অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আকিব শিকদার -
আকিব শিকদার – দু’টি অণুগল্প

ডেঙ্গু

ট্রেনে বড় ভাইটার সাথে পরিচয়। জানলাম তার সহকর্মীর সাথে প্রেম। সাত-আট বছরের সম্পর্ক। বাসা থেকে পরস্পরের সাথেই বিয়ে ঠিক। দিন নির্ধারণ করে অফিসের সবাইকে কার্ড দিয়ে দাওয়াত দিল। বিয়ের কেনাকাটা চলছে। গুগল থেকে পছন্দসই পণ্যের ছবি ডাউনলোড করছে। ইউটিউব থেকে দিচ্ছে অলংকারের স্ক্রিনশট। কোন দোকানের শাড়ি সুন্দর? কোথায় আছে ভালো লেহেঙ্গা? হীরার নাকফুলের দাম কমেছে জেনে আনন্দ। বিয়ের কার্ডে নামের বানান ভুল নিয়ে আফসোস, কষ্ট। শ্বশুর-শাশুড়ি হবু বউয়ের জন্য জুতা কিনতে গিয়ে এলিফ্যান্ট রোডের সব কয়টি দোকান ঘেটেও মনমতো জুতা পেল না।

হঠাৎ ডেঙ্গু। বিয়ের ছয়দিন আগে কনে হাসপাতালে ভর্তি। শরীরে প্লাটিলেট কমে গেছে। রক্ত দেওয়া লাগবে। ও নেগেটিভ রক্ত। স্বামী-স্ত্রী দুজনের একই গ্রুপের রক্ত হলে বাচ্চা নিতে সমস্যা হয়, এই কথা বলে সহকর্মীরা ভয় দেখাত। আজ মনে হলো দুজনের রক্ত এক হওয়াটাই ভালো হয়েছে। রক্ত দেওয়ার পর সুস্থ হলো।

গায়ে হলুদের স্টেজ সাজানো হয়েছে। ককশিটে লেখা ‘শানীলার হলুদ সন্ধ্যা’। বিয়ের গান বাজছে। কন্যা বসল আসরে। গাঁদা ফুলের সাথে হলুদ মিশিয়ে গায়ে মাখা হলো। অনেক ছবি উঠল চমৎকার-চমৎকার। একটা ছবি আতশবাজির চক্রে তারাবাতি পোড়ানোর, একটা ছবি আত্মীয়দের সাথে ফানুস ওড়ানোর। মাঝরাতে হঠাৎ জ্বর আবার বেড়েছে। খিঁচুনি দিয়ে অজ্ঞান। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেওয়ার জন্য গাড়িতে তোলা হলো। পথে মৃত্যু। পরদিন বিয়ে খেতে এসে আত্মীয়রা জানাজা পড়ে গেল।

ছেলের বাড়িতে বাসর ঘর সাজানো, অথচ মেয়ে কবরে কালো অন্ধকারে। ফুলে ফুলে ঝুলে আছে এক অপ্রাপ্তির বেদনা। ছেলেটার ইচ্ছে হলো না নিজের ঘরে যেতে। কবরের পাশে সে জেগে থেকে কাটিয়ে দিল রাত; একাকী।

নয়শো’ ছত্রিশ নাম্বার বেড

মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় কিছু নেই, যা আমি পেয়েছি অসুস্থ থাকা দিনগুলোতে। সুচিকিৎসার জন্য মাদ্রাজ নিতে হবে বলে ডাক্তারেরা যখন আমাকে ঢাকা মেডিকেল থেকে রেফার করে দিল, আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো গ্রামের বাড়িতে। পাশাপাশি তিন গ্রামের লোকেরা প্রায় প্রতিদিন রোগী দেখতে আসত। সাথে নিয়ে আসত তাদের গাছে ধরা টাটকা ফলমূল, শাকসবজি। কিন্তু আমি তো কিছুই খেতে পারতাম না। মুখে নিলেই নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসত।

আমাকে যেদিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, ডাক্তারেরা টেস্টের রিপোর্ট দেখে বলেছিল, হারপিক খেয়েছিলেন নাকি! পাকস্থলিতে এত ঘা আগে দেখিনি!

আসল কারণটা বলি। আমি ছিলাম একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং এজেন্ট। সকালে মালামাল নিয়ে মার্কেটে যেতাম, ফিরতাম সন্ধ্যায়। দুপুরে বাইরে খেতে হতো পুরি-সিঙ্গারা, পুরাতন তেলেভাজা সমুচা। প্রায়ই পেট ব্যথা করত। ভাবতাম আলসার, হয়তো সেরে যাবে। কিন্তু যেদিন মধ্যরাতে বমি করে বেসিন ভাসিয়ে দেখি রক্ত, সেদিন মেসের কয়জন আমাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। টানা একানব্বই দিন মুখে কিছু খেতে পারিনি। শুধু স্যালাইনের উপর বেঁচে ছিলাম। যে আমি ইনজেকশনের সুচ দেখলেই কুঁকড়ে যেতাম, সেই আমি কিনা হাত পেতে নিতে থাকলাম একের পর এক ভ্যাকসিন। প্রতিদিন সাতটি করে সুচের গুতো। হাতের রগগুলো চালুনের মতো ঝালাপালা। দুই হাতে দুটি ক্যানোলা। মুখে কিছু খেতে পারি না, তাই সেলাইনই ভরসা।

সাড়ে-চার মাসে জীবন সম্পর্কে এত দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার যা কিনা দীর্ঘ ত্রিশ বছরেও হয়নি। আমার বন্ধুরা প্রথম কদিন খুব খবরা-খবর নিলেও সপ্তাহখানেক পর ভুলে যেতে থাকল। শুরুতে তারা রেগুলার এসে আমার পাশে বসে সেলফি তুলে ফেসবুক মাতিয়ে সিমপ্যাথি ক্রিয়েট করতে চাইত। তারপর আর খবর নেই। মেস-মেম্বাররা প্রথম প্রথম ফলমূল নিয়ে দেখতে যেত, পরে তো ভুলেই গেল। এবং দ্বিতীয় মাসে আমাকে জানাল তারা আমার সিটে নতুন মেম্বার তুলেছে। মার্কেটিংয়ের চাকরি তো, এক মাসের বেতন অগ্রিম দিয়ে কোম্পানি জানাল আমার পোস্টে নতুন লোক নেবে। সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিলাম অর্পিতার কাছ থেকে। অর্পিতা আমার প্রেমিকা। ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার পথে রাজশাহীতে প্রায়ই রাত কাটাতাম অর্পিতার সাথে। হোটেলে পরিচয় দিতাম স্বামী-স্ত্রী। কথাটা এমনই ছিল, আমরা পরস্পর পরস্পরকে ছাড়া বিয়ে করব না। অর্পিতার পরিবার থেকে বিয়ের চাপ আসলে সে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু যখন জানাল আমার এই দশা, বাঁচি কি মরি ঠিক নেই, তখন সে বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেল। মুমূর্ষ রোগীর মৃত্যু দেখার জন্য অপেক্ষা করে কী লাভ!

ঢাকা মেডিকেলের নয়শ’ ছত্রিশ নাম্বার বেডে শুয়ে থেকে যখন খুব অস্বস্তি লাগত, মাকে বলতাম, মা আমাকে একটু ছাদে নিয়ে যাবে? নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই তাই বিকেলে ডাক্তারেরা যখন অফ-ডিউটিতে থাকে, মা আমাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে ছাদে রেখে আসতেন। আমি আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ভাবতাম, গাছ মরে যাওয়ার আগে তার উঁচু ডালপালা আর দূরবর্তী শেকড়গুলো মরে যেতে থাকে। মানুষের মরা শুরু হয় তার স্বপ্ন ও আশাগুলোর মৃত্যু থেকে। তবে কি বিধাতা আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন!

কিন্তু আমার মা তো আমাকে মরতে দেবেন না। যমদূতের থাবা থেকে তার ছেলেকে বাঁচাতে সবসময় পাহারায় থাকছেন, প্যাঁচার ছোঁ থেকে বাচ্চাকে বাঁচাতে যেমন সতর্ক থাকে মেঠো-ইঁদুর।

মাদ্রাজ নিতে হলে অনেক খরচ। পাসপোর্ট, ভিসা-প্রসেসিং। বাড়ি-ভিটা ছাড়া আমাদের যা ছিল মা সব বেচে দিলেন। একমাত্র ছেলেই যদি বেঁচে না থাকে সম্পত্তি দিয়ে কী হবে!

এদিকে বিধাতার কী খেলা! তিনি হয়তো মায়ের ভালোবাসা পরীক্ষা করতে চাইছিলেন। আমার মা সর্বোচ্চ মার্ক পেয়ে গেল। যেদিন জমি-জিরাত বেচা শেষ, সেদিনই আমি দু’চামচ ডাবের পানি মুখে নিয়ে গিলে ফেললাম, নাড়িভুঁড়ি উল্টে বমি এল না। তারপর ক্রমে ক্রমে চামচের সংখ্যা বাড়তে থাকল এবং এক সপ্তাহের মাঝে আর সব খাবারের দিকেও হাত বাড়ালাম।

এখন ঢাকা মেডিকেলের দিকে গেলে নয়শ’ ছত্রিশ নাম্বার বেডের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মনে মনে ভাবি, কী দিন গিয়েছে আমার! সাড়ে চার মাসে জেনেছি এমন অনেক কিছু যা ত্রিশ বছরেও জানতে পারিনি। অসুস্থতার কালে যেসব নার্সদের সাথে কিছুটা খাতির হয়েছিল, তারা আমায় টুকটাক কুশল বিনিময়ের পর বলে, যে দশা হয়েছিল আপনার, ঈশ্বর নিজ হাতে রেখে না গেলে বাঁচার কথা ছিল না…।

 

Read Previous

মুদ্রিত দুঃখের ধারাপাতে

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৫ম সংখ্যা (অক্টোবর-২০২৩)

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *