেহেদী নিয়ে আমার কাছে এসো, আমি তোমার হাতে মেহেদী লাগিয়ে দেবো!
হেনা : এই তো মা আমি আসছি।
(হেনা পাটি পেতে বসে। মা নিজে হেনার হাতে নকশা করে মেহদি পরিয়ে দিচ্ছেন। দিপু ও পল্টু দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছে।)
হেনা : (অবাক হয়ে) মা! আপনি এত সুন্দর নকশা করতে পারেন? আমি তো ভেবেছিলাম গ্রামে শুধু গোল করে মেহদি দেয়। এটা তো একদম দামি পার্লারের মেহদি ডিজাইনের মতো লাগছে!
মা : (স্নেহমাখা হাসিতে) ওরে মা, এগুলো তো মনের নকশা। যখন দিপু ছোট ছিল, ওর হাতের তালুতেও আমি এমন করে লতা-পাতা এঁকে দিতাম। আজ তোকে দিচ্ছি—আমার মনে হচ্ছে আমার নিজের মেয়েটাকেই সাজাচ্ছি।
পল্টু : (দিপুকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে) দেখছিস দোস্ত? সিনারিও তো একদম পাল্টে গেছে। ভাবি এখন ‘হাইজিন’ আর ‘ব্যাকটেরিয়া’র কথা ভুলে মেহদি পাতার গন্ধে মাতাল হয়ে গেছে।
দিপু : (তৃপ্তির হাসি দিয়ে) ত্যাগের আনন্দ যখন মনে লাগে, তখন সব খুঁতখুঁতানি চলে যায় রে পল্টু। হেনার এই পরিবর্তনটা আমার কাছে এ বছরের সেরা ঈদের উপহার।
বক্কর : (টর্চলাইটটা হেনার হাতের ওপর ধরে রেখে) ছোট ভাবি! লড়াচড়া কইরেন না। মেহদি শুকাইলে যখন রঙ হইবো, দিপু ভাই তো আপনার হাত ধইরা ছাড়তেই চাইবো না!
হেনা : (লজ্জা পেয়ে) বক্কর ভাই, আপনি কিন্তু অনেক বেশি কথা বলছেন! দিপু, দেখো মা কত যত্ন করে দিচ্ছে। তোমার মনে আছে? বিয়ের পর তুমি একবার আমাকে মেহদি লাগিয়ে দিতে চেয়েছিলে, আর আমি বলেছিলাম—‘উফ! কী স্মেল, আমি মেকআপ ছাড়া কিছু লাগাব না।’ আজ আমার নিজের হাতেই সেই পাতার গন্ধটা কত ভালো লাগছে।
মা : (হেনার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে) যারা মাটির মানুষকে ভালোবাসতে পারে মা, মাটি তাদের কখনো নিরাশ করে না। তুই আজ আমার ছেলের ঘরটা পূর্ণ করলি।
পল্টু : (মজা করে) আর আমি? আমার হাতে কি কেউ মেহদি দেবে না? বক্কর, তুই অন্তত একটা গোল্লা এঁকে দে তো আমার হাতে—যেন লোকে ভাবে আমি ফুটবল খেলি!
বক্কর : (হাসতে হাসতে) পল্টু ভাই, আপনার হাতে মেহদি দিলে তো রঙ ধরবো না, মেহদিই শরমে সাদা হয়ে যাবে!
(সবার হাসাহাসিতে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়। হেনা তার মেহদি মাখানো হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেখানে মাটির মমতা আর শেকড়ের রঙ ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে।)
দৃশ্য ২৭।। বটতলা।। বিকেল
চরিত্র : পল্টু, দিপু, বক্কর, হেনা।
[ফ্রেমে দেখা যায় বটগাছের ছায়ায় বসে আছে দিপু, পল্টু আর বক্কর। দিপু স্মৃতি রোমন্থন করছে। হেনা আজ সাদা রঙের একটা সুতি শাড়ি পরেছে—যেটা দিপুর মা তাকে উপহার দিয়েছেন। সে বাচ্চাদের সাথে নিয়ে পুকুরপাড়ে শাপলা তুলছে।]
পল্টু : (ঘাসের ওপর শুয়ে থেকে) দোস্ত দিপু, এই বটগাছের তলায় বসলে মনে হয় সময়ের কোনো তাড়া নেই। শহরে তো প্রতি সেকেন্ডে ঘড়ির কাঁটার সাথে দৌড়াতে হয়। এখানে ঘড়িটাই যেন থমকে গেছে।
দিপু : (মাথা নিচু করে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে) এই গাছটার নিচেই আমি বসে থাকতাম, যখন অভাবের কারণে বই কিনতে পারতাম না। বাবা তখন এই গাছের তলায় এসে আমাকে সাহস দিতেন। বলতেন, ‘গাছ যেমন শিকড় ধরে টিকে থাকে, তুইও টিকে থাকবি।’ আজ মনে হচ্ছে এই গাছটাও আমাকে চিনে ফেলেছে।
বক্কর : (গাছের ডাল থেকে ঝুলে থেকে) দিপু ভাই, গাছ তো গাছই, আমাদের পাড়ার পাগলা কুকুর ‘টাইগার’ও তো আপনারে দেইখে লেজ নাড়ায়! আর ওই দেহেন, ভাবি তো শাপলা নিয়ে কি আনন্দ করতিছে! শাড়ি পইরে তো ওনারে একদম পাড়ার মেম্বারের মেয়ের মতো লাগতিছে!
পল্টু : (হেসে) মেম্বারের মেয়ে না রে বক্কর, ওনারে লাগছে একদম ‘বনলতা সেন’-এর মতো। ভাবি! ও ভাবি! শাপলা দিয়ে কি আজ ডিনার হবে নাকি?
হেনা : (শাপলা হাতে নিয়ে এগিয়ে এসে) কেন হবে না? মা বলেছেন শাপলার লতি দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না করলে নাকি দারুণ লাগে। দিপু, দেখো তো—এই ফুলগুলো কত ফ্রেশ! আমি কিছু ফুল সাথে করে নিয়ে যেতে চাই।
দিপু : (মুগ্ধ হয়ে হেনার দিকে তাকিয়ে) নিয়ে যেও। তবে হেনা, এই ফুলগুলো কিন্তু শহরে গিয়ে শুকিয়ে যাবে। ওখানের এসির বাতাসে এরা বাঁচে না। এরা শুধু এই কাদা-জলেই হাসে।
হেনা : (একটু বিষণ্ণ হয়ে) জানি। তবু এই স্মৃতিগুলো তো শুকাবে না। দিপু, আমি ভাবছিলাম… আমাদের মেয়েকে প্রতি বছর এখানে নিয়ে আসব। ও তো শুধু আইপ্যাড আর পিৎজা চেনে। ওকে শেখানো দরকার যে কাদা-মাটিতে পা দিলেই শরীর নোংরা হয় না, বরং মনটা পরিষ্কার হয়।
পল্টু : (তালি দিয়ে) শাবাশ ভাবি! আপনার এই কথার জন্য বক্করকে দিয়ে এখনই এক ডজন ডাব পাড়িয়ে আনছি। বক্কর, যা! ভাবির মুখে আজ জ্ঞানের আলো ফুটছে, ওনারে ডাব খাওয়ায়ে আরও ব্রাইট বানায়া দে!
বক্কর : (লাফ দিয়ে নিচে নেমে) এখনই আনতিছি! তবে দিপু ভাই, আগামী ঈদে কিন্তু এই বটগাছের নিচেই বড় কইরে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করবো আমরা। পুরা গ্রামের মানুষ খাবে!
দিপু : (দৃঢ় কণ্ঠে) অবশ্যই হবে। এবার একটা গরু দিয়েছি, আগামীতে আরও বেশি দেবো। এই শিকড়ের টান আমি আর কখনো ছিঁড়তে দেবো না।
(সূর্যটা বটগাছের আড়ালে ডুবে যাচ্ছে। হেনা তার শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিপুর পাশে এসে বসে। তাদের এই মিলন যেন শহর আর গ্রামের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।)
দৃশ্য ২৮।। রাস্তা।। সকাল
চরিত্র : হেনা, মা, পল্টু, দিপু, বাবা, বক্কর।
[ফ্রেমে দেখা যায় বাড়ির সামনে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বক্কর আর পল্টু মিলে গাড়ির ডিকিতে চালের বস্তা, বড় বড় ডাব, আর মা’র তৈরি পিঠা-পুলি তুলছে। দিপু তার বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। হেনার চোখে আজ কোনো চশমা নেই, তার দুই হাত মেহদির টকটকে লাল রঙে রাঙানো।]
হেনা : (মা’র হাত দুটো জড়িয়ে ধরে) মা, আমি কিন্তু যাওয়ার সময় অনেক কিছু নিয়ে যাচ্ছি। শুধু এই চাল-ডাল না, আপনার হাতের মমতাটাও ব্যাগে ভরে নিয়েছি। এবার ঢাকা গিয়ে আমার রান্নাঘরেও কিন্তু জিরার গুড়োর ঘ্রাণ পাওয়া যাবে!
মা : (চোখ মুছতে মুছতে) আবার আসিস মা। এই বুড়ো মানুষ দুটো সারা বছর তোদের পথ চেয়েই থাকে। এবার গিয়ে শরীরটার যত্ন নিস।
পল্টু : (গাড়ির ভেতর থেকে মাথা বের করে) চাচি, চিন্তা করবেন না! আমি তো আছিই—ভাবি যদি আবার ‘ব্যাকটেরিয়া’র ভয় পায়, আমি ওনারে জোর করে আপনার পাঠানো টক দই খাইয়ে শান্ত করে দেবো!
বাবা : (দিপুর মাথায় হাত রেখে) সাবধানে যাস বাবা। তোদের এই আসাটাই আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি। তুই যে আজ নিজের শিকড়টাকে ভুলিসনি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
বক্কর : (গাড়ির কাচ পরিষ্কার করতে করতে) দিপু ভাই, ছোট ভাবি—ভুইলা যাইয়েন না কিন্তু! আগামী ঈদে কিন্তু দুইটা গরু কোরবানি হইবো! আমি এখন থেইকাই ঘাস কাটা শুরু করুম।
হেনা : (হেসে) বক্কর ভাই, দুইটা কেন? দিপু যদি রাজি থাকে, আমরা আরও বড় কিছু করব। আর শোনেন, আপনার বিয়ের খবরটা কিন্তু পাঠাবেন—আমি ঢাকা থেকে দামি স্যুট নিয়ে আসব আপনার জন্য!
বক্কর : (লজ্জা পেয়ে) ওরে আল্লা! আমি তো স্যুটে এক্কেরে শহরের এমডি সাহেব হয়া যামু!
দিপু : (গাড়িতে ওঠার আগে বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে) বাবা, দোয়া করবেন। কোরবানি শেষ হলো ঠিকই, কিন্তু ত্যাগের যে শিক্ষাটা এবার পেলাম, তা যেন সারা বছর মনে থাকে।
(গাড়ি স্টার্ট হয়। হেনা জানলা দিয়ে হাত নাড়ে। তার হাতের সেই লাল মেহদি যেন গ্রামের মাটির রঙের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। মা ও বাবা গেটে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে থাকেন। গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে দূরে মিলিয়ে যায়। হেনা এখন আর এসির নব ঘোরাচ্ছে না, সে জানলা খুলে দিয়ে গ্রামের শেষ মুহূর্তের শুদ্ধ বাতাসটা টেনে নিচ্ছে।)
