অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আতাউল হক মাসুম -
‘‘জার্নি টু দ্য প্যারালাল ওয়ার্ল্ড’’ : ভিন্ন চিন্তার গল্প

শিশু-কিশোরদের মনে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি কল্পনার জগতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়াই মূলত সায়েন্স ফিকশনের উদ্দেশ্য। জুলভার্ন, এইচ.জি ওয়েলস, আর্থার কোনান ডোয়েল প্রমুখ সাহিত্যিকগণ সায়েন্স ফিকশন রচনা করে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছেন। তাদের লেখা থেকে একাধিক ভাষায় সিনেমা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও সায়েন্স ফিকশনের বড় একটি পাঠক শ্রেণি রয়েছে। শুরুটা জগদীশচন্দ্র বসুর হাত ধরে হলেও একুশ শতকের গোড়ার দিকে হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা সায়েন্স ফিকশন তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

সায়েন্স ফিকশনের পাঠকদের কাছে পছন্দের একটি বিষয় হলো- ভবিষ্যতের পৃথিবী। ভবিষ্যতে মহাবিশ্বে কী ঘটবে, অন্য গ্রহে মানুষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব আছে কি না, আগামী একশ বা এক হাজার বছর পর মানবসভ্যতার কী কী পরিবর্তন ঘটতে পারে সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের বইয়ের পাতায় এসব পড়তেই পছন্দ করে থাকে বেশিরভাগ কিশোর পাঠক। একথাও সত্য যে কিশোর উপযোগী হলেও সায়েন্স ফিকশনের প্রতি সব বয়সী পাঠকেরই কমবেশি দূর্বলতা আছে। বিশিষ্ট গল্পকার ও গবেষক আশরাফ পিন্টু তার ‘‘জার্নি টু দ্য প্যারালাল ওয়ার্ল্ড’’ বইটিতে তার কল্পনার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইউনিভার্স বা সমান্তরাল বিশ্বের ধারণা নিয়ে বিভিন্ন স্বাদের ২০টি গল্প লিখেছেন।

প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল বিশ্ব মানে এই অসীম মহাশূন্যে অসংখ্যা মহাবিশ্ব রয়েছে যার মধ্যে একাধিক পৃথিবীও রয়েছে যা একটি অন্যটির প্রতিরূপ। ইংরেজিতে বলে প্যারালাল ওয়ার্ল্ড বা মিরর ওয়ার্ল্ড। এই মিরর ওয়ার্ল্ড দেখতে আমাদের পৃথিবীর মতোই, একেবারে যেন টুইন ওয়ার্ল্ড বা যমজ বিশ্ব। প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কে সর্ব প্রথম ধারণা দেন বিজ্ঞানী এরভিন শ্রোডিঙার। এরপর অন্য বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই তত্ত্বকে যাচাই-বাছাই করে বলেন যে এই মহাবিশ্বে আমাদের মতো অনেক পৃথিবী থাকতে পারে যা আমাদের পৃথিবীরই মিরর ইমেজ বা মিরর ওয়ার্ল্ড। আমরা যেমন পৃথিবীতে বিভিন্ন কাজ-কর্ম করছি তারাও আমাদের সমান্তরালে বিভিন্ন কাজ-কর্ম করছে যারা দেখতেও হুবহু আমাদেরই মতো চেহারার।

বইটিতে প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের গল্প ছাড়াও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রূপকথা থেকে সায়েন্স ফিকশন ইত্যাদি ভিন্ন স্বাদের কয়েকটি সায়েন্স ফিকশন রয়েছে। জার্নি টু দ্য প্যারালাল ওয়ার্ল্ড সায়েন্স ফিকশনে দেখা যায়- পৃথিবীর বাসিন্দা স্বনন তার ভিনগ্রহের বন্ধু বনবনের সাথে দুই দুইটি প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে পরিভ্রমণ করতে যায়। প্রথমে যায় স্বননের সুসত্তার গ্রহে। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পায় হুবহু স্বননদের পরিবারের মতো একটি পরিবার। তাদের নামও এক, দেখতেও এক। স্বনন, তার বোন মিমোসা, বাবা-মা তাদের অভ্যর্থনা জানায় এবং তাদের গ্রহ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে। এই গ্রহে কোনো মন্দ দিক নেই, কেবল সুখ আর সুখ। সেখান থেকে বের হয়ে উড়ন্ত যানে চড়ে তারা যায় কুসত্তার গ্রহে। সেখানে একইরকম খারাপ একটি পরিবারের অতিথি হয় তারা। গ্রহের মন্দ লোকেরা স্বনন ও বনবনকে আটক করে নির্দয়ভাবে চাবুক দিয়ে পেটায়। কোনোমতে তারা মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে ফেরে। বনবন বলে কুসত্তা এবং সুসত্তা দুই সত্তার সমন্বয়েই মানুষের সৃষ্টি।

‘জার্নি টু দ্য মিরর ওয়ার্ল্ড’-এ দেখা যায় মিরর ওয়ার্ল্ড নামে পৃথিবীর সমান্তরালে পরিভ্রমণরত নয়া আবিষ্কৃত গ্রহে অভিযানে যায় নাসার দুই তরুণ বিজ্ঞানী স্বনন আশরাফ ও সিজান মাহমুদ। প্রাণের অস্তিত্ব পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা অবলোকন করে। নতুন গ্রহে তারা অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীর পরিচিত মানুষজনের সাক্ষাৎ পাচ্ছিল। ক্ষণিকের জন্য তারা নাসার প্রধান বিজ্ঞানী মি. নিউব্রেন এবং স্বননদের বাড়িতে গিয়ে তার মায়ের সাথে কথাও বলে। সায়েন্স ফিকশনের শেষে লেখক আশরাফ পিন্টু বিজ্ঞানীদের ভাষ্যে এর একটি সম্ভাব্য ব্যখা আমাদের দেন। আর তা হলো বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয় আবেশের কারণে সমান্তরালে থাকা দুটি গ্রহের একই বিন্দু বরাবর ক্রসিং-এর ফলে এমনটি ঘটতে পারে। বিজ্ঞানী সিজান সিদ্ধান্তে আসেন, ‘তাহলে এটা নিশ্চিত হওয়া গেল যে ওই গ্রহে কোনো প্রাণীকুলের বসবাস নেই। গ্রহটি আসলে আমাদের পৃথিবীরই মিরর বা আয়না, যেখানে পৃথিবীর সবকিছু প্রতিবিম্বিত হয়।’

‘রূপান্তর’ সায়েন্স ফিকশনে দেখা যায় খনিজ সম্পদ আহরণের উদ্দেশ্যে তিন নভোচারী ‘প্যান্ডোরা’ গ্রহের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে। পথিমধ্যে তাদের স্পেসশিপে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা যায়। নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে চলে অচেনা এক গ্রহে গিয়ে মহাকাশ যানটি বিধ্বস্ত হয়। অন্য দুজনের হদিস না পেলেও নভোচারী স্বপন রহমান নিজেকে অদ্ভুত এক জীবের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করে। জীবটির দুই পা কিন্তু হতের সংখ্যা চারটি। প্রত্যেক হাতে আঙ্গুল রয়েছে ৭টি করে। সামনে পিছনে মোট তিনটি চোখ। অদ্ভুত জীবটির সাথে কথা বলার পর স্বপন মিররে নিজেকে তাদের মতো দেখতে পেয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে।

‘যে গ্রহে বয়স কমে যায়’ দারুণ একটি সায়েন্স ফিকশন। এতে দেখা যায় পৃথিবীর বাসিন্দা মোয়াজ্জম খান জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ‘থরটালউ’ গ্রহে গিয়ে আর ফেরেননি। তার ছেলে আশরাফ খান পিতাকে খুঁজতে বের হয় সুপারসনিক নভোযানে চেপে। সেখানে গিয়ে বিস্ময়করভাবে লক্ষ্য করেন তার পিতার বয়স কমে গিয়ে কিশোরে পরিণত হয়েছেন। পিতাকে নিয়ে পৃথিবীতে ফিরলে তার পুত্রও তাকে চিনতে পারে না, কারণ ‘থরটালউ’ গ্রহে যাওয়ার কারণে তার বয়সও কমে গেছে।

‘ডাইনোসরের ডিম’ সায়েন্স ফিকশনটি পড়লে বোঝা যায় লেখক বৈজ্ঞানিক তত্ত¡-উপাত্ত তালাশ করতে প্রচুর সময় দেন। এখানে দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সোহেল হাসান এন্টার্কটিকা মহাদেশ পরিদর্শনে যান। ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে সেখানে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে। মারা গেছে অনেক পেঙ্গুইন। দলের একজন সদস্য মি. রবিসন এন্টার্কটিকার ভূগর্ভ থেকে উঠে আসা দেড় ফুট লম্বা শিলাখণ্ডের মতো একটি ডিম দেখতে পেয়ে সবাইকে ডাক দেন। সবাই ধারণা করে এত বড় ডিম হয়তো ডাইনোসরের হতে পারে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে হয়তো এখানকার পরিবেশ ডাইনোসরের বসবাসের উপযোগী ছিল। এন্টার্কটিকার কাজ শেষে তারা আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জর্জ ওলসেনের কাছে ডিমটি জমা দেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। তিনি পরীক্ষা করে অবাক হয়ে দেখতে পান যে বরফে ঢাকা থাকার কারণে ডিমটির ভেতরে ডিএনএ এখনো সজীব আছে। দীর্ঘদিনের গবেষণার পর তারা ল্যাবরেটরিতে ডাইনোসরের ডিম থেকে বাচ্চা উৎপন্ন করতে সমর্থ হন। দেশ-বিদেশের লোক এসে ভিড় করতে থাকে সাত শত কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণী দেখার জন্য।

‘আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ’ আরব্যোপন্যাসের কথা কে না জানে! আলাদীনের প্রদীপের মতো একটি প্রদীপ পাওয়ার আকাক্সক্ষা অধিকাংশ কিশোরেরই থাকে। কিশোরদের মনোজগৎকে আধুনিকতার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য লেখক আশরাফ পিন্টু লিখেছেন ‘আশ্চর্য প্রদীপের আধুনিক গল্প’। মূলত এই গল্পের মাধ্যমে লেখক পাঠকদের একটি বার্তা দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। আলাদিনের প্রদীপরূপী রোবটটি হাতছাড়া হয়ে গেলে সে ভেঙে পড়ে। তখন তার শশুর তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘দেখো বাবা, অন্যের সাহায্য নিয়ে কিছু হয় না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখো, এতেই তোমার শান্তি হবে।’

বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানের অন্যতম একটি আলোচ্য বিষয় হলো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। লেখক আশরাফ পিন্টু ‘জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ গল্পে দেখিয়েছেন কীভাবে কৃত্রিমভাবে ছাত্রছাত্রীদের মেধা বাড়ানো যায়। এমনকি এটা ব্যবহার করে ভীতু-দুর্বলকে সাহসী ও শক্তিশালীও করে তোলা যায়।

সায়েন্স ফিকশনে বৈচিত্র্যেও পাশাপাশি লেখকের শিরোনাম নির্ণয়েও বিশেষ বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। উল্লিখিত সায়েন্স ফিকশন ছাড়াও ‘‘জার্নি টু দ্য প্যারালাল ওয়াল্ড’র্’ বইটির আরও কিছু চমকপ্রদ সায়েন্স ফিকশনগুলো হলো- ‘জমজ পৃথিবীর বাসিন্দা’, ‘ভূতিয়েনদের এক্সপেরিমেন্ট’, ‘এলিয়েনদের কবলে পৃথিবী’, ‘নরিয়েন, এলিজার মঙ্গল ভ্রমণ’, ‘ফেরাউনের ক্লোন’ প্রভৃতি। বইটিতে সর্বমোট ২০টি সায়েন্স ফিকশন রয়েছে। আশা করি সায়েন্স ফিকশনগুলো ছোট-বড় সব বয়সী পাঠকের কাছে আদৃত হবে।

জার্নি টু দ্য প্যারালাল ওয়াল্ড
লেখক : আশরাফ পিন্টু
প্রকাশনী : অনুপ্রাণন প্রকাশন
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৪
প্রচ্ছদ : মৌ দত্ত
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১০৪
মূল্য : ৫০০ টাকা।

Read Previous

ওহে ফিলিস্তিন আমার বড় জানতে ইচ্ছে করে

Read Next

প্রসঙ্গ- লাস্ট ডিফেন্ডার অব মনোগামী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *