অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আবুল হাসান তুহিন -
রক্তনদী

গল্প সংক্ষেপ : ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামে প্রভাব কম। তবুও গ্রামে যুদ্ধ আতঙ্ক। শহর থেকে পাকিস্তানি সৈন্য গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। গ্রামের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান। যে যার স্থান থেকে কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। নেবা ও ফটিক পাকিস্তানি সৈন্যদের পক্ষ নিয়ে গ্রামের মেয়েদের পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দিতে থাকে। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়েও জামিরের ভাইঝি জবেদাকে পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্পে অত্যাচার সহ্য করতে হয়। জামির পাকিস্তানি পক্ষের লোক জেনে তার ভাইঝিকে ছেড়ে দেয়। সৈন্যরা জামির কে টাকা দেয় এবং সান্ত্বনা দেয় যুদ্ধক্ষেত্রে এই সব জায়েজ আছে যুদ্ধ শেষ হলে পাকিস্তানি সৈন্য তার ভাইঝিকে বিয়ে করবে। মেয়েকে রক্ষা করতে না পারায় জবেদার মা গুলজান পাগল হয়ে নিরুদ্দেশ হয় এবং পাক-বাহিনীর হাতে মারা যায়। জবেদা তার চাচার উপর চরম বিদেশি হয় এবং পাকসেনাদের বর্বরতার প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প গ্রহণ করে। জবেদা বাতেনকে ভালোবাসত। একদিন বাতেনের কাছে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের কথা বলে জবেদা। বাতেন ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে গ্রামের যুবকদের যুদ্ধের জন্য সংগঠিত করছিল। জবেদাকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে। মুক্তি কমান্ডার জবেদাকে বিশ্বাস করেনি কারণ সে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের ভাইঝি। জবেদার উপর নির্মমতার কাহিনী শুনে একটু বিশ্বাস করে। জবেদা ট্রেনিং শেষে তার চাচা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান জামিরকে হত্যা করে। মুক্তি কমান্ডার তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে এবং গ্রামের পার্শ্বে পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্পে আক্রমণের দায়িত্ব দেয়। জবেদা ক্যাম্পে প্রবেশ করে যুদ্ধ করে প্রাণ দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা জবেদাকে তাদের শূন্য ভিটায় কবর দেয়।

চরিত্র পরিচিতি

১. বাতেন— মুক্তিযোদ্ধা— ৩০

২. জবেদা— মেয়ে— ২০

৩. মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার— ৩৫

8. রফিক— মুক্তিযোদ্ধা— ৩০

৫. দেওয়ান— মুক্তিযোদ্ধা— ৩০

৬. নেবা— খান সহযোগী— ৩০

৭. ফটিক— খান সহযোগী— ৩০

৮. গুলজান— জবেদার মা— ৪০

৯. জামির— শান্তি চেয়ারম্যান— ৫৫

১০. সবুর— চেয়ারম্যান চামচা— ৫০

১১. বান্ধবী— ২০

১২. পাকিস্তানি সৈন্য-১— ৩৫

১৩. পাকি অফিসার— ৩৫

১৪. পাকিস্তানি সৈন্য-২— ৩০

 

দৃশ্য ০১ ॥ দিন ॥ গ্রাম্য রাস্তা ॥ আউটডোর

চরিত্র : বাতেন, জবেদা, বান্ধবী-১

জবেদা স্কুলে যাচ্ছে বান্ধবীদের সাথে। বাতেন জবেদার সাথে কথা বলতে বলতে হেঁটে আসবে।

বাতেন : এই জবেদা কনে যাচ্ছ তোমরা?

জবেদা : স্কুলে যাচ্ছি।

বাতেন : স্কুলে যাতি হবে না। পারলি আমার সাথে চল।

জবেদা : মুরোদ কত! মুক্তির ট্রেনিং নিয়ে সাহস বাইড়ে গেছে।

বাতেন : শোনো, পড়াশুনা এখন হবে নানে। চারদিকি যুদ্ধ শুরু হয়েছে৷ এরমদ্দি পড়াশুনা! যাও বাড়ি যাও।

জবেদা : পড়াশুনা যারা করে তাগের যুদ্ধ-তুদ্ধ নেই।

বাতেন : দেখপানে। তবে আসল পড়াশুনা ঠিকই চলাই যাবানে।

জবেদা : চাচাজানের প্যাদানিতো খাওনি।

বাতেন : প্রেমের পাঠশালায় তুমি আমি ছাত্রছাত্রী। এর মন্দি হেডমাস্টারের চোখ রাঙানি তো একটু খাতি হবে। এত ভয় পালি চলে।

বান্ধবী : পথের মদ্দি এরাম কইরে কথা কলি গ্রামে কলঙ্ক লটাতি বাকি থাকবে নানে। জাবেদা জলদি চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

বাতেন : যাও। যুদ্ধের মদ্দি আমারে ভুলে যাইও না।

(সকলের প্রস্তান)

।।পটরিবর্তন।।

দৃশ্য— ০২ ॥ দিন।। স্কুল ॥ আউটডোর 

চরিত্র : বাতেন, রফিক ও দেওয়ান 

[স্কুলে পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে। পতাকা স্ট্যান্ড থেকে পতাকাটা নামাবে এবং পুড়িয়ে ফেলবে। বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবে]।

বাতেন : আমরা চাই মুক্ত স্বাধীন পাতাকা, মুক্ত স্বদেশ। পরাধীনতার শৃঙ্খলিত পতাকা চাই না।

দেওয়ান : আমাদের আকাশে উড়বে আমাদের দেশের পতাকা। কোনো ভিনদেশি পতাকা নয়।

বাতেন : ঐ পতাকা নামিয়ে আমাদের পতাকা উড়িয়ে দাও। বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল-সবুজের পতাকা।

রফিক : তাই করতে হবে। আমি পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ফেলি?

দেওয়ান : দাঁড়াও রফিক, আমি ঐ পতাকা নামাচ্ছি (দেওয়ান পাকিস্তানি পতাকা নামাবে)।

বাতেন : ঠিক আছে। দেওয়ান নামাও।

রফিক : পুড়াই ফেলি ঐ শত্রুদের পতাকা। আমাদের আকাশে আর কখনও উড়বে না, পাকিস্তানি পতাকা। পুড়িয়ে দিলাম। আ হা (হাসি)।

বাতেন : উড়িয়ে দাও বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা।

দেওয়ান : দিচ্ছি।

বাতেন : আহা কী সুন্দর করে নীল আকাশে পতাকা উড়ছে। এসো সবাই মিলে আমরা জাতীয় পতাকাকে সম্মান করি, এবং আমার সোনার বাংলা গানটি গাই। (সবাই একসঙ্গে আমার সোনার বাংলা গানটি গাইবে)।

দৃশ্য— ০৩ ॥ দিন ॥ রাস্তা ॥ আউটডোর

চরিত্র : নেবা, জবেদা ও ফটিক

[স্কুলে ছুটির ঘণ্টা বাজবে। ছেলে-মেয়েদের হট্টগোল। জবেদা ছুটির পর একা একা বাড়ি ফিরছে। নেবা জবেদার পিছু নিয়েছে।]

নেবা : (স্বগত) মামুগের জোগান দিতি দিতি হাঁফাই উঠিছি। মাইয়েডা কিডা! এরাম একটা মাইয়ে মামুগের দিলি, মামুরা বেজায় খুশি হবে নে। ও গো, ও…গো মেইয়ে। তোমাগের স্কুল বুঝি ছুটি হইয়েছে। (পেছন থেকে ডাক দেবে।)

জবেদা : (পেছন ফিরে রেগে) হ্যাঁ, হইয়েছে। তা তো দেখতি পাচ্ছেন। আবার শুনতিছেন কেন?

নেবা : (ঢোক চিপে) পাচ্ছি। এইডা কথার কথা। তা তুমি কোন কিলাসে পড়?

জবেদা : কিলাস টেনে পড়ি।

নেবা : বা, বা বেশ। তা তোমাগের স্কুল ঠিকমতো হচ্ছে?

জবেদা : এই সব শুইনে আপনার কী কাজ?

নেবা : মানে। দ্যাশে যুদ্ধ হচ্ছে তো। এর মন্দি কিলাস হচ্ছে তাই।

জবেদা : যুদ্ধ তো আমাগের গ্রামে হচ্ছে না!

নেবা : তা ঠিকই। তবে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঐ বাজারে ক্যাম্প করিছে, শুনেছ।

জবেদা : লোকে কচ্ছে, তাই শুনিছি।

নেবা : তোমাগের বাড়ি কোনডা?

জবেদা : (বাড়ি দেখাবে) ঐ তো। ঐ রাস্তার পার্শ্বে। ঐ নারকেল গাছের বাগান দেখা যাচ্ছে না, ঐ বাড়ি।

নেবা : বাহ্ খুব সুন্দর বাড়ি।

জবেদা : (একটু চিন্তা করে) আচ্ছা আপনি এত কথা শুনতিছেন কেন? আপনার মতলবটা কী শুনি!

নেবা : তেমন কিছু না। একটু পরিচয় হলাম।

জবেদা : তা দোষের না। যদি কোনো বদমতলব না থাকে!

নেব : না না, দেশ সেবাই নাম লেখাইছি তো। মনে হচ্ছে তোমাগের মেলা নারকেল গাছ আছে, তালি নারকেল খাতি আসবানে।

জবেদা : আইসেন। তবে পাইড়ে খাতি হবেনে।

নেবা : ঠিক আছে। (পেছন ফিরে হেঁটে আসতেই ফটিকের সাথে দেখা)।

ফটিক : কী রে নেবা, এত তাড়াতাড়ি ফিরে আলি যে!

নেবা : কাজ শেষ, তাই ফিরে আলাম।

ফটিক : কিরাম কাজ শেষ করলি।

নেবা : আমার কাজ মামুগের চোগান দিয়া। বাড়ি চিনে আলাম। এটা জব্বর জিনিস বুঝলি। যদি ঠিকমতো এইডা দিতি পারি তাহলি ম্যালা বকসিস পাবানানে।

ফটিক : তাই নাকি?

নেবা : তা কি মিথ্যে। যা কটকটে।

ফটিক : তা কখন যাতি হবেনে?

নেবা : চল ক্যাম্পে চল। মামুগের সাথে পরামর্শ কইরে ফাঁদ পাইতে ধরতি হবে।

ফটিক : চল চল জলদি চল। (প্রস্থান)

॥ পটরিবর্তন ॥

দৃশ্য— ০৪ ॥ দিন ॥ গাছতলা ॥ আউটডোর

চরিত্র : বাতেন, গ্রামবাসী-১, গ্রামবাসী-২, রফিক, দেওয়ান

[মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাতেন গ্রামবাসীদের সংগঠিত করবে।]

বাতেন : আমরা যারা ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়াইছি, তাদের সাথে তোমাগের থাকতি হবে।

গ্রামবাসী-১ : আমাগের কি যুদ্ধ করতি হবে?

বাতেন : অবশ্যই। আমরা তোমাদের ট্রেনিং করাইয়ে পাকা বানাই দিবানে।

গ্রামবাসী-২ : ট্রেনিং পালি সব একবারে পাটাই ফ্যালবানে।

বাতেন : এখন আমাগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশ মুক্ত করা।

গ্রামবাসী-১ : বাতেন ভাই গ্রামের মন্দি পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগান শোনা যাচ্ছে।

বাতেন : জানি, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হইছে ঐ জমির আলী।

রফিক : গ্ৰামে সবার উপর ওরা নজর রাখতিছে, আর আশেপাশের গ্ৰাম থেকে ক্যাম্পে মেয়েছেলে ধরে আনতিছে।

বাতেন : ঐ চামচাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজ চালাই যাতি হবে।

দেওয়ান : ভয় হচ্ছে। কখন কার ঘরে হামলা দেয় জানি না। মা-বোন সবার আছে।

বাতেন : ভয় পালি চলবে না। বুকের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা আনতি হবে। কি কন সবাই!

গ্রামবাসী : হ্যাঁ স্বাধীনতা আনতি হবে (এক সাথে বলবে জয় বাংলা।) আমরা সবাই যুদ্ধ করব। শহীদ হবে। জয় বাংলা, জয় বাংলা।

।।পটরিবর্তন।।

দৃশ্য ০৫ ॥ দিন ॥ জবেদার বাড়ি।। আউটডোর

চরিত্র : নেবা, ফকিট, পাকিস্তানি সৈন্য

[পাকিস্তানি সৈন্যদের নেবা ও ফটিক জবেদার বাড়ি নিয়ে আসবে। নারকেল গাছ দেখাবে।]

নেবা : আসেন স্যার, আসেন। কী সুন্দর ডাব, ঐ যে ডাব।

পাকসৈন্য : ডাব কিয়া, চিচ হ্যায়!

নেবা : ডাব পানি হ্যায়। গাছ মে পানি।

পাকসৈন্য : (নারকেল দেখে হেসে) গাছ মে পানি। হো, হো, হো। ও গ্রিন কোকোনাট।

ফটিক : (না বুঝে) না ছার, নারকেল।

পাকসৈন্য : পিলও মুঝছে।

ফটিক : বাড়ির মদ্দি কেউ কি আছে?

গুলজান : (বাড়ির ভেতর থেকে) কিডা আপনারা? আমাগের উনি বাড়িতে নেই। পরে আসেন।

নেবা : আনন্দে (স্বগত) এইডাই চাইছিলাম, বাড়িতে বিটা ছেলে নেই। পাখি তালি হাতের মুঠোই। আসেন স্যার বাড়ির মদ্দি যাই। (সবাইকে ডেকে বাড়ির ভেতরে যাবে।)

ফটিক : ঘরকে আন্দার চলিয়ে স্যার।

পাকঅফিসার : সোলজার, হ্যাঁ ঘরকে চলিয়ে।

পাকসৈন্য: ইয়েস স্যার।

গুলজান : দেখ তো মা কারা আইসে ডাকাডাকি করতিছে! (জবেদাকে উদ্দেশ্য করে।)

জবেদা : দেখতিছি মা। (অবাক হয়ে) আপনারা! চাচা তো বাড়িতে নেই। কী চান?

নেবা : উনারা গ্ৰামড়া ঘুরতি আইছে। তাই তোমাগের বাড়িতে নিয়ে আলম।

পাকসৈন্য ১ : লেড়কি কো, সুরত ভি আচ্ছা। আসমানকা পরী, ইয়ে চাহতা হ্যায়।

ফটিক : (আনন্দে) এই জন্নি তো নিয়াইছি। নেবা বেশি দেরি করা ঠিক হবে না। (গলা চেপে নেবাকে বলবে)

নেবা : স্যার জলদি কাম সারতা। উচকো চাচা বাড়ি নেহি। (একজন সৈন্যের কাছে বলবে)

পাকসৈনিক : সামাজ গিয়া। আও লেড়কি, এধারছে আও। মে আপসে জিন্দেকিকো পেয়ারদে ভরদেউঙ্গা। (জবেদাকে কাছে আসতে বলবে।)

নেবা : ঐ মাইয়ে, সার ডাকতিছে। আসো সালাম দিয়ে নাম কও।

জবেদা : না মানে আপনারা বসেন।

ফটিক : না না বসতি হবে না। আগে স্যার ডাকতিছে, এই দিকি আসো।

জবেদা : (ভয়ে ভয়ে আসবে সালাম দেবে) আসসালামু আলাইকুম ।

পাকঅফিসার : অলাইকুম সালাম, তোমারা নাম কিয়া?

জবেদা : (ভয়ে ভয়ে) জবে-দা।

পাকঅফিসার : নাম ভি সাচ্ছা। সুরাত ভি আচ্ছা। (হাত ধরবে।)

জবেদা : ছাড়েন, কী করতিছেন।

পাকসৈন্য : (হেসে) হো-হো, জিদ্দি লেড়কি হ্যায়।

জবেদা : মা, ও মা।

পাকসৈন্য : (ধমক দিয়ে) চুপ রও।

পাকঅফিসার : সুরত লেড়কি, হামার বহুত পছন্দ। আও হামার সাত।

জবেদা : কী কচ্ছেন আপনারা? কনে যাব। মা,ও মা।

পাকসৈন্য : বাকুয়াছ বন্দ।

জবেদা : মাগো মা, ওরা আমারে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

গুলজান : ছাইড়ে দেন। ছাইড়ে দেন, আমার মাইয়েডারে।

পাকসৈন্য : চুপ বুড়িয়া, গুলি মারেঙ্গে, উল্টা ভাগ যাও।

গুলজান : ওর ছাইড়ে দেন। আমারে নিয়ে যান। আমার মাইয়ের এত বড় সর্বনাশ কইরেন না।

নেবা : তোমার চলবে না।

গুলজান : তোমরা কিডা কনে আছ, আমার মাইরেডারে বাঁচাও। ওরে আল্লারে। (কাঁদবে)

নেবা : (ধমক দিয়ে) চুপ চুপ, চুপ কর। বাড়াবাড়ি করলি সত্যি সত্যি ওরা গুলি করবেনে।

গুলজান : তোমরা যা কবা আমি সব শুনবানে। শুধু আমার মাইডোরে ছাইড়ে দাও।

পাকসৈন্য : তোমরা লেড়কি হামারা পাছ রহেগি। চিন্তামাত।

গুলজান : (বিলাপ করে) ওরে আল্লারে আমার সব শেষ হয়ে গেল।

পাকসৈন্য: আওয়াজ বনধ বুড়িয়া। দূরহাট যাও (রাইফেল দিয়ে মাথায় আঘাত করবে।)

গুলজান : আহ আহ আহ (মাটিতে পড়ে যাবে। রক্ত ঝরে মাথা দিয়ে। টেনেহিঁচড়ে ওরা জবেদাকে নিয়ে যাবে। জবেদার মা উঠতে পারবে না।)

পাকঅফিসার : লেড়কিকো ক্যাম্প মে লে চলো।

জবেদা : মাগো মা, ওরা আমারে মাইরে ফেলবেনে।

দৃশ্য ০৬ ॥ দিন ॥ উঠান ॥ আউটডোর 

চরিত্র : জমির, সবুর, গ্রামবাসী

(জমির শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান গ্রামের লোকদের নিয়ে সভা করছে।)

জমির : শোন মিয়ারা, আজকের মতো আলোচনা শেষ কলাম। তবে আর একটা কথা, দ্যাশে গণ্ডগোল শুরু হইছে। সবাই একটু সাবধানে থাকবা। আমাদের গ্রামে এখনও শান্তি আছে। কী আছে না?

গ্রামবাসী : জি আছে। (নেপথ্য)।

জমির : পাকিস্তান দুই ভাগের চেষ্টা চলতিছে। তোমরা কেউ যেন মুক্তি বাহিনীতে যাওয়ার জন্নি লাফালাফি করবা না।

গ্রামবাসী : জি আচ্ছা। (নেপথ্যে)।

জমির : খান সেনারা স্কুল মাঠে ক্যাম্প করিছে। তারা কিন্তু কাউরে কিছু কচ্ছে না। সত্যি না মিথ্যে?

গ্রামবাসী : সত্যি, সত্যি। (নেপথ্যে)।

জমির : আমি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হইছি। আমি চাই গ্রামে শান্তি বজায় থাকুক। যাতে কোনো রক্তপাত না হয় সেই ব্যবস্থা করতিছি।

সবুর : (হাঁফাতে হাঁফাতে) জমির ভাই, জমির ভাই, সর্বনাশ হইয়েছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলেন।

জমির : (ব্যস্ত হয়ে) কী হয়েছে কবি তো?

সবুর : চলেন। পথে যাতি যাতি কচ্ছি।

জমির : (ব্যস্ত হয়ে) তাহলে আজকের মতো উঠি। আমার জরুরি একটা কাজ পড়ে গেছে, আসসালামু ওলাইকুম।

গ্রামবাসী : আলাইকুম সালাম।

।।সামান্য পজ।।

দৃশ্য ০৭ ॥ দিন ॥ গ্রাম্য রাস্তা ॥ আউটডোর

চরিত্র : জমির, সবুর

[ওরা রাস্তা দিয়ে হাঁটবে এবং কথা বলবে।]

জমির : এই বার-ক কী হয়েছে?

সবুর : আপনার বাড়িতে সর্বনাশ হয়েছে।

জমির : আমার বাড়িতে, কী সর্বনাশ! কারা কী করিছে?

সবুর : ঐ খানরা আপনার বাড়িতে চড়াও হইছে, আপনার ভাইজিরে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেছে।

জমির : বলিস কী? যাগের জন্নি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হোলাম তারাই কিনা কোলজায় দাগা দিল। আমি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। শান্তির জন্নি দিনরাত খাইটে মরতিছি। আমার বাড়িতে অশান্তি। বাড়ি চিনল কিরাম কইরে?

সবুর : ঐ পাড়ার নেবা আর ফটিক খানসেনাগের ক্যাম্পে থাকে। ওরা।

জমির : ওরা আমারে চেনে না?

সবুর : ওরা শুধু আপনারে চেনে। আপনার ভাইয়ের মাইয়েরে তো চেনে না। ঐডা আপনার বাড়ি এইডা বুঝে উঠতি পারিনি।

জমির : (রেগে গিয়ে) বজ্জাত দুটোরে জ্যান্ত পুতে মারব।

সবুর : নেবা সারাদিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে মেয়ে মানষির সন্ধান করে। পরে তাগের ধরে ক্যাম্পে আনে। সারারাত মাইয়ে মানষির উপর নির্যাতন করে।

জমির : জলদি চল। আগে ক্যাম্পের দিকি চল।

সবুর : এখনও তো দুই মাইল! জলদি পা চালায় হাঁটতি হবে।

জমির : যাগের জন্নি শান্তির চেয়ারম্যান তারাই আমার বাড়ির মদ্দি অশান্তি কায়েম করিছে।

দৃশ্য ০৭ ॥ দিন ॥ পাকবাহিনীর ক্যাম্প ॥ ইনডোর

চরিত্র : পাকঅফিসার ও ফটিক

[স্কুলে পাক সৈন্যরা ক্যাম্প করে আছে। বেশ কিছু সৈন্য অস্ত্রে সজ্জিত থাকবে।]

পাকঅফিসার : ফটিক, কুচ কেহনা চাতি হো?

ফটিক : স্যার মুসিবত হায়।

পাকঅফিসার : কিয়া!

ফটিক : যো লেড়কিকো পাকড়াও করতা, সোহাগ করতা হ্যায় ও লেড়কিকো চাচা, হামকো শাস্তি কা চেয়ারম্যান হ্যায়।

পাকঅফিসার : সামাজ বি ন্যাহি।

ফটিক : নেহি স্যার।

পাকঅফি : ওহো নো নো, ফিরছে বাতাও।

ফটিক : লেড়কিকে, চাচা হামারা শাস্তির চেয়ারম্যান।

পাকঅফিসার : ওহো। নেবাকো বুলাও। লেড়কি কো ঘরকে দি আও।

ফটিক : জি স্যার।

।।সামান্য পজ।।

দৃশ্য ০৮ ॥ দিন ॥ পাক বাহিনী ক্যাম্প ॥ আউটডোর 

চরিত্র : নেবা, ফটিক

[ফটিক নেবাকে ডাকতে ডাকতে স্কুলের বারান্দা থেকে নামবে]

ফটিক : নেবা। নেবা। এই নেবা।

নেবা : কী রে। এরাম ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিচ ক্যান?

ফটিক : চেঁচাব না, তুই তো নিজির ঘরে চুরি করিছিস।

নেবা : কী আবোলতাবোল কচ্ছিস!

ফটিক : আবোলতাবোল না, সত্যি কথা। যে মাইয়েডারে আইনে স্যারেরা সোহাগ করিছে, ঐ মাইয়ে হচ্ছে আমাগের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান জমির আলীর,বড় ভাইয়ের মাইয়ে।

নেবা : বলিস কী? ভুল নিশানাই তীর বিদ্ধ করেছি।

ফটিক : স্যার কলো ওরে বাড়ি দিয়ে আসতি। চল মাইয়েডারে বাড়ি দিয়ে আসি।

নেবা : চল চল। জলদি চল। বাঁচে আছে কিনা। হাভাতের দল। না মরা পর্যন্ত কারোরে ছাড়তি চায় না ফটিক : কোন ঘরে আছে?

নেবা : সামনে, চল দেখতিছি। কোন ঘর, মনে হচ্ছে এই ঘর, ভেতর থেকে কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে! (ভেতর থেকে জবেদার কান্নার শব্দ।)

ফটিক : এই ঘরের মদ্দি রইছে। খুলে ফেলি এ্যা, এ্যা। আ-হা-রে দেহার মতো নেই। কী কইরে বাড়ি যাবেন। জানে তো বাঁইচে আছে। কোনো রকম বাড়ির কাছ পর্যন্ত নিতি পারলি হবেনে। এই নবা ধরে আস্তে আস্তে বাইরি নিয়ে আয়।

নেবা : ও মাইয়ে, বাইরি বের হও। দরজা খুইলে দিছি। যাও বাড়ি চইলে যাও। হাঁইটে বাড়ি যাতি পারলি ভালো হবেনে। আমাগের কষ্ট কমবেনে।

নেবা : যাও, বাড়ি যাও। সব ঠিক হইয়ে যাবে নে।

জবেদা : (জবেদা কাঁদতে কাঁদতে ধীরে ঘর থেকে বের হবে।)

নেবা : এই তো হাঁটতি পারবে। যাক বাঁচা গেল।

।।পটরিবর্তন।।

দৃশ্য— ০৯ ॥ রাত ॥ পাক সৈন্য ক্যাম্প ॥ ইনডোর

চরিত্র : জমির, পাকসৈন্য

[পাকসৈন্য জমির পাক সৈন্যদের ক্যাম্পে আসবে। তার ক্ষোভের কথা জানাতে।]

পাকসৈন্য : হোল্ড, ক্যাম্পমে কিউ আইগো? 

জমির : আমি শান্তির চেয়ারম্যান, বড় স্যারের সাথে দেখা করতে চাই।

পাকসৈন্য : ঠিক হ্যায়। স্যার এ লোক আপনার সাথ মিলনা চাহাতে হ্যায়।

পাকঅফিসার : কিয়াবাত বাতাও।

জমির : স্যার, আমি সাচ্ছা আদমি। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হ্যায়। আপ হামারা ঘর পাচ দুসমনি করিগি।

পাক অফিসার : হাম মালুম নেহি।

জমির : আমার ভাইয়ের বেটিকো, সব কুচ লুটলিয়া। ও বেটিকো নিয়া আমি কী করেগি।

পাকঅফিসার : ওহ হা, জমির আলী তুম সবকুচ ভুল যাও। বেটিকো সাদী পড়াও।

জমির : এতিম মেয়েরে কে সাদী করেগি।

পাকঅফিসার : খুবসুরত লেড়কি, জঙ্গো কি পাচ হাম লেড়কি কো সাদী করেগি। চিন্তা মাত।

জমির : আপ মেরি ভাইজিরে সাদি করোগি!

পাকঅফিসার : জঙ্গ ময়দান সবকুচা জায়েজ হ্যায়। জোবি হুয়া সব কুচ ভুল যাও।

জমির : ঠিক হ্যায় স্যার।

পাকঅফিসার : জমির আলী এ রুপিয়া লে যাও। জেন্দেগী কি আয়েশা করো। লেড়কিকো কুহু মে উদছে সাদী করুঙ্গা।

জমির : আপকি মেহেরবানি।

জমির : চলি স্যার, আসসালামু আলাইকুম।

পাকঅফিসার : ওয়ালাইকুম সালাম। ঘাবড়াই নেহি, ঠিকছে কাম করেগি জমির আলী।

জমির : ঠিক হ্যায় স্যার,পাকিস্তান জিন্দাবাদ। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

।।সামান্য পজ।।

দৃশ্য— ১০ ॥ রাত ॥ রাস্তা ॥ আউটডোর 

চরিত্র : জমির ও সবুর

[টাকার বান্ডিল হাতে করে করুণমুখে জমির আলী হাঁটছে,সাথে সবুর।]

সবুর : এত টাকা ঐ খানসেনারা আপনারে দিল!

জমির : টাকা দিয়ে কলো সব ভুইলে যাতি। যুদ্ধ শেষ হলি এক স্যার মাইয়েডারে বিয়ে করবে।

সবুর : যুদ্ধে জেতবে না হারবে। মরবে না বাঁচবে কিডা কতি পারে। মাইয়ের সম্মানের দাম শোধ করল মনে হয়।

জমির : হোতি পারে, চল বাড়ি যাই। অনেক রাত হইছে।

সবুর : (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) আপনার ভাইয়ের মাইয়ে না হয়ে যদি নিজের মাইয়ে হয়তো ব্যাপারটা আপনি মাইনে নিতে পারতেন?

জমির : ঘটনা যখন পরতে পারতে ঘটে গেল তখন আর চিন্তা করে কী লাভ। জলদি পা চালা‌।

সবুর : চলেন। (প্রস্থান)।

দৃশ্য— ১১ ॥ দিন ॥ বাড়ি॥ আউটডোর 

চরিত্র : দিপালি ও পাকিস্তানি সৈন্যরা

[পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রামে আক্রমণ করেছে ভয় সবাই পালাবে কিন্তু দিপালি তার শিশুসন্তানকে কোলে করে পালাতে পারবে না সৈন্যরা তাকে নির্যাতন করবে।]

দিপালি : (স্বগত) গ্রামে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢুকেছে আমি এখন কী করব, কোথায় পালাব। চারিদিকে প্রচণ্ড গুলি হচ্ছে। ছেলেটা ভয় চিৎকার করছে। (শিশু ভয়ে চিৎকার করবে) শান্ত হও বাবা শান্ত হও। কী করব কিছুতেই শান্ত করতে পারছি না।

পাকিস্তানি : আপ কিউ ভাগরাহিহে, সহেলি বিনদ যাও। লেকিন হাম তুমারে সোহাগ কারেগি। (শিশুটি চিৎকার করতে থাকবে) আপকা বাচ্চা কিউ চিললাতাহে। উসকো ছাবর দিজিয়ে। হা হা হা (হাসি)।

দিপালি : না না আমার বাচ্চাকে তোমরা মেরো না।

পাকিস্তানি : সোলজার বাচ্চা কো জঙ্গলমে ফিকদো।

দিপালি : না না, আমার মানিক, (বাচ্চাটাকে জঙ্গলে ফেলে দেবে, বাচ্চার চিৎকার দিপালির আর্তনাদ।)

পাকিস্তানি : জোয়ানি লেড়কি, হো হো হো (হাসি)

দিপালি : আ আ হা (আর্তনাদ)

পাকিস্তানি : আপ জবান বন্ধ রাখো। (গোঁকানো শব্দ) হা হা হা (হাসি)

দৃশ্য— ১২।। রাত ॥ জমিরের বাড়ি ॥ ইনডোর

চরিত্র : জমির, জবেদা, গুলজান

[গুলজানের স্মৃতিশক্তি বিলোপ হয়েছে। সে পাগলামি করছে। জবেদা বাড়ি ফিরে নীরব। শুধু চোখের জল ফেলছে। কোনো কথায় উত্তর দেওয়ার শক্তি নেই। জমির মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করবে।]

জবেদা : (ঘরের মধ্যে বসে কাঁদছে)

জমির : সাচ্চা পাকিস্তানি হোতি যাইয়ে, যতসব মছিবত। শোন মা, যা হইছে সব ভুইলে যা। এই দেখ টাকা। পাকিস্তানি স্যারেরা দেছে। লাগলি আরও দেবে। একজন তোরে পছন্দ করিছে। যুদ্ধ শেষ হোলি সে তোরে বিয়ে করবে।

গুলজান : এই তুই কিডা। আমার মাইয়ে কই? কেউ আমার মাইয়েডারে কেউ রক্ষা করতি পারল না। হো হো (হেসে) আমি যাব রক্ষা করতি। আমি যাব। (ঘর থেকে হাসতে হাসতে বের হয়ে যাবে)।

জমির : আমি পড়েছি মহামছিবতে। একদিকি পাকিস্তান রক্ষা, অন্যদিকি এরা। কোনডা সামলাব। একজন হইছে পাগল অন্যজন বোবা। (বাইরে থেকে সবুর ডাক দেবে)

সবুর : জমির ভাই, ও জমির ভাই, পশ্চিম পাড়ায় যাওয়ার সোমায় হইছে। (জমির ঘর থেকে বের হয়ে)

জমির : ঘরে জ্বালা, বাইরে জ্বালা। দাঁড়া আসতিছি।

দৃশ্য— ১৩।। দিন ॥ আখখেত ॥ আউটডোর

চরিত্র : বাতেন

[আখখেতে এসে আখ ভেঙ্গে খাবে। জবেদার কথা চিন্তা করবে।]

বাতেন : (স্বগত) খেতের আখগুলো দেখ মনে হচ্ছে বেশ ক্ষতি হয়েছে। দেখি একটা ভাইঙ্গে দেখি বতি হয়েছে কিনা। আমি আর জবেদা বিকেল হলি আখ খাতি আসতাম। (বাতেন আখ ভাঙতে যাবে। পুরাতন স্মৃতি মনে পড়ে যাবে।)

।।ফ্ল্যাশব্যাক।।

দৃশ্য— ১৪ ॥ দিন ॥ আখখেত ॥ আউটডোর

চরিত্র : জবেদা ও বাতেন

[আখখেতে জবেদা ও বাতেন, আখ ভাঙতে যাবে। জবেদা ভেঙচি দিয়ে বলবে]

জবেদা : দেখি কিরাম বিটা মানুষ। আখ ডাইঙ্গে ক্ষাতি পারো।

বাতেন : ক্যান পারব না। আমি হোলাম শিয়াল পণ্ডিতের নানা।

জবেদা : নাও, খাও।

বাতেন : কিরাম মরাট করে আখ ভাঙ্গে ফেললাম। দাঁত বাঁধায়ে কিরাম করে ছিলতি হয় দেখো।

জবেদা : আ আ মনে হয় দাঁতের অবস্থা শেষ হয়ে গেছে। কিরাম শক্ত আখ।

বাতেন : ও হো দাঁত ভাইঙ্গে যাবে, বললাম না পারবা না, দেখ কিরাম করে আখ খাতি হয়।

জবেদা : একলা খালি পেট ফোলবেনে কিন্তু!

বাতেন : দাও ছিলে দিচ্ছি। শিয়াল পণ্ডিতের নানি। বাতেনকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যাবে।

জবেদা : দাঁড়াও, দেখাচ্ছি।

বাতেন : ধরতি পারবা না।

।।ফ্ল্যাশ ইন।।

দৃশ্য— ১৫ ॥ দিন ॥ আখখেত ॥ আউটডোর 

চরিত্র : বাতেন

বাতেন : (স্বগত) শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ভালোই দান বাঁধাইছে। যুদ্ধের মদ্দি খাবে কিডা। দেশের যুদ্ধ, মনের যুদ্ধ। দুটোই চালাই যাতি হবে। আমার স্বপ্নটা ভাইঙ্গে খানখান হয়ে গেল। ওমন প্রজাপতির মতো চঞ্চল মাইয়েডারে খানরা ডানা ভাইঙে দিল। আমার ইচ্ছা পূরণ হবে না। সারাদিন চুপচাপ বসে থাকে। জবেদার সাথে দেখা হয় না কতদিন। দেহি বাড়ির সামনে যাইয়ে দেহি কী অবস্থা।

।।সামান্য পজ।।

দৃশ্য— ১৬ ॥ দিন ॥ জবেদার বাড়ি ॥ আউটডোর

চরিত্র : বাতেন ও জবেদা

[বাতেন জবেদার বাড়ির সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা করছে। ভাবেদা বাতেনকে দেখবে এবং কথা বলবে।]

জাবেদা : কে ওখানে! কে, বাতেন ভাই না?

বাতেন : হ্যায়। তা তুমি ভালো আছ জবেদা।

জবেদা : (আশ্চর্য হয়ে কাছে এগিয়ে আসবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে) মরা মানষির ভালোমন্দ থাকে। বাতেন ভাই তুমি কি আমার একটা কথা শুনবা?

বাতেন : কী কথা বলো। তোমার কোনো কথা আমি কি ফেলিছি। কও।

জবেদা : (খুশি হয়ে) মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্পে তুমি আমারে নিয়ে যাবা।

বাতেন : মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্পে তুমি কী করবা!

জবেদা : আমি মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেব। দ্যাশের জন্নি যুদ্ধ করব। যুদ্ধ কইরে জীবন দেব। ঐ বাজারে ক্যাম্পে যতগুলো নাপাক কুত্তা আছে তাদের মারব। (এক নিশ্বাসে সে বলবে এবং হাসবে)

বাতেন : আচ্ছা নেব।

জবেদা : তুমি আমারে মুক্তি বাহিনীতে ভর্তি কইরে দাও। (কেঁদে ফেলবে, বাতেনকে জড়িয়ে ধরে)

বাতেন : (স্বগত) কোনো ফন্দি আঁইটে বাহানা করতিছে না তো, না তা হবে কেন? এরাম করার প্রশ্নই আসে না। আসলে প্রতিশোধের আগুন ওর বুকে বচ্ছে।

জবেদা : সত্যি ভর্তি কইরে দিবা তো?

বাতেন : সত্যি দিবানে। আচ্ছা এখন তুমি শান্ত হও। কালকে তুমারে সাথে কইরে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাবানে।

জবেদা : বাতেন ভাই, তুমি কি আগে মতো, এখনও আমারে ভালোবাস?

বাতেন : না বাসার কী আছে! সময়মতো চলে আসবানে। কোনো চিন্তা কইরো না। (বাতেন দ্রুত চলে যায়)

দৃশ্য—১৭ দিন ॥ রাস্তা ॥ আউটডোর 

চরিত্র : গুলজান ও কয়েকজন ছেলে-মেয়ে

[গুলজান বাড়ি থেকে দিক শূন্য রে পাগলামো করবে। কতিপয় ছেলে-মেয়ে তাকে উত্যক্ত করবে।]

গুলজান : আমার মাইয়েডারে কেউ বাঁচাতি আসল না। কেউ না, কেউ না (কেঁদে দেবে)। আমি বাঁচাব। আমি বাঁচাব। হা হা হা (হাসি)

ছেলে-মেয়ে : পাগলি, পাগলি। (নেপথ্যে)

গুলজান : তোরা কারা? যা পালা। আমার মাইরে আমি বাঁচাব। পালা, পালা, হা হা হা।

(ছেলে-মেয়ে ইট ছুড়ে রাগাবে। ছেলে-মেয়েদের তাড়া করবে। ওরা ছুটে পালাবে।)

দৃশ্য—১৮॥ দিন॥ মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প॥ আউটডোর 

চরিত্র : কমান্ডার, বাতেন ও জবেদা বাতেন

[জবেদাকে নিয়ে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্পে যাবে। মুক্তি বাহিনীর কমান্ডারের সাথে দেখা করবে।]

বাতেন : আসসালামু আলাইকুম।

কমান্ডার : ওয়াইকুমা সালাম। চারিদিকের খবর কী?

বাতেন : প্রতিদিন আশেপাশের গ্রামে হামলা হচ্ছে। রাজাকার ও পাকবাহিনী মিলে মাইয়েদের উপর অত্যাচার করতিছে।

কমান্ডার : তোমার সাথে মেয়েটা কে? ওকে ক্যাম্পে এনেছ কেন?

বাতেন : ওর নাম জবেদা। আমাদের গ্রামের জমির আলীর ভাইঝি।

কমান্ডার : জমির আলী, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান! তার ভাইঝি তোমার সাথে! শেষপর্যন্ত ক্যাম্পে! ব্যাপারটা মোটেও ঠিক না! তা ছাড়া আমাদের বিপদ হতে পারে!

বাতেন : আপনি যেভাবে ভাবতিছেন ব্যাপারটা সেই রকম না। তার চেয়ে ভয়াবহ।

কমান্ডার : বুঝলাম না বুঝিয়ে বল।

বাতেন : আমি জবেদারে ছোটবেলা থেকে চিনি। ছোটবেলায় এতিম হইছে। চাচার কাছে মানুষ।

কমান্ডার : চিনলে কী হবে। পরিবেশের পরিবর্তন হয়েছে। জমির আলী আগে ছিল গ্ৰামের মাতব্বর। সবাই তাকে মানত। এখন সে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। পাকিস্তানের পক্ষে।

বাতেন : সবই মানলাম।

কমান্ডার : ও নিশ্চয় কোনো ফন্দি নিয়ে এসেছে।

বাতেন : আমি প্রথমে এরাম ভাইবেছিলাম। পরে ওর মনের অবস্থা দেইখে, বুঝলাম ওর বুকে প্রতিশোধের আগুন বইছে।

জবেদা : (এগিয়ে আসবে) হ্যাঁ, প্রতিশোধ। আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে। আপনি হয়তো শুইনেছেন, রাজাকার ও পাকবাহিনী আমারে তাদের ক্যাম্পে ধইরে নিয়ে গিছিল। সারারাত চলে আমার উপর অত্যাচার। (জবেদা সেই বর্বর নির্যাতন মনে করবে।)

।।ফ্লাশব্যাক।।

দৃশ্য— ১৯ ॥ রাত ॥ ঘর ॥ ইনডোর 

চরিত্র: পাকঅফিসার, জবেদা

[ঘরের ভেতর পাক সৈন্য জবেদাকে নিগ্রহ করবে।]

পাকঅফিসার : (অট্টহাসি) আও আও পেয়ারছে রাত গুজার করেঙ্গে।

জবেদা : আমারে ছইড়ে দেন। আপনাগের পায়ে পড়ি।

পাকঅফিসার : আ হা হা (হাসি) বাকোয়াজ বনধ করো। মুখ বনধ রাখো।

।।ফ্লাশ ইন।।

দৃশ্য— ২০ ॥ দিন ॥ মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ॥ আউটডোর 

চরিত্র : জবেদা, বাতেন, কমান্ডার

জবেদা : একসময় খবর আসে, আমি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান জমির আলীর ভাইয়ের মাইয়ে। কিন্তু লাভ কী? একটা মাইয়ের সম্মান ততক্ষণে ধুলোয় মিশাই দেছে অত্যাচার কলঙ্কের দাগ মাথায় নিয়ে বাঁইচে থেকে কী লাভ!

কমান্ডার : লাভ আছে। তোমাকে বাঁচতে হবে। দেশের জন্য বাঁচতে হবে।

জবেদা : ঐ পশুরা আমারে আধমরা কইরেছে। আমি চাই ওদের মৃত্যু। আমার চাচা ওদের ক্যাম্পে গেলে পাকসেনারা বলিছে যুদ্ধের ময়দানে মাইয়ে ছেলে নিয়ে ফুর্তি করা জায়েজ। তাই আমার ইজ্জতের দামে টাকা দেছে। আমার চাচা সেই টাকা নির্লজ্জের মতো বাড়িতে আইনেছে। এক পাকসেনা যুদ্ধ শেষ হলি আমারে বিয়ে করবে, বলেছে। এখন আপনি বলেন আমার কী করা উচিত?

কমান্ডার : তুমি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ আসলে আমারই ভুল হয়েছে তোমাকে বুঝতে। তাহলে এখন থেকে ট্রেনিংয়ে যোগ দাও।

বাতেন : একই ঘরে শত্রু মিত্র থাকতি পারে!

কমান্ডার : নো মেটার অল রাইট বাতেন, জবেদার যথাযথ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করো।

বাতেন : জি আচ্ছা।

কমান্ডার : দেখবে ও হবে সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা, কারণ যার মনে কোনো মৃত্যুর চিন্তা থাকে না সেই তো প্রকৃত যোদ্ধা।

বাতেন : দেখবেন জাবেদা নিজের জীবন দিতে পিছপা হবে না!

কমান্ডার : যাও, কাজে লেগে যাও।

দৃশ্য— ২১ ॥ দিন ॥ পাকিস্তানি ক্যাম্প ॥ আউটডোর 

চরিত্র : জমির, বান্ধবী, পাকঅফিসার

বান্ধবী : চাচা আপনি আমারে কনে নিয়ে আসলেন?

জমির : কেন জবেদার সাথে দেখা করতে নিয়ে আইছি।

বান্ধবী : তা পাকিস্তানি ক্যাম্পে কেন? (পাকিস্তানি অফিসার এগিয়ে আসবে)

জমির : চুপ স্যাররা এইদিকি আসতেছে। স্যার যুদ্ধের মধ্যি মাথা ঠাণ্ডা করার জন্নি নিয়ে আসলাম।

পাকঅফিসার : তুম খাঁটি পাকিস্তানি রহগী।

বান্ধবী : চাচা, চাচা, আপনি জেনেশুনে এত বড় সর্বনাশ করলেন?

জমির : ধুত্তুরি চাচা, আপন জান বাঁচা। স্যার সামলায়ে রাখেন।

পাকঅফিসার : আও লেড়কি আও।

বান্ধবী : আমি তো আপনার মেয়ের মতো। (বিলাপ করবে)

জমির : আহ্ শান্তির জন্নি কষ্ট করতি হয়। কষ্ট না করলি শান্তি নষ্ট হয়।

পাকঅফিসার : শান্তিকো চেয়ারমান শান্তি কো নিশান উড়াও, হো হো হো (হাসি)।

দৃশ্য— ২২ ॥ দিন ॥ মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ॥ আউটডোর 

চরিত্র : জবেদা, বাতেন, কমান্ডার

কমান্ডার : জবেদার প্রশিক্ষণ কেমন চলছে?

বাতেন : খুব ভালোভাবে উত্তীর্ণ হবে, প্রতিটি ধাপ সে দক্ষতার সাথে পার করেছে।

কমান্ডার : ভেরি গুড। এবার তাহলে অস্ত্র চালানো শেখাতে হবে।

জবেদা : আমরা হাতের নিশানা ঠিক আছে।

কমান্ডার : ওকে। বাতেন শোন। এই রিভলবারটা জবেদাকে দেওয়া হলো। ও সব সময় এটা কাছে রাখবে।

বাতেন : ঠিক আছে। প্রথমে এইটা দিয়ে শুরু পরে, ভারী অস্ত্র।

কমান্ডার : আমাদের হাতে সময় কম। আশেপাশের পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বাতেন : (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) সবই প্রস্তুত। শুধু সময়ের অপেক্ষায়।

।।পটপরিবর্তন।।

দৃশ্য— ২৩ ॥ দিন ॥ জমিরে বাড়ি ॥ আউটডোর

চরিত্র : জমির, সবুর

[জমির আলী তার বাড়ির উঠানে বসে আছে। সবুর জমির আলীর মাথা পা ও গা টিপে দেবে।]

জমির : সবুর। এদিকি আয়। আমার গা মাথা একটু টিপে দে। মনে শান্তি নেই।

সবুর : কী কচ্ছেন জমির ভাই! আপনি হোলেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, আপনার শান্তি নেই।

জমির : ও তুই বুঝবি নে।

সবুর : গ্রামে তো শান্তি-টান্তি দেখতি পাচ্ছি নে।

জমির : এই শান্তি সেই শান্তি না।

সবুর : তা কিরাম শান্তি?

জমির : চারিদিকি শুধু গুলাগুলি লুটপাত।

সবুর : এই তো বুঝে গিচ্ছি। এইটাই হলো শান্তি। আমরা পাকিস্তান রক্ষার শান্তি চাই।

জমির : ভাইঝিডা, কোথায় গেল খোঁজও পালাম না। ওর মা পাগল হইয়ে হারায় গেছে। এখন ঘরবাড়ি দেখাশোনা করবে কিডা। রান্নাবান্নার লোকের অভাবে এর-ওর বাড়ি খাইয়ে থাকতি হচ্ছে।

সবুর : আপনি একটু ধৈর্য ধরেন। পাকিস্তান থাকিল সব পাওয়া যাবেনে।

জমির : দেখা যাক। শোন আসল কাজটা যেন আজকের মদ্দি সাইরে ফেলবি।

সবুর : ঠিক আছে।

জমির : বাতেনের বাড়ি লুটপাট কইরে জ্বালাই দিবি।

সবুর : সব সময় মতো কইরে ফালবানে।

দৃশ্য— ২৪ ॥ দিন॥ মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প॥ আউটডোর

চরিত্র : কমান্ডার, বাতেন, দেওয়ান ও জবেদা

[ক্যাম্পের ভেতর সবাই অবসর সময় কাটাবে। কমান্ডার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ধবাবার জন্য বলে।]

কমান্ডার : বাতেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রটা একটু ধরাও, দেখ কী হচ্ছে? (রেডিও ধরানের চেষ্টা করবে। কিন্তু ধরবে না।)

বাতেন : দেখতিছি। না ধরতিছে না। মনে হয় ব্যাটারি নেই।

কমান্ডার : দেখি আমার কাছে নিয়ে আস। এই যে, ব্যাটারি গলে গেছে। নাও রাখ। ব্যাটারি না কিনলে হবে না।

বাতেন : দেওয়ানরে ডাক দিচ্ছি।

কমান্ডার : কেন?

বাতেন : দেওয়ান একজন ভালো শিল্পী। আজগে দেওয়ানের কণ্ঠে আমরা গান শুনি।

কমান্ডার : বাজনা ছাড়া গান ভালো হবে?

বাতেন : দেওয়ানের কাছে একটা মাউথ অর্গান আছে। রফিক মাউথ অর্গান ভালো বাজাতি পারে।

কমান্ডার : সবাইকে ডাক দাও। একটা গান শুনি

বাতেন : দেওয়ান, রফিক, জবেদা তোমরা কে কনে আছো এই দিকি আস।

সবাই : কী ব্যাপার?

কমান্ডার : সবাই বস। সারপ্রাইজ আছে। দেওয়ান নাকি ভালো গান জানে। আমরা সবাই তার গান শুনব।

দেওয়ান : রফিক মাউথ অর্গানডা ধর। একটা দেশের গান ধরি। বাতেন মুড়ির টিনডা নিয়ে আয়, ঢোলের মতো, বাজাবি। সবাই রেডি।

রফিক : (মাউথ বাজাবে) হ্যাঁ রেডি গান ধর।

বাতেন : এই যে আমি মুড়ির টিন নিয়ে আসলাম। (বাজাবে)

দেওয়ান : শুরু করি। (গলা কেশে)

।।গান।।

যুদ্ধ নদী রক্ত জল সেতু হলো স্বাধীনতা

দীপ্ত সাহস ক্ষিপ্র বল ভাঙবে নীরবতা।।

একট ফুল একটি কবিতা একট ভাষার গান

মুক্ত বাতাসে উড়াতে পতাকা জীবনের বলিদান

বিজয় ধ্বনি আকাশে বাতাসে এলো স্বাধীনতা।।

সর্বগ্ৰাসী রক্তপিপাসুর অবনত হলো শির

ঘরে ঘরে আজ জন্ম নিয়েছে লক্ষ কোটি বীর

শত্রু রুখতে সদা জাগ্রত আপামোর জনতা।।

একমুঠো ভাত একটি স্বপ্ন একই ঐক্যতান

একই স্বপ্নে মায়ের মমতায় দুঃখের অবসান

বর্ণমালা ভোলে না কখনো বীর শহীদদের কথা।।

কমান্ডার : (গান শেষে) বাহ চমৎকার।

বাতেন : পরানডা ভরে গেল।

জোবেদা : রক্তটা গরম হয়ে গেল

কমান্ডার : দেওয়ানের জন্য সুন্দর তালি হবে। (সবাই তালি দেবে)

দৃশ্য— ২৫ ॥ রাত বাতেনের বাড়ি ॥ আউটডোর

চরিত্র : জমির, সবুর

[বাতেনের বাড়ি ওরা আগুন এবং লুটপাত করবে। আগুনের মশাল জ্বলে রাখবে হাতে।]

জমির : বাতেন গ্ৰামের সবার মাথা খাইছে। এত করে কলাম তোরা কেউ মুক্তি হবি নে। গ্ৰামে শান্তি থাকবে না। শুনল না।

সবুর : ঠিক কইছেন। ঐতি গ্রামে জয় বাংলা শ্লোগান দেয়। রাতের অন্ধকারে বাড়ি আসে। মুক্তি হওয়ার জন্নই সকলরে ফুসলায়।

জমির : বাড়ি এবার আসপেনানে।

সবুর : বাড়ি থাকলিতো আসপে।

জমির : দে, দে, ওর ঘরে আগুন দে। কিছুই যেন থাকে না।

সবুর : শুধু ভিটে। ভাই ঘটি বাটি কিছু নিতি হবে না।

জমির : আরে নে নে। যা পারিস এখন সব তোগের। হা হা হা (হাসি)

সবুর : তালি আগুন দিয়ার আগে ঘটিবাটি টাকাপয়সা সব গোছাই নি।

জমির : যা পারিস নে। পারলি মাটি কাইটেও নিতি পারিস। মুক্তি হওয়ার সাধ মিটোই দে। যা জলদি কর। হা হা (হাসি)।

সবুর : ধরায়ে দিলাম আগুন (আগুন দেবে, দাউদাউ করে আগুনে জ্বলবে বাতেনের বাড়ি।)

দৃশ্য— ২৬ ॥ রাত ॥ নির্জন স্থান ॥ আউটডোর 

চরিত্র : জবেদা ও বাতেন

বাতেন : জবেদা একা একা আনমনে দাঁড়িয়ে আছে। বাতেন এসে ওর কাঁধে হাত দেবে। পেছন ফিরে

জবেদা :ও তুমি।

বাতেন : ভয় পাইলে নাকি?

জবেদা : কীসের ভয়? আমার কোনো ভয় নেই। কিছু পাবার নেই। কিছু হারাবার নেই।

বাতেন : কিন্তু আমার ভয় আছে।

জবেদা : (হেসে) পুরুষ মানষির আবার ভয়।

বাতেন : হ্যা তোমারে হারানোর ভয়।

জবেদা : এখনও ভাবো আমারে নিয়ে!

বাতেন : কেন ভাবব না। তোমারে ছাড়া অন্য কাউরে তো ভালোবাসিনি!

জবেদা : ওসব বইলে, আমারে দুর্বল কইরে দিও না বাতেন ভাই।

বাতেন : শুধু তোমার চাচা আমাদের সম্পর্কডা মাইনে নিতি পারেনি।

।।ফ্লাশব্যাক।।

দৃশ্য— ২৭ ॥ দিন ॥ রাস্তা ॥ আউটডোর 

চরিত্র : বাতেন, জমির ও সবুর 

[জমির ও সবুর দাঁড়িয়ে খেতের ফল দেখতে। বাতেন আসবে তাদের সামনে দিয়ে।]

সবুর : জমির ভাই, আপনার ভাইজি জামাই আসতিছে।

জমির : কী কলি। কিডা আমার ভাইঝি জামাই?

সবুর : না মানে গ্রামের সকলি কয় আর কি!

জমির : তুই কবি ক্যান। দাঁড়া জামাই গিরি ছুটোই দিবানে। (বাতেন ওর সামনে এসে সালাম দেবে।)

বাতেন : সালামু আলাইকুম।

জমির : আলাইকুম সালাম। শুনলাম তুমি বামুন হয়ে চান ধরতি চাও?

বাতেন : ধরাডা কি অন্যায়?

জমির : ন্যায় অন্যায় বুঝি না।

বাতেন : অসুবিধেডা কোথায়?

জমির : সুবিধাও নেই। যেহেতু ঢিলডা আমার গাই পড়তিছে। তাই সাবধান কইরে দিচ্ছি। সামনে আর এগোইও না।

বাতেন : (রেগে) আপনি কি বাঁধা দিতি পারবেন?

জমির : প্রমাণ চাও?

বাতেন : কী প্রমাণ দিতি পারেন?

জমির : আমার ভাইঝির পিছনে হাঁটলি পা থাকপে না আর তাকালি চোখ দুটো হারাবা। এইবার ভাইবে দ্যাখো কী করবা। (শাসনের সুরে হুমকি দেবে।)

।।ফ্লাশ ইন।।

দৃশ্য— ২৮ ॥ দিন ॥ নির্জন স্থান ॥ আউটডোর

চরিত্র : জবেদা ও বাতেন

জবেদা : এখন ভাইবে কোনো লাভ নেই। তাছাড়া আমারে কেউ গ্রহণ করবে না।

বাতেন : আমি কি কখনও বলিছি।

জবেদা : তা না। সমাজ সংসারে সবাই আমারে ঘৃণা করবে।

বাতেন : তোমার কী দোষ? পরিস্থিতির শিকার মাত্র। আমি সব মাইনে নেব।

জবেদা : তা হয় না।

বাতেন : এখন আমরা সহযোদ্ধা। যুদ্ধ শেষ হোলি আমি তোমারে—।

জবেদা : না বাতেন ভাই। আমি যুদ্ধে জীবন দেব। আমারে সাহস দাও।

বাতেন : (জাবেদা হাত ধনে) আমি সব সময় পাশে থাকব। মরলে এক মরব, বাঁচলেও একসাথে বাঁচব।

।। পটপরিবর্তন।।

দৃশ্য— ২৯॥ রাত ॥ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ॥ আউটডোর

চরিত্র : বাতেন, রফিক, কমান্ডার, দেওয়ান ও জবেদা

[রফিক খুবই বিচলিত। সে হাঁটাহাঁটি করছে।]

বাতেন : কী ব্যাপার তুমি এরাম বিচলিত ক্যান?

রফিক : কী কইরে কথাডা বলি। না থাক।

বাতেন : আ হা বল না। কী সমস্যা?

রফিক : জবেদা কোথায়? গত রাইতে জবেদার চাচা খুন হইছে।

বাতেন : করা করল জানা গেছে?

রফিক : বিষয়ডা কিরাম রহস্যময়। জবেদা কি শুনেছে। (কমান্ডার এসে ঢুকবে ও বলবে)

কমান্ডার : কোনো সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছে।

দেওয়ান : জি। চারিদিকের অবস্থা খুবই খারাপ। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান খুন হইছে।

কমান্ডার : তাহলে আমাদের জন্য এলাকা মোটেই নিরাপদ নয়। আমাদের আসল সময় হচ্ছে এখন। পাকিস্তানি ক্যাম্প আক্রমণ করা।

বাতেন : আর সময় দেওয়া যাবে না।

দেওয়ান : আজ রাইতের মদ্দি পুরো এলাকা দখল নিতি না পারলি আমরা সকলে মারা পড়ব।

কমান্ডার : জবেদাকে ডাক দাও। বিষয়টা বলি। (জবেদা নিজেই চলে আসবে)

জবেদা : আমারে বলতি হবে না আমি সব জানি।

কমান্ডার : তুমি সব জানো!

জবেদা : পাকিস্তানি ক্যাম্প দখল করার জন্নি আমার প্রস্তুত। আমার চাচারে আমিই খুন করিছি।

।।ফ্লাশব্যাক।।

দৃশ্য— ৩০ ॥ রাত ॥ জবেদার বাড়ি ॥ ইনডোর

চরিত্র : জবেদা ও জমির

[জমির ঘরে শুয়ে আছে। এমন সময় জবেদা ঘরে আসবে। ভাইঝি ফিরে আসাতেই জমির খুশিতে উঠে বসবে]

জমির : কী রে মা, তুই এতদিন কনে ছিলি? তোর জন্যি কত চিন্তা। তোর মাও নিরুদ্দেশ। এই গণ্ডগোলের মদ্দি কিডা কারে খুঁইজে বেড়াবে!

জবেদা : আমারে নিয়ে তুমার অত চিন্তা করতি হবে না। তুমি নিজির চিন্তা কর।

জমির : তুই কী কচ্ছি। কিছু বুছতি পারতিছিনে।

জবেদা : সময় হোলি সব বুছবনে। আল্লাহ-রসুলের নাম কর।

জমির : দেখরে মাইয়ের কথা। আমি সব সময় ইবাদতের মন্দি আছি।

জবেদা : তাই নাকি? যে পিতার সমতুল্য চাচা নিজের ভাইয়ের মাইয়ের ইজ্জতের দাম নেয়, যারা তার ভাইয়ের মাইয়ের সম্মান নিয়ে উল্লাস করে, তাদের সাথে হাত মিলাই তার আবার ইবাদত!

জমির : পাকিস্তান দুই ভাগ হচ্ছে। আমি একজন সাচ্চা মুসলমান হয়ে, ঘরে বইসে থাকব!

জবেদা : যারা মাইয়েগের উপর অত্যাচার করে, মানুষ হত্যা করে, তারা আবার মুসলমান হয়। উপরে আল্লা আছে। অত্যাচারীরা কখনও টিকে থাকতি পারে না।

জমির : কী কইরে ঐ মুক্তিরা জেতবে। ঢাল নেই তরোয়ার নেই মিয়া বড় সরদার। যুদ্ধ করতি গিলি অস্ত্র গোলাবারুদ লাগে।

জবেদা : তুমি তালি কিছুই জানো না, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। যুদ্ধে মনোবল না থাকলি জিতা যায় না। যতই গোলাবারুদ থাকুক। মুক্তিগের মনোবলই সবচেয়ে বড়

জমির : (হাসি) হা হা হা। বলিস কী পুচকে মাইয়ে। এতই সোজা!

জবেদা : (রিভালবার বের করে তার চাচার দিকে তাক : করবে) এবার তালি দেখ। একপাও নড়বা না।

জমির : (ভয়ে) জবেদা, আমার ভাইঝি হয়ে তুই আমারে হত্যা করবি? তোর বাপ মরলি, আমি তোরে মানুষ করিছি।

জবেদা : এখানে কে চাচা, কে ভাইঝি, তুমি শত্রু, আমি মিত্র। এটাই বড় পরিচয় (সুযোগ না দিয়ে রিভালবার দিয়ে কয়েকটা গুলি করবে। জমির লুটিয়ে পড়বে)

জমির : আ আ আ। শুধুই একটা আফসোস। পাকিস্তান রক্ষা করতি পারলাম না। আ আ পাকিস্তান জিন্দা-বা-দ আ আ আ (মারা যাবে)।

।। ফ্লাশ ইন।।

দৃশ্য— ৩১॥ রাত ॥ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ॥ আউটডোর

 চরিত্র : বাতেন, রফিক, কমান্ডার, দেওয়ান ও জবেদা 

জবেদা : নিজের ঘর থেকেই শত্রু নিধন শুরু করলাম। (জবেদা অঝোরে কাঁদবে) শুধু বাকি থাকল ওই শয়তানগুলো।

কমান্ডার : এবার শান্ত হও জাবেদা। তোমার এই কাজের জন্য তোমাকে স্যালুট জানাই। সবাই এবার আসল কথা শোনো। পাকিস্তানি ক্যাম্প অপারেশনের দায়িত্ব জাবেদার উপর দেয়া হলো প্রথম কারণ নিজের চাচাকে হত্যা করে সে পুরোপুরি আস্থা অর্জন করেছে দ্বিতীয় হলো সে ক্যাম্পটাকে ভালোমতো চেনে তাছাড়া সে জমির আলীর ভাইঝি।

বাতেন : এই কারণে জবেদা ক্যাম্পের মধ্যে সহজে ঢুকতে পারবে। 

কমান্ডার : তুমি পরিকল্পনাটা বলে দাও।

বাতেন : ক্যাম্প আক্রমণের এক ঘণ্টা আগে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে যাবে। ঠিক এক ঘণ্টার মদ্দি অমণের সুযোগ কইরে ফেলবা। আমরা ক্যাম্প ঘিরে ফেলে কোকিলের ডাক দেব। তুমি কৌশলে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসবা। আমরা চারিদিক থেকে ফায়ার করতি করতি ক্যাম্প দখল করব। সবাইকে বুঝাতে পারিছি!

সবাই : জি বুঝতে পারছি।

জবেদা : কমান্ডার ভাই দুয়া করবেন। অন্যায় থাকিল মাপ কইরে দেবেন।

বাতেন : যে যার মতো প্রস্তুতি নিতে হবে। সন্ধ্যা লাগার সাথে সাথে আমরা এ স্থান ত্যাগ করব।

কমান্ডার : ভোর হওয়ার আগেই পাকিস্তানি ক্যাম্প দখল নেব। জয়বাংলা।

সবাই : জয় বাংলা।

দৃশ্য— ৩২।‌ দিন। পাকিস্তানি ক্যাম্প। আউটডোর 

চরিত্র : গুলজান,পাকিস্তানি-১, পাকিস্তানি-২

[গুলজান পাকিস্তানি ক্যাম্পের সামনে এসে ইট নিক্ষেপ করবে এবং পাগলামিকরবে। ইট নিক্ষেপ করে বলবে]

গুলজান : ধ্বংস হবি, আল্লার গজব পড়বে। দে দে আমার মাইয়েডারে ফিরাই দে। 

পাকসৈন্য-১ : চুপ রহো।

গুলাজান : আমাগের দেশ ছেড়ে পালা, তোগের সময় শেষ।

পাকসৈন্য-২ : বেত্তমিজ। বাকুয়াজ বনধ কর।

গুলজান : দাঁড়া দেখাচ্ছি। খানকা বাচ্চা।

পাকসৈন্য-১: পিছে হাঁটো।

গুলজান : মারিছি মারিছি তোদের মাথায় ইট মারিছি। হা হা (হাসি)। (ইট মারবে)

পাকসৈন্য-১ : আ আ হা। উচকো গলিমারদো, ফায়ার, (রাইফেল তাক করে গুলি করবে)

গুলজান : তোদের ক্ষমা নেই। আ আ। (চিৎকার করে লুটিয়ে পড়বে)

।।পটরিবর্তন।।

দৃশ্য— ৩৩ ॥ রাত ॥ নির্জন স্থান ॥ আউটডোর

চরিত্র : বাতেন ও জবেদা

[মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থেকে ওরা সবাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এর ফাঁকে ওরা আড়ালে কথা বলবে।]

জবেদা : বাতেন ভাই, আমারে বিদায় দাও। দেহ ছাড়াও ভালোবাস যায়। সব ভালোবাসায় মিলন হয় না। না পাক কুত্তারা যে অত্যাচার করিছে। আমি নিজ হাতে ওদের মারতে চাই। (বাতেন মন দিয়ে শুনবে।)

বাতেন : যুদ্ধের ময়দানে সাহস রেখ। আমি তো আছি। যাও বেরিয়ে পড়, হাতে সময় কম। (বাতেন চোখের পাখি সামাল দেবে তবুও ছলছল করবে।)

জবেদা : বাঁইচে যাদি থাকি দেখা হবে। না হলি এটা শেষ বিদায়। (জবেদা চলে যাবে। বাতেন এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকবে)

দৃশ্য— ৩৪ ॥ রাত ॥ বাগান ॥ আউটডোর 

চরিত্র : নেবা, সবুর, ফটিক, দেওয়ান, রফিক, বাতেন, কমান্ডার

[মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের কাছে নেবা ফটিক সবুর ঘোরাফেরা করছে]

রফিক : কিডা ওখানে? হোল্ড!

নেবা : না মানে আমরা…

রফিক : তোমাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।

ফটিক : না মানে আমরা পথ ভুলে আইসি।

দেওয়ান: হতেই পারে। তা এখানে কেন?

সবুর : আপনারা কারা?

দেওয়ান : আমরা যেই হই না ক্যান? দরকার আছে।

রফিক : গুলি চালায় দাও।

সবুর : না মানে কচ্ছি। আমি জমির আলীর লোক। জমির আলী খুন হইছে। তাই পালাই বেড়াচ্ছি।

নেবা : আমি আর ফটিক দুজনে ঐ পাকিস্তানি ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছিলাম।

দেওয়ান : বুঝিছি। (হট্টগোলের মধ্যে কমান্ডার আসবে)।

কমান্ডার : কী ব্যাপার? এরা কারা!

রফিক : নেবা ফটিক পাকিস্তানি দালাল, এ হচ্ছে সবুর শান্তি কমিটির লোক।

কমান্ডার : ওদের উদ্দেশ্য খুবই খারাপ। এক কাজ কর। সবাইকে বেঁধে ফেলে আমাদের সাথে নিয়ে চল। ওরাই হবে দাবার গুটি।

বাতেন : ঠিক আছে। শুধু জামাই আদর করে বেঁধে নিলে চলবে না তার আগে কিছু শাস্তি দেয়া উচিত।

সবাই : একদম সঠিক কথা।

বাতেন : এই শোন। ওরে পা উপর দিগি দিয়ে গাছে ঝুলোই দিয়ে, তার পর দুই চোখী ঝাল ডলে দিয়ে অন্ধ কইরে দিতি হবে।

নেবা : ওরে, তোমরা আমারে ছাইড়ে দাও। আমি তোমাগের লোক।

রফিক : এখন আমাগের লোক! ছাইড়ে দেব। বহু মাইয়ের সর্বনাশ করিচিছ। নেবার চোখে ঝাল ডলে দে।

নেবা : ওরে বাবারে, আমারে পানি দে।

রফিক : ঐ দুটোরে পিটমোড়া দিয়ে বান্দে চুতরা পাতা দে ভালো কইরে।

ফটিক : আমার কোনো দোষ নেই। এই যে, এই যে, আমি কচ্ছি, জয়, জয়, তা, কী যেন জয়, পা-কি

দেওয়ান : (লাঠি দিয়ে আঘাত করে বলবে) জয় পাকিস্তান তাই।

ফটিক : হ্যায়। না না না। কচ্ছি, জয় বাংলা, জয় বাংলা।

দেওয়ান : জোরে ক জয় বাংলা

ফটিক : কচ্ছি কচ্ছি৷

বাতেন : এই দুটোর মাথা নেড়া কইরে দে। (একজন চুল কাটাতে যাবে।)

সবুর : ওরে আমার মানত করা চুল। কাটিস নে কাটিস নে। (বিনয় করে বলবে।)

রফিক : বল কার জন্নি মানত করা। ঐ পাকিস্তান রক্ষার জন্যই। (সবাই হেসে উঠবে)

বাতেন : শোনো আর সময় নেই, এতক্ষণে জবেদা হয়তো পাকিস্তান ক্যাম্পে ঢুকে পড়েছে, এবার সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে।

দৃশ্য— ৩৫ ॥ শেষরাত ॥ পাকিস্তানি ক্যাম্প।। আউটডোর।। 

চরিত্র : পাকঅফিসার, জবেদা, পাকসৈন্য-১, পাকসৈন্য-২

[জবেদা পাকিস্তানি ক্যাম্পে প্রবেশের জন্য চেষ্টা করবে। পাকিস্তানি অফিসার মদ পান করছে।]

পাকঅফিসার : সারাব আর লেড়কিয়া আমার বহুৎ পছন্দ। নওজোয়ান লাড়কিকো পেয়ার করনেকাবহুত মজাহা হা হা (হাসি)।

পাকসৈন্য-১ : স্যার শান্তিকো চেয়ারম্যান ক্যাতেল হোগায়া।

পাকঅফিসার : কিয়া বলতা হ্যায়। ইয়ে সাচ হুয়া!

পাকসৈন্য-১ : বিলকুল সাচ।

পাকঅফিসার : ইয়ে মুক্তি কে কাম হে, পাতা লাগাও মুক্তি কহা চুপাহে। সোলজার গেট রেডি এন্ড পজিশন।

পাকসৈন্য : (সকলে) ইয়েস স্যার।

পাকসৈ-২ : স্যার আচানাক এ লেড়কি ক্যাম্প মে আগাইয়া।

পাকঅফিসার : উ সে আনে দো। এইছি লেড়কি কো খায়েস হে।

পাকসৈন্য-২ : স্যারকি পাছ যাও।

পাকঅফিসার : (জবেদাকে চিনবে) ও হো, তুমকো পেচান লিয়া, শুনাহে তোমহারা চাচা খুন হুয়া। ইসমে হাম বহুত দুখ পৌছা। লেকিন তুম চিন্তা মাত করো। হাম তোমারে দেখভাল করেগি। আও, আজছে এ ক্যাম্পমে রহেগি, আয়েস করেগি।

জবেদা : (আক্রোশে) কুত্তার বাচ্চা আমি থাকতে আসিনি, আমি হিসাব চোকাতে এসেছি। (জাবেদা গুলি করবে রিভারবারের পরপর কয়েকটি শব্দ, পাকঅফিসার লুটিয়ে পড়বে)।

পাকঅফিসার : (আ আ চিৎকার) আচনাক হামলেকি সামাঝ নেহি আয়ই। সোলজার গো এ্যহেট, এন্ড ফায়ার। এ লেড়কিকো খতম করো।

জবেদা : (জবেদাকে গুলি করবে লুটিয়ে পড়বে) আ আ আ।

দৃশ্য— ৩৬ রাত ॥ পাকিস্তানি ক্যাম্প ॥ আউটডোর

চরিত্র : কমান্ডার, দেওয়ান, বাতেন, রফিক

[প্রথমে ক্যাম্পের ভেতর থেকে পিস্তলের গুলির আওয়াজ শোনা যাবে। পরে বন্দুকের গুলির শব্দ। এরপর পিস্তনের গুলির শব্দ। সবাই ভাবনায় পড়ে যাবে।]

কমান্ডার : মনে হয় কোন মিস গাইড হয়েছে! তোমরা যে যার স্থান থেকে গুলি চালাও। ফায়ার। (প্রচণ্ড গোলাগুলি হবে। মাঝে মাঝে আর্তনাদ এইভাবে চলবে।)

বাতেন : মনে হয় জবেদাকে ওরা বিশ্বাস করেনি। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। (সবাই এগোতে থাকবে। পাল্টাপাল্টি গুলি হবে।)

রফিক : এই তো আমরা ক্যাম্পের কাছাকাছি আইসে পড়িছি। (ক্যাম্পের কাছে এসে পড়বে। পাল্টা গুলির শব্দ ধীরে ধীরে থেমে যাবে।)

দেওয়ান : একটু সাবধানে ঢুকতে হবে।

কমান্ডার : ঐ রাজাকার দুটোরে সামনে দিয়ে কভার করতে করতে এগিয়ে যাও। কাঁটা দিয়ে কাটা তুলতে হবে।

দেওয়ান : ঠিক আছে নেবা এবং ফটিকে সামনে দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

নেবা ফটিক : আ আ আ (ওদের গায়ে গুলি লাগে। ওয়া মারা যায়)।

বাতেন : ওদের মাথায় গুলি লেগেছে। ভয় পেলে চলবে না, সবাই সামনে এগিয়ে যাও।

দেওয়ান : কী ব্যাপার কোনো পাল্টা শব্দ পাওয়া যাবে না!

রফিক : মনে হয় সব খতম।

বাতেন : জবেদা তো ক্যাম্প থাইকে বের হোতি পারিনি। তবে কি?

কমান্ডার : যাও। ক্যাম্পের ভেতরে এবার ঢুকে পড়।

বাতেন : আমি গুলি করতে করতে কভারেজ দিচ্ছি।

রফিক : সবাই ক্যাম্পের ভেতর ঢুকে পড়বে।

সবাই : ঠিক আছে।

।।সামান্য পজ।।

[কাক ডাকার শব্দ, ভোরের আভাস। ক্যাম্পে ঢুকে জবেদাকে খুঁজছে। পাকবাহিনী সৈন্য মরে পড়ে আছে। এদের অস্ত্রগুলো ওরা নেবে। মৃদু কাতরানোর শব্দ পেয়ে সবাই কাছে আসবে দেখবে জবেদা। বাতেন দৌড়ে এসে জবেদাকে কোলে তোলা চেষ্টা করবে।]

দেওয়ান : জবেদার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ঐ তো ওখানে পড়ে আছে।

বাতেন : জবেদা, জবেদা জবেদা না, না এ হতে পারে না।

দেওয়ান : এই তো বাঁইচে আছে। গুলি খেয়েছে। নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। (জবেদা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।)

জবেদা : বাতেন ভাই, সময় নেই। এই পিস্তল দিয়ে দুটোকে মাইরে ফেলিছি। আমার আর কোনো দুঃখ নেই। শুধু আফসোস, স্বাধীনতা দেখে যেতে পারলাম না। আ আ আ। (চোখ দুটো হাত দিয়ে বন্ধ করে দেবে। বাতেন কাঁদবে।)

কমান্ডার : ইন্নাইলাহে অইন্নাইলাহে রাজিউন। রফিক ও দেওয়ান, অস্ত্র গোলাবারুদ সব কুড়িয়ে আনছ?

রফিক : সব অস্ত্রপাতি নিয়াইছি। জবেদারে পাওয়া গেছে। (কান্নাজড়িত কণ্ঠে)

দেওয়ান : হ্যাঁ, এই মাত্র মারা গেল। দুটোরে শেষ কইরে মরেছে।

কমান্ডার : ওঠো বাতেন। পতাকাটা দাও। ওর গায়ে দিয়ে দিই। শোনো, এখনও কাজ বাকি আছে। সমস্ত ক্যাম্প তল্লাশি কর। কোথায় কী আছে। সমস্ত ঘরের দরজা খুলে দাও।

দেওয়ান : দিচ্ছি। অনেক মাইয়ে তো বন্দি থাকার কথা। চল রফিক, ঘরগুলো খুইল্যে দেখি।

রফিক : চল দেখি।

কমান্ডার : বাতেন, দুঃখ কর না, গর্ব কর। একটা মেয়ে হয়ে যে অবদান রেখেছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ওর নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। দেশের জন্য এমন আত্মত্যাগ কজন করতে পারে?

বাতেন : (দীঘশ্বাস) না, দুঃখ না, আপন জন হারানোর বেদন তো থাকপে, যতদিন বাইছে থাকপো ভুলতি পারব না।

কমান্ডার : লাশটি সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে। কোথায় করা যায়?

বাতেন : জবেদাগের বাড়ির উঠানে দাফন করা হবে। যেহেতু জবেদার আপন বলতে আর কেউ বেঁচে নেই, চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকবে নিজের বাড়ি।

কমান্ডার : এই সবাই ধর ধর। লাশ নিয়ে যেতে হবে।

বাতেন : আমি কোলে তুলে নিচ্ছি। তোমরা সবাই আমার পাশে পাশে থাকো।

।।গান।।

যুদ্ধ নদী রক্ত জল সেতু হলো স্বাধীনতা

দীপ্ত সাহস ক্ষিপ্র বল ভাঙবে নীরবতা।।

(গানটি বাজবে।)

রচনাকাল : ০৫/০৩/২০০৮ থেকে ২০/০৮/২০১০

আবুল হাসান তুহিন

জন্ম : ২৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। গীতিকার, নাট্যকার ও নাট্যশিল্পী।

যশোরের স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক ‘দেশ হিতৈষী’ মাধ্যমে সাংবাদিক হিসেবে লেখার হাতেখড়ি। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ বেতারে তালিকাভুক্ত গীতিকার। ২০১০ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে অভিনয়শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত। বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চে নিয়মিত অভিনয়ের পাশাপাশি, নাট্যকার হিসেবে সুপরিচিত। ২০১৮ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে ৬৪ জেলার মূল্যবোধের নাটক ‘নতুন করে স্বপ্ন দেখি’ জেলা শিল্পকলা একাডেমি যশোর মঞ্চস্থ করে। ২০২০ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ৬৪ জেলায় তাঁর জীবন ও কর্মের উপর নাটক, ‘সংঘাত’ জেলা শিল্পকলা একাডেমি চুয়াডাঙ্গা জেলায় এবং নাটক ‘আগামীর বঙ্গবন্ধু’ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মেহেরপুর জেলায় মঞ্চস্থ হয়। বাংলাদেশ বেতার, খুলনা, রাজশাহী রংপুর, ঢাকা কেন্দ্র থেকে, গান, নাটক, যাত্রাপালা, জীবন্তিকা, নিয়মিত প্রচার হচ্ছে। সর্বাধিক প্রচারিত নাটক তারাদের আত্মদহন বাংলাদেশ বেতার খুলনা। নাটক ‘কাব্য কথা’ রাজশাহী বেতার, নাটক ‘অন্যরকম উপহার’ রংপুর বেতার, নাট্যরূপ বৈকুণ্ঠের খাতা, বাংলাদেশ বেতার ঢাকা।

বহু আগে প্রকাশিত ছোট গল্পের বই ‘ঝরাপাতা’ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত বই প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনি। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা, ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে।

A person in a suit and tie

Description automatically generated

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

সম্পাদকীয়, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল অনুপ্রাণন ৬ষ্ঠ সংখ্যা

Read Next

আবু আফজাল সালেহ – যুগল কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *