অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শরিফুল ইসলাম -
দ্য স্যান্ডম্যান

গ্রিক মিথলজির গড সোমনাসের ছেলে মরফিয়াস ছিলেন ঘুম ও স্বপ্নের দেবতা। এই ঘুম ও স্বপ্ন অবশ্য মানুষের। অর্থাৎ মানুষ ঘুমালে যে স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্নের জগতে প্রবেশ করে সেটা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বে ছিলেন মরফিয়াস। মানুষ জেগে থাকা অবস্থায় যে জগতে ঘুরে-ফিরে বেড়ায়, সেটাকেই আমরা বাস্তব জগত অথবা একমাত্র জগত হিসেবে বিবেচনায় আনি। কিন্তু আমরা এও জানি যে, ঘুমোলে আমরা প্রবেশ করি আরেক জগতে এবং আমাদের ঘুমের অনুপাত জাগরণের অনুপাতের চেয়ে খুব একটা কম যে তাও নয়। সম্ভবত ঘুমন্ত মানুষের স্বপ্নের জগত তার বাস্তব জগতের চেয়েও বড়। ঘুমন্ত মানুষের স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্ন এবং সেই জগতের রিয়েলিটির গুরুত্বটা অনেক ভারি। সেজন্যই হয়ত স্বপ্নরাজ্য রাজ করার জন্য দরকার হয়ে পড়ে মরফিয়াসের মতো দেবতার।

সাইকোএনালিস্ট ফ্রয়েডও বুঝে ফেলেছিলেন মানুষের স্বপ্নের গুরুত্ব কতখানি। সেজন্য তিনি মানুষের সুবিশাল মনোজগতে প্রবেশ করার একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন স্বপ্নকে। ফ্রয়েড বলেন, মনুষ্যমনের অচেতন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জ্ঞান পাওয়ার মহারাস্তা হলো স্বপ্নের ব্যাখ্যা। তার মতে, মানুষের চৈতন্যে যা কিছু সামাজিক কারণে অবদমিত হয়ে পড়ে তার প্রতিফলন ঘটে স্বপ্নে। প্রতিফলন হোক কিংবা পরাবাস্তবতা হোক স্বপ্ন যে আমাদের আরেকটা জগত যেখানে আমাদের প্রবেশ ঘটে প্রতিদিন সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হতে পারি এমনিতেই। কারণ আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নের জগতটা আসলে কেমন? অদ্ভুত। এটা অদ্ভুত, কারণ এটাকে আমরা হুবহু বর্ণনা করতে পারি না। এবং আমাদের মনে হয় স্বপ্নের জগতে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। আমরা স্বপ্নে দেখি যে আমরা দৌড়াচ্ছি, কিন্তু আমাদের পা এগুচ্ছে না। আমাদের সেই অনুভূতি থেকেই হয়ত গ্রিক মিথলজির দেবতা মরফিয়াসের উৎপত্তি, যিনি আমাদের স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করেন, দুঃস্বপ্নকেও। কিন্তু আসলেই কি সেই জগতে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? এমনকি হতে পারে না যে সেই জগতের পুরোটাই আমাদের নিজেদের সৃষ্টি? হয়ত আমাদের চৈতন্যের সাথে অচৈতন্যের আপাত বিচ্ছিন্নতার কারণে আমরা স্রষ্টা হয়েও এই নিয়ন্ত্রণহীনতায় ভুগি।

চেতন আর অবচেতনে কি সম্পূর্ণ আলাদা? যেহেতু আমরা ঘুমিয়ে পড়লে আরেক ধরনের রিয়েলিটিতে নিজেদের আবিষ্কার করি, তাই মনে করা যায় যে ওটা অবচেতনের জগতে ঘটে। সেই হিসেবে চেতন আর অবচেতনের মাঝে একটা পার্থক্য থেকেই যায়। হয়ত চেতন আর অবচেতনের মাঝামাঝি একটা গ্রে থ্রেসহোল্ড থাকতে পারে যার অবস্থান ঠিক কোথায় আমাদের জানা নেই।

নীল গেম্যানের দ্য স্যান্ডম্যান তথা মরফিয়াসকেও দেখা যায় মানুষের স্বপ্নজগতের অমর দেবতা হিসেবে অথবা এখানে মরফিয়াস নিজেই স্বপ্ন। গ্রিক দেবতার মতোই দেখতে লম্বা, টিংটিঙে, সাদা অবয়বে কালো পোশাক পরে স্বপ্নজগতে ঘুরে বেড়ান স্যান্ডম্যান। স্যান্ডম্যান তথা মরফিয়াসের ভাই-বোনদের দেখা যায় ‘ডেথ’, ‘ডিজায়ার’ ও ‘ডেসপায়ার’ নামে এবং প্রতিবেশী হিসেবে দেখা যায় জাহান্নামের প্রধান শয়তান লুসিফারসহ আরও অনেককে। এদের মধ্যে কেউ এটা স্বীকার না করলেও মরফিয়াস বারবার নিজে স্বীকার করেন এবং অন্যদের মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, মানুষই স্বপ্নের স্রষ্টা। ডিজায়ার, ডেসপায়ার এবং শয়তানেরও। এক্ষেত্রে মরফিয়াসের বোন ডেথ-এর উপলব্ধি আরও গভীর। আপন বোন ডেথ (মৃত্যু)-কে যখন মরফিয়াস জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি এই মানুষ মারার কাজটা এত সহজে কীভাবে করো’, তখন উত্তরে মৃত্যু বলেন, ‘এটাই আমার কাজ। এবং এক্ষেত্রে মানুষকে আমার যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক আমাকেও মানুষের ততটুকুই প্রয়োজন।’

মানুষ ঘুমে যে জগতে প্রবেশ করে সেটই মূলত স্বপ্ন হলেও জাগ্রত অবস্থায়ও মানুষ স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নের ভিত্তি হল আশা। বাস্তব জগতের যে আসল রূপ সেটা যদি সবাই হুবহু দেখতে পারে কিংবা বুঝতে পারে, তাহলে বিষণ্ণতার চাপে কেহই সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবে না। আবার যদি জগতকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই সেটাকে ঠিক সেভাবেই দেখি, তাহলে বিভ্রান্তির ঠ্যালায় কেউ সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠিকমতো তার স্যান্ডেলই খুঁজে বের করতে পারবে না। আমরা হয়ত জগতকে একটা গোলাপি চশমার মধ্য দিয়ে দেখি। এই চশমা তৈরি হয় স্বপ্ন দিয়ে, আশা দিয়ে। বাস্তব জগতে স্যান্ডম্যানের চুরি হয়ে যাওয়া রুবিটা যখন এথেলের ছেলে জন ডি-এর হাতে পড়ে, তখন তার ভেতরে এক একরোখা ইচ্ছা জাগ্রত হয়, সেটা হল সে যেকোনো মূল্যে জগতে সকলের ভেতরের সত্যকে বের করে আনবে, যেখানে কেউই কারও সাথে মিথ্যে বলে না। তার হাতে থাকা রুবির শক্তিতে সব চরিত্র যখন একে অন্যের কাছে নিজের সকল সত্য অনুভূতি প্রকাশ করা শুরু করে, তখন ফলাফল হিসেবে দেখা যায় আত্মঘাতী এবং খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়ে গেছে সবাই। কেন? সত্যের ফলাফল এমন কেন?

জগতের বাস্তবতা অথবা সত্য ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না, আবার পুরোপুরি বাস্তবতা নিয়েও আমরা বাঁচতে পারি না। আমাদের বাস্তবতা লাগে, ভ্রমও লাগে। দুইটারই উদ্দেশ্য আছে, একটা আরেকটার উপর প্রভাব ফেলে, একটা আরেকটার পরিসীমা তৈরি করে দেয়। এই দুইয়ে মিলে দরাদরি করে মিটমাট হয়ে যে জগতের জন্ম দেয়, সেই জগতেই আসলে আমরা বেঁচে থাকি। তাই সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়া রক্তপাতের দৃশ্যে এসে জনকে স্যান্ডম্যান বলেন, তুমি যা মিথ্যা হিসেবে ঘৃণা করছ, তা তো কেবল মিথ্যা নয়— এতে লুকিয়ে আছে মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

 

Read Previous

‘চিহ্নমেলা মুক্তবাঙলা ২০২২’ অনুষ্ঠিত

Read Next

নিমন্ত্রণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *