অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মো. সাইফুর রহমান মানিক -
দুটি অণুগল্প – খামে ভরা চিঠি নাকি মুখোশ? ও ভোররাতের ট্রেন

খামে ভরা চিঠি নাকি মুখোশ?

সব পরিণয় প্রণয় নয়, কিছু পরিণয় পরিণতি হয়।

প্রেমের অপরিণয়ে আছে একরাশ বিষাদীয় মুগ্ধতা, যেখানে রয়ে যায় শুভ্রতাটুকুর রেশ চিরকাল, ভদ্রতার অশেষ ভাব। অপরপক্ষে পরিণয়ে ক্রমেই ম্লান হয় আরক্তের আভা, মুখোশের রঙ খসে আবিষ্কার হয় নতুন মুখ, নতুন এক প্রাণ। লোকে বলে— দুখানা কাচের গ্লাস একসাথে থাকলেও তো ঠক করে শব্দ হয়। আর এত জলজ্যান্ত মানুষ গো! তবে তাদের বলি— আপাত ফাটলের সন্ধান না পেলেও, মাইক্রোস্কোপ লাগিয়ে দেখেন সেখানে আছে চৌচিরতার ভয়ানক মানচিত্র। যা হয়তো অদূরেই সার্বভৌমত্ব হারিয়ে নিশ্চিহ্ন হবে পৃথিবী হতে।

আয়নামতি,

তুমি এখনো নব্বই দশকের সাদাকালোয় মেশানো আমার আরাধিত অতি সাধাধারণ অবয়ব! সকাল-বিকালের এই ভাঙাগড়ায় আমি এখনো নির্দিষ্ট বলয়ে আবদ্ধ। যেমনটা চোখের তারায় কেন্দ্রীভূত দৃষ্টি, নিউক্লিয়াস ঘিরে ইলেকট্রন। এই যে দেখো দুইটা শব্দ— Love, Lust। কত মিল! ৪টা শব্দ, উচ্চারণ সমার্থক প্রায়। অথচ কত ব্যবধান! একটা ভালোবাসা আরেকটা লালসা! এ যুগের যান্ত্রিকতায় শরীর ছোঁয়াকে ভালোবাসার সংজ্ঞা দেয়। সেই খানে বসে আমি তোমাকে দূর হতে সাধিব, জন্মান্তর। এই যে লালসার মিথ্যা মায়াজালে তুমি দৃষ্টিভ্রম, আমি সেখানে শত তথাকথিত প্রেমের ফিলোসফিকে জানিয়েছি ধিক্কার, করেছি সহসা প্রত্যাখ্যান। তোমার জন্য রেখেছি একটা দাগহীন হৃদয়, কলুষহীন মন। যেমনটি সদ্য প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর ভ্রমরের প্রথম গুঞ্জন!

এই টেক্সের যানযটে আমি এখনো চাই গেরুয়া চকচকে খামের ভাঁজে মোড়ানো কয়েকটা চিঠি। আর শেষ চিঠিটা চাই একটা বিষাদের নীল রঙের খাম মোড়ানো সজ্জিত চিঠি। যেটাতে লেখা থাকবে, আগামী রোববার দুপুরে আপনি নিমন্ত্রিত। আপনার উপস্থিতি একান্ত কাম্য…

আয়োজনে— কন্যার পিতামাতা

শমসের বাহাদুর ও নূর বানু

ইতি—

তোমার আরাধিত পুরুষ।

এই চিঠি পাওয়ার পর বর আসনে স্থান হয়েছিল কন্যার পিতামাতার নিকটে বর্বর এক বরের। তবে এ বর্বরের এত স্পর্ধা হেতু? ওই যে নিখাদ ভালোবাসা!

বিয়ের ছ’মাস যেতে বেরিয়ে এল রূপ। একে কুরূপ বা অরূপ বললেও খুব ক্ষতি নেয়। কী এক নৃশংসতা, অত্যাচার, পৈশাচিক নির্যাতন। পরিণতি এই যে, আয়নামতির জীবন আয়নার ন্যায় খানখান হলো। বুঝতে বাকি রইলো না— সেই চিঠিটাও তাঁর লেখা নয়, বরং কাওকে দিয়ে লিখিয়ে শব্দজালের মায়ায় ফাঁসিয়েছে সে ভয়ংকর মনীষী। কারণ আয়নার সব দুর্বলতা তার নিকট শুধু পরিষ্কার নয়, একটু বেশিই স্বচ্ছ ছিল। মহাপাপকে মহাপথ জ্ঞান করে, সে পথের পথিক রূপে ধর্না দিতে বাধ্য হলো, আয়না।

নেহাতই দুর্ভাগা লগ্নভ্রষ্টা সেই বর হৃদয় পীড়া সহ্য করতে অপারগ এবং অতি দুর্বল চিত্তের বিধায় আয়নার স্থান আজ ধনকুবের আলোক ঝলমলে ড্রেসিং টেবিলে, যেখানে অকৃত্রিম প্রেমের আলোক-বাতি জ্বলজ্বল করে প্রতিদিন নতুনভাবে। কিন্তু এ কপাল নিয়ে জন্মায় কয়জনে?

 

ভোররাতের ট্রেন

ভোর রাতের ট্রেনটা অদ্ভুতুড়ে। কেমন এলোমেলো ঝড়গুলো যেন ভোর রাতেই আসে। না, অশরীরী কিছু নাহ! এই তো চৈত্রসংক্রান্তির উনিশ দিন পর খাঁ বাড়ির এক মাত্র ছোট মেয়ে পান্না ভোর রাতের ট্রেনে বউ সেজে শ্বশুরবাড়িতে চলে গেল। ট্রেনে যাওয়ার বিশেষ হেতু, আড়ম্বরে বিবাহ অনুষ্ঠান। নয়শ’ বরযাত্রী, ঠিকঠাক গুনলে হাজারে ধাক্কা! তাই আয়োজন সমাধাতেও বিলম্ব। তার উপর দূরান্তের পথ।

বাতির কুণ্ডলী যেমন আগুনের স্পর্শে দপ্ করে জ্বলে ওঠে, এ মেয়েও যেন ধপ্ করে বড় হয়ে গেল। এই তো সেদিন উঠানে আঁচড় কেটে, এক ঠ্যাঙা হয়ে ছুঁ কিত-কিত খেলত। সারা বাড়ি আলোড়িত রাখত, আর আজ সে বিবাহযোগ্যা!

পান্না’র পিতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বিবাহ ভারযোগ্য মধ্যবিত্ত পিতা যেভাবে বায়ুদল শ্বাসরন্ধ্রে পুরে পৃথিবীতে উগরে দেয় স্বস্তির নিঃশ্বাস, তাঁর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। পুতুলের মতো মেয়েটার অনুপস্থিত পিতার হৃদয়ের মধ্যে খাঁ খাঁ শূন্যতা বয়ে নিয়ে আসে। তবুও অস্ফুটে উচ্চারিত হয়— আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।

বিয়ের ঠিক নয়দিনের মাথায় পান্না এক জরুরি তলবে ভোররাতের ট্রেনে ফিরে যায় খাঁ বাড়িতে। এ তো আনন্দের, খুশিতে ডগমগ হওয়ার কথা, কিন্তু মন সারাপথ কেন যেন অস্থির রইল। গ্রামে পৌঁছেই পান্না ঠিক বুঝল না সে চমকিত হবে নাকি চোখ বন্ধ করে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাবে। গ্রামের রাস্তার দুধারে লোকজন তার দিকে হাঁ করে চেয়ে কী যেন ফিসাফিসি করছে। এত লোক, যেন গণসংবর্ধনার আয়োজন, তবুও তাদের হাতে ফুলের মালা বা ফুলের ডালা না দেখে পান্না বেশ বিচলিত হলো।

তারপর কোনদিক না তাকিয়ে সোজা বাড়ির উঠান, মেইন ফটক। তারপর? তারপর মাত্র এক হাত পথ যেন এক ক্রোশ-মাইল পথ হয়ে গেল নিমিষেই। আর পা উঠে না, চারিদিকে ঘোলা চোখ, আগরবাতির গন্ধে নিঃশ্বাস বুজে আসে প্রায়। লুটে পড়ে পান্না, শুধু একটা কথা এক কানের ভেতর ঢুকে সারা মস্তিষ্ক দাপিয়ে আরেক কানে ঠোকর খায়— ‘মা গো, আমি একটু হালকা হলাম, পনেরোটা দিন যাক জামাইসমেত নিয়ে আসব তোকে।’

পান্নার স্বামী এবার পান্নাকে বুকের মধ্যে লুকিয়ে জড়িয়ে রাখল। এবারে হাউমাউ করে উঠল পুরো বাড়ি। পান্না আড়ষ্ট জিভে আওড়াতে থাকে— আমাদের এভাবে না নিয়ে এলে কি হালকা বোধ করছিল না আব্বা…।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

নিঃশব্দ আহমেদ – গুচ্ছকবিতা

Read Next

অণুগল্পগুচ্ছ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *