অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আমিনুল ইসলাম সেলিম -
আবু রায়হানের অসমাপ্ত গল্প

আবু রায়হান টেবিল সামনে নিয়ে বসে আছেন আড়াই ঘণ্টা হলো। রাত তিনটা বাজতে চলেছে। মাথার ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গল্পগুলোর কয়েকটি চরিত্র খুব জ্বালাচ্ছে, ঘুমুতেই দিচ্ছে না তাকে। শুধু ঘুম? খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম— কিছুই ঠিকমতো হচ্ছে না। গতকাল ফারজানা এ নিয়ে অনেক কথা শুনিয়েছেন। কেঁদেকেটে গাল ভাসিয়ে দিয়েছেন। চেহারায় তেমন ভাবান্তর না-দেখালেও মনে মনে আপ্লুত হয়েছেন রায়হান। বউয়ের এই দরদি আবেদন ভালো লাগে তার। গলার কাঁদো কাঁদো স্বরটাও।

সন্ধ্যায় একটা মৃদু ঝড় সামলাতে হয়েছে তাকে। ‘বদ লেখক’ বলে একটা গালিও হজম করতে হয়েছে। অবশ্য এর পক্ষে ফারজানার স্পষ্ট অভিযোগ আছে। জগতের অধিকাংশ লেখক স্ত্রীদের শত্রু বানিয়ে রাখেন এবং আড়ালে বদনাম করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রায়হান একটা অদ্ভুত কাণ্ড করেছেন। ফারজানা গটগট করতে করতে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে রায়হান খেয়াল করলেন, কোমল আলোকরশ্মির মতো একটা গোপন অথচ চকচকে মুচকি হাসি ফারজানার মুখে লেগে আছে। ফারজানাকে খুশি করা গেছে, ভাবতে ভাবতে তিনি নিজের টেবিলে গিয়ে বসেন। তার মনটা তখন থেকেই ভালো। লেখার টেবিলে বসেছিলেন। তখন বিকেল। ফারজানা এক কাপ চা-ও বানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। চা খেলেন। ভাবলেন। কিন্তু কিছুই হলো না। কেমন গোপন একটা অস্থিরতা তাকে বৃত্তের ভেতরে বন্দি করে ফেলছে। তিনি বেরোতে পারেন না।

সবাই ঘুমুচ্ছে। আশপাশে কেউ জেগে নেই কল্পনা করে একটা নির্জন দ্বীপে চেয়ার টেবিল পেতে বসেছেন আবু রায়হান। তিনি একটা গল্প লিখতে শুরু করেছেন। গল্পটি বেশ কিছুদূর এগিয়েও গেছে। এই গল্পে যে চরিত্রটি তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে, তার নাম আনিতা। আনিতা খুবই সুন্দরী আর বুদ্ধিমতী। ওর মা নেই। খুব ঘটনাবহুল জীবন আনিতার। বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর সৎমার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় একদিন সে বাড়ি ছেড়ে পালায়। তখন ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে কেবল। কত আর বয়স?

বয়স কম হলেও জেদ কম ছিল না। সৎ মা খুব খারাপ আচরণ করতেন, বিষয়টা এমন না। বরং বেশ ভালোই ছিলেন মহিলা। সমস্যা হলো, তিনি আনিতার সত্যিকারের মা হতে চেয়েছিলেন। বড্ড বাড়াবাড়ি করছিলেন। খাওয়াদাওয়া, গোসল, পড়াশোনা— এসব নিয়ে একটু বেশিই খেয়াল রাখতেন। কিন্তু আনিতার মনে হলো এটা অন্যায়। তিনি কোনো আসল মায়ের জায়গা দখল করতে চাইবেন? তার এত লোভ কেন? একদিন এসব নিয়েই কথা কাটাকাটি হলো। কথা কাটাকাটি সমস্যা ছিল না। সমস্যা হলো যখন ওর বাবা ওই মহিলাকে অর্থাৎ আনিতার বর্তমান মাকে সমর্থন করলেন। আনিতা আর কোনো কথা না বলে নিজের বিছানায় গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। রাতেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যাগে গুছিয়ে রেখেছিল। পরের দিন কলেজে যাওয়ার নাম করে সোজা ঢাকায়।

বাড়ি থেকে পালানোর পর সাত বছর। ঢাকায় এসে কী কষ্ট যে সে সহ্য করেছে, তার শেষ নেই। বিশেষ করে একটা অবিবাহিত মেয়ের ঢাকার মতো শহরে টিকে থাকা যে সীমাহীন কষ্টের, মনে হলে আনিতা কেঁদে ফেলে। বাবা-মার সাথে দেখা তো দূর-কল্পনা, কোনো যোগাযোগই করেনি। একদম ইচ্ছে করেনি তা নয়। বারবারই করেছে। কিন্তু কী জবাব দেবে বাবাকে কিংবা মাকে? বাবা কি সেদিন খুব বাজে কিছু বলেছিলেন? আনিতার এখন তা মনে হয় না। মা-ও কি খুব খারাপ কিছু করেছিলেন? তা-ও না। আনিতার মনে হলো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। পেছন ফিরে আর তাকাতে চায় না। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে সমানে চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছে। হচ্ছে না। তবে আনিতার বিশ্বাস, চাকরি ওর হবেই। না হওয়ার কী কারণ থাকতে পারে? ভালো পড়াশোনা করছে। জব কোচিং করছে। বন্ধুদের নিয়ে গ্রুপ স্টাডি করছে। সে সুন্দরী, স্মার্ট ও বুদ্ধিমতী। তার চাকরি তো হতেই হবে।

আনিতা একটা ছেলেকে পছন্দ করেছে। ছেলেটা পাশের গলিতে থাকে। নাম আনাস কাবিরি। প্রথম প্রথম নামটা বিচ্ছিরি শোনালেও এখন কাবিরি ভাইয়া ডাকতে অবশ্য ভালোই লাগে। কাবিরিকে দেখতে অতটা স্মার্ট মনে হয় না। কিন্তু নিজের কাজে সে খুব দক্ষ আর দায়িত্বশীল। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। এর মধ্যে দুবার বিদেশে ভ্রমণ করলেও চাকরির বয়স বেশি না, চার বছর সাত মাস। প্রতিদিন দুবার কথা হয় নিয়ম করে। সকালে ঘুম থেকে উঠে একবার। তখন ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে বকবক করে আনিতা, কাবিরি শোনে। আবার রাত এগারোটায়। তখনও আনিতাই বকবক করে, কাবিরি শোনে। সকালের সময় আধাঘণ্টা। রাতে একঘণ্টা। রাতে এক ঘণ্টা হলেও আনিতা সেটা প্রায় দেড় ঘণ্টা বা পৌনে দু’ঘণ্টায় নিয়ে যায়। আনিতার আপাতত টার্গেট হলো এ সময়কে দুই ঘণ্টায় নিয়ে যাওয়া। কিন্তু কাবিরি মনে করে, প্রেমিক-প্রেমিকাদের উচিত নয় এত বেশি কথা বলা। বেশি কথা বলার দুটি প্রধান ক্ষতির কথা জানিয়েছে সে। প্রথম ক্ষতি হলো কথার অপচয়। সে মনে করে, পৃথিবীতে কথার অপচয় সবচে বেশি ক্ষতিকর। সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটিরই সবচেয়ে বেশি অপচয় হয়। এটা উচিত নয়। তাদের উচিত বিয়ের পরে আদর করে বলার জন্য কিছু কথা জমিয়ে রাখা। না হলে পুরোটা জীবন শুধু পস্তাতে হবে। স্বামী স্ত্রীর মুখের ভাষা খুব তেতো হয়ে উঠবে। দ্বিতীয় যে ক্ষতির কথা কাবিরি বলেছে, সেটাও ভাবার মতো বটে। সেটা হলো আর্থিক ক্ষতি। সে হিসেব করে দেখিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে দুই ঘণ্টা কথা হলে তাদের ব্যয় হচ্ছে অন্তত আশি টাকা। মাসে দু হাজার চারশ’। বছরে আটাশ হাজার আটশ’। যদি সেটা পাঁচ বছর মেয়াদি হয়, তাহলে সেটা দাঁড়ায় এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজারে। এর বেশি হলে আরও বাড়বে। তবে কাবিরি প্রেমকে পাঁচ বছরের বেশি দীর্ঘায়িত করার পক্ষে না। প্রেম বেশি দীর্ঘায়িত হলে শেষে চুষে ফেলা চুইংগামের মতো হয়ে যায়। আঠা আছে কিন্তু স্বাদ নেই, এমন। টাকার ব্যাপারে অবশ্য সে কিছুটা ছাড় দিতে চায়। মাসে ফোনে কথা বলার জন্য সে দৈনিক বিশ টাকা খরচ করাকে সমর্থন করে। বিশ টাকায় কিন্তু মোবাইল ফোনে পঁচিশ-ত্রিশ মিনিট কথা বলা যায়। বিশ টাকা হারে খরচ করলে পাঁচ বছরে মাত্র ছত্রিশ হাজার টাকা খরচ হয়। সে আনিতাকে হিসাব করে দেখিয়েছে বাকি টাকা অর্থাৎ এক লাখ আট হাজার টাকায় একটা খাট, একটা ডাইনিং টেবিল, একটা টিভি আর একটা ড্রেসিং টেবিল অনায়াসে কিনতে পারে। অল্প কিছু টাকা বাঁচলে সেগুলো দিয়ে দুয়েকটা ফুলের টব কেনাও তেমন অসম্ভব হবে না বলে মনে করে কাবিরি।

আনিতা খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পরেই ফোন করবে কাবিরি। এগারোটা প্রায় বাজতে চলেছে। হাতে ফোন নিয়ে অপেক্ষায় আছে। সম্পর্কটাকে আরও একটু গভীরতায় টেনে নিতে চায় আনিতা। কাবিরির সঙ্গে কথা বলার বয়স প্রায় পঁচিশ মাস হলেও এখনও কোথায় যেন বেশ ফাঁক রয়েছে। সে ফাঁকটা বন্ধ করতে হবে। সেটা করতে পারলেই একটা মজবুত কাঠামোয় দাঁড়াবে তাদের প্রেম। এখন পর্যন্ত যে অবস্থায় আছে, সেটাকে কিছুতেই গভীর প্রেম বলা যায় না বলেই মনে করে সে। গভীর না হলে আবার প্রেম কী! প্রেম হতে হবে একেবারে মাখামাখি। জটিল।

আনিতার হঠাৎ মনে হলো, আরে, কাবিরি তো ফোন করছে না। এগারোটা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে তো! ব্যাপার কী? মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে সে ডায়াল করল নম্বরটি। ঢুকল, কিন্তু রিসিভ হলো না। আবার কল করল। এবারও কলটি রিসিভ না হওয়ায় মনে মনে বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সে। শোয়া থেকে উঠে বসল। মানুষ রেগে গেলে শোয়া থেকে বসে যায়, বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়, দাঁড়ানো থেকে হাঁটতে বা দৌড়াতে থাকে। আনিতার রাগ অবশ্য এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপেই আছে। সুতরাং সে বসেই রইল। তৃতীয় ধাপে যাওয়ার আগে সে আরও দুবার ফোন করতে চায়। কিন্তু সে কি ফোন করবে, নাকি একটু অপেক্ষা করবে? রাগের সময় অপেক্ষা করতে পারলে ভালো হয়। অনেক সময় রাগ পড়ে যায়। মাঝে-মধ্যে নানান যৌক্তিক সমাধান আসে। আনিতা ভাবল, সে অপেক্ষাই করবে।

এ-টুকু লেখার পর আবু রায়হান একটা ভাবনায় পড়লেন। ভাবছেন, আনিতাকে সময়মতো কল না করার ব্যাপারে কাবিরির কী কারণ দেখাবেন। তিনি তিনটি কারণের কথা ভেবেছেন। প্রথমটা হলো ফোনে টাকা না থাকা। ফোনে টাকা না-ই থাকতে পারে। এটা একটা যৌক্তিক কারণ। কিন্তু এখানে আবার দুটো সমস্যা আছে। এর একটা হলো, সে কথা বলতে চায়নি বলে রিচার্জ করেনি। কথাটা মনে করতেই আঁতকে ওঠেন তিনি। আরেকটা হলো, সে যে কিপ্টা— এটা প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করবে আনিতা। সুতরাং প্রথম কারণটা বাতিল। দ্বিতীয় কারণ হতে পারে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড কাজের চাপে শরীর ক্লান্ত, তাই কথা বলার মুডে নেই। ‘কথা বলার মুডে নেই’— ভেবেই তিনি আবার বিরক্ত হলেন। এটা কী ধরনের কথা? কথা বলতে কী অসুবিধা, অন্তত এটুকু তো ফোন করে বলা যায়, নাকি? তৃতীয় ও সর্বশেষ কারণ হলো, সে ফোন করতে ভুলে গেছে। কথাটা দ্বিতীয়বার ভাবলেন রায়হান সাহেব। এক্ষেত্রে যেটা ঘটবে, সেটা হলো— আনিতা কেঁদে ফেলবে। শুধু কেঁদেই ঘটনার সমাপ্তি ঘটালে মন্দ হতো না বরং এমনও হতে পারে যে, নিজের মোবাইল ফোনটি সে ছুড়ে দিল দেয়ালে। সেটি ভেঙে খানখান হয়ে গেল। এ রকম ঘটলে নতুন একটা মোবাইল ফোন কাবিরিকেই কিনে দিতে হবে। এতে কাবিরির হিসাবে গোলমাল হয়ে যেতে পারে। বিষয়টা সুবিধের হবে না।

আবু রায়হান আবার লিখতে শুরু করলেন—

আনিতা আরও দুইবার ফোনকল দিল। রিসিভ হলো না। আশ্চর্য! এবার সত্যি সত্যিই প্রচণ্ড রাগ হলো। সুতরাং সে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল এবং অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল। ভাবল, ফোনটা বন্ধ করে ফেলবে, যাতে ফোন করতে চাইলেও কাবিরি তাকে আর না পায়। এটাই আপাতত শাস্তি। সে ফোনটা সুইচড অফ করতে যাবে, অমনি কাবিরির কল। কাবিরি প্রথমেই স্যরি বলে নেয়। আনিতা ভেবেছিল জোরে চিৎকার করে উঠবে। কিন্তু স্যরি বলার ধরনে আনিতার মন স্পঞ্জের মতো নরম হয়ে এল। রাগ চেপে সে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার, তোমার খবর নাই কেন?

কাবিরি বেশ অবাক হলো। আপনি থেকে হঠাৎ তুমিতে! কিন্তু সে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করবে বলেই ভাবল। কেন না সারাজীবন তারা তুমি সম্বোধনটাই তো ব্যবহার করবে। আনিতা আবার মুখ খুলল, তো কাবিরি সাহেব, কী সমস্যা তোমার?

—বলছি শোনো। তার আগে বল তুমি কেমন আছ?

—আমি তো পুরাই উল্টে গেছিলাম। মনে করছিলাম তোমার সাথে আর কথাই বলব না। যাই হোক, কী হয়েছে বল তো।

কাবিরি বলতে লাগল, হঠাৎই মায়ের অসুস্থতার খবর পায় সে। অসুস্থতা মানে উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা। গ্রামের পাশের কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কাবিরি অফিস শেষে রওনা দিয়ে এগারোটায় এসে বাড়ি পৌঁছেছে। কাবিরিদের বাড়ি নেত্রকোণার দূর্গাপুরে। দূর্গাপুরে ঢোকার রাস্তা অত ভালো নয়। সে কারণেই একটু বেশি দেরি হয়ে যায়। মার সাথে একটু কথাবার্তা বলেই সে আনিতাকে কল করে। মা এখন মোটামুটি ভালোই আছে। ডাক্তার অনেকগুলো ট্যাবলেট লিখে দিয়েছেন। তার শরীর দুর্বল। বয়স হয়েছে। সমস্যা হলো নিয়মিত ওষুধ খেতে চায় না। আনিতাকে জানাল, বাড়িতে দুদিন থাকবে সে। মাকে একটু ভালো অবস্থায় দেখে যেতে চায়। এটুকু কথা বলেই কাবিরি বিদায় নিতে চাইল। আনিতা বলল— ঠিক আছে, মার যত্ন নাও। নিয়মিত ওষুধ খাইয়ে দিও। আর বেশি করে ফলমূল কিনে দিও। নাকি আমি আসব?

শেষ বাক্যে হেসে ফেলল কাবিরি। বলল, সময় হোক। একদিন তো আসবেই।

—হুম, সেদিন মার সব দায়িত্ব আমার। আর আমার সব দায়িত্ব তোমার।

—তাই হবে। শুভরাত্রি বলে ফোন রাখল কাবিরি।

পরের দিন ঘুম থেকে উঠে আনিতাই ফোন করল কাবিরিকে। সাধারণত কাবিরিই ফোন করে। তাকে ফোন করতে দেয় না। আনিতা ফোন করায় কাবিরি বেশ খুশি হয়েছে বলে মনে হলো। আনিতার ভেতরে নির্মল হাওয়া খেলে গেল যেন। আপন মানুষের খুশিতে নিজের ভেতরে যে দারুণ একটা অনুভূতি হয়, সে আজ আবার টের পেল। আনিতা হবু শাশুড়ির খোঁজখবর নিল। ভালোভাবে যত্ন নিতে কাবিরিকে প্রায় হুকুমের মতো করে বলল। এমনকি কাবিরি নিজের যত্ন নিতেও যেন ভুলে না যায়, সেটাও বারবার মনে করিয়ে দিল। কাবিরিকে খুব আনন্দিত মনে হলো। নিজের মার ব্যাপারে প্রেমিকা বা হবু স্ত্রীর এমন দরদে প্রাণে ঢেউ খেলে গেল তার। শেষ করল এভাবে— স্যরি আনিতা, আজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারিনি। তাছাড়া উঠেই মাকে নিয়ে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তোমাকে কল দিতে পারলাম না। কিছু মনে কোরো না।

—আরে ধুর! সব সময় তোমার ফোন করতে হবে কেন? যতদিন বাড়িতে আছ, আমিই ফোন করব। এ বিষয়ে কোনো কথা চলবে না।

কাবিরি আবারও খুব খুশি হলো। ধীরে ধীরে আনিতার প্রতি মুগ্ধতা বেড়েই চলেছে কাবিরির। কাবিরি বলে, ঠিক আছে। খুব খুশি হয়েছি। নিজের যত্ন নিও। রাখি?

আনিতা বলল— রাখো। ভালো থেকো।

—তুমিও ভালো থেকো।

আনিতা ফোন রাখল। আনিতারও ভালো লাগছে আজ। কাবিরি সত্যিই একটা অসাধারণ ছেলে। যৌথজীবনে তারা সুখীই হবে। ফোনটা বালিশের পাশে ছুড়ে দিয়ে আনিতা একটা স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়ে—

আনিতা ও কাবিরি টাকা জমিয়ে একতলা একটা বাড়ি বানিয়েছে। একেবারে গ্রামের দিকে। তবে গ্রাম নয় এটি। শহর আর গ্রামের সন্ধিস্থল বলা চলে। নিম্ন মধ্যবিত্ত তারা। এরচে বেশি তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বাড়িটিতে সুন্দর রঙ করা হয়েছে। কোথাও আনিতার পছন্দে, কোথাও কাবিরির। আনিতার পছন্দ নীল, গোলাপি, ম্যাজেন্টা। কাবিরির সবুজ আর সাদা। ছাদে রেলিং দেওয়া হয়েছে। এক বিকেলে দুজন মিলে ছাদে উঠল। আকাশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন। রোদ পড়ে গেছে বেশ আগেই। ঝিরঝির হাওয়া বইছে। হাওয়ায় উড়ছে আনিতা চুল। কাবিরি ঠিক করে দিচ্ছে। আবার কাবিরির উড়ন্ত চুল আনিতা গুছিয়ে দিচ্ছে। হাওয়াটা বাড়ছে। কিছুটা ঠাণ্ডা নিয়ে পশ্চিমে সূর্য ডুবে যেতে যেতে লাল আবিরে রাঙিয়ে দিয়েছে অনেকটা এলাকা। আনিতার কবিতা আবৃত্তি করতে ইচ্ছে করে।

আবু রায়হান আবার একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন। আনিতাকে কার কবিতা পড়তে দেবেন তিনি? রবীন্দ্রনাথ? নজরুল? জীবনানন্দ? জসীম উদ্‌দীন, সুকান্ত, নাকি আরও পরে এসে শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদ? নাকি সমকালীন কবিদের কোনো কবিতা? কার নাম লিখবেন এখানে? জীবিত কবিদের অনেকেরই তো আবার চুলকানি রোগ আছে। এর নাম নিলে ও গালাগাল করবে, ওর নাম নিলে এ; তা-ও আবার দল বেঁধে। তাদের সমালোচনার ভাষা দেখলে মনে হবে, অন্য কবিদের গালাগাল করতেই এসে এই মহৎ কাজের দায়িত্ব নিয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আবু রায়হান খুব বিরক্ত। তার কী করা উচিত এখন? নিজের কবিতা আবৃত্তি করাবেন আনিতাতে দিয়ে? এমন তো প্রায়ই হচ্ছে আজকাল। কবিতার আলোচনায় নিজের কবিতার কোটেশন, ছড়ার আলোচনায় নিজের ছড়া, এভাবেই চলছে। তার কবিতার সংখ্যাও কম নয়। প্রথম দিকে কয়েক বছর তিনি কেবল কবিতাই লিখতেন। অবশ্য তার কোনো কবিতার বই বের হয়নি। তাই বলে কি তার কবিতা অন্য কেউ পড়তে পারবে না? বই বের হওয়া জরুরি! অনেক ভেবে স্থির করলেন, কোন রিস্ক নেবেন না তিনি। আনিতা নিজের লেখা কবিতা পড়বে। এ বয়সে দু চারটা কবিতা কে না লেখে? তাছাড়া প্রেমে যেহেতু পড়েছে, কবিতা তার লেখাই উচিত। প্রেমিককে খুশি করার জন্য আনিতা নিজের লেখা কবিতাই পড়বে আজ। ভেবে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন রায়হান সাহেব।

আবার লেখা শুরু করবেন। কিন্তু এর আগে এক কাপ চা খাওয়া দরকার। প্রতিরাতেই দুতিনবার চা খেতে হয় তাকে। আজ যেন ভুলেই ছিলেন। কিন্তু চা’র কথা মনে হতেই আঁতকে উঠলেন। ভুলে ছিলেন না তো! চা’র জন্য পানি বসিয়েছিলেন অনেক আগেই। দৌড়ে চুলার কাছে গিয়ে দেখলেন, আগুনের তাপে পানি শুকিয়ে ডেকচিটি পুড়তে শুরু করেছে। তাড়াতাড়ি ডেকচি নামালেন। কলের নিচে নিয়ে পানি ছেড়ে দিলে ছ্যাৎ করে শব্দ হলো একটা। কিছুটা পুড়েছে ডেকচি। সকালে আবার এ নিয়ে কথা শোনাবে ফারজানা।

তিনি কি আবার পানি বসাবেন? বউয়ের কান্নাভেজা মুখ কল্পনা করে তিনি চা খাওয়ার ইচ্ছা বিসর্জন দিলেন। বিসর্জনের অবিমিশ্র আনন্দ নিয়ে লেখায় মনোযোগী হলেন আবার—

আনিতা বলল— একটা কবিতা আবৃত্তি করি, শুনবে?

কাবিরি খুব উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল, কবিতা? বাহ! শুনব শুনব। কার লেখা?

আনিতা কায়দা করে বলল, কবিতা কার লেখা, সেটা বড় নয়। বড় কথা হলো কবিতায় কী লেখা হয়।

আনিতার মুখে দার্শনিকসুলভ আলাপ শুনে কাবিরি আর কথা বাড়ায় না। বিয়ের পরে কি কোনো কোনো মেয়ে দার্শনিক হয়ে ওঠে? কাবিরি আবৃত্তির তাগিদ দেয়। লাফ দিয়ে খাল পেরোনোর মতো আনিতা জোরে একটা নিঃশ্বাস নেয়। তারপর কিছুটা দম নিয়ে পড়তে থাকে—

বাতাস তোমার কান খোলো, শোনো—

আমার কিছুটা স্বপ্নের কথা বলব

যাকে ভালোবাসি তার হাত ধরে

সারাটা জীবন সুখে আর দুখে চলব

তুমি বাহক হয়ে…

রাতে আনিতার ফোন করার কথা থাকলেও কাবিরিই ফোন করে। কাবিরিকে কিছুটা নিষ্প্রাণ মনে হয়। কথায় কেমন একটা দ্বিধার স্বর, গলা কেঁপে কেঁপে উঠছে তার। কী ব্যাপার? কাবিরির মার কোনো সমস্যা হলো? মনে মনে ভয় পেতে লাগল আনিতা। বেশ উৎকণ্ঠা নিয়েই জানতে চাইল, কী হয়েছে? কোনো সমস্যা? এমন করে কথা বলছ কেন তুমি?

—না, এমনি। ছোট করে জবাব দিল কাবিরি। কিন্তু আনিতা এ রকম অনিশ্চয়তাভরা জবাব নেবে না। তার প্রকৃত সত্যটা জানা জরুরি। না হলে ঘুম হবে না রাতে। সে কণ্ঠকে নিচে নামিয়ে জিজ্ঞেস করে,

—মানে, আন্টির কোনো সমস্যা?

—নাহ! তোমার আন্টি ভালো আছেন— বলে লম্বা একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে কাবিরি। এই নিঃশ্বাসটা বেশ ভারী, বেশ তপ্ত। আনিতা এত দূর থেকেও তাপটা অনুভব করতে পারে। সে অবাক হয়। ভয়ও পায় কিছুটা। কী হতে পারে তাহলে? কী নিয়ে হঠাৎ এত মন খারাপ কাবিরির? ভেবে পায় না বলে সত্যি সত্যিই উদ্বিগ্ন হতে হয় আনিতাকে। সে বলে— আরে বাবা, কী হয়েছে বলবে তো, নাকি! কী নিয়ে মন খারাপ এত? বল তো আমাকে।

কাবিরি বলতে পারে না। কী করে বলবে সে? একমাত্র কাবিরি ছাড়া পৃথিবীতে কাউকে যে মেয়েটি আপন বলে ভাবতে পারে না; যার আসলে ভাবার মতো কেউ নেইও— তাকে কী করে বলবে সে এমন নির্মম কথা? বলার মতো ভাষা সে কোথায় পাবে? কোনো কোনো সময় তো মানুষের সব ভাষাই অচল চয়ে পড়ে। কাবিরি এখন দাঁড়িয়ে আছে তেমনই এক মুহূর্তে। সে মনে মনে প্রস্তুত হতে থাকে। আমতা আমতা করে বলতে থাকে সে— শোনো, তোমাকে কী করে বলি, তাই ভাবছি। আর সবার আগে তোমাকেই কথাটা বলা দরকার, বুঝছ?

আনিতা এবার একটু ঝাঁজ দেখায়। বলে, তো বুঝব কেমনে? আগে তো শুনতে হবে, নাকি?

তারপর আনিতাকে কাবিরি যা বলার চেষ্টা করেছে, তার মর্মার্থ এ রকম—

কাবিরির মার উচ্চ রক্তচাপ, সেটা আসলে তেমন গুরুতর ছিল না। এটা ছিল একটা ফাঁদ মাত্র। আজ বিকেলেই বাবা-মাসহ কয়েকজন আত্মীয় তাদের ঘরে বসেন। তারা সকলে মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কাবিরিকে তারা সেটা জানাতে চান। তাকে জানানো হয়, কাবিরিকে তারা বিয়ে করাতে চান এবং এ বিষয়ে তার কোনোরকম আপত্তি মেনে নিতে কেউ প্রস্তুত নন। কাবিরি কথা বলতে চাইলে সকলে তাকে বাধা দেন এবং এ-ও জানান যে, মেয়ে তারা ঠিক করে ফেলেছেন। ঠিক করা মেয়ের বর্ণনা দিলে কাবিরি তাকে চিনতে পারে। মেয়েটি দেখতে অত খারাপ না। কাবিরিদের অনার্স পাস করার বছর মেয়েটি এসএসসি পাস করেছিল। রেজাল্ট খুব ভালো না হলেও মেয়েটির বাবা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় গতবার প্রাইমারি স্কুলে চাকরি হয়ে গেছে। কোথায় যেন ডিগ্রিতে পড়তো মেয়েটি। চাকরি হওয়ার পর বাড়িতে ছেলেদের বাবা-মার লাইন লেগে গেছে। পুলিশ থেকে শুরু করে ফার্স্ট ক্লাস অফিসারও নাকি আছে। কিন্তু মেয়ের বাপ-মার পছন্দ কাবিরিকে। মেয়েরও নাকি পছন্দ। ‘মেয়েরও পছন্দ’— কথাটা শুনে কাবিরি আঁতকে উঠেছিল। মেয়েটির সাথে তো তেমন কোনো কথাই হয়নি কাবিরির। তাহলে মেয়ের পছন্দের ব্যাপার আসছে কী করে? আজব ব্যাপারস্যাপার! তবে হ্যাঁ, কথা যা হয়েছিল তাও বছর পাঁচেক আগে। কাবিরিদের বাড়িতে এসেছিল মেয়েটি। সেসময় পড়াশোনার ব্যাপারে উপদেশমূলক দু’চার কথা শুনিয়েছিল সে। বড়রা যা করে আর কী! মেয়েটি তখন বলেছিল, ভাইয়া, আপনার কথায় মুগ্ধ হয়েছি। আপনি শিক্ষক হলে জাতি উপকৃত হতো।

আর কাবিরি মজা করে বলেছিল— হতাম, তোমার মতো ছাত্রী পেলে।

ব্যস, এটুকুই। তারপর আর কথা হবে দূরে থাক, কোনো যোগাযোগ নেই। সবাই ঠিক করেছে আগামীকালই তাদের আংটি বদল। সোনার ডিম দেওয়া এমন মেয়ে তারা হাতছাড়া করার কথা ভাবতে পারে না। ভাবতে নিষেধ করেছে কাবিরিকেও। বারবারই প্রতিবাদ করতে চেয়েও সে পারেনি। বলতে চেয়েছে— আনিতা নামের একটা সুন্দরী মেয়েকে সে ভালোবাসে। মেয়েটাও ওকে খুব পছন্দ করে। অনেক ভালোবাসে তাকে।

কথা বলতে বলতে কাবিরির হঠাৎ মনে হলো, ওপাশে কোনো শব্দ নেই। আনিতা কোনো কথা বলছে না। কান থেকে ফোন নামিয়ে দেখল, আনিতা ফোন কেটে দিয়েছে। কাবিরি কল করল আবার। ফোন বন্ধ। কাবিরি খুব অস্থির হয়ে উঠল। এই অস্থিরতার ভেতরে বারবার আনিতাকে ঝাপটে ধরতে চাইছে সে। কিন্তু তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

আনিতা চুপিচুপি ছ’তলা ভবনটির ছাদে উঠে এল। চতুর্দিকে অন্ধকার। পৃথিবীটাকে মনে হলো শুনশান নীরব, অমানবিক। মনে হলো, একটা পুরো পৃথিবীতে সে একা। কেউ নেই তার পাশে। আনিতার আজ বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। অতি যত্নশীল সৎ-মার কথাও মনে পড়ছে বারবার। ভেতরে কোথাও যেন বাঁধ ভেঙে গেছে। জোর করেও থামাতে পারছে না। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে নিজেকে সে খুব অসহায় আর অপ্রয়োজনীয় মনে করে।

লেখক আবু রায়হানকে আবার থামতে হলো। থামতে হলো আনিতাকে তিনি কী পরিণতি দেবেন, এটা ভেবে। গল্পটা কি ট্র্যাজিক হবে? তাহলে তো এখনই দারুণ সুযোগ। আনিতাকে ছাদে তুলে দেওয়া হয়েছে। সে এখন দুখের সাগরে ভাসমান। ইচ্ছে করলেই ডুবিয়ে দেওয়া যায়। ডুবিয়ে দেবেন? মাথা কাজ করছে না তার। তিনি ভাবলেন একটু চা’র পানি বসাই। একটু গ্রীজ না পেলে মেশিন সচল হবে না। ডেকচি পুড়ে গেলে ডেকচি কেনা যাবে। ফারজানাকেও চুমু দিয়ে মন জব্দ করা যাবে। রায়হান যেন নিজের বউকে খুশি করার নতুন একটা উপায় আবিষ্কার করে ফেলেছেন। চা’র পানি বসিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। চা খেয়েই আবার লিখতে শুরু করবেন। ঝুঁকি নিতে চান না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ভাবনায় ডুবে গেলেন। মাথার ভেতর আনিতা ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়েটার জন্য মায়াও হচ্ছে। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিতে চান, মেয়েটাকে ট্র্র্যাজিক পরিণতিই দেবেন। গল্প ট্র্যাজিক না হলে পাঠকের মনে দাগ কাটে না।

হঠাৎ দরজায় ঠকঠক শব্দ হলে আবু রায়হান চমকে উঠলেন। আশ্চর্য? এত রাতে কে এল? এ সময়ে কারও আসা তো অসম্ভব। কলাপসিবল গেটে পর্যন্ত তালা দেওয়া। তাহলে? আবার শব্দ হলো, ঠকঠক। তিনি ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দিয়ে ভয়ানক আশ্চর্য হলেন। চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। শরীর কাঁপছে তার। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখে মায়াবী মুচকি হাসিকে অবিশ্বাস করা যাচ্ছে না। মেয়েটির পরনে শাড়ি, অবিশ্বাস করা যাচ্ছে না। কপালে গোল টিপ, অবিশ্বাস করা যাচ্ছে না। চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ানো। হাতে চায়ের কাপ। তিনি কাকে অবিশ্বাস করবেন? নিজেকে, নাকি জলজ্যান্ত মেয়েটিকে? রায়হান সাহেব স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করতে করতে আলাপ শুরু করলেন— তুমি কে?

—আমি আনিতা।

—কী! আনিতা মানে? কোন আনিতা?

—সেই আনিতা। যাকে নিয়ে আপনি এতক্ষণ ভেবেছেন। নেন, চা নেন। আমি ভেতরে গিয়ে বসব।

কী বলছে মেয়েটি! ঘোরগ্রস্ত আবু রায়হান দরজা ছেড়ে নিজের আসনে গিয়ে বসলেন। মেয়েটি চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে মুখোমুখি একটা টুলে বসে পড়ল। মেয়েটির হাসিমুখ। আবু রায়হান শঙ্কিত হচ্ছেন বারবার। ভূতটুত নয় তো আবার! তার জানা আছে যে, ভূতেরা খুব হাসে। চায়ে চুমুক দিয়ে দেখলেন মেয়েটি অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে। অর্ধেকের মতো চা শেষ করে টেবিলে কাপ রাখলে মেয়েটি আবার মুখ খোলে— তো স্যার, আনিতার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত কী আপনার?

—মেরে ফেলা। ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করবে সে। নির্বিকারভাবে কথা বলতে চেষ্টা করলেন তিনি। হা হা হা করে মেয়েটি হেসে ওঠে। হাসতে হাসতেই প্রশ্ন করে আবার— পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রাণী কারা, জানেন?

—হ্যাঁ, লেখকরা। স্রষ্টারা। রায়হান বললেন।

—একদম। কিন্তু লেখকদের এত নিষ্ঠুর হতে হবে কেন?

—স্রষ্টাকে নিষ্ঠুর হতে হয়। তাকে খেলতে জানতে হয়। নিষ্ঠুরতা লেখককে মহৎ করে তোলে।

—এর কোনো ব্যাখ্যা আছে?

—অবশ্যই। নিষ্ঠুর না হলে লেখক চরিত্রগুলোকে নির্মোহভাবে লিখতে পারেন না। নিষ্ঠুরতাই নির্মোহতার পরিশোধন যন্ত্র।

—আচ্ছা ঠিক আছে। কাবিরির ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত কী?

—ভাবিনি এখনো।

—ভাবেননি কেন? একটা মেয়েকে তো ঠিকই মেরে ফেলা সহজ। পুরো সমাজই মেয়েদের বিপক্ষে। আপনিও। একজন লেখক হয়েও?

কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটি যেন একটা গোপন তাপ ছড়িয়ে দেয় লেখকের মনে। চায়ে চুমুক দিয়ে আবার বলতে শুরু করেন তিনি— দেখ, আমি বুঝতে পারছি তুমি কী বলতে চাইছ। কাবিরির আসলে এটাই নিয়তি। সে ওই মেয়েটাকে বিয়ে করবে। কাবিরির পরিবার, ওই মেয়েটার পরিবার, এমনকি পুরো সমাজ এর জন্য প্রস্তুত। আমরা এভাবেই অভ্যস্ত। এতে আনিতা ছাড়া সবাই খুশি।

—ও, তাহলে আনিতা সংখ্যালঘু। সে মরবেই। লেখকের কাজ কী তাহলে? স্রোতে গা ভাসানো? লোকাল ট্রেনে চড়ে মদ খেতে যাওয়া?

এবার একটু হাসতে হলো আবু রায়হানকে। মেয়েটি কী বলছে! লেখক কি লোকাল ট্রেনে চড়ে মদ খেতে যায়? লেখক তো মদ খায় না। মাঝে মাঝে মদ লেখককে খায়। তবে তিনি কোনোদিন মদ খাননি। খাওয়ার যে ইচ্ছে হয় না, তা না। প্রচণ্ড ইচ্ছে হয়। কিন্তু খেতে পারে না ফারজানার কথা ভেবে। বউটা যা ছিঁচকাঁদুনে! তিনি বলেন— আনিতা, তুমি বুদ্ধিমতি সন্দেহ নেই। তোমাকে বলি, ঐ যে বললাম না, লেখককে নিষ্ঠুর হতে হয়, এটা সত্য। তোমাকে যে আমি মেরে ফেলতে চাইছি; এই চাওয়া কিন্তু আমার না। আমি এখানে বর্ণনাকারী মাত্র। সমাজবাস্তবতাই তোমাকে মেরে ফেলছে। লেখকের কাজ এটা দেখানো। এটা দেখিয়ে পাঠকের মনে আনিতার জন্য সহানুভূতি ও দুঃখবোধ তৈরি করা এবং এই বাস্তবতা যে অনুচিত, সে উপলব্ধি জাগানো। এর ফলে লেখক কিন্তু সংখ্যালঘুর পক্ষেই যান।

এবার খুব হতাশ দেখালো আনিতাকে। তার মুখ বেশ মলিন হয়ে এল। সে ভাবল, কথা আর দীর্ঘায়িত করবে না। কী লাভ? যে আনিতা লেখকের ইচ্ছার সৃষ্টি, তার কী ক্ষমতা আছে! কিন্তু আনিতার একটা অনুরোধ আছে। এটা জানিয়েই বিদায় নেবে। সে বলল— আচ্ছা, ঠিক আছে স্যার। একটু অনুরোধ আছে আমার, রাখবেন? খুবই সাধারণ ব্যাপার। এটা করা আপনার পক্ষে একেবারেই সহজ। আমি কি বলব স্যার?

—হ্যাঁ, বল।

আনিতা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ল— এটুকু আপনি লিখুন। কিন্তু আনিতা মারা গেল কিনা, তা নিশ্চিত করবেন না। এটুকুই। পাঠক তো ধরেই নেবে, লাফিয়ে পড়ে সে মারা গেছে।

—তো, এতে আনিতার লাভ কী?

—আছে। আনিতা তাতে বেঁচেও যেতে পারে। এ রকম কিন্তু ঘটে, স্যার। অনেক বছর আগে ঢাকায় এমনটা ঘটেছিল। আপনার মনে আছে? আত্মহত্যা করার জন্য একটা ছেলে ছয়তলা থেকে লাফিয়ে পড়েছিল। কিন্তু মরেছিলেন একজন পথচারী। কেন না ছেলেটি পথচারির উপরে পড়েছিল। আমিও বাঁচতে চাই স্যার, যেকোনোভাবে।

খুব জোরে হেসে ফেললেন আবু রায়হান। হাসতে হাসতে তার চোখ বন্ধ হয়ে এল। অনেক বেশি হাসতে গেলে এমন ঘটে তার। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করেই থাকলেন। মেয়েটার মুখ আসলে খুব মায়াবী, খুব সুন্দর। এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা উচিত। তিনি কি তাই করবেন?

—শোনো আনিতা… বলে তিনি চোখ খুললেন। খুলেই চমকে উঠলেন। আশ্চর্য! মেয়েটি কোথায় গেল? একটু আগেই তো, আধা মিনিট আগেই তো ছিল। তিনি ঘরের ভেতরে চোখ ঘোরালেন। নেই। অগত্যা দরজার কাছে গেলেন। দরজা খোলা। কোথাও নেই। কী আশ্চর্য! চুলার পাশে দাঁড়িয়ে আরেকবার চমকে উঠলেন। চা’র ডেকচি পুড়ে ছাই। জলদি চুলা নেভালেন। তাহলে তিনি চা খেলেন কীভাবে? রায়হান সাহেব ঘরে ঢুকে টেবিলে কোনো চা-কাপ দেখতে পেলেন না। তিনি ভ্যাবাচেকা খেতে খেতে প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বিছানায় বসে পড়লেন। ঝিম ধরে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর ভাবলেন, ঘুমাতে হবে এবার। ফারজানাকে সকালে কী জবাব দেবেন—এটা ভাবতে ভাবতে লাইট নিভিয়ে দেন।

সকালে উঠে দেখা গেল ফারজানা গাল ফুলিয়ে আছে। কথাবার্তা বলার কোনো লক্ষণ নেই। আবু রায়হানও কথা বলার সাহস পান না। তিনি জানেন, এখন যেকোনো কথা বলা মানে ফারজানাকে ফ্যাৎ করে জ্বালিয়ে দেওয়া। ফারজানা আগুন হয়ে আছে। আগুন নাকি মেঘ! মেঘ হলে সামান্য বৃষ্টি ঝরাবে আর আগুন হলে তো রক্ষে নেই, রায়হানকে পুড়ে ফেলবে। রান্না শেষ হলে ভাত তরকারি বেড়ে দিলেন ফারজানা। কোনো রকম ডাকের অপেক্ষা না করে রায়হান খেতে বসলেন। খেতে খেতে একবার বললেন, আজ রান্না খুব ভালো হয়েছে।

—হুম, অন্যদিন ভালো হয় না।

বলে ফারজানা আবার চুলায় কাছে চলে গেলেন।

আবু রায়হান বিব্রত ভঙ্গিতে খেতে থাকলেন। খাওয়াটা শেষ করা দরকার। হাত ধুতে যাবেন, এমন সময় ফারজানা এক গ্লাস দুধ নিয়ে উপস্থিত। হাতে নিয়ে তিনি আবার কথা বলার চেষ্টা করেন, আরে, দুধ কই পাইলা?

—গাই কিনছি! বলে ফারজানা এক চামচ ভাত তুলে দেন রায়হানের পাতে। তার ভালো লাগে এই মশকরাটা। দুধভাত খেতে খতে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তিনি ফারজানার দিকে তাকান। ফারজানা বলে— গোয়ালা আসছিল। কালকে রাখছি এক কেজি। লেখক মানুষের তো মগজ ভালো থাকা দরকার। যাই হোক, দুধের একশ’ বিশ আর ডেকচির আশি— দুইশ’ দিয়া পরে বাইরে যাইয়েন।

ফারজানা রান্নাঘরে হারিয়ে গেলেন। আবু রায়হান দেখলেন আগুনও জ্বলল না, বৃষ্টিও নামল না। মনে মনে খুশিই হলেন তিনি। খাওয়া শেষে মানিব্যাগে হাত দিয়ে দেখা গেল দুশোই আছে। ভাবলেন, স্ত্রীর হাতে পুরোটা তুলে দিয়ে চা’র জন্য বিশ টাকা চেয়ে নেবেন।

আজ একটু আগেভাগেই বাসায় ফিরেছিলেন রায়হান সাহেব। গল্পটা শেষ করা দরকার। আজ আবার গভীর রাতে মেয়েটি এসে উপস্থিত হয় কিনা কে জানে? সারাদিন ধরে মাথায় মেয়েটি ভর করে আছে। নামছে না কিছুতেই। কী আশ্চর্য ঘটনা! কাউকে বলাও যাবে না। বললে বিশ্বাস তো করবেই না, বরং তার মাথা যে পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে, এটাই নিশ্চিত হবে সবাই। ফারজানাকে কি বলা যায়? না, সেটাও ঠিক হবে না। তিনি লিখতে শুরু করলেন—

কাবিরি আর ওই মেয়েটির আংটি বদল ভালোভাবেই সম্পন্ন হলো। মেয়েটির নাম মিতু। মিতু খুব খুশি। খুশি উপস্থিত সবাই। শুধু কাবিরির মুখটাই মলিন ছিল। দুয়েকবার টিস্যু দিয়ে চোখের পানিও মুছতে দেখা গেছে তাকে। তবে এটা বিষয় না। এটুকু সম্ভবত আনন্দের অশ্রু— নিকটাত্মীয়রা এটা ভেবেই সান্ত্বনার বড়ি গিলে নিল। এর মধ্যেও কাবিরি আনিতার সাথে কথা বলতে চেয়েছে। অনেকবার কল করেছে। আনিতা কোনো কল ধরেনি। শেষবার কল কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে রেখেছে। আংটি বদল শেষে খাবারের আয়োজন ছিল ছোটখাটো। ছোটখাটো হলেও খাওয়াতে হয়েছে অন্তত পঞ্চাশজনকে।

কাবিরির বাবা-মা খুব খুশি। অনেকদিন পর এত মানুষ একত্রে মিলিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। একমাত্র ছেলের জন্য উপযুক্ত বউ পেয়েছেন তারা। খুশি মিতুর পরিবারও। এ যুগে এত ভালো ছেলে তারা আর কোথায় পেতেন?

আবু রায়হান একটু থামলেন। গতরাতের ঘটনাটা মনে পড়ল তার। আহা! মেয়েটির মুখ কেমন মায়াবী ছিল। নতুন করে ভাববেন তিনি। কী করা যায় তাকে নিয়ে? কাবিরির পরিণতি তো যা হওয়ার হয়েই গেল। ওই পর্ব এখানেই শেষ। কিন্তু আনিতা? আহারে, দুঃখী মেয়েটা! ওর জন্য সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে। আবু রায়হানের কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। বিয়ের দ্বিতীয় বছরে ফারজানা গর্ভবতী হলেও বাচ্চাটি গর্ভেই মারা যায়। সাত মাস হয়েছিল বয়স। সেই মেয়েকে অপারেশন করে বের করতে গিয়ে ফারজানাকেও মা হওয়ার ক্ষমতা হারাতে হয়। মেয়েটা বেঁচে থাকলে আজ আনিতার বয়সীই হতো। তার মন খারাপের মাত্রা বাড়তে থাকে। অনেকক্ষণ চুপ মেরে বসে থাকেন। তিনি কি কাঁদছেন? নিজের হাত দিয়ে টের পেলেন চোখ ভিজে উঠেছে। আজ বহুদিন পর এমন করে মনটা উতলা হয়ে উঠেছে। খুব আফসোস হয়, যদি এরকম একটা মেয়ে সত্যিই থাকত তার! থাকল না তো! স্রষ্টাকে এত নিষ্ঠুর হতে হয় কেন?

আবু রায়হান সিদ্ধান্ত নিলেন গল্পটি আর লিখবেন না। অসমাপ্ত থাকবে গল্পটি। তার মনে পড়ল, মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে ছাদের উপর। থাকুক। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিক। কী ভাবছে আনিতা? তার কি বাবা-মার কথা মনে পড়ছে? মায়ের মতো প্রিয় গাঁয়ের কথা মনে পড়ছে? অতি আদরে আগলে রাখতে চাওয়া সৎমায়ের কথা মনে পড়ছে? সে কি জন্মঠিকানায় ফিরে যাবে? নাকি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়বে? কিন্তু সে তো মরতে চায় না। হঠাৎ লেখকের মনে হলো, তিনি নিজেও চান না মেয়েটি মারা যাক। মেয়েটি বাঁচুক। বেঁচে থাকলে সে আবার মাঝরাতে দেখা করতে আসবে তার সাথে। আসতে পারে না? তিনি মনে-প্রাণে চান মেয়েটি আবার আসুক। এমন শুনশান মাঝরাতে এলে আনিতাকে তিনি নিজের মেয়ে বলে রেখে দেবেন। ফারজানা খুব খুশি হবে। অনাগত আনন্দের কথা ভাবতে ভাবতে আবু রায়হানের মনে কান্না আসে। তার ভেতরে একটা সমুদ্র জলোচ্ছ্বাসের বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয়।

আমিনুল ইসলাম সেলিম

নানামুখী লেখালেখিতে মগ্ন হলেও আমিনুল ইসলাম সেলিমের পরিচয় মূলত কবি হিসেবেই। গল্পকার হিসেবে তেমন পরিচিতি নেই, কিন্তু গল্পভুবনে তার বিচরণ দীর্ঘ দিনের। সৃজনব্যাধিতে আক্রান্ত এ লেখকের কাছে লেখালেখিই একান্ত উপাসনা ও নির্ভরতা।

পিতা ফজর আলী ও মাতা আয়েশা খাতুনের সন্তান হিসেবে ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩ সালে পৃথিবীর পথে যাত্রা। জন্মগ্রাম হাওরখ্যাত মিঠামইনের ছিলিমপুরে। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে পেশাগত পরিচয়ে শিক্ষক। বাস করছেন নিজের শহর কিশোরগঞ্জে। নিজ জনপদে প্রতিশ্রুতিশীল সাহিত্য সংগঠন ‘সন্দীপন সাহিত্য আড্ডা’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।

প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থসংখ্যা ছয়— গৃহপালিত দুঃখ (কবিতা-২০১৫), অদৃশ্য কোলাহল (কবিতা— ২০২০), নির্বাক চুম্বন (কবিতা— ২০২২), চিচিংফাঁকের দেশ (ছড়া— ২০১০), জনক তুমি তীর্থভূমি (ছড়া— ২০১৬), তখন একাত্তর (নাটক— ২০১৪)।

এ-ছাড়াও সত্তর দশকের উল্লেখযোগ্য কবি আশুতোষ ভৌমিকের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে সম্পাদনা করেছেন ‘নিজের নির্জনে আশুতোষ ভৌমিক’।

তরঙ্গ, চৌপদী, সন্দীপন, উড্ডীন নামে সম্পাদনা করেছেন অনিয়মিত ছোটকাগজ।

কবিতাগ্রন্থ গৃহপালিত দুঃখ’র জন্য অর্জন করেছেন ‘সাহিত্য দিগন্ত লেখক পুরস্কার ২০১৮’।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

কৃষ্ণচূড়া

Read Next

ড. জসীমউদ্দিন আহমেদ : ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনের অনন্য পথিকৃৎ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *