অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

হাবিবুল্লাহ রাসেল -
হে মুক্ত আত্মা, এইবার নাচো

‘আমরা উৎস থেকে নির্বাসিত, আমরা কথা বলি, লিখি সবই ঘরে ফেরার তাড়না’।

আয়নাজীবন একবার পড়ে শেষ করলাম। শেষ হলো না। আবার পড়লাম। আবার। কী এক ভাষার মায়াজাল ছড়ানো পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়! রবিশংকর বল (১৯৬২-২০১৭)-এর উপন্যাস ‘আয়নাজীবন’। প্রকাশকাল নভেম্বর ২০১৩, প্রকাশক : দে’জ পাবলিশিং।

সুফি সাধক, কবি জালালুদ্দিন রুমি’র জীবন ও তাঁর দর্শন নিয়ে এ উপন্যাস। উপন্যাসের চরিত্র পর্যটক ইবন বতুতা তানজিয়ারের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন বিশ্ব দেখার নেশায়। শহরের পর শহর পেরিয়ে যে আশ্চর্য শহরে পৌঁছান তার নাম আলেকজান্দ্রিয়া। আলেকজান্দ্রিয়ায় দেখা হয় ইমাম বুরহানউদ্দিন আল অরজের সঙ্গে। তার কাছ থেকে মওলানা জালালুদ্দিন রুমির কথা জানতে পারেন ইবন বতুতা। তিনি ইবন বতুতাকে বলেন, ‘কোনিয়া যাওয়ার পথের প্রতিটি পাথরে, প্রতিটি গাছে মওলানার কবিতা লেখা আছে, শুধু তোমাকে বুঝে নিতে হবে।’ ইবন বতুতা ভ্রমণ করতে লাগলেন মওলানার স্মৃতিজড়ানো পথে, চলতে চলতে আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে তুলে ধরলেন মওলানা রুমিকে। কী এক জাদুময়তায় রবিশংকর বল ইবন বতুতার কলমে লিখলেন এই মহান উপন্যাস!

উপন্যাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় পাঠকও ঘুরে বেড়াবেন— দামাস্কাস, নিশিপুর, লারেন্ডে, আলেপ্পো, মক্কা, তাব্রিজ, বাগদাদ, বলখ্‌, আনাতোলিয়া, কোনিয়া…। কোনিয়া— মওলানার লীলাক্ষেত্র, আশ্চার্য ঘুর্ণিনৃত্যের জন্ম শহর, জল আর বাগানের শহর কোনিয়া। তুর্কিরা ছাড়াও গ্রিক, আরব, ভারতীয়, ইরানি, আর্মেনীও, ভেনেশীও, চীনা, সারা পৃথিবী যেন এখানে এসে মিলেছিল। খ্রিস্টানদের প্রথম অধিবেশন হয়েছিলো এই শহরে। এই কোনিয়া থেকেই ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে পড়েছিলো সমরখন্দ আর বোখারায়। আর আনাতোলিয়ার আত্মা লুকিয়ে আছে সরাইখানাগুলোতে। মওলানা বলেছিলেন, ‘এ দুনিয়া এক সরাইখানা।… আনাতোলিয়া শুধু একটা জায়গা নয়, আত্মার আরেক নাম আনাতোলিয়া।’

‘এপারে যখন বন্ধ করো মুখ,

তখনই তা খুলে যায় ওই পারে,

তোমার গান প্রতিধ্বনিত হোক শূন্যের ভিতরে।’

এ উপন্যাস পড়ে পাঠক জ্ঞানমার্গ থেকে মায়ামার্গে পৌঁছাবেন, প্রেম আর মায়ার ধাঁধায় দুলবেন। কেননা ‘প্রেম আসলে এক দীর্ঘ জাগরণ। আপনার নিদ্রিত আশিকের পাশে বসে তার জেগে ওঠার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা।’ কিন্তু ‘প্রেমের চেয়েও অনেক বড় মমতা। প্রেমে অনেক সময়ই মোহ জড়িয়ে থাকে। মমতায় কোনও মোহ থাকে না।’

এ উপন্যাস পড়ে পাঠক জীবনভর ইতিহাসকে বয়ে বেড়াতে শিখবেন। কেননা, ‘ইতিহাস ঘটনা বা কাহিনি নয়, ইতিহাস একটা দায়, মানব জীবনে তুমি তা বহন করতে বাধ্য।’ মওলানার হ্যাজেল বাদামের মতো লালচে-বাদামি চোখে পাঠক হারিয়ে যাবেন— ‘সেই চোখের ভিতর দিয়ে এক দীর্ঘ পথ চলে গিয়েছে, এই দুনিয়া পেরিয়ে, অন্য দুনিয়ার দিকে।’

এ গ্রন্থ পাঠে পাওয়া যায় একা হওয়ার মন্ত্র। মওলানাকে শামস বলেন, ‘আরও একা হতে হবে। ভিড়ের মধ্যে সত্য থাকে না। …জীবন থেকে সব পাহারাদার বিদায় করো। বন্ধু নামে যারা জীবনে আসে, তারা বেশির ভাগই পাহারাদার।’ এ উপন্যাস ক্ষমতার লালসা থেকে দূরে থাকার গান শোনায়। মওলানা বলেন, ‘নবাব সুলতানদের সাথে বেশি মাখামাখি করতে যেও না। এইসব ক্ষমতাধররা একসময় ড্রাগন হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে যারা কথা বলে, বন্ধুত্ব করে, তাদের সম্পদ গ্রহণ করে, তারা একসময় ড্রাগনের ইচ্ছায় তার মতোই কথা বলতে শুরু করে।’ ক্ষমতা নিয়ে মওলানা আরও বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষই এমন, তাদের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে দেখে না, শোনে না, বোঝার চেষ্টা করে না।’

অহং তাড়িয়ে ভালোবাসার বসন্তে ঋদ্ধ এক উপন্যাস ‘আয়নাজীবন’। এখানে আছে ‘তুমি যদি কাউকে ভালবাসতে না পারো, তাহলে বুঝবে দু’জনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তোমার অহং।’

বৈষয়িক নয়, আত্মার দারিদ্র্যই হচ্ছে প্রকৃত দারিদ্র্য। ভিখিরি হলেও আত্মা যেন হয় ঐশর্যবান। এ উপন্যাস পাঠে আত্মা ধনবান হবে। আত্মার দারিদ্র সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আত্মার দারিদ্র কেমন জানেন? অসুস্থ মানুষের জিভে মিষ্টিও তেতো লাগে।’ সম্পদে নয়, গর্ব থাক আত্মার ঐশ্বর্যে। মওলানা বলেন, ‘কিছু কিছু গর্ব ঔদ্ধত্যের নয়, আনন্দের। নিজেকে প্রকাশ করার আনন্দ।’

উপন্যাসে ছড়িয়ে আছে কিস্‌সা’র পর কিস্‌সা, কিস্‌সার ভেতরে কিস্‌সা। কেননা, ‘সারা দুনিয়া, দুনিয়ার বাইরে যা কিছু, সবই এক একটা কিস্‌সা।’

এ উপন্যাসের ভাষার মায়ায় পাঠক বিভোর হয়ে মওলানা রুমি, শামস্‌-এর সান্নিধ্য পাবেন। অন্তরজুড়ে মসনবি শুনবেন। কদমের বোল, নে বাঁশির সুরে, শমার উদ্দাম ঘূর্ণিনৃত্যে মেতে উঠবেন। পাঠকও নাচবেন লড়াইয়ের মাঝখানে, নাচবেন রক্তের ভেতরে… মুক্ত আত্মায়…

‘যখন বিদীর্ণ হয়ে খুলে গেছো, তবে নাচো।

ক্ষত-পটি যদি ছিঁড়ে ফেলেছো, তবে নাচো।

লড়াইয়ের মাঝখানেই নাচো।

নাচো, তোমার রক্তের ভিতরে।

হে মুক্ত আত্মা, এইবার নাচো।’

সহকারী অধ্যাপক, ফজিলা রহমান মহিলা কলেজ, কৌরিখাড়া, স্বরূপকাঠি, পিরোজপুর থেকে

raselanuvab@gmail.com

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

বোধনের আগেই নিরঞ্জন

Read Next

হিন্দি চলচ্চিত্র ও অবিবাহিতা মায়েদের মাতৃত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *