অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
মে ১৮, ২০২৪
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
মে ১৮, ২০২৪
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আবু সাকিব -
অস্তিত্বের অসুখ

“Tell me how you want to die, and I’ll tell you who you are.”
― Emil Cioran, Tears and Saints

“The depth inside me was bottomless, and the life around me to be devoured, infinite.”

― Matt Cardin, Desert Places, To Rouse Leviathan

রাত বারোটা। একা একা হেঁটে যাচ্ছি আমি। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হওয়ায় পথঘাট সব ভেজা। ছপছপ শব্দ হচ্ছে। নিঃশব্দে হাঁটার কোনো উপায় নেই। ধীর লয়ে যে হাঁটব সেটা সম্ভব না; তাড়া আছে আমার।

শিরশিরানি বাতাস বইছে মাঝে মাঝে। সেই বাতাসের তোড়ে বৃষ্টির মায়া না ভুলতে পারা গাছগুলো থেকে ঝরছে পানি। আমার হাঁটার গতি বোধহয় বাড়ছে; মন ভালো না থাকলেও কোন কারণে উত্তেজিত আমি।

আমার বাসায় যেতে যেতে আরও এক কিলো। পেছনে আরও তিন কিলো ফেলে এসেছি। রিকশা নিলেই পারতাম, কিন্তু ইচ্ছে করেই নিইনি। আর হয়তো অফিসে যাওয়া হবে না, আসা হবে না এই রাস্তা দিয়ে।

আমি চারপাশে তাকালাম, আমার গত দুই বছরের জীবন, অফিস, আর এই চার কিলো রাস্তা এদের শেষবারের মতন একটু ভালোভাবে দেখে নেওয়ার জন্যেই বোধহয় হাঁটছি আমি।

চারপাশ বলতে গেলে জনমানবশূন্য; হঠাৎ দু-একজনকে দেখা যাচ্ছে, কীসের ভারে যেন নিচু হয়ে হেঁটে যাচ্ছে তারা, তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে বাসা-বাড়ির আড়ালে। সবার গন্তব্যই এই এলাকার কোনো না কোনো বাসা, যেগুলো সময়ের চাকার নিচে পুরোনো হয়ে গিয়েছে; সেখানকার মানুষগুলোও হয়তো পুরোনো। সবাই, এই এলাকার সবকিছুর ওপর এক অদৃশ্য ওজন বসে থাকে সবসময়, যেটা আমি এই চার বছরের প্রতিদিনই টের পেয়েছি… আমার ওপরও কি এমন কিছু চেপে বসেছে? আমার নিজের তা মনে হয় না, কিন্তু এলাকার বাকি মানুষগুলো আমাকে হয়তো একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে, তাদের চোখে আমিও কিছু একটার ভারে নিচু হয়ে চলা মানুষ; হয়তো এই মহূর্তেই কোনো এক অন্ধকার কোনায় দাঁড়ানো ব্যক্তি আমাকে দেখছে— ছন্দহীনের ভারে নুয়ে পড়া এক রক্ত-মাংসের অন্তিম চেষ্টা।

আমাদের সবার জীবনেই এমন দিন বোধহয় আসে, যখন সবকিছু ভারী মনে হয়— মহাকর্ষের কোলে মন-প্রাণ-ছন্দ হারিয়ে কাতরাতে থাকি আমরা সবাই; সেই আর্ত আওয়াজ কেউ শোনে না, মানুষ হয়েও আমরা মানুষের কষ্ট বুঝি না, বরং সেই ছন্দহীনের অন্ধকারে পাগল হয়ে গিয়ে আমরা একে অন্যের রক্তপাতে মেতে উঠি।

আমার জীবনেও বুঝি এমন দিন এসে গেছে বছর কয়েক আগে; কী জানি, আমি এখন নিশ্চিন্ত হয়ে আর কিছুই বুঝতে পারি না, বলতে পারি না… বোধবুদ্ধি আর বিবেকের ধার কমে গিয়েছে— নিজের জীবনের অবস্থা নিয়ে আমি নিজেও ধোঁয়াশায় থাকি।

এটাও সেই মহাকর্ষের মতন চূড়ান্ত একটা বিষয়, মানব জীবন আমরা অধিকাংশ সময়ই কাটাই ধোঁয়াশায়, বিভ্রান্তির জলসমুদ্রে ভেসে নিজেদের অজান্তে কোথা থেকে কোথায় যাই আমরা? যারা একটু ভাগ্যবান, তারা হয়তো কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে নিজেদের জীবনের ওপর; আর বাকিরা চেয়ে চেয়ে দেখে শীতের পর শীত, বসন্তের পর বসন্ত আসে আর যায় আর তাদের অর্থহীন বয়স বাড়ে, এর মাঝেই আসে সেই মহাকর্ষের টান… আর তারপর…

 

এই শহরের মানুষগুলো কি মৃত্যুর অপেক্ষা করছে? আমার অপেক্ষা আর তাদের অপেক্ষা কি একই? মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা না করলে এরকম মরুভূমির মতন নিঃস্ব এলাকায় এসে মানুষগুলো বসে আছে কেন, যেই এলাকার সাথে ‘স্বাভাবিক’ মানব-মানবীদের কোনো সম্পর্ক নেই? যেই এলাকায় এসে হঠাৎ করেই ‘স্বাভাবিক’ জীবনের কোলাহল আর শব্দেরা হারিয়ে যায়? পুরোনো, শ্যাওলাধরা, যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে এমন মৃতপ্রায় সব দালানের বাসিন্দা হয়েছে কেন তারা? নাকি মস্তিষ্কের বিচিত্র আর অস্বাভাবিক কোন খেয়ালে তারা এমনি এমনি এখানে এসে বসত গেড়েছে?

বিশাল বিশাল দালানগুলো শুধু যে ইট-সিমেন্টের সমাবেশের কারণে বিশাল তা কিন্তু নয়, বরং অতীতের সময়, সময়ের অতীত আর বর্তমানের হাহাকার নিয়ে তারা সব মাত্রায়, চোখ, নাক, কান আর মনের কাছে বিপুল আদিম তাৎপর্য নিয়ে বসে আছে। তাদের ভেতরে সময়ের সন্তান হিসেবে হাহাকারের অংশ হিসেবে আছে এই এলাকার বাসিন্দারা।

মাটি আর চারপাশের বাতাস থেকে বেরিয়ে আসা সবুজ-অসবুজ প্রাণেদের আক্রমণে দালানগুলোর আগের চেহারা বোঝা যায় না; সবুজ, অসবুজ, সাদা, ধূসর কিংবা ইটের লাল কত রকমই তো হতে পারে। হয়তো কোনো কোনো দালানের ছাদেও লতাগুল্মেরা অবাধ হয়ে গিয়েছে। মরচে-ধরা জানলা। কিছু কিছু জানালা কাচ ছাড়া বসে আছে, যেখানে কেউ এসে দাঁড়ালে তাকে বিকেলের গোধূলিতে বিশেষ কেউ বলে মনে হবে না। সেইরকম অবিশেষ কিছু কিছু বাসিন্দার মাঝে মাঝে বিকেলের দুর্বল আলো কিংবা রাতের অদ্ভুত অন্ধকারে অপার্থিব এক উদাসীনতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যেসব জানালার কার্নিশ ভেঙে পড়েছে নিচের তালার কার্নিশের উপর।

অধিকাংশ দালান যদিও খালি, বাইরে থেকে সেরকম কোনো তফাত বোঝা যায় না— সব কিছু, পুরো এলাকায় প্রাণ আছে আবার নেই এরকম দ্বৈত সত্তার বিভ্রান্তি বাতাসের মতোই ছড়িয়ে আছে।

পুরোনো বিদ্যুতের খুঁটি একা একা দাঁড়িয়ে থাকে অবাধ ময়দানের মাঝে, যার সাথে যোগাযোগ নেই অন্য কোনো খুঁটির। সেসবে পাখিরা এসে নীরবে বসে যায়। ডাকে না।

সব জায়গায়, মাটি থেকে শুরু করে নিরবচ্ছিন্নভাবে চতুর্দিকে, ঘন অবসাদ আর সময়হীন অপেক্ষা জমাট বেঁধে থাকে এই শহরে। ধীরে ধীরে এইসব কিছুর ঘনমাত্রা যেন বাড়ছে; মহাকর্ষে আক্রান্ত বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো আর চারপাশের আবহাওয়ার মধ্যে এখন আর আলাদা করা যায় না।

দুই কিলো আগে শহরের মাথা শেষ হয়েছে, দুই কিলো আগেই শুরু হয়েছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতন এই এলাকার। বিচ্ছিন্ন বলেই এদিকে বাসা নিয়েছি আমি। কারণ আমিও বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি সবার কাছ থেকে, ছায়াপথের মতন ধীরে ধীরে আমার আর আমার চারপাশের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। হয়তো আমার অবচেতন মন জানত এমন দিন আসবে, যে কারণে এই জায়গাটায় এসে ঠাঁই হয়েছে আমার; তার মানে আমিও অপেক্ষা করছি… কিছু একটার…

রাস্তাটা পরিত্যক্ত এক রেলরোডের পাশে। অতীতের দিনগুলোতে তাহলে সময় সময় রেলগাড়ির গম্ভীর আওয়াজে এখানকার আকাশ-বাতাস ভরে উঠত। রাস্তার হলুদ আলোয় বৃষ্টির পর ঘাস-লতা-পাতায় ঢাকা রেল রোডটাকে দেখে মায়া হল আমার; তাকে ভুলে গেছে সবাই, শুধু আপন করে নিয়েছে মাটির ভেতর লুকিয়ে থাকা সবুজেরা। আমার হঠাৎ নেমে যেতে ইচ্ছে হলো…

এই এলাকায় সবকিছুর মধ্যেই গুমোট মায়া আছে একধরনের; একটা সময় সবকিছুই বুঝি কারওর না কারওর ব্যবহারে ছিল, তারপর একসময় সেই মালিকানা আর মানুষরা হারিয়ে গেছে কিংবা চলে গেছে, আর পরিত্যক্ত হয়ে গেছে জিনিসগুলো।

আমি রাস্তায় চোখ দিয়ে হাঁটছিলাম, মাথা নিচু করে। হাতের বামপাশের রেলরোডটা শেষ হয়ে যাওয়া মাত্রই চোখ উঠে সামনে গেল; ওই তো সামনে চায়ের দোকানটা দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণে সাধারণত বন্ধ হয়ে যায়। ভদ্রলোক আজ কী মনে করে আছেন এখনও?

রাস্তার হলুদ আলোয় লম্বা দাড়িওয়ালা লোকটা বরাবরের মতন খালি গায়ে বসে আছেন। আমি এগিয়ে গেলাম।

‘চাচা, এক প্যাকেট বেনসন দিন তো।’

চাচা নিঃশব্দে একটা প্যাকেট বের করে হাত বাড়িয়ে ধরলেন।

‘ভালো আছেন তো চাচা?’

কোনো জবাব এল না।

টাকা পরিশোধ করে চলে আসার সময় পেছনে শব্দ হল একটা। আমি ঘুরে তাকালাম— চাচা দোকান বন্ধ করে চলে যাবেন হয়তো।

‘ভালো থাকবেন চাচা। আসি।’

কোনো উত্তর এল না। চাচা এই চার বছরে আমার কথার উত্তরে কিছু বলেননি। চার বছরের আসা-যাওয়ার পথের পরিচিত একজন মানুষ; হলুদ আলোয় মলিন দাড়িওয়ালা এই বৃদ্ধের গলার স্বর আমি জানি না।

আমার ইচ্ছে হলো চাচাকে বলি দোকান এখনই না বন্ধ করার জন্যে; দুজনে মিলে দুকাপ চা খাওয়া যাক, এরপর একটা করে সিগারেট। চাচা সিগারেট খান কিনা আমার জানা নেই। চায়ের দোকানে বসলেও চা-ও খান কিনা বলা যায় না। কিন্তু আমার এখানে কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করছে। আর্দ্র এই রাতে কিছু সময় গল্প করাই যায়, চাচা হয়তো একটা শব্দও উচ্চারণ করবেন না, কিন্তু আমি একাই খানিকক্ষণ কথা বলে গেলাম… ক্ষতি কী তাতে?

না, ক্ষতি নেই কোনো, কিন্তু আমার এই চাওয়ার উদ্দেশ্য কী? স্বাভাবিক লোকজন আর জীবনের কোলাহল থেকে দূরে থাকতেই তো এখানে এসেছি আমি, তাহলে এখন আমি অন্য একজনের সাথে সময় কাটাতে চাচ্ছি কেন? এখান থেকে কিছু মাইল দূরেই তো স্বাভাবিক জীবনের ব্যক্তিরা চায়ের দোকানে আলাপে মগ্ন, চায়ের কাপ আর সিগারেটের ধোঁয়ায় মাঝরাত্রির সেসব অর্থহীন কথায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসে…

তার মানে কি এই যে আমি ভেতরে ভেতরে আমার এই আলাদা জীবনকে মেনে নিতে পারিনি? কিংবা আদতে আমি চাই ‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফিরে যেতে? সেখানে মিশে যেতে বাকি সবার সাথে? কোনো এক অজানা মনস্তাত্ত্বিক সূত্র অনুযায়ী আমি কি তবে যা ঘৃণা করি সেটাকেই পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছি? সেই অপেক্ষার ভারেই নিচু হয়ে হয়তো আমি এইসব নির্জন রাস্তায় হাঁটি… আর এখন চেষ্টা করছি ক্ষয়ে যাওয়া এই এলাকায় ওই ‘স্বাভাবিক’ জীবনের মিথ্যে এক উপস্থাপন তৈরি করার, যাতে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে…।

প্যাকেট খুলে একটা সিগারেট হাতে নিলাম আমি, নিয়েই মনে হলো সাথে তো দেয়াশলাই নেই; পেছনে তাকালাম, বেশ খানিকটা দূরে চলে এলেও দেখলাম দোকান বন্ধ করে দিয়ে চলে গেছেন চাচা… ঠিক যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন তিনি, আমার সিগারেট কেনা হয়ে যেতেই তার আজকের দোকানদারি শেষ।

সিগারেট ঠোঁটে নিয়েই হাঁটতে লাগলাম আমি। আগের মতন উত্তেজনা বা তাড়া কাজ করছে না। পুব দিক থেকে বাতাস আসছে, কিন্তু সেই বাতাসে কোনো গন্ধ নেই— নামধাম পরিচয়হীন বাতাস। অথচ সেই বাতাসে চায়ের গন্ধ পাওয়া যাওয়ার কথা, পেছনের স্বাভাবিক জীবনের গন্ধ, অথবা দূরের কোনো ফুলের গন্ধ…

কিন্তু না, এই এলাকায় বাকি সব কিছুর মতন যা কিছুই আসে, তার কোনো পরিচয় থাকে না, কিছু থাকে না। নামধাম গন্ধহীন হয়ে যায়।

রুমে এসে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে রাখলাম আমি। রান্নাঘর থেকে দেয়াশলাই এনে সিগারেটটা ধরালাম। আমার রুমের কোনো বারান্দা নেই, এই বাসার কোনো রুমেই বারান্দা নেই; পুরোনো বাতাস আটকে আছে রুমে, যেন বাইরের প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন আর ঘৃণ্য এক কক্ষ এটা, দম আটকে নিয়ে বসে আছে…

মেঝেতে একটা কাগজ পড়ে আছে। চিঠি। একদৃষ্টি চেয়েই বুঝলাম কার চিঠি এটা। দরজা লাগিয়ে চিঠিটা এনে রাখলাম টেবিলের ওপর। ডেস্কের সামনের জানালাটা খুলে দিলাম।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর চেয়ারে বসে কম্পিউটারটা চালু করলাম। পরিবেশ ঠাণ্ডা হলেও অনেকটুকু রাস্তা হেঁটে আসাতে ঘেমে গেছি আমি; কাপড়চোপড় পাল্টানো দরকার…

কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সামনে এসেছে এখন…

আমি একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম মনিটরের স্ক্রিনের দিকে, কিন্তু আমার দৃষ্টি কোনো কিছুতেই স্থির হয় না এখন… খুব তাড়াতাড়িই শূন্য ফাঁকা আকাশ মাথায় নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম আমি, সিগারেটের অগ্রভাগ যান্ত্রিকভাবে পুড়তে লাগল… আর আমার দৃষ্টি চলে গেল চিঠিটার ওপর।

ঠোঁটের কাছে গরম আঁচ পেয়ে সম্বিৎ ফিরল আমার; কোনো এক জায়গা থেকে নেমে এলাম আমি, যেই জায়গার বাস্তবতা এখানকার আপাত বাস্তবতার চাইতে নরম স্বভাবের, যেটা আদতেই আমার উপস্থিতি মেনে নেয় খুশি মনে, যেখানে এখন না চাইলেও আমি চলে যেতে পারি…

এমনটাই তো হয়— আমাদের মধ্যে কেউ কেউ একজন থেকে দুজন হয়ে যায়, কিংবা বহুজন… নিজের ভেতরে অন্য কিছুর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়, শারীরিক আর মানসিক অনুভূতিগুলো বিদেশি হয়ে যায়, নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা যেন সেই অদৃশ্যলোকের বাসিন্দারাই নিয়ন্ত্রণ করে…

ব্যাপারটা না ঘটলে আমরা বোধহয় পাগল হয়ে যেতাম; যারা উন্মাদ হওয়ার খুব কাছাকাছি, তাদের দেখভালের ‘দায়িত্ব’ এইভাবেই হাত বদলায়…

পোড়া সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চিঠিটা হাতে তুলে নিলাম আমি। অনুষের কাছ থেকেই এসেছে; জিনিসটার ওজন, চেহারা আর গুরুত্ব চারপাশের বাতাস আর পরিবেশে নিজের পরিচয় ছড়িয়ে দিয়েছে, আমাকে চিঠির ভাঁজ খুলে দেখতে হবে না আর। এই চিঠি আসার অর্থ আমি খুব ভালো করেই জানি। অনুষ জায়গাটার খোঁজ পেয়েছে।

অনেক প্রশ্ন আসছে মাথায়, ওগুলোর জবাব পাওয়ার আশা করা বৃথা। রহস্য আর তামাশাপূর্ণ এই জীবনে সবকিছুর ব্যাখ্যা খোঁজা মানে নিজেকে নিজের আর এই জগতের কাছে বোকা সাজানো; কিছু ঘটনা ঘটবে যেগুলোর মানসিক আঘাত আমাদের মেনে নিতে হয় চোখ বুজে, ওগুলো নির্মম কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়, সেইসব কৌতুকের পর কেউ কেউ হয়তো হাসবে, আমাদের হাসা উচিত… একটা নির্দিষ্ট সময় পর অনুভূতির এমন হাল হবে, আমাদের নিজেদের ঠোঁটের কোণেও হয়তো জেগে উঠবে মলিন এক টুকরো হাসি…

আমার নিজের ভেতরেও খিলখিল হাসির মতন কিছু একটা নড়েচড়ে উঠল বোধহয়। এই হাসি কি পরাজয়ের হাসি? আমরা হয়তো এক অর্থে পরাজয় মেনে নিয়েছি এই মহাজীবনের কাছে; আসন্ন মুক্তির খোলা বুকে ঘুমিয়ে যাব আমরা, আর কিছু পোহাতে হবে না, পোহাতে হবে না এই মহাজীবন।

চিঠির ভাঁজ খুলতে লাগলাম আমি। হলুদ রঙের সস্তা কাগজে চিঠি মাঝপাতা পেরিয়েছে কোনোভাবে। গাঢ় কালো কালির লেখাগুলোকে মনে হচ্ছে কালো আলোর উৎস, আভা আর আহ্বান ছড়াচ্ছে গোপন এক জায়গার, গোপন কিন্তু নিশ্চিত মুক্তির পথ দেখিয়ে দেওয়া আঁধারের মহান আদিম বাসিন্দা।

চিঠিতে তেমন কিছু বলা নেই, বলার দরকারও ছিল না অবশ্য; এইরকম খবর পাওয়ার পর কী করা হবে তা আগে থেকেই আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম। তবু ওর পাঠানো চিঠি থেকে চোখ সরাতে চাইছিলাম না আমি, কিংবা পারছিলাম না। কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছিলাম; শব্দগুলোর মাঝে, দাড়ি-কমার আগে-পিছে সূক্ষ্ম কিছুর ইঙ্গিত… অনুষ ওইরকম মানুষ না যদিও, কোনো সাংকেতিক ভাষায় ও কিছু বলে না কখনও, বা নিজের অজান্তে ও যা বলতে চায় না কিংবা সরাসরি জানাতে চায় না এরকম কিছুও কোনোভাবে তার কাছ থেকে আসতে দেখিনি আমি, তারপরেও সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর তাঁর আচরণে হয়তো আমি পরিবর্তন আশা করছি, অক্ষরগুলোর মাঝে সেই পরিবর্তন খোঁজার চেষ্টায় কিছুক্ষণ সময় কাটল আমার…

কিন্তু না, কিছুই নেই। খুঁজে পাওয়া গেল না কিছুই।

আরেকটা সিগারেট ধরালাম আমি। জানালার কাছে এলাম। বাইরের অন্ধকার মাঝরাত্রির পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন কতগুলো কক্ষে বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের একজন এই আমি। সেই বিচ্ছিন্নতার আবার নানান রঙ আছে, সেগুলোর মধ্যে সামান্য পরিচিত কিছু রঙের সূত্র ধরেই বোধহয় অনুষের সাথে আমার পরিচয়। আমরা নিজেদের ঠিক বন্ধু বলে পরিচয় দিতে চাই না, কারণ সেরকম কিছু আমরা নই, বলা যায় ‘খুব বেশি নির্দিষ্ট একটা ব্যাপারে’ নিজেদের ‘আগ্রহ’ থেকে আমারা একে অপরকে এতদিন জেনেছি, এক অর্থে সহ্যও করেছি। সেই ‘ব্যাপারটা’ যদিও এই ক্ষয়িষ্ণু আর বিচ্ছিন্ন এলাকার মাটিতে যেসব জীবনেরা হেঁটে বেড়ায়, তাদের পক্ষে বেশ স্বাভাবিক, কিন্তু বাইরের পৃথিবীর কাছে সেটা স্বাভাবিক ঠেকবে না মোটেও।

সবকিছু থেকে দূরের এই জায়গাটাতেও কি বাইরের দুনিয়ার মতন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পরিচিত হয়ে উঠতে পারে? এই বিচ্ছিন্ন জায়গাতে পৃথিবীর স্বাভাবিক ‘অসুস্থ’ সভ্যতার রূপ-রস-আলো আবছা হয়ে লেগে আছে এখনও, যে কারণে আমাদের পরিচয়। সামাজিক আর নৃতাত্ত্বিক কোনো সূত্রানুযায়ী, কিংবা অপ্রাকৃত শক্তির প্রভাবে বাইরের পৃথিবীর ছায়ায় মলিন আর ঘৃণ্য এক সন্তান এই এলাকা, যেটা নিজেও অসুস্থ, কিন্তু ভিন্ন অর্থে। অসুস্থতার এই ভূমিতে আমরা একজন আরেকজনকে গত কয়েক বছর ধরে জানি— অসুস্থ মন নিয়ে আরেকটা অসুস্থ মনের রক্তমাংসকে যতটুকু বা যেভাবে জানা সম্ভব, আর সেই পরিচিতির সমাপ্তি এখন কাছে চলে এসেছে বলে মনে হচ্ছে আমার।

কিন্তু আমরা তো এখানে এসে অসুস্থ হইনি। অনুষের পেছনের ইতিহাস আমি তেমন জানি না, কিন্তু আমার নিজের কথাই ধরা যাক, আমি তো ছিটকে এসেছি, আমি অসুস্থ হয়েছি যখন আমি ছিলাম ওই স্বাভাবিক দুনিয়ার বাসিন্দা, ওখানকার আলো-বাতাস, দিনরাত্রি আর সংলাপের ভেতর দিয়ে ধীর গতিতে, ছায়ার মতন এগিয়ে এসেছে আমার পরিবর্তন; আর তারপর আমার ঠাঁই হয়েছে এখানে।

সুতরাং বলা যায়, এই জায়গায় প্রকৃতি তার বিভীষিকাগুলোকে পাঠিয়ে দেয় বাকি দিনগুলো পার করার জন্যে। আমরাই সেই বিভীষিকা। কিন্তু তার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়; বাইরের দুনিয়াও কি বিভীষিকাপূর্ণ নয়? সেখানে তো রীতিমতন বিশৃঙ্খলার উৎসব চলছে আবহমান সময় ধরে… সেসবের মাঝে সবাই কী খুব ‘স্বাভাবিক’?

যাই হোক না কেন, যতই ভাবি না কেন, প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসতে থাকবে, মাথা আর মন রক্তাক্ত হতে থাকবে, কিন্তু যাবতীয় অসুস্থতা আর অসমতার সমষ্টি এই অস্তিত্বের কৌতুক আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়…

আমার আর অনুষের, এবং হয়তো এই এলাকার বাকি সব মানুষের, ব্যপারগুলো (কিংবা ‘ব্যাপারটা’) নিয়ে পৃথিবীর মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণার অনেক ভালো মশলাপাতি পেয়ে যাবেন, অথচ প্রাথমিকভাবে, আর শেষপর্যন্ত অবধারিতভাবেই তাদের মুখ থেকে যে শব্দগুলো বেরিয়ে আসবে, সেগুলো হচ্ছে— মানসিক অসুস্থতা, সামাজিক ব্যাধি বা ক্ষয়, ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার এই লেখা যদি কোনোভাবে বাইরে পৌঁছায়, যেটার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে, তাহলে তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের কথা চিন্তা করে আমার ভেতরে কোনো রকম ঢেউই টের পাচ্ছি না। ‘জ্ঞানীরা’ তাদের গবেষণা আর ভাবার জন্যে যথেষ্ট জিনিস পেয়ে যাবেন, কিন্তু তাদের দৃষ্টিতেই যেই ক্ষয়ের বা ব্যাধির তকমা দেওয়া হচ্ছে, সেটা নির্মমভাবে তাদের বাস্তবতাকে গলা টিপে ধরবে, দিন রাত দুপুর মধ্যাহ্ন ঘুম আর চেতনার সব জায়গায় নামধাম গন্ধহীন এক অবসন্নতা এসে ভর করবে, বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি আস্ত এক সূর্যের মতো জেগে উঠবে প্রচণ্ড তাপ নিয়ে…

তখন প্রশ্ন শুধু একটাই থেকে যাবে— ঘৃণার এই মঞ্চে, বিতৃষ্ণা আর অস্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মের এই মহাবিশ্বে কীসের কারণ খোঁজার জন্যে আমরা প্রতিদিন বিছানা ছেড়ে উঠি?

অনুষের সাথে আমার পরিচয় এখানে আসার মাসখানেক পর। আমি শহরের যে জায়গাটায় থাকি, তার ঠিক বিপরীত প্রান্তে একটা বাড়িতে আমরা বেশ কজন মিলিত হতাম সপ্তাহের কোনো এক দিনে। সেই বিশেষ দিনটা নির্দিষ্ট ছিল না। অদ্ভুতভাবে নিয়মিত ছিলাম আমরা যারা, তাদের অধিকাংশই একই দিনে এসে পড়তাম জায়গাটায়। সময়টাও নির্দিষ্ট ছিল না, তবে সাধারণত মাঝরাত্রির ঠিক আগে।

আমাদের মাঝরাত্রির এই সমাবেশ নিতান্তই কয়েকজন অনিদ্রাকাতর মানুষের সময় কাটানোর উপায় ছিল কিনা, তা নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে। সাধারণত ফ্লোরে, জানালার পাশে, কিংবা ঘুণেধরা চেয়ারে বসে থাকতাম আমরা। সিগারেট পুড়ত কারও কারও ঠোঁটে। অনুষ যে নিয়মিত আসত তা কিন্তু না, তবে যেদিনই সে আসত, সবার আগে থেকে এসে সে বসত জানালার ঠিক পাশে। কাঠের দৃষ্টি নিয়ে তার অস্পষ্ট মুখ বাইরের দিকে ফেরানো থাকত।

নিচু গলায় আমরা কিছু কথাবার্তা বলতাম। সেইসব কথাবার্তার বিষয় আমাদের অপরিণত জীবনের অতীত, অথবা এই শহরের সময়হীন বর্তমানের। আমরা যারা নিয়মিত ছিলাম, তারা সবাই একজন আরেকজন সম্পর্কে মোটামুটি জানতাম। শুধু অনুষ ছাড়া।

সে কথা বলত কদাচিৎ। বললেও সেইসব কখনো তার অতীত কিংবা বর্তমানের বিষয়ে ইঙ্গিত দিত না। তাকে আমরা যেচে জিজ্ঞেসও করতাম না কখনও; সেটা হয়তো নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরেই। আদতে আমাদের কেউই তাকে বিশেষভাবে লক্ষ করতাম না। আমাদের মনোযোগের ভিতর তাকে আবছাভাবে বোঝা যেত, আমরা জানতাম যে সে আছে, এই রুমে, এই শহরের কোথাও, কোনো পুরোনো দালানের কোনো রুমে, কিন্তু সেই আবছা ছায়ামূর্তি আমাদের ভেতর কোনো আগ্রহ কিংবা সাড়া জাগাত না। মানুষ হিসেবে আমরা নাকি অনুষ, এতটাই ভেঙে গিয়েছিলাম?

অথচ আমাদের সবার মধ্যে সেই-ই ছিল সবচেয়ে ব্যাতিক্রম। তার গলার স্বর ছিল গম্ভীর, পরিষ্কার, আর মারাত্মকভাবে ভাবলেশহীন। তার কথাবার্তার বিষয় নিয়ে আমারা পাল্টা কোনো কিছু বলতাম না— শুধু ‘হু’, ‘হ্যাঁ’ এইসব ছাড়া। বাকিদের ভেতর এইসব কথাবার্তা কোনোরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত না। প্রথম প্রথম আমি কিছুটা অমন মনোভাব পোষণ করলেও একসময় আমি বুঝতে পারলাম যে আমার ভেতরে অনুষ কোনো একটা কিছু নাড়া দিয়েছে।

সে কথা বলত মৃত্যু নিয়ে, যেই মৃত্যু স্বাভাবিক পৃথিবীর চিরপ্রস্থানের মতন কোনো বিষয় নয়, বরং স্থান, কাল আর চেতনার একত্রীকরণ আর মুক্তি। সময়হীন বিচ্ছিন্ন এই জায়গায় সেইরকম মুক্তির সম্ভাবনা দেখতে সে। এই শহরেরই (মূল শহরের শেষ প্রান্ত থেকে এই এলাকা শুরু হলেও এটার বিস্তৃতি নিয়ে আমার কোন ধারণা ছিল না, বাকিদেরও ছিল না হয়তো, কিন্তু অনুষ সবসময় এই এলাকাকে শহর হিসেবেই আখ্যা দিত, কারণ খুব সম্ভবত সে জানত আস্ত এক শহরের মতোই এই এলাকার ব্যাপ্তি) কোনো এক জায়গায় নাকি এরকম ‘স্বেচ্ছামুক্তি’ ঘটানো যায়, যেই জায়গার খোঁজ এখনও সে পায়নি। তার এইরকম ধারণা প্রথম প্রথম আমার কাছে অবাস্তব আর অসম্ভব ঠেকলেও, দিনের পর দিন আর রাতের পর রাত এই শহরের অন্ধকার আলোকপ্রকোষ্ঠে কাটানোর পর আমার কাছে ঠিক ততটাই সম্ভব আর বাস্তবতার চেয়েও বেশি কিছু বলে শরীর পেয়েছে। সেই শরীরের চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে এই পুরো শহর, যার শুরু থেকে কোনো শেষ নেই; যেখানে সময় দম আটকে কোনো কিছুর অপেক্ষায় বসে থাকে, যেখানকার পুরোনো দালানগুলো বিচ্ছিন্নতার নিরেট আশ্রয়, যেখানকার মানুষগুলো অদৃশ্য এক ভারে নিচু হয়ে চলে— যাদের চোখ-মুখ-মন-শরীর অবসাদ আর উদাসীনতায় প্রাণহীন আর অপার্থিব… যাদের কাছে কোনো কিছুই আর কোনো কিছু নয়।

অনুষের এসব অদ্ভুত কথাবার্তায় বাকিরা কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও আমি ধীরে ধীরে আবিষ্কার করলাম যে রাত-দিন আমার ভেতর সেই ‘স্বেচ্ছামুক্তির’ প্রতি প্রচণ্ড এক আগ্রহ কাজ করছে। মাঝরাত্রির অন্ধকারে, যখন বাইরের ঘোলাটে চাঁদের আলো জানালার ভেতর দিয়ে এসে পড়ছিল, তার পাশেই অনুষের ভাবলেশহীন মুখ থেকে একেকটা কথা পরবর্তী ঘণ্টাগুলোতে আমার পুরো চিন্তা-চেতনা আর মানসিকতা দখল করে নিল। আবছা ছায়ামূর্তি থেকে অনুষ নামের লোকটা আমার কাছে আরও স্পষ্ট ছায়ামূর্তি হিসেবে চলে আসতে লাগল, যেই ছায়ামূর্তি মানুষ থেকে ছায়ামূর্তি হয়েছে গোপনে গোপনে কাজ করার জন্য, যে বন্দিত্ব আর অসহ্য অস্তিত্বের এই মানবজীবনের বিরুদ্ধে কিছু করার চেষ্টা করছে, যে হয়তো একা একা যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত, রক্তমাংসের মানুষ থেকে আবছা হতে হতে যে প্রায় মিলিয়ে যেতে বসেছে বাতাসে, যার ভাবলেশহীন কাঠের মতন মুখের চামড়ার নিচে প্রকৃতপক্ষে লুকিয়ে আছে সেই লড়াইয়ের ক্লান্তি আর খুব সম্ভবত মলিন এক হাসি, যা অবহেলার, আত্নবিশ্বাসের, আর হারানো সময়ের।

এভাবেই এক মাঝরাত্রিতে আবিষ্কার করলাম, শুধু আমি আর অনুষ ছাড়া কেউ আসেনি। জানালার পাশে ভাবলেশহীন সেই মুখ বাইরের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বসে আছে। আমি নিঃশব্দে রুমে ঢুকে বসলাম এক জায়গায়। আমার বিপরীত প্রান্তে অনুষ। আমরা কেউ কাউকে কিছু বললাম না। অথচ আমরা জানি এই রুমে এখন আমরা দুজন, আর কেউ নেই। আমি জানি অনুষ বরাবরের মতন সবার আগে এসে জানালার পাশে গিয়ে বসেছে। অনুষ জানে যে কোনো এক পুরোনো দালান থেকে আরেকটি রক্তমাংস এসে এইমাত্র রুমে ঢুকেছে।

আমি সিগারেট ধরালাম একটা। প্রথম ধোঁয়ার দিকে চাইতেই দেখলাম অনুষ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নিরেট চোখের সেই দৃষ্টি দিয়ে কারওর দিকে তাকালে মনে হওয়ারই কথা যে সে কিছু বলতে চায় না। কাউকেই কিছু বলতে চায় না। কাউকে কিছু বলার নেই।

—জায়গাটার খোঁজ পেয়েছি আমি।

মারাত্মক ভাবলেশহীন আর গম্ভীর সেই কণ্ঠ রাত্রির নীরবতায় মনে হল অনেক দূর থেকে আসছে, কিন্তু আসছে আমার জন্যে, আমার দিকে, আমার চোখ-কান-নাক-শরীর আর চেতনার দিকে, অনেক ক্লান্তি নিয়ে, যার আলো প্রায় নিভে এসেছে কিন্তু সঠিক জায়গাতে এসেই যাত্রা শেষ হয়েছে তার; এবার সে ঘুমোবে, প্রশান্তির ঘুম, যেই ঘুমে আমি স্বপ্ন হয়ে যাব, আমার চোখ-কান-নাক-শরীর-চেতনা আর বিগতের সব স্মৃতি স্বপ্ন হয়ে যাবে। কিছুই থাকবে না। হয়তো স্বপ্ন বলেও কিছু থাকবে না।

আমি কিছু বলার আগেই অনুষ বলল, আমার কথাতে বাকিদের কিছু যায় আসে না। একদিন হয়তো সেটা পালটাবে। যাই হোক, আজ ওরা কেউ নেই। তুমি তো শুনলে। তোমার তো যায় আসে, নাকি? জানি যায় আসে। আমি কয়েকদিনের মধ্যে রওনা হব। দেখি কী হয়। আসলেই যদি ওখানে গিয়ে পৌঁছুতে পারি খবর পাবে তুমি। কিছুদিন অপেক্ষা করার পর যদি আমার কাছে থেকে আর কিছু শুনতে না পাও, তবেই তুমি রওনা দেবে।

এই কথাটুকু বলার সময় সে আমার দিকে একবারও তাকায়নি। জানালার বাইরে থেকে তার দৃষ্টি সরেনি একবারও। সিঁড়িঘরের হলুদ আলো এদিকে আসতে আসতে একেবারে দুর্বল হয়ে গেছে। সেই দুর্বল আলোতে দেখা যায় যে এই রুমে কোনো লাইট-বাল্ব নেই। নেই কোনো ফ্যান। ফ্লোর ময়লা। নানান আকারের ময়লা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আলোর অভাবে কিংবা অন্ধকারের ক্ষমতায় সেগুলোকে দেখাচ্ছে কালো। ছোট ছোট মৃতদেহ। ছোট ছোট অন্ধকার।

এখানকার প্রতিটা বাড়ির ফ্লোরই বুঝি এমন ময়লা; যেসব রুম ঈষৎ আলোকিত থাকে, আর সেই স্বল্প আলোয় ঘুরে বেড়ায় মৃতপ্রায় রক্তমাংসের প্রাণীরা। কিংবা আমাদের মতন এইভাবে মুখোমুখি বসে থাকে।

না, আমাদের এই বসে থাকা আর অন্য কোথাও হয় না। হচ্ছে না। এই সময়টা মহাজাগতিক সম্ভাবনার গণিত অনুযায়ী একেবারেই স্বতন্ত্র।

প্রায়ান্ধকার এই রুমে আমরা দুজন কেবল বসে আছি। আমার ঠোঁটে জ্বলছে সিগারেট। অনুষ তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। আমি তাকিয়ে আছি অনুষের দিকে। তাকে আবার আবছা আবছা লাগছে; তার কথাগুলো শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমার মনে হতে লাগল আমি যার দিকে তাকিয়ে আছি সে যেন মহান এক ছায়ামূর্তি, যার মহিমা আর শক্তির কোনো তুলনা হয় না।

অনুষ কিছুক্ষণ পরই উঠে চলে গেল। আর কিছু বলল না। সিঁড়িঘরের আলোয় তার ছায়া মিলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি তাকিয়ে রইলাম দরজার দিকে। তারপর তার বসার চেয়ারটার দিকে চোখ গেল আমার। কিছুক্ষণ আগেই ওখানে একজন বসে ছিল… বা কিছু একটা বসে ছিল। অথচ এখন সেখানে আছে শূন্যতা। শূন্যতার অণু-পরমাণুরা এখন ধীরে ধীরে চেয়ারটার তাপমাত্রা শুষে নেবে। কেউ একজন বা কিছু একটার সামান্য সময়ের উপস্থিতির প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য চারপাশের দৃশ্য-অদৃশ্যরা তাদের ক্ষমতা নিয়ে কাজে নেমে পড়বে।

আজকের এই কয়েক লাইন উপস্থিতিও যে আমাদের পুরো অস্তিত্বের প্রমাণ মুছে দেওয়ার শুরু হবে, তা আমরা তখনও নিশ্চিত ছিলাম না।

আমি সিগারেট শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। অনুষের সাথে এরপর আমার আর দেখা হয়নি। আমিও আর আসিনি এই বাড়িতে।

চিঠি পাওয়ার পর কিছুদিন অপেক্ষা করে আমি জায়গাটার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যেতে কতটুকু সময় লাগতে পারে আন্দাজ করা কঠিন, এ নিয়ে চিঠিতে কিছু বলা নেই। তবে জায়গাটা এখান থেকে বেশ দূরে। আমাকে শহরের প্রধান রাস্তায় গিয়ে গাড়ি ধরতে হবে। বাকিটা হাঁটাপথ।

যাওয়ার দিন যেরকম ভাবছিলাম সেরকমই— প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো। সেই বর্ষণের মধ্যেই রেললাইনের পাশের রাস্তা দিয়ে আমি হাঁটতে থাকলাম। হেঁটেই যাব এই পথটুকু।

চাচার দোকান বন্ধ। আমি কিছুক্ষণ দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। দেখে আন্দাজ অনুযায়ী মনে হয় ভিতরে একজন মানুষ থাকতেই পারে। চাচা কি ভেতরে? টিনের চালে এই ভারি বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে শুনতে তিনি এখন কি মৃত্যুর খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছেন?

আমার সাথে ব্যাগ বলতে শুধু একটা, যেটা আমার পিঠে চড়িয়ে নিয়েছি। কাপড়চোপড়ের ব্যাগ বা এরকম কিছু নেওয়ার প্রয়োজন নেই কারণ আমি জানি আমি আর ফিরে আসব না এখানে। কোথাও ফিরে আসার মতন জায়গা এখন নেই, এখন যা আছে সেটা হল শেষবারের মতন কোথাও পৌঁছানোর জায়গা।

ব্যাগে আছে একটা ডায়রি, যেই ডায়রিতে আমি এখন লিখছি; আছে কলম, একটা রিচার্জেবল লাইট এইসব। আরও একটা বিশেষ জিনিস সাথে নিয়েছি আমি; শরীর আর মনের সবটা দিয়ে চাইছি যাতে সেটা আমাকে ব্যাগ থেকে বের করতে না হয়।

বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে। একটা ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল আমার মুখ থেকে। চোয়াল শক্ত করে চারপাশে তাকালাম আমি— স্বাভাবিক মানুষেরা তাদের যে যার কাজে যাচ্ছে। তাদের পেছনের গল্প না জেনেই আমি জানি তারা স্বাভাবিক, তা না হলে আমি যেখান থেকে এইমাত্র এলাম তারা সেখানে থাকত, এখানে না। এদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ হয়তো ছিটকে গিয়ে পড়বে সেখানে, ভবিষ্যতের কোনো একদিন বা রাত্রি বা এর মাঝামাঝি সময়ে…

একটা সিগারেট ধরাতে যাব এমন সময় বাসের হর্ন কানে এল আমার। সিগারেট ঠোঁটে রেখে আমি একবার আকাশের দিকে তাকালাম। প্রায় মধ্যাহ্ন এখন। রাতের অন্ধকারে বুঝি আমার পা পড়বে ওই জায়গায়, অন্ধকারের ভেতর অন্ধকারের সন্তান ফিরে এসে শান্তিতে ঘুমানোর আয়োজন করবে…।

***

জায়গাটায় পা পড়া মাত্র আমি বুঝতে পারলাম বিচ্ছিন্ন সেই শহরের সাথে এর একটা সম্পর্ক আছে; যেন ওই শহরেরই একটা অংশ (হয়তো এই কারণেই অনুষ ‘শহর’ শব্দটা ব্যবহার করত)। সম্পর্ক থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু সেই সম্পর্কটা শুধু এমন না যে একজনকে আগে সেই শহরে উঠতে হবে, তারপর এখানে আসতে হবে। এই জায়গাটার খোঁজ যে অনুষই প্রথম পেয়েছে এমন তো নাও হতে পারে; এর আগেও হয়তো এখানে আমার মতন হতভাগাদের পা পড়েছে, কিন্তু সেটা খুব সম্ভবত সেই শহরের মাধ্যমেই।

তাহলে সেই সম্পর্কের আরও একটা দিক আছে। কী সেটা? আমি আমার ক্লান্ত আর খেয়ালি মন নিয়ে সেটার পেছনে মাথা খাটাতে পারার মতো কোনো ইচ্ছা বা আগ্রহ বোধ করছি না। শুধু মাথা আর মনের পেছন থেকে অলক্ষে কেউবা কিছু একটা এরকম খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে আমাকে। সেটাকে অগ্রাহ্য করা দরকার। আমি এখানে রহস্য উদঘাটন করতে আসিনি, বরং রহস্যের মাঝে মরতে এসেছি।

কিংবা ব্যাপারটা হয়তো খুব সাধারণ, যে বিচ্ছিন্ন সেই এলাকা কোনো অনারোগ্য ক্ষতের মতন অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছে। আরও বোধহয় বাড়বে তার সীমানা। জগত আর সৃষ্টির ব্যাধির সাথে সাথে তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকবে সময়হীন এই রাজ্য।

হ্যাঁ, আমাদের জন্যে এটা তো এক রাজ্যই বটে তাই না?

তবে পার্থক্য হচ্ছে এখানে আসার পর আমার যতই অমন মনে হোক না কেন, এখানে লোকজনের বেশ আনাগোনা রয়েছে। রক্তমাংসের উপস্থিতি পরিবেশের উপস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি। চাপা, গুমোট, সময়হীন সেই ভাবটা নেই, অন্তত আপাতদৃষ্টে আর হালকাভাবে দেখলে তাই মনে হবে, কিন্তু এই সব কিছু একটা মুখোশ ছাড়া আর কিছু নয়। এরকম নিখুঁত মুখোশের অস্তিত্ব আমার মতন ‘অসুস্থ’ মনের মানুষ ছাড়া ‘স্বাভাবিক’ কারওর পক্ষে টের পাওয়া অসম্ভব। যেই ব্যাধির কথা একটু আগে বললাম, সেটা এখানে এখনও প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজেকে লুকিয়ে রাখছে। প্রকৃতি বা ‘অপ্রকৃতি’ এমন একটা অপূর্ব মুখোশ বানিয়ে এটাকে বাড়িয়ে তুলছে যে ভাবা যায় না।

এমন মায়া আর মহিমা আমি এর আগে দেখিনি। এই ভয়াল আর অন্ধকার সৌন্দর্যের মাঝে আমি ডুব দিয়ে হারিয়ে যেতে পারব ভাবতেই আমার সারা শরীরে শিহরণ বয়ে গেল।

সামনের মোড়ে একটা হোটেল দেখা যাচ্ছে। প্রায় মধ্যরাত্রের ভেতর ওই একটা হোটেল ছাড়া আশপাশে আর কোনো হোটেল বা টং চোখে পড়ছে না। চা খাওয়ার জন্যে এগিয়ে গেলাম আমি; নিদ্রাত্যাগী কিছু মানুষ বসে আছে— কারওর সামনে ভর্তি কিংবা আধভর্তি কাপ, কিংবা কেবলই শূন্য টেবিল। আমি সিগারেট নিয়েই ভেতরে ঢুকে গেলাম, ভাবছিলাম কেউ কিছু বলবে, কিন্তু না, কেউ আমার দিকে মুখ তুলেও তাকাল না।

হ্যাঁ, আমি এই এলাকারই পুরোনো একজন বাসিন্দা। আমি বোধহয় ফিরে এসেছি অনেক বছর পর, যেরকমটা সবাই আশা করছিল যে ভুল ভাঙার পর, ভেঙে যাওয়ার পর নিজেকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবে লোকটা, চোখ বুজে বিগতের ধ্বংসস্তূপের কথা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবে, সমস্ত দিনরাত্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত।

একইভাবে কাউকে কিছু না বলতেই আমার সামনে পুরোনো একসেট কাপ-পিরিচে ধোঁয়াওঠা চা এসে হাজির হলো। আমি এক চুমুক দিয়ে চোখ তুলে চারপাশে চাইলাম। না, কেউ আমার দিকে তাকিয়ে নেই, কিন্তু সবাই দেখেছে আমাকে, দেখছে, দেখবে আরও কিছু সময়ের জন্য, যেভাবে কোনো দুর্যোগের পর আমরা তাকিয়ে থাকি ধ্বংসস্তূপের দিকে। এটা আহতের প্রতি কোনো সহানুভূতি নয়, বরং অর্থহীন তাকিয়ে থাকা কেবল, কারণ আমরা স্বভাবগতভাবে তাকিয়ে থাকতেই জানি কেবল; অকারণ আর অর্থহীনতার চাইতে বড় কারণ আর নেই…।

লুকিয়ে লুকিয়ে কেউ আমাকে দেখছে এরকম হালকা অনুভূতি আমার ওই জায়গাতেও হয়েছিল। এখানেও হচ্ছে, তবে তার মাত্রা আর ধরন ভিন্ন। এখানকার দর্শকরাও কি ভিন্ন নয়? আমি নিজে কি আর একদিন আগের সেই ‘আমি’ এর সাথে পুরোপুরি সমান?

এখানকার কারওর সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক নেই, এদের কাউকেই আমি চিনি না, কিন্তু তবুও এখানকার চারপাশ আমার ঝাপসা লাগছে, পুরোপুরি অচেনা অজানা কোনো অনুভূতি কাজ করছে না।

চা শেষ করে আমি রওনা দিলাম যে জায়গাটায় আমার ওঠার কথা সেখানে। কিছুটা ভেতরের দিকে, একটা চৌরাস্তার মোড় পার হয়ে আবাসিক এলাকার মতন প্রায় ঠাসাঠাসি দাঁড়িয়ে আছে কিছু দালান। এই ‘আবাসিক এলাকা’ তার প্রবেশমুখে নামে মাত্র একটা গেট দাঁড় করিয়ে রেখেছে, কারণ গেটের দুপাশ দিয়ে অনায়াসেই ভেতরে ঢোকা যায়। অন্ধকারে আন্দাজ করলাম দালানগুলো পাঁচ-ছয় তালার মতন আকাশ ছুঁয়ে আছে। আন্দাজ করার সময়ই আকাশের দিকে তাকানোতে খেয়াল হলো মধ্যরাত্রি হওয়ার পরও আকাশ খানিকটা আলোকিত। একধরনের লাল হলদেটে আলো, যেন গোধূলি পুরোপুরি মরেনি, কিংবা রাত পুরোপুরি আসেনি। দালানগুলোর পেছন থেকে সেই ঈষৎ আলো শুরু হয়ে চোখ যে পর্যন্ত যায় সেই পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। আমি ঠিক মনে করতে পারলাম না যে বাস থেকে নামার পর থেকে এখানে আসার আগ পর্যন্ত এর আগে আমি একবারও আকাশের দিকে তাকিয়েছিলাম কিনা।

দারোয়ান বা এরকম কারওর দেখা পেলাম না। সামনে থেকে দ্বিতীয় দালানটা আমার গন্তব্য। সবগুলোর সামনেই অল্প আলোর বাতি জ্বলছে, কেবল সেই দ্বিতীয় দালানটা ছাড়া। আমি গিয়ে সেটার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। নিচতলা প্রায় অন্ধকার। এখানেও কোনো দারোয়ান নেই। ওপরের শুধু একটা জানালা দিয়ে দুর্বল আলো বেরিয়ে আসছে। ডানদিকে চাইলাম— ওখানকার বেশ কয়েকটা জানালায় বাতি জ্বলছে, কোনোটায় সাদা আলো, কোনোটায় হলুদ, কোনোটা দুর্বল, কোনোটা তীব্র।

আমি আবার ওপরের দিকে চাইলাম। ওই জানালা দিয়ে আর আলো আসছে না। পাশের দালানগুলোর সামনের সব কয়টা বাতি নিভে গেছে। যেসব জানালা দিয়ে আলো আসছিল, সেগুলো আমার চোখের সামনেই একটার পর আরেকটা নিভে যেতে লাগল। হয়তো একসময় সবগুলোই নিভে যাবে।

আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। ডানদিকে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। এক ধরনের হালকা ধূসর আলো ভেসে আসছে ওপর থেকে, মনে হচ্ছে আকাশের আলো মেঘের কাপড় ভেদ করে এখান পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, আসার পথে লাল আর হলুদ রঙগুলো গেছে হারিয়ে। আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম। সিঁড়ির পাশে কোনো রেলিং নেই। জায়গায় জায়গায় ভেতরের লাল ইট বেরিয়ে আছে। চারপাশের অদ্ভুত আলোতে সেগুলোকে দেখাচ্ছে পচে যাওয়া মাংসের মতন, পুরোনো ক্ষত যেন।

বাঁকা মেরুদণ্ডের মতন এঁকে-বেঁকে চলা সিঁড়িঘর আর ফ্লোরগুলো অদ্ভুত এই আলোতে ভিজে আছে। ভিজে আছে এই কথাটা মনে হওয়ার কারণ সেই আলোতে প্রবেশ করার সাথে সাথেই আমার শরীর আর চেতনার ভেতর এক ধরনের আর্দ্রতা টের পেতে লাগলাম আমি। আর কয়েক ধাপ পেরোবার সাথে সাথেই নাকে এক ধরনের ভেজা গন্ধ এসে লাগল। অন্য কোথাও হলে গন্ধটাকে বৃষ্টির পূর্বাভাস হিসেবে নেওয়া যেত, কিন্তু এই দালানের ভেতর এরকম গন্ধ থাকার কোনো মানে হয় না, বাইরে বা ভেতরে বাতাসের কোনো প্রবাহ নেই; তবুও সেই বৃষ্টির কথাই আমার মনে হলো প্রথমে।

ওপরে ওঠার সাথে সাথে গন্ধের সামান্য তারতম্যও হলো না। চারপাশের এই সমাপ্লুত আর অপরিবর্তনীয় আলোর মতনই গন্ধের মাত্রা একই থেকে গেল।

প্রথমবারের মতন খেয়াল করলাম নিজের ছায়াকে। দুর্বল আর অপার্থিব এই আলোতে নিজের ছায়াকেও দেখাচ্ছে দুর্বল আর অপার্থিব। শারীরিক নাড়াচড়ার সময় জায়গায় জায়গায় ভেঙে-ছিঁড়ে যাচ্ছে। এই ছায়া আমার ছায়া না, কিংবা আমার ছায়া হিসেবে থাকতে আর ইচ্ছুক না; নিজের ভাঙন আর ক্ষয় আমার ছায়ার মধ্যেও ছড়িয়ে গেছে।

আলো মাঝে মাঝে আমাদের সামনে এমন সব সত্য সামনে নিয়ে আসে যে বোবার মতন তাকিয়ে থাকতে হয়।

তিনতলা পর্যন্ত উঠে থামলাম। ডানদিক দিয়ে লম্বা এক করিডোর। দু’তলার মতো এখানেও করিডোরের দুপাশে অনেকগুলো রুম। রুমগুলোর দরজা এই অদ্ভুত আলোতে দেখাচ্ছে লালচে কালো। কোনো দরজার নিচ দিয়ে কোনো প্রকার আলো আসছে না। সবগুলোতে হয়তো তালা মারা, ওপাশে কেউ নেই।

করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে শেষ মাথায় চলে এলাম আমি। শেষ রুমটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাকিগুলোতে চেষ্টা না করলেও কী মনে করে এটাতে ধাক্কা দিলাম আমি। দরজা খুলে গেল।

রুম সম্পূর্ণ অন্ধকার। একটা স্বাভাবিক মাঝরাতে অন্ধকার একটা রুম যেরকম অন্ধকার হওয়ার কথা সেরকম, কিংবা তার চেয়েও বেশি। বাইরের অন্ধ আলোতে রুমের ভেতরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দরজা পুরোপুরি মেলে দেওয়ার পর মনে হতে লাগল দরজার অর্ধেক বুঝি খেয়ে ফেলেছে কেউ। সম্পূর্ণ আলাদাভাবে, প্রচণ্ড ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও এই রুম আর অন্ধ আলোর এই করিডোর পাশাপাশি অবস্থান করছে, কারও ভেতরে কেউ প্রবেশ করছে না।

আমি আমার রিচার্জেবল লাইটটা জ্বালিয়ে উঁচিয়ে ধরলাম। পুরোপুরি চার্জ দিয়ে আনলেও রুমের ভেতরে আলো সামান্য দুর্বল মনে হলো। রুমের আসবাব বলতে কেবল একটা বিছানা পাতা আছে দরজার বিপরীত দিকে, আর হাতের বামদিকে একসেট টেবিল-চেয়ার। বিছানার পাশেই জানালা, সামনে ধূসর-ময়লা এক পর্দা টানানো।

ভেতরে ঢুকে কাঁধের ব্যাগ আর লাইটটা টেবিলের ওপর রাখলাম আমি। ওই ভেজা গন্ধটা এখানে নেই। ভেতরের বাতাস কিছুটা উষ্ণ মনে হলো, গুমোট ভাব নেই কোনো। কেউ কি ছিল এখানে? দরজার পাশেই সুইচবোর্ড। মাত্র দুইটা সুইচ সেখানে। মাথার ওপরে কোনো ফ্যান নেই। হাতের ডান দিকে পুরোনো আমলের হলুদ টাংস্টেনের বাতি। লাইট জ্বালানোর জন্যে সুইচগুলো টিপে কোন কাজ হল না, বাল্ব নষ্ট। একটা নিঃশ্বাস ফেলে চারপাশে ভালোভাবে তাকালাম আমি।

বিছানার চাদর একপাশে গোটানো। জায়গায় জায়গায় তোষক ছিঁড়ে ফেটে আছে। চাদরটা মেলে দিলাম আমি। জানালার পর্দার মতন চাদরটাও ধূসর আর ময়লা। হাত দিয়ে চাদরটা স্পর্শ করার সময় কিছুটা উষ্ণ মনে হলো; কেউ বুঝি আমি আসার ঠিক আগেই বিছানা থেকে উঠে এই রুম ছেড়ে চলে গিয়েছে, কিন্তু এখন আবার একজন এসেছে এখানে ঘুমানোর জন্য। আগের সেই ব্যাক্তি আর ফিরে আসবে না।

মাথা ঘুরিয়ে পেছন দিকে চাইতেই মনে হলো দরজার সামনে থেকে কেউ বা কিছু একটা যেন বামদিকে সরে গেল। করিডোরের অদ্ভুত আলোর কারণেই বোধহয় সেটার অবয়ব মানুষ জাতীয় কিছু বলে মনে হলো না; কিছুটা ছায়ার মতো, কিছুটা আলোর মতো, কিছুটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। কয়েক সেকেন্ড নির্বিকারভাবে তাকিয়ে থাকার পর দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি। করিডোর পুরো খালি। এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত কেউ বা কিছু নেই।

সামান্য হাসি ফুটে উঠল আমার মুখে। এই হাসির পেছনে হয়তো কারণ শুধু একটা না।

আমি দরজা লাগিয়ে দিলাম।

রুমটা এখন একেবারে অন্ধকার।

বাইরে আকাশের বুকে এখান থেকে ওখানে আলো খেলে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। কেউ এখন বাইরে খেয়াল করে তাকালে হয়তো দেখবে যে সেই শুভ্র আলো ছাড়াও দালানটার ঠিক ওপরে আকাশের মেঘগুলো লাল, ঠিক এই জায়গাটা থেকে যেন গোধূলি চলে যায়নি। এই গোধূলি যেন থেকে থেকে কাঁপছে, দম নিচ্ছে, আবার দম ছাড়ছে, কিছু সময়ের জন্যে শুভ্র এক আলোর সাথে মিলে গিয়ে চাপা গলায় গাইছে মন খারাপ করা হাহাকার। কী জন্য এমনটা হচ্ছে সেটা নিয়ে ভাবার আগেই এই অস্বাভাবিক দৃশ্যের সৌন্দর্যে কারওর চোখ আর মন অচল হয়ে যাবে— একদৃষ্টে সে তাকিয়ে থাকবে পুরোপুরি অন্ধকার এক দালানের ওপরের আকাশের দিকে।

এসব আলো দুর্বল হয়ে জানালা দিয়ে আসে রুমটার ভেতর। আশ্চর্যজনকভাবে সেই আলোতে রুমের অন্ধকার কিছুটা মুছে যায়, আর দেখা যায় প্রায় অদৃশ্য এক মানুষের অবয়ব পড়ে আছে বিছানায়। অদৃশ্য বলতে যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে বসেছে বিছানার সাথে; রুমের সম্পৃক্ত অন্ধকারের মায়ায় এটা যেন বিছানারই একটা অংশ হয়ে যাবে শীঘ্রই।

মানুষটার বুক ওঠানামা করছে ক্রমাগত। প্রায় শব্দহীন চারপাশে এই ছন্দেরও কোনো আলাদা আওয়াজ কানে আসছে না। শুধু বাইরে থেকে গুড়গুড় আওয়াজ আসছে মাঝে মাঝে। এটা কী শুধু মেঘেদেরই আওয়াজ? তারা কাকে কী বলতে চাইছে? এই গুড়গুড় আওয়াজ, গোধূলির কাঁপতে থাকা ছন্দ, আর এখানকার অন্ধকার এক অবয়বের অমানুষিক বুক… মনে হতে পারে বিছানার ওই অন্ধকারের টুকরো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে আর জায়গা করে নিচ্ছে ওই আকাশের অন্তহীন অন্ধকারের মাঝে, আর এই গুড়গুড় শব্দ তারই অসুস্থ গলার স্বর, অসুস্থ গান, উন্মাদের প্রলাপ; তার বুকের এই ওঠানামা, নিয়ে নিতে চায় এই পৃথিবীর সব বিষ আর বিশুদ্ধ, সবকিছু, কিন্তু কিছুই না, সবই তো অর্থহীন, সবকিছু সে নিতে পারছে না, আবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না, তাই বের করে দিচ্ছে আবার।

হঠাৎ মনে হবে এই রুমে বিছানার ওই অন্ধকার ছাড়াও অন্য কেউ আছে। এইসব চারপাশের দেয়াল, ইট-পাথরের চামড়া আর মাংসের আড়ালে অনেকে বা অনেককিছু লুকিয়ে আছে যারা মেলে দিয়েছে তাদের সুতীব্র চোখ। প্রচণ্ড সেই দৃষ্টির নিচে পড়ে বিছানার অবয়বটার বুকের ওঠানামা কিছুটা কমে আসবে, তার ওপর আরও একটু অন্ধকার এসে জমা হবে চারপাশ থেকে; আরো একটু মিলিয়ে যাওয়া, মিশে যাওয়া…

রুমের বাইরে করিডোরের অন্ধ আলোটা বোধহয় এখন আর নেই। পুরো দালানটাই এখন ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে, বাইরের আলো জানালা দিয়ে তেমন আসছে না; বাকি দালানগুলোও হারিয়ে গিয়েছে পুরোপুরি। গোধূলির সাথে সাথে আঁধারের পরিবার নেমে এসেছে আদর নিয়ে।

এমন সময় শোনা যাবে হু হু এক শব্দ। বাতাস বইতে শুরু করেছে বাইরে। বৃষ্টি আর বাতাসের খেলা শুরু হবে হয়তো। গোধূলির আলোয় লাল রঙের বৃষ্টির ফোঁটা রক্তের মতন পড়বে ক্ষত থেকে। শীঘ্রই ঝড়ের মাঝে আসর সাজিয়ে বসবে হাহাকারের গান।

এখন বাইরের আলো একেবারেই আসছে না রুমের ভেতর, যদিও হু হু শব্দ আরও সুরেলা আর তীক্ষ্ণ হয়ে গিয়েছে। এত সুরের মাঝে অতীতের কত কথাই না মনে আসে মানুষের, পুরোনো দিনরাত্রি সেখান থেকে বিকেল আর চোখবোজা রাত, সেখানকার মানুষজন, পুরোনো পৃথিবীর বোকা-বোবা বাসিন্দারা, সুখ আর সন্তুষ্টির মিথ্যা সাজে ভুলে থাকা প্রসন্ন সময়, সময়ের বুকে ফুটে থাকা প্রিয় হাসির মুখ, প্রিয় মুখের হাসি, চেনা আপন ছায়াদের গোধূলিযাপন, বুকের কাছের জিনিসগুলোর বুক ভেঙে দিয়ে হারিয়ে যাওয়ার নির্মম পুনরাবৃত্তি…।

এইসবই কি ভাবছে বিছানার মানুষটা?

রুমের বাতাস ভারি হয়ে আসে। বাইরের কোনো আলো এখন আর ভেতরে আসে না। নিরেট অন্ধকারের মধ্যেও ফাঁক খুঁজে নিয়ে অসংখ্য ছায়া এসে হাজির হয় যেন। অন্ধকার বিস্তৃত আর ঘন হতে হতে ভারি আর বিশাল হয়ে ওঠে। নাক-মুখ চোখ লোমকূপের ভেতর দিয়ে সবজায়গায় ছড়িয়ে যায়। হু হু শব্দের নিচে চাপা পড়ে অমানুষিক এক বুকের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ধীরে ধীরে পাতলা হতে থাকে। পাওয়া যায় ব্যাগের চেইন খোলার শব্দ। বাইরে শুরু হয় ঝড়।

***

এই শহরের বিস্তৃতি আরও বাড়ছে, সংক্রমণ যেমন বাড়ে, ক্ষতের বিষ যেভাবে গ্রাস করে পুরো শরীর।

হয়তো আরও অনেকে ক্রমাগত ছিটকে আসবে এই জায়গায়। এসে দেখবে এখানকার আকাশ-বাতাস পরিপার্শ্ব প্রচণ্ড ভারি হয়ে ঝুলে আছে; সময়হীন, দমবন্ধ আর অপেক্ষার সুতায় টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন এই শহর, আশ্রয়দাতা বিপর্যয়।

আদৌ কি স্বেচ্ছামৃত্যু বলে কিছু আছে? ধারণাটাকে যেভাবে ডায়রির লেখক কল্পনা করেছিলেন, তার সাথে বাস্তবতা কতটুকু মিলল? আদতেই কি হারিয়ে যাওয়া যায়, মিলিয়ে যাওয়া যায় অস্তিত্ব থেকে?

প্রায়ান্ধকার কক্ষে বসে থাকে একজন। নিঃশব্দ, ময়লা মেঝের সেই কক্ষে জানালার পাশে ভাবলেশহীন একটা মুখ তাকিয়ে থাকে বাইরে, যার চোখের দৃষ্টি কোনোদিকেই নিবদ্ধ নয়। এখন তার হাতে একটা ডায়রি দেখা যাচ্ছে। পাশে একটা ব্যাগ ময়লা ফ্লোরের উপর রাখা। কিছুক্ষণ পর হয়তো এগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও পুড়িয়ে ফেলা হবে; দূর থেকে দেখা যাবে রাতের অন্ধকারে হঠাৎ জেগে উঠেছে গোধূলির মতন চোখ, যেই চোখ ময়লা ফ্লোরের এক রুমে কিছুক্ষণ পর আবার অন্ধ হয়ে মিলিয়ে যাবে। মানুষটা অপেক্ষা করে যাবে। সময়হীন শহরে অপেক্ষা। কীসের অপেক্ষা তা জানে না কেউ।

mabusakib@gmail.com

 

Read Previous

জলছবির প্রতিচ্ছবি

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৪র্থ সংখ্যা (এপ্রিল-২০২৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *