অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

স্বপঞ্জয় চৌধুরী -
সাহিত্য বিকাশে লিটলম্যাগচর্চা

সাহিত্য বিকাশে ও চর্চায় লিটলম্যাগ একটি অন্যতম প্রধান বাহন। লিটলম্যাগকে বলা যায় শিল্পসাহিত্য বিকাশের বাতিঘর। গোষ্ঠিকেন্দ্রিকতার বলয় ভেঙে কিংবা অনেকক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে থেকে সাহিত্যকে আস্তে আস্তে ক্রমবিকাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে লিটলম্যাগ। লিটলম্যাগ বা ছোটকাগজ সম্পর্কে লোক-এর একটি স্লোগান রয়েছে— ছোটকাগজ কারও মনকে জোগাতে নয় জাগাতে চায়।

অর্থাৎ একটি লিটলম্যাগ বা ছোটকাগজ আপনাকে কতটুকু বিনোদিত ও আলোড়িত করতে পারবে তা হলফ করে বলা যাবে না। তবে আপনার চিত্তের ভেতর কুসুম পল্লবিত আরেক যে মানুষ ঘুমিয়ে রয়েছে তাকে জাগিয়ে তুলতে পারবে ছোটকাগজ। লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির বালাই থেকে বেরিয়ে এসে ছোটকাগজই তৈরি করতে পেরেছে দেশের সত্যিকারের সাহিত্যের দিকপালদের। একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্চার ভেতর দিয়ে জাতি পাচ্ছে দেশের সত্যিকারের মেধাবী মানুষগুলোকে। যারা স্বপ্ন দেখে এবং দেখায়। লিটল ম্যাগাজিন শিল্পসাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ে চলমান ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তাধারা ও মতামত ব্যক্ত করার মুদ্রিত বাহনকে বলা হয় লিটল ম্যাগাজিন। এ ম্যাগাজিন অনেকটা অনিয়মিত ও অবাণিজ্যিক। লিটল ম্যাগাজিন প্রতিনিধিত্ব করে একটি ছোট সমমনা নব্য গোষ্ঠীর যার চিন্তা-ভাবনা-দর্শন চলমান ধারা থেকে ভিন্ন এবং অভূতপূর্ব। উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু।

ইংরেজি সমালোচনা সাহিত্যের ইতিহাস মতে লিটল ম্যাগাজিনের অভিযাত্রা শুরু হয় Ralph Waldo Emerson ও Margaret Fuller (Boston, ১৮৪০-১৮৪৪)-এর মাধ্যমে। ইমার্সনের নতুন দর্শন Transendentalism-এ যারা সমর্থক তাঁরাই শুধু Dial ম্যাগাজিনে লিখতেন। লিটল ম্যাগাজিনের আরেক প্রভাবশালী পত্রিকা ছিল ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত Savo। ভিক্টোরীয়ান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার উদারপন্থী ও সাম্যবাদী লেখকদের প্রধান বাহন ছিল এটি। সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশ শতকের গোড়ার দিকে সবচেয়ে নামী লিটল ম্যাগাজিন ছিল Poetry : A Magazine of Verse (Chicago ১৯১২। এর সম্পাদক ছিলেন হেরিয়েট মনরো ও এজরা পাউন্ড।

পাশ্চাত্যের আদলে বঙ্গদেশে প্রথম লিটল ম্যাগাজিন প্রবর্তন করে প্রমথ চৌধুরী। তাঁর সম্পাদিত সবুজপত্র (১৯১৪)-কে আধুনিক লিটল ম্যাগাজিনের আদিরূপ বলে গণ্য করা হয়। অবশ্য অনেকে মনে করেন যে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন (১৮৭২) বাংলা ভাষায় প্রথম লিটল ম্যাগাজিন।

লিটল ম্যাগাজিন নবচেতনা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এবং লেখক ও পাঠকদের মধ্যে সে নবচেতনাকে সঞ্চারিত করে দেওয়ার জন্যে আন্দোলনে যায়। যারা সাহিত্য, দর্শন ও শিল্প-চেতনায় গতানুগতিক ধারার বিরোধী, তারা তাঁদের চিন্তাচেতনার প্রকাশ ঘটান নিজেদের সংঘটিত মুখপত্রের মাধ্যমে, কেননা সাধারণের নিকট তাঁরা অপ্রিয়, বাণিজ্যিক কারণে বাজারের পত্রিকার পরিচালকেরা তাঁদের পরিহার করে চলেন। অতএব নবধারার নবযুগের শিল্পী সাহিত্যিকেরা তাঁদের মতবাদ প্রচারের জন্য লিটল ম্যাগাজিনের আশ্রয় নেন। লিটল ম্যাগাজিন থেকে বেরিয়ে আসেন তখনই যখন তাঁদের মতামত সমাজ মোটামুটি গ্রহণ করে থাকে।

বাংলাসাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনায় বহু পত্রপত্রিকা বাণিজ্যিকভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত সংবাদ প্রভাকর (১৮৩১), অক্ষয় কুমার দত্ত সম্পাদিত তত্ত্বববোধিনী পত্রিকা (১৮৪৩), প্যারীচাঁদ মিত্র ও রাধানাথ শিকদার সম্পাদিত মাসিক (১৮৫৪), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন (১৮৭২), দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত ভারতী (১৮৭৭), সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত সাধনা (১৮৯১), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রবাসী (১৯০১), জলধর সেন ও অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত ভারতবর্ষ (১৯১৩) প্রভৃতি পত্রিকা। এসব পত্রিকা ছিল প্রতিষ্ঠিত মতাদর্শের বাহক, যদিও পাশাপাশি অভিনবত্বেরও ছাপ ছিল এগুলোতে। তবে সনাতন চিন্তাধারার প্রাধান্য ছিল।

যথার্থ অর্থে বাংলায় লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভাব ঘটে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র (১৯১৪) পত্রিকার মাধ্যমে। পরবর্তীকালে কল্লোল (১৯২৩), শনিবারের চিঠি (১৯২৪), কালিকলম (১৯২৭), প্রগতি (১৯২৭), পূর্বাশা (১৯৩২) পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিন প্রবাহকে বেগবান করে। এসব পত্রিকার লেখকগণের উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে তাঁরা ইউরোপীয় আদর্শে বাস্তবজীবন, মনস্তত্বের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রসঙ্গকে তাঁদের রচনার প্রধান উপাত্ত করেন। লিটল ম্যাগাজিন উন্মেষকালে রবীন্দ্রনাথের অনেক কালজয়ী রচনা প্রকাশিত হলেও লিটল ম্যাগাজিনের প্রভাবই বেশি লক্ষ করা যায়, বিশেষত বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা (১৯৩৫) পত্রিকার মাধ্যমে।

বাংলাদেশে ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম থেকে মাহবুব উল আলম চৌধুরী ও সুচরিত চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সীমান্ত (১৯৪৭-৫২)। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে পত্রিকাটি স্মরণীয় হয়ে আছে। ফজলে লোহানীর সম্পাদনায় ১৯৪৯ সালে বের হয় অগত্যা। মধ্যবিত্ত, নব্যনাগরিক জীবনের এবং বুর্জোয়া মানবতাবাদী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে অগত্যার লেখাগুলোতে। এ কারণে পত্রিকাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাছাড়াও সমকালীন মেধাবী ও প্রগতিশীল তরুণ লেখকদের উচ্ছ্বাস, আনন্দ, চিন্তাভাবনা অগত্যা পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে।

আবদুল আলীম চৌধুরী ও আহমদ কবির-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয় যাত্রিক (১৯৫৩)। পঞ্চাশের দশকের প্রধান তরুণ সাহিত্যিকগণের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র ছিল যাত্রিক। সিকান্‌দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল (১৯৫৭) পঞ্চাশের দশক থেকে প্রকাশিত হলেও এর প্রকৃত সমৃদ্ধি ষাটের দশকজুড়ে। প্রগতিবাদী-সৃষ্টিশীল সমকাল-এ এমন সব লেখাকে স্থান দেওয়া হতো যে-ধরনের লেখা ইতোপূর্বে প্রকাশিত সওগাত (১৯১৮), মোহাম্মদী, মাহে-নও ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত রচনাগুলো থেকে ভিন্ন ধরনের। প্রকৃতপক্ষে ষাটের দশকে বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন শুরু হয় স্যাড জেনারেশন (১৯৬৩), স্বাক্ষর (১৯৬৩), কণ্ঠস্বর (১৯৬৫), ছোটগল্প (১৯৬৬), সাম্প্রতিক (১৯৬৪) প্রভৃতি আধুনিকতাবাদী লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের মাধ্যমে।

এনামুল হকের সম্পাদনায় উত্তরণ (১৯৫৮) পত্রিকাটি বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন-আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। অপরদিকে ফজল শাহাবুদ্দীন সম্পাদিত কবিকণ্ঠ, সাঈদুর রহমানের খাপছাড়া, মহিউদ্দিন আহমদের স্পন্দন, সিরাজুর রহমান সম্পাদিত সংকেত প্রভৃতি কাগজ পঞ্চাশের দশকের লিটল ম্যাগাজিন-আন্দোলনকে গতিশীল করে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে এ সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের অন্যান্য লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— সপ্তক (১৯৬২), বক্তব্য (১৯৬৩), স্বাক্ষর (১৯৬৩), স্যাড জেনারেশন (১৯৬৩), যুগপৎ (১৯৬৩), সাম্প্রতিক (১৯৬৪), কালবেলা (১৯৬৫), কণ্ঠস্বর (১৯৬৫), ছোটগল্প (১৯৬৬), না (১৯৬৭), বহুবচন (১৯৭০), স্বদেশ (১৯৬৯), শব্দের বিকৃতি (১৯৬৯), শিল্পকলা (১৯৭০) প্রভৃতি। ষাটের দশকের প্রথম উল্লেখযোগ্য কাগজ সপ্তক। পত্রিকাটি বিশেষ পরিচিতি লাভ করে গল্পে স্বাতন্ত্র্য আনয়নে। লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে স্বাক্ষর উল্লেখযোগ্য এ কারণে যে, সাহিত্যসৃষ্টির পাশাপাশি বিশৃঙ্খল-ভাবনার তরুণ কবিদের ভাবনায় সামঞ্জস্য বিধান করেছিল। সাম্প্রতিক প্রকাশিত হলে স্বাক্ষর-এর কেউ কেউ এ পত্রিকায় লেখেছিলেন। এ দশকের মাঝামাঝি ‘ছোটগল্প’ প্রকাশে শ্রাবন্তী (১৯৬৬), ছোটগল্প, উল্কা (১৯৬৬), সূচীপত্র (১৯৭০), স্বরগ্রাম (১৯৭০), সুন্দরম (১৯৭০), পত্রিকাগুলোর যথেষ্ট অবদান রয়েছে এবং এ সময় ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ছোটগল্প সমিতি’ নামে একটি সংগঠন। এ সমিতি থেকে কামাল বিন মাহতাবের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ছোটগল্প। ছোটগল্পকেন্দ্রিক পত্রিকা হিসেবে এটিই বাংলাদেশের প্রথম গল্পবিষয়ক পত্রিকা। মধ্যষাটে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় কণ্ঠস্বর। প্রায় বারো বছর নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছে। আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আবদুস সেলিম সম্পাদিত শিল্পকলা (১৯৭০) ছিল ষাটের দশকের ভিন্নধর্মী লিটল ম্যাগাজিন। পত্রিকাটিতে কবিতাচর্চার পাশাপাশি চলচ্চিত্র, চিত্রকলা ও সাহিত্যের অন্যান্য শাখাও সমান গুরুত্বে স্থান পেয়েছে।

ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিনগুলোকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্য-আন্দোলন শুরু হয়, সে ধারা স্বাধীনতার পরে অব্যাহত থাকেনি। সেসময় মানুষের চেতনাজগতে স্বতন্ত্রধর্মী পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, যা সাহিত্যেও প্রভাব ফেলে। এ সময় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। এ সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কিছুসংখ্যক লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় যা সত্তরের দশকের সাহিত্যচর্চার ধারাকে গতিশীল করে। এসব পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ দেখা দেয় নতুন আঙ্গিকে। ওবায়দুল ইসলাম ও মুহম্মদ হাবিবুল্লাহ সম্পাদিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন মুখপত্র (১৯৭২)। মফিদুল হক সম্পাদিত গণসাহিত্য (১৯৭২) পত্রিকাটি প্রগতিশীল লেখকদের নিয়ে সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্রধারা গড়ে তুলেছিল। পত্রিকাটি পঞ্চাশের দশকের সমকাল পত্রিকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। গত তিন দশকের সাহিত্য-প্রচেষ্টা পত্রিকাটিতে পাওয়া যায়। সত্তরের দশকের শেষ দিকে সাঈদ জুবেরী ও জাহিদ হায়দারের সম্পাদনায় বিপক্ষে পত্রিকাটি লেখকদের চটুল রম্যপ্রিয়তার বিপক্ষে ছিল। তিতাশ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় অলক্ত। এ দশকের কথাসাহিত্যধারাকে বেগবান করার ক্ষেত্রে এ পত্রিকা দুটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। মধ্যসত্তরে আবিদ আজাদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় কবি (১৯৭৫)। পত্রিকাটিতে সমকালীন কবিদের বিশ্লেষণধর্মী কবিতা ছাপা হতো।

আশির দশকের শুরুতে লেখকদের চিন্তার গভীরতা কমতে থাকলে মধ্য-আশিতে লেখার সংকট দেখা দেয়। বর্তমানে এ সংকট আরও ব্যাপক হয়েছে। তাছাড়া এ সময় মুদ্রণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায়, বিজ্ঞাপন প্রাপ্তির দুরূহতার কারণে লিটল ম্যাগাজিনের জন্য পর্যাপ্ত শ্রম ও সততার তীব্র অভাব লক্ষ করা যায়। এ সংকটময় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন, আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পাদিত লোকায়ত (১৯৮২) পত্রিকাটি লিটল ম্যাগাজিনের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছিল। এ পত্রিকার প্রায় সংখ্যাতেই লেখা থাকত— যারা জানতে চায়, বুঝতে চায়, তর্ক করতে চায়, অতীতের গর্ভ থেকে বর্তমানকে যুক্ত করে অন্যায়মুক্ত, অভাবমুক্ত নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ করতে চায় লোকায়ত তাদের পত্রিকা। প্রায় তিন দশক ধরে প্রকাশিত পত্রিকাটি আমাদের চিন্তার জগতকে প্রভাবিত করেছে। তপন বড়ুয়া সম্পাদিত গাণ্ডীব, সমকালীন প্রগতিশীল নতুন লেখকদের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র ছিল। খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত একবিংশ গদ্যমাধ্যমের কবিতা ও কবিতাবিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন। বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত সংস্কৃতি আমাদের চেতনাজগতে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পত্রিকাটি নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্পকলাচর্চার মাধ্যম ছিল। মীজানুর রহমান সম্পাদিত মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা (১৯৮৩), বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত সংস্কৃতি, আবু ইউসুফ সম্পাদিত আত্মপ্রতিকৃতি, মোহাম্মদ শাকেরউল্লাহ সম্পাদিত ঊষালোকে ম্যাগাজিনগুলোই আমাদের মুক্তবুদ্ধিচর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে।

নব্বইয়ের দশক থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে বহু লিটল ম্যাগাজিন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারা বিকাশিত না হলেও সমাজে তার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা অবলুপ্ত হয়নি। আমাদের চেতনাজগতে বিদেশি সংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করছে। প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী গণসংযোগের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তার ফলে আমাদের সাহিত্যে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন চিন্তা। আর নিরীক্ষাধর্মী লেখা প্রকাশের মাধ্যমে লিটল ম্যাগাজিনগুলোকে আশ্রয় করে সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের সাহিত্য।

নব্বই দশক, প্রথম দশক ও দ্বিতীয় দশকেও নিয়মিত ও অনিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে বেশকিছু ছোটকাগজ। যা সময়ের সাথে খাপ খাওয়ার সাথে সাথে যুগোপযোগীভাবে প্রকাশিত হচ্ছে পূর্বাপেক্ষা অধিক নিরীক্ষা ও চর্চার ভেতর দিয়ে। কবি ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত শালুক পত্রিকা চর্চিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে— বিশেষ বিশেষ সাহিত্যিককে কেন্দ্র করে সমৃদ্ধ আয়োজন করে থাকে। সম্প্রতি জীবনানন্দ দাশের উপর দুটো সমৃদ্ধ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। ভবিষ্যৎ গবেষণার দলিল হিসেবেও এটি সমাদৃত হবে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত নতুন দিগন্ত, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত আবহমান, কবি ও কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর সম্পাদিত ঘুংঘুর, আবু এম ইউসুফ সম্পাদিত অনুপ্রাণন, খালেদ উদদীন সম্পাদিত বুনন, কবি আহমেদ শিপলু সম্পাদিত মগ্নপাঠ, কবি ও প্রাবন্ধিক বঙ্গ রাখাল সম্পাদিত নিহারণ, কবি অরবিন্দ চক্রবর্তী সম্পাদিত মাদুলি, কথাসাহিত্যিক ইমরুল কায়েস সম্পাদিত নব ভাবনা, কবি আনোয়ার কামাল সম্পাদিত এবং মানুষ, বাদল সাহা শোভন সম্পাদিত রোদ্দুর, কবি আহমেদ ফয়েজ সম্পাদিত নহলী, মাহমুদ নোমান সম্পাদিত দেয়াঙ, রনি বর্মণ সম্পাদিত বামিহাল, কথাসাহিত্যিক হারুন পাশা সম্পাদিত পাতাদের সংসার— এসব লিটলম্যাগের কথা উল্লেখযোগ্যভাবে বলতে হয়। পাতাদের সংসার লিটলম্যাগটি বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকদের নিয়ে বিশেষ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে ইতোম্যধ্যে আলাদা একটি অবস্থান দাঁড় করাতে পেরেছে। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, হরিশংকর জলদাস, সেলিনা হোসেনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে সংখ্যা করেছে।

এছাড়াও বেশকিছু লিটলম্যাগ সুনামের সাথে এখনও তাদের প্রকাশকার্য অব্যাহত রেখেছে। সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— নাহিদা আশরাফী সম্পাদিত জলধি, কবি অনিরুদ্ধ দিলওয়ার সম্পাদিত কবিতাভূমি, কবি হোসেন দেলোয়ার সম্পাদিত দূরের সাইকেল, কাঠপেন্সিল, খেয়া, প্রকাশ, চারবাক, প্রান্ত, নৃ, দেশলাই, খড়িমাটি, প্রতিবুদ্ধিজীবী, একবিংশ, দাঁড়কাক, অনুভূতি, কবিতাপত্র, লোক, শালুক, কর্ষণ, কবিতাবাংলা, খনন, টাঙ্গন, অনুরণন, কবিতাঅলা, কালের ধ্বনি, মানুষ, সাম্প্রতিক, কবি, শিড়দাঁড়া, এবং মানুষ, রোদ্দুর, কোরাস, শব্দগুচ্ছ, ভিন্নচোখ, দাগ, কথা, প্রান্তস্বর, ম্যাজিক লণ্ঠন, চিরকুট, স্বপ্নকুঁড়ি, ল্যাম্পপোস্ট, গল্পকথা, ম, শাব্দিক, সরলরেখা, শব্দ, কবিতার রাজপথ, কাব্যকথা, বাংলার কবিতাপত্র, প্রতিধ্বনি, জলতরঙ্গ, তৃতীয় চোখ, অনুঘটক, মনন, সপ্তবর্ণ, জলছবি, অবিনশ্বর, কালধারা, নান্দীপাঠ, চন্দ্রবিন্দু, ধ্রুপদী, অমিত্রাক্ষর, চিহ্ন, মেঘ, পান্থজনের সখা, পর্ব, কার্পাস, চর্যাপদ, লাটাই, পুনশ্চ, কাশবন, আলোকধারা, উত্তরায়ন, সারস, কাদাখোঁচা, রৌদ্রছায়া, উলুখাগড়া, শিল্প ও সাহিত্য, হরিৎপত্র, পাণ্ডুলিপি, শব্দ কাহন, সম্প্রীতি, ছিন্নপত্র, দোয়েল, সময়চিহ্ন, স্বাক্ষর, বৃত্তায়ন, কালপত্র, আবহমান, লিরিক, বৈঠা, ক্যাপটেন ইত্যাদি।

তবে এর বাইরেও অনেক ‘ছোটকাগজ’ ঢাকা থেকে ও ঢাকার বাইরে থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। এ থেকেও বাংলাদেশের ‘লিটল ম্যাগাজিন’ ও আমাদের সাহিত্যের বর্তমান হাল জানা সম্ভব। তাই বলা যায় লিটল ম্যাগাজিন আমাদের সাহিত্য বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গতানুগতিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নতুন চিন্তার বাহক হিসেবে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

স্বপঞ্জয় চৌধুরী : কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক; প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, সাউথ পয়েন্ট কলেজ, বারিধারা, ঢাকা

 

Read Previous

জলছবির প্রতিচ্ছবি

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৪র্থ সংখ্যা (এপ্রিল-২০২৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *