অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ২০, ২০২৪
৬ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ২০, ২০২৪
৬ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আবুল খায়ের নূর -
ছাদেক আলীর সংসার

শ্রাবণের বিকেল। প্রবল বৃষ্টির ধারা ঝরছে। বিজয়নগর গ্রামখানিতে পড়েছে যেন নির্জনতার হাতছানি। বৃক্ষরাজ নীরবে ঠায় দাঁড়িয়ে। বৃষ্টির ধারা মাটিকে গড়িয়ে গড়িয়ে খাল বিলে উচ্ছ্বাস বাড়াচ্ছে। এ যেন প্রকৃতির খেলা।

বিজয়নগর গ্রামটি ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা ঝিনাই নদীর তীরে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। নদীটি এক সময় খুবই খরস্রোতা ছিল। কালের পরিক্রমায় নদীটি এখন কংকালসার। নদীতে নেই কোনো জল। স্রোত সে তো আঁতুড়ঘরে হারিয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে নদী ছাপিয়ে পানিতে গ্রামখানি টইটম্বুর হয়ে যায়। নৌকা ছাড়া চলাচল দুষ্কর। উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগের রাস্তাটি মোটামুটি ভালো। ইদানীং জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ রাস্তা হয়েছে।

কৃষক ছাদেক আলী এ গাঁয়েরই বাসিন্দা। লম্বা ছিপছিপে চেহারা। গালভার্তি লম্বা দাড়ি। তারা দুই ভাই দুই বোন। বোনদের বিয়ে হয়েছে। ছাদেক আলীর এক ছেলে চার মেয়ে। ছাদেক আলীর ছোট ভাই রাজু খেতে কাজ করে। এখনো বিয়ে করেনি। বৃদ্ধা মা চাঁন বানু এখনও বেঁচে আছেন। তাদের সংসার ভালোই চলছিল।

বৃষ্টির দিন কাজ নেই। অলস সময় গল্প গুজবে দিন কাটে। সিকদার, আকবর মুন্সি, একাব্বর আলী ও ছাদেক আলী তারা বসে ছাদেক আলীর ঘরে গল্প করছিল। পেঁয়াজ কুচি কাঁচা মরিচ ও সরিষার তেল দিয়ে ঝালমুড়ি বানিয়ে দিলেন ছাদেক আলীর স্ত্রী। ঝাল মুড়ি খাচ্ছে আর গল্পে ডুবে আছে। মুড়ি খাওয়া শেষ হলে ছাদেক আলীর স্ত্রী জয়নব বানু পানের বাটায় পান সুপারি দিয়ে ছাতা হাতে রান্নাঘরে চলে যান। পান চিবাতে চিবাতে সিকদার ছাদেক আলীকে বললেন, আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। কথাটি কীভাবে নেবেন জানি না। যদি অভয় দেন তাহলে বলি।

ছাদেক আলী জানতে বললেন, ভনিতা না করে বলে ফেলো, শুনে বিবেচনা করার চেষ্টা করব। সুযোগটা সিকদার কাজে লাগালেন। বললেন, আপনার ছোট ভাই, রাজুর তো বিয়ের বয়স হলো। ভালো দেখে বিয়ে করিয়ে দিই। ভালো একটি মেয়ে আছে। আমাদের গ্রামেরই মেয়ে। আজহার মৃধার বড় মেয়ে। দেখতে শুনতে খুবই ভালো। কথাগুলো গড়গড় করে বলে ফেলল।

ছাদেক আলী সিকদারের কথায় অবাক হলেন। তিনি ভাবতে পারেননি এ ধরনের প্রস্তাব দিতে পারেন। তাই তিনি নিজেকে সামলিয়ে কৌশলে হেসে হেসে জবাব দিলেন— রাজুর তো এখনো বিয়ের বয়সই হয়নি। হিসাবনিকাশ ঠিকমতো বোঝে না বললেই চলে। সংসারের ভার বহন করবে কেমনে? সংসার কী— বুঝে-সুজে উঠুক। তারপর না হয় কথাটি ভেবে দেখব। এভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন ছাদেক আলী। এটা একটি ঝড়ের পূর্বাভাস তা ছাদেক আলী অনুমান করতে পারলেন। আকবর মুন্সি ও একাবর আলী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করলেন না।

সিকদার বুঝতে পারলেন ছাদেক আলী বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন। তাই তার মনে কেমন যেন জেদের পোকা ভর করল। সিকদার মনে মনে ভাবলেন আমার নামও সিকদার, এ বিয়ে দিয়েই ছাড়ব। সিকান্দার এবার টোপ ফেললেন ভিন্ন পথে। রাজুর ভগ্নিপতি আকবর মুন্সির সাথে ভাব জমিয়ে ফেলল। সে সুযোগে তাকে কবজা করার প্রযাস চালান এবং সফলও হলো।

আকবর মুন্সিকে সিকদার বললেন— ভগ্নিপতি হিসেবে আপনার তো একটা দায়িত্ব আছে। কী বলেন?

তা তো আছেই। কেন?

সিকদার বলল— আপনার ভূমিকা ছাড়া মনে হয় সম্ভব হবে না। তাই বলছিলাম কি রাজুর বিয়ের বিষয়ে ছাদেক আলী কোনোদিনই রাজি হবে না। আপনি ভরসা। আপনি মত দিলে এগুতে পারি।

রাজি না হওয়ার কারণ? আকবর মুন্সি জানতে চাইলেন।

তার কারণ আছে আকবর ভাই।

কী কারণ? যে জন্য তিনি রাজি হবেন না তা হলো— তার পাঁচজন ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ালেখা করে। তাদের অনেক খরচ আছে। বাড়তি কোনো আয় নেই। যে পাঁচ ছয় বিঘা জমি আছে তার উপর নির্ভর করে সংসার চলে। তাও আবার নদীভাঙ্গা জমি ঠিকমতো ফসল হয় না। এর মধ্যে রাজুকে বিয়ে করালে নতুন আরেকটি সংসার হবে। খরচ বাড়বে। সংসার চলবে না। এমনিতেই সারা বছর টানাপোড়েন থেকেই যায়।

এ ছাড়া আরও একটি কারণ আছে। সেটা আবার কী? আকবর জানতে চায়। সেটা হলো রাজু যদি সংসার থেকে পৃথক হয়ে যায়।

যতদিন তাকে ধরে রাখা যায়। ততদিন তার লাভ। এটা তার একটা কৌশল।

—ঠিক বলেছ সিকদার। এভাবে কখনো ভাবিনি তো!

সিকদার এবার জোর গলায় বলল— তার স্বার্থের জন্য তো আর রাজু সারা জীবন চিরকুমার হয়ে থাকবে না। কী বলো আকবর ভাই!

তা কী করে হয়! আকবর মুন্সি বললেন। এর একটি ব্যবস্থা করা দরকার।

—তাহলে দেরি কেন? রাজুর যদি মঙ্গল চান তাহলে; রাজুর একটা ব্যবস্থা করুন। সিকদার বললেন। তাছাড়া ছাদেক আলী সংসারে কোনো কাজও করে না। ভবঘুরের মতো দেওয়ানি করাই তার কাজ। এটা তো ভালো করেই জানেন। জমিতে হাল চাষ থেকে শুরু করে কামলা কিষাণ, সংসারের যাবতীয় কাজ তো রাজুই করে। তিনি বসে বসে আরাম কেদারায় ফায়দা নিচ্ছেন। বিশ্লেষণী ব্যাখ্যা শুনে আকবর মুন্সি বললেন ঠিকই বলেছ। কোনোদিন এভাবে ভাবিনি। তাই মাথায় আসেনি। সেও তার সাথে সুর মিলিয়ে বলল— একজনের জন্য তো আর আরেকজন এভাবে ঠকতে পারে না। সিকদার তুমি ঠিকই ধরেছ। এভাবে রাজুর ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেওয়া উচিত নয়। একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সিকদার মনে মনে খুশি হলেন। তিনি এটাই চেয়েছিলেন। সিকদার বললেন, রাজুর মঙ্গলের জন্যই বলছি। রাজুকে বিয়ে করিয়ে পৃথক করে দিন। দেখবেন দুদিনেই তাদের সংসারে উন্নতি আসবে। একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, দেখবেন ছাদেক আলী কেমন বেহাল দশা হয়।

আকবর মুন্সি ও সিকদার রাজুকে বোঝাতে থাকে। রাজু ছিল একজন সহজ সরল ছেলে। কোনো প্রকার ছল চাতুরি জানত না। সেই রাজু যুক্তিবাক্য শুনতে শুনতে সেও বেগে বসল। কেননা পাথর জড় পদার্থ তাকেও একটি অন্যটির সাথে ঘনঘন ঘর্ষণে করলে আগুন জ্বলে। রাজু তো রক্ত-মাংসের মানুষ। বিয়ের কথা শুনতে শুনতে বিয়ে পাগলা হয়ে গেল। কুটিল মনের মানুষ যে কাজ করে সে কাজ মঙ্গলজনক হয় না। তারা কুটিল কাজ করতেই ভালোবাসে। আকবর মুন্সিও তার ব্যতিক্রম নয়।

ছাদেক আলী কিন্তু এই গোপন ষড়যন্ত্রের কথা কিছুই জানতে পেল না।

১৯৮১ সালের ২৩ জানুয়ারি।

সকাল বেলা ছাদেক আলী রাজুকে বলল, জমি চাষের জন্য লাঙল জোয়াল নিয়ে মাঠে যাও।

—যেতে পারব না। রাজু রাগের বসে গরগর করে কথাটি বলে ফেলল।

—কেন যেতে পারবে না? তোমার কি শরীর খারাপ?

—না। শরীর খারাপ নয়।

—তাহলে যাবে না কেন?

রাজু এবার চোখ বন্ধ করে বলে ফেলল, আমি আর এ সংসারে কলুর বলদের মতো খাটতে পারব না। সংসারে আমি একা খাই না। আমি বুঝে গেছি, আমার ভাবনা তোমার মাথায় নেই। আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনোদিন চিন্তা করেছ? করনি। সারা জীবন শুধু খেটেই যাব? আমার কোনো ভবিষ্যৎ নাই? আমার ভাবনা আমাকেই ভাবতে হবে।

—তোর আবার কীসের ভাবনা? বুঝলাম না।

উত্তর না দিয়ে হনহন করে মাঠে চলে গেল।

ছাদেক আলী আর কথা বাড়াল না। বুঝতে পারল নিশ্চয়ই একটা গোলমাল হয়ে গেছে।

বড় ভায়ের উপর বিরাগভাজন হয়ে রাজু কঠোর কথা বলে গেল। যে ইঙ্গিত দিয়েছে। তাতে মান সম্মান হারানোর ভয় রয়েছে। কথাগুলো শুনে মনে কষ্ট পেল। ছাদেক আলী ভাবছে— যে ব্যক্তি কোনোদিন চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনি। সে আজ বুক ফুলিয়ে কথাগুলো অনায়েসে বলে গেল।

সত্য একদিন প্রকাশ পায়। এটাই সত্য। কোনো গোপনই গোপন থাকে না। রাজুর বিষয়টি প্রকাশ পেল। সিকদার, আকবর মুন্সি তাদের সাথে যোগ হয়েছে একাব্বর আলী। তারা ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে রাজুর মাথা খারাপ করে দিয়েছে। তাই রাজু বিদ্রোহের সুরে উলটাপালটা কথা বলছে। বিয়ে না করালে সংসারে কোনো কাজই করবে না।

ছাদেক আলী যা জেনেছে তাতে বুঝলেন— এ বিয়ে সংসারে কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না। তবুও তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর দাঁড়াল না। সোজা বাড়ি ফিরল। চিন্তা ভাবনায় ও ক্লান্তিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

অসময়ে ছাদেক আলীকে বিছানায় দেখে তার স্ত্রী জয়নব বানু জিজ্ঞাসা করল— অসময়ে বিছানায়! ব্যাপার কী? শরীর খারাপ?

—না। তাহলে অসময়ে শুয়ে আছ কেন? দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন। মনটা খারাপ। ভালো লাগছে না। একটু বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

—কী হয়েছে? আমাকে বলা যায় না? বলা যাবে না কেন?

—হ্যাঁ, তোমাকে অবশ্যই বলব।

—রাজুকে বিয়ে না করালে সংসারে কাজ করবে না। আমার সাথে যে আচরণ করল তাতে আমি হতাশ হলাম।

কথাগুলো শুনে জয়নব বানু বিচলিত হলো। কী হলো না, বোঝা গেল না। তাকে সাহস জেগালেন এবং বললেন, আল্লাহ’র উপর ভরসা রাখেন। আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন কারও অমঙ্গল করেন না। যারা ক্ষতি করার জন্য যড়যন্ত্র করে, তারাই একদিন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

স্বগতোক্তি করে ছাদেক আলী বলল, তোমার কথাই যেন সত্য হয়।

ছাদেক আলী আকবর মুন্সিকে ডেকে পাঠাল। আকবর মুন্সি ছাদেক আলীর ছোট বোন রেজিয়া বেগমের স্বামী। শত্রুতা করলেও তাকে ডাকতেই হয়। আকবর মুন্সি বিকালে এল। ছাদেক আলী ঘরেই ছিলেন। বাড়ির আঙিনায় কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসলো দু’জন। আকবর মুন্সি বলল, ভাই, ডেকেছেন আমাকে?

—হ্যাঁ ডেকেছি।

—কী ব্যাপারে বলুন তো।

—বিষয়টি তুমিও জানো। তবুও বলছি। রাজুকে বিয়ে না করালে কোনো কাজ করবে না।

—এইটা কী বললেন! আমি কী করে জানব।

—থাক সে সব কথা। এখন কী করা যায় তাই বলো।

আকবর মুন্সি রহস্য করে বলল, এখন বিয়ে না করালেই নয়?

—না করিয়ে তো উপায় দেখছি না। তোমার কি মত?

—কোনো উপায় যেহেতু নেই। তাহলে তো বিয়ে করানোই উচিত।

—ঠিক আছে। তোমরা ব্যবস্থা করো। আচ্ছা আমি দেখছি। আকবর মুন্সি আগ বাড়িয়ে বলল, রাজুর মেয়ে পছন্দ করা আছে শুনলাম। তবে আর দেরি কেন? দিনক্ষণ দেখে বিয়ের দিন ধার্য করে ফেলুন।

ছাদেক আলী বলল, মেয়ে দেখতে হবে না? না দেখে বিয়ের দিন ধার্য এ কেমন ব্যাপার, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

সে যাই হোক। ছাদেক আলীর আর মেয়ে দেখা হলো না। শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল।

বিয়ের পর নববধূ ছাদেক আলীর বাড়িতে একবার এসেছিল। তারপরেই রাজুর শ্বশুর আজহার আলী মৃধা মেয়ে আটকে দিলেন। বলে পাঠালেন যে রাজু একান্নবর্তী সংসার থেকে পৃথক না হলে মেয়ে পাঠাবেন না। তার কথা হলো— ছাদেক আলীর সংসারে থাকলে রাজুর উন্নতি হবে না। আমাদের মেয়ে জামাইয়ের উন্নতির বিষয়টি আমাদেরই ভাবতে হবে।

দু’দিন পর রাজু কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ডাকল, ছাদেক আলীর বাড়ির আঙিনায়। ছাদেক আলীও বসে আছেন। সিকদার, আকবর মুন্সি ও একাব্বর আলীও আছে। ছাদেক আলীকে না জানিয়ে রাজু লোক জমায়েত করেছে। সিকদার আগ বাড়িয়ে রাজুকে জিজ্ঞাসা করলেন— রাজু, লোক ডেকেছ কেন?

রাজু বলল, আমি আপনাদের ডেকেছি একটা কারণে। তা হলো আমি আর এক সংসারে থাকতে চাই না। আজ থেকে পৃথক সংসারে থাকতে চাই। আমাকে পৃথক করে দিন।

প্রতিবেশী যারা ছিল তারা বলল, এ কেমন কথা। বিয়ে করতে না করতেই পৃথক সংসার!

জমির দেওয়ান বললেন, ঠিক আছে তুমি যদি এক সংসারে থাকতে না চাও। আমরা বিষয়টি পরে বিবেচনা করে দেখব। এখন নয়। কিছুদিন যাক। আমরা আবার পরে বসব। রাজু মানতে রাজি নয়। সাফ জানিয়ে দিলো একান্নবর্তী পরিবারে থাকবে না। ছাদেক আলীর কাছে জানতে চান— আকবর মুন্সি ভাই, তুমি কী বল?

—তোমাদের কথাই মানছে না। আমি আর কী বলব। রাজু যখন থাকতে চাইছে না। আমাদের বোঝা মনে করছে। আমি কি জোর করে ধরে রাখতে পারব? তোমরা যা ভালো মনে করো সেটাই করো। তখন আকবর মুন্সি সিকদারকে বলল, কী আর করা যাবে। এক সঙ্গে যখন থাকতে চায় না, পৃথক করেই দেওয়া হোক।

ঘরে ধান-চাল যা আছে ভাগ বণ্টন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। ছাদেক আলী কোনো কথাই বলছে না।

এ পেছনে বড় ভূমিকা ছিল সিকদারের।

ভাগ-বাটোয়ারার জন্য ঘর থেকে যখন ধান বের করা হচ্ছিল তখন ছাদেক আলীর ছেলে তারেক বাড়ির আঙিনায় বিমূঢ় চিত্তে দাঁড়িয়ে ছিল। অবাক হওয়ার কথাই। কেননা তার চাচিকে দেখতে না দেখতেই পৃথক হয়ে গেল। সংসারে নতুন বউ এল আর সুন্দর সংসারটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেল। তারেক এসব ভাবতে ভাবতে আবেগে দুঃখে তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। চোখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকে বইখাতা নিয়ে দ্রুত স্কুলের দিকে পা বাড়াল।

তারেক তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ছাত্র হিসেবে মোটামুটি ভালোই। দরিদ্র পরিবারে যা হয়। পোশাক পরিচ্ছেদে নেই কোনো জৌলুস। গায়ে কোনো রকমে একটি রেডিমেট শাট। পরনে কমদামের লুঙ্গি, পায়ে রুপসা চপ্পল। এগুলোই ছিল তারেকের ছাত্র জীবনে নিত্যদিনের পোশাক। স্কুলের বই খাতা ঠিকমতো কিনে দিতে পারত না ছাদেক আলী। এতসব অপ্রতুলতা সানন্দে গ্রহণ করে নিত। এছাড়া উপায়ও ছিল না। সে দিন স্কুলে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু স্কুলে তার মন বসেনি। ছুটি হলে সোজা বাড়ি ফিরে আসে। বাড়িতে প্রবেশ করে দেখলো তার মা জয়নব বানু আঙিনায় ঘরের কোল ঘেসে বিমর্ষ ভারাক্রান্ত মনে বসে আছে। দুপুরের রান্না হয়নি। ছোট বোন বেনু, খালেদা ও মুক্তা মায়ের কাছেই কাঁদছে। ছাদেক আলী বাড়ি নেই। এ থমথমে অবস্থা দেখে মায়ের কাছে খাবারের জন্য বিরক্ত করল না। ঘরে বইগুলো রেখে বাইরে চলে যায়।

রাতেও চুলা জ্বলেনি।

পাশের বাড়ির তারেকের খালা মাজেদা ঘরে এসে দাঁড়াল। সে এক গামলা ভাত ও তরকারি নিয়ে এসেছে। ডাক দিয়ে বলল, তারেক, বেনু খালেদা, মুক্তা তোরা আয়, বসে পড়। ক্ষুধা লেগেছে খেয়ে নে। আমি বেড়ে দিচ্ছি।

সকলে বসে পড়ল। ক্ষুধাও লেগেছে। চুপচাপ খেয়ে নিল।

রাজুর স্ত্রী সেদিনই এসেছে। নুতন সংসার শুরু। এখন তার আনন্দের দিন। রাজুর ভাবনা দূর হয়েছে ছাদেক আলীর পরিবারের ব্যয় ভার আর বহন করতে হবে না। দু’জন আর দু’জন। তাদের সংসার সুখেই কাটবে। নিজকে তৃপ্তমনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।

রাজু যতটুকু খুশি না হয়েছে তার চেয়ে বেশি খুশি হলো সিকদার আকবর ও একাব্বর। জমিজমা বণ্টন হয়ে গেলে রাজু মহাআনন্দে তার নতুন সংসারে আত্মনিয়োগ করল।

এদিকে ছাদেক আলীর মাথায় বাজ পড়ল। এক ছেলে চার মেয়ে, সকল ছেলেমেয়ে স্কুলে লেখাপড়া করে। তাদের খরচ বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তাছাড়া জমিতে কৃষাণ নিতে পারছে না। নিজে জমিতে খাটতে হচ্ছে। এ অবস্থা দেখে কুটিল সম্রাটগণ উপহাস করতে ছাড়ল না। তাদের ধারণা, ছাদেক আলী ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া তো দূরের কথা সংসারই চলবে না।

ছাদেক আলী তাদের উপহাস নীরবে হজম করে যান। এ ছাড়া উপায়ইবা কি? তারেক বয়সে ছোট হলেও বুঝতে পারে। নিজের মনোবলকে শক্ত করার চেষ্টা করে।

পাঁচ বছর পরের ঘটনা। ছাদেক আলীর অবস্থা আরও শোচনীয়। পৈতৃক তিন বিঘা জমি পেয়েছিল। তা থেকে দুই বিঘা ইতোমধ্যে বিক্রি করতে হয়েছে। আবাদি জমি না থাকায় জমি থেকে কোনো ফসল আসে না। সে বছর তারেক এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তারেক ছাদেক আলীকে জানাল, ফরম ফিলাপের টাকা লাগবে। কত টাকা লাগবে? জানতে চাইল ছাদেক আলী।

—সব মিলিয়ে তিন শত পঞ্চাশ টাকা লাগবে।

ভাবনায় পড়ল ছাদেক আলী। অর্থের অভাবে ফরম ফিলাপ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কার কাছে যাবে, কে দেবে এত টাকা। প্রতিবেশী বাতেন শেখ, কাদের শেখ আরও কয়েকজন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের সহযোগিতায় ফরম ফিলাপ হয়ে গেল। এসএসসি পাস করল তারেক।

কলেজে ভর্তি হতে হবে। ভর্তি হতেও নতুন বই কিনতেও টাকা লাগবে। কোনো উপায় না দেখে এক বিঘা জমি ছিল। সেটাও বন্ধক দিল। তারেক কলেজে ভর্তি হয়। ছাদেক আলী বলল, তুমি মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকো। তুমি কোন চিন্তা কোরো না। আমার যত কষ্টই হোক। তুমি লেখাপড়া করবে। ছাদেক আলীর স্বপ্ন, তার শত কষ্ট হলেও ছেলেকে শিক্ষিত করে তুলবে। প্রয়োজনে বাড়ি ভিটামাটি বিক্রি করবে তবুও ছেলেকে লেখাপড়া থেকে বিরত রাখবে না।

এগিয়ে যাচ্ছে দিন। তারেক এইচএসসি পাস করে বিএসসিতে ভর্তি হয় এবং যথাসময়ে পাস করে। ছাদেক আলীর তখন এমন অবস্থা দাঁড়ায়, দিনমজুরি কাজ ব্যতীত তার কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। কিন্তু বংশ মর্যাদা ও আত্মসম্মান রক্ষায় তাও করতে পারছে না। এমতাবস্থায় দিন যেন আর কাটতে চাইছে না। এক বেলা জোটে তো দু বেলাই উপোস থাকতে হয়।

একদিনের কথাই বলা যাক। সে দিন ছাদেক আলী কোন ব্যবস্থা করতে পারল না। শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে এল। কেউ ধার কর্জও দেয় না। পরিশোধ করতে পারবে না ভেবে কেউ দিতে চায় না। সকাল দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। তখনো চুলা জ্বলেনি। ছেলে-মেয়েগুলো ক্ষুধায় কাতর। অনাহারে আর কত সহ্য করবে। মাকে খাবার জন্য বিরক্ত করছে। এটা যে তাদের ব্যর্থ চেষ্টা তা শিশুরা বুঝবে কী করে। রাত গভীর হতে চলল। কতক্ষণ আর জেগে থাকে শিশু। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।

তারেক বিএসসি পরীক্ষা দিয়েছে প্রায় একমাস হলো। ফলাফল বের হতে আর প্রায় দুই মাস বাকি। চৈত্রের খররৌদ্রে জল না চাইতেই যেন হাতের নাগালে জল পেল। বিকালে ডাক পিয়ন এসে একটা রেজিস্ট্রি লম্বা রঙিন খাম দিয়ে গেল। বাবা-মা কাছে এল। ছাদেক আলী বলল, কীসের খাম তারেক? কী আছে এতে?

তারেক বলল, জানি না। খুলে দেখি কীসের চিঠি।

খাম খুলে পড়ল তারেক। পড়ে খুশির খবরটি মা-বাবাকে বলল— আমার চাকরি হয়ে গেছে। দশদিনের মধ্যে কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। তারেক বিএসসি পরীক্ষার আগে একটি প্রতিষ্ঠানে দরখাস্ত করেছিল, মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছে পরীক্ষার পরে।

ছেলের চাকরি হওয়ায় ছাদেক আলী খুব খুশি হলো। আনন্দে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল। আনন্দে তার দু’চোখ অশ্রুতে ছলছল করছে। ধরে রাখতে পারল না। কয়েক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু ধরার ধূলিতে গড়িয়ে পড়ল।

তারেকের পোস্টিং হয়েছে উত্তরবঙ্গে। রেল ও স্টিমারযোগে যেতে হবে। কর্মস্থলে যোগদানের জন্য প্রস্তুতি নিল। মুরব্বিদের দোয়া ও আশীর্বাদ নিল। সোনালি স্বপ্নের প্রত্যয়ে তারেক চাকরিতে যোগদানের উদ্দেশে বাড়ি থেকে অচেনা পথে পা বাড়াল। ছাদেক আলী ও জয়নব বানু আদরের ধন তারেকের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল। যতক্ষণ দেখা যায়, ততক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে রইল। এক সময় গাঁয়ের বাঁকা পথে তারেক অদৃশ্য হয়ে গেল।

 

Read Previous

মুদ্রিত দুঃখের ধারাপাতে

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৫ম সংখ্যা (অক্টোবর-২০২৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *