
আব্দুল্লাহ্ আল বাকীর পিওর মসগ্রীন : সাম্প্রতিকের আত্মসংশ্লেষণ
এমরান কবির
বগুড়া লেখক চক্র কর্তৃক আয়োজিত স্পর্ধিত তারুণ্য কবিতা উৎসবের সম্মানিত সভাপতি, আয়োজক কমিটি, মঞ্চে উপবিষ্ট আলোচকবৃন্দ, উপস্থিত তরুণ লেখক- যাঁদের নিয়ে আজকের মূল আয়োজন, উপস্থিত অগ্রজ ও অনুজ কবি-লেখকবৃন্দ এবং সম্মানিত অন্যান্য উপস্থিতি সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই। বিশেষ ধন্যবাদ জানাই বগুড়া লেখক চক্রের সম্মানিত সভাপতি কবি ইসলাম রফিক ভাইকে। শুধুই তরুণদেরকে নিয়ে কোনো আয়োজন বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন করে কি-না তা আমার জানা নেই। বগুড়া লেখক চক্র অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই কাজটি করে আসছে দুবছর হলো। এই সংগঠনটি নানাবিধ সাহিত্য-সংক্রান্ত আয়োজন পরিচালনা করে আসছে এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই- যার তালিকাও সুদীর্ঘ। এখন সে-আলোচনায় যাচ্ছি না। আসছি তরুণদের নিয়ে আলোচনায়।
পরপর দুবছর শুধুই তরুণদের নিয়ে আয়োজনের প্রেক্ষিতে আন্দাজ করতে পারি, বগুড়া লেখক চক্র তরুণদের নিয়ে তাদের বিশেষ লক্ষ্য আরো বেগবান ও বিশেষ করেছে। যদি তাই-ই থাকে, তাহলে আমি অনুরোধ করব এই আয়োজনটি যেন তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হয়ে ওঠে। কারণ তরুণরা না এলে সাহিত্যের রিলে রেস কে চালিয়ে যাবে? বগুড়া লেখক চক্রের প্রতিষ্ঠা তো সেই তরুণ ও তারুণ্যের লালন করার জন্যই।
গত বছর যখন প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় তখনও আমাকে একটি কাব্যের উপর আলোচনার জন্য আমন্ত্র্রণ জানানো হয়েছিল। আমি সানন্দে তা গ্রহণও করেছিলাম। কিন্তু পেশাগত জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারিনি। আমার পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছিলেন তরুণ কবি ও ভারত বিচিত্রার সম্পাদক অরবিন্দ চক্রবর্তী। আমি ওই সময়ে আসতে না পারার কারণে আজকে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আমি খুব বিস্মিত হয়েছি এই দেখে যে আমার না-আসতে পারার কারণটি কেন যেন বগুড়া লেখক চক্রের অনেক সদস্যের বিশ্বাস হয়নি। আজকেও আমার মনে হয়েছে অনেকেই সে-দিনের না-আসতে পারাটাকে কেমন বাঁকা চোখে দেখেছে, দেখেছে অভিমানের চোখে। আজকে আমার উপস্থিতি এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাবে বলে বিশ্বাস করি। একটু আগেও এক তরুণ কবি, বলা যায় তরুণী কবি, এমন শ্লেষ ভরে আমার উপস্থিতি নিয়ে কথা বললেন, তাতে আমার ধারণা আরও পাকাপোক্ত হলো। আশা করি এরপর আমাকে নিয়ে এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে।
কবি ইসলাম রফিক ভাই এবারের আয়োজনের একজন আলোচক হিসেবে আমাকে নির্ধারণ করে একটি গ্রন্থ নিয়ে আলোচনার আমন্ত্রণ জানান। আমি লেখকের নাম ও তার বই সম্বন্ধে জানতে চাই। তিনি জানান লেখকের নাম আব্দুল্লাহ আল বাকী। আমি বলি, চিনি না তো। রফিক ভাই বলেন, কবিতা উৎসব হলেও এটি একমাত্র গল্পগ্রন্থ হিসেবে আলোচিত হবে বলে লেখক চক্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আমি জানতে চাই কোন প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে বইটি? তিনি বলেন অনুাপ্রাণন।
অনুপ্রাণন প্রকাশনীর কথা শুনে আমি আর কথা বাড়াই না। একবাক্যে রাজি হয়ে যাই। কারণ লেখক আমার কাছে যতই নতুন হোক না কেন, তাকে আমি যতই চিনি না কেন, বইটি যেহেতু অনুপ্রাণন থেকে বের হয়েছে সেহেতু এক বাক্যেই ধরে নিতে পারি বইটি বিশেষ। কারণ অনুপ্রাণন প্রকাশনী বই প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বিশেষ সম্পাদনা-পদ্ধতি অবলম্বন করে। তাতে কোনো নিম্নমানের বই প্রকাশের সম্ভাবনা থাকে না।
কয়েকদিন পর বইটি ক্যুরিয়ারে পেয়ে যাই। বইটির নাম পিওর মসগ্রিন। নাম দেখে ভড়কে যাই। এটা আবার কেমনতর নাম! অর্থই তো বুঝি না।
নামের অর্থ খোঁজা নিয়ে কী করলাম তা পরে বলছি। তার আগে দুএকটি কথা বলে নিই। যেহেতু বইটি ছোটোগল্পগন্থ যা কথাসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। তাই কথাসাহিত্য নিয়ে দুএকটি কথা না বললে অপূর্ণতা থেকে যেতে পারে।
কথা। কেন এত কথা। বলা হয়ে থাকে সব কথা বলা হয়ে গেছে। যদি সব কথা বলা হয়েই যায় তাহলে এত কথা কেন? এই কথার ভেতরেও ওই কথার উত্তর নিহিত রয়েছে। এত কথা এজন্য যে, কথার ভেতরে এমন কিছু কথা থকে সে-কথা একেকজনের একেক রকম হয়। একেক জনের কল্পনাশক্তি, জীবনকে দেখার অন্যতর বীক্ষা, ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষ জায়গা থেকে আলো ফেলে একে অন্যতর উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা- লেখক ভেদে একেক রকম হয়ে থাকে। ওই একেক রকমের মধ্য থেকে কেউ কেউ অনন্য হয়ে ওঠে। কারো শিল্পনৈপূণ্য ভিন্নতর হয়ে ওঠে। জীবনের এমন সব জায়গায় কেউ কেউ এমনভাবে আলোকসম্পাত করেন তা ইতিপূর্বে করা হয়নি। বা ওইভাবে করা হয়নি। ফলে সব কথা বলা হয়ে যাবার পরেও তার কথাটি নতুন হয়ে ওঠে। ওই নতুন হয়ে ওটার কথার শেষে যে মহাশূন্যতা থাকে- সেখানে বসে বসে পাঠক কখনো দুই লাইনের ফাঁকে- কখনও মার্জিনের বাহিরে গিয়ে মহাআগ্রহ নিয়ে তার রস আস্বাদন করেন। এভাবে লেখক কৌতূহলের নতুন নতুন চোখের জন্ম দেন।
প্রশ্ন হলো এগুলো কীভাবে হয়। কীভাবে একটি সাধারণ ঘটনা গল্প হয়ে ওঠে। এক একটি মানুষ হাজারো গল্পের খনি। কিন্তু সেগুলো শিল্প নয়। তারাও শিল্পী হয়ে ওঠেন না। বা বিদগ্ধ মহল তাদেরকে শিল্পী হিসেবে তকমা দেন না। সংবাদপত্রের প্রথম নিউজ থেকে শুরু করে শেষ নিউজ পর্যন্ত, উপসম্পাদকীয়, ফিচার, আরো যা কিছু আছে সবই তো গল্প। কথার সমাহার। কিন্তু এগুলোকে আমরা কথাসাহিত্য বলছি না। কেন? কারণ ওই স্টেটমেন্ট স্টেন্টমেন্ট হয়ে থাকে। তাকে গল্পে পরিণত করতে হয়। না করলে স্টেটমেন্টটি গল্প হয়ে ওঠে না।
আবারো প্রশ্ন। তাহলে সাধারণ ঘটনাকে গল্পে পরিণত করা যায় কীভাবে? দুটি উদাহরণ দেবো। তারপরেই বইটি নিয়ে মূল আলোচনায় প্রবেশ করব। তার আগে দুটি ঘটনার উদাহরণ দেয়া খুব জরুরি।
প্রথম ঘটনা সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের। তার মুখেই শোনা। বহুল কথিত গল্পটি গল্প হয়ে ওঠার এক ধ্রুপদী গল্পও। আপনারাও নিশ্চয়ই জানেন কেউ কেউ। আবারও বলি। তিনি একবার, ছোট বেলায়, ঢাকা থেকে ফিরে কুড়িগ্রাম রেল স্টেশনে নেমে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে হারিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাকে তার বাবা খুঁজে বের করে বাড়িতে নিয়ে যান।
ব্যস এটুকুই। এটা একটা ঘটনা। যার মধ্যে গল্প আছে- কাহিনিও আছে। কিন্তু এরকম ঘটনা হাজারো ঘটে। কিন্তু কোনোটাই কথাসাহিত্য নয়। কোনোটাই গল্প-উপন্যাস নয়।
এই ঘটনাকেই সৈয়দ হক যখন এভাবে বর্ণনা করেন- একবার ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য ট্রেনে চেপে বসি। তখন আমি নিতান্তই শিশু। উদ্যম শৈশবকাল। কুড়িগ্রাম স্টেশনে যখন পৌঁছি তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধের দিকে হেলে পড়ছে। স্টেশন থেকে ভ্যান গাড়িতে চড়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় আমি ছাড়া পড়ে যাই। পরিবারের বিশাল সদস্যের দল থেকে আমি যে ছিটকে গেছি তা যেমন প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি তেমনি অন্যরাও টের পাননি। ততক্ষণে ওই বিকেল প্রায় সন্ধে হয়ে গেছে। আমি কোনো কুল কিনারা না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে স্টেশনের এ মাথা থেকে সে-মাথা দৌড়াতে থাকি। স্টেশনের কানে আমার কান্না কিংবা চোখের পানি পৌঁছে না। আমি এদিকে যাই সেদিকে যাই। খুঁজতে থাকি আমার স্বজনদের। না কেউ কোথাও নেই। কাঁদতে কাঁদতে একসময় আমি স্টেশনের এক নিৎসঙ্গ বেঞ্চে বসে পড়ি। ততক্ষণে সন্ধে হয়ে গেছে। মুখ দেখা যায় না এমন অন্ধকার। হঠাৎ আমি আমার ঘাড়ে কার যেন কোমল স্পর্শ টের পাই। চমকে পেছনে তাকাই। দেখি আমার কাঁধে বাবার হাত। আমি আরেকবার চিৎকার দিয়ে কেঁদে বাবা নামক সমুদ্রের বুকে ঝাপিয়ে পড়ি।
শেষ। একই ঘটনা কিন্তু বলাটা দুভাবে। আমার মনে হয় উপরোক্ত একই ঘটনার দুটি রূপ দেখে বুঝতে পারছি স্টেটমেন্ট, ফিচার, কাহিনি বা ঘটনার বিপরীতে একটি গল্প কীভাবে গল্প বা সাহিত্য হয়ে ওঠে।
আরেকটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।
কর্মসূত্রে দিনাজপুরে থাকলেও আমি মূলত বগুড়ার মানুষ। বগড়োর ছোল আর কি। এখানে বড়গোলা নামক জায়গায় থাকি। যা বহুল পরিচিত সাতমাথা থেকে হাঁটাপথ দূরত্বে। মাঝে মাঝে আমি সাতমাথায় এসে চা খেয়ে বাসায় ফিরি। এই যে ‘মাঝে মাঝে সাতমাথায় এসে চা খেয়ে বাসায় ফিরি’ এটা একটা স্টেটমেন্ট। কোনো গল্প না। এমনকি কোনো কাহিনিও না। এটা বলে যদি গল্প হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হয় তাহলে তা চরমভাবে ব্যর্থ হবে। তবে এটিই গল্প হয়ে উঠবে যদি এই আসা যাওয়ার মধ্যে এক বা একাধিক সংকট ঢোকানো যায়। যেমন এটুকু পথ যেতে আসতে আমি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে যাই কি-না, কিংবা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি কি-না। ভুগলে কেন? কোনো যানজট আছে? থাকলে কেন? ফুটপাত দখল? যদি ফুটপাথ দখল থাকে তাহলে এর ভেতরেও অনেক কিন্তু রয়ে গেছে। দখল কেন হয়। কারা দখল করে? কেন দখল করে। প্রশাসন কী করে। এর ভেতরে ঢুকলে দেখা যাবে অনেক ব্যাপার-স্যাপার রয়ে গেছে। তার একটা হলো চাঁদাবাজি। কত টাকা চাঁদা ওঠে। কার কার পকেটে যায়? ইত্যাদি।
কিংবা চায়ে আমি চিনি খাব কি-না। এটা নিয়ে অন্যান্য চা-প্রার্থিদের সাথে বিতর্ক হয়ে যেতে পারে। মারামারিও হয়ে যেতে পারে। কিংবা প্রশ্ন উঠতে পারে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার লোকজনই কেন চায়ে চিনি আর দুধ খায়? পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের লোকজন খায় না কেন? এর তথ্য অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে ব্রিটিশ ইমপেরিয়ালিজমের হাত রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে? নিছক চা খেতে ফুটপাত থেকে চলে যাচ্ছে ব্রিটিশ ইমপেরিয়ালিজমে! সামান্য বিষয়ের ভেতরে ব্যাপকতা ও গভীরতা এসে যাচ্ছে।
বোঝা যাচ্ছে যে আমার চা খেয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া অতটা সরল নয় যদি উপরোক্ত বিষয়গুলোর কোনো একটা ধরে এগুনো যায়। যদি এরকম উপাদান আমি সংযুক্ত করতে পারি তাহলেই আমার ওই চা খেয়ে আসা-যাওয়াটাও গল্প হয়ে উঠবে। নতুবা নয়।
এইসব ধর্তব্য বিষয়-আশয়ের সাথে হাজারো উপাদানে অভিষিক্ত হয়ে এক একটা গল্প গল্প হয়ে ওঠে। যাই হোক, বগুড়া লেখক চক্রের সুযোগ্য সভাপতি ইসলাম রফিক ভাইয়ের কথানুযায়ী বইটা হাতে পেয়ে নাম দেখে চমকে যাই। আরে! এটা আবার কেমন নাম। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না এর মানে কী? কোনোদিন এরকম শব্দই শুনিনি। পাতা উল্টিয়ে গল্পের সূচিতে চোখ বুলাই। দেখি শেষ গেল্পের নামেই গ্রন্থটির নামকরণ। স্বভাবতই আমি পাতা উল্টিয়ে চলে যাই শেষ গল্পে। এভাবেই পিওর মসগ্রীনের সাথে আমার সংযোগ স্থাপিত হয়। প্রথম প্যারাতেই জানতে পারি পিওর মসগ্রীন একটা রঙের নাম। মাঝারি গাড় সবুজ রঙ। লিপিস্টিকের একটা শেড। মিথিলার ঠোঁটে যা শোভা পায়। গল্পের চরিত্র বা কথকের ভাষায় তা জানা হয়।
গল্প কথক এক অদ্ভুত ধরনের মনস্তাতত্ত্বিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক পোড়খাওয়া চরিত্র। বিয়ের কথাবার্তা শুরু হলে তার মনের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও দ্বিধা ভর করে। তার মনে হয় সে ভার্জিন কি-না। একুশ শতকে নারী পুরুষের যৌন-অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত এই বিষয়টি যে খুব গৌণ হয়ে উঠেছে তা কথকের মাথায় থাকে না। নারী হলে তবুও আমাদের সমাজবাস্তবতার সাথে তার মনোদ্বন্দ্ব বা আত্মপীড়ন বা ভীতি বা সংশয় কাজ করত। কারণ বাংলাদেশের পুরুষ স্ত্রী হিসেবে ভার্জিন মেয়েকেই চায়। এমনকি ভার্জিনিটি নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংসার ভেঙেও যায়। কিন্তু সে তো পুরুষ। যে সমাজে পুরুষের ভার্জিনিটি থাকাটাই ব্যর্থতার সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেখানে সে কি-না এধরনের দ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে সাইক্রিয়াটিস্টের স্মরণাপন্ন হয়। তারপর পরিচয় এক ডায়াটিশিয়ানের সাথে। কথকের অগোচরে তারা তাকে নিয়ে একটা খেলা খেলে। ডায়াটিশিয়ানে আসলে একজন পর্নস্টার। কথককে হিপটোনাইজ করে তার সাথে পারফর্ম করে। বাজারে খুব চলে সেই পর্ন। অনেক টাকা হাতে আসে। তারই একটা অংশ যা পরিমাণেও বেশ বিশাল, তাকে দেয়া হয়, তার কাজের সম্মানী হিসেবে। কিন্তু সে প্রত্যাখ্যান করে। একজন দ্বিধান্বিত যুবকের সুস্থতার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা এভাবে সময়ের এক গভীর গর্তে পড়ে যায়। কথকের মনস্তত্ত্বের হাত ধরে পাঠক চলে যায় আত্মসংশ্লেষণের এক নির্মম জগতে।
এভাবে পিওর মসগ্রিনের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। তারপর যাই প্রথম গল্পে। জাকিরের মাঙ্কিটুপিতে। জাকিরের মাঙ্কিটুপি এমন এক টুপি যা জীবনে একজন একবারই ব্যবহার করতে পারে। জাকিরও একবার ব্যবহার করেছিল। তারপর গল্পকথককে দিয়েছিল।
সঙ্কটে পড়লেই কেবল মাঙ্কিটুপি কথা বলে। অনেক কিছু জানায়। জাকিরকেও জানিয়েছিল। জাকিরের মা তার সহকর্মীর সাথে সমাজ অননুমোদিত সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে বিতাড়িত হওয়ার আগে জাকির জানতে পেরেছিল তাদের এ এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে চলে যাওয়ার কথা। যাবার আগে কথককে দিয়ে গিয়েছিল সেই টুপি। কথকের বাবা সৎ অফিসার। তার সংসারে টানাপোড়েন থেকেই থাকে। এই নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়া। বিপরীতে তার বাবার এক সহকর্মীর কত জৌলুশ! অবৈধ আয়ের কারণে তার চাকচিক্যের কোনো অভাব নেই। তার সাথে কথকের মায়ের এক বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়। কথক আসন্ন ভয়াবহ কোনো একটা কিছুর আশঙ্কায় মাঙ্গি টুপির আশ্রয় নেয়। জানতে পারে তার বাবার সহকর্মী তার মাকে উস্কানি দিচ্ছে। ওর মতো সৎ লোকের বেঁচে থাকার কোনো আধিকার নেই। সে সবার বোঝা। অফিসের জন্য হুমকি। পরিবারের অস্বচ্ছলতার জন্য দায়ী। কথকের মাকে সে উপদেশ দেয় খাবারে বিষ মেশাতে। ধীরে ধীরে মারা গেলে কেউ সন্দেহ করবে না। ধরা পড়লেও টাকার জোরে বের হয়ে আসবে। বাকি জীবনটা খুব জৌলুশের মধ্যে কাটানো যাবে।
কথক এই দৃশ্য দেখে একটানে জাকিরের মাঙ্কিটুপি খুলে ফেলে। তারপার আবার পরে। এবার কিছুই দেখতে পায় না। সে শুধু না-পাওয়ার আর্তনাদই শুনতে পেল। তার মায়ের, তার বাবার, নিজেরও।
অদ্ভুত কল্পনাশক্তি না থাকলে এরকম গল্প লেখা যায় না। মাঙ্কি টুপি আসলে একটা ফাঁদ। এই ফাঁদে লেখক আটকিয়ে ফেলেন পাঠককে। পাঠকও কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই আত্মসমর্পন করেন। এখানেই যেন তার তৃপ্তি। এই ফাঁকে লেখক তার আসল কাজটি সারেন। যা বলার তা বলে দেন। কী সেটা? সে-কথাটি হলো সময়ের করুণ আর্তনাদ। এর ভেতরে রয়েছে নারী পুরুষের সমপর্কের জটিলতা নিয়ে সমাজের তথাকথিত মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব। রয়েছে সৎভাবে জীবনযাপনের গ্লানি। সৎ মানুষের কাছে তা শান্তির কারণ হলেও সমাজের কাছে সে আদতে ব্যর্থ। এবং অন্যের কাছে তা নিছক দুর্বলতা। এসববেরই ভয়ংকরও ছবি জাকিরের মাঙ্কি টুপি।
বইটির সবগুলো গল্পই প্রায় পড়েছি আমি। গল্প ধরে ধরে আলোচনা চালিয়েও যেতে পারতাম। কিন্তু ইতোমধ্যে আমাকে হালকা ওয়ার্নিং দেয়া হয়েছে সংক্ষেপ করার। ফলে অন্য গল্পগুলোর বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে সামগ্রিকভাবে তার গল্পের শক্তিমত্ততার জায়গা নিয়ে দুএকটি কথা বলি। এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হবে গল্পে পাওয়া গিয়েছে তার নিজস্ব একটি ভাষা। যা স্বতন্ত্র হয়ে ওঠার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার ভেতরে অনেক অপূর্ণতাও রয়েছে। এই অপূর্ণতা থাকবে না যদি কয়েকটি কাজ লেখক চালিয়ে যেতে পারেন। আমার যেটা মনে হয় আর কি। সেটা হলো অধিক পঠনপাঠন। লেখকের সাথে আমার ব্যক্তিগত আলাপ-পরিচয় নেই। ধরেই নিচ্ছি তিনি অনেক পড়াশোনা করেন। তবুও ওই অনেক পড়াশোনার ভেতওর যে ঘাটতি রয়েছে তাও কম নয়- অনেক। এই ঘাটতি পূরণের জন্য তাকে অনেক পড়াশুনার পাশাপাশি লেখালেখি চালিয়ে যেতে হবে। তবেই-না তার আত্মসংশ্লেষিত এই ভাষা একটা পরিণতি পাাবে। যা তাকে যেমন স্বতন্ত্র করে তুলবে তেমনি বাংলা সাহিত্যও পাবে স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গির গল্প। আরো দুএকটি কথা বলত হয়। গল্পগুলোর বুনোট বেশ। যা সাম্প্রতিক গল্পে চরমভাবে অনুপস্থিত। তার ঠাস বুনন গল্পের অভিব্যক্তিকে অনেক গভীরতা প্রদান করে। ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার এক মারাত্মক সক্ষমতা রয়েছে তার। রয়েছে ভিন্ন কৌণিক অবস্থান থেকে আলো ফেলার সক্ষমতাও। তবে দুর্বলতার কথা যদি বলতে চাই তাও তার শক্তিমত্ততার ভেতরেই নিহিত। বাক্যের মধ্যে অত্যধিক ই প্রত্যয়ের ব্যবহার খুবই পাঠ-কটু হয়ে পীড়া দিয়েছে। ভাষা-দক্ষতার যে কথা বললাম তার ভেতরের এইসব দুর্বলতা যদি কাটানো যায় তাহলে সমৃদ্ধ হয়। হ্রস্ব বাক্য চলছে। তারপর দীর্ঘ বাক্য শুরু। ওই দীর্ঘ বাক্যের মধ্যে একাধিক বাক্য থাকায় তার সংযোগ-সেতু হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ই প্রত্যয়। এবং অত্যধিক হারে। এই ব্যবহার গল্পের গতিময়তার সাথে সাংঘার্ষিক হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা অবশ্যই পরিত্যায্য।
বলতে বলতে অনেক বলে ফেলেছি। এখন শেষ করব।
দুই আর দুই যোগ করলে চার হয়। এই সমীকরণ, এই গণিত কিংবা এই বিজ্ঞান মানলে গল্প গল্প হয়ে উঠবে না। দুই আর দুই যোগ করলে যদি পাঁচ বা ছয় হয় তাহলেই গল্প হয়ে উঠবে। প্রশ্ন হলো অতিরিক্ত এক বা দুই-এর কী হবে তাহলে। সেটা থাকবে বিটুইন দ্য লাইনে। থাকবে সংযোগের ইঙ্গিত। পাঠক তা ধরে ফেলবে। লেখক তা সরাসরি বলবে না। কখনো কখনো বিটুইন দ্য লাইন অভারকাম করে যাবে। তখন চরণের শেষে যে মহাশূন্যতা থাকবে সেখানে খুঁজেও কাজ হবে না। তা চলে যেতে পারে আউট অব দ্য বক্সে। দ্যাট মিনস অ্যাট দ্য মার্জিন। পাঠককে সেখানেও যেতে হবে। তবে লেখক সে -সম্বন্ধসূত্রও গল্পের মধ্যেই গেঁথে দেবেন। এভাবে গল্প গল্প হয়ে উঠবে।
পরিশেষে আজ যে সাতজন তরুণ লেখক তাঁদের গ্রন্থের আলোচনার সুযোগ পেলেন তাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে ঈর্ষা জানিয়ে রাখি। (তখন দর্শক মহলে হাসি শুরু হয়)।
কারণ আমি বা আমরা যখন তরুণ ছিলাম (বলার সাখে সাথে দর্শক মহলের একটি অংশ থেকে সম্মিলিত আওয়াজ ভেসে আসে ভাই আপনি এখনও যথেষ্ট তরুণ)। সামনে উপবিষ্ঠ আমাদের অগ্রজ কবি শিবলী মোকতাদির, রয়েছেন কবি মতিন রহমান ভাই, মঞ্চে উপবিষ্ট রয়েছেন ষাটের কবি যিনি আসলে আমাদের কাছে জীবন্ত কিংবদন্তি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্যার, কিংবা ইসলাম রফিক ভাই যখন তরুণ ছিলেন (তখন আবারো দর্শক মহলের একটি অংশ থেকে সম্মিলিত আওয়াজ আসে রফিক ভাই এখনও যথেষ্ঠ তরুণ)। আসলে বলতে চাচ্ছি আমরা যখন বয়সের দিক থেকে আপনাদের মতো তরুণ ছিলাম তখন আমাদেরকে নিয়ে এধরনের আয়োজন হয়নি। এজন্য আপনাদের জন্য অনন্ত ঈর্ষা।
পরিশেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। এরকম আয়োজন আবারো হোক। তখন যদি আলোচক হিসেবে রাখা হয় আমাকে তাহলে এবারের মতো শুধু মিঠা মিঠা কথাই হবে না। আয়োজকদের আহ্বান ও দাবি অনুযায়ী ঝাল কথাও হবে। তখন এই প্রয়াস নিছক আলোচনায় আবদ্ধ থাকবে না। হয়ে উঠবে সমালোচনার ঝড়। সত্যিকারের সাহিত্য চর্চার জন্য যা খুব জরুরি।
আবারো শুভ কামনা।
(বগুড়া লেকক চক্র কর্তৃক আয়োজিত স্পর্ধিত তারুণ্য কবিতা উৎসবে প্রদত্ত বক্তব্যের লিখিত রূপ।)
