অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
এপ্রিল ১৫, ২০২৪
২রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
এপ্রিল ১৫, ২০২৪
২রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মুরসালিন মনন -
বরপুত্রের কালজয়ী সৃষ্টি : বৃষ্টিস্নাত অন্য এক শ্রাবণের দিন

একটা ছিল সোনার কন্যা, মেঘবরণ কেশ,
ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ।
দুই চোখে তার আহা রে কী মায়া?
নদীর জলে পড়লো কন্যার ছায়া।

‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ কথাটি শুনলেই প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী প্রয়াত সুবীর নন্দীর কণ্ঠে শোনা গানটির কথাই মাথায় আসে। নন্দিত কথাসাহিত্যিক, সাহিত্যের বরপুত্র নামে খ্যাত হুমায়ূন আহমেদ তাঁরই লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। যা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৯ সালে। এই চলচ্চিত্রের জন্যই তিনি গানটি গেয়েছিলেন। ছবিটি আমি প্রথম দেখি ২০০৭-০৮ সালের দিকে। তো স্বভাবতই তেমন কিছুই মনে নেই। তাই সম্প্রতি আমি ছবিটি আবার দেখি। মুগ্ধ আমি। নিঃসন্দেহে এটি আমার পছন্দের ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। সেই মুগ্ধতা থেকেই উপন্যাসটি পড়ার আগ্রহ জাগে।

১৯৯৪ সালে সময় প্রকাশন থেকে বের হয়েছিল উপন্যাসটি। পড়া নয় ঠিক শোনা। রায়হানুল আমিন ভাইয়ের গড়া ইউটিউবে ‘গল্পকথন বাই কল্লোল’ চ্যানেল থেকে অডিওবুক হিসেবে শুনে ফেললাম হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। একজন নির্মাতা উপন্যাস বা গল্পকে মিডিয়ায় রূপ দিতে গেলে তাকে কিছু না কিছু পরিবর্তন করতেই হয়। যিনিই লেখক তিনিই তো এখানে নির্মাতা। সে অর্থে এখানে খুব সামান্য পরিবর্তনই লক্ষ করছি।

এবার উপন্যাসের দিকে চোখ দেওয়া যাক। গ্রামের নাম সুখানপুকুর। সেখানেই যাচ্ছে শাহানা আর নীতু। ওরা দু’বোন। গন্তব্য তাদের দাদার বাড়ি। দাদার নাম ইরতাজুদ্দিন। ইরতাজুদ্দিনের পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন জমিদার। পরগণার পর পরগণা ছিল তাদের দখলেই। জমিদারি না থাকলেও সেই জমিদারিয়ানাটা এখনও তার মধ্যে ঠিকই রয়ে গেছে। ঘটনাচক্রে গ্রামে ঢুকুতে না ঢুকতেই তাদের সঙ্গে গাতক মতির দেখা হয়। ভাটি অঞ্চলে বোধহয় গায়ককে গাতক বলা হয়। চালচুলাহীন গায়ক মতি তার স্বভাব ও গুণের কারণে গ্রামের সকলের প্রিয় মানুষ।

সৃষ্টিকর্তা সব কেড়ে নিলেও তাকে দিয়েছিলেন সুরেলা এক কণ্ঠ। যে কণ্ঠের জাদুতেই সবাই মুগ্ধ। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মা ও নবজাতকের জীবন ফিরিয়ে দিয়ে শাহানাও মতির মতো করে রীতিমতো গ্রামের সকলের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। অল্পদিনে প্রিয় হয়ে ওঠে শহুরে দুই নাতনিরও। শাহানা আর নীতু চেয়েছিল পুরনো শিকল ভাঙতে। তার কি পেরেছিল? যাওয়ার আগে তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে দাদা শাহানাকে বলেছিলেন সে যা চাইবে তাই তিনি দিতে চান। তিনি শেষপর্যন্ত শাহানার চাওয়াগুলোকে পূরণ করতে পেরেছিলেন কি?

উপন্যাসের নজরকাড়া এক চরিত্র হলো কুসুম। গাঁয়ের চপলা-চঞ্চলা ধরনের মেয়ে এই কুসম। সোজা-সাপটা কথা বলতেই পছন্দ করে সবসময়। কুসুমরাও দুই বোন, কুসুম আর পুষ্প। ওদের বাবা অনেক বছর ধরে নিখোঁজ। অভাবের মধ্য দিয়ে দিন কাটে ওদের। এই কষ্টগুলো নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে সবসময়। ভালো থাকার চেষ্টা করে কুসুম। মনে মনে মতিকে আপন মানুষ ভাবে সে। মতিও কি ভাবে তেমনটাই? উপন্যাসে শেষ পর্যায়ে কুসুমকে এই রূপে আশা করেনি কেউই। কী বলেন?

শরতের মেঘমুক্ত আকাশে যখন জোছনা ওঠে তখন কী এক দারুণ, অপার্থিব মুগ্ধতায় ছেয়ে যায় চারিপাশ। এই দৃশ্যের বর্ণনা সত্যিই লিখে প্রকাশ করার মতো নয়। এ এক অনুভূতি, আমার কাছে মনে হয় তা কেবল অনুভব করাই যায়। বলা বা লেখায় তা সত্যিকার অর্থে ফুটে ওঠে না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের লেখায় জোছনা-শোভিত রাতের বর্ণনা থাকবে না তা তো হয় না! এ উপন্যাসও তার ব্যতিক্রম নয়। অশ্রু দিঘির পাড়ে বসে জোছনা উপভোগ, হ্যাজাক লাইটের আলোয় গানের, গ্রামের মেঠোপথ, দিনের ভাগ অনুসারে গ্রামীণ পরিবেশের বর্ণনায় আমি মুগ্ধ হয়েছি বারবার। গ্রামের ছেলে হওয়াতে সময়ে-অসময়ে এসব উপভোগও করছি বারবার। তাই উপন্যাস শুনতে শুনতে আমি কখনও কখনও হারিয়ে গেছি সেসব সময়। কিন্তু এখন থেকে এসব আমায় আরও বেশি মুগ্ধ করবে। টিনের চালে রুমঝুম বৃষ্টি পড়বে, চায়ের কাপ হাতে কোনো এক শ্রাবণের বিকেলে আবারও পড়ব এই বইটি, ঠিক তখনও কুসুমের জন্য মন খারাপ হবে। কঠিন মানুষ ইরতাজ্জুদিনের জন্য মন কেমন করবে। জানতে ইচ্ছা করবে মতিদের নৌকাটা কি শাহানাদের নৌকাকে ধরতে পেরেছিল কি না। সর্বোপরি বাংলা সাহিত্যের এক মাস্টারপিস হয়ে থাকবে সাহিত্যের বরপুত্রের লেখা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’।

বই : শ্রাবণ মেঘের দিন
লেখক : হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাশন : সময় প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর, ১৯৯৪
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
মূল্য : ১৭৫ টাকা

 

Read Previous

একজন মন্ত্রীর একদিন

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন- ৩য় সংখ্যা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *