অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শাহীদ লোটাস -
কবর জিয়ারত

আপনি একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, আমাদের সমাজে অধিকাংশ মৃত মানুষের বেলায় তাদের কবর জিয়ারত করার তেমন মানুষ থাকে না। যদিও তার মৃত্যুর সময় অনেক আত্মীয়স্বজন, অনেক বন্ধুবান্ধব, অনেক প্রতিবেশী, পরিচিত আর অপরিচিত আসে তার শেষ বিদায়ের বেলায়, অনেকেই আবার হা-হুতাশ করে। কান্নাকাটিও করে। তারপরেও তারা সবাই সেই মৃত্যু মানুষটিকে ভুলে যায় কয়েকদিন যেতে না যেতেই, ভুলে যায় সেই মৃত্যু মানুষটি কবরের ভেতর কেমন আছে তা জানার আগ্রহ। আপনি হয়তো ভাবছেন দুনিয়ায় জীবিত থাকা মানুষগুলো বড় বেঈমান, তাই শৈশব কৈশোর যৌবন আর বৃদ্ধ বয়সের সঙ্গী এমন মানুষটিকে ভুলে গিয়ে তারা নিজে নিজেদের নিয়ে মশগুল হয়ে পড়ে, তাই মৃত মানুষটি তাদের মনে আর প্রভাব ফেলতে পারে না।

আপনার ধারণা ভুল! মৃত মানুষটিকে এভাবে ভুলে যাওয়া বা তার কবর জিয়ারত না করতে যাওয়ার জন্য আসলে দুনিয়াদারির ব্যস্ততা ততটা দায়ী নয় যতটা দায়ী মৃত মানুষটি নিজে। আমি বলছি মৃত মানুষটিই দায়ী, আপনার হয়তো আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না! নিজেকে দিয়েই একটু ভাবুন। আপনার জীবনে আসা শত শত মানুষের মাঝে স্বার্থপর ধোঁকাবাজ মানুষগুলোকে নিয়ে একটু ভাবুন। তাদের মধ্যে যারা মৃত্যুর মাধ্যমে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে তাদের সম্পর্কে একটু ভাবুন। আপনার সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে যাওয়া স্বার্থপর মানুষ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী হচ্ছে? তার কবরের পাশে গিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে আপনার? বলতে ইচ্ছে হচ্ছে কি ‘সৃষ্টিকর্তা সমাধিতে যিনি শায়িত আছেন তাকে আপনি স্বর্গ দিয়ে দিন, তাকে আরামে রাখুন’। নাকি আপনার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে— ‘শালা ইবলিশ, জীবিত থাকা অবস্থায় তুই অনেক কুকর্ম করেছিস, এখন বুঝ মজা, এখন তোর দিন শেষ, এখন তোর সকল কুকর্মের জন্য শাস্তি ভোগ কর।’

আর যারা সত্যিই মহান ছিলেন, আপনার বা অন্য কারো কখনো ক্ষতি করেননি, পারলে ভালো কাজেই করেছেন সব সময়, যার জীবনে আপনি কখনো ধোঁকাবাজি পাননি, যে নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের স্বার্থ কখনো নষ্ট করেননি, যিনি অন্যের প্রতি অত্যাচার না করে বরং অত্যাচারিত মানুষ পক্ষ নিয়ে কাজ করেছেন, সে ধনাঢ্য বা দরিদ্র যাই হোক না কেন, তার মৃত্যুর পর আপনার কেমন লাগে তার কথা ভাবলে? কেমন অনুভূতি হয় আপনার? তার সমাধির পাশে গিয়ে কি তার জন্য একটু দোয়া করতে ইচ্ছে হয় না আপনার? নাকি গালি দিতে হয় সেই মন্দ মনুষ্যকে যেমন গালি দিয়েছেন? আমি জানি আপনার মনে এখন কী হচ্ছে, কোন ধরনের ধারণা হচ্ছে ভালো ও মন্দ মানুষের প্রতি। আপনি একটু খুঁজে দেখলেই দেখবেন যে, যেই কবরগুলো জিয়ারত হয় েনা সেই কবরে শায়িত থাকা মানুষগুলো জীবিত থাকা অবস্থায় স্বার্থপর ছিল, অন্যায়কারী ছিল বা তেমন ভালো মানুষ ছিলই না দুনিয়াতে। তারা নিজের স্বার্থ ছাড়া তেমন কিছুই করেনি জীবিত থাকা সময়টুকুতে। তাই মৃত্যু মানুষটির এমন স্বার্থপরতার কারণে তার আত্মীয়, তার বন্ধুমহল বা দূরের লোক সকল তাকে এমনভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যে ভুলে থাকে যে শত শত দিন পার হলেও তার কবরে পাশে যেতে তাদের অনীহা হয়, সেই মৃত মানুষটির কথা মনে হলে তারা আবেগ-আপ্লুত না হয়ে বরং বিরক্তই হয় বেশি, কবরে শায়িত থাকা মানুষটির প্রতি ঘৃণাভরা একটা তিক্ততা এসে পরে আপনাআপনি।

মানুষ সত্যিকার অর্থে ততটা বেঈমান হয় না, যতটা মানুষ ভাবে। মানুষ যদি বেঈমান হতো তাহলে মৃত্যু মানুষের রেখে যাওয়া তার সন্তানসন্ততিও তাকে ভুলে যেত, তার কবর জিয়ারত করতে যেত না কখনো। এখন আপনি বলতে পারেন, মৃত মানুষের সন্তান সন্ততি রক্তের টানে ভালোবাসার টানে তার কবরের পাশে যায়, এক সঙ্গে সব সময় বসবাস করার কারণে এমন করে, কারণ মৃত্যু মানুষের শূন্যতা জীবিত মানুষগুলো অনুভব করে বলেই মায়া ও ভালোবাসার টানে মৃত্যু মানুষের কবরের কাছে ছুটে যায় বারবার, কবরের পাশে গিয়ে কান্নাকাটি করে, দোয়া করে।

আসলেই এমন ভেবে থাকলে আপনি সম্পূর্ণ ব্যাপারটি বুঝতে পারেননি এখনো। কারণ এখানে রক্তের টান বলে তেমন কিছু নেই, ভালোবাসা মায়া ও শূন্যতা বলেও তেমন কিছু নেই, আছে তাদের প্রতি তার জীবনভর কর্ম, যেমন মৃত্যু হয়ে যাওয়া মানুষটি অন্যের প্রতি যতই স্বার্থ-বাদী হোক না কেন, অন্য মানুষকে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর ক্ষতি করুক না কেন, সে তার সন্তানসন্ততি পরিবারে থাকা লোকগুলোকে সব সময় ভালো রাখার চেষ্টা করেছে, সে তার পরিবারে থাকা লোকগুলোর সঙ্গে স্বার্থপরতা করেনি কখনো, সর্বদাই সন্তানের স্বার্থ নিয়েই ভেবে কাজ করেছে সবার সঙ্গে, তাই সে তার সন্তানের কাছে পরিবারের কাছে অপরাধী নয়, তাই তার সন্তান তার জন্য মাঝে মাঝে কাঁদে, তার কবর জিয়ারতে করতে যায়, কারণ তাদের কাছে কবরে শায়িত থাকা মানুষটি ভালো মানুষ, উত্তম মানুষ।

এখন প্রকৃত কথা আপনাদের বলি, পৃথিবীতে রক্তের টান আছে, এটা ভুলে যাওয়ার নয়, তবে এই টানের মাঝে ঘৃণাও থাকতে পারে আবার ভালোবাসাও থাকতে পারে। যেমন ধরুন, আপনার পরিবারে বা আত্মীয়দের মাঝে সবার প্রতি কিন্তু আপনার ভালোবাসা ও আবেগ এক রকম নয়, কারও প্রতি আপনার ভালোবাসা অনেক, তার কোনো বিপদের কথা শুনলেই আপনি কষ্ট পান ব্যথিত হন, চেষ্টা করেন তার বিপদে আপনিও শামিল হয়ে তাকে উদ্ধার করতে, কারণ সে উপকারি মানুষ, সে আপনাকে ভালোবাসে বলেই আপনি এমন করেন। আবার আপনার একেই পরিবারে থাকা কেউ কেউ আছে যাদের কথা শুনলেই আপনার মাথায় রক্ত উঠে যায়, তার প্রতি ঘৃণা ছাড়া আপনার কোন অনুভূতিই হয় না, সে কোনো বিপদে পরলে আপনি মনে মনে বলেন, ‘এটা তার পাপের শাস্তি হচ্ছে, অপরাধ করে কেউ পার পায় না এইটাই তার প্রমাণ’।

আপনার ভেতরে এমন কেন হয়, বলুন তো দেখি? দুজনেইতো আপনার আত্মীয়, কাছের লোক, তারপরেও এক জনের প্রতি ভালোবাসা আর আরেকজনের প্রতি ঘৃণা, কেন এমন হয় ? কারণ মানুষ যে রকম করবে সে সেই রকমেই ব্যবহার উত্তরে পাবে। তার মানে বড় বিষয় জীবিত অবস্থায় যে যেই রকম কাজ করবে তার মৃত্যুর পর মানুষ তাকে ঠিক সেই ভাবেই মূল্যায়ন করবে। আপনি আরও একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন, আপনি হয়তো জীবনে এমন কারও কারও কবর জিয়ারতে গিয়েছেন যার সঙ্গে আপনার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, কোনো স্বার্থের সম্পর্কও নেই, তার সঙ্গে আপনার কখনো দেখাই হয়নি কথাও হয়নি কোনোদিন, সে হয়তো পৃথিবী থেকে চলে গেছে আপনি পৃথিবীতে আসার বহু বহু বছর আগে, তারপরেও তার কবর জিয়ারত করেছেন, করব জিয়ারত করতে গিয়েছেন, কারণ আপনি শুনেছেন, তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন, তিনি জীবিত অবস্থায় কারও ক্ষতি করেননি কখনো, তিনি সব সময় সৎ ও উত্তম মানুষ হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেছেন। এই ভালো মানুষ হওয়ার কারণেই পরম শ্রদ্ধায় তার মৃত্যুর পর আপনি তার কবর জিয়ারতে যেতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে কয়েক প্রজন্ম পরে পৃথিবীর সব কবরই বিলীন হয়ে যায়, মিশে যায় ভূপৃষ্ঠে। কিন্তু এই বিলীন হয়ে যাওয়া ও মিশে যাওয়া কবরগুলোর মাঝে কিছু কিছু কবর জীবিত থাকে চিরকাল। কিছু কিছু কবর অগণিত মানুষের ভালোবাসায় ও শ্রদ্ধায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো পৃথিবীতে আলো ছড়ায়, কারণ তারা তাদের জীবনদ্দশায় ছিলেন মহামানব, ভালো কাজ করাই ছিল তাদের জীবনের লক্ষ্য, পৃথিবীতে তারা এমন কিছু করে গেছেন যার সুফল মানুষ এখনো পেয়ে থাকে, তাদের জীবনকে অনুসরণ করে এখনো মানুষ তাদের মতোই হওয়ার স্বপন দেখে। আর পৃথিবীর কিছু কিছু কবর ঘৃণা ও ধিক্কারে চিহ্নিত হয়ে আছে সব সময়, কারণ সেই ঘৃণিত কবরে যিনি শায়িত থাকে, সে তার জীবনে এমন অকর্ম করে গেছে যার জন্য বহু মানুষ অসহ্য কষ্টে কাটিয়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবন, সৃষ্টিকর্তার কাছে থেকে পাওয়া মাত্র একটি জীবন সুখের বদলে যন্ত্রণায় তলিয়ে গিয়েছিল সেই নিকৃষ্ট মানুষের অমানবিক কাজকর্মে, তাই সেই নির্যাতিত হওয়া, অত্যাচারিত হওয়া মানুষের নিদারুণ চিৎকারের প্রতিধ্বনি এখনো পৃথিবীতে শোনা যায়, তাদের সেই আর্তনাদেই কবরে শায়িত থাকা অত্যাচারী মানুষকে ঘৃণা করার সঙ্গে সঙ্গে ঘৃণা করে তাদের কবরকে পৃথিবীর সবাই। সত্যি কথা বলতে কী, কবর কখনো বেঁচে থাকে না, বেঁচে থাকে মানুষের কর্ম।

 

Read Previous

মুদ্রিত দুঃখের ধারাপাতে

Read Next

শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণন, ৫ম সংখ্যা (অক্টোবর-২০২৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *