অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিচিত্রা সেন -
ফেরারি মনটা তাহার

মা… মা… আমি আবার আইসা পড়লাম।

মালার কণ্ঠ শুনে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসে মালার মা। উঠোনের মাঝখানে মেয়েকে দেখে চমকে ওঠে সে। মেয়ে একটা কাপড়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে আলুথালু বেশে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের অজান্তেই যেন মালার মা চারপাশে কাউকে খোঁজে। সত্যি কি মালা একা চলে এসেছে! আর কাউকে তো আশপাশে দেখা যাচ্ছে না। নিজের মনের সন্দেহকে চাপা দেওয়ার জন্যই যেন মালার মা প্রশ্ন করে, তুই একা আইছস? জামাই আসে নাই?

মালা যদিও খুব ক্লান্ত, তবু মায়ের কথার প্রত্যুত্তরে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, হে আইবো ক্যান্? আমি হেরে না জানাইয়াই আইসা পড়লাম।

মালার মা আর কথা বাড়ায় না। আশপাশের ঘরের কেউ কেউ উঁকি দেওয়া শুরু করেছে। কলোনি টাইপের বাসাগুলোতে এই এক অসুবিধা! কারও ঘরে কিছু হলে আশপাশের মানুষ ভিড় করে তা দেখে। তাই কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মালার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে মা চাপা স্বরে বলে, আয়, ঘরে আয়।

এ নিয়ে চারবার স্বামীর বাড়ি ছাড়ল মালা। না, কোনো মান-অভিমান নয়। এটা তার অভ্যাস। কয়েকদিন সংসার করার পর তার ওপর যেন কী এসে ভর করে। তারপর কয়দিন সে খুব অস্থির থাকে। এসময় তার খাওয়া-দাওয়া উঠে যায়। একসময় সে স্বামীর ঘর ছেড়ে পালায়। এই যে সে চারবার পালাল, তা কিন্তু এক স্বামীর ঘর থেকে নয়। চারবার সে চারটা স্বামীর ঘর থেকে পালিয়েছে। কী হলো! আপনাদের কপাল কুঞ্চিত হয়ে গেল? হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনা কিন্তু সত্য। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগছে মালাকে নিয়ে? তবে সে গল্পই শুনুন।

মালার বয়স যখন আঠারো, তখন তার জন্য প্রথম সম্বন্ধ আসে। সম্বন্ধটা নিয়ে এসেছিল মালার মায়ের এক পিসি। এক সন্ধ্যায় মালার মায়ের কাছে পিসি এসে হাজির। যদিও মালার বাবা এক বাড়ির দারোয়ান আর মা তিনটা বাসায় কাজ করে, কিন্তু মাস শেষে ভালোই কামায় তারা। যেহেতু ছোট সংসার, কম ভাড়ার বাসায় থাকে তাই সেই টাকায় তারা চলতে চায় সাধারণ আর দশটা মধ্যবিত্তের মতো। একমাত্র মেয়েকে চালাতেও চায় সেভাবে। তাই প্রশ্রয় পেতে পেতে মেয়েটি ভুলে যায় যে, ও খুব নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। কিন্তু ও ভুলে গেলে কী হবে! পাত্রপক্ষ তো বিয়ের আগে সব খোঁজখবর নেয়। পাত্রী দেখে এগিয়ে আসলেও যখন শোনে মালার বাবা দারোয়ান, আর মা বুয়ার কাজ করে তখন তারা পিছু হটে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়, ব্যাটে বলে আর মেলে না। বিয়ের সম্বন্ধও আর পাকা হয় না। কিন্তু এবার সব জেনেও কী এক রহস্যময় কারণে পাত্রপক্ষ এগোয়।

বিয়ের কথাবার্তা পাকা হওয়ার পর থেকেই মালা যেন হাওয়ায় উড়ছে। অষ্টাদশী মালা, চোখে তার রঙিন স্বপ্ন। টিভিতে অনেক সিনেমা দেখা হয়ে গেছে তার। সে জেনে গেছে স্বামী-স্ত্রী মানে সারাদিন একসাথে গান গাওয়া, ঝগড়া করা আর ঝগড়া শেষে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা। বিভিন্ন চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনেক গানই এরই মধ্যে শিখে নিয়েছে সে। তার খুব সখ বিয়ের পর তারাও সিনেমার নায়ক নায়িকার মতো গান গাইবে। বিয়ের আগের কদিন সেসব স্বপ্নে বিভোর থাকে সে। অবশেষে একদিন এলাকার লোকদের সাহায্য সহযোগিতায় মালার বিয়েটা হয়ে যায়। তবে এ বিয়ের জন্য কোনো প্যান্ডেল হয় না। পাড়ার মন্দিরেই বিয়েটা সেরে ফেলা হয়। মন্দিরের সস্তা ফি-এর বিয়ে, তাই তিন ঘণ্টার বিয়ের অনুষ্ঠান দশ মিনিটেই শেষ। শুধু ব্রাহ্মণই মন্ত্র পড়েন। বর-কনেকে কোনো মন্ত্র পড়তে হয় না। মা কালীর পায়ের সিঁদুর নিয়ে মালাকে পরিয়ে দেয় বর। এরপরই বিয়ের কার্যের সমাপ্তি। এমন কাটছাঁট বিয়ের আয়োজন এর আগে কখনো দেখেনি মালা। ভাবে, ওদের টাকাপয়সা কম বলেই হয়তো এত ক্ষুদ্র আয়োজন। সিঁদুর পরানোর পরেই কন্যা বিদায়ের আয়োজন করা হয়। মেয়েকে বিদায় করে মালার মা-বাবা যেন স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে।

ওদিকে কুমিল্লার শ্বশুরবাড়িতে নেওয়ার পর মালার স্বামী মালাকে ঘরে রেখে সেই যে বেরিয়ে যায় আর একবারের জন্যও ঘরে আসে না। গাড়ি থেকে বাড়ি পর্যন্ত একটি কথাও হয়নি তার সাথে। মনে মনে কেমন উদ্গ্রীব হয়ে থাকে মালা। ভাবে, আজ রাতে হয়তো বেশি কথা বলবে বলেই ইচ্ছে করে এখন দূরে সরে রয়েছে। মনের ভেতর গুনগুনিয়ে উঠছে গান। কেউ যেন না শোনে-মতো সে নিজের মনেই গুনগুন করে, ‘সোনার পালঙ্কের ঘরে, লিখে রেখেছিলেম দ্বারে’।

রাতে তাকে খাটে বসিয়ে ননদ-শাশুড়ি চলে যায়। একটু পরই ঘরে ঢোকে বর। মালা লজ্জায় চোখ বুজে থাকে। তারপর অপেক্ষার পালা। অনেকক্ষণ কেটে যায়, কিন্তু মালার বর কিছু বলে না। আর কতক্ষণ চোখ বুজে থাকবে সে! কিছু বলছে না কেন তার বরটা? একটু পরই তার হাতে সে বরের হাতের স্পর্শ পায়। আস্তে আস্তে চোখ খোলে মালা। তার বর একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখে অপার মুগ্ধতা, কিন্তু দৃষ্টিতে কেমন যেন বিষণ্নতাও খেলা করছে। মালা হাত ছাড়িয়ে বরের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে। বর তাকে দুহাতে তুলে বুকে চেপে ধরে। সারা শরীর আবেশে কেঁপে ওঠে তার। বুক থেকে সরিয়ে বর আবারও তার মুখের দিকে তাকায়। মালা অধীর হয়ে তাকিয়ে থাকে বরের মুখের দিকে। কিন্তু বর শুধু তাকিয়েই আছে, একটি শব্দও উচ্চারণ করে না। অথচ কী আগ্রহ নিয়ে মালা শুনতে চায় একটি শব্দ। শেষমেশ লজ্জার মাথা খেয়ে সে নিজেই জানতে চায়, আমারে তোমার পছন্দ হইসে?

প্রথমে তুমি বলতে তার একটু লজ্জা করছিল, কিন্তু সে সিনেমাতে দেখেছে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে তুমি করে বলে। তাই সেও বরকে তুমি করে বলবে। মালার কথার জবাবে বর মুচকি হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। এবার মালার অস্থির লাগে। তার বর এখনো পর্যন্ত একটি কথাও বলেনি। খুব রাগ হয় তার। সে জানে সে দেখতে নজরকাড়া। বিয়ের আগে জনে জনে এ কথা সে অনেকবার শুনেছে। অথচ তার বর তো একটিবারও সে কথা মুখ ফুটে বলল না। সে আকুল হয়ে বরের দিকে তাকিয়ে বলে, আমারে কিসু বলবা না?

বর মালাকে ছেড়ে দিয়ে দুহাত মুখের কাছে নিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে আওয়াজ করে জানায় সে কথা বলতে পারে না। হেসে দেয় মালা। সে বুঝতে পারে বর তাকে ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য ইচ্ছে করে এমন মজা করছে। সে বরকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদ করে বলে— ধুর, এমন মজা কইরো না তো। আমার লগে কথা কও।

মালার আহ্লাদী স্বর শুনে করুণ হয়ে ওঠে বরের চোখ। সজোরে মাথা নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করে আবারও বোঝায় সে কথা বলতে পারে না। হাসি হাসি মুখটা ম্লান হয়ে যায় মালার। বরের অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে সত্য কথাই বোঝাতে চাচ্ছে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে তার। নিজের অজান্তেই বরকে জড়িয়ে ধরা হাতটা শিথিল হয়ে পড়ে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, তবু মন এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, তার বাবা মা তাকে বোবা ছেলের সাথেই বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এ বোবা লোকটার সাথে কীভাবে সে পুরোটা জীবন কাটাবে? বর অঙ্গভঙ্গি করে আঁই আঁই শব্দ করে কী যেন বোঝাতে চায়। কিন্তু সেদিকে তাকাবার সমস্ত আগ্রহই হারিয়ে ফেলে অষ্টাদশী মালা। সে মাথা নিচু করে খাটের ওপর বসে থাকে। দু’চোখ ছাপিয়ে লোনাজল গড়িয়ে পড়ে কপোল ছেড়ে চিবুকে। গভীর মমতায় তাকে বুকে চেপে ধরে বর।

সে রাতটাতে কিন্তু মালার শরীরে যৌবনের বান ডেকেছিল। বোবা বর ভেবে যতটা তার মন খারাপ হয়েছিল, ততটা খারাপ পরে আর লাগেনি। আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছিল চব্বিশ বছরের পেশীবহুল জেলে যুবকটি মালার উত্তাল বিস্ফোরিত যৌবনকে। মাস দুয়েক ভালোই কেটেছিল তাদের। গোলমাল বাঁধে মালার বর ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পর। ঘরে কোনো পুরুষমানুষ নেই দেখে মালার শাশুড়ি বাজার সওদা করার জন্য পাশের বাড়ির তমালকে দায়িত্ব দেয়। মালার ননদ সারাদিন টো টো করে পাড়া বেড়ায়, আর শাশুড়ি থাকে নানা কাজে বাইরে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে একুশ বছরের তমাল খুব সহজেই মালাকে ভোলাতে পারে। মালা তখন নরমাংসের স্বাদ পাওয়া ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো। তাই মোম আর আগুন পাশাপাশি থাকলে যা হওয়ার তাই হয়। এক রাতে মালা তমালের সাথে পালায়। তারপর সোজা নারায়ণগঞ্জে। কিছুদিন এক বস্তিতে তারা সংসারও করে। তার আগে অবশ্য এক মন্দিরে গিয়ে তমালের হাতে মালা সিঁদুরও পরে নেয়। আগের স্বামীকে ডিভোর্স দেওয়ার বালাই ওদের সমাজে নেই। তাই এসব তাদের ভাবনাতেও আসে না। তবে এ সংসারও টেকে না মালার। মাস তিনেক একসাথে থাকার পর একদিন তমালই আর বস্তিতে ফিরে আসে না। কয়েকদিন বস্তিতে একা একা ভয়ে ভয়ে কাটে মালার। তারপর এক বিকেলে সে চট্টগ্রামমুখী বাসে উঠে পড়ে।

বিয়ের পাঁচ মাস পর দুই স্বামীর সংসারের পালা চুকিয়ে মালা যখন বাবার ঘরে ফিরে আসে তখন সে অনেকটা আলুথালু। মা-বাবা সব শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর তারা ভেবেছিল মেয়ে হয়তো সুখে সংসার করছে। কিন্তু এরই মধ্যে যে এত কাণ্ড ঘটে গেছে তা তো তাদের ভাবনার বাইরে। এবার তারা একটা মোবাইল ফোনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সে সময় দেশে মোবাইল ফোনের জয়জয়কার। তারা ভাবে, মোবাইল ফোন থাকলে অন্তত মেয়ের খবরটা তো নিয়মিত পেত। কয়েকদিন পর জমানো টাকা দিয়ে তারা সস্তা দামের দুটো মোবাইল ফোন কিনে নেয়। একটি ফোন মালাকে দিয়ে আরেকটি ফোন মালার মা নিজের কাছেই রাখে।

কয়েকদিনের মধ্যেই আশপাশের লোকজনের সহায়তায় মালা ফোনের ব্যবহার শিখে ফেলে। কিন্তু কারও ফোন নম্বর তো তার কাছে নেই, সে কাকে ফোন করবে? প্রতিদিন ফোনটা নিয়ে সে নাড়াচাড়া করে, আর ভাবে কাকে ফোন করবে সে! একদিন আন্দাজেই সে একটা নম্বরে কল করে। ওপাশ থেকে জানতে চায় কে? মালা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, আমি মালা।

ওপাশ থেকে দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে উত্তর আসে— আমার গলার মালা হবেন?

ব্যাস, কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনের জমে যায়। এরপর দশ বারোদিন শুধু কথা আর কথা। মালার মা সব দেখেও না দেখার ভান করে। থাক, মেয়েটার ওপর ধকল গেছে। এখন যদি কারো সাথে কথা বলে ভালো থাকে থাকুক। কিন্তু মেয়েটার নাম তো মালা, তাই সম্পর্কটা শুধু কথাতেই আটকে থাকে না। একদিন ওপাশ থেকে দেখা করার প্রস্তাব আসে। মালা তো তাই চাইছিল। শুধু মেয়ে বলে কথাটা লজ্জায় বলতে পারছিল না। দেখা করার দুদিনের মধ্যেই তারা সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার। এক দুপুরে কালীমন্দিরে গিয়ে আবার তৃতীয় বরের হাতে সিঁদুর পরে নেয় সে। যদিও তৃতীয় বর জানে না যে তার আগে দুজন বর মালার সাথে সংসার করে গেছে। এবার সোজা বরকে নিয়ে বাপের ঘরে ওঠে মালা। তার বাবা-মা মেয়ের প্রতি বিরক্ত হলেও মুখ ফুটে কিছু বলে না। একমাত্র সন্তানের মায়া বড্ড মায়া। তাই মালার একের পর এক সংসার ভাঙা তাদের ভালো না লাগলেও মেয়েটা চোখের সামনে থাকাতে কেমন যেন স্বস্তি পায় ওরা। তাছাড়া যৌতুকবিহীন বিয়ের নামে এবং স্বচ্ছল জীবনের লোভে একটা বোবা ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দেওয়ার অপরাধবোধও তাদের কুঁরে কুঁরে খায়।

তৃতীয় বরকে নিয়ে বাপের বাসায় ভালোই কাটে মালার। বর সেলুনে কাজ করে। আয় রোজগার ভালোই। এরই মধ্যে মালা কেমন যেন কাহিল হয়ে পড়ে। কয়েকদিন বমির জন্য কিছুই খেতে পারে না। অবশেষে মায়ের কথায় বুঝতে পারে, সে মা হতে চলেছে। কেমন এক অজানা আনন্দে সে কেঁপে কেঁপে ওঠে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে আরেক জায়গায়। বংশধর আসছে জেনে মালার তৃতীয় বর গোঁ ধরে তার সন্তান নিজবাড়িতে তার মায়ের কাছে ভূমিষ্ঠ হবে। মালার মা বাবার এতে আপত্তি থাকলেও মেয়েজামাইয়ের জেদের কাছে হার মানে। ছয় মাসের পেট নিয়ে একদিন মালা স্বামীর হাত ধরে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তারপর কী ঘটেছিল সেটা মালা ছাড়া আর কেউ জানে না। একদিন সন্ধ্যায় মালা যখন বাপের ঘরে ফিরে আসে তখন তার উঁচু পেট শীর্ণ হয়ে শরীরের ভেতর লুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে গাঢ় কালি। মেয়েকে এ অবস্থায় দেখে মা তো কেঁদে আকুল। বার বার জিজ্ঞেস করছিল, কী রে তোর বাচ্চা কই? জামাই কই?

কোনো উত্তর দিতে পারেনি মালা সেসময়। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারিয়েছিল সে। বেশ কিছুদিন ধরে মালার ফোনটা বন্ধ পাচ্ছিল বাবা-মা। জামাইয়ের ফোনে অবশ্য খবর নেওয়া যেত। তবে প্রায় সময় জামাই বলত সে বাইরে আছে। তাই প্রাণ খুলে কখনো কথা বলা হতো না। মেয়ে কেমন হুঁ হাঁ করে রেখে দিত ফোন। কিন্তু মেয়ের পেট তো খালি, তাহলে বাচ্চাটা গেল কই? কয়েকদিন পরে সুস্থ হলে মালা জানায়, মরা বাচ্চা প্রসব করার কারণে তাকে রাক্ষসী অপবাদ দিয়ে বেদম পিটিয়েছে শাশুড়ি। স্বামীর সামনে এ ঘটনা ঘটলেও স্বামী কিছু বলেনি। তাই সে ও বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। হতাশায়, দুঃখে আর কিছু বলার থাকে না মালার মায়ের। শুধু বলে, বিয়ার আর নাম নিস না ঝি। সংসার তোর কপালে নাই। তুই এবার চাকরি কর। গার্মেন্টসে ঢুক।

 

মাসখানেক পর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে সত্যি সত্যি গার্মেন্টসে ঢুকেছিল সে। ছয় সাত মাস মুখ বু্জে চাকরিও করেছে। তারপর আবার সেই পুরোনো ইতিহাস। মালা আবার তার এক সহকর্মীর প্রেমে পড়ে। এবার আর মা-বাবাকে জানানোর ইচ্ছে হয়নি। এক শুক্রবারে ওভারটাইম আছে বলে মালা বেরিয়ে যায়। সেদিন আর ঘরে ফেরেনি সে। রাতে শুধু মাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল সে আবার বিয়ে করেছে। তারা নতুন বাসা নিয়েছে সরাইপাড়ায়। কিছুটা উদ্বিগ্ন হলেও মনে মনে মা খুশিই হয়েছিল। যাক, মেয়ের এ সংসারটা যেন অন্তত টেকে। টেলিফোনে প্রায় প্রতিরাতেই মায়ের সাথে কথা বলত সে। বলত, ভালো আছে।

কিন্তু আজ তো আবার ফিরে এল মেয়ে। কী ঘটেছিল এবার? কেন মেয়েটার সংসার হয় না? মালার মায়ের মাথায় যেন একটা মাছি ঢুকে পড়েছে। শুধু ভোঁ ভোঁ আওয়াজ। সবকিছু খুব জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মেয়েটা তো এসেই গোগ্রাসে দুটো খেয়ে বেহুঁশের মতো ঘুমোচ্ছে। কখন উঠবে সে? মালার মা অস্থির উন্মাদনায় সারা ঘরময় পায়চারি করে। একবার ভাবে, মালার বাবাকে কি ডেকে আনবে! যেভাবেই হোক আজ জানতেই হবে মালা কেন বারবার স্বামীর ঘর থেকে পালায়। কেন তার মনটা এমন ফেরারি! কোথায় তার অতৃপ্তি! কোথায় তার শূন্যতা! ভাবতে ভাবতে মালার মা তার স্বামীকে ডেকে আনার উদ্দেশ্যে বাইরের দিকে পা বাড়ায়।

 

Read Previous

মুদ্রিত দুঃখের ধারাপাতে

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৫ম সংখ্যা (অক্টোবর-২০২৩)

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *