অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

জসীম উদ্দীন মুহম্মদ -
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ – গুচ্ছকবিতা

পৃষ্ঠাজুড়ে স্বাধীনতা 

সারাদিন বিছানা আর পিঠ প্রায় একই সাথে ছিল
অনেকটা আকাশ আর দিগন্তের মতোন
যদিও এপাড় এবং ওপাড়
তবুও তা আমার কাছে ঢেউ আর সমুদ্রের কারবার!

ইদানীং দুই চোখ বন্ধ করলেও অনেক কিছুই দেখি
পৃথিবীর পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা অনায়াসে পড়ে যেতে পারি
কেবল হাজার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও চিনতে পারি না নিজকে
আমি যেন দিন দিন নিজের কাছেই নিজে অচেনা

তবে কীভাবে শুধিব মাটির দেনা, আকাশের দেনা!
সারাদিনই কেবল এইসব ভেবেছি
চাঁদের বুড়ির চরকা কাটার মতোন উচ্ছ্বল আলোর
নদী জন্ম থেকে মৃত্যু
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এখন কেবলই রূপান্তরিত আত্মা
সবাই অমরত্ব চায়…  নিরবধি!

গল্পের রুপালি রূপান্তর

মাঝে-মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে যখন উড়তে থাকি তখন
মনে মনে ভাবি এ আর এমন কী?
মশা ওড়ে… মাছি ওড়ে,
পাখি ওড়ে, তেলাপোকা ওড়ে..
এমনি করে ওড়ে আরও হাজারো কত কী!

আসলে জীবন কেবলই দু’আঁটি পাটের বোঝা
সরল অঙ্ক কেবল নামেই, নয় এত সোজা!
তবুও ডেকে আনি ঢেঁকুর বেদনা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে
অন্তর, আমি জানি আজ হউক, কাল হউক
একদিন না একদিন ঘটবেই গল্পের রুপালি রূপান্তর!

তবুও…
সারাদিন কতকিছু আঞ্জাম দিই বাড়ি, গাড়ি,
নারী; আচ্ছা, যে পথে হেঁটে যাই… সেপথ কি চেনে
আমায়? নাকি সবকিছু কেবলই লজ্জাবতীর লজ্জা…
আশা, ভয় ও শঙ্কার আলো-আঁধারীর ফুলশয্যা!

তথাপি থেমে নেই মধ্যরাতের উড়নচণ্ডী ভুল
হাঁটতে হাঁটতে উড়তে উড়তে ফিরে ফিরে আসে
মৃতনদীর দুকূল; অথচ পৃথিবীর কেউ বোঝে না
বুঝতে চায় না… লাটাইবিহীন ঘুড়ির পাস্তুরিত ভুল!

ভুল পৃষ্ঠার গল্প

একদিন একটা পৃষ্ঠা উল্টাতে ভুলে গিয়েছিলাম
সেই ভুলের মাশুল আজও গুনছি!
অথচ পদ্মপাতার রঙ আজও তেমন তখন ছিল যেমন!

হিসাবে আমি বরাবরের মতোন এখনও কাঁচা
আকাশের নক্ষত্রগুলো অনেকদিন গুনতে চেয়েছি
গুনতে চেয়েছি বেচারি কুসুমের শরীরে কয়টি তিল
শৈশবে গুনতে চাইতাম মাথার উপর কয়টি চিল!

এখনও ফি রোজ কতকিছুই তো গুনতে হয়
এই যেমন প্রতিদিন কত টাকার তেল কিনেছি
ওই তেল কার কার তেলা শরীরে মালিশ করেছি
আজ সারাদিনে কয়টি তেলাপোকার সাক্ষাৎ পেয়েছি
এমনি আরও কত কিছু…!

তবুও কেবল সেই ভুলে যাওয়া পৃষ্ঠার কথা মনে হয়
কেবলই মনে হয়
যে ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, তা আমার নয়!


আইসল্যান্ড থেকে সেন্টহেলেনা

কবিতা লিখি বলতেই একজন মুচকি হাসি দিলেন
তবে আমার খুব একটা খারাপ লাগেনি
কেননা এই হাসিটা আমি একচল্লিশ বছর ধরে চিনি!

যেভাবে কোনো মরা দেখলেই শকুন হাসে
যেভাবে ধনিক শ্রেণি দরিদ্র দেখলে হাসে সেই হাসি
অথচ তিনি হয়তো জানেন না এইসব বিগাইড়া হাসি
মান্দারের কাঁটার মতোন আমিও খুউব ভালোবাসি!

ইদানীং আমি কারও কারও মুখের মানচিত্রের দিকে
অবাক চেয়ে থাকি… পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পাঠ করি
যেখানে অন্ধকার দেখি সেখানে আলোও দেখি
তবুও পোড়ায়… আইসল্যান্ড থেকে সেন্টহেলেনা দ্বীপ
জ্বলতে জ্বলতে একদিন যে নিঃশেষ হয়ে যেতে হবে
সে কথা কি জানে না বাসর ঘরের জ্বলন্ত প্রদীপ?

আকাশছোঁয়ার গল্প

খুব স্বাভাবিকভাবেই পানি সবসময় নিচের
দিকে গড়ায়, খুব স্বাভাবিকভাবেই সবাই পানি দেয়
গাছের গোড়ায়; তবুও এইসব নীতিকথা সবসময়ের
জন্য ঠিক নয়, যে পানি নিচের দিকে গড়ায়; কে
জানে না… সেই পানিও একটা সময় বাষ্প হয়!

কিছু কিছু মানুষ সবসময়ই যশ-প্রিয়, তারা কখনও
মাটির দিকে ভালোবাসার চোখে তাকায় না
মাটির দিকে তাকাতে তাদের বোধকরি ঘৃণা হয়
আচ্ছা বলুন, তারা কি এই মাটির গড়া নয়?

আকাশ ছোঁয়ার জন্য যারা ঘোড়ার মতোন ছুটে যায়
বলুন তো তারা কি সবসময়ই আকাশ ছুঁতে পায়?
হয়তো পায় না তখন মাঝে-মধ্যে হাত-পাও ভেঙে যায়
আর খ্যাতি নিজেই যখন কারও পেছনে ছুটে চলে
তখন তার ঢোল নিজেকে আর পেটাতে হয় না
তার ঢোল নিজে নিজেই সবার সাথে কথা বলে!

সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

কৃষ্ণচূড়া

Read Next

ড. জসীমউদ্দিন আহমেদ : ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনের অনন্য পথিকৃৎ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *