অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সঙ্গীতা ইয়াসমিন। -
প্রসঙ্গ- লাস্ট ডিফেন্ডার অব মনোগামী

সবসময়ের মত আকুল আগ্রহ নিয়ে মুস্তাফা সারোয়ার ফারুকীর কাজ দেখতে চাই, আর যথারীতি একই অনুভব নিয়ে ঘরে ফিরি।শেষ হলে গিয়ে দেখেছিলাম বাংলাদেশে অমুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি “শনিবার বিকেল”। একই উপলব্ধি। যত গর্জে তত বর্ষে না।শুরুতেই নেতিবাচক ইঙ্গিত প্রদানের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ভিন্নতর কিছু পাবার আকাঙ্ক্ষা থেকেই হয়তো এমনটি হয় থাকে।

যদিও আমি কোনো বোদ্ধা চলচ্চিত্র পর্যালোচক নই।একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার প্রত্যাশা প্রাপ্তির সাথে সমাজ বাস্তবতার চিত্রাঙ্কনে গল্পটি কতটা সফল সেটুকু বলার স্বাধীনতা আমার আছে। সেকারণেই এই লেখার অবতারণা।গল্পটি আবর্তিত হয়েছে নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে, সেখানে আইনী সম্পর্কের বাইরে নারী-পুরুষ জড়িয়ে গেলে প্রতিদিনের জীবনে যেসকল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় চরিত্রগুলোকে সেভাবেই সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অন্তত দর্শক হিসেবে সেটাই কাঙ্ক্ষিত ছিল।

চঞ্চল চৌধুরী যেহেতু বিবাহিত এবং তাঁর সহকর্মী অবিবাহিত, সেক্ষেত্রে লামিয়া চরিত্রের আচার-আচরণ কর্মকাণ্ড ত্রুটিহীন ছিল বলা যায়।বাস্তবে দুটি সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় নারীদের প্রতিকুলতা অপেক্ষাকৃত বেশি হলেও এই নারী স্বাধীন, এবং কেরিয়ার সচেতন!তবে, একজন স্ত্রী অনুগত-প্রেমময় স্বামী হয়েও চঞ্চল চৌধুরীর দুম করে অন্য একটি শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া এবং সেটি কনফেস করতে গিয়ে শিশুদের মতো প্রেমিকার বিছানায় শুয়েই কাঁদবেন এ দৃশ্য বাস্তবতাবর্জিত, হাস্যকর এবং কোনোভাবেই পুরুষ চরিত্রটির অসাধারণ মনোজাগতিক বিশ্লেষণ নয়।

গল্পকার যেহেতু নিজেও পুরুষ; সেই চরিত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকেই একটু বেশিই উদারতা দেখিয়েছেন। আর সেখানেই নির্মানের দুর্বলতা সুস্পষ্ট হয়েছে। চঞ্চল চৌধুরীর নিজস্ব অভিনয় দক্ষতা দিয়ে যতটুকু সম্ভব কাভার করার চেষ্টা করেছেন এ কথা সত্য। তবে, এই গল্পের সূত্রপাত এবং বিস্তার আমার কাছে যেমন গতানুগতিক মনে হয়নি।একইভাবে কোনো অসাধারণত্বও খুঁজে পাইনি।কেননা, বাস্তবতা হল এর বিপরীত।

অপ্রিয় সত্য হল সহজাতভাবেই মানুষ পলিগামী। জাহার বছরের সাংস্কৃতিক চর্চা ও নানাবিধ সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সভ্যতার বিবর্তনের ফলে আজ এই জায়গায় এসেছে। এই যে ভাঙন এবং টানাপোড়েন এসবই জীবনের অংশ, সমাজেরও অংশ।আমরা অস্বীকার করলেও এটাই সত্য যে পরিবার-পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে পড়ে  মানুষ বাধ্য হয় মনোগামীর ভূমিকায় অভিনয় করতে। যার কাছে বহুগামীতা অপরাধ সেটা তাঁর বিশ্বাস।আর সেই বিশ্বাসের ভিতই তাঁর জন্য যথেষ্ট অন্য কোনো সম্পর্কে না জড়ানোর ক্ষেত্রে, কিংবা সহজেই নিজেকে অন্য সম্পর্ক থেকে মুক্ত করে নিতে।

প্রকৃতি ও আমাদের হাজার বছরের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা পুরুষের বহুগামীতাকে সজহপাচ্য করে দিয়েছে এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। সেক্ষেত্রে ভালোবাসা-দায়িত্ব খুব বেশি ক্লিশে শোনায়, অন্তত আজকের সমাজে দাঁড়িয়ে। এমন হাজারো প্রেমময় ঘর ভেঙে গেছে বিশ/ত্রিশ বছর পরে। স্ত্রী সন্তানের প্রতি ভালোবাসা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বহুগামীতা কিংবা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময়তাই এর জন্য দায়ী।যারা এটা মানতে পারেন না  সেটাও সংস্কার।হাজার বছরের সংস্কার থেকে মানুষের মুক্তি সহজে মেলে না। নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য মানুষ একদিন নিজেকেই হয়তো কাঠগড়ায় তোলে।

মুস্তাফা সারোয়ার ফারুকী সম্ভবত সে কথাই বলতে চেয়েছেন এই গল্পে।দুঃখজনক সত্য হল দর্শককে তাঁর মাইন্ড রিড করার দায়িত্ব দিয়েছেন।এটা তো কবিতা নয়। ভাবসম্প্রসারণও নয়!স্ক্রিপ্ট দিয়ে মূল বার্তাটি বোঝাতে সক্ষম হতে হবে। এঁর সম্বন্ধে একটা কথা না বলে পারছি না। যদিও এই মন্তব্যে আমাকে যেকেউ বোল্ড আউট করে দিতেই পারেন। তবুও দায়িত্ব নিয়েই বলছি-

ইনি আমাদের বাদশাহ নামদারের মত অনেকাংশেই ওভাররেটেড। কেবল একটা মুভি দেখেই এ কথা বলছি না। সম্ভবত তাঁর নির্মিত সবগুলো মুভি দেখেই বললাম।তবুও নাই মামার চেয়ে কানামামা ভালো। আশায় বুক বাঁধি।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে আরও অনেক ভালো ভালো কাজ হচ্ছে অনুমান করি।হয়তো আমার জানা নেই সবগুলো। নুহাশের মূর্ধণ্য ষ পুরুষ্কার পেয়েছে শুনেছি, যদিও দেখা হয়নি। তৌকিরের কিছু কাজ দেখেছি।খুবই ব্রিলিয়ান্ট মনে হয়েছে।নিকট অতীতে আর তেমন কারও কাজ দেখিনি ফারুকীর সাথে তুলনা করার, কিংবা তুলোধূনো করার মত। সে কারণে বলতে পারি, ইনি আমাদের কাছে মন্দের ভালো।

এই গল্পটাই কৌশিক গাঙ্গুলির হাতে পড়লে হয়ে উঠত অনন্য সাধারণ। যেমন অর্ধাঙ্গিনী! খুবই সাধারণ গল্প। অথচ, অসাধারণ তার উপস্থাপন। কেন জানি মনে হয় ফারুকীর গল্পগুলো সিনেমা হতে হতে হয়ে উঠতে পারে না আর। পরিশেষে বলব একটু ভিন্ন চিন্তার জন্য তবু ভালোবাসা! জয় হোক বাংলা চলচ্চিত্রের, জয় হোক বাংলা সংস্কৃতির।আরও ঋদ্ধ হয়ে উঠি মন-মননে।

সঙ্গীতা ইয়াসমিন।
লেখক, প্রাবন্ধিক।
টরন্টো, কানাডা।

 

 

 

 

Read Previous

‘‘জার্নি টু দ্য প্যারালাল ওয়ার্ল্ড’’ : ভিন্ন চিন্তার গল্প

Read Next

এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *