অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শাপলা সাদী -
ভয়ঙ্কর রাত্রি

পর্ব ১ : গাদ নগরী

৩০০০ BC, জর্ডান নদীর পূর্ব উপকূলে, নেগেভ মরুভূমির ১০০ শত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবাল পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে উঠেছে ছোট্ট একটা নগরী, নাম তার গাদ।

পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে গামলা আকৃতির বিশাল একটা লেক, লেকে রয়েছে টলটলে স্বচ্ছ নীল পানি। এই স্বচ্ছ পানির লেককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গাদ শহরের বিস্তৃতি। এবাল পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে জলপাইয়ের বাগান, আরও রয়েছে স্বাদুপানির কিছু ঝর্ণা। গাদ শহরটি ক্রমে ক্রমে, হিট্টিয় এবং অমালেকিয়দের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় তীর্থ স্থান হয়ে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হচ্ছে এই গাদ শহরেই রয়েছে উর্বরতার দেবতা বাআল এবং দেবী আশেরাহর প্রধান মন্দির হেপোটি।

হিট্টিয় এবং অমালেকিয়রা তাদের নিজ নিজ দেবতা এবং দেবীদের পাশাপাশি বিদেশি দেবতা বাআল এবং দেবী আশেরাহ্-রও পূজা করে থাকে।

প্রায় একশত বছর হতে চলল গাদ শহরের হেপোটি মন্দিরটি হিট্টিয় এবং অমালেকিয়ও দের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে।

বাআল এবং আশেরাহর প্রধান মন্দিরটির নাম হচ্ছে হেপোটি।

হেপোটি মানে দাড়ায় স্বর্গীয় বা পবিত্র প্রাসাদ।

এই হেপোটি মন্দিরটি পাহাড়ের পাথর কেটে কেটে গড়ে তোলা হয়েছে। মাঝে মাঝে বিশেষ বিশেষ জায়গায় স্বর্ণ দিয়ে কারুকাজ করা রয়েছে।

বিশাল আকৃতির জাঁকজমকতায় পূর্ণ মন্দিরটির চত্বরের মাঝখানেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে দেবতা বাআল এবং দেবী আশেরাহ-র স্বর্ণের মূর্তি, মূর্তি দুটি উচ্চতায় পনের কিউবিট এবং চওড়ায় চার কিউবিট করে দণ্ডায়মান রয়েছে।

বিশাল আকৃতির মূর্তি দুটির সামনেই রয়েছে ১৬/ ১০ ফিটের একটা বেদি। এই বেদিতেই প্রতি বছরের আবিব মাসের পূর্ণিমা রাতে ফাইলো উৎযাপনের পর পশু এবং নবজাতক শিশুদের উৎসর্গ করা হয়ে থাকে। তখন মন্দিরের চারপাশ রক্ত এবং চর্বির গন্ধে মানুষের মস্তিষ্কে নেশা এবং ভ্রমের সৃষ্টি করে।

পর্ব ২ : ফাইলো উদযাপন

পবিত্র মন্দিরটির চারপাশ ঘিরে রয়েছে মোট আটচল্লিশটি বড় বড় কুঠুরি।

এই সকল মন্দিরের কুঠুরিতে মন্দিরের ভাববাদী এবং ভাব্বাদিনিরা বসবাস করে থাকে।

মূলত এই সকল ভাববাদী এবং ভাব্বাদিনিদের কাজ হচ্ছে কাঠি চালিয়ে মানুষের ভবিষ্যদ্বাণী করা এবং যৌনসেবা দিয়ে টাকা রোজকার করা।

আর এই সকল ভবিষ্যদ্বাণী এবং যৌনসেবা পাওয়ার উদ্দেশ্যেই মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এর কাফেলা এই শহরে প্রতিনিয়ত তীর্থ উদযাপন করতে এসে থাকে।

আজ আবিব মাসের পূর্ণিমা, আকাশে কোটি কোটি নক্ষত্রের মাঝে বড়ো একটা চাঁদ জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। স্বচ্ছ আকাশে তারকাগুলোও চাঁদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের উজ্জ্বলতার বিকিরণ ছড়াচ্ছে।

আজ হেপোটি মন্দিরে, হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটেছে। কিছুক্ষন পরেই শুরু হবে ফাইলো উদযাপন।

হেপোটি নগরীর সকল অধিবাসী এবং তীর্থযাত্রীরা সেই উদযাপন দেখার অপেক্ষায় সারি সারি হয়ে মন্দিরের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আজকের ফাইলো উদযাপনের জন্য প্রতিবারের মতো মন্দিরের ৩৬ জন নারী ভাব্বাদিনি এবং ৩৬ জন পুরুষ ভাববাদী অংশগ্রহণ করেছে। মন্দিরের চত্বরের দূর প্রান্তে বাঁধা রয়েছে একশতটি মোষ ও গরু এদের সকলকেও দেবতা বাআল ও দেবী আশেরাহ-র উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হবে। সারারাত ধরে উৎসর্গ করার পশুগুলোর মাংস দিয়ে রান্না করা হবে ফাইলো অনুষ্ঠানের ভোজের খাবার।

গাদ শহরে ৩৬ সংখ্যাটিকে পবিত্র হিসাবে ধরা হয়ে থাকে। কারণ তিন হচ্ছে মিলনের সংখ্যা এবং ছয় হচ্ছে ভালোবাসার সংখ্যা।

ফাইলো হচ্ছে মূলত নারী এবং পুরুষের যৌন সঙ্গমের একটি আদিম অনুষ্ঠান। আমাদের ভাষায় একে সেক্স রিচুয়াল বলা হয়ে থাকে।

খোলা চত্বরে দেবতা এবং দেবীর মূর্তির সামনে আকাশের নিচে নর এবং নারী পবিত্র রতিক্রিয়ায় মিলিত হবে আর সেগুলো জনতারা দেব দেবীর মিলন হিসেবে উপভোগ করবে।

ফাইলোতে অংশ গ্রহণকারী পুরুষগুলো উর্বরতার দেবতা বাআল-এর প্রতিনিধিত্ব করে এবং নারীগুলো যৌনতার দেবী আশেরাহ-র প্রতিনিধিত্ব করে।

পুরুষ এবং নারী উভয়ের মিলনের মাধ্যমে সংগঠিত হয় ফাইলো অনুষ্ঠানটি।

পর্ব ৩ : লিলিয়ান

মন্দিরের চত্বর থেকে প্রায় অনেকটাই দূরে দেখা যাচ্ছে, মন্দিরের একশতটি গেটের মধ্যে থেকে একটি বিশাল গেট দিয়ে একজন মধ্য বয়স্ক পুরুষ এবং একজন মোটা তাজা মহিলা এক সুন্দরী যুবতী মেয়েকে টেনে-হিঁচড়ে মন্দিরের ভেতরে নিয়ে আসতে চাইছে।

তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে যুবতী মেয়েটির উপর তারা জোর খাটাচ্ছে।

যুবতী মেয়েটি খুব সুন্দরী এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার জলপাই রঙের গাঢ় সবুজ মণি থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে একই সাথে আতঙ্ক এবং ঘৃণাময় দৃষ্টি।

আতঙ্কগ্রস্ত সুন্দরী যুবতীটির নাম হচ্ছে লিলিয়ান। লিলিয়ানকে যাঁরা ধরাধরি করে নিয়ে আসছে, তারা হচ্ছে লিলিয়ানের বাবা ও মা।

এটা একটা রীতি। যদি কোনো যুবতীকে মন্দিরের ভাব্বাদিনি হিসাবে উৎসর্গ করার মানত করলে মানতের মেয়েটিকে ফাইলো উদযাপনের অনুষ্ঠান স্বচক্ষে দেখে উপভোগ করতে হয়।

লিলিয়ানের এখন পনের বছর বয়স চলছে, আগামী বছর তার বয়স ষোল পূর্ণ হবে।

আজকের পবিত্র রাতে তাকে তার বাবা এবং মা ফাইলো উদযাপন দেখানোর জন্যই নিয়ে আসছে। কারণ আগামী বছরই তো তারা তাদের মেয়েকে এই কাজের জন্য দেবতা এবং দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবে বলে মানত করেছে। তখন তাদের মেয়েও এই মন্দিরের একজন ভাব্বাদিনি হিসাবে পরিগণিত হবে।

কিন্তু এই সব নোংরা চরিত্রের ভাব্বাদিনি হওয়ার জন্য লিলিয়ানের রয়েছে ঘোর আপত্তি।

লিলিয়ান মনে-প্রাণে দেবতা বাআল আর দেবী আশেরাহ্-এর মূর্তি দুটোকে ঘৃণা করে।

বিকৃত রুচির মূর্তি দুইটি তাকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে পারে না।

লিলিয়ান ছোটবেলা থেকেই বাস্তবধর্মী চিন্তা-ভাবনার অধিকারী। সে মূলত কাল্পনিক কোনো কিছুই বিশ্বাস করে না।

ধর্মের প্রতি তার কোনো ভক্তি ছিল না এবং এখনও নেই।

হাজার হাজার জীবন্ত মানুষ যখন মূর্তি পূজা করে তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে— মানুষের হাতে গড়া মূর্তি কীভাবে জীবন্ত মানুষগুলোর প্রভু হতে পারে?

লিলিয়ানকে যখন তার বাবা-মা টেনে-হিঁচড়ে মন্দিরে প্রবেশ করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন মন্দিরের দর্শক সারির ভিড় থেকে একজন লম্বা চওড়া লোক বেরিয়ে এসে লিলিয়ানকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল এবং লিলিয়ানের মায়াবী সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়ে লিলিয়ানের বাবা ও মাকে জিজ্ঞাসা করল, বেচবে নাকি মেয়েটিকে?

লিলিয়ানের মা লোকটিকে জানালো আগামী বছরই আমার মেয়েকে এই মন্দির এর ভাব্বাদিনি বানানোর জন্য উৎসর্গ করা হবে, তাই আজ আমরা ওকে দেখাতে নিয়ে এসেছি কীভাবে ফাইলো উদযাপনে অংশগ্রহণ করে দেবতা ও দেবীর আশীর্বাদ পাওয়া যায়। ওকে আমরা বেচব না, উৎসর্গ করব।

লোকটি বলল, এত সুন্দরী মেয়েকে উৎসর্গ করে কী পাবে? আমার কাছে বেচে দাও। ভালো পয়সা দেব।

লিলিয়ানের মা বিরক্ত হয়ে লোকটিকে বলল, তুমি এখন যাও তো বাপু। আমাদের জ্বালিও না। এমনিতেই এই অবাধ্য মেয়ে অনেক অশান্তি করে রেখেছে।

লিলিয়ানের মায়ের মুখের বীভৎস গালি শুনে লোকটি আর একটি কথা না বলে তাদের সামনে থেকে চলে গেল।

টানা-হেঁচড়ার কারণে লিলিয়ানের জামার হাতার একটা অংশ ছিঁড়ে গেছে সেই সাথে তার পায়ের তলায় কিছুটা ক্ষতের ও সৃষ্টি হয়েছে।

মন্দিরে উৎসব শুরু করার জন্য মন্দিরের পূজারীরা বীণা এবং শিঙা বাজাতে শুরু করে দিয়েছে।

লিলিয়ান কোনোমতেই এই নোংরা উৎসবে অংশগ্রহণ করতে চায় না বলে সে তার বাবা-মায়ের সাথে মন্দিরে প্রবেশ করতে চাইছে না। আর এই জন্যই লিলিয়ানের সাথে জোরাজুরি করা হচ্ছে।

পর্ব ৪ : লিলিয়ানের ছোটবেলা

ছোটবেলা থেকেই লিলিয়ান সবার থেকে আলাদা প্রকৃতির শিশু ছিল।

সব কিছুর প্রতিই তার ছিল ভীষণ কৌতূহল।

ভাবুক প্রকৃতির লিলিয়ান ছোট থেকেই সে সব কিছু নিজের মতো করে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করত, যে কোনো বিষয়ের উপর যুক্তি অনুযায়ী নিজে নিজে প্রশ্ন তৈরি করে নিজেই তার উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করত।

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই লিলিয়ান বুঝে ফেলেছিল যে সে একটা মূর্খ ও কুসংস্কার আচ্ছন্ন পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছে।

তার পরিচিত এই সমাজের মানুষগুলো যে কোনো কিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস করে এবং মনে প্রাণে সেই বিশ্বাসগুলোকে আগলে রাখার ভীষণ চেষ্টা করে।

ধর্মের নামে যে নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ডগুলো তাদের নগরীর মন্দিরগুলোতে ঘটতে থাকে তা কোনো সুস্থ মানুষের জন্য মেনে নেওয়া অতীব কঠিন বিষয়।

লিলিয়ান একই সাথে যুক্তিবাদী এবং বাস্তববাদী কিশোরী সে তার দাদির কাছে থেকে বাস্তবতার জ্ঞান অর্জন করেছে তাই সে যুক্তির মাপকাঠি দিয়ে সব কিছু বিচার করতে শিখেছে। আজ প্রায় ছয় মাস হল লিলিয়ানের দাদি মারা গেছেন। তিনি থাকলে আজ হয়ত লিলিয়ানকে এই অবস্থায় পড়তে হত না। তার বাবা ও মায়ের সাহস হত না এই মন্দিরে নিয়ে আসার।

লিলিয়ান তার পরিবার ও এই নগরীর বাসিন্দাদের ধর্ম এবং তাদের সংস্কারের কোনোকিছুই পছন্দ করে না।

লিলিয়ানের চিন্তাভাবনা তার বাবা ও মায়ের চিন্তাভাবনার থেকে একদম বিপরীত।

লিলিয়ান তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, তার মাও এই মন্দিরের একজন ভাব্বাদিনি ছিলেন, লিলিয়ানের বাবা, ছয় পোটলা গিনি সোনা এবং তিন পোটলা চান্দির মোহরের বিনিময়ে মন্দিরের পূজারীদের কাছ থেকে ক্রয় করে নিয়ে লিলিয়ানের মাকে বিয়ে করেছেন।

বিয়ের আগে লিলিয়ানের বাবা একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু লিলিয়ানের মাকে বিয়ে করার পর থেকে ক্রমে ক্রমে তার সম্পদ কমে আসতে থাকে। তাদের বিয়ের দশ বছর পরে লিলিয়ানের জন্ম হয়েছে।

লিলিয়ানের জন্মের পূর্বে তার একটা ভাই জন্মেছিল।

তার ভায়ের আবিব মাসে জন্ম হয়েছিল বলে, দেবতা বাআল-এর উদ্দেশ্য ৯ দিনের শিশুকে বলিদান দিয়ে উৎসর্গ করা হয়েছে।

লিলিয়ানের বাবা-মা এখন খুব দরিদ্র অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের সন্তানসন্ততি কম বলে, তাদের আয় রোজগারও কম।

মেয়েকে ভাব্বাদিনি বানাতে পারলে, সারাজীবন পায়ের উপর পা তুলে কাটিয়ে দিতে পারবে লিলিয়ানের বাবা-মা। এই চিন্তাতেই তারা বুকে আশা বেঁধে আছে। আরও মেয়ে থাকলে তারা তাদের সেই মেয়েগুলোকেও ভাব্বাদিনি বানাতে পারত, এতে তারা অনেক ধনী হয়ে যেত কিন্তু লিলিয়ানের বাবা-মায়ের কপালে এত সুখ লেখা নেই তাই তাদের একটি মাত্রই মেয়ে রয়েছে।

পর্ব ৫ : অনুষ্ঠানের সূচনালগ্ন

রাত এক প্রহর পেরিয়ে গেছে হেপোটি মন্দিরে বজ্রনিনাদ সুরে শিঙা এবং বীণা বেজে উঠেছে, এইদিকে হাজার হাজার মানুষের হট্টগোলে গাদ নগরীতে কান পাতা দায়।

লিলিয়ান মনে মনে প্রার্থনা করছে যেভাবেই হোক সে যেন আজ এই নোংরা এবং অপবিত্র পরিবেশ থেকে পালাতে পারে।

মনে মনে সে তার দাদিকে স্মরণ করছে।

লিলিয়ান খুব ভালোমতোই জানে আর কিছুক্ষণ বাদে মন্দিরের ভেতরে কী ঘটতে চলেছে।

লিলিয়ান যখন মাত্র আট বছরের শিশু তখন সে তার বান্ধবীদের সাথে চুরি করে মন্দিরে প্রবেশ করে মন্দিরের এক কোণায় লুকিয়ে থেকে এই ফাইলো উদযাপন দেখেছিল।

পুরুষ আর নারীর একে অপরের সাথে মিলিত হওয়ার সেই নোংরা দৃশ্য কোনোদিনও ভুলতে পারবে না। সেই দৃশ্য দেখে তার মনে ভয় এবং আতঙ্ক পেয়ে বসেছিল। সেই দৃশ্য দেখার পর থেকে দুই রাত সে ঘুমোতে পারেনি এবং কিছুদিন কিছু খেতেও পারেনি।

আর আজ তাকে কি না সেই দৃশ্য দেখানোর জন্য জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

লিলিয়ানের ঘোর আপত্তির পরেও লিলিয়ানের বাবা-মা তাকে জোর করে এইখানে নিয়ে এসেছে।

লিলিয়ান মন্দিরের গেটের সোনার দণ্ড ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে আর মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতে চায় না। গেটে থেকেই সে দেখতে পাচ্ছে মন্দিরের চারপাশে জ্বালানো মশালের আলোতে মন্দিরের চত্বর এবং স্বর্ণের দুই মূর্তি মশালের আগুনের হলুদ আলোর আভায় ভেসে যাচ্ছে।

মূর্তি দুটির সামনেই সারি সারি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নগ্ন নারী ও পুরুষেরা।

আর কিছুক্ষণ পরেই শিঙা এবং বীণা বাজানো বন্ধ হয়ে গেলেই নগ্ন নারী এবং পুরুষগুলো মেতে উঠবে ফাইলো উদযাপনে।

কিন্তু না, একী ! দূর থেকেই লিলিয়ান দেখতে পেল মন্দিরের ভেতরে ভয়াবহ কিছু একটা ঘটে চলেছে, যার কারণে নগ্ন মানুষগুলো মন্দিরের চত্বরে দিশেহারার মতো এইখান থেকে সেইখানে ছুটে বেড়াচ্ছে।

আরও কিছুক্ষণ পরে লিলিয়ান চাক্ষুষ করল হাড় হিম হয়ে যাওয়া ঘটনা, সে দেখতে পেল একটা মোটা তাজা মোষ পায়ের তলে যাকে পাচ্ছে তাকেই চটকাচ্ছে।

লিলিয়ানের বাবা-মাও আর সবার মতো দিশেহারা হয়ে ছোটাছুটি করতে শুরু করে দিয়েছে।

লিলিয়ান ঠায় সেখানেই গেটের দণ্ড ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে, কী করবে এখন বুঝতে পারছে না।

হঠাৎ করেই একজন অশীতিপর বৃদ্ধা মহিলা লিলিয়ানের কাছে এসে বলল— লিলিয়ান, এই তোমার সুযোগ এই সকল নোংরা মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার। এখন যদি না পালাও তবে সারা জীবন তোমাকে এই নোংরা মূর্তি দুইটির ভাব্বাদিনি হয়ে কাটিয়ে দিতে হবে।

লিলিয়ান প্রশ্নের দৃষ্টি নিয়ে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কীভাবে জানলেন যে, আমি এই মূর্তি দুটোকে পছন্দ করি না? মূর্তিদের উপর আমার এই ঘৃণাগুলো কারও কাছেই তো কোনোদিন প্রকাশ করিনি, অথচ আপনি জানলেন কী করে? আর আপনিইবা কে? আগে তো আমি আপনাকে কখনো দেখিনি! আর আমি এই নগরী ছেড়ে পালিয়েইবা কোথায় যাব?

বৃদ্ধা বলল, মানুষ অনেক কিছুই জানে না, অনেক কিছুই বোঝে না, আবার মানুষ যা জানে তা বোঝে না এবং যা বোঝে তা মানতে চায় না। লিলিয়ান, তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। আমি তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী। তুমি এই নগরী ছেড়ে পাহাড় ডিঙিয়ে নদীর তীরের দিকে চলে যাও, সেখানে তুমি পবিত্র মানুষদের দেখা পাবে। যারা তোমাকে উদ্ধার করবে এবং তোমাকে আলোর পথ প্রদর্শন করবে। তারা হচ্ছে জ্ঞানী জাতি, গুণী জাতি। শীঘ্রই পালাও লিলিয়ান, এই তোমার সুযোগ।

পর্ব ৬ : নিরুদ্দেশের পথে লিলিয়ানের যাত্রা শুরু

কথাগুলো বলে বৃদ্ধা মহিলাটি ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

লিলিয়ান আবার মন্দিরের ভেতরের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। এখন মোষটি একা নয় তার সাথে আরও তিন চারটা অথবা আরও বেশি মোষ মিলে মন্দিরের চত্বরে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে।

লিলিয়ান দেখল শত শত মানুষ মোষের পায়ের তলে চটকিয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছে।

লিলিয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে মন্দির থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পিছু নিয়ে খোলা রাস্তায় এসে দাঁড়ালো।

মন্দিরের ভেতরে যে কিয়ামত ঘটে যাচ্ছে বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় নেই।

লিলিয়ান রাস্তা বরাবর তার ক্ষত পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে হেঁটে চলেছে। কিছুদূর আসার পরে সে বুঝতে পারল কেউ তার পিছু নিয়েছে, পেছন ফিরে তাকাতেই সে দেখতে পেল সেই লম্বা চওড়া ব্যক্তিটিকে যে তার মাকে লিলিয়ানকে তার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করেছিল।

লিলিয়ান বুঝতেই পারছে সামনে মহাবিপদ, কারণ সে লোকটির চোখে-মুখে একধরনের লালসার ছাপ দেখতে পাচ্ছে।

লিলিয়ান এখন যে রাস্তাটি দিয়ে হেঁটে চলেছে সেটি ফাঁকা, লোকটি যদি লিলিয়ানকে আক্রমণ করে তবে তাকে বাঁচানোর কেউ নেই।

এখন সে কী করবে ভয়ে নির্জীব হয়ে আসছে।

রাতের এক প্রহর পার হয়েছে, মন্দিরের পথ ছেড়ে পাহাড়ি ঢালু রাস্তার উপরে উঠে এসেছে লিলিয়ান। পাহাড়ের এইদিকে লিলিয়ানের আগে কখনই আসেনি। ফাঁকা রাস্তা, তবে সুখের বিষয় মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই কিছু কিছু মানুষের আগমন ঘটছে থেকে থেকে।

সবারই গন্তব্য মন্দিরের দিকে, মন্দিরে এখন কী ঘটছে লিলিয়ান আর জানে না এবং তার বাবা ও মায়ের কপালে কী জুটেছে তাও সে জানে না। রাস্তার এক পাশে রয়েছে ডালিমের বাগান এবং অন্যদিকে পাহাড়টি সোজা চারশ’ ফুট নেমে গিয়ে পৃথিবীর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

রাতের স্বচ্ছ আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে সোনার থালার মতো বড় একটা চাঁদ, হুহু করে বয়ে চলেছে আবিব মাসের মৃদুমন্দ শীতল বাতাস। চারিদিক ডালিম ফুলের গন্ধে ভেসে যাচ্ছে।

এইদিকে লিলিয়ানের পেছনে থাকা ব্যাক্তিটি একই দূরত্ব বজায় রেখে লিলিয়ানকে অনুসরণ করে যাচ্ছে। কী করবে লিলিয়ান ভেবে উঠতে পারছে না। আগে কোনোদিন সে এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েনি। লিলিয়ান বুঝে গেছে দুর্বৃত্ত লোকটি লিলিয়ানকে শিকারি কুকুরের মতো করে শিকার করতে চাইছে।

এখনও লোকটি তার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেনি তার কারণ হচ্ছে মাঝে মাঝে পথযাত্রীদের উদয় হচ্ছে ঠিক সেই জন্যেই। দুর্বৃত্ত লোকটি যখন লিলিয়ানকে একা পাবে ঠিক তখনই লিলিয়ানের উপর হামলে পড়বে।

লিলিয়ান তার বাড়ির পথ না ধরে কেন যে এই পথে চলে এল যার কারণে তাকে এই বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

আরও কিছুদূর যাওয়ার পর লিলিয়ান দেখতে পেল পাহাড়ের ঢাল এবং রাস্তার কিনারা ধরে, মন্দিরে দেখা সেই বৃদ্ধা মহিলাটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। লিলিয়ান বৃদ্ধা মহিলাটিকে দেখা মাত্র কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেল।

খোঁড়া পা নিয়ে সে বৃদ্ধা মহিলাটির কাছে ছুটে গেল, লিলিয়ান কিছু বলার আগেই বৃদ্ধা মহিলাটি বলল, ভয় পেও না, লিলিয়ান। তোমার এই বিপদ থেকে তুমি নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পার।

লিলিয়ান জানতে চাইল কীভাবে তা সম্ভব? আমি কীভাবে একা পেরে উঠব ওই বিশালদেহী লোকটির সঙ্গে? লিলিয়ান লোকটির দিকে ইঙ্গিত করতেই সে দেখতে পেল লোকটি দশ গজ দূরে চোখ-মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লিলিয়ানের ধারণা হল, লোকটি বোধহয় বৃদ্ধাকে দেখে সাবধান হয়ে গেছে।

বৃদ্ধা মহিলাটি লিলিয়ানকে বলল, লোকটি এখন তোমার কাছে আসবে, তুমি বসে পড়ো, এবং একমুঠো ধূলি নাও। লোকটি যেন কোনোভাবেই দেখতে না পাই তোমার হাতে ধূলি আছে। সে যখন তোমাকে আক্রমণ করতে আসবে ঠিক তখনই তুমি লোকটির চোখে ধুলো দিয়ে ডালিম বাগানে লুকিয়ে পড়বে।

লিলিয়ান বৃদ্ধাকে বলল, এত কথা বলছ অথচ আমাকে সাহায্য করছ না কেন?

আমি তো তোমাকে বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করছি, বাছা। এর চেয়ে বেশি সাহায্য আমি তোমাকে করতে পারব না।

লিলিয়ান জিজ্ঞাসা করল, কেন পারবে না? কিন্তু সে কোনো উত্তর পেল না। এইদিকে দুর্বৃত্ত লোকটি লিলিয়ানকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরেছে। লিলিয়ান বৃদ্ধার পরামর্শ অনুযায়ী পায়ের ক্ষত দেখার বাহানা করে মাটিতে বসে পড়ে এক মুঠো ধুলো নিল। দুর্বৃত্ত লোকটি আর মাত্র পাঁচ গজ দূরে রয়েছে। লিলিয়ান ভয় পেয়ে বৃদ্ধার দিকে তাকাল কিন্তু দেখল সেখানে বৃদ্ধা নেই, বৃদ্ধা মহিলাটি যেন হাওয়া হয়ে উবে গেছে।

লোকটি আর মাত্র তিন গজ দূরে রয়েছে, লিলিয়ান কিন্তু ইচ্ছা করে মাটিতেই বসে রয়েছে, লোকটি তার কাছে আসা মাত্র লোকটিকে সে ভড়কে দিয়ে বলল, আমাকে কি আপনি সাহায্য করবেন উঠে দাঁড়াতে?

দুর্বৃত্ত লোকটি লিলিয়ানের স্বাভাবিকভাবে কথা বাত্রার ধরন দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। লোকটির ধারণা ছিল, মেয়েটি তাকে দেখে ভয়ে প্রায় আধমরা হয়ে গেছে। তার অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের ভয় পেয়ে আধমরা মেয়েদের খুব সহজেই শিকার করা যায়। অথচ মেয়েটি খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে তার সাথে, কিছুক্ষণ আগেই সে দেখল মেয়েটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাতাসের সাথে কথা বলছে। লোকটির ধারণা হয়েছে ভয় পেয়ে মেয়েটির হয়ত মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই সে এমন আচরণ করছিল। কিন্তু এখন দেখছে সে একদম স্বাভাবিক আছে।

লোকটি তার নোংরা হলুদ দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল, উঠে দাঁড়ানোর দরকার নেই তোমার, কারণ আমি যা করতে যাচ্ছি তোমার সাথে তা শুয়ে করতে হয়।

এই বলে লোকটি লিলিয়ানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত হতেই, সেই মুহূর্তে লিলিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে লোকটির চোখ লক্ষ করে একমুঠো ধূলি ঝেড়ে দিল।

লোকটির চোখে ধুলো পড়ায় লোকটি কিছুক্ষণের জন্য অন্ধ হয়ে গেল।

আর এই সুযোগে লিলিয়ান রাস্তার পাশের ডালিম বাগানে গা ঢাকা দিল। রাতের বেলা বাগানে কেউ লুকিয়ে থাকলে তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

লিলিয়ান ক্ষত পা নিয়ে ছুটতে ছুটতে বাগানের শেষ প্রান্তে চলে এলো, কতক্ষণ ছুটেছে তার কোনো ধারণা নেই। বাগানের শেষ প্রান্তে এসে সে দেখল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা সরু পায়ে হাঁটা পথ নিচে নেমে গেছে।

কিছু চিন্তা না করেই সে সরু পথটি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। যাবার সময় লিলিয়ান একটা ডালিম গাছের ডাল ভেঙ্গে নিল। ডালিম গাছের ডালটি দুইটা কাজে আসবে এক ডালিম গাছের ডালটি লাঠি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে এবং ডালিম পাতার রস দিয়ে সে তার পায়ের ক্ষতের পরিচর্যা করবে।

প্রায় ত্রিশ গজ নামার পর লিলিয়ান একটা পাথরের বোল্ডারের পাশে বসে পড়ল। কারণ সে আর পারছে না ক্লান্ত শরীরটাকে বয়ে নিয়ে চলতে। পানির পিপাসায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। এইদিকে পায়ের যন্ত্রণা তো রয়েছেই।

পাথরের বোল্ডারে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর যখন সে একটু থিতু হয়ে এল, তখন সে তার পায়ের ক্ষতের পরিচর্যা করা শুরু করে দিল।

ডালিম পাতা চিবিয়ে পায়ের ক্ষতে তার রস লাগাল।

ডালিম পাতা চিবানোর সময় প্রথম প্রথম সেটা তেতো বলে মনে হলেও পরে কিন্তু হালকা মিষ্টি বলে মনে হল তার কাছে।

পিপাসায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে তাই লিলিয়ান ডালিম পাতাগুলোই চিবিয়ে চিবিয়ে রস খেতে থাকল।

ডালিম পাতার রস খাবার আগে প্রথমে সে ভাবল ডালিম পাতার রস কি খাওয়া যায়?

মনে মনে সে যুক্তি দাঁড় করাল, কেন খাওয়া যাবে না! ডালিম ফল যদি খাওয়া যায় তবে ডালিম পাতাও খাওয়া যায়। এই যুক্তি মেনে সে ডালিম পাতাগুলো চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল।

ডালিম পাতা খাবার কিছুক্ষণ পর লিলিয়ান অনুভব করল যে তার পায়ের ক্ষতের ব্যাথাটা অনেকটাই কমে আসছে। তার আর পিপাসাও লাগছে না। শরীরে কিছুটা শক্তিও ফিরে পেয়েছে।

এখন রাত্রি হয়তো দ্বিপ্রহর হবে, চাঁদ এখনও মধ্য গগনে রয়েছে। লিলিয়ান বোল্ডারে হেলান দিয়ে তার ফেলে আসা দিনগুলো স্মৃতিচারণ করছে।

পর্ব ৭ : আতঙ্কের প্রহর

অতীব দরিদ্র ঘরের মেয়ে লিলিয়ান, সে সারাদিন ধরে বাগির কাজ এবং পাহাড়ের ঢালে ভেড়া চরিয়ে দিনযাপন করত।

বাবার কাজ ছিল সুযোগ পেলেই চৌর্যবৃত্তি করা, আর মায়ের কাজ ছিল দেবতা বাআল এবং দেবী আশেরাহ-র মন্দিরে গিয়ে সারাদিন বসে থেকে দান সংগ্রহ করা।

ছোট থেকেই সে একাকিত্বে ভুগত, বাবা-মা থেকেও না থাকার মতোই।

তাই তো তার বাবা ও মায়ের কারও সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।

একমাত্র সন্তান হিসেবে যতটা আদর-যত্ন পাওয়া উচিত ছিল লিলিয়ান তার কিছুই পায়নি।

মায়ের বিকৃত মুখের গালি এবং বাবার মারধর তার উপরে ধারাবাহিকভাবে চলতেই থাকত।

কোমল কিশোরী লিলিয়ান পিতা মাতার অবহেলায় মানুষ হতে হতে কখন যে সে শক্ত মনের নারীতে পরিণত হয়েছে সে তা এখন নিজেই বলতে পারে না।

একদিকে দারিদ্র্যের কষাঘাত অন্যদিকে পিতা-মাতার অবহেলা লিলিয়ানকে কষ্ট দিতে পেরেছে কিন্তু ভেঙে ফেলতে পারেনি।

লিলিয়ানের বিরাট সান্ত্বনা ছিল তার দাদি, দাদি ছিলেন অমালেকিয়দের উচ্চ এবং শিক্ষিত বংশ থেকে উঠে আসা এক স্বযোদ্ধা নারী।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের জন্য সেই নারীর বিয়ে হয় লিলিয়ানের দাদার সাথে।

লিলিয়ানের দাদা ছিলেন ঠিক তার বাবার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং নোংরা প্রকৃতির মানুষ।

দাদা যাই হোক না কেন, দাদি কিন্তু তার শিক্ষা ও মর্যাদাকে ধারণ করে চলতেন।

আর এই জন্যই গাদ শহরের সকলেই তাকে মহীয়সী হিসেবে সম্মান করত।

লিলিয়ানও ঠিক তার দাদির ধাঁচে গড়ে উঠেছে বলেই তার এই জীবনের প্রতি ঘৃণা ধরে গিয়েছে।

লিলিয়ান জানে না তার ভবিষ্যৎ কী এবং কোথায়ইবা তার এখনকার এই যাত্রা।

অজানা-অচেনা ভবিষ্যৎ নামের এক জগতে সে তো পা বাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু সে কি জয় করতে পারবে সেই অজানা জগৎকে?

নিরব নিস্তব্ধ রাত, কোথাও কেউ নেই। দূরে আবছা মতো দেখা যাচ্ছে মন্দিরের চূড়ার কিছুটা অংশ।

মন্দিরে বোধহয় আগুন লেগেছে কারণ এতদূর থেকেও লিলিয়ান দেখতে পাচ্ছে আগুনের আভা এবং আকাশের বুকে কালো ধোঁয়া উড়ে যেতে।

লিলিয়ান মনে প্রাণে চায় তাদের এই মন্দির ধ্বংস হয়ে যাক। মন্দিরের নোংরা দেব-দেবীর মূর্তিগুলো ধুলোয় মিশে যাক। ধ্বংস হয়ে যাক স্বর্ণ দিয়ে তৈরি হেপোটি মন্দিরের সকল জাঁকজমকতা এবং নোংরা রীতিনীতি।

লিলিয়ানের মনে পড়ে যখন সে তাদের বাড়ির পাশের পাহাড়ের ঢালে ভেড়া চরাতে যেত তখন লক্ষ করে দেখত ভেড়াগুলো তাদের ছোট ছোট ভেড়া সন্তানদের আগলে রাখছে।

ভেড়াগুলো সব সময় দলবদ্ধ হয়ে থাকে। তাদের মধ্য মানুষের চেয়েও রয়েছে বেশি মানবিকতা এবং রয়েছে শৃঙ্খলাবোধ। অথচ মানুষ জাতের প্রাণীগুলো নিজেদের নিষ্পাপ সন্তানগুলোকে হাতে গড়া মূর্তির সামনে বলিদান করে, এতটুকুও তাদের মনে দয়ার উদ্রেক হয় না তখন। নিকৃষ্ট মূর্তিপূজারীরা তাদের নিজেদের হাতে গড়া নির্জীব মূর্তিদের সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের নিষ্পাপ সন্তানদের উৎসর্গ করে থাকে।

এতে নাকি দেবতারা খুশি হয়! লিলিয়ান তো সেই ছোট থেকে দেখে আসছে এসব নিকৃষ্ট রীতিনীতি। সে তো কখনো দেখেনি যে শিশু বলিদানের পর কেউ বিশেষভাবে লাভবান হতে পেরেছে বা তাদের জীবনে চমৎকারভাবে কোনো পরিবর্তন নেমে এসেছে। তাহলে তারা কীভাবে বুঝতে পারবে যে শিশু উৎসর্গ করার পর আদৌ তাদের দেব-দেবীগুলো সন্তুষ্ট হয়েছে কি না?

তার নয় দিনের নিষ্পাপ ভাইকেও একইভাবে বলিদান দেওয়া হয়েছে।

লিলিয়ানকেও উৎসর্গ করা হত বাআল ও আশেরাহ-র প্রতিনিধিত্ব করে বেশ্যাবৃত্তি করার জন্য।

লিলিয়ানের দাদি মারা যাবার পূর্বে লিলিয়ানকে বলে গিয়েছেন— লিলিয়ান, যদি কখনো তোমার জীবনে এমন ঘটনা আসে যে তোমাকে তোমার পিতা-মাতা মন্দিরে ভাব্বাদিনি হওয়ার জন্য উৎসর্গ করতে চায়, তখন তুমি চেষ্টা করবে নিজেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন হলে তুমি এই শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে জর্ডান নদীর তীরবর্তী এলাকায় আশ্রয় নেবে। কারণ সেই এলাকার মানুষগুলো জ্ঞানী ও পরোপকারী।

লিলিয়ান তার দাদির কথা মেনে নিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে যে সে সত্যি সত্যি এই অপবিত্র গাদ শহর ছেড়ে পালাবে।

বহুদূরে আগুনের লেলিহান দাউ দাউ করে জ্বলতে দেখে লিলিয়ান মন থেকে চাইতে থাকল— ধ্বংস হয়ে যাক এবং পুড়ে ছারখার হয়ে যাক হেপোটি মন্দিরের সকল অহঙ্কার।

লিলিয়ান একটা বড় বোল্ডারের আড়ালে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। বেশ ক্লান্ত হলেও সজাগ হয়ে রয়েছে কারণ শত্রু তার পিছে লেগেছে। সজাগ না থাকলে তার ধ্বংস অনিবার্য।

রাতের নিস্তব্ধতাকে কাটিয়েও আবিব মাসের প্রবাহিত বাতাসের কারণে ডালিম বাগানের ডাল পাতার নড়াচড়ার শব্দ শোনা যায়, সেই শব্দকে ছাড়িয়ে লিলিয়ানের কান আরও একটি শব্দ শুনতে পাচ্ছে। কারও পায়ের ধুপধাপ আওয়াজ আর সেই আওয়াজটা ডালিম বাগান থেকেই আসছে।

আওয়াজ শোনা মাত্রই লিলিয়ান বোল্ডারের পেছনে আড়াল নিল এবং লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে চাইল কার পায়ের পদধ্বনি এটা।

প্রায় পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করার পরেই দেখা গেল পদশব্দ সৃষ্টি করার মালিককে।

লিলিয়ান দেখল পাষণ্ড সেই লোকটা! ডালিম বাগান থেকে বের হয়ে পাহাড়ের ঢালের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, পূর্ণিমার জোৎস্নায় স্পষ্ট ভেসে উঠেছে তার দেহ অবয়ব, হাল ছাড়েনি সে।

লোকটি জানে যে পায়ে ক্ষত নিয়ে বেশিদূর এগোতে পারবে না তার শিকার।

লিলিয়ানের জায়গায় অন্য কোনো যুবতী হলে পাষণ্ড লোকটিকে দেখে ভয় পেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ত কিন্তু লিলিয়ান অন্য ধাঁচে গড়া মানবী। সে ভয় পেল না, কারণ সে জানে তার রক্ষাকর্তা আছে।

পর্ব ৮ : লিলিয়ানের রক্ষাকর্তা

লিলিয়ানের রক্ষাকর্তাই তাকে রক্ষা করবে। কে সে যে লিলিয়ানকে রক্ষা করবে?

লিলিয়ান তার দাদির কাছে শিখেছে মানুষ নিজেই তার নিজের রক্ষাকর্তা, মানুষ যদি বুদ্ধি এবং জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে চলে তাহলে সেই মানুষের কখনই অন্যর উপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়ে না।

জ্ঞান হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ আর বুদ্ধি হচ্ছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

এই দুটির ব্যবহার মানুষ যদি ঠিকমতো করতে পারে তাহলে তাকে কখনই কোনো বিপদ আঁকড়ে রাখতে পারে না।

প্রত্যেকটা মানুষ নিজেই তার নিজের রক্ষাকর্তা এই কথা মনে করে লিলিয়ান মাথা ঠাণ্ডা রেখে বুদ্ধি আঁটতে শুরু করল, কীভাবে এই দুর্বৃত্ত লোকটির হাত থেকে শেষ রক্ষা পাওয়া যায়।

লিলিয়ান বোল্ডারের আড়াল থেকে দেখতে পেল পাষণ্ড লোকটি ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসছে আর প্রতিটি পাথরের বোল্ডারের পেছনে খুঁজে দেখছে লিলিয়ানকে পাওয়া যায় কি না।

লিলিয়ান মুখে ক্রূর হাসি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে রইল লোকটিকে চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্যে।

লোকটির কোনো ধারণাতেই নেই যে সে নিজেই তার নিজের ফাঁদে পা দিতে চলেছে।

ভুল মেয়েকে বেছে নিয়েছে সে তার শিকার হিসেবে পাওয়ার জন্য। আদর-যত্ন ছাড়া মানুষ হওয়া রাগী, একরোখা এবং জেদি মেয়ে লিলিয়ান।

সে তৈরি করে ফেলেছে নিজেকে রক্ষা করার সুকৌশল।

পর্ব ৯ : আততায়ীর শেষ পরিণতি

নিশুতি রাতের মধ্য গগন থেকে চাঁদ কিছুটা হেলে পড়েছে, চাঁদের আসে পাশে পেঁজা তুলোর মতো খণ্ড খণ্ড মেঘ চাঁদের পাশে ভিড় জমিয়েছে। পাহাড়ের ঢালে গজিয়ে উঠা ছোট ছোট পাহাড়ি ঘাসের উপর খরগোশের দল পূর্ণিমা চাঁদের আলোয় হুটোপুটি এবং খেলা করতে ব্যস্ত। তাদের বিরক্ত করার মতো কেউ নেই। ডালিম বাগানে শনশন করে বাতাস বয়ে যাওয়ার শব্দ করে চলেছে। লিলিয়ান বোল্ডারের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে পাষণ্ড লোকটির প্রতিটি পদক্ষেপের উপর নজর রাখছে।

আততায়ী লোকটি পাহাড়ের সরু রাস্তাটির ধারে একগোছা ডালিমের পাতা পরে থাকতে দেখল। ডালিমের পাতাগুলো কুড়িয়ে নিয়ে লোকটি বোঝার চেষ্টা করল পাতাগুলো আসলে টাটকা না বাসি। এবং লোকটি যা বোঝার তা বুঝেও গেল।

তার ঠোঁটে জেগে উঠল নোংরা একটা হাসি।

আততায়ী লোকটি বুঝে গেছে আশপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে অথবা বিশ্রাম নিচ্ছে তার আকাঙ্ক্ষিত শিকার।

পাষণ্ড লোকটি যেখানে বর্তমানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেইখান থেকে দশ গজ দূরে থাকা একটি বোল্ডারের আড়াল থেকে হালকা ধরনের একটা শব্দ শুনতে পেল সে। শিকারকে সে পেয়েই গেছে এই কথা ভেবে লোকটি খুব ধীর পদক্ষেপে বোল্ডারটির পেছনে এসে দাঁড়ালো এবং লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করল সেখানে সুন্দরী মেয়েটি লুকিয়ে রয়েছে কি না?

কিন্তু হতাশ হল সে। দেখল দুটি খরগোশ কী নিয়ে যেন একে অপরের সাথে মারামারি এবং হুটোপুটি করছে। লোকটি তার শিকারকে না পেয়ে রাগে একটি ছোট পাথরের খণ্ড তুলে নিয়ে খরগোশ দুটির উপর আক্রমণ করল। খরগোশগুলো পালিয়ে গেল আরও একটি বোল্ডারের আড়ালে। লোকটি প্রতিটিই বোল্ডার খুঁজে দেখছে এবং লিলিয়ানকে না পেয়ে বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। বিরক্ত হলেও সে মনে মনে বলছে ল্যাংড়া পা নিয়ে কত দূরেইবা যাবি তুই। তোকে ধরা পড়তেই হবে রে মেয়ে।

লিলিয়ান বুঝে গেছে সে খুব সহজে এই লোকটির হাত থেকে রেহাই পাবে না। তাই সে উল্টো পরিকল্পনা করে নিয়েছে। সে এখন নিজেকে শিকার ভাবছে না বরং পাষণ্ড লোকটিই তার শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছে।

লোকটি এগিয়ে আসছে আর লিলিয়ানও প্রস্তুতি নিচ্ছে তার শিকারের কাছাকাছি হওয়ার। লিলিয়ান যে বোল্ডারের পেছনে আশ্রয় নিয়েছে, সেখানেই পরে রয়েছে একটা ছুঁচালো পাথরের অংশ বিশেষ। মাঝারি সাইজের পাথরটিই হচ্ছে লিলিয়ানের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। এই পাথর এবং হাতের লাঠিটি ব্যবহার করে লিলিয়ান লোকটিকে পরাস্ত করতে চাইছে। লিলিয়ান জানে কোনোভাবেই সে পাষণ্ড লোকটিকে সামনাসামনি পরাস্ত করতে পারবে না। তাই লোকটির পেছন দিক থেকে হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে লোকটিকে আঘাত করে তার হাত থেকে নিস্তার পেতে হবে।

যেই পরিকল্পনা সেই কাজ, লোকটি নিচের দিকে যেমন নেমে আসছে, লিলিয়ানও বোল্ডারের আড়ালে ক্রল করে করে উপরে উঠে লোকটির পেছন দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। লিলিয়ানের এক হাতে রয়েছে ডালিমের ভাঙ্গা ডাল এবং অন্য হাতে ধরা রয়েছে সেই মাঝারি সাইজের ছুঁচাল পাথরটি, কোনুই বেয়ে বেয়ে সে উপরের দিকে উঠছে, কিছুদূর উপরে উঠার পর সে আর একটি বোল্ডারের পেছনে আশ্রয় নিল, হাঁফাচ্ছে সে এখন কঠোর পরিশ্রমের ফলে। লিলিয়ান রয়েছে দক্ষিণ দিকে এবং পাষণ্ড লোকটি রয়েছে উত্তর দিকে তাদের মাঝখানে রয়েছে দুইটি মাত্র বোল্ডার। কিছুক্ষণ আগেই লোকটি এই বোল্ডার দুইটি চেক করা শেষ করে, নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে, লিলিয়ান এতক্ষণ যে বোল্ডারের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সেটা চেক করার জন্য।

রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে কোথায় যেন ডাহুক পাখি ডেকে উঠল।

গাদ শহরের বাসিন্দাদের কাছে ডাহুক একটি অলুক্ষণে পাখি। এই পাখিটি সব সময় অলুক্ষণের বার্তা প্রেরণ করে বলে তারা বিশ্বাস করে।

হয়ত পাখিটি আততায়ী লোকটিকে সংকেত দিয়ে জানিয়ে দিতে চাইছে— সামনে তোমার বিপদ! সাবধান হয়ে যাও বাছা।

এদিকে রাগে এবং আক্রোশে লিলিয়ান ভুলে গেছে তার ক্ষত হওয়া পায়ের যন্ত্রণার কথা।

আবার ডাহুক পাখিটি ডেকে উঠল এইবার হয়ত সে লিলিয়ানকেও সাবধান করে দিচ্ছে শিকারকে শিকার না বানানোর ব্যাপারে।

আবিব মাসের পূর্ণিমা রাতের দ্বিপ্রহরে এবাল্ পাহাড়ের ঢালে দুইজন শিকারি নেমেছে একে অপরকে শিকার করতে। প্রথম শিকারি জানে না সে নিজেও শিকারে পরিণত হয়েছে তার নিজের শিকারের কাছে। আর দ্বিতীয় শিকারি জানে না সে তার শিকারকে আদৌ পরাস্ত করতে পারবে কি না? লোকটি যখন নিচে নামছে, লিলিয়ান তখন বোল্ডারের আড়াল থেকে বেরিয়ে লোকটির পিছু নিল।

খুব সন্তর্পণে লিলিয়ান পাষণ্ড লোকটির পিছু নিয়ে লোকটির কাছাকাছি আসতেই, লিলিয়ান তার কুড়িয়ে পাওয়া ছুঁচাল পাথরটি দিয়ে লোকটির পিঠের উপরে বিশাল জোরে আঘাত করল, কিন্তু হায়, আঘাতটি ফস্কে গেল কারণ লোকটি কীভাবে যেন বুঝে গেছে তার পেছনে কেউ রয়েছে তাই সে দ্রুততার সাথে জায়গা পরিবর্তন করল এবং লিলিয়ান ধরা পড়ে গেল পাষণ্ড লোকটির হাতে।

বোকা লোকটি লিলিয়ানকে দেখা মাত্রই তাকে আক্রমণ করার চেষ্টা করল, কিন্তু লিলিয়ান পিছু সরে যেতেই লোকটি পা ফস্কে দরাম করে বোল্ডারের উপর গিয়ে পড়ল। পড়া মাত্রই লোকটি আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই, লিলিয়ান আর এক মুহুর্ত দেরি না করে সুযোগ পেয়ে তার অন্য হাতে ধরা ডালিম গাছের ডাল দিয়ে লোকটির এক চোখ বরাবর ঢুকিয়ে দিল।

নিস্তব্ধ রাতকে খানখান করে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে লোকটি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল। লিলিয়ানের ভেঙে আনা ডালিমের ডালটিই লিলিয়ানকে বাঁচিয়ে দিল আজকের রাতের মহাবিপদ থেকে।

আততায়ী লোকটির একটা চোখ পুরাই উপড়ে নিয়েছে সে। লিলিয়ান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে লোকটির গলা ফাটানো চিৎকার এবং ছটফটানি উপভোগ করল। লিলিয়ান দেখতে পাচ্ছে লোকটির উপড়ে নেওয়া চোখ বেয়ে গলগলিয়ে বের হচ্ছে কালো বর্ণের রক্তের ধারা। রাতে রক্ত দেখতে কালোই মনে হয় অথবা এমনও হতে পারে লোকটির অপরাধের মাত্রা বাড়তে বাড়তে তার রক্তের রং কালো হয়ে গেছে। লিলিয়ান ভেবেছিল ডালিম গাছের ডালটি দুইটি কাজে লাগবে, কিন্তু ডালটি তিনটি কাজে এল।

লিলিয়ান আবার শুনতে পেল ডালিম বাগানে অনেক মানুষের এগিয়ে আসার পদশব্দ।

তাই লিলিয়ান আর একমুহূর্ত দেরি না করে, পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে লাগল। ক্ষত পা নিয়ে চার শ’ ফুট ঢালু পাহাড় বেয়ে নিচে নামা খুব একটা সহজ সাধ্য ব্যাপার না। আততায়ী লোকটি উপড়ে যাওয়া চোখ নিয়ে জ্ঞান হারিয়ে পরে রইল পাহাড়ের ঢালের সরু পথটির উপর। আর লিলিয়ান খোঁড়াতে খোঁড়াতে বোল্ডারের আড়াল নিয়ে নিয়ে নেমে চলল তার অজানা ভবিষ্যতের গন্তব্যে।

ভবিষ্যৎ অজানা হলেও লিলিয়ান এখন জেনে গেছে টিকে থাকতে হলে যুদ্ধ করা বাঞ্ছনীয়। আর এখন তার নিজের প্রতি রয়েছে পূর্ণ বিশ্বাস, সে বুঝে গেছে সে পারবে জীবনের প্রতিটি যুদ্ধে জয়ী হয়ে গড়ে উঠতে।

আরও কিছুদূর নামার পর লিলিয়ান আবার দেখতে পেল সেই বৃদ্ধা মহিলাটিকে। তাকে দেখে লিলিয়ান বলল, আমার ভবিষ্যতের ছায়া, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি জেনে গেছি তুমিই হচ্ছ আমার বর্তমান সত্তার ভবিষ্যতের অস্তিত্ব। আসলে তুমি হচ্ছ আমার বুদ্ধিমত্তার পরিপূর্ণতা যাকে শুধু একমাত্র আমিই দেখতে পাই আর অন্য কেউ দেখতে পায় না। আবারো ধন্যবাদ তোমাকে, আমার মনে বুদ্ধি ও সাহস জোগানোর জন্য।

লিলিয়ানের বুদ্ধিমত্তার বৃদ্ধারূপী ছায়া বলল, তুমি কি পারবে তোমার অজানা ভবিষ্যৎকে জয় করতে?

লিলিয়ান হাসি মুখে বলল, আজ যখন অজানা শত্রুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছি, তখন অবশ্যই আমি আমার অজানা ভবিষ্যৎকেও জয় করতে পারব।

বৃদ্ধা বলল, সাবাস মেয়ে! সব সময় এইভাবেই সাহস ও বুদ্ধি দিয়ে চলবে তাহলে জীবনে কোনোদিন কোনো বিপদের কাছে হার মেনে নিতে হবে না। এই বলেই বৃদ্ধা লিলিয়ানের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। লিলিয়ান হাসিমুখে নিচের দিকে নামতেই থাকল পাথরের পাহাড় থেকে মাটির কাছাকাছি আসার জন্য।

এবং তার অজানা ভবিষ্যৎকে জানার জন্য। মনে মনে সে বলে উঠল— এইটাই জীবন আর এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে বেঁচে থাকা।

Read Previous

একজন মন্ত্রীর একদিন

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন- ৩য় সংখ্যা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *