অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

স্বাতী চৌধুরী -
সুড়ঙ্গ শেষের অরুণোদয় কিংবা মরীচিকার বিভ্রম

একটা ছোট গলি। এই গলিতেই কোনো একটা খুপরিতে বাস করে আলোকলতা। যদিও সে জানে না এই গলির শেষ আর শুরু কোনখান থেকে। গত তিন বছর ধরে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য একটা নীরব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আলোকলতা। কিন্তু কোনদিন যে এখান থেকে বের হতে পারবে তার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না। তবু কেন যেন সে হাল ছেড়ে দিতে চায় না। একদিন এখান থেকে ঠিক বেরিয়ে যাবে এই স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন সে তার খুপরি থেকে বেরিয়ে নিজস্ব বুদ্ধির সামর্থ্য অনুযায়ী ইতিউতি ঘুরে বেড়ায় যদি কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যায়। তার বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই যার সাথে দেখা হয় সে প্রতিবেশী ফুলবানু। ফুলবানু তখন ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে ছোট আয়নায় একদৃষ্টে চেয়ে এক ঠোঁটের রঙে অন্য ঠোঁট রাঙানোর কসরত করতে করতে মুখ টিপে হাসে আর বলে, ‘আলোকলতা লো, খামোকাই চেষ্টা করস! কইসি না এই চোরাগলিতে ঢুকনের রাস্তা আছে, বাইর অওনের রাস্তা নাই।’

ফুলবানুর মুখটেপা হাসিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আলোকলতা আজও পথে বের হয়। সে হাঁটতে থাকে। হাঁটতেই থাকে। হঠাৎ সে টের পায় এই চোরাগলির ভেতরে না দিন না রাত অবস্থার মাঝে অন্ধকার যেন আরও প্রগাঢ় হয়ে নামছে। অথচ একটু আগে আলোকলতা যখন ঘর থেকে বের হয় তখন ঘড়িতে দেখেছে দুপুর একটা ছিল। তবে এ কোন ভোজবাজির কারবারে দিনদুপুরটা এখন রাতদুপুর হয়ে গেল? রাত মানেই তো কালো। নিকষ কালো অন্ধকার। আর অন্ধকার মানেই হারিয়ে যাওয়া। যেমন করে একদিন বিকেলে তার প্রিয়তমের সাথে দেখা করার নিমিত্ত নিরাপদ ঘর ছেড়ে পথে নামলে সহসা কোথা থেকে অন্ধকার ঘনিয়ে এসে বেপথু হয়ে হারিয়ে গিয়ে এই চোরাগলিতে এসে ঠেকেছিল জীবন। তাই সে এখন বুঝে হারিয়ে যাওয়া মানেই জীবন থেকে ছিটকে যাওয়া। অবশ্য এখন আর জীবনের আছেইবা কী? না হয় এক চোরাগলি থেকে আরেক চোরাগলিতে ঢুকবে। ফুলবানু খুব রসিক। এ জীবনকে মেনে নিয়ে সে প্রতিটি মুহূর্তকে রসিকতা দিয়ে ভরিয়ে রাখে।

সেদিন হাসতে হাসতে বলল, ‘এই গলির নাম চোরাগলি কেন হইল জানিস? জানিস না তো? তবে শোন। এইখানে দিনে রেইতে চোরাদের রাজত্ব চলে তাই এর নাম হইল চোরাগলি। আরে এইখানে যারা আয় তারা বড় বড় চোর।’

চোর!

আলোকলতার প্রশ্নে সে বলে, ‘চোরই তো এরা! সমাজ সংসারটারে ফাঁকি দিয়া এইখানে যারা আয় তারা চোর না তো কি? এই চোরারা এইখানে আয় বুইলেই না এরা এর নাম চোরাগলি দিসে। বুঝছিস?’

ফুলবানুর কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই হাঁটতে হাঁটতে একটা অশরীরী ভয় তাকে বিচলিত করে। তবু সে হাঁটতে থাকে। কিন্তু এখন কোন দিকে যাবে সে। হঠাৎ আলোকলতা থমকে দাঁড়ায়। সামনে না পেছনে, ডানে না বামে কোথায় সে দাঁড়িয়ে আছে ঠাহর করতে পারে না। একজন কাল বলেছিল তার ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম হাঁটলেই যে নাগেশ্বর গাছটা আছে তার বামদিকে আরও কয়েক কদম এগিয়ে তারপর কিছুটা পথ হাঁটলেই গলিটা ডানদিকে বাঁক নিয়ে যে দিকে গেছে তার থেকে গুনে গুনে তিন তিরিশে নব্বই কদম গেলেই আরেকটা আরও সরু গলি। সে গলিতে ঢুকলে একটা আলোর সুড়ঙ্গ দেখা যাবে। সেই সুড়ঙ্গকে ডানে রেখে বরাবর কিছুদূর হেঁটে গেলে বাম দিকে আরও একটা আলোর সুড়ঙ্গ দেখা যাবে। আর সেই সুড়ঙ্গের ডানদিকে একটু দূরে একটা কুকুর বসে থাকে। কুকুরটা সারাক্ষণ ঘেউ ঘেউ না করে চুপ করে বসে থাকে। কেউ তাকে অতিক্রম করতে চাইলেই কেবল ঘেউ ঘেউ করে। তবে সকলকে দেখলেই সে যে তা করে তাও নয়। কাউকে কাউকে সে ছেড়েও দেয়। এখন সেই কাউকে যদি ঐ কুকুরটা ছেড়ে দেয় তো আলোর এই সুড়ঙ্গকে এবার বামে রেখে বরাবর হেঁটে যেতে হবে আরও পাঁচশ কদম। তখন আরও একটু বড় আলোকরেখা দেখা যাবে। আলোকরেখাটার গোড়াতেই বসে থাকবে আরও একটা কুকুর। তার চোখ-জোড়া সবুজ আর তীক্ষ্ণ। সে কোনো শব্দই করে না। ব্যাটা চব্বিশ ঘণ্টায় একটু ঝিমায়ও না। কিন্তু যখনি তুমি তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইবে সে তার দুই থাবা দিয়ে হামলে পড়বে। কিন্তু তুমি যদি সেখানে গিয়ে তার সামনে নতজানু হও সে তোমাকে ছেড়ে দিলেও দিতে পারে।

তারপরই কি রাজপথ? ঝলমলে দিনের শুরু? আরে না, অত সহজও কি হয়? তা যদি হতো তবে কি এর নাম আর চোরাগলি হতো? শোন একটা কথা, ঐ চব্বিশ ঘণ্টার অতন্দ্র প্রহরী কুকুরটা যদি তোমাকে ছেড়ে দেয় তবে তুমি আর পেছন ফিরে তাকাবে না। যদি তাকাও তাহলেই হয়েছে। পথের এই দিশা তুমি হারিয়ে ফেলবে। দেখবে তুমি একটা চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছ এবং এই চৌরাস্তার প্রতিটি মোড় একই রকম। তখন গোলকধাঁধায় চক্কর কাটতে কাটতে তোমার রাত ভোর হয়ে যাবে। তবু বের হবে তো দূরের কথা, তোমার এই খুপড়ির পথও হারিয়ে ফেলবে তুমি।

আলোকলতা এখন সেই চৌরাস্তার মোড়ে। এত ভয়ংকর খুনি চোখের কুকুরটি তাকে ছেড়ে দিল ভেবে সে বিস্ময়ে আবার তাকে দেখতে পছন ফিরে তাকিয়েছিল। তারপর আবার যখন সামনে ঘুরল সেই লোকটির কথামতো সে দেখে সত্যি চার চারটা রাস্তার মিলন মোহনা। এবার কোন দিকে গেলে সঠিক পথের নিশানা পাবে সে, একথা জিজ্ঞাসা করার মতো এমন একটা মানুষ সামনে পেছনে ডানে বামে তাকিয়েও খুঁজে পেল না। তখন যা আছে কপালে বলে আলোকলতা নিজেই একটা পথ বেছে নেয়। বেছে নিয়ে সে আবার হাঁটা শুরু করে কিন্তু এই পথের শেষ কোথায়? সেই কখন থেকে সে হাঁটছেই। এক পথ আরেক পথের দিকে নিয়ে যাচ্ছে নাকি সে একই পথে ঘুরপাক খাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। সত্যিই কি সে গোলকধাঁধায় পড়ে গেল? হঠাৎ একটা বাড়ির ভেতর থেকে একটা আলোর রেখা দেখা গেল আর আলোর উৎস থেকেই যেন একটি সুরেলা আওয়াজ এই ঘুরপথের মাঝখানেই ভেসে বেড়াতে লাগল। ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় কাতর ছিল আলোকলতা। সে আলোর উৎস ধরে একটি ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। টোকা দিতেই আপনি খুলে যায় সে দরজা। একটা খুপড়ি ঘর তার ঘরের মতই তবে আর একটু বড়। তার একধারে মাটিতে তোশকের বিছানায় দুটো শিশু ঘুমিয়ে আছে। ফাঁকা জায়গাটাতে ক্ষীণ মোমবাতির আলোয় কয়েকজন বিভিন্ন বয়সী নারী আর একজন তারই মতো তন্বী মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে খমক, দোতারা আর করতালি বাজিয়ে গান করছে। অন্তহীন অন্ধকারে ঘুরাঘুরির পর এই আলোটুকু তার চোখে আরাম দিল। শেষমেশ ক্লান্ত পা দুটো আর ধরে রাখতে না পেরে সে বসে পড়ল তাদের পাশে। তার এই আচমকা ও অনাহূত প্রবেশের পর গান থেমে গেল। মধ্যবয়সীদের মধ্যে সবচে বয়স্কজন বলল, ‘তুমি কে গো? এখানে কেন এসেছ? কোথা থেকে এসেছ?’

আলোকলতার গলা এমন শুকিয়ে উঠছে যে সে কথা বলতে পরছিল না। শুধু বলল, ‘একটু পানি খাব।’

তন্বী মেয়েটি এক গ্লাস পানি এনে দিল।

‘নাও পানি খাও। তারপর প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।’

আলোকলতা পানি পিয়ে একটু শান্তি অনুভব করে। বলে, ‘আমি এই দিকের কোনো একটা গলিতে থাকি আজ তিন বছর হলো। এখানে আমি নিজের ইচ্ছায় আসিনি। কেউ আমাকে পথ ভুলিয়ে এখানে এনে ফেলে গেছে। অনেকদিন পরে বুঝছি আমি এখানে বিক্রি হয়ে গেছি। অনেকদিন ধরে এখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁছছিলাম। একজন পথ বাতলে দিয়েছিল তাও কিছুদিন হলো। তারপর থেকে রোজ পথের দিশা খুঁজি। কিন্তু পাইনি। আজও বের হয়েছিলাম। ফুলবানু বলেছে, এখানের প্রবেশের পথ আছে বের হওয়ার পথ নেই। সেটা অবশ্য আমিও জানতাম। তবু চেষ্টা করে যাচ্ছি। আজও এখান থেকে চলে যাব বলে বেরিয়েছিলাম। লোকটি বলে দিয়েছিল কোন পথ থেকে কোন পথে যাব। কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলেছি। সেই দুপুর থেকে হাঁটছি তো হাঁটছি এখন খুব ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত আমি। তোমাদের ঘরে আলো দেখে অনুমতি ছাড়াই ঢুকে পড়লাম। ভুল হলে মাফ করে দিও। তাও বলব, আমায় একটু আশ্রয় দাও তোমরা। আর সকাল হলে শুধু আলোর জগতে ফিরে যাওয়ার রাস্তাটা দেখিয়ে দিও।’

মধ্যবয়স্ক কর্ত্রী মতন নারী মুখ টিপে হাসলেন শুধু। এই হাসিমুখ নিয়েই সেই তন্বীকে তিনি আদেশ দিলেন, ‘ঘরে খাবার যা কিছু আছে ওকে এনে দাও তো মনি। ও অনেকক্ষণ কিছু খায়নি। একদম নেতিয়ে গেছে গো।’ মনি বলে যাকে সম্বোধন করা হলো সে এবার ঘরের কোণে রাখা হাঁড়িকুড়ি ঘেটে একটু ডালভাত আর একটা বাটিতে একটু দুধ-কলা এনে আলোকলতার সামনে রাখল।

‘নাও, খাও। তোমার খাওয়া হলে আমরা আবার গাইব।’

এদের কথা, আচরণ ও আদর আপ্যায়নে আলোকলতা অভিভূত হয়ে চেয়ে রইল। তার মনে পড়ল মানুষ যে মানুষকে এভাবে আদর আপ্যায়ন করে তা এই ক’বছরে সে ভুলেই গেছিল। মনে হলো এরা যেন তার নিজের কেউ। অথচ মূহূর্তের আগেও এদেরকে সে চিনত না। এখনো চেনে না এরা কে কিংবা এরাও চেনে না সেইবা কে। এখন তার মনে পড়ল তিন বছর আগে আজকের এই জীবনের বাইরে তার একটা জীবন ছিল যেখানে তাকে অনেকেই এমন আদর করত। তার চোখ জলে ভরে গেল। জল ছলছল চোখে সে বয়সী নারীর দিকে চেয়ে রইল। তিনি তার পিঠে হাত রাখলেন। সেই স্পর্শ যেন কথা বলে উঠল।

বুঝেছি। সব জানি। তাও তোমার কথা শুনব। তবে পরে। এখন খাও।

আলোকলতার খাওয়া শেষ হলে দ্বিতীয় মধ্যবয়সী নারী একতারা হাতে গান ধরল। আরেকজন খমক আর তরুণীটি মন্দিরা বাজাতে লাগল।

‘আমি বারে বারে করি মানা, কালার সনে প্রেম কইরো না, আগে কি মনে ছিল না…’ এমন গান আলোকলতা আগে শোনেনি। যেমন গান, তেমন সুর গায়িকার। তার সুর এই খুপড়ি ঘরের দেয়াল ছাদ ফুড়ে এই চোরাগলির চোরা পথঘাট মাড়িয়ে ভদ্রলোকের পাড়ার বহুতল ভবনের ছাদ ছাড়িয়ে যেন সাত আসমান ছুঁতে চলেছে। গানের প্রত্যেকটি শব্দ আর বিশেষ করে সুর যেন আলোকলতার মর্মকেও ভেদ করল। তাই তো। যদি সে প্রেম না করত, তবে তো অন্ধকারের পথে বের হতো না সেদিন। ভাবতে গিয়ে তার চোখ জলে ভরে যায়। মনও যেন ভিজে যায়। আর শুধু তাই নয় সে চেয়ে দেখল, এঘরের কর্ত্রীরও চোখ ভিজে উঠেছে। একপর্যায়ে তিনিত হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগলেন। আর সেই সুকণ্ঠী গায়িকা একটার পর একটা গান গেয়েই চলেছে। গান শুনতে শুনতে আলোকলতার ভেতরটাও এলোমেলো হয়ে গেল। গানের কথা ও সুর তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল অতীতে। তার দাদুরও এমন একটা গানের আসর ছিল। দাদুর বন্ধুরা তাদের বাংলাঘরের মেঝেতে চাটাই পেতে গোল হয়ে বসত। মাঝখানে গাঞ্জার কলকি। ছিলিমের পর ছিলিম গাঞ্জা বানিয়ে চলেছে দাদুর কমবয়সী বন্ধু তোতা। তার মুখে কোনো শব্দ নেই। অন্যরা কথা বলে, হাসে, গান গায় আর গাঞ্জার কলকি ঘুরে ঘুরে একজন থেকে আরেকজনের হাতে আসে। প্রথমে এক দম তারপর দুই দম তিন দম টেনে টেনে একজন আরেকজনের হাতে দেয়। সুখরঞ্জন দাদু একটু ভাঙা ভাঙা মিঠা করুণ সুরে গায়—

চিন্তা হইতে চিতা ভালো,

চিতায় মরা মানুষ পুড়ে,

ওগো জীয়ন্তে পোড়াইয়া মারে,

চিন্তায় যারে ধরে গো সই,

তোরা বইলা দে আমারে—

গাঞ্জার কলকিতে দম দেয়ার অবসরে অন্যরাও ধুয়া দেয় আর এই সুযোগে সুখরঞ্জন দাদুও দুইদম টেনে নেয়। এভাবে গান আর গাঞ্জা নিয়ে এরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকত। দাদুর ফাই-ফরমাশ খাটতে গিয়ে অনেকদিন সে তাদের গান শুনেছে। মাঝে মাঝে বাংলাঘরের বারান্দার এক কোণে বসে থেকে তাদের কাণ্ডকীর্তি দেখত সে। তার খুব ভালো লাগত সে আসর। সবচে ভালো লাগত সুখরঞ্জনের গান আর মরম আলী দাদার দুলুনি। গানের তালে তালে মরম আলী দাদার ভূড়িটাও দুলত। দেখে দেখে একসময় তার চোখেও ঢুলুনি এসে গেলে বড় ঘরে এসে জেঠিমার বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। তার নিঃসন্তান জেঠিমার কোলে তাদের সকল ভাইবোনের ছিল নিরাপদ আস্তানা।

‘কী গো মেয়ে? কী হলো? কোন ভাবে বিভোর হয়েছ তুমি? গান ভালো লাগে?’

এ্যা?

সম্বিত ফেরে আলোকলতার।

‘হ্যাঁ খুব ভালো লাগে। তা তোমরা বেশ আছ মাসী। এখানে রাতভর শুধুই গান হয় বুঝি?’

‘হ্যাঁ গো মেয়ে এখানে কেবল গানই হয়। এখানে তারাই আসে যাদের গান ভালো লাগে। আর গান শুনে খুশি হয়ে তারা আমাদের যা টাকা দেয় তাও আমরা খুশি হয়ে নিই। তা দিয়েই আমরা কোনোরকমে দিনপাত করছি। ঐ যে খেলে একটু ডালভাত। তোমার ভাগ্য ভালো। যেন একটু দুধকলাও ছিল আজ। না রে মনি?’

মনি কোনো জবাব দেয় না। সে জানে এসব কথার উত্তর দিতে হয় না।

‘কিন্তু আজ কেউ যে এল না?’ আলোকলতা একটু বিস্ময় নিয়েই যেন প্রশ্ন করে।

‘আসেনি। হয়তো আসার সুযোগ হয়নি। এমন হয় মাঝে মাঝে। কোনো কোনোদিন কেউ এখানে আসে না।’

আলোকলতার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। সে মনে মনে ভাবে এরকম হয় নাকি? এই পাড়ায় পুরুষের দল কেবল গান শুনতে আসে?

‘আমরা বেশ্যা নই, আলোকলতা। আমরা বেশ্যা হলে এখানে আমাদের কাছে যারা আসে, তারাও বেশ্যা। তবে এখানেও পার্থক্য আছে। আমাদের বেশ্যা বানানো হয়। কোনো মেয়ে শখ করে ছিনালিপনা করে না। বাধ্য হয়ে এখানকার মেয়েরা তাদের শরীর বেচলেও মন বেচে দেয় না কিন্তু এখানে যারা আসে সেই পুরুষ বেশ্যারা শখ করে আসে। ওদের দেহমন দুটোই নষ্ট বলে তারা এখানে আসে। এরা নিজেরা প্রতিমুহূর্তে নিজের মন, নিজের আত্মা লোভের কাছে, লালসার কাছে বিকিয়ে দেয়। এরা লোভের দাস। এদের সবাই কিনতে পারে। এমনকি এখানকার মেয়েরাও।’

আলোকলতার মনের ভাব বুঝতে পেরে তিনি কথাগুলো বলেন। একটু থেমে আবার বলেন, ‘হ্যাঁ গো মেয়ে জানো, তোমার মতো আমাকেও ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে একদিন একজন এখানে এনে বেচে দিয়েছিল! সর্দারনির পায়ে পড়ে অনেক কেঁদেছি। সে মাফ করেনি। কী করে করবে? এই সর্দারনি তো আর শুরু থেকেই সর্দারনি ছিল না। আমার মতো, তোমার মতো, তাকেও কেউ বিক্রি করে দিয়েছিল যে। নিপীড়ন সইতে সইতে সে তার ভেতরের সকল কোমলতা হারিয়ে ফেলেছিল। হয়ে উঠেছিল নিপীড়নকারী ও ব্যবসায়ী। তার মতো কোমলতা হারিয়ে ফেললে আমিও হয়তো এতদিনে তারমতো সর্দারনী হয়ে যেতাম। কিন্তু সকলে তো আর একরকম হয় না। আমারও সেটা নিয়তি ছিল না। আমার নিয়তি আমি তৈরি করেছি। আমি আমার ভেতরের সুরধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম আর ফল্গুনদীর মতো শত অত্যাচার শোষণের পরও সেটা উৎসারিত ছিল। তাই তো এই মহল্লার মালিক সর্দার, সর্দারনি বছরের পর বছর আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার দেহকে খাটানোর পরও আমি মরে যাইনি। আমি প্রেম ভালোবাসা ভুলে যাইনি। আমিও তোর মতো প্রাণপণে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার স্বপ্নকে লালন করে চলেছিলাম। সেই সময় একদিন এখানে এমন একজন আসে যে জীবনের বহু ঘাটের পানি খেয়ে, পোড় খেয়ে খেয়ে বিবাগী হয়ে গেছিল। কী মনে করে সে নাকি আসে এইখানে। তারপর সারারাত আমার মুখোমুখি বসে শোনাল সে তার দুঃখের কথা। তার পরদিনও আবার এলো সে। শোনাল একটি কবিতা।

‘থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

বলেছিল, ‘তুমি আমার বনলতা সেন। দুদণ্ডের শান্তির জন্য এই অন্ধকারে তোমার মুখোমুখি বসে থাকব বলে আমি রোজ আসব। কিন্তু তোমার এখানে আর কাউকে এলাউ করবে না।’

হায় আমার কপাল! আর কাউকে এলাউ করব কী করে গো? তার আবির্ভাবে যে আমার ঘরে ভালোবাসার আলো ঝলমল হাজার বাতি জ্বলে ওঠে। হাজার বছর পরে তার মতো যে আমিও দুদণ্ড শান্তি পেলাম। সেখানে আর কাউকে এলাউ করি— এমন ইচ্ছা যেন না হয় আমার। সে প্রায় রোজই আসত। আমরা অন্ধকারে মুখোমুখি বসে থাকতাম। সে কবিতা শোনাত। মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। একদিন গুনগুন করে গান গেয়েছিলাম— মিলন হবে কতদিনে, আমার মনের মানুষের সনে…। সে গোল গোল বড় বড় চোখে নতুন করে আমাকে দেখতে লাগল। তার চোখে অসীম মুগ্ধতা। কিন্তু মুখে সেসব কিছু না বলে অন্য কথা বলল। বলল, ‘মনের মানুষের সাথে মিলন কখনো হয় না গো। হবে কী করে বলো? মনের মানুষকেই খুঁজে পাওয়া না। গেলেও কার সাথে মিলন হবে? মনের মানুষকে খুঁজতে খুঁজতেই যে সারাটা জীবন ফুরিয়ে যায়। তাই এই আক্ষেপ। এই আক্ষেপের সুর নিয়ে বেলা কাটিয়ে দেওয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কবিতা খুব প্রিয় ছিল আমার। ‘বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যথা।’ বুজলে ব্যথাও কখনো সুখের হয়। না, ঠিক সুখের না, সুখের মতো। এই সুখের মতো ব্যথায় প্রশান্তি আছে। মনের মানুষের সনে মিলন হয় না বলে যে চোখের ভেতর যমুনার জল উজান বয়ে যায় সেই চোখের জলেই প্রশান্তি। যাদের অন্তরে প্রেম আছে, প্রেমের আকুতি আছে তাদের চোখেই যমুনা বয়ে যায়।’

‘জানো আলোকলতা’, অতীত ভ্রমণ করে মধ্যবয়সী নিরঞ্জনা বলেন, ‘তারপর থেকে আমার চোখ খুলে গেল—জীবনকে এতদিন যে চোখে দেখেছি সে দেখার চোখটাই বদলে গেল! মনে হলো নারীর জীবনে এই নিষিদ্ধ পল্লী বলো আর ঘরসংসার বলো সবটাই গোলকধাঁধা। এখানে প্রবেশের পথ আছে প্রস্থানের পথ নেই। আছে যেটা সে শুধু মৃত্যু, মহাপ্রস্থান। আর সংসার বা গৃহ সেটা কি নারীর কখনো ছিল? কখনো থাকে? আসলে নারীর জীবনে বিবাহ পরবর্তী ঘর আর এই পল্লীর ঘরে কি আদৌ কোনো তফাৎ আছে? হ্যাঁ বলতে পারো খুব ছোট একটা অংশের নারীজীবনে এর ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু ব্যতিক্রমী জীবন তো বিরাট গোষ্ঠীজীবনে কোনো আলো ফেলে না। কেউ কেউ অনুপ্রাণিত হতে পারে তবে তারাও ব্যতিক্রমই হয়। যাক গে।’ নিরঞ্জনা একটু থামেন। কিছু ভেবে চলেন। তার সঙ্গী গায়িকা ও কন্যাসম তরুণীও স্তব্ধ হয়ে শুনছিল এতক্ষণ। এত কথা তাদেরও জানা ছিল না তো! তারা ভাবছে অনাহুত আগন্তুক মেয়েটি কোন ভোজবাজিতে নিরঞ্জনার অতীতের অর্গল খুলে দিল?

অল্প বয়সের আবেগে প্রতারণাকে প্রেম ভেবে বাপের ঘর ছেড়েছিলেন নিরঞ্জনা। প্রতারক তাকে নিয়ে একটা মিছে খেলাঘর বেঁধেছিল। তারপর একদিন সন্ধ্যায় সে আর ঘরে ফেরেনি। কিশোরী নিরঞ্জনা বিরহ মোচন করতে সারাদিনমান শুধু স্কুলজীবনে শেখা ‘পাখি কইও বন্ধুয়ার লাগাল পাইলে…’ গানটি গায়। একরাতে সে ঘরে অন্য একজন আসে। সে তাকে দলিত মথিত চূর্ণিত করে অবশ দেহটা এখানে এনে ফেলে যায়। যাওয়ার আগে বলে যায়, যাকে সে মনের মানুষ ভেবেছিল সেইই তাকে তার কাছে বিক্রি করে গেছে এখন অন্য পাখির খোঁজে। আর এখন সেও তাকে এখানে বেচে দিয়ে গেল।

সেই ভাবের মানুষ পাগলা দাশু, হ্যাঁ নিজেকে সে ঐ নামেই পরিচয় দিয়েছিল আর এই নিরঞ্জনা নামটাও তারই দেওয়া। তা পাগলা দাশুই আমাকে বুঝিয়ে দিল আফসোস করার কিছুই নেই। কারণ এই চোরাগলির বাইরেও যে নারীর জীবন তার বাইরেরটাই শুধু ঐ বাইরের রাস্তাঘাটের মতোই ঝলমলে। ভেতরে সেই অন্ধকার যা কেউ দেখে না। কিন্তু যারা সেখানে থাকে সেই নারীগুলো সারাটা জীবন ঐ অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে আলো কেমন বস্তু সেটাই জানে না।

তফাতের কথা বলছিলাম না? তফাত শুধু এই যে এখানে তুমি প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছ আর সেখানে ব্রিটিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। তবু পাগলা দাশু আমাকে এখান থেকে বের করতে চেয়েছিল। তুমি যে আলোর সুড়ঙ্গগুলো দেখে দেখে এসেছ সেসব আলো নয় আলেয়া। আমিও সেই সুড়ঙ্গ দেখে মরীচিকার পেছনে ছুটেছিলাম। পথ খুঁজে পাইনি। আর প্রত্যেকটা সুড়ঙ্গের মুখে পাহারাদারগুলো যে বসে আছে সে আ্যালসেসিয়ান, দেশি বা সরাইল্যা প্রজাতির তাদের অতিক্রম করে পাগলা দাশুর সহায়তায় আমি সূর্যের নিচে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু এ চোরাগলিতে যেসব চোর আসে সেখানেও তো তাদেরই সাম্রাজ্য। ওরা একশ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে আমাদের তিষ্টোতে দেয়নি সেখানে। ফিরে আসতে হলো এই এখানেই আবার। দাশু বলেছিল ভদ্রপল্লিতে সেই যে বাঁধা জীবন তুমি তো সেই একক বাঁধা জীবনেই ফিরতে চেয়েছিলে? এমনকি তোমার স্রষ্টারা তোমার রক্ত সম্পর্কীয়রাও তোমাকে জায়গা দেয়নি। এখানেই থাকো তবে। শোন এই খুপড়ি তোমার রাজত্ব। এখানে তুমিই অধিশ্বরী। কেউ আসবে না এখানে। এমনকি অন্ধকারে মুখোমুখি একটু বসার জন্য আমিও যদি আসি আর তোমার ইচ্ছে না হয় খুলবে না দরজা।

নিরঞ্জনার চোখ ছলছল করে। আবার থেমে যান কিছুক্ষণের জন্য। মনে হয় তিনি আবার ফেলে আসা দিনে পরিভ্রমণ করেন। তারপর আবার শুরু করেন।

‘পাগলা দাশু কী করে যে এসব করেছিল আমি জানি না। তবে শুনেছি মহল্লার সর্দারদের এককালীন অনেক টাকা দিয়ে কী একটা চুক্তিনামা করেছিল। সেই চুক্তিনামা আমার কাছে দিয়ে বলেছিল যদি কখনো তোমার দরজায় এসে কেউ টোকা দেয় তবে এইটার বলে তুমি লড়াই করতে পারবে। কিন্তু আমি কখনো সেই চুক্তিপত্র খুলেও দেখিনি। এই রজকিনী, তখন ওর তোমার মতো বয়স; আর এই মনি এতটুকু মেয়ে, এদেরকেও একদিন এখানে এনে দিয়েছিল সে। এরা জানে না কিছুই। সেই থেকে এরাও আছে এখানে। কিন্তু পাগলা দাশু চলে গেছে অনন্তের পথে। সেও কতদিন হয়ে গেল। মনের খিদে জুড়াতে আমরা গান গাই। এখানে আসা কিছু কিছু চোরেদেরও বুঝি মনের খিদে অপূর্ণ থেকে যায়। আমরা যখন গান গাই ওরা আসে। আমরা গান বেচি আর তাই দিয়ে পেটের খিদে মেটাই।’

নিরঞ্জনার কথা থেমে গেছে অনেকক্ষণ। পাখপাখলির সমবেত কলধ্বনি জানান দিল রাত ভোর হয়ে গেছে। সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। সকলের শরীর মন বিবশ এখন।

নিরঞ্জনা নীরবতা ভেঙে বলেন, ‘ভোর হয়েছে আলোকলতা। এত ভোরে কেউ তেমন ওঠে না। পালিয়ে যাওয়ার জন্য এখন হয়তো সুযোগ পেলেও পাওয়া যেতে পারে। যাবে তুমি? কিন্তু বলেছিলে যে আলোর রাস্তা দেখিয়ে দিতে, সেটা তো আমিও জানি না। যদি জানতাম তবে কি আমরা এখানে পড়ে থাকতাম?’

বিহ্বল হয়ে নিরঞ্জনার চোখে চোখ রেখে চেয়ে থাকে আলোকলতা। বিহ্বলতা কাটিয়ে বলে, আমি সত্যি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে চাই, মাসি। আমাকে একটু সাহায্য করো।’

নিরঞ্জনা দেখেন মেয়েটি সত্যি মরিয়া হয়ে উঠেছে। তিনি আবার বলেন, ‘আমরাও পথ চিনি না বললাম তো। তবু তুমি যেতে চাও তো? ঠিক আছে চলো। দেখি চেষ্টা করে।’

‘কিন্তু কোথায় যাবে তুমি?’ সেই সুকণ্ঠী গায়িকা এবার কথা বলে— ‘ফেলে আসা প্রিয়জনদের কাছে? আমরাও গিয়েছিলাম আলোকলতা। তারা তাদের মনের ঘরে বাইরের ঘরে সবখানে এমন তালা লাগিয়েছে সে তালা হাতুড়ি শাবল পিটিয়েও তুমি খুলতে পারবে না।’

নিরঞ্জনা বলেন, ‘থাক— ওকে আর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। দেখি ওকে বের করে দেওয়া যায় কিনা। চেষ্টা করে দেখুক না তার পুরোনো ঘরের বন্ধ কপাট খুলে যেতেও তো পারে! চল আলোকলতা।’

নিরঞ্জনার হাত ধরে আলোকলতা এগিয়ে যায় যেদিক থেকে ভোরের অরুণ আলোর একটা ক্ষীণ রেখা দেখা যায় সেই দিকে।

 

Read Previous

মুদ্রিত দুঃখের ধারাপাতে

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৫ম সংখ্যা (অক্টোবর-২০২৩)

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *