অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুলাই ১৭, ২০২৪
২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মামুন মুস্তাফা -
আবুবকর সিদ্দিকের জীবন ও সাহিত্যের আঙিনায়

আমাদের সাহিত্যে সব্যসাচী লেখক বলতে একজনকেই বুঝি তিনি সৈয়দ শামসুল হক। কিন্তু সম্প্রতি আবুবকর সিদ্দিক সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রথিতযশা কবি কামাল চৌধুরী বলেছেন, ‘কবি আবুবকর সিদ্দিক তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল জীবনে কবিতা, গণসংগীত, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধসহ বগুমুখী সৃষ্টি সম্ভারে বিশিষ্ট সব্যসাচী সাহিত্যিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।’ আর আমি তাঁকে চিহ্নিত করি বাংলাদেশের সাহিত্যের একজন অখণ্ড নায়ক রূপে। এই অর্থে তিনি অখণ্ড নায়ক— কেবল তিনি যে সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর কলমকে প্রসারিত করেছেন তা নয়, তিনি তাঁর যৌবনে চারু মজুমদারের নকশাল আন্দোলনের সমর্থক সহযোগী ছিলেন, ষাটের দশকে আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন সক্রিয় সহযোদ্ধা ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর লেখা গণসংগীতের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে প্রভাবিত করেছিল। এবং এর জন্যে কবিকে রাজাকারদের দোসরদের দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতিতও হতে হয়েছে। স্বাধীনতার পরেও দেশের সামরিক যাঁতাকলে নিষ্পেষিত জনজীবনে তিনি লিখেছেন— কাব্য : হে লোকসভ্যতা, কালো কালো মেহনতি পাখি, উপন্যাস : বারুদপোড়া প্রহরসহ নানা ছোটগল্প ও গদ্য। অতএব আবুবকর সিদ্দিক বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনের অপরাজিত অখণ্ড নায়ক।

আবুবকর সিদ্দিকের সাহিত্যকর্ম বিস্তৃত। তাঁর কবিতা, কথাসাহিত্য, গদ্যসাহিত্য, গণসংগীত, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিবিধজনের সঙ্গে তাঁর সখ্য কিংবা পেশাগত দিক থেকেও অধ্যাপনার তুঙ্গস্পর্শী চূড়া— সেসব ছুঁয়ে দেখা পরিশীলিত বোদ্ধা মানুষ ছাড়া উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাই কি তিনি ছিলেন আলোচনার ঊর্ধ্বে? আমি এখানে মানুষ ও সাহিত্যিক আবুবকর সিদ্দিকের কয়েকটি দিক স্বতন্ত্র আলোয় দেখার চেষ্টা করব।

ক. কাব্যপ্রতিভা

সাতচল্লিশউত্তর দেশভাগের পটভূমিতে বাংলাদেশের আধুনিক কবিতা নির্মাণের পথিকৃৎ কবি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন আবুবকর সিদ্দিক। তাঁর কবিতায় সবার আগে যে বিষয়টি দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়, তা হচ্ছে নিত্যনতুন শব্দ নির্মাণের সক্ষমতা। কবিতায় নতুন শব্দ নির্মাণে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রমী কবি। আবার সমাসবদ্ধ শব্দ ব্যবহারেও ছিলেন অনন্য। যেমন— আত্মবন্ধকী, পাললিক স্তন, শংকরসন্তান, সুভালাভালি, মিতবাক জীব, মনোহারী প্রতিভা, লাশদেহ ইত্যাদি এমন উদাহরণ দেওয়া যেতেই পারে যা শেষ হওয়ার নয়। এর ব্যবহার একটু দেখি—

ক. পেচকেরা কালদর্শী একমাত্র মিতবাক জীব। (পেচক/ ধবল দুধের স্বরগ্রাম)

খ. একজন বুদ্ধিজীবী শুধু মনোহারী প্রতিভা সাজিয়ে নিয়ে/ বসে থাকে। (মানবজাত ভেসে যাচ্ছে/ হে লোকসভ্যতা)

গ. আমায় আমার মতো সুভালাভালি থাকতে দাও। (আমলকী ভয় পায়/ মানুষ তোমার বিক্ষত দিন)

ঘ. পাললিক স্তন হতে দুধ পায় শংকরসন্তান, (ছেদ/ হেমন্তের সোনালতা)

ঙ. লাশদেহ বয়ে নিয়ে নিশিচরা গোভূতের মত! (সত্রাজিৎপুর ট্র্যাজেডী/ কংকালে অলংকার দিয়ো)

আমরা আবুবকর সিদ্দিকের বইসমূহের নামকরণের ভেতরেও দেখি স্বতন্ত্র এক ভিন্ন মাদকতা। ধবল দুধের স্বরগ্রাম, বিনিদ্র কালের ভেলা, মানুষ তোমার বিক্ষত দিন, কালো কালো মেহনতী পাখি, কংকালে অলংকার দিয়ো, মানবহাড়ের হিম ও বিদ্যুৎ ইত্যাদি। এবং লক্ষণীয় যে, আবুবকর সিদ্দিকের কাব্যসমূহ বিষয়বৈচিত্র্যে ভরপুর। একটির সঙ্গে অন্যটির মতাদর্শগত কিংবা ভাবাদর্শগত কোনো মিল পাঠক খুঁজে পাবেন না।

প্রথম কাব্য ধবল দুধের স্বরগ্রাম (১৯৬৯) ছিল মাতৃভূমি মা ও মাটির প্রতি ঋণ স্বীকারের সঙ্গে আবেগ ও মননশীলতার চমৎকার বহির্প্রকাশ। প্রথম কাব্যের এই উত্তরাধিকারের ঐতিহ্য কবির দ্বিতীয় কাব্য ‘বিনিদ্র কালের ভেলা’ (১৯৭৬) পেরিয়ে তৃতীয় কবিতাগ্রন্থ ‘হে লোকসভ্যতা’ (১৯৮৪) পর্যন্ত চলে। উপরন্তু ‘হে লোকসভ্যতা’ ছিল স্বাধীনতার মোহভঙ্গ, ক্ষোভ-যন্ত্রণার বিদ্রূপাত্মক শ্লেষের প্রতীকী ব্যঞ্জনা। যেখানে বাংলার আবহমান লোকঐতিহ্য, স্যাটায়ার, দেশ ও রাজনীতি পূর্ণমাত্রায় সমাসীন। এরপরই আমরা কবিকে দেখি পূর্ণমাত্রায় রোমান্টিক।

‘মানুষ তোমার বিক্ষত দিন’ (১৯৮৬), ‘হেমন্তের সোনালতা’ (১৯৮৮), ‘নিজস্ব এই মাতৃভাষায়’ (১৯৯১), ‘কংকালে অলংকার দিয়ো’ (১৯৯৬), ‘মানবহাড়ের হিম ও বিদ্যুৎ’ (২০০১), ‘মনীষাকে ডেকে ডেকে’ (২০০২), ‘আমার যত রক্তফোঁটা’ (২০০২), এইসব ভ্রূণশস্য (২০০৭), ‘নদীহারা মানুষের কথা’ (২০০৮), ‘রাভী’ (২০০৮) এবং হাওরের হাহাকার (২০১০); এসব কবিতাগ্রন্থগুলোতে আজন্ম রোমান্টিকতার ঈষদাভাস ছলকে ওঠে। এর কবিতাগুলোতে আয়ুষ্কাল, নিরবধি ও অবিভাজ্য কালবোধ, অস্তিত্বের অনস্বীকার্যতা-অসহায়তা, অবিদীর্ণ ব্রহ্মাণ্ড নিখিল বিস্ময়, স্মৃতিকাতরতা— এইসব মননজটিল রহস্যপ্রাণতার দার্শনিকতায় আচ্ছন্ন হন একজন অন্তর্মনস্ক কবি। তবে এসব কাব্যগুলোতে কবির ফেলে আসা অতীতের পুঞ্জিভূত অভিমানের কালোমেঘ তীব্র হয়ে বৃষ্টি ঝরায় ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সময়খণ্ডের ভেতরে। সুতরাং আমরা বলতেই পারি কবির রোমান্টিকতা কখনোই একঘেয়ে প্রেমার্তি সর্বস্ব ছিল না।

এসব কাব্যসমূহের বাইরে আলাদাভাবে তিনটি কবিতাগ্রন্থের উল্লেখ করা প্রয়োজন। কাব্য তিনটি হচ্ছে— ‘কালো কালো মেহনতী পাখি’ (১৯৯৫), শ্যামল যাযাবর (১৯৯৮) এবং কবিতা কোব্রামালা (২০০৫)। তিনটি কাব্যের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামরিক যাঁতাকলে নিষ্পেষিত জনজীবনের হাহাকার বাম আদর্শে উজ্জীবিত কবির চেতনাকে দংশন করে। সেই ঘৃণার বিষ ও বিক্ষোভের দাহ ছড়িয়ে পড়েছে ‘কালো কালো মেহনতী পাখি’র কবিতাগুলোতে। জন্মরোমান্টিক অথচ বোহেমিয়ান স্বভাবের কবি আবুবকর সিদ্দিকের মতো তাঁর কবিতাও ভ্রাম্যমাণ। মানুষের মুখের বলিদীর্ণ আদরা, প্রাচীন বৃক্ষের জটিল শেকড়বাকড়-পুরারহস্য-প্রত্নবাকল, অজরায়ু দিঘির শ্যাওলাঢাকা রানা, অজানা গ্রামের অচেনা জনগোষ্ঠীর অন্তরাল ঘরকন্না, অর্ধভগ্ন দালানের মুমূর্ষু শ্বাসক্রিয়ার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তাঁর ‘শ্যামল যাযাবর’ কাব্যটি। অন্যদিকে ‘কবিতা কোব্রামালা’ কাব্যের একটাই বিষয়, তা হলো কবিতাই পরিশুদ্ধ কবিতা এবং একমাত্র শিল্প। কবি ও কবিতা প্রসঙ্গ, কবির কবিতাবাসের কবিতা এবং সাম্প্রতিক কবিতার চল সম্পর্কিত কথন— এই তিন ধারায় বিন্যস্ত এর কবিতাগুলো।

এছাড়া তাঁর ‘বৃষ্টির কথা বলি বীজের কথা বলি’ (২০০৬) অনেক পরে প্রকাশিত হলেও এর কবিতাগুলো কবির প্রথম যৌবনে লেখা। আর তাই এর কবিতাগুলো ষাটের স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদির ঝাঁঝাঁ সময়কে ধারণ করেছে। অন্যটি কবির সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্য ‘এইসব অন্যমানবিক কবিতা’ (২০১২)। এর কবিতাগুলো কোনো একক বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বরং কবির দেখা বিভিন্ন সময়ের অসংগতিগুলো স্বকাল সংকট হয়েই ধরা দিয়েছে কবির কলমে।

কবিতাগ্রন্থের বাইরে আবুবকর সিদ্দিকের একটিই মাত্র ছড়াগ্রন্থ প্রকাশ পায় ‘হট্টমালা’ (২০০১)। এছাড়া চিত্রা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (২০০২) এবং নান্দনিক থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশ পায় আবুবকর সিদ্দিকের কবিতাসমগ্র (২০১১)।

শুদ্ধতম কবি, জাত কবি, জন্মরোমান্টিক কবি, জীবনবোধের কবি— যেভাবেই ব্যাখ্যা করি না কেন বাংলাদেশের কবিতায় আবুবকর সিদ্দিক এক স্বাতন্ত্রিক কণ্ঠস্বর। ফলে তাঁর এই স্বাতন্ত্রিকতা তাঁর কাব্যবৈশিষ্ট্যে এনেছে বহুমাত্রিকতা। সামাজিক দায়বদ্ধতা, আধুনিকতা, পরিশীলিত কাব্যচিন্তা, ঘূর্ণায়মান জীবনের দৈশিক ও বৈশ্বিক টানাপোড়েন, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার; এসব কিছুই কবির কাব্যবৈশিষ্ট্যের অন্যতম চরিত্র। যদিও স্বতন্ত্রভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে কবির নিজস্ব প্রতীক ব্যবহার ও শব্দ নির্মাণের সূক্ষ্মতা। আবুবকর সিদ্দিকের কাব্যবৈশিষ্ট্যের বহুমাত্রিকতার পেছনে কাজ করেছে তাঁর অবিভক্ত ও অবিভাজ্য বাংলা কবিতার ধারাকে বহন করা এবং একই সঙ্গে দেশজ ভাষাগত আবেগ ও ব্যক্তিগত আলোছায়া আবুবকর সিদ্দিকের কবিতার চেতনালোককে পরিপুষ্ট করে তুলেছে।

খ. অদ্বিতীয় কথাকার

বাংলাদেশের কথাসহিত্যে ভাষা, চরিত্র এবং এর বিষয়-প্রকরণ নিয়ে যে অল্প কয়েকজন কথাসাহিত্যিক নিরীক্ষা চালিয়েছেন, তাঁদেরই একজন অন্যতম এবং অদ্বিতীয় কথাকার আবুবকর সিদ্দিক। বিরলপ্রজ অথচ সময়ের সহচর সাম্প্রতিক ও একই সঙ্গে চিরকালীন আবেদনের চিহ্ন স্বাক্ষরিত ঋদ্ধ কথাসাহিত্যের অনন্য রূপকার আবুবকর সিদ্দিক তাঁর নিরীক্ষার শেকড় প্রোথিত করেছেন প্রধানত দলিত ব্রাত্যজনকে নিয়ে। সেই সাবল্টার্ন সমাজের এক নতুন প্রকাশ দেখতে পাই আবুবকর সিদ্দিকের গল্প ও উপন্যাসের ভেতরে। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো হচ্ছে— ‘ভূমিহীন দেশ’ (১৯৮৫), ‘চরবিনাশকাল’ (১৯৮৭), ‘মরে বাঁচার স্বাধীনতা’ (১৯৮৭) ‘কুয়ো থেকে বেরিয়ে’ (১৯৯৪), ‘ছায়াপ্রধান অঘ্রাণ’ (২০০০), ‘কান্নাদাসী’ (২০০৬), ‘বামাবর্ত’, (২০০৭), শ্রেষ্ঠ গল্প (কলকাতা, ২০০৭) ‘কালোকুম্ভীর’ (২০০৮), ‘মুক্তিলাল অভ্যুদয়’ (২০০৮), ‘হংসভাসীর তীরে’ (২০০৮), গল্পসমগ্র (কলকাতা, ২০০৮), ‘মধুবন্তী’ (২০০৯), শ্রেষ্ঠ গল্প (বাংলাদেশ, ২০১০), ‘বরীনভূমি-বাদাবন’ (২০১৭) এবং ‘দেশ ও দশের গল্প’ (২০১৯)।

আবুবকর সিদ্দিকের গল্পের মানুষগুলো সবসময়েই অর্থনীতি ও রাজনীতির পাকচক্রের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। ফলে এদেরকে আপাতদৃষ্টিতে গৎবাঁধা একঘেয়ে মনে হলেও, অবচেতন সত্তায় এরা সকলেই ডাইন্যামিক। আবুবকর সিদ্দিকের গল্পের প্রধান উপজীব্য মানুষ, হোক সে ব্রাত্যজন। তিনি সেই মানুষকে পর্যবেক্ষণ করেন বিভিন্ন দিকে আলো ফেলেছেন। সুতরাং ব্যক্তির অন্তর্লোক, মনোবিকলন ধরা পড়ে এই সকল গল্পের পটভূমিতে। অন্তত একটি উদাহরণ পাঠকের সুবিধার্থে দেওয়া যাক—

“ওবেদুরকে ভোরে খালের মুখ থেকে তুলে নেয়া হবে। সব ঠিকঠাক করে দুজনে বনে নামল। কেয়াকটকীর পাতার করাতে ঘাড়ের চামড়া ছড়ে যায়। ছোরার মতো লম্বা শুলো ফণা তুলে পায়ের গামবুটে খোঁচা মারে। পাকানো লতার ফাঁসে গলা বেধে গেলে হটে আসতে হয়। ইনফর্মারের লম্বা পাঞ্জাবি দেখা যায়। লুঙ্গি তুলে খালি পায়ে কুঁজো হয়ে ছুটে চলেছে। রাইফেল দিয়ে ডালপালা সরায় আর খেঁকিয়ে ওঠে, হুঁশিয়ার সার!

ডাঁশা অন্ধকারে হাজার ঝিঁঝিপোকা মিলে একটা কালো সুতোর গুলি পেঁচিয়ে চলেছে। পানিতে শব্দ ওঠে ছড়্ ছড়্। একদলা কাদা ছিটকে উঠে নাকের ডগায় আটকে যায়। ওবেদুরের বাঁ হাত স্যালুটের কায়দায় কপালের কানায় উঠে আবার নেবে যায়। বুনোমশার ভন ভন ঢেউ ফেটে যায়। খট্টাশ কাঁহাকা!

লোকটাকে আর দেখা যায় না। হাঁটার শব্দ আর হুঁশিয়ারি শুনে শুনে এগুতে হয় ওবেদুরকে।

মেয়েমানুষের অভ্যেস তার। চাকরিতে ঢুকে অব্দি ভীষণ বেড়ে গেছে। মোংলা পোর্টে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে সাতমাস পুরো। এবং নোনা মেয়েমানুষের কাছে এই প্রথম।”

(নোনা মাংসের গন্ধে/ ছায়াপ্রধান অঘ্রাণ)

অন্যদিকে মাত্র ৪টি উপন্যাসের ভেতর দিয়ে আবুবকর সিদ্দিক বাংলাদেশ নামক ভূ-মণ্ডলের পরিবেশ ও প্রতিবেশ, মনুষ্য নির্মিত সমাজ ও রাজনীতির আদি-অন্ত তুলে এনেছেন। ‘জলরাক্ষস’ (১৯৮৫), ‘খরাদাহ’ (১৯৮৭), ‘বারুদপোড়া প্রহর’ (১৯৯৬) ও ‘একাত্তরের হৃদয়ভস্ম’ (১৯৯৭) এর জ্বলন্ত উদাহরণ। আবুবকর সিদ্দিকের উপন্যাস চতুষ্টয়ের যে নন্দনরীতি, তা বাংলাদেশের প্রতিবাদী সাহিত্যধারায় নতুন ও অভিনব। বিশেষত তিনি এর মাধ্যমে প্রতীকী তাৎপর্যের নিরিখে একটি নতুন ও স্বতন্ত্র পথ নির্মাণ করেছেন আমাদের কথাসাহিত্যে। তাঁর জলরাক্ষসখরাদাহ নিয়ে আবুবকর সিদ্দিককে লেখা পশ্চিমবঙ্গের দুই কীর্তিমান সাহিত্যিকের চিঠির উদ্ধৃতি তুলে ধরছি।

ক. আবুবকর সিদ্দিকের জলরাক্ষস উপন্যাস সম্পর্কে প্রথিতযশা সাহিত্যিক শওকত ওসমান লিখেছেন, “আবুবকর সিদ্দিক যে অমিত তেজ এবং সাহসের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন-ধারার আলেখ্য তুলে ধরেছেন, তা মনে রাখার মত ঘটনা।” আর কলকাতা থেকে সাহিত্যিক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাস প্রসঙ্গে শওকত ওসমানের উক্ত কথার প্রসঙ্গ টেনে আবুবকর সিদ্দিককে লেখেন, “তার সঙ্গে আমি আর একটি কথা যোগ করতে চাই। তেজ ও সাহসের সঙ্গে আছে অন্তহীন প্রেম। উপদ্রুত, অবহেলিত, ধূসর মানুষগুলি আপনার ভালোবাসার আতপ্ত স্পর্শে পঙ্ক-শয্যা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে নতুন অস্তিত্বের সন্ধানে। সার্থক হোক, ফলবান হোক, অনাগত জীবনের সর্বতোভদ্র বার্তা বহন করে আনুক আপনার লেখা।”

খ. শক্তিমান কথাকার সরোজ বন্দোপাধ্যায় চিঠিতে আবুবকর সিদ্দিককে তাঁর খরাদাহ উপন্যাস পড়ে জানান, “টোপোগ্রাফির উপর আপনার দখল অনন্যসাধারণ। তবে তার থেকেও আপনার বড়ো ব্যাপার মানবিক বাস্তবতা সম্বন্ধে অভ্রান্ত জ্ঞান। সোনার দ’ত কলম হোক— এ শুভেচ্ছা আপনাকে জানাবো না। শুধু বলবো— আপনার লোহার দ’ত কলম অটুট থাকুক।”

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে বিষয় নির্বাচনে, বিচরণে এমনকি ভূগোলে— সব মিলিয়ে একটা বিশাল ক্যানভাসে কাজ করেছেন তিনি। একদিকে দক্ষিণবঙ্গের জলজ ভূমি অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের রুঠাফাটা গনগনে নর-নারী— এই দুই বিপ্রতীপ পরিবেশের ব্রাত্যজনের অমলিন কথাকার আবুবকর সিদ্দিক। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, আবুবকর সিদ্দিকের গল্প-উপন্যাস তাৎক্ষণিক পঠনসুখ জুগিয়ে হারিয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার জন্যে আসেনি। বাংলা কথাসাহিত্যের ক্লাসিক তালিকাভুক্ত হয়ে থাকবে তাঁর বেশকিছু গল্প ও উপন্যাস।

গ. স্বতন্ত্র গদ্যশৈলী

কবিতা ও কথাসহিত্যের মতোই প্রবন্ধগুলোতেও নিজস্ব অঙ্গীকারের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন আবুবকর সিদ্দিক। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন বাম-রাজনীতি ঘরানার লোক। মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে গেছেন জীবনভর। তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মই প্রগতিশীল। এ পর্যায়ে তাঁর প্রবন্ধসাহিত্যের শরীরেও লেগে আছে এই সমস্ত কিছুর বিশ্বস্ত ছাপ। সুতরাং তাঁর প্রবন্ধসাহিত্যের ভেতরেও খুঁজে পওয়া যায় সাহিত্যবিষয়ক বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা, স্বদেশভাবনা এবং আর্থসামাজিক ও রাজনীতির ফাঁসকলে নিষ্পেষিত জনজীবনের ক্ষোভ ও দ্রোহ। আর এসবকে সঙ্গী করে কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিক লিখে গেছেন জীবনী, স্মৃতিকথা, সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গদ্য। ‘কালের কলস্বর’ (২০০১), ‘সাহিত্যের সংগপ্রসংগ’ (২০০১), ‘রমেশচন্দ্র সেন’ (১৯৯২), ‘সাতদিনের সুলতান’ (২০০২), ‘প্রীতিময় স্মৃতিময়’ (২০১০), ‘স্মরণের মুখশ্রী’ (২০১১) তেমনই কিছু গ্রন্থ।

“আমাদের এ কলেজের ইতিহাস যেমন পুরোনো তেমনি দামী। স্বয়ং পি. সি. রায়ের হাতে গড়া কলেজ। তিনি সফরে এসে আই এস সি বিল্ডিংয়ের দোতলায় দক্ষিণপুব কোণের যে কামরাটায় থাকতেন, সেটা এখনো টিকে আছে। আর আছে কলেজের গেটে ঢুকতে পি. সি. রায়ের শ্বেত পাথরে গড়া মূর্তিটা। অনেক নামীদামী পণ্ডিত এখানে অধ্যক্ষ ও অধ্যাপনা করে গেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেয় ও শ্রদ্ধেয় ছিলেন ঋষি কামাখ্যা চরণ নাগ। তিনি সেই ঊনিশশ’ আঠারো (১৯১৮) খ্রী.-এ কলেজের প্রতিষ্ঠাবর্ষ থেকে অধ্যক্ষ পদে বহাল হন। আব্বা পড়েছেন তাঁর কাছে। আমাদের কালের সব থেকে খ্যাতিমান অধ্যক্ষ ছিলেন মণিকান্ত গাঙ্গুলী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। টকটকে সোনার মত গায়ের বরণ। মাথায় কাঁচাপাকা কদমছাঁট চুল। পায়ে পাম্পশু। গায়ে গিলে করা শাদা আদ্দির পাঞ্জাবি। পরণে শাদা ধুতি। চোখে রোলগোল্ড চশমা। নাকের নিচে শাদাটে পুরুষ্টু গোঁফ। ডান হাতের তর্জনীর ডগা সিগ্রেটের দাগে টকটকে বাদামী। তাঁর সরাসরি চাহনির সামনে দাঁড়ানো যেতো না বেশিক্ষণ। স্মিত হাসিটা ছিলো যেন চাপা আগুন। গলার স্বর তরঙ্গে তরঙ্গে বাজতো। তাঁর ‘ওথেলো’, ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ পড়ানোর কণ্ঠস্বর এখনো কানে বাজে। লাইব্রেরীর পাটাতনের উপর উঠে বসে ঘন্টার পর ঘণ্টা বইয়ের স্তূপে ডুবে থাকতেন। তার শখ ছিলো ফুলবাগানের। কলেজের সামনে অপূর্ব সুন্দর দেখতে পামগাছগুলো তাঁরই হাতে লাগানো। তিনি এ কলেজ থেকে চলে গেছেন ১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দে। মারা গেছেন গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের হেড থাকা অবস্থায়। তাঁকে আমরা ভুলে যেতে বসেছি। সময় আমাদের ভুলিয়ে দিচ্ছে নিত্য নতুন মুখ মনে ধরিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু একজন তাঁকে ভোলেনি আজও। একটা আনি (আজকাল দশপয়সা) দিলে চ’তে তার চব্বিশ ইঞ্চি বুকের দু’পাশে দু’হাত সম্পূর্ণ ছড়িয়ে দিয়ে ঠিক পাঁচমনি ভুঁড়ির ভারটা ধারণ করার মতো চালে দুলে দুলে কুঁতে কুঁতে ভক্তিগদগদভাবে মণিকান্ত গাঙ্গুলীর হাঁটা নকল করে দেখায়।”

(চ’তে পাগলা : স্মরণের মুখশ্রী)

বহুমুখী বিষয়, মৌলিক দৃষ্টিকোণ ও স্বকীয় ভাষারীতি আবুবকর সিদ্দিকের গদ্যকে প্রথানুগ পঙক্তি থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। সৃজনশীল গদ্যশৈলী এর বিশেষ সম্পদ।

ঘ. গণসংগীতের বিপ্লবী কবি

আবুবকর সিদ্দিককে বলা চলে মনননিষ্ঠ দেশপ্রেমিক। স্বদেশের প্রতিটি সংকট মুহূর্তে গর্জে ওঠে তাঁর কলম। সেই লেখা থেকে ঝরে পড়েছে জখমচিহ্ন, ঘটেছে রক্তপাত। তেমনি ষাটের দশকে বাঙালির আত্মপরিচয় নির্ণয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটা ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আবুবকর সিদ্দিক তখন গণসংগীত রচনায় আত্মনিয়োগ করলেন। এখানেও তিনি সমভাবে ব্যতিক্রমী ও স্বাতন্ত্রিকতায় উজ্জ্বল।

আমরা দেখেছি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে তাঁর রচিত গণসংগীত রণক্ষেত্রে কীভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে পরিবেশিত হতো তাঁর লেখা গান। ‘ব্যারিকেড বেয়নেট বেড়াজাল/ পাকে পাকে তড়পায় সমকাল’ গানটির জন্য ১৯৭১-এ রাজাকারদের দ্বারা নির্যাতিত হতে হয়েছিল কবিকে। এছাড়াও ‘বিপ্লবের রক্তরাঙা ঝাণ্ডা ওড়ে আকাশে/ সর্বহারা জনতার জিন্দাবাদ বাতাসে’, ‘পায়রার পাখনা বারুদের বহ্নিতে জ্বলছে/ শান্তির পতাকা অজগরনিঃশ্বাসে টলছে’, ‘পৎ পৎ উৎসাহে পতাকাটা উড়ছে/ উদ্দাম সিম্ফনী ঝঞ্ঝায়’— এরকম অসংখ্য তাঁর লেখা গণসংগীত বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতাযুদ্ধে গীত হতো।

মূলত ’৬০-এর দশকে কবি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন খুলনা শহরে ষাটের দশকে সৃষ্টি হয়েছিল ‘সন্দীপন’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। কার্যত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভেতর দিয়েই সে-সময়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষের পক্ষে কথা বলত ‘সন্দীপন’। খুলনার গার্লস কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক খালিদ রশিদের নেতৃত্বে এর সাথে তখন যুক্ত ছিলেন সাধন সরকার, হাসান আজিজুল হক, নাদিম মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ। এর আগে কলকাতার আন্ডারগ্রাউন্ড বামরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কবি, এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রত্যক্ষতা কবির চেতনাকে তাড়িত করে, শাণিত করে; লিখতে শুরু করেন গণসংগীত। একসময় চরমপন্থী নকশাল রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। বলা যায় এ-সময় থেকে আবুবকর সিদ্দিকের লেখায় গণমানুষ প্রধান হয়ে ওঠে, ব্রাত্যজন ঠাঁই নেয় তাঁর সাহিত্যে।

আমাদের সৌভাগ্য যে, ‘রুদ্রপদাবলী : গণমানুষের গান’ (২০০৮) নামে প্রকাশিত হয়েছে আবুবকর সিদ্দিকের গণসংগীতের সংকলন। তাঁর গণসংগীতের প্রকাশভঙ্গি, ভাষার বলিষ্ঠ শব্দচয়ন এবং সুরের উদ্দীপ্ত প্রেরণাই তাঁকে রুদ্র স্বর ও সুরের অঙ্গীকারাবদ্ধ কলমসৈনিকের পরিচিতি এনে দিয়েছে।

ঙ. বিষ্ণু দে-র সঙ্গে পত্রমৈত্রী

স্বভাবে বোহেমিয়ান ছিলেন কবি আবুবকর সিদ্দিক। তার স্বাক্ষর মেলে তাঁর বেশকিছু কবিতা ও গল্পে। এই পরিব্রাজক কবির সঙ্গে তাই দেশ-বিদেশের অনেকের সখ্য গড়ে উঠেছিল। কি শহরে, কি মহানগরে, এমনকি অজপাড়াগাঁয়েও। কিন্তু তিরিশের কাব্যধারায় পঞ্চপাণ্ডব খ্যাত কবি বিষ্ণু দে-র সঙ্গে পত্রমিতালি গড়ে ওঠে বাংলাদেশের যশস্বী কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিকের। সে-সব চিঠি আজ ইতিহাস। ওই ইতিহাসের কালসাক্ষী হয়ে দুই বাংলার দুই সময়ের অসমবয়সী দুই কবি পরস্পরের কাছাকাছি এসেছিলেন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও প্রীতির বন্ধনে।

১৯৬৩ সালে কবি আবুবকর সিদ্দিকের প্রথম পশ্চিমবঙ্গ সফরে যান। ততদিনে সিকান্‌দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ সাহিত্যকাগজের দৌলতে ওপারের সুধীজনদের কাছে ‘আবুবকর সিদ্দিক’ নামটি পরিচিত। সেই ক্ষীণ পরিচিতিটুকু নিয়ে ১৯৬৩-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বিষ্ণু দে-র সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ। আবুবকর সিদ্দিকের বর্ণনায় বলা যাক : “বিষ্ণু দে সন্দর্শন আমার কাছে মনে হয়েছিল রাজদর্শন। হাইব্যাক চেয়ারে উপবিষ্ট দীর্ঘদেহী ঈষৎ কুঁজো, টানা চোখ তীক্ষ্ন নাক স্মিত হাসি সিল্কের পাঞ্জাবি— রাজকীয় ব্যক্তিত্ব।”

ওই ’৬৩ সালের প্রথম পশ্চিমবঙ্গ সফরেই তিনি কাছাকাছি এসেছিলেন বিষ্ণু দে-র। দুই/ তিনদিন করে গিয়েছিলেন বিষ্ণু দে-র বাসায়। কবিতা, বইপত্র, পত্রিকা বিনিময় হয়েছিল দুই কবির। এরপর ১৯৮৪ সালে দ্বিতীয়বার আবুবকর সিদ্দিক যখন পশ্চিমবঙ্গে বিষ্ণু দে-র বাড়িতে যান, তখন আর কবি বেঁচে নেই। ঠিক তার দু’বছর আগেই গত হয়েছেন বাংলা কবিতার এই মহীরুহ বিষ্ণু দে। কিন্তু ততদিনে আবুবকর সিদ্দিক ও বিষ্ণু দে-র মধ্যে গড়ে উঠেছিল প্রীতির বন্ধন, বিনিময় হয়েছে অসংখ্য চিঠির। তাই তো ১৯৮২ সালে কবির মৃত্যুর পরেও যার সাক্ষ্য মেলে কবিপত্নী প্রণতি দে-কে লেখা আবুবকর সিদ্দিকের চিঠির ভেতরে। কবি আবুবকর সিদ্দিকের ভাষাতেই বলা যাক— “বুঝতে পারি, গণ-আন্দোলনের রক্তসড়ক ধরে ক্রমজায়মান একটি স্বাধীন দেশের সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে শামসুর রাহমান বা আমি তাঁর কাছে প্রতীকী-চরিত্রে পরিণত হয়ে উঠেছিলাম।”

আবুবকর সিদ্দিক সম্পর্কে কবি বিষ্ণু দে বলেছিলেন, “আবুবকর সিদ্দিক লড়াকু কবি বটে”। তাঁর এই যে মূল্যায়ন, তারও পেছনের কারণ ’৪৭-উত্তর দেশভাগের পটভূমিতে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কবিতাচর্চা, গণ-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবির উদ্দীপনার অন্ত ছিল না। ষাটের দশকে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষায় আবুবকর সিদ্দিকের গণসঙ্গীত রচনা এবং সন্দীপন গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার প্রভাব আবুবকর সিদ্দিকের সাহিত্যে কীভাবে এসেছে, সন্দীপন পত্রিকা— এগুলো বিষ্ণু দে-কে আবুবকর সিদ্দিকের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। আর ওখানেই বিষ্ণু দে পেয়ে যান আবুবকর সিদ্দিকের মতো রুদ্র-বলয়ের বিপ্লবী কবিকে। আবুবকর সিদ্দিকের প্রবল রাজনীতি সচেতনতাই তিরিশের তথা বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি বিষ্ণু দে-কে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেছে খুব সহজেই। আর তাই বাংলাদেশের পঞ্চাশের অন্যতম প্রধান কবি আবুবকর সিদ্দিককে তিরিশের প্রধান কবিপুরুষ বিষ্ণু দে উৎসর্গ করেন তাঁর সংবাদ মূলত কাব্য (১৯৬৯) কবিতাগ্রন্থটি। সঙ্গে আমাদের কবিতার বরপুত্র শামসুর রাহমান। বিষ্ণু দে যার উৎসর্গে লেখেন : ‘শামসুর রাহমান, আবুবকর সিদ্দিক— পূর্ববঙ্গের সহকর্মীদের উপহার’। আমাদের কাব্যযাত্রার এ এক অনন্য অধ্যায় বললে অত্যুক্তি হবে না।

আবুবকর সিদ্দিকের সঙ্গে বিষ্ণু দে-র চিঠির ভেতরে কেবল নিজেদের কবিতাভাবনাই বিনিময় হয়েছে তা নয়, সে-সময়ের উভয় বাংলার সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক আন্দোলন, স্থানিক পরিবেশ, প্রতিবেশের চিত্রাবলিও উঠে এসেছে। তখন শুধু পূর্ব পাকিস্তানের জনমানুষের মৌলিক অধিকার বা স্বাধিকার আন্দোলন নয়, ওপারেও সদ্যসমাপ্ত চীন-ভারত যুদ্ধের ফলাফল ওই জনজীবনেও প্রভাব রেখেছিল। এই দুই কবির চিঠিতে তাও বাদ যায়নি।

কিন্তু ১৯৭৮ সাল থেকে কবি বিষ্ণু দে-র ভগ্নস্বাস্থ্য দেখা দেয়। লো প্রেসার, হৃদযন্ত্রের বাড়াবাড়ি, সেরিব্রাল এক্সিমা, হারনিয়া প্রভৃতি অসুখে প্রতিনিয়ত কবি অসুস্থতার দিকে হাঁটতে থাকেন। আর ওই মুহূর্তে কবিপত্নী প্রণতি দে বিষ্ণু দে-র হয়ে কবি আবুবকর সিদ্দিককে চিঠি লিখতে থাকেন। সেই থেকে ১৯৮২ সালে বিষ্ণু দে-র মৃত্যু অবধি প্রণতি দে আর আবুবকর সিদ্দিকের মধ্যে পত্রালাপ পরোক্ষে বিষ্ণু দে-র সঙ্গেই যোগাযোগ বটে। শেষ দিকে এসে বিষ্ণু দে ‘প্রিয়বরেষু’ থেকে আবুবকর সিদ্দিককে চিঠিতে লিখলেন, তাহ’লে স্নেহাস্পদেষু। ততদিনে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আর কবির প্রয়াণের পরে প্রণতি দে লিখছেন : “আপনার অপূর্ব চিঠিখানি পেয়ে কতো যে আনন্দিত হয়েছি, বলতে পারি না। তবে আমাকে ‘প্রাজ্ঞ’ বলাটা ঠিক হয়নি। আমি তো শুধু পুরোনো স্মৃতি প্রাণপণে ধরে রাখতে চাইছি— এগুলো আছে বলেই আমি তবুও প্রতিদিনের কাজ চালিয়ে যেতে পারছি।…”

এ কথা মানতে হবে যে, বিষ্ণু দে-র রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং তাঁর সাহিত্যে রাজনীতির যে ক্ষেত্রভূমি তৈরি হয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশের অন্যতম পুরোধা কবি আবুবকর সিদ্দিকের কোথায় যেন একটা সাদৃশ্য বিষ্ণু দে খুঁজে পেয়েছিলেন, যার সূত্র ধরে এঁদের মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আবুবকর সিদ্দিক ও বিষ্ণু দে-র এই যে পত্রমৈত্রী, ভবিষ্যতে তাদের অনেক অজানা তথ্য সামনে আনবে, সেই বিশ্বাস রাখি।

মাসিক সাহিত্যপত্রিকা ‘কালি ও কলম’ ‘বিষ্ণু দে-র জন্মশতবার্ষিকী’তে প্রকাশ করেছিল আবুবকর সিদ্দিকের লেখা বিষ্ণু দে ও প্রণতি দে-র চিঠি : কবির সঙ্গে পত্রমৈত্রী শীর্ষক একটি গদ্য। আমার বিশ্বাস আমাদের উত্তর প্রজন্ম বাংলা ভাষার এই দুই কবির পত্রাবলির মাধ্যমে সাহিত্যের নানাপথ ও তার চড়াই-উৎরাই সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন।

চ. ওজস্বী শিক্ষক

আবুবকর সিদ্দিকের ছাত্র, সমকালীন চিন্তক ও প্রাবন্ধিক, বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শহীদ ইকবাল এক সাক্ষাৎকারে আবুবকর সিদ্দিক সম্বন্ধে বলেছেন, ‘সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে তাঁর নখাগ্র স্পর্শ; কল্পনা ছাড়া আমার জন্য আর কিছু নয়’। তাঁর এই উক্তির ভেতরেই আবুবকর সিদ্দিকের শিক্ষক হিসেবে পারঙ্গমতার কিছুটা আমরা আঁচ করতে পারি।

আবুবকর সিদ্দিককে দেখেছি শৈশবকাল থেকেই, আমার পিতার সহকর্মী ও বন্ধু হিসেবে। বলা আবশ্যক, আবুবকর সিদ্দিক যখন বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক তখন আমার পিতা মুহম্মদ গোলাম রসূল ওই কলেজেরই ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনারত। তাঁরও আগে গত শতকের পাঁচের দশকে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে তৎকালীন সলিমুল্লাহ মুসলিম হল তথা আজকের এস এম হলে তাদের পরিচয়। সেই সখ্য তাঁরা বহন করেছেন তাঁদের দুজনেরই মৃত্যু অবধি। আমি ২০১৫ সালে লেখমালা নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা শুরু করি। সে বছর কবি আবুবকর সিদ্দিক পূর্ণ করেন তাঁর ৮০ বছর। সে উপলক্ষে লেখমালা প্রকাশ করে ছোট আঙ্গিকে আবুবকর সিদ্দিক সংখ্যা। ওই সংখ্যায় আমি আমার পিতাকে আহ্বান জানাই ‘সহকর্মীর চোখে’ আবুবকর সিদ্দিক সম্পর্কে লিখতে। তিনি সেখানে অনেক কিছুই লিখেছেন, তবে তাঁর অধ্যাপনার গুণপনা সম্বন্ধে বলেন—

“অধ্যাপনা জীবনে কবির মধ্যে অনেক গুণের সমাবেশ দেখেছি। যদি কোনো অনুষ্ঠানে ছাত্রদের মধ্যে অস্থিরতা বা চাঞ্চল্য লক্ষ করা গেছে বা তাদের মধ্যে সোরগোল শুরু হয়েছে, আমরা কবিকে (আমাদের সিদ্দিক ভাইকে) দাঁড় করিয়ে দিতাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে। তিনি চমৎকারভাবে তাঁর ভাষার মহিমা ও বাচনভঙ্গি দিয়ে শান্ত করেছেন ছাত্রদেরকে। এ যাদুবিদ্যা হলো তাঁর বাংলা ভাষার উপর অগাধ স্বাচ্ছন্দ্য ও পাণ্ডিত্য। তাঁর ভাষার সুললিত শব্দমাধুর্যের এক চিত্তাকর্ষক তরঙ্গ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মন্ত্রমুগ্ধ ও নীরব করে রাখতো। তখন মনে হয়েছে ইংরেজ কবি সুইনবার্নের কথা। এ ইংরেজ কবির রচনার বিষয়বস্তু ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের বুঝতে কষ্ট হলেও তাঁরা বুঝতে পারেন কবির গীতিময়-ছন্দময় ভাষার শিল্পনৈপুণ্য। আবুবকর সিদ্দিকের মধ্যে সুইনবার্নের ওই গুণাবলি আমরা লক্ষ করি। আর এ কারণেই ক্লাসের পাঠদানে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আবুবকর সিদ্দিক ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয় এক শিক্ষক, আবার একই কারণে কোনো কোনো সহকর্মীদের চোখে ঈর্ষাপরায়ণ।”

এই ঈর্ষাপরায়ণতার অনেক ধরনের সাক্ষী তিনি হয়েছেন— কি পেশাগতভাবে কি সাহিত্যকৃতির জন্যে। বিষ্ণু দে যখন কাব্য উৎসর্গ করলেন, তখন প্রয়াত কানাডাপ্রবাসী কবি ইকবাল হাসান আবুবকর সিদ্দিকের সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিলেন। যেহেতু ওই কাব্য শামসুর রাহমানকেও উৎসর্গ করা ছিল। তাই ইকবাল হাসান শামসুর রাহমানেরও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করলেন। কিন্তু এরপরই আবুবকর সিদ্দিককে এড়িয়ে চলেন। তবে কানাডা চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির কোনো এক অদৃশ্য নগ্ন খেলার কারণে তিনি যে আবুবকর সিদ্দিকের সাক্ষাৎকার নিতে পারেননি, সে জন্য কবির কাছে ক্ষমা চেয়ে যান। এই ঈর্ষাপরায়ণতার শিকার তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুবার হয়েছেন। অথচ আবুবকর সিদ্দিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে আসার পরে বাংলা বিভাগের পাঠ্যক্রম থেকে তিরিশের কবিদের পড়ানো বন্ধ ছিল বেশকিছু কাল। কেননা ওই বিষয় পড়ানোর মতো শিক্ষক সেখানে ছিল না।এই চাটুকারতাড়িত সমাজে এটুকুই আশার কথা যে, মিডিয়া কবি আবুবকর সিদ্দিককে নিয়ে ব্যবসা করতে চায়নি কিংবা পারেনি। এমনকি আবুবকর সিদ্দিকের ঘনিষ্ঠ ছাত্ররাও তাঁর কাছ থেকে মধু আহরণ শেষে নিঃশব্দে কেটে পড়েছেন আড়ালে। তারা জেনে গেছেন, এই প্রত্যয়দীপ্ত ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে অমূলক, অনির্ণিত, অশোভন কিছু পাওয়া যাবে না, যা তাদের ওপরে ওঠার সিঁড়ি তৈরি করে দিতে পারে। অতএব তারা চাটুকারতাড়িত সমাজের মাথায় ঘি ঢালতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কবিরা তাঁকে এড়িয়ে গেছেন তাঁর কবিত্বশক্তির কারণে, গদ্যকাররা কাছে টেনে নেননি তাঁর কথাসাহিত্যের ভাষারীতি ও অমিয় তেজের কারণে। আর তাই আবুবকর সিদ্দিক তাঁর জীবদ্দশায় যেভাবে আলোচিত হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হননি। থেকে গেছেন আড়ালেই, স্বল্পালোচিত, অনালোচিত হয়েই।

কিন্তু আবুবকর সিদ্দিক ছিলেন মনের দিক থেকে শিশুসুলভ, সত্যপ্রকাশে সাহসী। তাই তাকে দেখেছি শত্রু-মিত্র, অগ্রজ-অনুজ সবার ভালোটুকু নিয়ে সোচ্চার হতে। কলম ধরেছেন তাদের লেখার গুণাবলি সম্পর্কে। তা থেকে আমার মতো একজন সামান্য লেখকও বাদ যাননি। ১৯৯৮ সালে আমার প্রথম কাব্যের ফ্ল্যাপে পরিচিতি তিনি লিখে দিয়েছিলেন। এরও আগে আমি যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, তখন আমার কবিতা নিয়ে গিয়ে তিনি তৎকালীন ছোটদের কাগজ নবারুণকিশোর কথায় ছাপিয়ে দেন। পরবর্তীকালে শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্পগ্রন্থ আবুবকর সিদ্দিক আমাকে উৎসর্গ করে বাংলাদেশের সাহিত্যের পঙক্তিতে আমাকে ঠাঁই করে দেন। বিনিময়ে আমি তাঁকে কিছুই দিতে পারিনি। তবে সান্ত্বনা, যে কাজটি তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্রদের করা উচিত ছিল, তার কিছুটা আমি কবির জীবদ্দশাতেই করতে পেরেছি। ‘আববুকর সিদ্দিক : সমগ্রতার চিরন্তনী’ নামের একটি গ্রন্থ লিখতে পেরেছি। বইটি অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে ২০২২ প্রকাশিত। এই বই কবির জীবদ্দশায় তাঁর হাতে তুলে দিতে পেরে স্বস্তি অনুভব করছি।

বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গেলে কি কবিতায়, কি কথাসাহিত্য, এমনকি স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পর্বের কথা আবুবকর সিদ্দিক এই নামটিকে কেউ উপেক্ষা করতে পারবেন না। সুতরাং এমন একজন সৎ নিষ্ঠাবান পরিশুদ্ধ জাত কবি ও কথাকারকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে আবুবকর সিদ্দিকের রচনাবলি প্রকাশের উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে। বাংলা একাডেমির জীবনসদস্য ও ফেলো হিশেবে আবুবকর সিদ্দিকের প্রতি এই সুবিচারটুকু বাংলা একাডেমিকে গ্রহণের দাবি ইতিমধ্যে নানামহল থেকে করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলা একাডেমি আবুবকর সিদ্দিকের মতো ক্ষণজন্মা সাহিত্যের সাধকপুরুষের প্রতি তাদের কর্তব্যপরায়ণতা দেখাবে। ১৯৩৪ সালের ১৯ আগস্ট জন্ম নেওয়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই প্রথিতযশা কবি ও কথাকার গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩-এ অনন্তলোকে যাত্রা করেন। তাঁর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যে পাঁচের দশকের শেষ প্রতিভূও নিভে গেল। একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি মধ্যে যে অমানিশা দেখছি, সেখানে নতুন কোনো সূর্যের আলো আমাদের কবিতা, কথাসাহিত্যে সম্ভাবনাময় দ্যুতি ছড়াক, সেই আশা রাখি।

 

Print Friendly, PDF & Email

Read Previous

কৃষ্ণচূড়া

Read Next

ড. জসীমউদ্দিন আহমেদ : ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনের অনন্য পথিকৃৎ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *