অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সনোজ কুণ্ডু -
মৃত্যুকূপ

পর্ব : ১

গ্রামের নাম : কামারপুকুর। সৈয়দপুর উপজেলার একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম।

শেষ রাতের দৃশ্য।

চারিদিকে শুনশান নীরবতা। মঞ্চে মৃদু আলো থাকবে। মঞ্চের দু’প্রান্ত থেকে পর্দা ধীরে ধীরে খুলতে থাকবে। শুরু হবে ফজরের আজানধ্বনি। আজানের শেষ লাইন—

‘আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম’

বাক্যটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে শুরু হবে পাখিদের প্রহর ঘোষণার কিচিরমিচির আওয়াজ। পাশের শিবমন্দির থেকে বেজে ওঠে ঘণ্টার ঢংঢং শব্দ।

পাশের মসজিদে নামাজ আদায় করার জন্য দুইজন মুসল্লি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-টুপি পরে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে।

প্রতিদিনের মতো গ্রামবাসীকে ঘুম ভাঙাতে গেরুয়া রঙের শাড়ি পরে বৈষ্ণবী খঞ্জনি বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে গ্রামে বের হয়।

‘ওঠো ওঠো নগরোবাসী, নিশি অবসানরে।

উঠিয়া লহো কৃষ্ণ নামরে।’

মঞ্চে তৃতীয় ব্যক্তি প্রবেশ কালু পাগলা। সবার পরিচিত। কেউ ভালোবাসে। কেউ ধিক্কার দেয়।

ছিন্ন মলিন বেশের পাগল। স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি নেই। পরনে ছেঁড়া গেঞ্জি-লুঙ্গি। মাথায় কাঁচা-পাকা ঝাঁকড়া চুল। মুখভর্তি দাড়ি। গলায় অসংখ্য বড় আকৃতির তাবিজ-কবচ। মাথায় লাল রঙের কাপড় পেঁচানো। সবসময় তার হাতে একটি বাঁশের লাঠি থাকে। লাঠি হাতে গ্রামে গঞ্জে, হাট-বাজারে ঘুরে বেড়ায়। আবোলতাবোল বলে।

তবে গাঁয়ের কোনো খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা থাকলে কালু পাগলা কেমন করে যেন আগাম পূর্বাভাস পায়। এমন প্রমাণ আছে। দেশের অবস্থা অশান্ত হওয়ার সাথে সাথে কালু পাগলার আচরণেও পরিবর্তন ঘটে। সারাক্ষণ অস্থির, উন্মাদের মতো আচারণ শুরু করে। কদিন আগেও সে হো হো শব্দ করে হেসেছে। আজকাল তার মুখে কোনো হাসি নেই। সারাক্ষণ অস্থির-উত্তেজনার ভেতর কাটে। কখনো হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে। আবার ফিক করে হাসে। ইদানীং কালু পাগলার রহস্যজনক আচারণ গ্রামবাসীকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে।

পাশেই সৈয়দপুর রেল স্টেশন। অদ্ভুত বিষয়টি হলো যতবার তার কানে ট্রেনের হুইসেল আসে, ততবার সে অস্থির হয়ে ওঠে। রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। বাঁশের লাঠিটা কব্জিতে ঘোরাতে ঘোরাতে নিজের চুল টেনে ছেঁড়ে। চিৎকার করে গ্রামবাসীর উদ্দেশে বলে—

‘আহারে, কী সুন্দর মৃত্যুরে!

যা যা তোরা সবাই মরবার যা,

আমি যাব না। আমার ম্যালা কাম।’

মঞ্চের পাশেই রহিম মিয়ার চায়ের দোকান।

প্রতিদিনের মতো আজও সে দোকান খোলে। দোকানে ঝুলতে থাকে কলা, বিস্কুটের প্যাকেট। মাটির চুলোতে চায়ের জল গরম হচ্ছে। দোকানের কাঠের তাকে কিছু বিস্কুটের প্যাকেট, কাচের বৈয়মে কিছু লজেন্স থাকে। রহিম মিয়া একধ্যানে কালু পাগলার পাগলামি দেখে। কালু পাগলার উদ্দেশ্যে বলে—

রহিম মিয়া : ও কালু, তোর মাথায় এসব কী ঢুকল রে! তুই আবোলতাবোল কি কইস? কারা মরবার যাবে? তোর মাথাটা এক্কেবারে গ্যাছে রে কালু।

কালু পাগলা কব্জিজে বাঁশের লাঠিটা ঘোরাতে ঘোরাতে রহিম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে লাফাতে লাফাতে মঞ্চ ত্যাগ করে।

পর্ব : ২

মঞ্চে প্রবেশ করে চারজন শিশু। [কার্তিক, গীতা, রিফাত রাব্বি, পান্নু] সবার হাতে হাতে আদর্শলিপি বই।

তারা গুনগুণ করে মাথা নিচু করে বই পড়তে থাকে। তখনি মঞ্চে প্রবেশ করে সুকুমার মাস্টার। সবার নয়নের মণি। সবার আপদে-বিপদে তিনি এগিয়ে আসে। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। ছাত্ররা তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। মাস্টারমশাই শিস্যদের উচ্চস্বরে পড়াতে শুরু করে—

‘অ’তে অজগর। ঐ অজগর আসছে তেড়ে।

‘আ’ তে আম। আমটি আমি খাব পেড়ে।

‘ই’ তে ইক্ষু। ইক্ষু রস অতি মিষ্ট।

কার্তিক : মাস্টারমশাই কাল রাতে পড়ার সময় বাবা মাকে বলছিল, এই গ্রামে নাকি অনেক অজগর সাপ আছে। আমি তো ভয়ে সারারাত ঘুমাতে পারিনি।

পান্নু : হা হা হা, কার্তিক সত্যিই বোকা মাস্টারমশাই। অজগর সাপ তো গভীর জঙ্গলে থাকে। আমাদের খাবে কী করে।

মাস্টারমশাই : তোমরা শোনো, কার্তিকের বাবা ঠিকই বলেছেন। আসলে অজগর সাপ তো এখানে নেই, তবে মানুষ নামের কিছু হিংস্র অজগর সাপ এই গ্রামে আছে। তারা খুবই ভয়ঙ্কর। তাদের থেকে সাবধান থাকতে হবে। সুযোগ পেলেই ছোবল মারে।

শিশুরা হো হো শব্দে একসাথে হেসে ওঠে।

সে মুহূর্তে মঞ্চে করে মাদ্রাসার একজন হুজুর। নাম হিম্মত মিয়া। চোখে মুখে তার হিংস্রতা।

হিম্মত মিয়া : শোনো মাস্টোর, তুমি কিন্তু গ্রামের কোমলমতি শিশুদের মাথা নষ্ট করতাছ। গ্রামের সন্তানগো তুমার শিক্ষিত করার কাম নাই।

মাস্টারমশাই : এসব কী বলছেন হুজুর? এই শিশুদের তো লেখাপড়া শিখতে হবে। ওদের বড় হতে হবে। লেখাপড়া শিখে ওরাই একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

হিম্মত মিয়া : সেসব তুমারে ভাবতি হবি না। আমাগো সন্তানরা কোনো হিন্দু মাস্টারের কাছে পড়বি না। আর এইসব পইড়া হবি কী? আর তুমি যদি জানে বাঁচপার চাও এই গ্রাম ছাইড়া হাঁইটা যাও।

হিম্মত মিয়া রাগে গরগর করে দুই জন মুসলিম ছাত্রের [রিফাত রাব্বি, পান্নু] হাত ধরে। টেনে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় শাসিয়ে যায়—

হিম্মত মিয়া : শোনো মাস্টার, তুমারে জানি মাদ্রাসার পুকুরে গোছল করতি না দেহি। জবাই কইরা ফেলব খুদার কছম।

মাস্টারমশাই : মাদ্রাসার পুকুরে কেন স্নান করব না! বাড়ির কাছে পুকুর, আমার বাপ-দাদারা এই পুকুরে চিরকাল স্নান করে এসেছে, আমরা কেন করব না?

হিম্মত মিয়া : কথা বাড়াইও না মাস্টার, ভালো হবি না কিন্তু। তুমি পেত্যেকদিন সকালে ঘাটের গলা পানিতি নাইমা ‘শ্রী বিষ্ণু’ কইয়া গলা ফাটাবা, তা তো মানা যায় না।

মাস্টারমশাই : তাতে আপনার সমস্যা কোথায়?

হিম্মত মিয়া : আমাগো হুজুরের ঘুমের বিঘ্ন ঘটে। তাছাড়া হুজুর কইছে ‘শ্রীবিষ্ণু’ কইয়া পানিতে ডুব দিলি পানির পবিত্রতা নষ্ট হবার পারে।

মাস্টারমশাই : অসম্ভব, দীর্ঘদিন ধরে নিয়ামত হুজুরকে আমরা চিনি। বড় ভালো মানুষ। সে এমন সিদ্ধান্ত নিতেই পারে না। এটা আপনার ষড়যন্ত্র। তাছাড়া আপনি ভুলে যাবেন না, এই মাদ্রাসা নির্মাণের সময় আমার বাবা নিখিলেশ সাহা দশ শতাংশ জমি দান করে গেছেন।

হিম্মত মিয়া : হিন্দুরা দিবি মাদ্রাসার জন্যি জমি? হা হা হা। তা আমাকে বিশ্বাস করতে হবি?

মাস্টারমশাই : শোনেন হুজুর, জমিদাতাদের তালিকা থেকে আমার বাবার নাম কেটে দিলেও গ্রামবাসী ভালো করেই জানে। আপনি হুজুরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।

হিম্মত মিয়া মাস্টারের দিকে ভেংচি মুখ করে ছাত্রদের হাত টানতে টানতে নিয়ে যায়।

মাস্টারমশাই ধীর পায়ে রহিম ভাইয়ের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে।

মাস্টার : হিম্মত মিয়ার আচারণ দেখলে রহিম ভাই, আমি কিন্তু চেয়ারম্যানের কাছে বিচার দেব।

রহিম মিয়া : কোনো লাভ হবি না মাস্টার। সব এক গোয়ালের গরু। তাছাড়া তোমার বাড়িটার উপর হিম্মত মিয়ার নজর পড়ছে। সেদিন দোকানে আইসা কয়, ৪৭ সালে দ্যাশভাগের সময় কত হিন্দুরা ভারতে চইলা গেল, এই মালাউনের বাচ্চা সুকুমার মাস্টার ভিটা ছাড়ল না।

মাস্টারমশাই : এসব থাক রহিম ভাই, কালু পাগলাকে দেখলাম তার পাগলামিটা বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ভীষণ অস্থির লাগছিল। কী ব্যাপার?

রহিম ভাই : হ মাস্টার ঠিকই কইছ। ট্রেনের হুঁইসাল শুনলেই ওর মাথাডা বিগড়ে যায়। চিৎকার করে ছুটাছুটি করে। কী সব আবোল-তাবোল কয়। ‘আহারে, কী সুন্দর মৃত্যুরে! যা যা তোরা সবাই মরবার যা, আমি যাব না। আমার ম্যালা কাম।’

মাস্টার : বিষয়টি সত্যিই ভাবনার। দেশের খারাপ অবস্থা দেখে কালু সম্ভবত আগাম কিছু পূর্বাভাস পাচ্ছে?

রহিম মিয়া : দেশের অবস্থা তো সত্যিই খারাপ মাস্টার। শুনলাম বঙ্গবন্ধু নাকি স্বাধীনতার ডাক দেবে। গ্রামের অনেক যুবক কিন্তু ঢাকায় গেছে।

মাস্টারমশাই : দেখো বঙ্গবন্ধু কী নির্দেশ দেন। এককাপ চা বানাও রহিম ভাই। সাথে একটা টোস্ট বিস্কুট দিও।

পর্ব : ৩

পর্দার আড়াল থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেসে আসবে—

‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারে সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

গাঁয়ের কিছু যুবক রহিম ভাইয়ের চায়ের দোকানে এসে বসে। [বদর, রায়হান, মকবুল, শিহাব, সোহেল, বিপ্লব, স্বপন, বিষু, আলম] (নামগুলে বিশেষ প্রয়োজনে অন্য চরিত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে)।

সবার চোখে মুখে অস্থিরতা। উৎকণ্ঠা। দেশের এই নাজুক পরিস্থিতি দেখে ওরা ভীষণ চিন্তিত। বিচলিত। তবে চোখে মুখে প্রতিশোধের নেশা।

বিষু : দ্যাখছ তোমরা, বঙ্গবন্ধু কি আগুন ঝরানো ভাষণ দিল। একবারের জন্যও তার বুক কাঁপল না। একেই বলে নেতা।

আলম : দেশের অবস্থা কি মোটেও ভালো না। তোমরা কি টের পেলে বঙ্গবন্ধু কিন্তু অত্যন্ত কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণাটাও দিয়ে দিল। অনেকে বুঝতেই পারল না কী হয়ে গেল।

সোহেল : ঠিকই কইছ আলম ভাই। বঙ্গবন্ধুর কইলজা কত বড় রে। একবার দেখফার পারতাম। কণ্ঠ দিয়ে যেন আগুন ঝরে পড়ল। তোরা দেখিস, এই আগুনেই একদিন ইয়াহিয়ার মসনদ ছারখার হয়ে যাবে।

স্বপন : শুনলাম, পাকিস্তান সরকার নাকি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠকে বসবে।

রহিম ভাই : শোনো বাবাজিরা। তোমরা বিদ্যেন মানুষ। আমি মুখ্যু-সুখ্য মানুষ হইয়া কই, ঐ বৈঠকে কোনো শান্তি আসফি না। বঙ্গবন্ধু বাঙালিগো স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করবি না। সে বাঙালির অধিকার আদায় কইরাই ছাড়বি। দরকার হলে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হবি।

মঞ্চের আলো কমে আসবে। মঞ্চের আড়াল থেকে শিবরঞ্জনি রাগে রাখালের বাঁশির সুর ভেসে আসবে। হাটফেরত মানুষ বাড়ি ফিরছে। সবার হাতে হাতে সদাইয়ের ব্যাগ। মাথায় ধামা কিংবা ঝাঁকা। একজন কৃষক ঘাসের আঁটি মাথায় করে বাড়ি ফিরছে। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসবে একজন গৃহবধূ তার হাঁসগুলোকে ঘরে ফিরে আসার জন্য ডাকছে।

‘আয় আয় তৈ তৈ—’

মঞ্চে বৈষ্ণবী গাইতে গাইতে যায়—

‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে।

তুমি পারের কর্তা, জেনে বার্তা, তাই ডাকি তোমারে।’

মঞ্চের এক পাশে মসজিদের ইমাম গ্রামের চারজন টুপি পরা যুবকের সাথে শলা-পরামর্শ করছে।

পর্ব : ৪

২৬ মার্চের সকাল।

তখনি স্টেশন থেকে ট্রেনের হুইসেল ভেসে আসে। সাথে সাথে কালু পাগলার আগমন ঘটে।

আজ খুব পাগলামি শুরু করে। আজ আবার গলায় জুতার মালা পরা। অস্থিরভাবে মঞ্চে তাণ্ডবনৃত্য শুরু করতে করতে বলে—

‘আহারে, কী সুন্দর মৃত্যুরে!

যা যা তোরা সবাই মরবার যা,

আমি যাব না। আমার ম্যালা কাম।’

চলে যাওয়ার আগে কালু পাগলা হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। যাওয়ার আগে রহিম ভাই তাকে একটা কলা দিতে হাত বাড়িয়ে দিল। কালু পাগলা কলাটা ঠিকই হাতে নিল। কিন্তু কলাটা ছিলে ফেলে দিয়ে চলে গেল।

সকালেই রহিম মিয়া চায়ের দোকানে দু’জন মাড়োয়ারি [বলরাম আগরওয়াল, লাল বিহারি দাস] চা খেতে বেঞ্চিতে বসে।

বলরাম : দুকাপ দুধ চা বানাও তো রহিম ভাই, তোমার হাতের চা না খেলে কাজে মন বসে না।

দুজন মাড়োয়ারি কানে কানে কিছু একটা গোপন কথা ভাগাভাগি করছে।

রহিম মিয়ার চায়ের দোকানে সামনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে রায়হান, মকবুল।

রায়হান : খুব খারাপ খবর আছে রহিম ভাই। মাস্টারমশাই কি দোকানে এসেছিল? নিখিল ডাক্তারকেও খুঁজে পাচ্ছি না। শালার বিপদ আসলে চারদিক থেকে ঘিরেই হাজির হয়।

বলরাম আগরওয়াল : অস্থির হইও না, বাপজান। আগে শান্ত হয়ে বসো। বলো কী হয়েছে?

রায়হান : কাল সারারাত পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা শহরের ঘুমন্ত মানুষের উপর অতর্কিত আক্রমণ করছে। ঢাকার শহরে রক্তের বন্যা বইয়ে দিছে। শুধু লাশ আর লাশ।

মকবুল : আমি নিজে রেডিওর খবরে শুনেছি রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ করেছে। সবচেয়ে খারাপ খবর হলো বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার লক্ষণ টের পেয়ে আগেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেছেন।

বলরাম আগরওয়াল : শোনো বাপজানেরা, বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিল, আর তো কোনো কথা থাকতে পারে না। দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলো। গ্রামের সব যুবকদের ডাকো। উত্তরপাড়া, দক্ষিণপাড়া, কাশিনাথপুর মানুষদের খবর দাও। মালোপাড়ার দিকে আমরা নিজেরাই যাচ্ছি। ঢাল-শরকি-রামদাও, মাছ মারার জুতি, যার কাছে যা আছে তা নিয়েই প্রতিরোধ করতে হবে। তোমরা আজ গভীর রাতে মাড়োয়ারি পট্টিতে আসবে। যত টাকা-পয়সা লাগে আমরা দেব। দেশকে বাঁচাতে আমাদের মাঠে নামতেই হবে। ‘জয় শ্রীরাম—’

সবাই চলে গেলে মঞ্চে ছুটে আসে সুকুমার মাস্টার, জসিম ভাই, ছিরু, ফটিক কবিরাজ, বদর ভাইরা। সবাই রহিম ভাইয়ের চায়ের দোকানে জড়ো হয়। দৌড়ে আসে গ্রামের তরুণ নেতা বাদল। সবাই গোল হয়ে শত্রু মোকাবেলার কৌশল আঁটছে। সবার চোখে মুখে প্রতিশোধের নেশা। সবাই হাতের উপর হাত রেখে ইয়াহিয়া গোষ্ঠীকে ধ্বংস করতে দীপ্ত শপথ নেয়।

বাদল : খোদার কছম জসিম ভাই, খান সেনারা এই গ্রামে পা রাখলে তাদের রামদাও দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে কুত্তা দিয়ে খাওয়াব। ওরা আমাদের বঙ্গন্ধুকে গ্রেফতার করেছে। আর রক্ষা নাই। এই আমার রামদাওটা পাগাল দে। বহুদিন ও রক্তের স্বাদ পায় না।

মঞ্চে ছুটে আসে নিলিল ডাক্তার।

সবাই শোনো, আমার কাছে আরও একটি গোপন খবর আছে। কাল গভীর রাতে মজ্জেল চেয়ারম্যানের বাড়িতে রাজাকারেরা গোপন বৈঠক করেছে। চেয়ারম্যানের দোতলা টিনের চালের উপর পাকিস্তানি পতাকা টানিয়েছে। সেখানে উপস্থিত ছিল মসজিদের ইমাম, হাতিম আলী, টুকু মেম্বর, আরও গ্রামের উঠতি রাজাকার। সবার মাথায় জিন্নার টুপি। চেয়ারম্যান সবার কানে কানে কী এক বীজমন্ত্র দেওয়ার সাথে সাথে সবার কণ্ঠ চিড়িয়ে বেরিয়ে আসে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’।

মঞ্চের আড়াল থেকে ভেসে আসে মটরসাইকেলের তীব্র আওয়াজ। বারবার ভেসে আসছে হর্ন বাজার বিকট শব্দ। সাথে সাথে জেলা থেকে এসডিও সাহেব সবার সামনে হাজির হন। চোখে মুখে তার বিষণ্নতা। উৎকণ্ঠা। মাথার টুপিটা খুলে হাতে নেয়। টেনশনে বারবার কপালে হাত দিচ্ছে। এসডিও সাহেবকে দেখে সবাই তার কাছে জড়ো হয়। এসডিও সাহেব দুবার ঢোক গিলে ইশারায় ফাঁসি ফুঁসি করে বলে—

এসডিও সাহেব : আমাদের কাছে খবর আছে, যেকোনো সময় পাকসেনারা এ গাঁয়ে ঢুকে পড়বে। গ্রামবাসীকে সতর্ক থাকতে বলো। আজ রাতেই রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দাও। উত্তরপাড়ার কাঠের পুল ভেঙে দাও। দক্ষিণ পাড়ার তিন রাস্তার মোড়ের সব মাটির রাস্তা কেটে দাও।

কথাগুলো ঝটপট বলে এসডিও সাহেব দ্রুত গতিতে চলে গেলেন।

উপস্থিত সবার মাথায় হাত। তারা দিশেহারা। এই বিপদে কী করা উচিৎ বুঝে উঠতে পারছে না।

মঞ্চের পাশেই ঘাপটি মেরে বসেছিল মজ্জেল চেয়ারম্যান। তার সাথে দুজন টুপি পরা উঠতি চামচা। চেয়ারম্যানের মুখে পান। বারবার ঠোঁট চাটছে। মুখ থেকে পানের পিক ফেলে জিহবা দিয়ে ঠোঁট চাটে। সে ধীরে ধীরে রহিম মিয়ার চায়ের দোকানে আসে। গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে বলে—

মজ্জেল চেয়ারম্যান : আরে ও মিয়া-মশাইরা, ঘাবরাইও না। ভয় নাই। আমি তো আছি। আস্থা হারাইও না। কত আপদে-বিপদে তোমাদের পাশেই তো ছিলাম। ঠিক কিনা কও। ঐ সরকারি পা-চাটা কুত্তা এসডিও সাহেব তুমাগো কাছে বড় নাকি আমি। ঐ বেয়াদপের কথা শুইনা গ্রামের রাস্তাঘাট কেউ নষ্ট কইরো না। আমি থাকতি এ গিরামে পাকসেনা আসপি না। আর যদি আইসাই পড়ে আমি দ্যাখপানে।

পর্ব : ৫

কী এক অস্থিরতায় রাতে কারও চোখে ঘুম ছিল না। এসডিও সাহেবে কথা না শুনে গ্রামবাসী যে ভুল করল এখন তারই মাশুল দিতে হচ্ছে। মাঝরাতেই গ্রামে ঢুকে পড়ে জলপাই রঙের পাকসেনাদের তিনটি জিপ। ক্যাপটেন হাফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সেনা দল এ গ্রামে আসে। ক্যাপটেনের সাথ আরও চারজন বিহারি সেনা মঞ্চে আসে। মজ্জেল চেয়ারম্যান, ইমাম সাহেব, টুকু মেম্বর খুশিতে ডগমগ। ক্যাপটেনসহ বিহারি সেনাদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। ক্যাপটে মজ্জেল চেয়ারম্যানের ব্যবহারে তুষ্ট হয়ে মুখে ‘সাবাশ সাবাশ’ বলে কাঁধ চাপড়িয়ে তাকে বাহ্বা দেয়।

শেষরাত থেকেই খানসেনারা এগ্রামের ঘুমন্ত মানুষের উপর তাণ্ডব চালায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেসে আসবে গুলি, মেশিনগানের শব্দ। সৈন্যদের বুটের আওয়াজ। নর-নারীর আর্তচিৎকার। জীবন বাঁচাতে মঞ্চ দিয়ে অস্থিরভাবে গ্রামবাসী ছুটে পালানোর চেষ্টা করবে।

দু একটি হিন্দু পরিবার শেষরাতেই দেশ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য সকলকে ভীষণভাবে পীড়া দেয়।

দুটি পরিবার মঞ্চ দিয়ে নীরবে দেশ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। সাথে নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ আছে।

কারও হাতে ব্যাগ, মাথায় বস্তা কিংবা জিনিসপত্র ভরা ট্রাংক। তাদের অসুস্থ অন্ধ পিতা লতিত মোহন দাস হঠাৎ অসুস্থ হয়ে রাস্তায় বসে পড়ে। তার পা আর চলছে না। ঘনঘন নিঃশ্বাস টানছে। একসময় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ছেলেরা বাবার হাত ধরে একবার টেনে উঠাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সে উঠতে পারে না।

ললিত মোহন : তোরা জীবন নিয়ে পালিয়ে যা বাবা। আমার কথা ভাবিস না। আমি এমনিতেই মরে যাব। আমাকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া করলে সময় নষ্ট হবে। বিপদ বাড়বে।

ছেলে-ছেলে বউ, নাতি-নাতনিরা ললিত মোহনকে শেষবারের মতো পা ছুঁয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিদায় নেয়। ললিত মোহনের স্ত্রী গঙ্গা দেবী কিছুতেই অসুস্থ স্বামীকে রেখে যেতে চায় না। সে স্বামীর বুকে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদে। এ জীবনে হয়তো তাদের আর দেখা হবে না। বড় ছেলে বিজন মায়ের হাত ধরে জোর করে টেনে নিয়ে যায়। মাত্র দুকদম পা পাড়িয়ে গঙ্গা দেবী ছেলের হাত থেকে হাত জোর করে হাত ছাড়িয়ে আবার স্বামীর বুকের উপর এসে পড়ে।

গঙ্গা দেবী : না না, তোরা চলে যা। আমি আমার অসুস্থ স্বামীকে এই অবস্থায় ফেলে যেতে পারি না। সবাই চলে যা। মা কালী তোদের মঙ্গল করুক।

সবাই মায়ের পা ছুঁয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিদায় নিল।

সুকুমার মাস্টার, জসিম ভাই, নিখিল ডাক্তার, বদির, বাদল ভাই, শিহব ভাইরা দলবদ্ধ হয়ে মাড়োয়ারিপট্টির দিকে যায়। সবার হাতে লাঠি, রামদাও।

সুকুমার মাস্টার : শোনো সবাই, তোমরা তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে যাবে। ছিরু, বদির, কাশেমরা তালতলা জঙ্গলে থাকবে। রহিম ভাই বলেছে, আজ রাতেই নাকি তারা হিন্দুপাড়া আক্রমণ করবে। সব যুবতী মেয়েদের সরিয়ে ফেলতে বলো। আমরা মাড়োয়ারিপট্টিতে যাচ্ছি। পাকসেনাদের মাড়োয়ারিদের উপর ভীষণ আক্রোশ। মাড়োয়াড়িদের সংগঠিত করতে হবে।

এই সুযোগে দুজন বিহারি সৈন্য সুকুমার মাস্টারের বাড়ি আক্রমণ করে। পাশে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে হিম্মত হুজুর। বিহারি সৈন্যরা সুকুমার মাস্টারের সুন্দরী বউ আরতি সাহার দেহ ভোগের উন্মাদনায় মেতে ওঠে। তার শাড়ি খুলতে টানা-হেঁচড়া করছে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায় আরতির শাখা ভেঙে নিচে পড়ে। সে পালাতে গেলে একজন সৈন্য শাড়ির আঁচল টেনে ধরে। আরতি একজন সৈন্যের পায়ের উপর লুটোপুটি খায়—

আরতি : মা কালীর দোহাই আপনেগো। আমারে ছাইড়া দেন। আমার স্বামী-সন্তান আছে। আমি চার মাসের গর্ভবতী। আমারে নষ্ট কইরেন না। মা কালী সহ্য করবে না।

কুতুব নামের একজন বিহারি সৈন্য : তোর মা কালীর চোখ অন্ধ হয়ে গেছেরে আরতি।

আরতিকে জোর করে টানতে টানতে মঞ্চের পেছনে নিয়ে যায়। সাথে সাথে ভেসে আসে তার সতীত্ব রক্ষার আর্তনাদ। এর পরপরই গুলির আওয়াজ।

একজন পুরোহিত রামাবলি গাঁয়ে পাগলের মতো ছুটে আসে। সর্বনাশ হইয়া গ্যাছে।

মন্দিরে মা কালী নাই। কারা যেন মা কালীরে নিয়া গ্যাছে।

তখনি গ্রামবাসীর সম্মিলিত কন্ঠের আর্তচিৎকার ভেসে আসে—

‘আগুন আগুন। আগুন লাগছেরে! তোরা কিরা কোথায় আছিস, সুকুমার মাস্টারের কালী মন্দিরে কারা যেন আগুন ধরাইয়া দিছে।’

পরের দৃশ্য আরও মর্মান্তিক। সুকুমার মাস্টার চোখের জলে ভেসে ভেসে, বোবা কান্নায় নিজের স্ত্রী আরতির রক্তাক্ত দেহ কাঁধে নিয়ে শ্মাশানঘাটার পথের দিকে নিয়ে যায়। রহিম ভাই অস্থিরভাবে কাঁদতে থাকে। জসিম ভাই, ছিরু, নিখিল ডাক্তারেরা পেছন পেছন হেঁটে যায়, মুখে ধ্বনি তোলে— হরি হরি বলো, হরি বলো, হরি হরি বলো, হরি বলো।

মঞ্চের মৃদু আলোতে আরও একটি করুণ দৃশ্য দেখা যাবে। দুইজন পাকসেনা তিনজন যুবতীর চোখে কাপড় বেঁধে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ওদের সাথে আছে কয়েকজন রাজাকার।

তৌহিদ নামের রাজাকার : হুজুর হুজুর ঐ মাড়োয়ারিপট্টি। মাড়োয়ারিরা দেশভাগের আগেই ভারত থেকে এই দেশে এসে ব্যবসা শুরু করে। আর যায়নি। ঐ যে সীতারাম আগরওয়ালের বাড়ি। বিশাল ধনী। ঐ শালারাই অর্থ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জেলা সদরে ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠিয়েছে। ওরা সবাই সুকুমার মাস্টারের কথায় ওঠে বসে।

পর্ব : ৬

সকালেই ক্যাপটেন হাফিজ উদ্দিন মজ্জেল চেয়ারম্যান, নুরু ইমামকে নিয়ে গ্রামে বের হয়। প্রথমেই আসে রহিম মিয়ার চায়ের দোকানে।

ক্যাপটেন : তোমার নাম তো রহিম মিয়া?

(তুছক্যা নাম রহিম মিয়া?)

রহিম মিয়া : জি হুজুর।

ক্যাপটেন : এ গাঁ থেকে কারা কারা মুক্তিবাহিনীতে গেছে তা জানো?

(এ গাঁও ছে কুন কুন জওয়ান মুক্তিযুদ্ধে চালা গিয়া তুম কি জানতে হো?)

রহিম মিয়া : আমি জানি না না হুজুর।

ক্যাপটেন : তোমার দোকানে বসে সব পরিকল্পনা হয়, তুমি জানো না? দাঁড়াও শালা তোমাকে দেখাচ্ছি মজা।

(তুছ কি দোকান মে বৈঠে বিলকুল মোশাবড়া করতে হয়, তু ইস কি জানতে নেহি? রুখো সালা তুছ ক্যা মজা দেখা গিয়া)।

ক্যাপটেন রহিম মিয়াকে দোকান থেকে নামতে বলে। কিন্তু কিছুতেই রহিম মিয়া দোকান থেকে নামতে চায় না। একপর্যায় একজন সৈন্য রহিম মিয়ার গলায় পেঁচানো গামছা ধরে হেঁচকা টানে নিচে নামিয়ে আনে।

তখনি ক্যাপটেন সাহেবের চোখ ছানাবড়া। রহিম মিয়া দোকানে বঙ্গবন্ধুর ছবি ঝুলিয়ে রেখেছে। ক্যাপটেন দাঁত খিটমিট করে একজন সৈন্যকে ছবিটি দোকান থেকে নামিয়ে আনতে ইঙ্গিত দেয়। পরে ক্যাপটেন নিজে পকেট থেকে দেশলাইর কাঠি জ্বালিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিখানা উঁচু করে আগুন ধরিয়ে দেয়। রহিম মিয়া একপ্রকার জোর খাটিয়ে অর্ধ পোড়া বঙ্গবন্ধুর ছবিখানা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে আগুন নেভায়।

ক্যাপটেন উত্তেজিত হয়ে নিজে রহিম মিয়ার গলার গামছা ধরে টানা-হেঁচড়া করে। একপর্যায় মাটিয়ে ঠাস করে ফেলে পায়ের বুট দিয়ে আঘাত করে।

ক্যাপটেন : এই কুত্তার বাচ্চা, বঙ্গবন্ধু কি তোর বাপ না দেবতা। তুই দোকানে ঝুলিয়ে রেখেছিস কেন? তুই শালা মুসলমানের নামের কলঙ্ক। ভালো করে শুনে রাখ, এ দেশ পাকিস্তান ছিল, আগামীতেও থাকবে। মাঝখানে তুই শালা মারা যাবি।

(এই কুত্তা কি বাচ্চা, বঙ্গবন্ধু তুছ কি বাপ হ্যায়? তুছ দোকান লটকে রাখে কিউ। তু শালা মুসলমান নাম কি কলঙ্ক হ্যায়। বেহতছ ছে ছুনে রাখে, এ দেশ পাকিস্তান হ্যায়, জিন্দেগিভর থাকে গ্যা। তুছ কি জিন্দেগি বরবাত হয়ে যায় গা)।

ক্যাপটেন আরেক দফা উত্তেজিত হয়ে রহিম মিয়ার উপর চড়াও হয়।

ক্যাপটেন : পাকিস্তান জিন্দাবাদ বোল শালা?

রহিম মিয়া : বাঁচার জন্য জড়োনো গলায় একবার উচ্চারণ করে ওরা কিছুটা দূরে চলে গেলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে— জয় বাংলা।

পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা, লুটতরাজ, ধর্ষণ করে যাচ্ছে। এলাকার মুক্তিবাহিনীরাও বসে নেই। বাদলের নেতৃত্বে স্বপন, দুলু, সিরাজ, বিপ্লবরা ইতোমধ্যেই গেরিলা আক্রমণ করে বেশ কয়েকজন সৈন্যকে মেরে ফেলেছে। পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকেও বহু মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। ক্যাপটেন হাফিজ উদ্দিন এই এলাকায় আরও সৈন্য পাঠানোর বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

শান্তি কমিটির সদস্যরা প্রতিদিনই এলাকার হিন্দুদের নামের তালিকা তুলে দিচ্ছে। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়া পরিবারের তালিকাও ইতোমধ্যে ক্যাপটেনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অবাক হওয়ার মতো বিষয় এখনো কোনো পাকিস্তানি সৈন্য মাড়োয়ারিপট্টিতে ঢোকেনি। বাজার থেকে বেশ কয়েকজনকে ক্যাম্পের টর্চার সেলে এনে হত্যা করেছে। অনেক হিন্দুরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

অন্ধকার রাত। মঞ্চে মৃদু আলো থাকবে। পর্দার আড়ালে বেওয়ারিশ কুকুরের ডাক শোনা যাবে। হঠাৎ করে ক্যাপটেন তার পরিকল্পনা বদল করে। সে শান্তি কমিটির সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে গোপন বৈঠক করে। পরদিন সকালেই মাইকে ভেসে আসে—

‘একটি বিশেষ ঘোষণা, এলাকাবাসীকে আনন্দের সাথে জানানো যাচ্ছে যে, আজ থেকে সৈয়দপুরবাসী সম্পূর্ণ মুক্ত। এ মাটিতে আর একটি লাশও পড়বে না। আপনারা কেউ এলাকা ছেড়ে চলে যাবেন না। আগামীকাল ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে শান্তিকার্ড বিতরণ করা হবে। সবাইকে শান্তিকার্ড সংগ্রহ করার জন্য অনুরোধ করা গেল। আদেশক্রমে— ক্যাপটেন হাফিজ উদ্দিন।’

পর্ব : ৭

একটি রাতের দৃশ্য। মঞ্চের আলো নিভে আসবে। মিউজিকে বেজে উঠবে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। কখনো থেমে থেমে কুকুরের ডাকও শোনা যাবে। মঞ্চে উঠে আসেন শান্তি কামিটির চেয়ারম্যান মজ্জেল হোসেন। সামসুল লস্কর। টুকু মেম্বর, ইমাম সাহেব।

মঞ্চে উঠে আসে ক্যাপটেন হাফিজ উদ্দিন। তিনি নিজ মুখে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মজ্জেল চেয়ারম্যানকে সভাপতি করেন। সবাই করতালি দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানায়। ক্যাপটেন নিজেও মজ্জেলের কাঁধে হাত চাপড়িয়ে অভিনন্দন জানায়।

ক্যাপটেন : পাকিস্তানের প্রতি তোমার দরদ দেখে আমি বহুত খুশি।

(পাকিস্তান কি দরদ দেখে ম্যায় বহুত খুশ হ্যায়)।

মঞ্চ থেকে সবাই একে একে চলে গেলেও মঞ্চে বসে থাকে মজ্জেল চেয়ারম্যান। সাথে একজন চামচে। কিছু একটা পরামর্শ করে দুজন। সেই মুহূর্তে শান্তি কার্ড নিতে আসে, নিখিল ডাক্তার, সুকুমার মাস্টার, শ্যামসুন্দর অধিকারী। শান্তি কার্ড পেতে মজ্জেলের হাতে তারা মোটা অংকের টাকা দেয়। সীতারাম কেডিয়া চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দেয় বউয়ের ব্যবহৃত স্বর্ণের কানের দুল। মজ্জেল চেয়ারম্যান সবাইকে শান্তি কার্ড পাওয়ার আশ্বাস দেয়।

শ্যামসুন্দর অধিকারী : চেয়ারম্যান সাব, ভগবানের পর আপনিই আমাদের রক্ষক। আমাদের প্রাণে মারবেন না। আমাদের পরিবারের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আপনাকে কথা দিচ্ছি, শান্তি কার্ড পাওয়ার পর আমরা অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করব।

মজ্জেল চেয়ারম্যান : আমি থাকতি কারও কোনো ক্ষতি হবে না। কাইল সকালেই ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে এসে শান্তি কার্ড নিয়া যাবা। লাইনে দাঁড়াইয়া সবাই কিন্তু মুসলমানের পরিচয় দিবা। দুএকটা সূরা-কলমাও মুখস্থ রাখবা। তয় কথাডা যেন মনে থাহে। শান্তি কার্ড পাবার পর তুমাগো কিন্তু ধর্মান্তরিত হইতি হবি। সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবা।

সকালেই ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে সবাই শান্তি কার্ড নিতে আসে। সবাই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ায়। মাড়োয়ারিপট্টি থেকে এসেছে শ্রী হরি দাস, সীতারামা কেডিয়া, বলরাম আগরওয়াল। লাইনের সামনের সারিতে আছে সুকুমার মাস্টার, নিখিল ডাক্তার, হরিপদ মালো।

মঞ্চের আড়াল থেকে জিপগাড়ি আসার আওয়াজ ভেসে আসবে। ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে আসবেন ক্যাপটেন হাফিজউদ্দিন। সাথে পাঁচজন বিহারি সৈন্য। তারা লাইনে দাঁড়ানো লোকগুলোকে খুব ভালোভাবে পরখ করে। কিছু কিছু মানুষকে দেখে সৈন্যদের সন্দেহ হয়। ক্যাপটেনের নির্দেশে লাইন থেকে ধরে আনা হয় সুকুমার মাস্টারকে।

ক্যাপটেন : তুমি কি মুসলমান?

(তুম কি মুসলমান হ্যায়?)

সুকুমার মাস্টার : জি হুজুর।

ক্যাপটেন : তুমার নাম কি?

(তুছ কি নাম কিয়া হ্যায়?)

সুকুমার মাস্টার কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে : সুকুর আলী।

ক্যাপটেন : তুমি তো মিথ্যা বলছো? তুমি মাস্টারমশাই। এ গ্রামের নেতা। এ গ্রাম থেকে অনেক যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ে পাঠিয়েছ। এটা মিথ্যে নয়।

(তু তো ঝুট বলতা হ্যায়। তু তো মাস্টারমশাই আছিস। এ গাঁও কি লিডার। এ গাঁও কি বহুত নওজুয়ান কো মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং কি নিয়ে পাঠাইয়ে। এ তো ঝুট নেহি)।

একজন বিহারি সৈন্য মাস্টারমশাইকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিল। একজন সৈন্য রাইফেলের বাট দিয়ে মাজা জড়িয়ে দুটি আঘাত করল। ক্যাপটেন নিজে পায়ের বুট দিয়ে মাস্টারমশাইয়ে বুকে ডলতে ডলতে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়। পরে মাস্টারকে ক্যাম্পের টর্চার সেলে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

সোহরাব নামের একজন বিহারি সৈন্য ক্যাপটেনের খুব কাছে আসে।

সোহরাব : স্যার আমাদের কাছে খবর আছে, অনেক হিন্দুও শান্তিকার্ড নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছে।

(হাম মে খবর হ্যায়, বহুত হিন্দু শান্তি কার্ড মিললে কি নিয়ে লাইন মে দাড় রহে গা।)

ক্যাপটেন : তাই নাকি? ওরে শালার মালাউনের বাচ্চা। তোদের রক্ষা নেই। তোমরা ভালো করে পরিচয় নিয়ে কার্ড দেবে। কোনো হিন্দু শান্তিকার্ড নিতে এলে সরাসরি ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে।

(এ কিয়া হ্যায়! ওরে সালার মালাউন ক্যা বাচ্চা, তুছকো নেহি রাখে গা। কুই হিন্দুদ শান্তি কার্ড কি লিয়ে আয়ে গা, সরাসর ক্যাম্প কে পাঠিয়ে দে গা।)

ক্যাপটেন নিজে লাইনে দাঁড়ানো সকলের মুখের দিকে তাকায়। লাইন থেকে ধরে আনে নিখিল ডাক্তারকে।

ক্যাপটেন : সত্যি করো বলো তুমি কি মুসলমান?

(সত্যি কি লিয়ে বলো তুম কি মুসলমান হ্যায়?

নিখিল মাস্টার : জি হুজুর। আমি মুসলমান।

ক্যাপটেন : কলেমা পড়তে পারবে তো?

(কলেমা পড়তে পাড়তে হো?)

নিখিল ডাক্তার মাথা নাড়িয়ে হাঁ সূচক জবাব দিয়ে কলেমা পড়ে প্রাণে রক্ষা পায়।

ক্যাপটেন : ওকে শান্তিকার্ড দিয়ে দাও।

(উছকো শান্তি কার্ড বিলায়ে দে গা।)

ধরা পড়ে বলরাম আগরওয়াল, নিশিকান্ত মালো।

বলরাম আগরওয়ালকে সূরা পড়তে বললে সে‘(আউজুবিল্লাহি মিনাশশাই তানির রাজীম বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।)

এ পর্যন্তই। আর একটি শব্দও তার মুখ থেকে বের হলো না। ভয়ে সে কাঁপছে। একজন সৈন্য বলরামকে একটু আড়ালে নিয়ে লুঙ্গি খুলে নুনু পরীক্ষা করে দেখে তার খতনা দেওয়া নাই। অর্থাৎ সে নিশ্চিত হিন্দু। বলরামের পাছায় আচ্ছা বেগে লাথি মেরে টর্চার ছেলে পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেয়।

নিশিকান্ত মালোকে দেখে ক্যাপটেনের সন্দেহ হয়।

ক্যাপটেন : শালা তুই তো হিন্দু আছিস ঠিক না?

(শালা, তু তো হিন্দু রাহে গা। এ ঠিক হ্যায়।)

নিশিকান্ত : না না হুজুর! আমি মুসলান।

ক্যাপটেন : দেখি একটা সূরা বল তো?

(দেখি এক কোরআন কি সূরা বোল হে?)

দুর্ভাগ্য নিশিকান্ত মালোর। একটা লাইনও সে উচ্চারণ করতে পারল না। নিশিকান্ত হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। তার কপালটা আরও মন্দ এই জন্য যে, গলা থেকে তুলসীর মালাটাও খুলে আসা হয়নি। ক্যাপটেন নিজে নিশিকান্ত মালোর গলা থেকে তুলসীর মালা ছিঁড়ে দূরে ফেলে দেয়।

ক্যাপটেন : শালার মালাউনের বাচ্চা। আমার কাছে মিথ্যা বলিস। এর শাস্তি যে কত ভয়ঙ্কর তুই নিজেও জানিস না। এই ওকে ক্যাম্পে পাঠিয়ে দাও।

(শালার মালাউন কি বাচ্চা, মুছকে ঝুট বলতে হে। ইস কি আজাব বহুত ভংঙ্কর হ্যায়। তু নেহি জানতে হো। উসকে ক্যাম্প মে পাঠিয়ে দো।)

সীতারামকে বাঁচাতে ক্যাপটেনের কাছে আছে চেয়ারম্যান মজ্জেল।

মজ্জেল চেয়ারম্যান : বেচারিকে ক্ষমা করে দিন হুজুর। ওরা আমাকে কথা দিয়েছে শান্তিকার্ড পাওয়ার পর এরা সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে।

ক্যাপটেন : এ তো দারুণ খবর। ওকে শান্তিকার্ড দিয়ে দাও।

(এ তো বহুত আচ্ছা খবর হ্যায়। উছকো শান্তি কার্ড বিলায়ে দে গা।)

সে রাতে আরেকটি খবর গ্রামবাসীকে ভীষণ আহত করে। ক্যাম্পের টর্চার সেলে সুকুমার মাস্টার মারা যায়। গ্রামের দবির নামের একজন গোরখোদক গ্রামে ঢুকে সবার কাছে জানিয়ে দেয়। এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি শক্তিশালী বহর সুকুমার মাস্টারের মৃত্যুর খবর শুনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা ক্যাম্পের সামনেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে ঝটিকা মিছিল দেয়। তাদের সামনে দুজন পাক সৈন্য দৌড়ে পালাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ধরে ফেলে। সৈন্যদের বন্দুক কেড়ে নিয়ে দুহাত বেঁধে বাগানে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধারা এবার সরাসরি ক্যাম্প আক্রমণের পরিকল্পনা করে। বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা এসে এ গ্রামে জড়ো হতে থাকে। ভোররাতেই আবার গ্রামে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়। ‘রহিম মিয়া খুন হইছে।’ উত্তরপাড়ার একটি আমগাছে তার লাশ ঝুলছে।

বৈষ্ণবী : হরিবোল। কী দিন আইল রে রাধা-মাধব। আমি নিজের চোখে দেখলাম রহিম মিয়ার রক্তাক্ত লাশ আমগাছে ঝুলছে।

পর্ব : ৮

তারিখ : ৫ জুন। সকাল থেকেই মাইকে আবার ঘোষণা আসে।

‘একটি বিশেষ ঘোষণা, এই এলাকায় যারা হিন্দু মাড়োয়ারি রয়েছে তাদের জন্য সুখবর। আগামী ১৩ জুন, ভোর ৫ ঘটিকার সময় একটি বিশেষ ট্রেনে সব মাড়োয়ারিদের ভারতের বর্ডারে পৌঁছে দেওয়া হবে। ঐ দিন সব মাড়োয়ারিদের সৈয়দপুর স্টেশনে হাজির থাকার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

আদেশক্রমে ক্যাপটেন হাফিজ উদ্দিন।

এই সুসংবাদ শুনে মাড়োয়ারিরা অনেক আশায় বুক বেঁধেছে। মনে শান্তির সীমা ছিল না। যেসব মাড়োয়ারি জীবন বাঁচাতে অন্য গ্রামে গিয়ে আত্মগোপন করে ছিল তারাও সৈয়দপুর চলে আসে। এমন একটি সিদ্ধান্ত নেবার জন্য সকলে ক্যাপটেনকে ধন্যবাদ জানায়। কামারপুকুর ইউনিয়ন, কাশিরাম বেল পুকুর ইউনিয়ন থেকে শতাধিক মাড়োয়ারি তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে সৈয়দপুর শহরে চলে আসে।

রাত পোহালেই ১৩ জুন। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মাড়োয়ারিরা তাদের এলাকার মানুষের সাথে লেন-দেন মিটিয়ে ফেলে। গ্রামবাসীর সাথে দেখা করতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে। নিখিল ডাক্তারও একজন মাড়োয়ারিকে জড়িয়ে কাঁদে। মাড়োয়ারিরা দেখা করে চলে যাওয়ার সাথে সাথে দুজন পাকসেনা নিখিল ডাক্তারকে চোখ বেঁধে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সবাই বলাবলি করছে সকালে ভিড় হবে মনে করে রাতেই মাড়োয়ারিরা সৈয়দপুর স্টেশনের আশে-পাশে ব্যাগ-পোটলা নিয়ে অবস্থান নেয়। একে অন্যকে জড়িয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে। অনেকে স্টেশনের টিনসেটে ঠাঁই না পেয়ে খোলা জায়গায় ব্যাগ মাথায় দিয়ে ঘুমায়।

ভোর রাত। আরও একটি মর্মান্তিক দৃশ্য এলাকাবাসীকে কান্নার সাগরে ভাসিয়ে দেয়।

তখনই মাড়োয়ারিদের নিয়ে যাওয়া বিশেষ ট্রেনটি সৈয়দপুরে এসে থামে। আজ একটু বেশিই ট্রেনের হুইসেল বাজতে থাকে। ট্রেনের হুইসেল শুনে কালু পাগলা উন্মাদের মতো মঞ্চে এসে দাপিয়ে পড়ে— কিন্তু আজ সে তার হুঁশিয়ারি সংকেত জানাতে পারেনি— মঞ্চে ওঠার সাথে সাথে বিকট শব্দের স্টেনগানের শব্দ হতে থাকে— ঠাস-ঠাস-ঠাস। কালু পাগলার পেছন দিয়ে মৃত্যুঘাতি বুলেটি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। কালু পাগলা ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সাড়া শরীর তার রক্তে চপ চপ করে। চোখে মুখে রক্ত। কালু পাগলাকে চেনার উপায় নেই। পর্দার আড়াল থেকে সম্মিলিত কণ্ঠে চিৎকার চেচামেচি ভেসে আসে—

গ্রামবাসী : তোরা কিরা কোথায় আছিসরে, জলদি আয়, কালু পাগলা খুন হইয়া গ্যাছে।

বিষু, বদির, ছিরুরা মঞ্চ দিয়ে কালু পাগলার রক্তাক্ত দেহটা তুলে নিয়ে যায়।

এলাকাবাসীর হৃদয় থেকে আন্দোলিত হতে থাকে কালু পাগলার বয়ান—

‘আহারে, কী সুন্দর মৃত্যুরে!

যা যা তোরা সবাই মরবার যা,

আমি যাব না। আমার ম্যালা কাম।’

ট্রেনটি সকাল পাঁচ ঘটিকায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সকাল দশটার সময় সৈয়দপুর স্টেশন ত্যাগ করে। তখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। দ্বিতীয় দফায় হুইসেল বাজাতে বাজাতে ট্রেনটি ধীর লয়ে ছেড়ে যায়। ট্রেন ছাড়ার সাথে সাথে অনেকে করতাল বাজিয়ে কীর্তন শুরু করে। মহিলারা উলুধ্বনি দিতে থাকে। অনেক মাড়োয়ারি ‘জয় শ্রীরাম’ বলে চিৎকার দিতে থাকে।

এদিকে বিশেষ ট্রেনটি সৈয়দপুরে ঢোকার সাথে সাতে মাড়োয়ারিরা হুড়মুড় করে উঠে পড়ে। জীবনটা রক্ষা পাওয়ার অপার আনন্দে তারা ট্রেনের কামড়ায় গিয়ে উল্লাস করে। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে।

কানাই দাস : জীবনটা নিয়ে যে আসতে পারব, একদম ভাবিনি গো? এবার দক্ষিণাশ্বের কালি মন্দিরে গিয়ে মায়ের কাছে বড় করে পুজো দেব।

রামপদ কেডিয়া : কানাইদা, আমিও ভারতে গিয়ে পুরীতে যাব। বাবা জগন্নাথের কাছে পূজো দেব।

প্রাণবল্লভ আগরওয়াল : সত্যিই গো দাদা, এই নরপশুদের হাত থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারব একদম ভাবিনি। তবে মজ্জেল চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। তিনিই হয়তো ক্যাপটেন সাহেবকে এমন পরামর্শ দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করেছেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্য মাড়োয়ারিদের। তারা কেউ বুঝতে পারেনি তার বড় রকমের ষড়যন্ত্রের শিকার। ট্রেনটি মাত্র দুই কিলোমিটার সামনে গিয়ে গোলাহাট নামক স্থানে গিয়ে থেমে যায়। ট্রেনের যাত্রীদের শঙ্কা বাড়ে। সবার মনে অশনি সংকেত বেজে উঠে। এখানে তো ট্রেন থামার কথা নয়। এর কারণ খুঁজতে অনেকেই ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখে ট্রেনের দুধারে বিপুল পরিমাণে বিহারি সৈন্য, পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে হাতে রাইফেল, স্টেনগান। বিহারি সৈন্যদের হাতে রামদাও। সবাই এই ট্রেনটির অপেক্ষা করছে। ওদের সাথে আছে মজ্জেল চেয়ারম্যান, মসজিদের ইমাম রাশু খা, টুকু মেম্বারসহ এলাকার সব রাজাকার। তাদের হাতেও রামদাও, ছুরি, চাকু।

ট্রেনটি থেমে যাওয়ার সাথে সাথে পাকিস্তানি সৈন্যরা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকে সব জানালা দরজা বন্ধ করে দেয়। বিহারি সৈন্যরা রামদাও হাতে প্রতিটি বগির দরজায় সামনে দানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

মাঈনুল নামের একজন বিহারি সৈন্য : ভালো করে শোনো নিয়ামত আলী, মাউলাউন গো মারার জন্য একটি গুলিও যেন খরচ না হয়। গুলির কিন্তু অনেক দাম। সব কটাকে রামদাও দিয়ে কুপিয়ে মারো।

(ভালো করে শোনো নিয়ামত আলী। মালাউন ক্যা খুন করনে কি লিয়ে এক গুলিও করচ নেহি করতা। গুলি কি বহুত দাম হ্যায়। সব মালাউন কো রামদাও কোপ দিয়া মারে গা।)

মাড়োয়ারিদের একজন করে নিচে নামে আসার সাথে সাথে তাদের কচুকাটা শুরু করে।

প্রতিটি বগিতেই এমন কৌশল অবলম্বন করে লোমহর্ষক ধ্বংসলীলা চালায়। অনেক বিহারী সৈন্য গভীর আক্রোশে লাশগুলোকে কেটে টুকরো টুকরো করে। নারী, বৃদ্ধ, শিশু কেউ পশুদের হাত থেকে রেহাই পায় না। গোটা সৈয়দপুর স্টেশন রক্তের বন্যায় প্লাবিত হয়। ঝাঁকে ঝাঁকে বেওয়ারিশ কুকুর রক্ত চাটতে থাকে। ৪১৩ জন মাড়োয়ারিকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করে। সৈয়দপুরে রচিত হয় পৃথিবীর জঘন্যতম বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। রচিত হয় একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। মজ্জেল চেয়ারম্যান, মসজিদের ইমাম রাশু খা, টুকু মেম্বারসহ এলাকার সব উঠতি রাজাকার পাকিস্তানি পতাকা হাতে নিয়ে ক্যাপটেনের পেছন হাঁটতে শুরু করে।

একটি নারকীয় অপারেশন শতভাগ সফল হওয়ায় সকলে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিতে দিতে চলে যায়।

সনোজ কুণ্ডু

সনোজ কুণ্ডু একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীত শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার। সম্পাদনা করে ছোটকাগজ শশী। প্রভাষক হিসেবে কর্মরত— রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি মুকসুদপুর কলেজ, গোপালগঞ্জ

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

বোধনের আগেই নিরঞ্জন

Read Next

হিন্দি চলচ্চিত্র ও অবিবাহিতা মায়েদের মাতৃত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *