অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নাহার আলম -
অন্তর্তলের বোধ ও ব্যাপ্তির গহনকথা

C:\Users\Administrator\Desktop\Joma Rakhi Nirzatito Nokkhotrer ovidhan.jpg

কবি যে যে শুধু সৃষ্টি করে তা নয়, কবি সৃষ্টি রক্ষাও করে। যা স্বভাবতই সুন্দর, তাকে আরও সুন্দর করে প্রকাশ করা তার একটা কাজ, যা সুন্দর নয়, তাকেও অসুন্দরের হাত থেকে বাঁচিয়ে তোলা তারই কাজ।

(চরিত্রহীন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩১)।

শরৎচন্দ্রের কথায় সহমত রেখেই বলছি, কবিরাও স্রষ্টা। তারা ভেঙেচুরে গড়তে যেমন জানে আবার প্রতিষ্ঠিত কোনো অসত্যকে ভাঙতেও তেমনই জানে। উদীয়মান নবীন কবি উদয় শংকর দুর্জয়-ও ক্রমাগত নিজেকে ভেঙে ভিন্ন ছাঁচে গড়ার প্রত্যয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী। শব্দে-বাক্যে-উপমায় তার কবিতারা কথা বলে, বলায় পাঠককেও। রেখে যায় জিজ্ঞাসা ও দায়ের ভার। ‘জমা রাখি নির্যাতিত নক্ষত্রের অভিধান’ কাব্য শিরোনামের বিশেষত্বই জানান দেয় কবিমানসের বিষাদ, অভিমান একইসাথে দ্রোহ ও ক্ষোভের মিশ্র বোধের অস্তিত্ব। আত্মজকে উৎসর্গ করা এ কাব্যের স্রষ্টা উদয় শংকর দুর্জয় একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং সফল একজন সম্পাদকও। লিখছেন বহু বছর ধরে।

যশোরে ১৯৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন। পড়েছেন কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটিতে। তারপর ইউনিভার্সিটি অফ ইস্ট লন্ডন-এ ইনফরমেশন সিস্টেম নিয়ে পড়া শেষে বিপিপি ইউনিভার্সিটি লন্ডন থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা তার প্রথম ছোটগল্প দৈনিক যশোরে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘লিখে রাখি বিশুদ্ধ আত্মার রাত্রিদিন’ (২০১৭) তার প্রথম কাব্য। নির্বাচিত ইংরেজি কবিতার অনুবাদ গ্রন্থ ‘ওয়েস্টার্ন অ্যাভিনিউর অরণ্য দিন’, ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’ (২০২১) তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ। এছাড়া সাহেত্যের ছোটকাগজ ‘স্পন্দন’ অনিয়মিতভাবে সম্পাদনা করেছেন ১৯৯৮ সাল থেকে। বর্তমানে ২০১৯ সাল থেকে লন্ডন প্রবাসী এই গুণীজন বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে বিশ্ব অলিন্দে সুপরিচিত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন আন্তর্জাতিক ইংরেজি সাহিত্য পত্রিকা POL (Poetry Out Loud, International Literary Magazine) লিটল ম্যাগাজিনটি সম্পাদনার মাধ্যমে। তার সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে পেয়েছেন ‘সাহিত্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর লিটারেচার’।

‘জমা রাখি নির্যাতিত নক্ষত্রের অভিধান’ তার তৃতীয় কাব্য যা এ বছরই (জুন ২০২২৩) প্রকাশিত হলো অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে। অল্প কথায় পুরো বইটির সারমর্ম তুলে ধরেছেন ফ্ল্যাপের লেখায় কবি ও গবেষক গৌরাঙ্গ মোহান্ত। যা পড়ে ভেতরটা পড়ার আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। আধুনিক ধারার গদ্য কবিতায় এক অমোঘ টান চিরায়ত। কবির কবিতাগুলোর বেশির ভাগই গদ্য কবিতা। প্রতিটি কবিতায় সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় কবিমনের ব্যক্তিচিন্তা ও মননশীল চেতনার ছায়া। তেষট্টিটি কবিতা দিয়ে সাজানো বইটিতে একেকটি কবিতায় একেকরকম বোধের প্রকাশ লক্ষ করা যায়। যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবির স্বদেশের নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় অস্থির পরিস্থিতিতে কাতরমনের আর্তি ঝরে পড়ে নানা কবিতায়। আবার প্রবাস জীবনের নানা বিষয়, ঘটনা ও প্রতিবেশের বাক্সময় বর্ণনা তুলে ধরেছেন কাব্যের কলেবরে। কম্পিউটার সায়েন্সের যন্ত্রবিদ্যার পারদর্শিতার পাশাপাশি সাহিত্যের নিমগ্ন অনুরাগ, ভাষার শৈল্পিক শব্দচয়ন তাকে ভিন্নমাত্রায় অনন্যসাধারণ করে তুলেছে। চিরায়ত প্রেম-প্রণয়-বিরহানুভূতির চেয়ে দেশ, দশ ও বিশ্বের নানা জুলুম, ধর্ষণ, যুদ্ধ-বিগ্রহের বিবিধ অসঙ্গতির মর্মপীড়ার নানামাত্রিক বোধের অনুরণন পাঠকমনকেও নাড়িয়ে যায়। কোথাও উচ্চ কোথাও-বা অনুচ্চ দ্রোহ-ঝংকারে প্রতিবাদী করে তোলে পাঠককে। অতীতস্পর্শী আর চলমান ঘটমান সময়ের নিষ্ঠুরতার ঘাত-প্রতিঘাতের প্রতিবাদী স্বরের নিনাদ ঝরে পড়ে কবিতার ছত্রে ছত্রে।

শোক-সন্তাপে, দুঃখ-ক্ষোভে স্বজন বা প্রিয়া হারানোর মর্মবেদনার বহিঃপ্রকাশ পাঠকহৃদয়কে নানাভাবে দোলা দেয়। প্রিয় শৈশবকে ভুলতে পারে না কেউ-ই। সে শৈশবকে মনে করিয়ে পাঠকের মনকেও ভারাক্রান্ত করে, জাগিয়ে তোলে স্মৃতির বিস্তৃত পরিসর। জাগায় সুখ কখনো-বা, জাগায় দুঃখও কিঞ্চিৎ। কবি খুঁজে ফেরেন তার হারানো শৈশব অসংখ্য কবিতায়, এমন—

উড়ছে মেঘের পালক শ্রাবণের মাঠে, আঁধারে পুড়ছে আলো বৈকালিক প্রিয় টানে/ সবকটি জানালা খুলে গেলে রোষাবেশে, মুঠোভরা আর্তি ঢুকে পড়ে কঙ্কন সুরতানে/ …এক মধ্য দুপুরের ছাই উড়িয়ে নিলে আঁচলে, একাকী দীর্ঘ মাঠ পেরুবার কালে আনমনে/ শৈশবের সব ফুল স্মৃতির পৃষ্ঠা ভুলে গেলে, শুকনো পাতায় লেগে থাকে ধূপসন্ধ্যা নভমনে।

(উড়ছে মেঘের পালক শ্রাবণের মাঠে)

রণ্য খুলে দিলে চৌকাঠ, জমে থাকা কুয়াশার হাজার বছরের কেউ/ শৈশব খুঁড়ে পাড়ি দ্যায় লক্ষ্মীবিলাস, মৌবিহার, নকশি পেড়ে ঢেউ।

(খুনি হতে গিয়ে প্রেমিক হয়ে উঠতে পারে না যারা)

শৈশবের বারান্দায় জড়ো হয় পাতার সংসার/ অযাচিত ভাবনারা দাঁড়ায় চেয়ে অহংকার।

(অরণ্যের ফাঁকে বাজে বৃত্তের বেহাগ)

অগ্রজের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে কবি কুণ্ঠিত নন, বরং উদারচিত্তে স্মরণ করেন, স্মরণে রাখেন।

রূপশালি ধানের ঘ্রাণ শুঁকে কোনো ধনেশ পাখি/ গড়েছিলো আবাস— তার জন্য লিখেছিলে/ নক্ষত্রের স্বরলিপি ম্লান অরুণালোয়।/ …ধূসর গোধূলি থেমে গ্যালো। রাজ-সরালির দল/ ছড়িয়ে দিয়ে গ্যালো স্নাত জোছনার ফুল।/ …সব রঙ মুছে ফেলে, এক অদ্ভুত আঁধারে/ জমিয়ে অভিমান; তুমি নিঃশ্বাসের তরঙ্গে ফেলে গ্যালে—/ দিক ভুলো ট্রামের ক্ষুধার্ত কুয়াশাসমাচার। ম্লান অরুণালোয় নক্ষত্রের স্বরলিপি।

(জীবনানন্দ দাশ স্মরণে))

আবার তাদের সাথে অন্যায়ের নীরব অথচ সোচ্চার প্রতিবাদী স্বর তোলেন স্ব-উচ্চারিত বর্ণে-শব্দের ঝংকারে—

তুমি যে ধুলো জড়িয়ে ছিলে পায়ে সে ধুলোর ঊর্ণাজালে/ জড়িয়ে যাচ্ছে হৎপিণ্ডের ক্ষত, বইমেলা থেকে সুবিধাবাজার/ খিলগাঁও থেকে শাহবাগ। …এখন নির্বাসিত ছায়ার ঘন তুষারে ঢেকে যাচ্ছে/ ফেরার সব অনুবাদ। …ঝলমলে আলোয় শানিত হয়ে/ যাচ্ছে রক্ষকদের হাতিয়ার।…/ ৬২৪ নম্বর কাফেলা হারিয়ে ফ্যালে দিশা/ কোনো পারাবত তোমার সমাচার জানে না।/ …শুধু অনাশ্রয়ী চৈতন্যের গোপন কোঠরে আগুয়ান পালক তুহিন/ হাওয়ায় জমিয়ে দিতে চায় সব তাপিত দ্রোহ/ কোনো পারাবত রাখে না সমাচার।

(কবি দাউদ হায়দারকে)

কারও সাথে ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত অনাচারের প্রতিরোধের অপারগতার দায় স্বীকারোক্তিতে কবিহৃদয় ব্যথিত, ক্রোধে জর্জরিত। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ও রমা চৌধুরীকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতায় তারই বহিঃপ্রকাশ মেলে এভাবে—

জ্বলতে জ্বলতে পালানির মা এসে দাঁড়াল/ বটতলায় ততক্ষণে ভস্মাভবরণ ঢেকে দিয়েছে/ সম্ভ্রমের আহত বেদন।…/ ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী/ হাঁটু গেঁড়ে ছুঁতে চাইছে বুটের ধুলো তবু সে ধুলোয় আরও/ ধুলো হয়ে গেল তাঁর সজল সংসার।…/ কত শ্যামলীমাদের কথা বলব। রমারা এখনও পিচের বুক ছুঁয়ে দ্যায় খালি পায়ে।/… ক্ষত-সম্ভ্রমের বিচার চেয়ে কেউ কখনো মিছিল হয়ে ওঠেনি,/ যতটা স্লোগান হয়ে উঠেছিল ঘাতক বাঁচাতে।

(আকুতি ভরা ক্রন্দসীর গান)

নারীর প্রতি পুরুষের পাশবিকতার ক্ষোভ, সমাজের অবক্ষয়ের যন্ত্রণা ও প্রতিবাদ ঝরে পড়ে যেসব কবিতায়— এক নির্যাতিত দলিল, শৈশব পেরিয়ে আতঙ্কিত জনগণ, ফিরিয়ে দাও হে পোড়ামাটি, বিচারের দাবিগুলো আবার হয়ে যায় লুট, যে রাষ্ট্র দায় স্বীকার করে না, ব্যর্থতার দলিল মোড়া সময়, ওদের ক্ষমা করো, নিষিদ্ধ পথগুলো বোতাম খুলে দাঁড়ায়, কলম জাগুক দ্রোহ ও ক্রোধে, শতাব্দীর অধুনা যাপন, বাচা খানের পাঠশালা, মৃত্যু যেন অনঘ সমাচার, মুক্তির জন্য ভুলের শপথ, কার কাছে রাখবো বিচারের দাবি ইত্যাদি। কিছু চুম্বকীয় চরণ পড়ে নিই—

সুনসান নীবরতা ছুঁয়ে গেলে পাশ, মগজে হানা দ্যায়/ প্যারাসাইট ভাইরাস, পশু হয়ে ওঠে পরাধীন কোষ,/ হয়ে ওঠে পরাশক্তি শৌর্যে-বীর্যে। হিংস্র নখ আরও/ ক্ষুধার্ত হয় নির্ভয়াদের আর্তনাদে। …কোথায় রাখবো রক্তাক্ত গ্রহগুচ্ছ? কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো মিছিল কাঁধে করে?

(একটি নির্যাতিত দলিল)

কোন হিসাবের খাতায়/ ভুলের ঘ্রাণ মাখা ফুল! কোন রমণী আজ আবার ঠায় দাঁড়াবে/ অঙ্গনে আনত মস্তকে! যে শিশু সম্ভ্রমের সংজ্ঞা বুঝে উঠবার/ বহু আগেই রক্তাক্ত শ্লীলতা মেখে নেয় শরীরে। আর যে রাষ্ট্র দায় স্বীকার করে না…

(যে রাষ্ট্র দায় স্বীকার করে না)

আদিবাসী সাঁওতালদের ঘর-বাড়ি পোড়ানোর যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাদের প্রতি একরাশ ঘৃণা ও ক্ষোভে রোষান্বিত হতে দেখা যায় কবিকে—

জ্বলছে ভিটের চাল, নির্ভীক চুলো, উড়ছে প্রকাণ্ড লেলিহান শিখা/ হিংসার বিষাক্ত ছোবল, লুপ্ত গোবিন্দগঞ্জ, পোড়ামাটি তপ্ত একা/ …এতো আগুন দেখিনি সাতচল্লিশে! দেখিনি উন্মাদ শিখা একাত্তরের পরে!/ …এতো ক্ষুধার্ত শকুন ফ্যালেনি ছায়া! এতো প্রলেপি আঁধার! কোথায় লুকানো ছিল/ হায়েনার বিচরণ অবাধ!

(ফিরিয়ে দাও হে পোড়ামাটি)

গরু মেরে জুতো দান করার মতোই বাড়িঘর জ্বালিয়ে সাহায্যের নামে ত্রাণের নাটকে কবিকে ক্ষুব্ধ করে—

যে হাতে রক্তের দাগ সে হাতে মানায় না ত্রাণ/ ফেরত চাই ভিটেমাটি সম্বল নিখাদ পরিত্রাণ

(বিচারের দাবিগুলো আবার হয়ে যায় লুট)

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের কথা ভেবে কবির ক্ষোভক্লান্ত হৃদয়ে বিষাদের টলটলে জল ঝরে পড়ে কবিতার পাতাজুড়ে সরবে-নীরবে—

সূর্যের কারুকাজ মুছে যেতে যেতে কার পাঁজরে/ নুয়ে পড়ে আশ্রয়। …দ্বিখণ্ডিত মুখ খোলে/ অনঘ শব্দের সোনালি মুখ। যে মুখ সেলাই করা অজস্র অস্ফুট রবে/ শীতলক্ষ্যার বিক্ষত বুকের পাশে লেখা সাতটি নিষ্প্রভ ভোরের সংবাদ।/ …আকাশ ভরা উজ্জ্বল নক্ষত্র, তবু সাত সাতটি তারা অভিমানী স্থবির

(শৈশব পেরিয়ে আতঙ্কিত জনগণ)

বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে কবির কলমে ঝরেছিল ক্ষোভ ও বেদনার আর্তনাদ—

মেঘের ছায়ায় এখন রক্তস্নাত বর্ণমালা, ছিঁড়ে গ্যাছে/ লহরি-জমাট গিটার বাদকের তান।…/ কোথায় লুকোবে মাথা, কোথায় লুকিয়ে পড়ে নেবে গুহ্য মর্মলাপ?/ পেশোয়ারের ভূমিগ্রহ ভাইরাস আক্রান্ত। বিষাক্ত আঁচড়ে পচে গ্যাছে/ নিকেতনের বিশুদ্ধ আত্মারা।

(বাচা খানের পাঠশালা)

বিশ্বময় যুদ্ধ-বিগ্রহের করাল থাবায় নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের প্রতি জুলুম নির্যাতনে মমত্ববোধের পাশাপাশি স্বজন হারানোর হাহাকার শোনা যায় যেসব দলিলে—

মেয়েটি তখন বারো বছরের, স্নানালয়ে মাত্র ভিজিয়েছে/ রোদের প্রখরতা। একদল দানব ছিনিয়ে নেবে বলে হুঙ্কারে, প্রকম্পনে/ করছে তোলপাড়। …ঝলসানো কন্যার আর্তনাদ শুনে ছুটে গ্যালো সেবালয়ে, তবু কেউ ফেরাল না চোখ।/ মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়ায়ে জননী নিজের নাম লিখিয়ে নিল মহীয়সীদের পাতায়;/ অন্তিম উচ্চারিত শব্দে ‘ওদের ক্ষমা করো’ ছাই হয়ে গ্যালো মাতার আর্তনাদ।

(ওদের ক্ষমা করো)

২০১৪, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের দাপটে বালি হয়ে ওড়ে/ রাদির আবাস, ওমের উল, চুলের কাঁটা/ প্রার্থনার পৃষ্ঠাগুলো। উড়ে যায় লেইলার বহিরাভরণ।…/ লেইলারা এভাবে সারি নারি/ ক্ষতচিহ্ন হয়ে ওঠে মানচিত্রে।

(নিষিদ্ধ পথগুলো বোতাম হয়ে দাঁড়ায়)

প্রবাসজীবনের পারিপার্শ্বিক চিত্রকে কাব্যশরীরে ঢেকেছেন অনুপম শব্দের শিল্পিত অবয়বে। মুগ্ধতার পরাগরেণু ছড়িয়েছেন সরলে, সহজাত সাবলীলে, কখনো মূর্ত আবার কখনো-বা বিমূর্ত মায়াবিভ্রমে। দেখে নিই—

নাগরিক স্টারলিঙ্ক/ আড্ডা ফেলে এসে শুনে যায় পলাতক লহরি,/ …উল জড়ানো পেঙ্গুইন, সোনালি অলক আর রঙ/ করা শ্রীমুখ, এলইডির আলোয় সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায়। তুমুল— অতঃপর সীমাহীন।/ …ফোস্কা পড়া দালান, আলোক রশ্মির মাঝে খোঁজে গ্রীক/ দেবতা পাল্টাতে এসে নাবিক পাল্টে যায় টেমসের জমাট ভরা তুষার জোছনায়, যদিও খুব/ বারণ ব্লুমসবারির সিদ্ধি ফোটা ফুল আড়মোড়া ভেঙে দ্যায় ভুল করে তুলে রাখা অবিরাম ব্যর্থতা।

(হিমশহর)

এছাড়াও যেসব কবিতায় দেখা যায়— ছায়া গোধূলির রাগ-অনুরাগ, সমুদ্র ও শহরিকা, বাঁধনের বেহালা ঝরায় মূর্ছনা, এক সমুদ্র তৃষ্ণার আলো ইত্যাদি।

বৃষ্টিকাতর কবি বৃষ্টিকে উপভোগ করেন স্বদেশে-প্রবাসে, প্রেমে-বিরহে-অভিমানে বা স্মৃতিমেদুরতায়। এভাবেই ঋতু বর্ষা কবিকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। বৃষ্টির মন্ত্রমুগ্ধতার কাছে কবি নিজেকে সহজাত সমর্পণে ভিজিয়ে নেন শৈল্পিক বর্ণে-শব্দের মিশেলে কবিতার শরীরে। কখনো প্রেমিক, কখনো কবি, কখনোবা খুনি হতেও দেখা যায় তেমন কিছু কবিতার চরণ—

পথের জলে ঘুম চড়ুক, বৃষ্টি ধুমে জোয়ার উঠুক/ ভীষণ রকম ঢেউ ভাঙুক ত্রিধারায় বর্ষা উড়ুক।

(বাজুক নূপুর নিভৃত গহনে)

অদূরে বৃষ্টিতে এক খণ্ড উঠোন হয়ে উঠুক সদ্য স্নান সারা/ ভরাট জলাশয়। …বৈদেশি সংগীতে আত্মমুগ্ধ পাণ্ডুলিপি খুলে পড়ুক বুষ্টি-কন্যারা/ মুকুট খুলে সামনে দাঁড়াক কুক আইল্যান্ডের ভৌগোলিক সন্দেশ।/ …অমন শান্ত প্রদোষে চোখের নীলাভাঞ্চল জুড়ে নামুক বৃষ্টি-জোছনা,/ মুঠোমুঠো বৃষ্টিফুলের সৌরভ জমা রেখে পেরিয়ে যাক বণিকেরা/ গলিত শ্রাবণের দেশ।

(ঋণ রেখে যাক সব পলাতক ইচ্ছেরা)

কী অন্ধকার কী মুষলধারায়/ ভিজছে অনুপম অধরা/ তোমাকে দেবো তাই/ রুমাল খুলে দেখি/ বিবর্ণ পুষ্পাঞ্জলি/ তোমাকে দেবো বলেই/ কী আরাধনাই না করেছিলাম।

(অভিবাদন এই মেঘ-বৃষ্টি জলধারায়)

অতি ব্যস্ততম যান্ত্রিক জীবনে কখনো আনমনে প্রেম ও প্রত্যাশায় বন্দি হয় কবির মন। প্রকৃতিকে ভালোবাসে প্রেমিকার মতন। প্রেমিকারাও প্রকৃতিরই উপাদান। প্রেম ও প্রকৃতি যেন সহোদরা হয়ে থাকে তার কবিতায় গলাগলি ধরে। দৃশ্যমান অথবা অদৃশ্যমান আলো-ছায়ার নিবিড় অনুরাগের আকুলতা ঝরে পড়ে এভাবেই—

খামের মধ্যে পাঠাও তবে গাঢ় সবুজের অনুপম কারুকাজ/ শিমুলের স্পর্শগুলো তুলে নিও কম্পাস লেখা পালের কোনো জাহাজে/ …অপেক্ষায় থেকো…/ জমা রেখে ধ্রুপদি মূর্ছনা, অভ্রবাদক শুনিয়ে যাবে শ্রাবণ আলোয়/ স্বরলিপি ছাপা পুরনো ধারাপাত। তখন শুধু একবার/ জোছনার আগুনকথা ধরে রেখো আঁচলের গহিনে।

(ছায়া গোধূলির রাগ-অনুরাগ)

সে এক অটবি ঘেরা কুমারী জলাশয়ের কথা। সন্ন্যাস-জীবন/ প্রচ্ছদ এঁকে খুঁজেছিল পরিযায়ী স্পর্শ। কোনো এক বৃক্ষ পত্রে রেখেছিল/ মুগ্ধ মন্ত্রের ত্রিলিপি, অরণ্যপাঠ শেষ করে নাবিকদল মেঘের বুকে পুষেছিল/ ঢেউ ভাঙা আলোর উন্মুখ অপরাহ্ন, এক বিষাদময় ভীষণ

(খুনি হতে গিয়ে প্রেমিক হয়ে উঠতে পারে না যারা)

যন্ত্রের থাবা শিশুমনকে নিয়ন্ত্রণ করে তার খোলামেলা সরল শৈশবকে ঘরবন্দি করে তুলছে। গ্রামের চিরচেনা সবুজকে গ্রাস করছে— এমন আধুনিকতাকে কবি কটাক্ষ করেছেন যেভাবে—

ইলেকট্রনিক্সের খেলনারা কেড়ে নিচ্ছে সান্ধ্য কলরব।

(এ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে সুপারসনিক/ কংক্রিট)

ইস্পাতের শহর উঠে যাচ্ছে আমার গাঁও।…/ প্লাস্টিকের চাদর জড়িয়ে ভুলে যাচ্ছে পশমের ওম।/ …এই অরণ্যের পাঁজরজুড়ে ইস্পাতের কারুকাজ ভীষণ, আলোক বন্যায় ভেসে চলেছে অধুনা যাপন।

(এ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে সুপারসনিক/ ইস্পাত)

কবি মাত্রই নিঃসঙ্গ। সবার মাঝে থেকেও একদম একা। নিমগ্ন সে একাকিত্বের খোলস ভেঙে কবি কখনো-সখনো সামাজিক হতে চায়, সবার সাথে একাত্ম হওয়ার বাসনায় ব্যাকুল হতে দেখা যায়—

মনে হচ্ছে—/ আমিও ছাড়ি ঘর, মায়া কাটিয়ে সব অপরাধ মেনে/ প্রার্থনা রাখি, অশ্রুজল ধরি গৃহমন্দিরে।/ পৃথিবীটা ছায়াময় হোক, দুঃখের পাথর সরে, গিয়ে/ জ্বলে উঠুক রাশি রাশি উদ্যানের নিথর সরোবর।

(তোমাদের প্রার্থনা দেখে)

এছাড়াও— তুমি রবে সমুদ্র স্নান সেরে বালুর মোহনায়, চলো পড়ি চুম্বনের তাম্রলিপি, নিঃশব্দ ধূলোমাঠ বিবর্ণ অপরাহ্ন ইত্যাদি কবিতাগুলোয় কবির দ্রোহী মনের আড়ালে প্রেমিক মনকে খুঁজে পাওয়া যায় অনায়াসেই।

একাকিত্ব আর কর্মক্লান্তির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি ও স্বস্তির প্রত্যাশা করেন একজন শান্ত সুবোধ সঙ্গীর সাহচর্য। শিশুর মতোই এমন সরল চাওয়া তার ‘একজন শান্ত-সুবোধ সঙ্গী চাই’ কবিতায়।

এমন একজন সঙ্গী চাই যে আমার/ অপরাধের বাড়ন্ত দিগন্তকে ছোটো করে দেবে/ দেখাবে ফুলঝরা পথ, সোনামাখা ছেলেবেলা।/ আমি সব অপরাধের হিসাব ফেলে তুলে নেবো/ ফুল পাতা অঞ্জলি আর স্বর্ণদ্বীপের আহ্বান।/ …ক্লান্তিতে একটু হেলান দেবার জন্য একজন সঙ্গী প্রয়োজন/ যে আমাকে দুঃস্বপ্নের প্রতিটি রাত থেকে বাঁচাবে/ অক্সিজেন দেবে বিনে পয়সায়।

এছাড়া— চলো পড়ি চুম্বনের তাম্রলিপি কবিতাগুলোয় দ্রোহী কবির প্রেমিক মনকে পড়ে নেয়া যায় খানিকটা। প্রেয়সীর জন্য প্রেমিক কবি সবকিছুই করতে পারে তারই নমুনা—

ডাব কটেজ গার্ডেনে বসে ওয়ার্ডসওয়ার্থ যে প্রজাপতির ডানায় এঁকেছিল/ কাব্য-আলপনা তার অবয়ব থেকে তুলে রাখব রঙের ঠিকানা।

(ছায়া গোধূলির রাগ-অনুরাগ)

কবির মন সদা পরিভ্রমণশীল। আকাশে-বিহারে, দেশে-বিদেশে, পথে-প্রাচীরে, মেরু কিংবা মরুতে তার নিরন্তর অভিযাত্রা। তার যাযাবরী মন বহুমাত্রিকতার ধারক ও বাহক। অভিজ্ঞানের পোশাকে উপমার অলংকারে সাজিয়ে তোলেন কবিতার শরীর। সে শরীর তাই হয়ে ওঠে কোথাও ষোড়শী ললনার মতো কোমল আবার কোথাও-বা হেমন্তের খরখরে মাঠের মতো রুক্ষ কঠিন, কোথাও সমুদ্রের বিশালতা, কোথাও-বা আকাশের উদারতার বিন্যাসে হয়ে ওঠে জীবন্ত। প্রবাসী কবি দেশের মায়ায় নস্টালজিক হন। হাহাকারমেশা বিষাদী মনে জাগে অনিকেত কিছু চাওয়া বা ফিরে পাওয়ার আকুলতা। খোঁজেন প্রকৃতির শাশ্বত রূপকে দেশমায়ার অমোঘ টানে। যান্ত্রিক কাঠামোয় যাপনের সেইসব বিষাদগাথার চিত্র এঁকেছেন এভাবেই—

হাজার বছর ধরে ধ্যান ভঙ্গের/ প্রার্থনায় জপে যাব আরেকটি মহাকাল। সব বরফ-সিক্ত-নদীর সিঁড়ি থেকে তুলে এনে/ ভ্যাজানো বিকেলগুলো শৈশব করে তুলব।/ …অতীন্দ্রিয়বাদ থেকে তুলে নেবো তপস্যার ভোর, বনপো কিংবা জৈন/ অথবা সব অন্ধকারের দলিল সরিয়ে লিখে দেবো শাশ্বত আলোর বর্ণমালা।

(এক সমুদ্র তৃষ্ণার আলো)

এখানেই ছিল পিতামহের ঘরদোর পোড়ামাটি চৌকাঠ কুয়োপাড়।/ …এখানেই লক্ষ্মীবিলাস ধানের ওমে পাড়ায় বইতো নতুন হাওয়া।/ …তাম্রপাতা থেকে এসব ক্ষয়ে যেতে যেতে আমরা শিখেছি গ্রিন হাউজ আর নভ গ্রহের পরিচয়।/ …আন্তর্জালিক শাখাপ্রশাখায় পড়ে নিচ্ছি রোবোটিক জীবন ও/ অন্যান্য প্রোটনের জীবনবৃত্তান্ত।

(নিঃশব্দ ধুলোমাঠ বিবর্ণ অপরাহ্ন)।

বেশ কিছু কবিতার মুগ্ধতার রেশ কাটে না। তন্মধ্যে— জলসমগ্র, বিষাদের রোদ খালি করেছে হৃৎপিণ্ড, এ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে সুপারসনিক, পরাগমাখা শাশ্বত বিকেল, শঙ্খযুগ হেসে উঠবে হিম-আঁধারে, ইচ্ছের একপাল পেগাসাস পালক, লিখে যাও অভিমানে বিষাদ ইত্যাদি। তেমন কিছু কবিতার উদাহরণ—

হেমেন মজুমদারের ক্যানভাসেই এমন সিক্ত বসনারা ঝরিয়ে যায় বহুমাত্রিক রামধনু। …ভ্যানগগ, পিকাসো; চকচকে রঙ মেখে হয়েছিল পশ্চিমের। রূপের বাংলায় সুলতান দেখেছিলেন বিশালকায় রঙসিক্ত রমণী।… এখন নগ্ন-পুকুর-জল আর ভেজা আঁচলে সাজবে কোন সে পোড়ামুখী।

(রংতুলির জলসায় আনন্দমহল)।

পৌষসংক্রান্তির ছোট্ট বিকেল/ তাড়িয়ে নেবো ইশকুল মাঠে, ফেরা সংগীতে—/ সুতো কাটার তীব্র যন্ত্রণা পকেট-অভিধানে জমা রেখে/ কোনো জাদুকরের কাছে ফেলে যাবো রূপক কৌশল।

(ইশকুল মাঠ মধ্যাকর্ষণ)

এখন ভোর হলে নিঃসঙ্কোচে বেরিয়ে পড়ে মুঠো ভরা ফুলেল শৈশব,/ …প্রভাতফেরির সুর গুঞ্জন/ আত্মার শ্রান্তিগুলো লিখে রাখে আরেকটি অধ্যায়ের সৃজনলিপি।/ অধ্যায় পার হতে হতে পাণ্ডুলিপি খুঁজে বেরিয়ে পড়ে শাশ্বত ইতিবৃত্ত।/ মুঠেভরা সূর্যগুঁড়ো উড়ে যায় শ্রান্তির চুড়োয়।

(পরাগমাখা শাশ্বত বিকেল)

উদয় শংকর দুর্জয়-এর কবিতায় স্বদেশ-বিদেশের প্রকৃতি, নারী, নদী, প্রেম ও প্রতীক্ষার সমান্তরালে উঠে এসেছে মানুষের বাড়বাড়ন্ত অন্যায়, জুলুম, সহিংসতার নিপাট চিত্র। এসেছে হিংসাত্মক রাজনীতি ও সভ্যতার আগ্রাসী শোষণের কথাও। ‘জমা রাখি নির্যাতিত নক্ষত্রের অভিধান’ কাব্য পাঠান্তরের সারকথা হলো, অন্যায়ের বিচার না হওয়ায় আক্ষেপের বহিঃপ্রকাশ কবিকে দ্বিধান্বিত করে তোলে যা প্রেমময় মনকে ছাপিয়ে তাকে দ্রোহী ও প্রতিবাদী হতে শেখায়। এমনটাই মনে হয়। গুমসুধা, লক্ষ্মীবিলাস, পরিযায়ী স্পর্শ, গলিত শ্রাবণ, শঙ্খ-গহ্বর ইত্যাদির মতো নান্দনিক উপমায় আর অন্তর্তলের নির্মল অনুভবের ছোঁয়া পাঠকমনকেও আন্দোলিত করবে, প্রতিবাদী অথবা প্রতিরোধে প্রত্যয়ী হতে শেখাবে। কবিতাপ্রেমী পাঠকদের কাছে বইটি সুখপাঠ্য হবে নিশ্চিত। মোমিন উদ্দীন খালেদের চমৎকার প্রচ্ছদে রুচিশীল অলংকার ও মুদ্রণে বইটির মূল্য ২৪০ টাকা। প্রকাশিত হয়েছে অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে। শেষকথায় ‘কবি ও তার স্বকাল’ গ্রন্থে বলা অন্নদাশঙ্কর রায়-এর একটি বাণী প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি—

কবি তার স্বকালের বই-কি। কিন্তু কবির উক্তি একবার উচ্চারিত হলে চিরকালের। হাওয়ার পিঠে সওয়ার হলে বীজ যেমন দূর দেশে যায় তেমনি সময়ের পাখায় ভর করে কবির উক্তি যেতে পারে নিরবধি কালের শেষ সীমানা অবধি।

কে বলতে পারে? নবীন এক কবির কোনো উক্তি বা কাব্য কালের সীমানা ছাড়াবে না দূর ভবিষ্যতে? নির্মোহ এই কবির কালিক চেতনার পঙক্তিরা দূর আগামীতে অক্ষয় হবে না— এমন বলা মুশকিল। কাব্যস্বরেই বলতে ইচ্ছে হলো—

কবি ও কাব্যের হোক জয়। সময়ের ছিপ, ঠিক তারে তুলে নেবে একদিন— নিশ্চয়।

 

Read Previous

মুদ্রিত দুঃখের ধারাপাতে

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৫ম সংখ্যা (অক্টোবর-২০২৩)

২ Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *